Home / স্বাস্থ্য / স্বাস্থ্য সমস্যা / ডায়াবেটিস থেকে কিডনি অকেজো।

ডায়াবেটিস থেকে কিডনি অকেজো।

শামিম আরা টলি। ৭৩-৭৫ সালের ট্র্যাকের দুর্দান্ত দ্রুততম মানবী। আজ ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে দুইটি কিডনি হারিয়েন। পৃথিবীর আলো দেখার জন্য এখন তার সপ্তাহে ৩ বার ডায়ালাইসিস করতে হয়। শামিম আরা টলি প্রথমে বুঝতেই পারেননি তার কিডনি আক্রান্ত হয়েছে। আর যখন বুঝতে পেরেছেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাই ট্র্যাক বিজয়ী টলি আজ ডায়াবেটিস থেকে কিডনি ফেইল্যুর-এর কাছে পরাস্ত।

ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগ, ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি কি, কিভাবে  এটি প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয় করা যায় বা কি উপায়ে এ ঘাতক ব্যাধির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তা নিয়ে আকজের আলোচনা।

প্রথমেই বলে নিচ্ছি যে, আমাদের দেহে দুইটি কিডনি আছে। প্রতিটি কিডনিতে প্রায় বার লক্ষ (ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্তনালীর তৈরি) ছাকনি থাকে যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্তনালীর সমম্বয়ে তৈরী। এই ছাকনি আমাদের দেহের সমস্ত বিষাক্কত পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি প্রস্রাব আকারে বের করে দেয় এবং প্রয়োজনীয় পদার্থ রক্তে ধরে রাখে। কোন কারণে এই ছাকনি বিকল হলে দুষিত পদার্থ রক্তে জমতে থাকে এবং রক্তের প্রয়োজনীয় উপাদান প্রস্রাবে চলে যায়। এই দূষিত বা বিষাক্ত পদার্থ রোগীকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দ্বারে নিয়ে যায়। এ অবস্থাকেই বলে কিডনি ফেইল্যুর।

ডায়াবেটিস থেকে কিডনি কিভাবে আক্রান্ত হয় রক্তে উচ্চ মাত্রায় শর্করা বা সুগার ধীরে ধীরে কিডনির ২৪ লক্ষ ছাকনি নষ্ট করে দেয়। প্রাথমিক  পর্যায়ে প্রস্রাবের সাথে অল্প মাত্রায় অ্যালবুমিনযায়। যা ৩০ থেকে ৩০০ মিলিগ্রাম প্রতি ২৪ ঘন্টায়। প্রস্রাবে নির্গত এই অল্প পরিমাণ অ্যালবুমিনকে বলা হয় মাইক্রোঅ্যালবুমিন (microalbumin) । যা সাধারণতঃ ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় মাধ্যমে নির্ণয় করা যায় না। এটি বিশেষ মেশিনের সাহায্যে নির্ণয় করতে হয়। মাইক্রোঅ্যালবুমিনিউরিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ডায়াবেটিস আছে তাদের মধ্য থেকে ৩০-৪০ ভাগ লোকের কিডনি ফেইল্যুর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনিয়ন্ত্রিত রক্তের গ্লুকোজ, উচ্চ রক্ত চাপ ও বংশগত কারণ ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথির প্রধান কারণ। এ ছাড়াও ডায়াবেটিস জনিত স্নায়ু রোগের কারনে প্রস্রাবে সমস্যা এ ঘন ঘন ইনফেকশনের কারনে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।

ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথির লক্ষণ ও উপসর্গ সমূহঃ প্রাথমিক অবস্থায় নেফ্রোপ্যাথিতে আক্রান্ত হওয়ার পরও এর কোন উপসর্গ লক্ষ্য করা যায় না। তবে যখন উপসর্গ দেখা যায়, ততদিনে কিডনি অনেকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নেফ্রোপ্যাথিরপ্রধান উপসর্গ – পায়ে পানি এসে পা ফুলে যাওয়া এবং উচ্চ রক্তচাপ। এ সময় পরীক্ষা করলে শতকরা নব্ববইভাগ ক্ষেত্রে চোখের জটিলতা ও স্নায়ুর জটিলতা লক্ষ্য করা যায়। সাধারণতঃ ডায়াবেটিস হওয়ার ৫-১৫ বৎসর এর মধ্যেই এ ধরণের জটিলতা দেখা যায়। প্রস্রাবে প্রচুর অ্যালবুমিন যায় ও রক্তে অ্যালবুমিন কমে আসে। এ পর্যায়ে চিকিৎসায় খুব ভাল ফল না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই এমন পর্যায়ে  নেফ্রোপ্যাথি নির্ণয়ের চেষ্টা করা উচিৎ , যখন চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিরাময় সম্ভব। এ জন্যে প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগীর প্রস্রাবে “মাইক্রোঅ্যাবুমিন” যায় কিনা তা দেখতে হবে।  প্রতি বছর অন্ততঃ দুইবার প্রস্রাবের “মাইক্রোঅ্যাবুমিন” দেখা প্রয়োজন। কোন কিডনি রোগীর প্রস্রাবে প্রতি লিটারে ২০ মিলিগ্রামের বেশি অ্যালবুমিন গেলেই বুঝতে হবে তার কিডনি আক্রান্ত হয়েছে। এই “মাইক্রোঅ্যাবুমিন” হল প্রাথমিক পর্যায়ে ডায়বেটিসজনিত কারণে কিডনি আক্রান্ত অশনি সংকেত। তবে আনন্দের খবর হলো   -এই পর্যায়ে উপযুক্ত চিকিৎসা প্রদান করলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসার মাধ্যমে নেফ্রোপ্যাথি  নিরাময় করা সম্ভবন।

বিলম্বিত নেফ্রোপ্যাথির লক্ষণ ও উপসর্গ সমূহ (symptoms of late diabetic nephropathy) প্রাথমিক পর্যায়ে যুদি ডায়াবেটিস জনিত কিডনি রোগ নির্ণয় করা হয়, যদি রক্তের সুগার ও রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত থাকে তবে ক্রমাম্বয়ে কিডনি ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে, ধীরে ধীরে কিডনির কার্যকারিতা লোপ পেতে থাকে।

নিম্নলেখিত উপসর্গ সমূহ ক্রমান্বয়ে দেখা দেয়ঃ  প্রস্রাবে অতিরিক্ত অ্যালবুমিন/ প্রোটিন, উচ্চ রক্তচাপ, গোড়ালী ও পা ফুলা, রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, রক্তে ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন বেড়ে যাওয়া, ইনসুলিন-এর প্রয়োজন কমে যাওয়া, ক্ষুধা মন্দা, বমি বমি ভা, দুর্বল হয়ে যাওয়া ও রক্ত শূন্যতা দেখা দেয়া, বিনা কারণে গা চুলকান।

এ পর্যায়ে চিকিৎসার মাধ্যমে কিডনি রোগ নিরাময় করা সম্ভব নয়, তবে উপযুক্ত চিকিৎসার দ্বারা ফেইল্যুর বিলম্বিত করা যেতে পারে।

ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি নির্ণয়ের জন্য কি কি পরীক্ষা করা দরকার-প্রস্রাব ও রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ডায়াবেটিক নির্ণয় করা হয়।

প্রস্রাব- মাইক্রো অ্যালবুমিন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি বিলম্বিত নেফ্রোপ্যাথি (Late nephropathy) হয় তবে ২৪ ঘন্টার প্রস্রাবে প্রোটিনের পরিমাণ দেখতে হবে।

রক্ত- গ্লুকোচ, ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন, অ্যালবুমিন ও Hbaic

চিকিৎসা ও প্রতিরোধঃ  ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথির চিকিৎসা নির্ভর করে ডায়াবেটিস দ্বারা কিডনি কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার উপর। ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি ঠেকানোর প্রধান শর্ত রোগীর ডায়াবেটিস পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা। এ ক্ষেত্রে ট্যাবলেট –এর পরিবর্তে ইনসুলিন দ্বারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা শ্রেয়। মনে রাখা অত্যন্ত জরুরী তা হল- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও প্রস্রাবে আমিষ নির্গত হওয়ার পরিমাণ কমানোর ব্যবস্থা করতে পারলে নেফ্রোপ্যাথি হওয়া সত্তেও কিডনি ফেইল্যুর হবার প্রবণতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এই ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ কমানোর জন্য BDFA ড্রাগ যেমনঃ ক্যাপটোপ্রিল বা এনালাপ্রিল গ্রুপের ওষুধ কে প্রাধান্য দেয়া হয়। এ ওষুধ কে মাইক্রোঅ্যাবুনেমিয়া কমিয়ে নেফ্রোপ্যাথি নিরাময় করতে পারে। যাদের রক্তচাপ স্বাভাবিক তাদের মাইক্রো অ্যালবুমিন নিরাময়ের acei প্রয়োগ করে নিরাময় করা যায়।

তাছাড়া খাবার তালিকায় আমিষের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং যাদের শরীরে পানি এসে গেছে তাদের স্বল্প পরিমাণে পানি পান ও লবণ পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, “সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়” অর্থাৎ প্রাথমিক অবস্থায় ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি নির্ণয় ও তার চিকিৎসা ডায়াবেটিস জনিত কিডনি ফেইল্যুর প্রতিরোধের পূর্বশর্ত। 

About Syed Rubel

Creative Writer/Editor And CEO At Amar Bangla Post. most populer bloger of bangladesh. Amar Bangla Post bangla blog site was created in 2014 and Start social blogging.

Check Also

মালয়েশিয়া প্রবাসিদের জন্য সু-খবর

মালয়েশিয়ার বসবাসরত প্রবাসী ভাই-বোনদের জন্যে সুখবর। কলকাতার স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত ন্যাচারাল মেডিসিন ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: