Home / বাংলা সাহিত্য / কিছু গল্প / আসমা (একজন বুদ্ধিমান সতী নারীর জীবনের গল্প)
নারীর জীবনের গল্প

আসমা (একজন বুদ্ধিমান সতী নারীর জীবনের গল্প)

এই অঞ্চলের কোনও মানুষ কোনওদিন শুনেনি যে হাইকোর্টের মামলা গ্রামসালিশে আসিতে পারে। কোর্টের বাইরে আপোশ নিস্পত্তির একটা সুযোগ দিয়েছে বিচার  বিভাগ। সেই সূত্রে দুই পক্ষের উকিল ব্যারিস্টার আর কিছু জ্ঞানী শুভানুধ্যায়ী এসেছেন সুন্দরনগর গ্রামে।

বিশাল এক কাছারিঘরে বসেছে সভা। ৫/৬ গ্রামের মানুষ বহুল আলোচিত মামলার আপোশ বিষয়ে জানতে জড়ো হয়েছে বাড়ির চারপাশে।

আহমদ আলী আর মাহমুদ আলী দুই ভাই। আহমদ আলী আলিম মানুষ, কৃষিকাজই তাঁর পেশা। মাহমুদ আলী ননম্যাট্রিক, তিনিও সচ্ছল গেরস্ত। আহমদ আলী অনেক বেশি বয়সে একটি কন্যা সন্তানের জনক হয়েছেন। অপর পক্ষে মাহমুদ আলীর ৪ মেয়ে আর এক ছেলে।

মাহমুদ আলী চার মেয়েকেই বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে ফারহান আহমদ এম এস সি রসায়নশাস্ত্রে।

আহমদ আলীর কন্যা আসমা ১৫ বছর বয়সি—মাদ্রাসার ক্লাস নাইনের ছাত্রী। ফারহান বিদেশে পড়াশোনায় আগ্রহী, ব্রিটেনের কোনও কলেজে ভর্তি হতে পারবে। মাহমুদ আলী এত টাকাপয়সা জোগাতে পারবেন না। তাই বাপ ছেলেতে বেশ টানাপড়েন।

কথাটা কানে  গেছে আহমদ আলীর। বৃদ্ধা মাকে নিয়ে পরামর্শ করলেন। ডাকলেন ছোটো ভাইকে।

আসমাকে তুই যদি ছেলের বউ করে নিস তাহলে ওর বিলেত যাবার খরচ আরত পরবর্তী কালে যা লাগে আমিই করব। আম্মাও এই পরামর্শ দিচ্ছেন। তুই দেখ। মাহমুদ আলী খুশি হয়েই রাজি হলেন।

বড়ো ভাই বললেন, তুই রাজি হলে তো হবে না। তোর বউ এবং ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করে বল।

মাহমুদ আলীর বউ না না করেও রাজি হলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল ছেলে মেম বিয়ে করবে। হলো না। ছেলে প্রথমে রাজি হলো না। তাঁর যে প্রেমিকা আছে সেও মা-বাবাকে বলতে পারলো না। আসমাকে বিয়ে করা ছাড়া তাঁর বিদেশ যাবার স্বপ্নপূরণ সম্ভব হবে না দেখে  রাজি হলো। কথা হলো আকদ হয়ে থাকবে—কনের বয়স আঠারো হলে ঘরে উঠবে বউ হয়ে।

মাহমুদ আলী বললেন, কাবিননামা রেজিস্ট্রেশন আমি করবো, মোহরানা হিসেবে তুই বাড়ির পাঁচ বিঘা জমি দিবি। আমার সবটাই তো মেয়ে আর জামাই পাবে। ফারহান বিদেশে যাচ্ছে—উল্টা-পাল্টা করলে ভিটেবাড়ির তাঁর অংশের দায়টা তাঁর থাকে। মানুষের মন তো রং বদলায় ক্ষণে ক্ষণে।

ঘটলও তাই। আসমা বিয়ের আগে ফারহানের সামনে বেরোতে—কথাবার্তা বলতো, বিয়ে হলে তাও বন্ধ হয়ে গেল। ফারহানের তরফে নতুন বউ দেখার বা কথা বলার গরজ ছিল না।

সে ঢাকায় গেল এবং লন্ডনেও পাড়ি জমালো।

এক বছর পর সে প্রথম চিঠি লিখল আসমাকে। তোর সঙ্গে বিয়েটা এক ছেলেখেলা ছিল। ভুলে যাস এটি। গ্রাম্য অশিক্ষিত একটা মেয়ে নিয়ে আমি সংসার করতে পারবো না। আর ওই কাগুজে বিয়ের কথা পরিবারের বাইরে তো কেউ জানে না। তুই কাউকে নিশ্চয়ই পাবি। ইত্যাদি।

আসমা চিঠির কথা দাদিকে জানালো তাঁর কী করনীয় জানতে। বুড়ি অসুস্থ ছিলেন এই খবরে স্ট্রোক করলেন। নির্বাক ৩/৪ দিন বেঁচেছিলেন, তারপর চোখ মুদলেন।

এস এস সি পরীক্ষা দিলো সে, ভালো হলো পরীক্ষা। পরীক্ষার পর পর বাবা  তাঁকে বিবাহ সম্পর্কে ইসলামের বিষয়াদি বোঝাতে শুরু করলেন। আসমা শুনে আর কাঁদে।

বাবা একদিন বললেন, মা আয়েশাকে আদর্শ মানিসরে মা। শৈশবে শাদি হয়েছিল তাঁর। নবীজীর সংসারে ৯ বছর ছিলেন। দুনিয়ার মুসলিম নারীকূলের জন্য দ্বীনের যথাযথ পথটি তিনিই দেখিয়েছেন। আমি জানি না রে মা তোকে বিয়ে দিয়ে ভুল করেছি কি না। ভুলও যদি করে থাকি তুই ত্রাকে ফুল করে তুলিস। কথা দে মা, তুই আমার কথা রাখবি। আমাদের এই ক্ষয়িষ্ণু পরিবারটিকে উজ্জ্বল করে তুলবি তুই।

আসমা কেঁদে ওঠে ডুকরে। আর কান্না জড়ানো কণ্ঠে জানায় সে কথা দিচ্ছে।

সেদিই সে ফারহানকে চিঠি লিখে, ‘আপনার চিঠি পেয়েছি। পরীক্ষা, দাদির মৃত্যু, আব্বার অসুস্থতার জন্য উত্তর দিইনি। আপনার যোগ্য আমি নই সেটা আমি জানি। জানি বলেই কোনও অধিকার কখনও দাবি করব না, ওয়াদা দিচ্ছি। তবে হ্যাঁ, কাগুজে বিয়েটিই আল্লাহর নামে রাসূলের সুন্নতের অসিলায় হয়েছে বিধায় আমি এর অধীনে সারাজীবন  থাকতে চাই, থাকবো ইনশাআল্লাহ। আপনি আপনার সুখশান্তির জন্য যা প্রয়োজন করুণ আমি আপত্তি করছি না, করব না। আশা করি আপনি আমাকে যে মনোভাব জানিয়েছিন বাড়ির অন্য কাউকে তা জানাবেন না। আপনার চিঠির মর্মার্থ শুনেই দাদি ইন্তেকাল করেছেন। আমি চাই না আর কারও ওপর আমার দুর্ভাগ্যের ছায়া পড়ুক। ভালো থাকবেন।’

চিঠি পড়ে ফারহান রাগে কাঁপতে থাকে। সে তাঁর শ্বশুরকেও কথিত বিয়ের অসারতা জানিয়ে চিঠি লেখে। বড়ো চাচা চিঠি পেয়ে হতভম্ব হয়ে যান, ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করার ইচ্ছে জাগে কিন্তু মেয়ে তা জেনে যাবে। অতএব নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত হোন এবং মায়ের মৃত্যুর ছ’মাসের মধ্যে কবরবাসী হন।

বাবার মৃত্যুর পর অসহায় মেয়েটি শ্বশুর-শাশুড়ির মনোভাবও জেনে যায়। ইন্টারমিডিয়েট পড়বার আশায় একমাত্র মামার আশ্রয়ে যায়। কিন্তু দুমাসেই মামির নির্যাতন তাঁকে মোহমুক্ত করে দেয়।

ভাগ্য সব দরজা করে দিচ্ছিল তাঁর। পত্রমিতালি বলে একটা বিষয় তখন চালু ছিল। মহানগর ঢাকার একটা মেয়ে মাসুমা শেলির সঙ্গে পত্রমিতালি ছিল তাঁর। খুব সংযত ভাবে সে তাঁর কাহিনী শেলিকে লিখে যাছিল। শেলি জানায় তাঁর বাসার দরজা আসমা জন্য চিরদিন খোলা আছে, থাকবে। সে তাঁকে দিন তারিখ জানিয়ে বলে, সে কোনও উপায়ে চলে আয় ভাই। ওই নরকে আর একটা দিনও পড়ে থাকিস না।

অতি সংগোপনে আসমা বাবার ব্যাংকে জমানো ২৫ হাজার টাকা তুলে নেয় আর পাড়ি জমায় ঢাকায়।

আল্লাহর রহমতে একা মেয়েটি সহিসালামতে ব্যারিস্টার ইদ্রিসের বিলাস বহুল অট্টালিকায় পৌঁছে যায়।

শ্বশুর মহাশয় গ্রামময় রটিয়ে দিলেন কুলটা মেয়েটি, কোনও ছেলের হাত ধরে পালিয়েছে। আল্লাহ তাঁর আর তাঁর ছেলের জীবনকে অভিশাপমুক্ত করেছেন।

সুসময় বড়ো দ্রুত পালায় মানুষের জীবন থেকে। ফারহান আহমদ সহপাঠিনীকে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করান। বিয়ে করেন। দুজনে ডক্টরেট করে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিও পেয়ে যান। দশ বছর স্বপ্ন আর সাধনার ঘোর কেটে যায়। অবশেষে তাঁর স্ত্রী ড. নাজমার ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে। ডাক্তাররা যখন নিরাশ হয়ে Pray, Pray বলতে শুরু করেন তখন তাঁর ঘোর কাটে। তিনি স্ত্রীকে বলতে শুরু করেন আমার পাপে তুমি মরতে বসেছো।

স্ত্রী বলেন, না আমার পাপেই আমি মরছি। যদি পারো আসমাকে খুশি রেখো। আমি জেনে শুনে একটা নিষ্পাপ সুন্দর জীবন থেকে তোমাকে বিচ্যুত করেছি।

পাপবোধের প্রবল কষ্ট নিয়ে নিঃসন্তান নাজমা চলে গেলেন ওপারে।

ডক্টর ফারহান এখন বড়ো একা, দেশে এসে দেখলেই বাবাও যাবেন-যাবেন অবস্থা। তাঁকে পেয়ে খুব খুশি। ভাইয়ের গোটা সম্পত্তি জাল দলিলে আত্মসাৎ করেছেন। নিজের মেয়েদেরকে কানাকড়ি সম্পদ না-দিয়ে একমাত্র বংশপ্রদীপ ফারহানের নামে করে রেখেছেন। এগুলো সমঝে রাখো। কেউ কানাকড়িও পাবে না। মেয়েরা তো সুখেই আছে আর ওই ছুড়িটা পালিয়ে গিয়ে তোমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

ফারহান চেঁচিয়ে ওঠে। আব্বা এসব রাখেন, আল্লাহকে স্মরণ করেন। সবাইকে ঠকিয়ে আমাকে সম্পত্তি দিচ্ছেন। আমি কাকে দিয়ে যাবো ভেবেছেন একবারও।

দুনিয়ার লোভে যাকে অন্ধ করে দিয়েছে তিনি পুত্রের কথা বুঝতে পারলেন না। বললেন, তোর মা’র সঙ্গে বুঝাপড়া করিস বাবা। তিনবার হিক্কা উঠলো তাঁর, তারপর ঠান্ডা হলেন চিরতরে।

ছেলে লন্ডন চলে যাবে। মাকে বার বার বলছে, আসমাকে খুঁজে বের করো মা। আমি একবার অন্তত তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে চাই। নইলে আমার জীবনটা নরক হয়ে রইবে।

মা বললেন, নষ্টা মেয়েটার কথা মুখেও নিস না। কোনও খারাপ পাড়া নয়ত জাহান্নামে চলে গেছে তাঁকে খুঁজে কোনও লাভ হবেনা। উল্টো মা বিভিন্ন স্ট্যাম্পে দস্তখত করান। এসব কেন আম্মা, জিজ্ঞেস করে পুত্র।

মা বলেন,  তুই বুঝবি না। সাইন কর। সব তোর জন্য তোর মঙ্গলের জন্য। ঝগড়া করতে মন চায়না ফারহানের। রাগ করবে কার উপরে! এই মা ছাড়া পৃথিবীতে তাঁর আপন কেউ নেই আর।

আসমা ব্যারিস্টার ইদ্রিসের বাসায় উঠলো একান্ত আপনজনের মতো। ব্যারিস্টার গিন্নি আর ইদ্রিস সাহেব যেন দ্বিতীয় একটি মেয়ে পেলেন। শেলি সবকিছু জানিয়েছে তাই তাঁরা আর বেদনা খুঁড়লেন না। ব্যারিস্টার দম্পত্তির বড়ো দুই ছেলে, একজন আমেরিকায়, দ্বিতীয় জন তাঁর সহকারী আইনজীবী। ব্যারিটার আরিফের স্ত্রীও আইনজীবী। এটি যেন এক আইনের ঘর। কিন্তু বড়ো হৃদয়বান প্রাণখালা প্রতিটি মানুষ।

ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হলো আসমা ইডেন কলেজে। মেধাতালিকায় স্থান পেলো গ্রামের মাদ্রাসা পড়া মেয়েটি। এ  ঘরে ঢুকেই সে জেনেছিল সে আইন পড়বে, আইনই পড়ল।

শেলিই আবিস্কার করেছে ডিজাইন করার ব্যাপারে আসমার প্রকৃতিগত প্রতিভা। বিভিন্ন ডিজাইন হাউসের সঙ্গে আসমাকে পরিচয় করিয়ে দিল সে। আর এ আহমদ নামের এক আনকোরা ডিজাইনার প্রফেশনালি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল রাতারাতি। প্রচন্ড পরিশ্রমী মেয়েটি। দশ বছরে ব্যারিস্টার হলো, খ্যাতিমান ডিজাইনার হলো। কিন্তু তাঁর পরিচিত ফেলে আসা পৃথিবীর কেউ সে-খবর জানেলো না।

আরও পাঁচবছর পর মাহমুদ আলী পরিবারে মা-মেয়েতে সম্পত্তি নিয়ে আইনি যুদ্ধ শুরু হলো। চার মেয়ে দাবি করল পৈতৃক সম্পত্তি যা বেআনিভাবে ভাই ডক্টর ফারহানের নামে দিয়ে দেওয়া হয়েছে পাওয়ার অব এটর্নির বলে, মা রাবেয়া খাতুন ছেলের পক্ষে লড়ে চলছেন।

গড়াতে গড়াতে সেই মামলা হাইকোর্টে উঠলে পরে চূড়ান্ত পর্যায়ে আজ আপোশ রফার এই আয়োজন। ডক্টর ফারহানের বসতবাড়িতে অর্থাৎ সরেজমিনে আজকের ঐতিহাসিক বিচারসভা।

দুপক্ষের ব্যারিটার আছেন, কোর্ট নির্ধারিত জুরি আছেন দুজন। সর্বোপরি ব্যারিস্টার ইদ্রিসের ল’ ফার্মের একজন প্রতিনিধিও ডক্টর ফারহানের উপদেষ্টা হিসেবে হাজির হয়েছেন।

সকাল দশটায় দেখা গেল একজন ভগ্নস্বাস্থ্য চল্লিশ বছর বয়সি মানুষ হলরুমের একেবারে পেছনে বসেছেন। কোর্ট নয় এই অর্থে যে, কোর্টের চেয়ে একটু শিথিল আচরণের একটি মহাকোর্ট মনে হচ্ছে এটিকে।

একজন উকিল সাহেব বিষয়বস্তু অর্থাৎ মেয়েদের দাবির বিষয়টি তুলে ধরলেন শুরুতে। পেছনের ভগ্নস্বাস্থ্য লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমার পক্ষে ব্যারিস্টার ইদ্রিসের ফার্ম থেকে একজন প্রতিনিধি থাকার কথা আছে তিনি কি আছেন? কালো বোরখা ও নেকাব পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে বললেন, জি আমি আছি।

পেছনে বসা লোকতি বলল, আমি ফারহান আহমদ এই বিষয়ের দ্বিতীয়পক্ষ। আমি আপনাকে বলছি আইনের নৈতিক মূল্যবোধ থেকে আমার বক্তব্য দিয়ে দিলে আমার মনে হয় সকল পক্ষের সন্তুষ্টি এবং সমঝোতা খুব সহজ হবে।

মহিলা বললেন, জনাব ফারহান আপনি কি আমাকে এই মামলাভুক্ত সকল সম্পত্তির ন্যায্য সকল পক্ষ ও ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার অধিকার দিচ্ছেন।

ফারহান বললেন, নিশ্চয়ই দিচ্ছি।

মহিলা শুরু করলেন। মামলার জুরিবৃন্দ ও আইনজীবী মহোদয়গণ—

আমি ব্যারিস্টার মিসেস এ আহমেদ। আমার ও জনাব ফারহান আহমদের এফিডেভিট আপনাদের কাছে পেশ করেছি। ফারহান আহমদ আমাদের ফার্মকে এই সম্পত্তিতে নায্য অংশীদার প্রত্যেককে যার যার ন্যায্য অংশ নির্ধারণের অধিকার প্রদান করেছেন।

তাই এখানে তাঁর বোনেরা সম্পত্তির যে দাবি দিয়েছেন তা তাঁরা পেতে কোনও বাঁধা থাকছে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে সম্পত্তি ফারহান আহমদ তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে দলিলদস্তাবেজের মাধ্যমে কোর্টে সাবমিট করেছেন, সেটির আর কোনও মালিক আছেন কি না সেটি আমাদের খুঁজে দেখতে হবে।

দুজন উকিল বললেন, না তেমন দাবিদার কেউ নেই। উকিল দুজন রাবেয়া খাতুনের আর তাঁর মেয়েদের পক্ষের। শান্ত কণ্ঠে মিসেস আহমদ বললেন, অবশ্যই আছেন, আহমদ আলী সাহেবের কন্যা আসমা আহমদ আছেন আবার সেই আসমাই ফারহান সাহাবের স্ত্রী হিসেবে তাঁর মোহরানা বাবদে পাওনাদার আছেন।

একজন উকিল উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, মৃত ব্যক্তির মালিকানার প্রশ্ন এখানে উঠছে কেন? বিশেষত সেই মৃতের যখন উত্তরাধিকারী নাই।

মিসেস আহমদ জানতে চাইলেন, সেই মৃত্যুর সার্টিফিকেট প্লিজ এক্সিবিট করুণ।

আবারও দুজন উকিল দাঁড়িয়ে উত্তপ্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আপনি তাঁকে হাজির করুণ। ১৭ বছর যার কোনও পাত্তা নাই তাঁকে নিয়ে আপনি অযথা জটিলতা সৃষ্টি করছেন কেন?

মিসেস আহমদ পেছন ফিরে ফারহান আহমদকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার প্প্রপ্তহম স্ত্রী আসমা মারা গেছেন বলে কোনও প্রমাণ কি আপনার কাছে, ডক্টর ফারহান?

ফারহান  দাঁড়ালেন, কম্পিত কণ্ঠে বললেন, না আসমা মারা যাবার কোনও খবর আমি জানি  না। আমার দৃঢ়বিশ্বাস সে বেঁচে আছে এবং তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করার সুযোগ আল্লাহ আমাকে দেবেন।

ব্যারিস্টার মিসেস আহমদ আস্তে করে তাঁর বোরখা খুললেন। নেকাব খুলে বললেন, মাননীয় জুরিবৃন্দ এই আমি, আমিই আসমা আহমদ। এই আমার চাচিকে যিনি আমার শাশুড়িও বটে, আমার চাচাতো বোনদেরকে  এবং আমার স্বামীকে অনুরোধ করছি তাঁরা কি আমাকে দয়া করে শনাক্ত করবেন? যদি না করেন, আমিও নিজেকে মৃত স্বীকার করব। আর তাঁদের সম্পত্তির বাটোওয়ারানামা আপনাদের কাছে পেশ করে বিদায় নেবো।

অনেক কণ্ঠে আর্ত আওয়াজ উঠলো ‘আসমা’। এই তো আসমা। স্তম্ভিত বিচারসভা থমকে গেল যেন।

উদভ্রান্তের মতো  ফারহান সামনে ছুটে এসে হাতজোড় করে দাঁড়ালেন ব্যারিস্টার আসমার সম্মুখে।

আসমা বললেন, তুমি শান্ত হয়ে প্লিজ বসো।

মাননীয় জুরি সাহেবান আইনবিদগণ ও সংশ্লিষ্ট সম্মাননীয় সুধীজন।

আমরা সকল দলিলদস্তাবেজ ঘেঁটে দেখেছি এই বাড়িতে ২৪ বিঘা ভূমি আছে। এরমধ্যে ১২ বিঘা আহমদ আলী সাহেবের উত্তরধিকারী আসমা পান। ফারহান আহমদের দেওয়া মোহরানা হিসেবে আসমা পান আরও ৫ বিঘা। এই ১৭ বিঘার পর ৭ বিঘা পান ফারহান সাহেবের বোনেরা।

বোনেরা হাততালি দিলেন। এর বাইরের ৫৪ বিঘা ভূমির ২৭ বিঘা আসমার আর বাকি ২৭ বিঘার ২ দশমাংশ ফারহান সাহেবের এবং ১ দশমাংশ প্রত্যেক বোন পাচ্ছেন।

হ্যাঁ, একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে আমার চাচির স্বামীর সম্পত্তির ভাগ কোথায় গেল। তিনি তাঁর প্রাপ্য অংশটুকু তাঁর স্বামীর কাছে রেজিস্ট্রি দলিলমূল্যে বিক্রি করেছেন বিধায় তাঁর সম্পত্তিটুকু তাঁর ছেলেমেয়েদের ভাগে গেছে। সবাইকে ধন্যবাদ।

উকিল সাহেবরা বড়ো কসরত করে এসেছিলেন কিন্তু তাঁরা যাদের পক্ষে তাঁরা যেভাবে সন্তোষ প্রকাশ শুরু করেছেন তাতে চুপ না-হয়ে তাঁদের উপায় ছিল না।

জুরিবৃন্দ সকল পক্ষের হাজিরি নিশ্চিত করলেন, সকল পক্ষের দস্তখত নিলেন।

অন্যদিকে আসমাকে নিয়ে মেতে উঠলেন চাচাতো বোনেরা। আসমা বলল, ‘আম্মা কোথায় আমার চাচি আম্মাকে নিয়ে এসো’। দুজনে ধরাধরি করে মহিলাকে আনলেন, ফ্যাকাশে মুখ, থর থর করে কাঁপছেন তিনি। আসমা তাঁকে পা ছুঁয়ে সালাম করল। তারপর দুই হাত দুই গালে চেপে বলল, আম্মা তোমার কোনও অংশ রইল না, এই তো তোমার দুঃখ। ব্যারিস্টার আসমা আহমদ তোমাকে তাঁর এখানকার গোটা সম্পত্তি লিখে দিয়েছে রেজিস্ট্রি দলিলমূলে। ব্রিফ কেইস খুলে দলিলটি তাঁর হাতে দিলো আসমা। বৃদ্ধা দলিলটি হাতে নিলেন, তারপর হাতের সমস্ত শক্তি জড়ো করে সেটিকে কুঁচি কুঁচি করে ছিঁড়লেন।

কাঁপা গলায় বললেন, আমাকে ক্ষমা করিস না রে মেয়ে আমাকে ক্ষমা করিস না। পারলে ফারহানকে ক্ষমা করিস। আমি অন্ধ ছিলাম, মরবার আগে চোখে আলো পেলাম, সত্য সুন্দর দেখলাম। আমি তোকে আল্লাহর জিম্মায় রাখলাম। মূর্ছিত হলেন তিনি।

বিচারসভা খুব কম সময়ে শেষ হলো বলে সকলে খুশি। কৃতিত্ব যে তাঁদের গাঁয়ের মেয়ের, সেটি সবার মুখে মুখে। ঘরে যাচ্ছে না আসমা। ভিড় তাঁর চারদিকে।

ডক্টর ফারহানের কষ্ট হচ্ছিল প্রচন্ড। শেষ পর্যন্ত ভিড় ঠেলেই সামনে এলেন তিনি। ‘আসমা আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না?’

আসমা তাঁকে পা ছুঁয়ে সালাম করে। ভয়ে তিনি ত্বরিত পা সরালেন। হাসলো আসমা। স্থির অচঞ্চল কণ্ঠে বলল, আমার আব্বা আমাকে আল্লাহর আইনে, নবী মোহাম্মদ (সাঃ) এর অসিলায় আপনার কাছে আমানত রেখেছেন। আমি সেই আমান্তই আছি আর থাকবো ইনশাআল্লাহ। আপনি যদি আমাকে ত্যাগ না-করে থাকেন তবে আমি আপনারই আছি। হ্যাঁ, আমি যাদের আশ্রিত তাঁদের কাছেই যাচ্ছি। আপনি তাঁদেরকে বলুন আপনার অধিকার তাঁরা নষ্ট করবেন না।

বত্রিশ বছর বয়সি এক কুমারী নারী যখন সৌন্দর্যে, জ্ঞানে ঔদার্যে, ক্ষমা আর ধৈর্যের মহিমায় জ্বলে ওঠে, চাঁদ-সূর্য আর তারকালোক তখন বড়ো ম্লান হয়ে যায়।

গাড়িতে যখন উঠছে আসমা, ফারহান এ বাক্যটি আওড়ায়।

লেখকঃ কালাম আজাদ।

শেষের আলোয় সিক্ত শিশির বই থেকে নেওয়া। 

এই গল্পটিকে আপনি একটি রেটিং দিন

0%

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, এই গল্পটি পড়ে আপনার কাছে কেমন লেগেছে তাঁর উপর ভিত্তি করে আপনি একটি রেটিং দিন। রেটিং দিতে নিচের পাঁচটি তাঁরা থেকে আপনার রেটিং তাঁরা তে ক্লিক করুণ। সর্বোচ্চ রেটিং ৫ম তারাতে ক্লিক করুণ।

আরো গল্প পড়ুন
User Rating: 4.26 ( 5 votes)

About Syed Rubel

Creative Writer/Editor And CEO At Amar Bangla Post. most populer bloger of bangladesh. Amar Bangla Post bangla blog site was created in 2014 and Start social blogging.

Check Also

নায়িকা হওয়া পেছনের গল্প (শয়তানের ফাঁদ-৪)

ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে মাহমুদা। হয়ত তারা গুনতে চেষ্টা …

One comment

  1. গল্পটি ধৈর্যশীল নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার। আঘাত আসলে প্রতিঘাত করার এক অন্যতম শিক্ষা। বিপদে, দুর্যোগে হাল না ছাড়ার শিক্ষা। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *