পাখি

অনেকক্ষণ ধরে ওর ভ্যা ভ্যা কান্না সহ্য করেছি। এবার সত্যি মেজাজটা বিগড়াল।
কাছে গিয়ে বিশাল একটা ঝাড়ি দিলাম, "প্যানপ্যানানি থামাবি? নাকি থাপ্পড় লাগাব?"
আমার ঝাড়িতে ও নাকও গলাল না, কানও গলাল না। প্যানপ্যানিয়েই যাচ্ছে। ননস্টপ বুঝি এইটাকেই বলে। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়েই যাচ্ছে। একঘন্টা ধরে কাঁদার পরেও কীভাবে যে এত তাজা পানি বের হয়, ভেবে অবাক হচ্ছি। নাক বেয়েও দরদর করে হিনি বের হচ্ছে, আর ও একটু পরপর জোরে শোরে টান দিয়ে যেখান থেকে এসেছিল সেই আপন ঠিকানায় ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এতটা বিশ্রী আর জঘন্য দৃশ্য বুঝি আর হয়না!
আবারও ধমকালাম, "কান্না কিন্তু তোর বন্ধ করে দেব। কাঁদতে হলে রাস্তার ওধারে জঙ্গল আছে সেখানে গিয়ে কাঁদ। খাটাস আর পাতিশিয়াল তোর কান্না শোনার জন্য রয়েছে। এইরকম কান্না লোকালয়ে কাঁদা যায়না।"
ও এবার ফ্যাত করে হিনি ফেলল। তারপর ফ্যাসফ্যাস করে বলল, "তুমি বাড়িতে ছিলে না, আপু? আমার শালিকটা কী করে পালাল?"
: "তোর কাছে আদর পায়নি সেই জন্যই হয়ত পালিয়েছে। এতে ছাগলের মত  ভ্যা ভ্যা করার কী আছে? তোর তো খুশি হওয়া উচিত। ও যেখানে সুখে থাকবে সেখানেই গেছে।"
: তুমিইতো দেখেছ ওকে কত আদর করতাম, ওর আর কত আদর চাই? আর ও-ওতো আদর করত, আমার গালে মুখে ঠোঁট ছুঁয়ে দিত। তাহলে পালাল কেন?"
: "তোর শালিক নিয়ে গবেষণা করার সময় নেই আমার। যা, ভাল করে নাক ঝেড়ে গামছা দিয়ে মুখ মুছে নে। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দিস। চোখ ফুলে তো ভাংখোরের মত হয়েছে। আব্বা দেখলে তোর অবস্থা কেরোসিন বানিয়ে দেবে।"
: "আপু…"
ও অতি করুণ সুরে ডাকল।
: "কী হল আবার?"
: "চল না একবার খুঁজে দেখি। বেশি দূর ও আমাকে ছেড়ে যেতে পারে না, আমার বিশ্বাস। হয়ত কোন দরকারে গেছে।"
: "আর হাসাস্ না বাবু, পাখি আবার কোন দরকারে বাইরে যায়!"
: "তুমি ওকে চেন না। ও আমাকে অনেক পছন্দ করে। আমাকে ও ছেড়ে যাবে না।"
: "সময় নাই বললাম না? যেতে হলে তুই একা যা, আমি পারব না।"
: "আপু, প্লিজ…, আব্বা-মা ফেরার আগেই চলে আসব, প্রমিজ। প্লিজ আপু…"
বাবুর চোখ দিয়ে অবিরত পানি ঝরছে। নাকের উপর-নিচ খেলাও চলছে। দেখে ঘেন্না লাগছে। আবার মায়াও লাগছে। বেচারা!!! বললাম, "সুন্দর করে নাক পরিষ্কার করে হাত-মুখ ধুয়ে আয়, যা।"
: "তারপর যাবে?"
: "হুম।"
ও এক রকম ছুটতে ছুটতে পুকুরপারে চলে গেল। একটু পরেই ফিরে এল পরিষ্কার হয়ে।
এসেই বলল, "চল।"
জানি পাব না, কারণ পাখি একবার উড়ে গেলে আর পাবার কথা না। কিন্তু এই হাঁদারামটাকে কে বুঝাবে? অহেতুক খুঁজে যাচ্ছি। ন্যাকাটাকে শান্ত করার জন্য।
তাও কতটুকু শান্ত হবে কে জানে? যদি না পাওয়া যায় হয়ত আবার শুরু হবে।

গতবছরের শেষের দিকে একটা ঘুর্ণিঝড় হয়েছিল, আমাদের বাসার সামনে একটা রাধাচূড়া গাছ ভেঙে পড়েছিল। সকালে রাধাচূড়া গাছের হলুদ হলুদ ফুল ওর হাতের নাগালে পেয়ে কী যে খুশি হয়েছিল বাবু! হাততালি দিতে দিতে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ও ফুল ছিড়তে শুরু করে। আর চিৎকার দিয়ে দিয়ে "আব্বা", "মা", আর "আপু" বলে ডেকে যাচ্ছিল। ও ভেবেই পাচ্ছিল না যে কী করে এত বড় গাছটা মাটিতে শুয়ে পড়ল? এতদিন ও শুধু ওপরে তাকিয়ে ফুলগুলো দেখত, আর দু-একটা যা নিচে পড়ত তাই কুড়িয়ে আনতো। আজ নিজে গাছ থেকে ফুল
ছিঁড়তে পেরে ও নিজেকে মহাবীর মনে করতে থাকে। আমাকে ডেকে বলে, "আপু, এসো ফুল তুলবে।"
আমি বললাম, "তুই-ই তোল, আমার কাজ আছে।"
ও একাই ফুল তুলতে থাকে। হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বলে, "আপু, আপু, দেখে যাও, একটা কাকাতুয়া পাখি।"
আমি গিয়ে দেখি ওর হাতে একটা ভিজে যাচ্ছেতাই হওয়া অবস্থার শালিক পাখি। ওটার মাথার ছোটছোট পালকগুলো ভিজে কেমন উঠে উঠে আছে। দেখে মনে হয় ঝুটি। আর ও গত বছর বইয়ে পড়েছে "কাকাতুয়ার মাথায় ঝুঁটি। সেজন্য ও ভেবে নিয়েছে যে ওটা কাকাতুয়া। আমি মুখ টিপে হাসলাম, বললাম, "ওটাতো শালিক পাখি।"
ওর আনন্দ আর দেখে কে? মনে মনে ভাবে, "ঝড়টা হয়ে ভালই হল। অনেক মজার মজার জিনিস পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন কেন যে ঝড় হয়না কে জানো!!"
ও বলে উঠল, "আপু, আমি এই শালিকটাকে পালব।"
: "পালার আর কিছু পেলিনা দুনিয়ায়? শেষ পর্যন্ত শালিক পাখি! আব্বা দেখলে ভীষণ বকবে। তার চেয়ে যেখানে পেয়েছিস সেখানেই রেখে দে, ভাল হয়ে উড়ে যাবে।"
: "ইমমমম্ না, আমি এটাকে ছাড়ব না, আমি পালব, এটা আমার।"
বলে এমনভাবে বুকের সাথে লাগাল যেন এটা ওর হাজার বছরের পোষা শালিক পাখি। আমি হাসলাম। ও বলল, "আচ্ছা আপু, শালিক পাখি কী খায়?"
: "কী আর খাবে? পোলাও, রোস্ট, বিরানি, আইসক্রিম, পুডিং- এইসব খায়।"
: "হি হি, এসব কি ওর মা রেঁধে দেয়?"
: "হুম, আমাদের তো মা-ই রেঁধে দেয়।"
: "আচ্ছা, ও কি আমাদের মার রান্না খাবে?"
কী আশ্চর্য! ছোট হয়েছে বলে কি এত বোকা হতে হবে? বলেছি শালিক পোলাও রোস্ট খায় আর বিশ্বাস করে বসে আছে। বললাম, "ও এগুলোর কোনটাই খাবেনা। মজা করেছি। ও ধান খায়, পোকামাকড় খায়, ভাতও খায়।"
: "তাহলে তো আরও ভাল। কষ্ট হবে না বেশি।"

সেই থেকে এই শালিক পাখিটা ওর। এত যত্নে রাখে মনে হয় যেন নবজাতক। ওকে না খাইয়ে কখনও খায়না। দশ মিনিট পরপর না দেখলে পড়ায় মন বসেনা। বাইরে কারও সাথে খেলতে যায়না। যা খেলা সব শালিক পাখিটার সাথেই।
আব্বা-মার বকাও খেতে হয়েছে অনেকদিন। আব্বা বেশ কয়েকবার পাখিটাকে ছেড়ে দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাবু কেঁদেকেটে একশেষ অবস্থা। কার সাধ্য আছে এটাকে ছেড়ে দেয়?
যেটুকু সময় স্কুলে থাকে ততটুকু সময়ই শুধু চোখের আড়াল, এছাড়া সবসময় চোখে চোখে রাখে।
দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় দুই বিষয়ে ফেল করেছে বাবু, অথচ এর আগে ওর রেকর্ড নম্বর ছিল। আব্বা চেঁচিয়ে সারা বাড়ি মাথায় তুলেছিলেন।

ঘন্টা দুই খোঁজাখুঁজির পর খালি হাতে ফিরে এলাম। এইটাই স্বাভাবিক। বাবুর কান্না আবার শুরু হয়েছে। ও বাসার পেছনে আবার শালিক পাওয়ার আশায় একবার ঢু মারতে গেল।
আমি বাসায় এলাম। আব্বা মুখ ভার করে বসে আছেন। মা এখনও ফেরেনি। আমি ঘরে পা রাখামাত্র আব্বা বললেন, "কোথায় ছিলি এতক্ষণ?"
: "একটু বাইরে ছিলাম।"
: "কোন রাজকার্যে? নবাবপুত্তুর কোথায়?"
আব্বার মেজাজ মনে হচ্ছে ব্যাপক খারাপ। বিদ্যুৎ নেই বলে দরদর করে ঘামছেন।
: "আব্বা, কী হয়েছে?"
: "নবাবজাদাকে ডাক।"
: "ও মনে হয় পেছনে আছে, চলে আসবে। কী হয়েছে আব্বা?"
: "নবাবজাদার দ্বিতীয় সাময়িকের রেজাল্ট দিয়েছে।"
: "কেমন করেছে?"
: "কেমন করেছে তা জিজ্ঞেস করতে হয়? এবার তিনটাতে ফেল। দুপুরবেলা পেলে ওকে কেটে ফেলতাম। হারামজাদা, পাখির পেছনে ঘুরঘুর সারাদিন। লেখাপড়া ডকে তুলেছে। ডাক ওকে, ওর শালিক পোষার শখ আমি মেটাচ্ছি।"
: "আব্বা, ওর শালিকটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ও অনেক কাঁদছে। এখন কিছু বলবেন না, প্লিজ। পরে একটু বকে দিয়েন। আর তাছাড়া ওর পাখি তো হারিয়েছে। এখন আর সময় নষ্ট করতে পারবে না। খুঁজে পাবে কিনা কে জানে?"
আব্বা একটু শান্ত হলেন। আমি পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি কি ওর পাখিটা ছেড়ে দিয়েছেন?"
: "ওর পাখি নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, ওই পাখি আর কোনদিন আসবেনা।"
এমন সময় বাবু ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকল, বুকের সাথে তার প্রিয় শালিক পাখিটা। দীর্ঘ বিরহের পর খুঁজে পেয়েছে। ও আস্তে আস্তে আব্বার দিকে এগিয়ে গিয়ে
তার গলা জড়িয়ে ঢুকরে কেঁদে উঠল, ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, "আব্বা, আমার শালিক পাখিটা চোখ খুলছে না। আমি এতবার বললাম আমার ঠোঁটে গালে আদর করতে, ও একবারও করল না। ওর মনে হয় অসুখ করেছে। আব্বা, একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন? আব্বা, প্লিজ, প্লিজ…। আমি আর সারাদিন ওর সাথে থাকব না। খালি খাওয়ানোর সময় থাকব। আমি মন দিয়ে পড়ব, প্রমিজ। ওকে শুধু ভাল করে দিন।"
আব্বা ওকে কাছে টেনে বসালেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তিনি জানেন, শালিক পাখিটা আর বাবুকে আদর করবে না। কোনদিন না। বাবা নিজেকে খুব অপরাধী ভাবতে থাকেন।
কিন্তু কিছুই করার নেই। কিছু করার ছিলও না। অবশ্য তিনি ছেড়ে দিতে পারতেন, কিন্তু বাবুর প্রতি রাগটা শালিকটার উপর ঝাড়লেন। বাবু কাঁদছে, ওর নাক চোখ বেয়ে
পানি পড়তে থাকে। আব্বাকে খুব অসহায় লাগছে।
আমি বাবুকে ডাকলাম, "আয় ভাইয়া, নাকটা পরিষ্কার করে দিই।"
ও আমার দিকে এগিয়ে এল। কিন্তু শালিক পাখিটাকে আব্বার কাছে রেখে এল। পুকুরপাড়ে যাওয়ার পথে ওকে বললাম, "তোকে আর একটা শালিক ধরিয়ে দেব। আর কাঁদিস না লক্ষ্মী ভাইয়া।"
ও আস্তে করে বলল, "থাক, লাগবে না, আমি বড় হয়ে শালিক পাখি পালব।"
আমি ওকে বুকের কাছে টেনে নিলাম। চোখ মুছে দিয়ে নাতে হাত দিয়ে বললাম, "দেখি, নাকটা ঝাড়্।"
ও বাধ্য ছেলের মত হুমমম্ দিল।

এই গল্পটিকে রেটিং দিন

এই গল্পটি পড়ে আপনার কাছে কেমন লেগেছে তা আমাদেরকে জানাতে আপনি একটি রেটিং দিন। আপনার দেওয়া রেটিং লেখককে আরো সুন্দর গল্প লিখতে সাহায্য করবে। (Admin)

আরো গল্প পড়ুন
User Rating: 4.87 ( 3 votes)

About সাদিয়া আফরিন

Check Also

নারী নিগ্রহের গল্প

ছেঁড়া ব্লাউজ (নারী নিগ্রহের গল্প) । মামুন মুনতাসির

বিয়ের জন্য পাত্রী হিসেবে ষোল-আঠারো বয়সের মেয়েদের প্রথম চয়েসে রাখে যে কোন পুরুষ। মুছাপুর গ্রামে …

5 comments

  1. অনেক সুন্দর গল্প। পড়ে ভালো লাগলো তবে পাখিটার জন্য খুব খারাপ লাগলো। 

  2. নতুন লেখক হিসেবে আপনাকে আমার বাংলা পোস্ট এ আপনাকে স্বাগতম। কোন কিছু বুঝতে অসুবিধা হলে আমাদেরকে জানাবেন। আমি আপনার পোস্টকে seo ফ্রেন্ডলি করে দিলাম। 

    • সাদিয়া আফরিন

      অনেক ধন্যবাদ!

      • ধন্যবাদ আপনাকেও। আপনি আমাদের বিষয়বস্তুত উপরে লিখে যান, প্রয়োজনে আমরা সম্পাদন করে দিবো। একটু সুন্দর সামাজিক ব্লগ মাধ্যম গঠন করতে আমরা আপনার সাহায্য কামনা করি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *