Home / World Blog / বাংলা ব্লগ / বিয়ে একটি উত্তম বন্ধুত্ব | রেহনুমা বিনতে আনিস
বিয়ে

বিয়ে একটি উত্তম বন্ধুত্ব | রেহনুমা বিনতে আনিস

নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে ‘ওশিন’ নামে একটি জনপ্রিয় জাপানি সিরিয়াল প্রচারিত হত। আমরা তখন সম্ভবত অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। বান্ধবীরা প্রায়ই এর বিভিন্ন এপিসোড নিয়ে আলাপ করতাম। একবার দেখানো হল ওশিন এমন এক নির্জন জায়গায় গিয়ে চাষবাস করতে শুরু করল যেখানে স্থানীয় স্কুলশিক্ষক ছাড়া আর কোনো উপযুক্ত পুরুষ নেই মেয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য। সে আর কোনো উপায় না দেখে মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে স্কুলশিক্ষকের কাছে বিয়ে দিয়ে দিল। একটি সন্তান হওয়ার পর মেয়েটির এমন একজনের সাথে পরিচয় হয় যাকে তাঁর মন থেকে পছন্দ হয়। বেশ কিছুদিন চিন্তাভাবনা করার পর সে সিদ্ধান্ত নেয় যে শিক্ষক স্বামীকে ছেড়ে সে ঐ লোকের সাথে সংসার করবে। ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের মধ্যে এমনভাবে তোলপাড় সৃষ্টি হল যেন আমাদের পরিচিত কেউ এমনটা করে বসেছে!

আমার কোন বোন নেই। ভাইদের সাথে বড় হওয়াতেই কিনা জানি না, আমার স্বাভাবিক মেয়েলি বিষয়গুলোতে খুব একটা আগ্রহ ছিল না কখনো। বাস্তব জীবনের চেয়ে বইপত্রের সাথে সম্পর্ক ছিল বেশি। তাই বিবাহ বিষয়ে ধারণা ছিল সিন্ডারেলা মার্কা গল্পে যা লেখা থাকে তেমন। কোনো প্রকারে একবার বিয়ে হয়ে গেলেই “happily ever after’. আমাদের অধিকাংশ মেয়েদের মধ্যেই এই ধরণের ভূল ধারণা কাজ করে। কারণ রূপকথার বইগুলো আমাদের কোনোভাবেই জীবনের বাস্তবতার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে না। তাই বান্ধবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুষড়ে পড়েছিলাম আমি, ‘এমনটা তো হওয়ার কথা না!’

তখন  আমি ফিলসফার বান্ধবী শিমু আমাকে খুব ভালো একটা ব্যাখ্যা দিল। সে বলল, ‘ইসলামে বিয়ের বিধানের ওপর এত গুরুত্ব দেওয়ার একটা অন্যতম কারণ হল চরিত্র সংরক্ষণ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। আমাদের সমাজে আমরা ইসলামের বিধানের চেয়েও আঞ্চলিকভাবে যা চলে এসেছে তাঁকে বেশি গুরুত্ব দেই, মানুষ কি বলবে তা ভেবে বেশি চিন্তিত হই। তাই দেখা যায়, লোকে কি বলবে ভেবে অনেকে বছরের পর বছর এমন একজনের সাথে আপাতদৃষ্টিতে বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখে যেখানে একজনের সাথে আরেকজনের আদৌ কোনো সম্পর্ক থাকে না। দুজন মানুষ একই বাড়িতে থাকে একসাথে খায়, ঘুরে। কিন্তু একজন আরেকজনকে সহ্য করতে পারে না। কেউ কেউ সন্তানদের কথা ভেবে নিজেকে বঞ্চিত করে, চালিয়ে যায় সুখে থাকার নাটক। যারা অতটা দৃঢ় মানসিকতাসম্পন্ন নয়, তাঁরা ডুবে যায় ব্যভিচার বা অনৈতিক কার্যকলাপের আবর্তে। সেক্ষেত্রে তো বিয়ের মূল উদ্দেশ্যই ব্যহত হচ্ছে! তাঁর চেয়ে কি এটা ভালো নয় যে তাঁরা যেভাবে নিজেদের চরিত্র সংরক্ষণ করতে পারবে সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেবে? তাঁর মানে এই নয় যে তাঁরা যে বৈবাহিক সম্পর্ক আছে তাঁকে সহজভাবে নেবে। এর মানে হল তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে দেখবে এই সম্পর্ক কার্যকর করা যাবে কিনা আর তারপর ব্যর্থ হলেই কেবল আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে।

‘এটা অবশ্যই খুব দুঃখজনক অবস্থা যদি কোনো ব্যক্তি সঠিক মানুষটিকে খুঁজে পান তাঁর বিয়ের পর। এজন্যই হয়তো পর্দার ওপর এতখানি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য। কিন্তু একইসাথে বিবাহিত ব্যক্তির জন্য ব্যভিচারের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড যেখানে অবিবাহিত ব্যক্তির জন্য শাস্তি অপেক্ষাকৃত কম। যেহেতু অবিবাহিত নারী পুরুষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সংযমের অভাবের কারণে ঘটতে পারে। কিন্তু বিবাহিত নারী পুরুষদের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘনই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত  করা যায়। পুরুষদের জন্য একাধিক বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে যদিও আল্লাহ বলেছেন এক বিয়েই তাঁর কাছে অধিক পছন্দনীয় এবং একাধিক বিয়ের শর্ত এত কঠিন করে দেওয়া হয়েছে যে চিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রই ভয় পাবে। কিন্তু এর পেছনে উদ্দেশ্য এই যে, যদি এই দুর্ঘটনা ঘটেই যায় তাহলে ব্যভিচারের পরিবর্তে সঠিক পথটিই যেন মানুষ বেঁছে নেয়।

‘সুতরাং, আমাদের সবসময় আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিৎ যেন আল্লাহ আমাদের এমন সঙ্গী মিলিয়ে দেন যার সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য—ঐ সাত ব্যক্তির একজনের মতো যারা কেয়ামতের দিন আরশের নিচে ছায়া পাবে যখন বারটি সূর্য ঠিক মাথার ওপর অবস্থান করবে। আল্লাহ যেন আমাদের জন্য বৈবাহিক জীবন এবং দায়িত্ব সহজ এবং আনন্দময় করে দেন যাতে ইসলামের ওপর অবস্থান এবং চরিত্র সংরক্ষণ করা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়’।

শিমুর কথায় আমার যে শুধু এই ব্যাপারে ধারণা স্পষ্ট হল তাই নয়, আমি বুঝতে পারলাম যে আমরা অনেক ফালতু ব্যাপারে দোয়া করতে করতে অস্থির হয়ে যাই।  অথচ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলোতে আল্লাহর সাহায্য চাইত্যে ভুলে যাই! মজার ব্যাপার হল, আমি যখন আমার ছাত্রীদের বলতাম সঠিক বিয়ের জন্য দোয়া করতে, তাঁরা খুব লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলত, ‘এটা কি বললেন ম্যাডাম? এ রকম লজ্জাজনক বিষয়ে কি আল্লাহকে বলা যায়?’ অথচ ভুড়িভুড়ি ছেলেমেয়ে দেখেছি যারা বাবা-মাকে লুকিয়ে প্রেম করে আর সেই প্রেমে সাফল্য আসার জন্য আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে মহাবিশ্ব ফেঁড়ে ফেলার জোগাড়!

তাঁদের একজনকে বলেছিলাম, ‘তুমি আল্লাহকে বল যেটা তোমার জন্য ভালো হবে, আল্লাহ যেন সেটাই তোমাকে দেন। তুমি নিজে নির্দিষ্ট করে দিয়োনা তুমি কি চাও। কারণ আমরা কেউ জানি না আমরা যা চাই তাতে ভালো আছে না মন্দ’। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। শেষমেষ বহুবছর পর, বহু নিশিথ রজনী অশ্রুব্যাকুল হয়ে দোয়া করার পর আচমকা কিভাবে যেন সব বাঁধা পরিষ্কার হয়ে গেল! তাঁর বিয়ে হয়ে গেল নিজের পছন্দমতো। সে এখনো প্রতিরাতে ব্যাকুল হয়ে কাঁদে, ‘আমি না হয় ভূল করে তাই চেয়েছি যা আমার জন্য ভালো নয়, কিন্তু তুমি কেন আমায় তা দিলে আল্লাহ?’ আপনারাই বলুন, আল্লাহ বেচারা কি করবেন?!

আরেকবার এক ভাইয়ের বৌ মারা গেলেন হঠাৎ করে। বাচ্চাদের নিয়ে বেচারা হিমশিম খাচ্ছেন। ভাইয়ের বয়স খুব বেশি না। আমরা বললাম, কত বিধবা মেয়ে আছে যাদের কোনো অভিভাবক নেই, তাঁদের একজনকে যদি উনি বিয়ে করেন তাহলে দুজনেরই উপকার হতে পারে। স্বামী বা স্ত্রী মারা গেলে অন্যজনের সব প্রয়োজন বা চাহিদা তো আর অদৃশ্য হয়ে যায় না! সংসার চালাতে হয়ে, সন্তানদের দেখাশোনা করতে হবে, কোনটা বাদ দেয়ার মতো? একজনের জীবনাবসান হয়েছে বলে তো আরেকজন জীবিত মানুষের জীবনের ইতি টেনে দেওয়া যায় না। এর মানে এই নয় যে তাঁদের সম্পর্কে কোনো ঘাটতি ছিল। বরং কেউ যদি কারো ব্যাপারে সত্যিই শুভাকাঙ্ক্ষী হয় তাহলে সে চাইবে সে মারা গেলে যেন তাঁর সঙ্গী জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধা না হয়ে সুখী হয়। কিন্তু আত্মীয়-স্বজনরা অনেক সময় ইসলামের তোয়াক্কা না করে চলতি প্রথা অনুসারে চিন্তা করেন। বিধবা বা মৃতদার বিয়ে করবেন এটা তাঁরা কিছুতেই  মেনে নিতে পারেন না। আমার এক বন্ধু ক্ষুদ্র হয়ে বলেছিলেন, ‘তাঁরা (আত্মীয়স্বজনরা) বরং এটাই ভালো মনে করে যে যাদের স্বামী বা স্ত্রী মা গেছেন তাঁরা অবৈধ কিছু করুক, ওটা হয়তো লোকে দেখতে পাবে না। কিন্তু বৈধ উপায়ে বিয়ে করলে যে লোকে ছি ছি করবে সেটা তাঁরা কিছুতেই সহ্য করতে রাজী না।’

আমাদের সমাজে হয়তো অভাব, হয়তো লোভ থেকে এখন আরেকটা প্রথা প্রচলিত হয়েছে।  বিয়ে করে বউ রেখে বছরের পর বছর বিদেশ থাকা। কেউ টাকার জন্য, কেউ সিটিজেনশিপের জন্য, কেউ একটা স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য, কেউ পরিবারের প্রয়োজনে। আবার অনেকে বাড়িতে বউ রেখে  শহরে পড়ে থাকেন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। অথচ আল্লাহ বলেছেন, স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের পরিচ্ছদস্বরূপ। পোশাক যেভাবে আমাদের শীতগ্রীম্ম, রোদবৃষ্টি,  পোকামাকড় থেকে রক্ষা করে; আমাদের সৌন্দর্য্য বর্ধিত করে, অসৌন্দর্য ঢেকে রাখে—স্বামী স্ত্রী সেভাবেই একজন আরেকজনকে সাহায্য সহযোগিতা, আলাপ পরামর্শ,  সাহস বা সান্ত্বনা দিয়ে পরস্পরকে পরিপূরণ করবে। কিন্তু দুজন যদি বছরের পর বছর পরস্পরকে নাই দেখে, শুধু ফোনে কথা বলে আর আকাশপাতাল কল্পনা করে কি চরিত্র সংরক্ষণ করা যায়? এর ফলশ্রুতিতে আমাদের সমাজে পরকীয়া সহ নানাধরণের বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। মানুষ তাঁদের প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, আবার এই অবৈধ কার্যকলাপ ঢাকতে গিয়ে আরো বড় পাপের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছে। বিদেশেও যে ভাইরা সবসময় নিরাপদ থাকেন, ব্যাপারটা তেমন নয়। বিদেশের মাটিতে মানুষের মন প্রায়ই খারাপ থাকে, তখন প্রলোভন থেকে নিজেকে বিরত রাখা স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই পা  পিছলে পড়ে যান পঙ্কিলতার পিচ্ছিল পথে। উমার (রাঃ) মুসলিম সৈনিকদের জন্য প্রতি চার মাসে বাড়ি ফিরে আসা বাধ্যতামূলক  করে দিয়েছিলেন এই ধরনের সামাজিক বিপর্যয় রোধ করার জন্য। আমাদের ভাইদের কজন প্রতি চারমাস অন্তর স্ত্রীর সাথে সময় কাটাতে আসেন বা  আসতে পারেন? পরিবারের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অনেকেই নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছা সাধ আহ্লাদ কোরবানি করে দেন বছরের পর বছর। কিন্তু তাঁদের আত্মীয়স্বজন মনে করেন, বিদেশে তো টাকা আকাশে বাতাসে ওড়ে, তাঁর কাছে নিশ্চয়ই আরো টাকা আছে কিন্তু সে আমাদের দিচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে আসা কঠিন বৈকি! আর দেশে যারা দূরে থেকে কাজ করেন তাঁদের স্ত্রীদের অনেক সময় বাবা-মা আসতে দেন না, হয়তো এই মনে করে যে তাহলে ছেলে আর বাড়িতে টাকা পাঠাবে না! তাই দেশে থেকেও তাঁরা চরিত্র সংরক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত!

পারিবারিক বা সামাজিক প্রয়োজনে আজকাল আমাদের দেশে বিপুলসংখ্যক মহিলা সংসারের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও কাজ করছেন। কিন্তু আমাদের সামাজিক কাঠামো এখনো তাঁদের এই উভয় দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে  পালন করার উপযোগী হয়ে ওঠেনি। কাজের লোকের সাহায্য ছাড়া সংসার চালানোর মতো গৃহ, রান্না-ঘর, গ্যাস, ইলেকট্রিসিটি, পানির ব্যবস্থা,  পারিবারিক কাঠামো, বাচ্চাদের জন্য সুব্যবস্থা এখনো সুদূরপরাহত। অনেক মহিলারাই কাজ করেন পুরুষপরিবেষ্টিত পরিমন্ডলে যেখানে নারী বলেই তাঁদের প্রতি সৎমাসুলভ আচরণ করা হয়। অনেকেই সারাদিন এ ধরণের কষ্টকর পরিস্থিতি থেকে একটু শান্তির আশায় ঘরে ফেরেন। কিন্তু অধিকাংশ মহিলা যৌথ পরিবারে থাকেন বিধায় ঘরে ফিরেও পারিবারিক দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি মিলে না। শাশুড়ি কেন্দ্রিক পরিবারে শাশুড়ি বিবেকবতী না হলে মহিলাদের ২৪ ঘন্টাই কাটে এক দুর্বিসহ পরিস্থিতিতে। তদুপরি স্বামীও যদি তাঁদের সময় বা সাহচর্য না দেন যেটা যৌথ পরিবারে অনেক সময়ই সম্ভব হয়ে ওঠে না, তখন তাঁদের দিক হারানোর আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে। এটা শুধু নারীদের ক্ষেত্রেই নয়, যে পুরুষ সারাদিন চাকরি করে বাড়ি ফিরে দেখেন বউ শ্বশুর শাশুড়ির সেবায় নিয়োজিত সম্পূর্ণ সময়, তাঁর সাথে দু’দন্ড বসে কথা বলার সময় নেই স্ত্রীর, তিনিও একইভাবে পথ হারাতে পারেন।

একবার এক ছাত্রী কথা প্রসঙ্গে  বলছিল, ‘ম্যাডাম,  আমি ইউনিভার্সিটি আসি বলে প্রতিদিন সকালে বাসার সবার জন্য নাস্তা বানাতে পারি না। তাই শাশুড়ি আমাকে নাস্তা খেতে দেন না। আমি এখন পাঁচমাসের প্রেগন্যান্ট।  প্রতিদিন খালিপেটে ক্লাসে এসে বমি করি। বাসায় গিয়ে রান্না করতে পারলে খাবার জোটে নতুবা নয়। আমার শাশুড়ির যদি ইসলাম সম্পর্কে কোনো জ্ঞান থাকত তাহলে কি উনি এরকম করতে পারতেন?’

সে যে বর্ণনা দিল তাতে আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে শুরু করল। যে মহিলা তাঁর হবু নাতি বা নাতনির মায়ের সাথে এমন আচরণ করছেন, তিনি কি ভাবছেন তিনি এই মেয়েটাকে প্রতিদিন কি বিপদের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছেন? নূন্যতম মানবতাবঞ্চিত এই মেয়েটা যদি কারো কাছ থেকে ন্যূনতম মানবিক ব্যবহার পায়, তাঁর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে বা তাঁর সাথে পালায়, তাঁকে কি খুব দোষ দেওয়া যাবে? কি নিশ্চয়তা আছে যে এরকম মানসিক তোলপাড়ের মধ্যে সে কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে? তাঁর স্বামী কি ধরেই নিয়েছেন যে এক টুকরা কাগজে দুজনে সই করেছে বলে তিনি এবং তাঁর পরিবারের সবাই এই মেয়েটাই সাথে এমন অমানবিক আচরণ করতে পারবেন অথচ সে তাঁদের প্রতি অনুরক্ত থাকতে বাধ্য?!

এক বন্ধুকে একবার বলেছিলাম, ‘ভাই আপনি এতো ভালো মানুষ, এত গুরুত্বপূর্ণ একটা পজিশনে চাকরি করেন, অথচ একটা মেয়েকে নিয়ে আপনাকে ঘুরতে দেখেছে অনেকেই। আপনি তাঁকে বিয়ে করুণ বা বিয়ে পর্যন্ত অপেক্ষা করুণ। কিন্তু আপনি যা করছেন তা আপনিও জানেন অন্যায়। কিন্তু তাঁর চেয়েও বড় সমস্যা আপনার মতো একজন অসাধারণ মানুষ যখন এই কাজটা করছেন তখন অন্যদের আমরা আর কিছু বলতে পারছি না যাদের বলার প্রয়োজন’। উনি কিছুক্ষণ কিভাবে বুঝিয়ে বলবেন চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, ‘আমাদের বাড়িতে সব ভাইবোন পালিয়ে বিয়ে করেছে। কারণ আমাদের বাবা-মা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ এবং তাঁরা নানাধরণের বাহানা দিয়ে আমাদের সময়মতো বিয়ের ব্যবস্থা করেন না। আমি একটু আধটু ইসলাম বিষয়ে পড়াশোনা করেছি। তাতে লাভ হয়েছে এই যে আমি পালাইনি, বাবা-মায়ের সব আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছি, বাড়ি বানিয়ে দিয়েছি, বোনদের বিয়ে দিয়েছি, টাকা-পয়সা দিচ্ছি প্রতিমাসে। কিন্তু তাঁরা আমাকে বিয়ে করতে দিতে রাজি নন। যদি বিয়ের পর এভাবে ওদের জন্য খরচ করতে না পারি! আমার চল্লিশ হতে খুব একটা দেরি নেই। আর চল্লিশের পর আমার  আর বিয়ে করার প্রয়োজনই নেই। কিন্তু বাবা-মাকে কে বোঝাবে?  আমি এখন আমার ‘ভুলের মাসুল দিচ্ছি। দুনিয়াতেও গুনাহ কামাচ্ছি, আখেরাতেও এর প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।  

‘এ তো গেল বাবা-মায়ের কথা। যে মেয়ের আমাকে পছন্দ তাঁকে বললাম,  চল আমরা ছোটখাটো করে বিয়ে করে ফেলি। সে তখন বেঁকে বসল। কমপক্ষে দশভরি গহনা আর বড় অনুষ্ঠান না করলে সে বিয়েই করবে না। আপনি তো গোল্ডের দাম জানেন নিশ্চয়ই। বলেন তো আরো কত বছর চাকরি করলে আমার দশ ভরি গোল্ড কেনার সামর্থ্য হবে?’ ওনাকে বিচার করা আমার উদ্দেশ্য ছিলনা। তাই চুপ করে রইলাম।

ছোটবেলায় এক ভদ্রমহিলার কথা শুনেছিলাম যিনি বোনকে তালাক দিইয়ে বোনের স্বামীকে বিয়ে করেছিলেন। বাংলাদেশে ফেরার পর এক পরিবারের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। পরে জানতে পারলাম এই সেই পরিবার যার কথা আবুধাবীতে বসে শুনেছিলাম। একদিন ওনার বাবার সাথে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম বড় বোন স্বামীকে দিয়ে ছোটবোনের আনা নেওয়া থেকে শুরু করে সব কাজ করাতেন। অথচ হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে শালী-দুলাভাই বা দেবর-ভাবির সম্পর্কগুলো থেকে ততটাই সাবধনতা অবলম্বন করতে হবে যেভাবে আগুন থেকে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করা হয়। যেহেতু এক্ষেত্রে পর্দা বজায় রাখা অনেক কঠিন, এখানে সাবধানতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায় শ্যালিকা বা দেবরদের সাথে দুলাভাই ভাবিদের আজেবাজে দুষ্টুমি করতে, পাশে বসতে বা গায়ে হাত দিয়ে কথা বলতে! এই বিষয়ে কেউ কিছু বললে আমরা খুব রেগে যাই বা অপমানিত বোধ করি। আমরা মনে করি এই বিষয়ে এভাবে ভাবাটা নোংরা মানসিকতার পরিচায়ক। কিন্তু এই কথাটা আমাদের মাথায় খেলে না যে আমরা সবাই মানুষ, তাই কেউ মানবীয় দুর্বলতার উর্ধ্বে নই। আপনজনদের নিরাপত্তার জন্য এক্ষেত্রে আমাদের আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরন করাটাই শ্রেয়। কারণ সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন সৃষ্টবস্তুত গুণাগুণ সম্পর্কে।

বিয়ে কেবল একটা মৌখিক সম্মতি, এক টুকরো কাগজ, একটা সামাজিক অনুষ্ঠান—যতক্ষন না উভয় ব্যক্তি তাঁদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং এই সম্পর্ককে স্থায়ী করার জন্য বুঝে শুনে অগ্রসর হয়। নাটক সিনেমা দেখে আমাদের একটা ধারণা হয়ে যায় যে, বিয়ে হল সব সমস্যার শেষ আর সুখের শুরু। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। ব্যাপারটা এমনও নয় যে দেখতে ভালো হলে, সুন্দর জামাকাপড় গহনা মেকাপ পরে সেজেগুজে থাকলেই বিয়ে সুখের হয়। দু’জন মানুষ সম্পর্কে আলাদা দুই পরিবেশ, দুটো পৃথক পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে এসে ‘happily ever after’ টিকে যাওয়া এতটা সহজ নয়। এর জন্য দুজনকেই প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্ত চেষ্টা করতে হবে একে অপরকে বোঝার, পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধা ‘রুচি’ পছন্দ জানার এবং তাঁকে সম্মান করার। পরস্পরের পরিবারকে আপন করে নেওয়ার। দুজনকেই সাহায্য করতে হবে একে অপরকে আলাপ আলোচনা সহযোগিতা করে। সবচেয়ে বড় কথা প্রেম সম্পর্কে নাটক সিনেমার বানোয়াট ধারণা ঝেড়ে ফেলে বুঝতে হবে সবার আগে এটা একটা খুব ভালো বন্ধুত্ব—যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সম্প্রীতি আর সম্মানের মজবুত ভিত্তির ওপর, যা পাকা চুল আর ঝুলে পড়া চামড়ার পরিবর্তিত হয়ে যায় না।

লেখিকাঃ রেহনুমা বিনতে আনিস।

বইঃ বিয়ে।

আপনার গল্প কবিতা ও মতামত প্রকাশ করুণ |
আপনার লেখিত কোন গল্প-কবিতা আছে? থাকলে এখই আমার বাংলা পোস্ট.কমে প্রকাশ করুণ। আমরা আপনার লেখিত সামগ্রী হাজারো লোকের কাছে পৌঁছে দিবো। আপনার গল্প-কবিতা প্রকাশ করতে এখনই আমার বাংলা পোস্ট এ একটি একাউন্ট খুলুন অথবা আমাদেরকে মেইল করে পাঠিয়ে দিন। মেইল : Amarbanglapost@gmail.com মেইল আইডি না থাকলে ইমো’র মাধ্যমেও পাঠাতে পারেন। ইমো : 01741757725

About Syed Rubel

Creative Writer/Editor And CEO At Amar Bangla Post. most populer bloger of bangladesh. Amar Bangla Post bangla blog site was created in 2014 and Start social blogging.

Check Also

চলন্ত বাসে ধর্ষণ

চলন্ত বাসর (চলন্ত বাসে ধর্ষিত হওয়া থেকে যেভাবে রক্ষা পেলো তরুণী)

রাত ৮:৩০ গলফ ক্লাবের সামনে থেকে মিরপুরের উদ্দেশ্যে বাসে উঠলাম আমরা তিন বন্ধু।আঃ রহমান, সাজিদ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *