হযরত আসিয়া (আঃ)

আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—

وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ آمَنُوا اِمْرَأَةَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

মুমিনদের জন্যে ফেরাউন-পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফেরাউন ও তার দুস্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে যালেম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।–সুরা—আততাহরীম, আয়াত ১১।

মুসলিম নারীদের জন্য চির বরণীয় ও অনুসরণীয় এক ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন আছিয়া। সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা সুউচ্চ প্রাসাদের আলীশান মহলে তিনি বসবাস করতেন। সবুজ বৃক্ষের তলদেশে প্রাসাদের গা ঘেষে নীল দরিয়ার স্বচ্ছ পানি বয়ে চলত অবিরাম। এমন সব নেয়ামত ও আয়েশের মাঝেও আছিয়া ছলেন অতৃপ্ত, অস্থির। তাহলে কোন সে পিপাসায় তিনি কাতর ছিলেন? কিসের অভাবে ছটফট করতেন তিনি?

আল্লাহ পাকের কাছে আছিয়া কাতর দুয়া করেছিলেন—তিনি যেন তাঁর স্বামীর দুঙ্কর্ম থেকে তাঁকে হেফাজত করেন। তাঁর জুলুমবাজ কওমের হাত থেকে রেহাই দেন তাঁকে। তিনি আরো বলেছিলেন, তাঁর স্বামীর পৃষ্ঠপোষকতায় যে পাপের রাজ্য কায়েম হয়েছে, সেখান থেকে বের হতে তিনি উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন। অথচ এক সময় তিনি স্বামীর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। হৃদয়জুড়ে ছিল তাঁর ভালবাসা। তাহলে তাঁর এ অভিযোগের প্রেক্ষাপট কী?

ফেরাউন তাঁর সুউচ্চ রাজপ্রাসাদ, সুদূর বিস্তৃত সাম্রাজ্যে অপ্রতিদ্বন্ধি বাদশাহ ছিল। সে ছিল ভীষণ কঠোর প্রকৃতির ও পাষাণ দিল। নির্বিচারে প্রজাসাধারণের উপর সে জুলুম করত। অত্যাচারে জর্জরিত করত তাদের। ফেরাউন স্বেচ্ছাচারিতার চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। অত্যন্ত অহংকার ও গর্ব করে বেড়াত সে। বনী ইসরাঈল ছিল তাঁর অবৈধ অত্যাচারের নিশানা। তারা নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে অত্যন্ত কষ্টের ভেতর দিয়ে ফেরাউনি রাজ্যে জীবন যাপন করছিল । বিপদ মুসিবতে ধৈর্য ধরা ছাড়া তাদের কিছুই করার ছিল না। একদিন রাজদুরবারের প্রধান জ্যোতিষী ফেরাউনের কাছে এসে বলল—বাদশাহ নামদার। অচিরেই বনী ইসরাঈলের মাঝে একজন সন্তান জম্ম নিবে। তাঁর হাতে আপনার সাম্রাজ্যের পতন অনিবার্য। জ্যোতিষীর এ সংবাদ বনী ইসরাঈলের উপর অত্যাচারের আগুনে ঘি ঢেলে দিল। ফেরাউনের পাষণ্ডতা উথলে উঠলো। জ্যোতিষীর এ অসহনীয় কথায় তাঁর উন্মত্ততা বেড়ে গেল কয়েকগুণ। নিজেকে একটু প্রবোধ দেয়ার জন্য, মনটাকে একটু সুস্থির করার জন্য বনী ইস্প্রাঈলের উপর জুলুমের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। সে তাদের নবজাতক পুত্র সন্তানদের ধীরে ধীরে নৃশংসভাবে হত্যা করতে লাগল। তবে শুধু কন্যা সন্তানদের জীবিত রাখত। অবশেষে আল্লাহ পাক বনী ইসরাঈলের ভাগ্য লিখনে পরিবর্তন আনলেন। তাদের পর্যাপ্ত শক্তি ও ক্ষমতা দান করলেন। ফলে ফেরাউন যে বিভীষিকার আশংকা করত, তা স্বচক্ষে দেখতে বাধ্য হয় সে।

লোমহর্ষক এ ঘটনার শুরুটা খুবই অম্লমধুর । ফেরাউনের রাজপ্রাসাদের অনতিদূরে ছোট্ট এক ঝুপড়িতে ইউহানিব নাম্নী এক মহিলা বাস করতেন। তাঁর গর্ভধারণের সময় ঘনিয়ে এলে নিজগৃহের এক কোণায় তিনি আবদ্ধ হয়ে রইলেন। প্রসব বেদনা শুরু হলে তিনি মেয়েকে বললেন যাও, জলদি একজন ধাত্রী ডেকে নিয়ে আস। মেয়ে ধাত্রী ডেকে আনল। ইউহানিবের ঘরে একটি সুন্দর ফুটফুটে পুত্রসন্তান ভূমিষ্ট হল। তিনি ফেরাউনের নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার কথা করে ভয় ও আতংকে শিউরে উঠলেন। নিজেকেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এই নিষ্পাপ ফুলের মত শিশুকে কি মেরে ফেলা হবে? ছেলের প্রতি ভালবাসায় তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলেন। সিংস্র ফেরাউনের হিংস্রহাত থেকে বাঁচতে একাধারে তিন মাস গৃহভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকলেন তিনি। এজন্য ইউহানিব প্রতিটি মুহূর্তেই চিন্তা ও আতংকের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করতেন। নিজের প্রতি নয়, ছেলে মূসার প্রতি ভয় ও ভালবাসায় তিনি গভীর চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তবে আল্লাহ পাক তাঁর সহায় ছিলেন। তিনি তাঁকে নির্দেশ দিলেন, এ শিশুটির জন্য একটি কাঠের সিন্দুক তৈরি কর। তারপর তাঁকে সিন্দুকের ভেতর ভরে নীল দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও। আর তোমার মেয়েকে সিন্দুকের অনুসরণ করে নীল নুদের পার দিয়ে চক্কর দিতে বল। এ ঐশী আদেশ পেয়ে মুসা জননীর চিত্ত প্রশান্ত হল। মন থেকে সব ডর—ভয় মুছে গিয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেন তিনি। সুন্দর একটি সিন্দুক বানানো হল। ইউহানিব নয়নের মণি মুসাকে সেখানে রেখে দিয়ে মেয়েকে বললেন, সিন্দুকটি মাথায় করে নীল নদের ঘাটে নিয়ে যাও। চতুর মেয়ে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে কাজ সম্পন্ন করল। ইউহানিব সন্তান সমেত সিন্দুকটি নীল নুদে ভাসিয়ে দিলেন। প্রবাহমান নদীর ঢেউয়ের আঘাতে আঘাতে সিন্দুকটা নাচতে নাচতে এগিয়ে চলল। সন্তানকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মা জননী ঘরে ফিরলেন। মেয়েকে পাঠিয়ে দিলেন সিন্দুকের পেছনে পেছনে। নদীর ফস্রোতে ভাসতে ভাওতে সিন্দুকটি ফেরাউনের মর্মর নির্মিত সুদৃশ্য সিঁড়ির গোড়ায় এসে থামল। ফেরাউনের স্ত্রী, কন্যা, সেবিকারা এখানে বসেই নদীর শীতল হাওয়ায় গা জুড়াত। প্রাসাদের এক খিড়কি দিয়ে আছিয়া এ সিন্দুকটি দেখতে পেলেন। বাচ্ছাসহ সিন্দুকটি উপরে তুলে আনা হল। ফেরাউনের সিপাহী ও প্রহরীরা আশাপাশেই ছিল। তাদের সবার হাতেই শিশু হননের যাবতীয় অস্ত্র ও হাতিয়ার উন্মুখ হয়ে রয়েছে। তাদের কাজই ছিল, বনী ইসরাঈলের ঘরে কোন নবজাতকের সন্ধান পেলে তাঁকে বধ করে নীল নদে সেই লাশটা ভাসিয়ে দিবে কিংবা দূরের কোন মরু উপত্যকায় ফেলে আসবে। শিশুটিকে প্রথম দর্শনেই ফেরাউনের মনে একটি ভালবাসা জেগে উঠল। কিন্তু তাঁর আশ পাশের লোকেরা শিশুটিকে হত্যা কুরে ফেলতে তাঁকে নানাভাবে উত্তেজিত করতে লাগল। কেউ একজন বলেও ফেলল, মহারাজ! সিন্দুকে বাচ্ছা রেখে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া আসলে আপনার বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র। জ্যোতিষীর কথা অনুযায়ী হতে পারে এই বাচ্ছাটিই আপনার রাজ্য পতনের কারণ হবে। তাদের এই কথোপকথনের মাঝে আছিয়া এক কদম সামনে এসে বললেন,

وَقَالَتِ امْرَأَتُ فِرْعَوْنَ قُرَّتُ عَيْنٍ لِّي وَلَكَ لَا تَقْتُلُوهُ عَسَى أَن يَنفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ

এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি, তাকে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি। প্রকৃতপক্ষে পরিণাম সম্পর্কে তাদের কোন খবর ছিল না।–সুরা কাসাস, আয়াত ৯।

আছিয়া স্বামীর কাছে এ শিশুটির ব্যাপারে তাঁর সাধারণ হুকুম বলবৎ না করার জন্য উপর্যুপরি অনুরোধ করতে লাগ্লেন। প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বললেন, হতে পারে এ শিশু বড় হয়ে আমার একান্ত বাধ্যগত হবে আর আমরা তাঁকে আমাদের সন্তানরূপে গ্রহণ করবো। এক পর্যায়ে ফেরাউন তাঁর কোথা মেনে নিল। রাজপ্রাসাদে মূসা তখন ফেরাউনের পুত্রবৎ হয়ে গেল। মানস সন্তানের প্রতি অগাধ ভালবাসায় আছিয়ার দিল টইটম্বুর। আনন্দের দোলায় তিনি দুলতে লাগলেন।

প্রাসাদের লোকেরা এ শিশুর জন্য একজন ধাত্রী খুঁজতে লাগল। হাজার হলেও এতো এখন রাজপুত্র। আর ফেরাউন তো শুধু বাদশাই নয়। প্রজাসাধারণের স্বকল্পিত প্রভুও সে। কাজেই চতুর্দিক থেকে ধাত্রীদের আগমন্ব প্রাসাদ ভরে উঠলো। ফেরাউন ও আছিয়া বাচ্ছার জন্য একজন যুৎসই ধাত্রীর জন্য প্রতীক্ষমান। কিন্তু রজোপ্রাসাদে আগত কোন মহিলার স্তনই মুখে নিচ্ছে না বাচ্চাটি। প্রধানমন্ত্রী হাসান তাঁর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে ধ্রল চারদিকে। ইত্যবসরে মূসার সহোদরা বোন সামনে এগিয়ে এসে বলল আমি একজন ধাত্রীর সন্ধান দিতে পারি তোমাদের, আশা করা যায় এ বাচ্চা তাঁর দুধ পান করবে। বাচ্চাটির অবিরাম কান্না আমার মনে খুবকরুণ হয়ে বিঁধছে, তাই আমি তোমাদের সাহায্যে এগিয়ে এলাম। অন্যথায় এতে আমার কোন গরজ নেই। আছিয়া বললেন—জলদি গিয়ে তাঁকে নিয়ে আস, দেখছো না সে কেমন জোরে জোরে চিৎকার করছে। ক্ষুধার তাড়নায় মুখটা একেবারে পাংশু হয়ে গেছে ছেলেটির। মেয়েটি বলল আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না রাণী মা! আমি এক্ষুণি তাঁকে নিয়ে হাজির হচ্ছি।

মূসার বোন মারিয়াম দৌড়ে মায়ের কাছে গেল। মাকে বলল—আম্মা!সসুসংবাদ শুনুন। তাঁকে নিয়ে অবাক কাণ্ড ঘটে গেছে। মূসা আগত কোন মহিলার দুধই পান করছে না। সকলেই হতাশ হয়ে ফিরে গেছে। আমি তাদেরকে আপনার কথা বলে এসেছি। চলুন, চলুন জলদি চলুন।

ইউহানিব বলতে লাগলেন, আমার প্রচন্ড ভয় হচ্ছে, যদি তারা কোনভাবে বুঝে ফেলেয়ামি তাঁর মা, তাহলে কী হবে? কিন্তু আমার তো আর তর সইছে না। সেই কখন থেকে যে অবিরাম দুধ ঝরে পড়ছে।মারয়াম বলল, আম্মা! তাড়াতাড়ি চলুন, আমাদের অনেক দেরি হয়্ব যাচ্ছে। তারা উভয়ে রাজপ্রাসাদে রওয়ানা হলেন। সেখানে পৌঁছে দেখলেন মূসার কান্নার আওয়া উচ্ছে উঠে গেছে। আছিয়া তাঁকে কোলে তুলে হেলিয়ে দুলিয়ে প্রবোধ দিচ্ছে আর আদর করছে। কিন্তু কান্না থামছে না কিছুতেই। ইউহানিব তাঁর কাছে গিয়ে বললেন—রাণী মা! একে আমার কাছে দিন। আছিয়া মারয়ামকে লক্ষ্য করে বললেন—এই ক্লি সেই ধাত্রী? মারয়াম বলল জি হ্যাঁ—রাণী মা ! আপনি নিশ্চিন্তে বাচ্ছাকে তাঁর হাতে দিন। মনে হচ্ছে অবশ্যই সে এর দুধ পান করবে এবং কান্নাও বন্ধ করবে। ইউহানিব বাচ্ছাকে কোলে নিতেই সে নীরব হয়ে গেল। তাঁর চোখে ফুটে উঠল একটি খুশীর ঝিলিক। নিতান্ত শান্ত ভঙ্গিতে সে তাঁর দুধ পান করতে লাগল। পাশে দাঁড়ানো আছিয়ার খুশি আর ধরে না। প্রশান্তির একটি নিঃশ্বাস ছাড়লেন তিনি। কিন্তু চতুর ফেরাউনের মনের ভেতর একটি সন্দেহ দানা বেঁধে উঠল।

ফেরাউন তাঁকে জিজ্ঞেস করল আচ্ছা, বলতো কে তুমি? এ বাচ্ছা আর সব মহিলা থেকে মুখ থেকে মুখ ফিরিয়ে তোমার দিধই বা কেন মুখে নিল? ইউহানিব বললেন আসলে আমার পেশাই হচ্ছে দুধ পান করানো। আমার দুধ বড়ই সুমিষ্ট ও সুপেয়। সব ধরণের শিশুরাই আগ্রহ ভরে আমার দুধ পান করে। আর যে একবার আমার দুধ খায় সে অন্যদের দুধ মুখেই নিতে চায় না। ফেরাউন প্রধানমন্ত্রী হামানের দিকে ইশারা করে বলল এ মহিলার ভাতা দ্বিগুণ করে দাও আর তাঁর থাকার সুবন্দোবস্ত করে দাও। মূসা জননী এসব কথা শুনে এবং পুরিস্থিতির অনুকূলতা অনুভব করে অত্যন্ত খুশী হলেন। আল্লাহ পাকের ওয়াদা যে এত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, তা তিনি ভাবতেই পারেননি।

আছিয়া তাঁকে বললেন—তুমি আমাদের এই প্রাসাদেই অবস্থান করো। আমি তোমার থাকার জন্য মনোরম একটি কামরা এবং উপযোগী খাবার—দাবারের ব্যবস্থা করে দিব। ইউহানিব বললেন—রাণী মা! আপনাকে অনেক অনেক শুকরিয়া। আমি চাচ্ছি এ বাচ্ছাকে আমার ঘরেই দুধ পান করাবো। সেখানকার পুঅরিবেশ খুব মনোরম। আর আমিও অবলীলায় সেখানে চলা—ফেরা করতে পারবো। এ বাচ্চারও বোধহয় কোন কষ্ট হবে না। আছিয়া বললেন—তোমার যা ইচ্ছে তা করো। মূসা জননী সন্তান নিয়ে ঘরে ফিরলেন। আল্লাহর শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতায় মুখর হয়ে উঠলেন তিনি। তিনিই তো তাঁর দিলে প্রশান্তি দিয়েছেন। মনের অস্থিরতা দূর করেছেন । আর আদরে দুলালকে তাঁর কোলেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। খুব বেশি আওময় তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়নি। আদরে যত্নে মা ছেলেকে লালন পালন করতে লাগলেন। আছিয়ার যখনই বাচ্ছাটিকে দেখতে মন চাইত তিনি কাউকে পাঠিয়ে তাঁকে রাজপ্রাসাফে নিয়ে আসতেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তৃপ্তি ভরে দেখতেন। একটু একটু করে মূসা হাঁটুতে ভর দিয়ে চলতে শিখলেন। কখনো কখনো দু—পায়ে ভর করে থাকতেন কিছুক্ষণ। ভাঙ্গা ভাঙ্গা করে অল্প—সল্প কথাও বলতেন মাঝে মধ্যে। যখনই আছিয়া মুসার সাথে একটু আমোদ—আহ্লাদ করতেন সে অত্যধিক আনন্দিত হয়ে উঠত। তবে আর কোন মহিলার সামনে সে এতটা আনন্দিত, এতটা অকৃত্রিম হত না।

কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের সিঁড়িতে পদার্পণ করলেন মূসা। আছিয়ার হৃদয় কন্দরে স্নেহের বৃক্ষটি এখন পত্র পল্লবে সুশোভিত। মানস পুত্র মুসাকে না দেখে থাকতে পারেনা তিনি। দুগ্ধপানের মেয়াদ শেষ হতেই মূসাকে রাজপ্রাসাদে দিয়ে গিয়েছিলেন ইউহানিব। জ্যোতিষীর কথা শুনে ফেরাউনের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া নিষ্ঠুরতা তাঁর চোখের সামনে ছিল অহেতুক ঝামেলা এড়িয়ে চলাই সমীচীন মনে করেছেন তিনি। কিন্তু ফেরাউন জানত না, তাঁর গৃহেই আগ্নেয়গিরির এক ভয়ঙ্গকর লাভা বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য ধীরে ধীরে স্ফীত হচ্ছে।

খোদাকে পরিত্যাগ করে হামানসহ যারা ফেরাউনের সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ত, আছিয়া সাদের প্রতি ভীষণ রুষ্ট ছিলেন। ভীতি ও ভক্তি নিয়ে তারা অসম্ভব সব উপাধিতে ভূষিত করত ফেরাউনকে। এগুলো দেখে আছিয়া সিমাহীন অস্থির হয়ে উঠতেন। তাঁর স্বামী যখন অহংকারে মদমত্ত হয়ে বলত আমিই তোমাদের ভমহান প্রভু; তিনি মনে মনে বলতেন, হায়রে কপাল! কোন শয়তানের পাল্লায় যে পড়েছি। এ অন্ধ অহমিকায় আর কতকাল সে ডুবে থাকবে। কিসের নেশায় সে এ মহা মুসিবতকে বরণ করে নিচ্ছে? ফেরাউনের স্বকল্পিত প্রভুত্বকে প্রচন্ড ভাবে ঘৃণা করতেন তিনি।

তাঁর ভক্তদের ভাঁড়ামিপূর্ণ কার্যকলাপ দেখে দূর থেকে শুধু আফসোস করে বলতেন—সবগুলো একেকটা উম্মাদ।

হৃদয়ের মনিকোঠায় মূসাকে ধারণ করতেন আছিয়া। প্রগাঢ় ভালবাসায় ভরিয়ে রাখতেন তাঁকে। হঠাৎ একদিন একটি লোক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে তাঁকে সংবাদ দিল মূসা জনৈক কিবতীকে হত্যা করে ফেলেছে। স্বগোষ্ঠীয়       এক লোকের পক্ষাবলম্বন করেই এ কাজটা সে করেছে। আছিয়ার কন্যাদের সেবা করত যারা, তাদের একজনের স্বামী হিজকীল এসে তাঁকে জানালেন, শহরে দুজন লোক ঝগড়া করছিল। একজন মূসার স্বগোত্রীয় অপরজন কিবতী। কিবতী লোকটির বিরুদ্ধে অপরজন মূসার সহযোগিতা চাইলে মূসা তাঁকে প্রচন্ড ঘুষি মারে। আর এতেই লোকটির ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যায়। আছিয়া মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনছিলেন, হঠাৎ দূর থেকে ফেরাউনের ক্রোধান্বিত চিৎকারে তিনি সচকিত হয়ে উঠলেন। তাঁর বিকট আওয়াজে প্রাসাদ যেন কাঁপতে লাগল। কোথায় মূসা? এখনো কেন তাঁকে বন্দী করা হচ্ছে না। সিপাহী! ঐ কুলাঙ্গারকে এক্ষুণি আমার সামনে হাজির কর। আমি নিহত কিবতীর প্রতিশোধ নিতে চাই। এক্ষুণি। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় আছিয়া খুব শংকিত হয়ে উঠলেন। মূসার প্রতি উৎকন্ঠায় তাঁর প্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠল। অনন্ত অসীম পরমসত্তার কাছে মিনতির দু’হাত তুলে ধরলেন তিনি। ভক্তি গদগদ কণ্ঠে মহান মা;বুদের কাছে তিনি মুসার কল্যাণের জন্য প্রার্থনা শুরু করে দিলেন। ইলাহী! মূঊসাকে ফেরাউন আর তাঁর সাঙ্গপাঙ্গাদের অনিষ্ট থেকে তুমি হেফাজত করো। তাদের বর্বরতা থেকে তুমি নিরাপদ রাখো।

হিজকীল সেখান থেকে চলে গেলেন। নিজের স্বভাবশুদ্ধতার বদৌলতে তিনিও এক আল্লাহয় বিশ্বাস করতেন এবং দাম্ভিক ফেরাউনের প্রভুত্বকে প্রত্যাখ্যান করতেন। দ্রুত মূসার কাছে গিয়ে তাঁকে সর্তক করে দিয়ে তিনি বললেন—

وَجَاء رَجُلٌ مِّنْ أَقْصَى الْمَدِينَةِ يَسْعَى قَالَ يَا مُوسَى إِنَّ الْمَلَأَ يَأْتَمِرُونَ بِكَ لِيَقْتُلُوكَ فَاخْرُجْ إِنِّي لَكَ مِنَ النَّاصِحِينَ

হে মূসা, রাজ্যের পরিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করার পরমর্শ করছে। অতএব, তুমি বের হয়ে যাও। আমি তোমার হিতাকাঙ্ক্ষী।–সুরা কাসাস, আয়াত ২০।

মূসা হিজকীলের কথা আমলে নিয়ে তখনই ফেরাউনবাহিনী থেকে আত্মরক্ষার জন্য একদিকে পালিয়ে গেলেন। হিজকীল প্রাসাদে ফিরে এসে দেখলেন আছিয়া মূসার জীবনাশংকায় কম্পমান। তিনি কিছুটা নিচু আওয়াজে বললেন—রাণী মা! আর ভয়ের কোন কারণ নেই। আমি মূসা পর্যন্ত সব কোথা পৌঁছে দিয়েছি এবং আসন্ন বিপদ সম্পর্কেও সর্তক করেছি ত্তাকে। শহর ছেড়ে দূরে কোথাও—যেখানে ফেরাউনের সিপাহীরা তাঁর নাগাল পাবে না। চলে যাওয়ার জন্য সুপারিশ করেছি আমি। আছিয়া বললেন—মহান প্রভুর শুকরিয়া। তিনি মূসাকে ফেরাউনের হিংস্রতা ও নিষ্ঠুরতা থেকে হেফাজত করুন। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতি আমাকে কুড়ে কুড়ে খাবে। সে তো আমার সন্তান সমতুল্য। আমার কোলে পিঠেই সে বড় হয়ে উঠেছে। তাঁকে ছাড়া আমি থাকব কেমন করে? আচ্ছা একটু খোঁজ নিয়ে দেখ না সে কোথায় গেছে। হিজকীল বললেন, রাণী মা! আসুন! মহিমান্বিত স্রষ্টার কাছে আমরা তাঁর কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করি।

একে একে কয়েক বছর কেটে গেল। মূসা আর মিসরে ফিরে এলেন না। মূসাকে এক নজর দেখার অধীর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আছিয়া প্রায় নিরাশ হয়ে গেলেন। কারো কাছে মূসার কোনো সংবাদ নেই। সবাই যেন মূসাকে ভুলে গেল। সময় গড়িয়ে চলল। ফেরাউন ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের মুনে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেল যে, মূসা কস্মিনকালেও আর ফিরে আসবে না। তবে কয়েক বছর মূসা ঠিকই ফিরে এলেন। এবার তিনি আল্লাহ পাকের একজন নবী ও পয়গম্বর হয়ে এলেন। মূসা (আঃ) হকের দাওয়াত আর খোদায়ী শিক্ষার মহা সওগাত নিয়ে এলেন। আল্লাহ পাক তাঁকে ফেরাউনের কাছে এ দাওয়াত নিতে যেতে বলেছেন। যার অসহনীয় অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মানবেতর জীবন—যাপন করছে বনী ইসরাঈলের লোকগুলো। জীবনে ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে পরাধীনতার শৃংখলে তারা আষ্টে পৃষ্ঠে বাঁধা। তাদের মুক্তির পয়গাম নিয়েই মূসা (আঃ) এসেছেন। নীল দরিয়ার জোয়ার ভাটা আসে কিন্তু উদ্ধত ফেরাউনের নির্মম নিষ্ঠুরতায় কোন ভাটা নেই। মানুষকে মাবুদ বানানো দুরাচার কিবতীদের লাগামহীন উস্কানীতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ফেরাউন। এ পাগলা ঘোড়াকে নিবৃত্ত করার জন্যই ইনসাফেরচাবুক নিয়ে মূসা (আঃ) এলেন। কিন্তু অনাকাঙ্গিত সেই কিবতী হত্যা স্মৃতিটি তাঁর মনে একতি ভয় ধরিয়ে দিল। প্রভুর শরণাপন্ন হয়ে তিনি বললেন

“পরওয়ারদেগার! আমি তাদের এক ব্যক্তিকে (অনিচ্ছায়) হত্যা করেছিলাম। আমি আশংকা করছি, তারাও আমাকে হত্যা করে ফেলবে। আল্লাহ পাক তাঁকে আশ্বস্ত করলেন, এবার তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে বললেন,

সহযোগীদের সত্য বিনাশী ষড়যন্ত্র আমি বরদাশত করতে পারি।

আমার যাবতীয় কাজ আসান করে দিন। সব বাঁধা বিপত্তিকে নস্যাৎ করে দিয়ে দাওয়াতের পথকে সুগম করে দিন।

আমার মুখের জড়তা দূর করে দিন যেন মাধুর্যপূর্ণ ভাষায় হৃদয়গ্রাহী করে আমি তাদের সত্যের পথে ডাকতে পারি। এবং আমার দাওয়াতের মুগ্ধ হয়ে এর প্রতি তারা উৎসাহী হয়।

আর আমার পরিবারের একজনকে আমার সহযোগি বানিয়ে দিন, যে আমার মত একই চিন্তার অনুগামী হয়ে আমার সহযোগিতা করবে।

আমার ভাই হারুনের পৃষ্ঠপোষকতায় আমার শক্তি সুদৃঢ় করুন এবং তাঁকে আম,আর কাজে সহযোগী বানান।

আছিয়া এসবের কিছুই জানতেন না। ফেরাউনের দুর্দম শক্তির মোকাবেলায় মূসা (আঃ) কী হাতিয়ার ব্যবহার করবেন, কার থেকে সাহায্য নিবেন তাও তাঁর অজ্ঞাত ছিল। তিনি মূসা (আঃ) ও হারুন (আঃ) এর আগমন সংবাদ শুনে ভাবনায় পড়ে গেলেন যে, ফেরাউনের কাছে তারা বলবেটা কী? আর কিভাবেই বা বলবে? কাছাকাছি থাকার কারণে স্বামীর নিষ্ঠুর স্বভাব সম্পর্কে তিনি খুন ভালভাবেই ওয়াকিফহাল। এই ভাবনা ও দুর্ভাবনায় তিনি ডুবে ছিলেন হঠাৎ কানে আওয়াজ এল, মূসা (আঃ) রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করছেন। অল্পক্ষণ পরেই তিনি সবার সামনে এক মহাসত্যের পয়গাম তুলে ধরবেন। তাদের কথাবার্তা শোনার জন্য আছিয়া দরবারের একপার্শ্বে বেলকনিতে আসন গ্রহণ করলেন। যাতে গোটা দরবারীদের অবস্থান সহজেই তাঁর নজরে আসে।

আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের জন্য মুসা (আঃ) অত্যন্ত অনাড়ম্বরভাবে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন। সঙ্গে সহোদর ভাই হারুন (আঃ) ও আছেন। তাদের প্রতি আল্লাহর আদেশ ছিল। তোমরা ফেরাউনের কাছে গিয়ে বলবে ‘আমরা তোমার প্রভুর প্রেরিত পয়গাম্বর। তোমার অত্যাচার ও অমানুষিক নির্যাতনের হাত থেকে বনী ইসরাঈলকে মুক্ত করার জন্যই আমরা এসেছি। পাশেই গ্যালারি থেকে আছিয়া মনোযোগ সহকারে দরবারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ভাবগম্ভীর কণ্ঠে মূসা (আঃ) ফেরাউনকে বললেন—আমরা আল্লাহ পাকের প্রেরিত পয়গাম্বর।

فَأْتِيَاهُ فَقُولَا إِنَّا رَسُولَا رَبِّكَ فَأَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا تُعَذِّبْهُمْ قَدْ جِئْنَاكَ بِآيَةٍ مِّن رَّبِّكَ وَالسَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى

বনী ইসরাঈলকে আমাদের সাথে যেতে দাও। তাদ্রেকে অযথা নির্যাতন করো না।–সুরা ত্বহা, আয়াত ৪৭।

ফেরাউন কথাটিকে কোনই গুরুত্ব দিল না। উল্টো সে গোস্বা ভরে বলল মূসা! আজ তুমি আমাকে এ কথা বলছ? আমি কি তোমাকে লালন করিনি? বছুরের পর বছর আমার ঘরে খেয়ে পড়েই তুমি বড় হয়েছ। ব্যালকনি থেকে আছিয়া অত্যন্ত আআগ্রহভরে ধ্যানসহকারে মূসা (আঃ) এর কোথা শুনছিলেন। তিনি দেখলেন ফেরাউন ক্রোধান্বিত হয়ে উঠছে। এটা চরমে উঠতে হয়তো খুব বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু মূসা (আঃ) নির্বিকার ভঙ্গিতে মুহূর্তেই এক সাংঘাতিক বাক্য নির্মাণ করলেন আরে! বাল্যকালে আমার লালন—পালনের অনুগ্রহের কথা বলে আমাকে তুমি খোটা দিচ্ছ? শুনে রাখ! এটাও ছিল তোমার বর্বরতা আর পাষণ্ডতার পরণতি। যদি তোমার পাশবিকতা সীমা ছাড়িয়ে না যেত তাহলে নিজ ঘরেই আমি সুখে শান্ততে প্রতিপালিত হতাম, এখানে আসার পরও তো আমার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। আল্লাহ পাকের সীমাহীন মেহেরবাণীই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অন্যথায় তোমার অভিপ্রায় তো ছিল অন্য কিছু। তোমার প্প্রাসাদে আমার প্রতিপালিত হওয়াও কি বনী ইসরাঈলের উপর অমানবিক অত্যাচারের প্রমাণ বহন করে না?

এ কথা শুনে ফেরাউন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে বলতে লাগল—ইতোপূর্বে তুমি আরো অনেক কিছু করেছ। আমাদের নিরপরাধ একজন লোককে হত্যা পর্যন্ত করেছে। আর এখন আমাদের অবদানকে অস্বীকার করছ? মূশা (আঃ) বললেন—ঐ কাজটি তো একান্তই আমার অনিচ্ছায় সংঘটিত হয়েছে। পরে তোমাদের ভয়ে আমি দেশ ছাড়াও হয়েছিলাম। এখন তো রাব্বুল আলামীনের রহমত ও নেয়ামতে আমি অভিষিক্ত। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মহাসম্পদ তিনি আমাকে দান করেছেন। আমাকে তিনি তাঁর পয়গাম্বর বানিয়েছেন। অল্প সময় গম্ভীর থেকে কিছুটা অবজ্ঞার সুরে ফেরাউন বলল—তোমাদের রাব্বুল আলামীন আবার কে? জবাবে মূসা (আঃ) বললেন—যদি তুমি নিজের চারপাশের সৃষ্টিজগত নিয়ে একটু গভীর চিন্তা কর, পৃথিবীর গতি প্রকৃতি অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ কর, এমনকি নিজের জীবন ও এর সুশৃঙ্খল প্রবাহ নিয়ে, ভোগ বিলাসের সমূহ সম্ভাব নিয়ে সুষ্ঠুভাবে একাগ্রচিত্তে একটু ধ্যানমগ্ন হও তাহলে তুমি নিজেই উপলদ্ধি করতে পারবে রাব্বুল আলামীন হচ্ছেন আসমান—জমিন ও এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে সবার সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক।

এ জবাব শুনে ফেরাউনের ক্রোধ কয়েকগুণ বেড়ে গেল। তাঁর আওয়াজে ক্ষিপ্রতা এসে গেল। দরবারের কথাবার্তা শুনে আছিয়া নিজ কামরায় ফিরে এসে বলতে লাগলেন—মূসার উপর এবং যে দ্বীনের দাওয়াত তারা নিয়ে এসেছে আমি তাঁর উপর পূর্ণ ঈমান আনলাম। রাব্বুল আলামীনের সমীপে নিজেকে সর্বোতভাবে সমর্পণ করলাম। এ দিকে ফেরাউনের বিকট আওয়াজ দরবার ছাড়িয়ে বাইরে এসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। সে বলছে, তোমরা কি এর কথা শুনছ? এদের জিজ্ঞেস কর, কাকে তারা প্রভু মানে, তাদের রব কে? মূসা (আঃ) বললেন—যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্বপুরুষের প্রভু, তিনিই আমাদের প্রভু। নিখিল পৃথিবী ও এর মধ্যকার সবকিছুর যিনি স্রষ্টা তিনিই আমাদের রব। তোমাদের সুস্থ বিবেক থাকলে তোমরাও এটা বুঝতে পারবে।

ফেরাউন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, যদি আমি ভিন্ন অন্য কাউকে তোমরা মাবুদ মনে কর তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করব। একান্ত ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে প্রশান্ত চিত্তে মূসা (আঃ) বললেন, যদি আমার দাবীর স্বপক্ষে সুস্পষত কোন দলীল কিংবা অলৌকিক কোন    প্রমাণ পেশ করতে পারি তাহলে কি আমার কথার সত্যায়ন তোমরা করবে? তাপরেও কি তোমাদের মনের অমূলক সন্দেহ—সংশয় দূর হবে না। ফেরাউন বলল, আচ্ছা তুমি যদি নিজ দাবীতে সত্যবাদী হয়ে থাক তাহলে আমাদেরকে কোন মুজিযা দেখাও।

আছিয়া আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছেন। এবার তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবতে লাগলেন—মূসা কি কোন জাদুকর? নাকি সত্যিই সে একজন মুজিজাধারী যে,তাঁর স্বেচ্ছাচারী স্বামীর অহংকার ও দম্ভকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারবে। তিনি মনে মনে বলতে লাগলেন, মূসা! তুমি যদি জাদুকর হয়ে থাক তাহলে কস্মিনকালেও বিজয়ের নাগাল পাবে না তুমি। এরাই বিজয়ী হবে। এদের ঔদ্ধত্য বেড়ে যাবে আরো কয়েকগুণ। তিনি নিজেই আবার এ ধারণা প্রত্যাখ্যান করে বললেন—এমন তো নাও হতে পারে! সর্বোপরি তিনি নিরাশ ছিলেন না। আছিয়ার ভাবতন্ময়তা কাটতে না কাটতেই তিনি দেখতে পেলেন মূসা (আঃ) তাঁর হাতের লাঠিটি বৃত্তাকারে হাওয়ায় ভাসিয়ে জমিনে ছেড়ে দিলেন। কোন আওয়াজ হল না ঠিকই কিন্তু বিশালকায় এক অজগরে পরিণত হল লাঠিটি। প্রকান্ড মাথাটি উঁচুতে তুলে বিষাক্ত দাঁতগুলো বের করে সে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। ফেরাউন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। সাপটি এমনভাবে ফেরাউনের দিকে এগুতে লাগল যেন, এক্ষুণি তাঁকে গিলে খাবে। ফেরাউন আত্মসংবরণ করে বলল—মূসা! তোমার সামর্থ কি এটুকুই। নাকি আরো কোন ভেল্কি তোমার ভান্ডারে আছে? মূসা (আঃ) নিজের ডানহাত বাম বগলের নিচে থেকে বের করে প্রলম্বিত করে মেলে ধরলেন। অপরূপ শুভ্র জ্যোতির বিচ্ছুরণ শুরু হল সেখান থেকে। রশ্মির তীব্রতায় সকলের চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। গোটা দরবার আলোকিত হয়ে সুদূর দিগন্ত পর্যন্ত সে আলো ছড়িয়ে পড়ল।

এসব কল্পনাতীত বাস্তবতা চাক্ষুষ দেখতে পেয়ে আছিয়া বলতে লাগলেন নিশ্চয় আল্লাহ পাক মুসাকে সহায়তা করবেন। তাঁকে বিজয়ী আর ফেরাউনকে পরাজিত করবেন। কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁর হৃৎপিণ্ডে। তবুও তিনি আশান্বিত হয়ে উঠলেন; হয়তো এবার তাঁর স্বামীর মনে ভীতির সঞ্চার হয়ে মূসা (আঃ) এর দাওয়াতের সামনে মাথানত করবে সে। নিজের জুলুম—নির্যাতনের ঘৃণ্য পথ থেকে ফিরে আসবে। আছিয়া তাঁর স্বামীর অজ্ঞতা আর বর্বরতাকে ভীষণ অপছন্দ করতেন, ষন্ডামার্কা মন্ত্রীদের প্ররোচনায় তাঁর নিষ্ঠুরতার মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যেত। আছিয়া তখন খুবই মর্মাহত হয়ে পড়তেন। কৃত্রিম প্রভুত্বের অন্ধ—অহমিকার ফেরাউন মাঝে মাঝে তুলকালাম অকান্ড ঘটিয়ে ফেলত। আর তাঁর নির্মমতার যুপকাষ্ঠের বলি হত বেচারা বনী ইসরাঈল। সব কিছুর পরও আছিয়া এবার আশান্বিত হয়ে উঠলেন।

কিন্তু তাঁর আশার ব্যর্থ হতে খুব বেশী সময় লাগল না। ফেরাউন তাঁর সভাসদকে সম্বোধন করে বলল—তোমরা জেনে রাখ, মূসা ও তাঁর ভাই হচ্ছে আস্ত জাদুকর। জাদু বলে তারা তোমাদেরকে তোমাদের ভীখন্ড থেকে বের করে নিতে চায়। তোমাদের করণীয় সম্পর্কে তোমরাই এবার সিদ্ধান্ত নাও। জনৈক মন্ত্রী পরামর্শ দিল বাদশাহ সালামত! মূসা ও তাঁর ভাইয়ের যাদুর যথোচিত জবাব দেয়া দরকার। আপনি সমগ্র মিসরে আপনার প্রতিনিধি পাঠিয়ে দিন। তারা দেশের সব অভিজ্ঞ জাদুকরদের আপনার দরবারে এনে উপস্থিত করবে। তারাই মূসাকে সমুচিত শিক্ষা দিবে। পরামর্শটি ফেরাউনের খুবই মনঃপূত হল। সে দেশের চতুর্দিকে থেকে জাদুকরদের একত্রিত করায় ব্যস্ত হয়ে উঠল। আছিয়া জাদুকরদের তেলেসমাতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতেন। কাজেই মূসা (আঃ) কে নিয়ে তিনি মহাভাবনায় ডুবে গেলেন। সেই যে, ফেরাউনকে সম্বোধন করে তিনি বলেছিলেন,

فَأْتِيَاهُ فَقُولَا إِنَّا رَسُولَا رَبِّكَ فَأَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا تُعَذِّبْهُمْ قَدْ جِئْنَاكَ بِآيَةٍ مِّن رَّبِّكَ وَالسَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى

আমরা উভয়েই তোমার পালনকর্তার প্রেরিত রসূল, অতএব আমাদের সাথে বনী ইসরাঈলকে যেতে দাও এবং তাদেরকে নিপীড়ন করো না। আমরা তোমার পালনকর্তার কাছ থেকে নিদর্শন নিয়ে তোমার কাছে আগমন করেছি। এবং যে সৎপথ অনুসরণ করে, তার প্রতি শান্তি।–সুরা ত্ব-হা, আয়াত ৪৭।

আছিয়া তাদের নিম্মোক্ত বক্তব্যটি নিয়েও বিস্তর ভাবতে থাকলেন—

إِنَّا قَدْ أُوحِيَ إِلَيْنَا أَنَّ الْعَذَابَ عَلَى مَن كَذَّبَ وَتَوَلَّى

আমাদের এ মর্মেও ওহী পাঠানো হয়েছে যে, যারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং সঠিক দ্বীন থেকে বিমুখ হয়ে যায় তাদের উপর আল্লাহর আজাব অবধারিত ।–সুরা ত্ব-হা, আয়াত ৪৮।

এসব কথাবার্তা নিয়ে গভীর চিন্তা—ভাবনা করে আছিয়া মূসা (আঃ) এর অকপট উপস্থাপন ও সাবলীল বর্ণনাভঙ্গিতে বেশ চমৎকৃত হলেন। কত ছোট্ট অথচ পূর্ণাঙ্গভাবে তিনি মহান প্রভুর গুণাবলীর পরিচয় তুলে ধরে বলেছিলেন—

قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَى

আমাদের পালনকর্তা তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যোগ্য আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন।–সুরা ত্ব-হা, আয়াত ৫০।

আছিয়া মূসা (আঃ) এর প্রশকৃত সব কিছুর উপর ঈমান এনে মনে মনে ফেরাউনকে বললেন—মূসার সাথে বিতর্কে তুমি হেরে গেছ। বিশেষ করে যখন তুমি মূসাকে বলেছিলে,

قَالَ فَمَا بَالُ الْقُرُونِ الْأُولَى

তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কি? আর তৎক্ষণাৎ মূসা এর যুৎসই উত্তর দিয়ে বলেছিল,

قَالَ عِلْمُهَا عِندَ رَبِّي فِي كِتَابٍ لَّا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنسَى

الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا وَسَلَكَ لَكُمْ فِيهَا سُبُلًا وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاء مَاء فَأَخْرَجْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّن نَّبَاتٍ شَتَّى

كُلُوا وَارْعَوْا أَنْعَامَكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّأُوْلِي النُّهَى

তাদের খবর আমার পালনকর্তার কাছে লিখিত আছে। আমার পালনকর্তা ভ্রান্ত হন না এং বিস্মৃতও হন না।

তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে শয্যা করেছেন এবং তাতে চলার পথ করেছেন, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন এবং তা দ্বারা আমি বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি।

তোমরা আহার কর এবং তোমাদের চতুস্পদ জন্তু চরাও। নিশ্চয় এতে বিবেক বানদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।–সুরা—ত্ব-হা, আয়াত ৫২—৫৪।

গভীর ভাবনায় সীমানা পেরিয়ে ঈমানের ভূখন্ডে ঢুকে পড়লেন আছিয়া। নারীদের মাঝে তিনিই সর্ব প্রথম মূসা (আঃ) এর উপর ঈমান আনেন। নিজের এ আবেগ ও অনুভূতি তিনি হিজকীলের স্ত্রীর (এ মহিলা তাঁর সেবিকা ছিলেন–) সামনে তুলে ধরলেন। হিজকীল ইতিপূর্বেই ঈমান এনেছিলেন কিন্তু ফেরাউনের ভয়ে তিনি ঈমান গোপন রেখেছিলেন হঠাৎ ফেরাউনের চিৎকারের বিকট আওয়াজ শোনা গেল। দরবারের বিশাল পরিসর পেরিয়ে বাহিরের প্রশস্ত আঙ্গিনাজুড়ে সে আওয়াজ ছড়িয়ে পড়েছে। আত্মম্ভরিতার সুরে সে বলছে—কালই মূসা তাঁর জাদুর চূড়ান্ত পরিণাম দেখতে পাবে। তাঁর জাদুর ক্ষমতা চিরতরে নস্যাৎ করে দেয়া হবে কাল।

পরের দিন শহরের সকল লোক ফেরাউনের জাদুকরদের দেখার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে সমবেত হল। জাদুকররা তাদের ঐন্দ্রজালিক খেল দেখাতে শুরু করল। হাতের রশিগুলোকে তারা জাদুবলে চলন্ত সাপে পরিণত করল। এ দেখে ফেরাউন ও তাঁর সঙ্গিরাও তো খুশিতে আটখানা। এ দিকে মূসা (আঃ) এর কপালে একটি চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল। আমার লাঠিও যদি সাপ হয় তাহলে লোকেরা জাদু ও মুজিজার পার্থক্য করবে কিভাবে। সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ পাক সান্ত্বনা দিয়ে নিশ্চিন্ত করলেন। ও দিকে আছিয়া জাদুকরদের অভিনব কীর্তি দেখে ভয়ে এতটুকন হয়ে গেলেন। দুশ্চিন্তায় কালো হয়ে গেল তাঁর চেহারা। এতক্ষণে মূসা (আঃ) তাঁর হাতে লাঠি জমীনে ছেড়ে দিয়েছেন। মুহূর্তেই এক প্রকান্ড সাপ হয়ে তা নড়েচড়ে উঠল। জাদুকরদের সাপের বিপরীত পার্শ্বে দাঁড়িয়ে এগিয়ে প্রতিটি সাপকেই গিলে খেতে লাগল। সামান্য সময়ের ব্যবধানে গোটা ময়দান খালি হয়ে গেল। এ অভাবিত দৃশ্য দেখে আছিয়া তো আনন্দে আত্মহারা প্রায়। অজ্ঞাতেই ভেতর থেকে কৃতজ্ঞতার আওয়াজ বেরিয়ে এল। আরেকটু হলেই সে আওয়াজ সকলের কানে চলে যেত। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করে তিনি শুধু বললেন—আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে মূশাকেই তিনি বিজয়ী করলেন। অল্প কিছুক্ষণ পরেই তাঁর খুশির জোয়ার আর বাঁধ মানল না। যখন তিনি দেখলেন, পরাজিত জাদুকররা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে মূসা (আঃ) এরপ্রতি ঈমানের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে আল্লাহর সমীপে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছে। পাষন্ড ফেরাউন তাদের অমানুষিক শাস্তি দিয়ে চোখের সামনে নির্মমভাবে হত্যা করে ফেলল। কিন্তু তারা সফলকাম। কিয়ামতের দিন অবশ্যই আল্লাহ পাক তাদের মহা পুরস্কারে ভূষিত করবেন।

পরাজয়ের চরম গ্লানি মাথায় নিয়ে নিদারুণ লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হয়ে ফেরাউন প্রাসাদে ফিরল। আছিয়াও ফিরে এলেন প্রাসাদে। স্বামীর সাথে কোন কথা হল না তাঁর। কারণ ঘটে যাওয়া কোন কিছুই তাঁর অগোচরে ছিল না। নিজের আলীশান সিংহাসনে বসে ভরা মজলিসে দিশেহারা ফেরাউন গম্ভীর হয়ে বলতে লাগল,

وَقَالَ فِرْعَوْنُ ذَرُونِي أَقْتُلْ مُوسَى وَلْيَدْعُ رَبَّهُ إِنِّي أَخَافُ أَن يُبَدِّلَ دِينَكُمْ أَوْ أَن يُظْهِرَ فِي الْأَرْضِ الْفَسَادَ

তোমরা আমাকে ছাড়, মূসাকে হত্যা করতে দাও, ডাকুক সে তার পালনকর্তাকে! আমি আশংকা করি যে, সে তোমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে দেবে অথবা সে দেশময় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।–সুরা মুমিন, আয়াত ২৬।

আছিয়া দূর থেকে দেখতে পেলেন ভরা মজলিস থেকে এক লোক উঠে দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ করছেন, ভাল করে তাকিয়ে দেখলেন তিনি হিজকীল। ফেরাউনের নিষ্ঠুর চরিত্রের কথা চিন্তা করে মনে মনে তিনি বললেন—লোকটি এক্লহানে এভাবে না বললেই হয়তো ভাল করতো। হিজকীল তাঁর ভরাট গলায় বলতে লাগলেন—

وَقَالَ رَجُلٌ مُّؤْمِنٌ مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَكْتُمُ إِيمَانَهُ أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَن يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءكُم بِالْبَيِّنَاتِ مِن رَّبِّكُمْ وَإِن يَكُ كَاذِبًا فَعَلَيْهِ كَذِبُهُ وَإِن يَكُ صَادِقًا يُصِبْكُم بَعْضُ الَّذِي يَعِدُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ

يَا قَوْمِ لَكُمُ الْمُلْكُ الْيَوْمَ ظَاهِرِينَ فِي الْأَرْضِ فَمَن يَنصُرُنَا مِن بَأْسِ اللَّهِ إِنْ جَاءنَا قَالَ فِرْعَوْنُ مَا أُرِيكُمْ إِلَّا مَا أَرَى وَمَا أَهْدِيكُمْ إِلَّا سَبِيلَ الرَّشَادِ

তোমরা কি একজনকে এজন্যে হত্যা করবে যে, সে বলে, আমার পালনকর্তা আল্লাহ, অথচ সে তোমাদের পালনকর্তার নিকট থেকে স্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট আগমন করেছে? যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার মিথ্যাবাদিতা তার উপরই চাপবে, আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে যে শাস্তির কথা বলছে, তার কিছু না কিছু তোমাদের উপর পড়বেই। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারী, মিথ্যাবাদীকে পথ প্রদর্শন করেন না।

হে আমার কওম, আজ এদেশে তোমাদেরই রাজত্ব, দেশময় তোমরাই বিচরণ করছ; কিন্তু আমাদের আল্লাহর শাস্তি এসে গেলে কে আমাদেরকে সাহায্য করবে? –সুরা—মুমিন, আয়াত ২৮—২৯।

হিজকীলের কথা শুনে ফেরাউন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। পেরেশান হয়ে সে ভাবতে লাগল—আমার সামনে এভাবে কথা বলার দুঃসাহস সে পেল কোথায়? কতটা অবলীলায় সে মূসার পক্ষ সমর্থন করে তাঁকে আমার উপর প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রকাশ্যে জনসম্মুখে মূসার সাথে একাত্মতার ঘোষণা দিতে তাঁর বুকটা একটুও কাঁপল না? এটা কিভাবে সম্ভব হল? অথচ আমিই তো তাঁর প্রভু ও মালিক। হিজকীল কিন্তু তখনো থেমে নেই। এক নাগাড়ে তিনি বলেই চলেছেন। সকল সভাসদকে উপদেশমূলক পরামর্শ দিয়ে তিনি বলতে লাগলেন—

وَقَالَ الَّذِي آمَنَ يَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُم مِّثْلَ يَوْمِ الْأَحْزَابِ

مِثْلَ دَأْبِ قَوْمِ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِن بَعْدِهِمْ وَمَا اللَّهُ يُرِيدُ ظُلْمًا لِّلْعِبَادِ

وَيَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ

يَوْمَ تُوَلُّونَ مُدْبِرِينَ مَا لَكُم مِّنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ

হে আমার কওম, আমি তোমাদের জন্যে পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের মতই বিপদসঙ্কুল দিনের আশংকা করি।

যেমন, কওমে নূহ, আদ, সামুদ ও তাদের পরবর্তীদের অবস্থা হয়েছিল। আল্লাহ বান্দাদের প্রতি কোন যুলুম করার ইচ্ছা করেন না।

হে আমার কওম, আমি তোমাদের জন্যে প্রচন্ড হাঁক-ডাকের দিনের আশংকা করি।

যেদিন তোমরা পেছনে ফিরে পলায়ন করবে; কিন্তু আল্লাহ থেকে তোমাদেরকে রক্ষাকারী কেউ থাকবে না। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই।–সুরা—মুমিন, আয়াত ৩০—৩৩।

আছিয়া হিজকীলের কথাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন এবং তাঁকে নিয়ে প্রবল উৎকণ্ঠায়ও ভোগছিলেন। হয়তো এখনি সে ফেরাউনের রোষানলে দগ্ধ হয় কিনা? যা ভাবনা তাই। ফেরাউন অনতিবিলম্বে হিজকীলকে বন্দী করে হত্যা করে ফেলার নির্দেশ জারী করল। কেননা ফেরাউনের স্বগোত্র কিংবা সভাসদদের কেউই আজ পর্যন্ত এমন দুঃসাহস কখনো দেখাতে পারেনি। যে ফেরাউনের জন্য এ দুঃসাহস সে ফেরাউনের সামান্য পরিবর্তনও হল না। উল্টো তাঁর হিংস্রতা ও শয়তানী বেড়ে গেল কয়েকগুণ। হিজকীল কিন্তু সহজে ধরা দিলেন না। পালিয়ে আত্মগোপন করলেন তিনি; বরং বলা উচিৎ, আল্লাহ পাকই তাঁকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করলেন। কারণ তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও সত্যানুরাগী একজন মানুষ। মানুষকে কল্যাণের পথ দেখাতে গিয়ে কখনোই কারো নন্দা ও ভর্ৎসনার পরোয়া করতেন না।

ফেরাউন নিজের খাস কামরায় বসে মূসা (আঃ) সম্পর্কে সীমাহীন উদ্বেগ নিয়ে আছিয়ার সাথে আলোচনায় প্রবৃত্ত হল। বলতে লাগল—এই মূসাকে আমরা আদর যত্ন করে প্রতিপালন করলাম। আর সে কি না আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরছে। কিসের এক নতুন ধর্মের দাওয়াত দিচ্ছে মানুষকে। দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি আমরা। একথা বলে জ্যোতিষীর সেই কথাকে স্মরণ করিয়ে দিল সে। অচিরেই বনী ইসরাঈলের ঘরে এক সন্তান জম্ম নিবে যে আপনার রাজত্বের পতন ঘন্টা বাজাবে। সে লক্ষ্য করল আছিয়া এই ভাবনানুভূতি ও আবেগকে মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছে না। তেমন একটি মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনছে না। ফেরাউন চিৎকার করে বলল মূসাকে নিয়ে আমি দুশ্চিন্তায় পাথর হয়ে যাচ্ছি আর আমাকে সহানুভূতি জানানো তো দূরে থাক আমার কথার সামান্য গুরুত্ব্বও তুমি দিচ্ছ না। তুমি কি ভুলে গেছ যে, তুমি আমার স্ত্রী? আছিয়া নিজের পথ ধরে এগুলেন। পাল্টা প্রশ্ন করলেন তিনি। তুমি মূসাকে অপছন্দ কর কেন? বিস্মিত হয়ে ফেরাউন জবাব দিল সে আমার প্রভুত্ব অস্বীকার করে অন্য কাউকে প্রভু বলে বিশ্বাস করে। আছিয়া বললেন—মূসাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ও বাড়াবাড়ি করো না। যে ঘটনা ও বাস্তবতা আজ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলে তা নিয়ে একটু ভেবে দেখ, গভীর চিন্তায় একটু ডুব দাও, তারপর বলো কী অন্যায়টা মূসা করেছে। কেন সৎ পথের দিশারী বলে তাঁকে স্বীকার করবে না?

তুমি তো প্রবঞ্চক হামানের নির্জলা মিথ্যা কথাগুলোকেই প্রত্যাদেশের মত গুরুত্ব দাও। আর হামান মূসাকে শুরু থেকেই অপছন্দ করে। সে চায় তুমি মূসার সাথে শত্রুতা কর। তাঁর প্রত্যাশা তোমার অন্তরে কেবল সে একাই বসবাস করবে। তুমি কখনো একথা বলছ না কেন যে, মূসা হকের পথেই আমাদের ডেকে যাচ্ছে আর হামানই মূলতঃ ভুলের পসরা বিকিনি করছে?

আছিয়ার নতুন মূর্তি দেখে এবং তাঁর কথাগুলো শুনে ফেরাউন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আশ্চর্য হয়ে সে ভাবতে লাগল এ হতভাগী এ কী কথা বলছে আমাকে? এরপর থেকে সে আছিয়াকে সন্দেহজনক চোখে দেখতে লাগল। তাঁর চাল চলন, কথাবার্তা সব কিছু সন্দেহজনক মনে হতে লাগল। এমনকি তাঁর কন্যাদের পরিচারিকা হিযকীলের স্ত্রীকেও সন্দেহের আওতায় নিয়ে আসল সে, তাঁর সব কাজকর্ম গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্য গোয়েন্দা নিযুক্ত করল সে, অবশেষে তাঁর কাছে নিশ্চিত সূত্রে সংবাদ পৌঁছল এ পরিচারিকাটি মূসা (আঃ) এর একান্ত ভক্ত ও অনুসারী। এবার ফেরাউনের ক্রোধের কোন সীমা পরিসীমা রইল না। তারই রাজ প্রাসাদে মূসার ধর্ম ঢুকে গেছে। তাঁর স্ত্রী, দাস দাসী, পরিচারিকা, সিপাহী প্রহরী, কর্মচারী এবং তাঁকে প্রভুত্বের আসনে সমাসীনকারী লোকগুলোক ও আজ মূসার দ্বীনের সামনে মাথা নুইয়ে দিয়েছে। নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে বজ্রের মত গর্জন করে উঠল সে। আছিয়া! এ পরিচারিকা ও তাঁর স্বামীর মরণই একমাত্র প্রাপ্য। তাদেরকে এমন ভয়ানক শাস্তি দাও, যার প্রচন্ডতায় তারা যেন মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য হয়। আছিয়া তাঁর পরিচারিকার ব্যাপারে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। কিছুটা প্রকৃতিস্থ হয়ে তিনি বললেন—এ মেয়েটি আসলে এসব কিছু সুঝে না। কথাগুলো তিনি মূলতঃ নিরাপরাধ মেয়েটিকে ফেরাউনের কবল থেকে বাঁচানোর জন্যই বললেন। কিন্তু ফেরাউন আছিয়ার কথার দিকে সামান্য ভ্রূক্ষেপও করল না; বরং কিছুটা রাগচটা হয়ে আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল তুমিও কিন্তু সন্দেহভাজনদের মাঝে আছ। মূসার পক্ষপাতিত্বে তুমিও কিন্তু কম যাও না। বিরক্তি ও আক্রমণাত্মক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে এক নজর তাকিয়ে ফেরাউন উঠে দাঁড়াল। তাঁর কড়া নির্দেশ হিজকীলের স্ত্রী কোথায়? এক্ষুণি তাঁকে আমার সামনে হাজির কর।

ফেরাউনের প্রহরীরা বেরিয়ে এল। তাঁর কন্যাদের কেশ পরিপাটি ক্লরার দায়িত্ব নিযুক্ত পরিচারিকা হিজকীলের স্ত্রীকে আটক করল তারা। কেউ বাহু ধরে, কেউ চুলের মুঠি ধরে নির্মমভাবে টেনে হিঁচড়ে ফেরাউনের সামনে হাজির করল তাঁকে। প্রশ্ন প্রস্তত করাই ছিল। সরাসরি বলে ফেলল সে আরে কুলাঙ্গার মহিলা! তোর প্রভু কে! নিঃশঙ্ক ভঙ্গিতে সে উত্তর দিল—আমার ও তোমাদের সকলের প্রভু একমাত্র আল্লাহ। যিনি আমাদের সকলকে সৃষ্টি করেছেন। বিকট গর্জন করে উঠল ফেরাউন। বদবখত! এত বড় স্পর্ধা তোর। মুখের উপর আমাকে অপমান। প্রহরী! পুড়িয়ে মেরে ফেল এ নেমকহারামীটাকে। আর শোন!   এর ছেলেটাকে আগে ওর সামনে জ্বালিয়ে দাও। বুঝুক আমাকে অবজ্ঞা করার মজা কাকে বলে।

 

প্রহরীরা আগুনের এক বিশাল কুণ্ড তৈয়ার করল। এক আল্লাহকে প্রভু মেনে ফেরাউনকে কষ্ট দেয়ার পরিণতিতে আগুণে পুড়তে হচ্ছে এক নারীকে। শুধু তাই নয়। কোলের শিশুটির পর্যন্ত রেহাই নেই। মায়ের চোখের সামনে জ্বলে ভস্মীভূত হচ্ছে নিষ্পাপ বাচ্ছাটা। সে যেন মায়ের দিকে ফিরে অব্যক্ত ভাষায় বলছিল—আম্মিজান! আপনি সঠিক পথে আছেন। বিচলিত হওয়ার কোন কারণ নেই। হৃদয়ে ঝড়তোলা নির্মম এ দৃশ্য দেখে অশ্রুতে চোখ মুখ একাকার করে ফেললেন আছিয়া। কান্নাভরা কণ্ঠে গলা উঁচিয়ে তিনি বললেন, ফেরাউন তোর নিস্তার নেই। আমার প্রভুর মর্মন্তদ শাস্তি তোকে ভোগ করতে হবে। তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে ফেরাউন বলল—আছিয়া বদলে গেছে। পাগল হয়ে গেছে। শয়তান পেয়ে বসেছে ওকে। আছিয়া জবাব দিলেন কিছুই হয়নি আমার। আমাকে শয়তানেও পায়নি। আমি পাগল নই। আমার জ্ঞান বুদ্ধি সব ঠিক আছে। আমি এক আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি। যিনি আমার তোমার সকলের প্রভু। গোটা সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা তিনি। একথা শুনে ফেরাউন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রোন করতে পারল না। ঐ পরিচারিকার মত আছিয়াকেও কথিন শাস্তি দেয়ার হুকুম দিল। তবে এর আগে তাঁর মাকে বিষয়টা অবগত করল সে। যেন সে এসে মেয়ের কর্মকাণ্ড স্বচক্ষে দেখে যায়।

আছিয়ার মা এসে সব কিছু ভাল্ভাবে জেনে শুনে আছিয়ার কাছে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করল লোকেরা তোমার ব্যাপারে যে আবোল—তাবোল কথা বলছে, সবই কি ঠিক? তুমি কি সত্যিই মূসার প্রতি ঈমান এনেছ? এক বুক আত্মতৃপ্তি নিয়ে আছিয়া বললেন—সব কথাই ঠিক। মূসা সঠিক পথে আছে। যে দ্বীন মূসা নিয়ে এসেছে সেটাই প্রকৃত সত্য। তাঁর মা তাঁকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফেরাউনের কথা মেনে নিতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করল। কিন্তু কোনই ফায়দা হল না। ফেরাউন এবার তাঁর শাস্তির চূড়ান্ত ফয়সালা জানিয়ে দিল। প্রহরীরা তাঁকে চাবুক দিয়ে আঘাতের পর আঘাত করতে লাগল। ফেরাউন এ তাঁর সভাসদ সকলেই এ নিদারুণ দৃশ্য উপভোগ করছিল। যখনই আছিয়া ব্যথায় ককিয়ে উঠতেন, ফেরাউন আরো বেশি করে প্রচন্ডভাবে প্রহার করার হুকুম দিত। যেন ফেরাউনকে তিনি প্রভু বলে স্বীকার করেন। কিন্তু ঈমানের অটল পাহাড় আছিয়া সমানে মার খাচ্ছেন আর আল্লাহ তাআলার দরবারে কাতরকণ্ঠে প্রার্থনা করছেন—

وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ آمَنُوا اِمْرَأَةَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফেরাউন ও তার দুস্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে যালেম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।–সুরা তাহরীম, আয়াত ১১।

আল্লাহ পাক তাঁর দুআ কবুল করলেন। সিদ্দিক ও শহীদদের অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত করলেন তাঁকে। জান্নাতের অকল্পনীয় সব নেয়ামত দান করলেন। আর ফেরাউন! বিশাল সৈন্যবহরসহ নীল দরিয়ায় ডুবে মরল। পৃথিবীবাসীর কাছে এখন সে শুধু এক মর্মান্তিক ইতিহাস।

লিখেছেনঃ শাইখ আব্দুল মুনঈম হাশেমী

অনুবাদঃ মাওলানা হাসান শরীফ

আল কুরআনে নারীর কাহিনী বই থেকে সংগ্রহ করা।

About Syed Rubel

Creative Writer/Editor And CEO At Amar Bangla Post. most populer bloger of bangladesh. Amar Bangla Post bangla blog site was created in 2014 and Start social blogging.

Check Also

বিড়াল

প্রকৃত ইসলাম হলো সদয় আচরণের ধর্ম

59- عَنْعَبْدِاللَّهِبْنِعُمَرَرَضِيَاللَّهُعَنْهُمَا: أَنَّرَسُوْلَاللَّهِصَلَّىاللهُعَلَيْهِوَسَلَّمَقَالَ: "عُذِّبَتِامْرَأَةٌفِيْهِرَّةٍرَبَطَتْهَا،حَتَّىمَاتَتْ؛فَدَخَلَتْفِيهَاالنَّارَ،لاَهِيَأطعمَتْهاوَسَقَتْها؛إذْحَبَسَتْها،وَلاَهِيَتَرَكَتْها؛تَأْكُلُمِنْخَشَاشِالأرْضِ". (صحيحالبخاري،رقمالحديث 3482،واللفظله،وصحيحمسلم،جزءمنرقمالحديث 151 – (2242)،). 59 – অর্থ: আব্দুল্লাহ বিন ওমার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *