Home / ইসলাম / শিক্ষামূলক গল্প / দুধের পেয়ালা (আবু হুরায়রার (রাঃ) গল্প)
দুধের গল্প

দুধের পেয়ালা (আবু হুরায়রার (রাঃ) গল্প)

মানুষ চলাচলের পথ। সে পথ দিয়ে সবই আসা-যাওয়া করে। পথে কেউ বসে  থাকে না। পথ বসে থাকার জায়গা নয়। বসে বিশ্রাম করার জন্য সবাই একটু জায়গা খুঁজছে।

কিন্তু আবু হুরায়রা (রাঃ)  একদিন পথেই বসে পড়লেন।  পথে তো তাঁর কেউ সখ করে বসে না। তিনিও সখ করে বসেননি।

এ পথ দিয়ে চলাফেরা করেন সাহাবীগণ। এ পথে চলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

হযরত আবু হুরায়রা পরিচিত সবার চলাচলের এই পথেই বসলেন। বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কয়েক বেলা খেতে না পেয়ে ক্ষুধায় কাতর হয়ে গেছেন  তিনি। কাউকে কিছু বলতে পারছেন না।  পথে বসে অপেক্ষা করছেন, যদি কেউ তাঁকে দেখে তাঁর অবস্থাটা বুঝে নেয়; তাহলেই হয়ে যায়। যিনি বুঝবেন তিনি নিশ্চয়ই আবু হুরায়রাকে নিজের বাড়ীতে ডেকে নিয়ে যাবেন। এক বেলা খাবারের ব্যবস্থাতো হয়ে যাবে!

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ)  একজন বিশিষ্ট সাহাবী। কিন্তু এক সময় তাঁর অবস্থা এমন কেটেছে। ক্ষুধায় ক্ষুধায় পাগলের মত হয়ে যেতেন। খেতে না পেয়ে পেয়ে মাটিতে গড়া গড়ি খেতেন। কিন্তু মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতেন না। সবাই ভাবতেন আবু হুরায়রার অসুখ করেছে। সেদিনও ক্ষুধার জ্বালায় আবু হুরায়রা পথে বসে পড়েছিলেন।

আবু হুরায়রা বসে আছেন তো বসেই আছেন। অনেকক্ষণ যাবত সে পথ দিয়ে কেউ আসছে না। হঠাৎ দেখা গেল  আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) আসছেন। আবু হুরায়রা ভিতরে ভিতরে খুশী হয়ে উঠলেন।  আবু বকর তাঁর দিকে ভালোভাবে নজর দিলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন।

আবু বকর সামনে আসতেই আবু হুরায়রা সালাম দিলেন। আবু বকর সালামের জবাব দিলেন। দু’জনের মাঝে সামান্য কয়েকটি কথাবার্তাও হলো। কিন্তু আবু বকর কিছু বুঝতেই পারলেন না। পথ ধরে এগিয়ে গেলেন।

এমনিতেই ক্ষুধায় কাতর। এবার আরো দমে গেলেন আবু হুরায়রা (রাঃ)। কিছুক্ষণ পরেই এ পথে এগিয়ে এলেন হযরত ওমর (রাঃ)। আবু হুরায়রা আবারো উৎসাহী হয়ে উঠলেন। দু’জনের সালাম বিনিময় হলো। টুক টাক কথাবার্তা হলো। ওমর আর দেরি করলেন না। তিনিও চলে গেলেন।

ক্ষুধার্ত আবু হুরায়রা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে গেলেন। ক্ষুধার জ্বালা তিনি কাউকে বুঝাতেই পারছেন না। ক্ষুধার কষ্ট একদিন দু’দিন কিছুই না খেয়ে কষ্ট তাঁর সহ্য হয়ে গেছে। মসজিদে নববীর একপাশে কাত হয়ে রাত পার করে দেন।  সারাটা বেলা রাসূলে করীম (সাঃ)-এর পিছু পিছু ঘুরেন। নবীজীর মুখ থেকে যখন যা শুনেন তা মুখস্ত করে ফেলেন।

জীবিকার সন্ধানে ঘুরার সুযোগই তিনি পাননা। হযরত ওমর চলে যাবার পর আবু হুরায়রা কিছুটা হতাশই হয়ে পড়েছিলেন। তারপরও অপেক্ষা করতে লাগলেন।

শেষ পর্যন্ত এ পথ ধরে এগিয়ে এলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)। আবু হুরায়রা বুক বেঁধে বসে রইলেন। রাসূলুল্লাহ কাছাকাছি আসতেই আবু হুরায়রা সালাম দিলেন। রাসুলূল্লাহ (সাঃ) সালামের জবাব দিলেন। তারপর পথে বসে থাকা আবু হুরায়রার মুখের দিকে গভীর চোখে তাকালেন।

মা যেমন সন্তানের মুখের দিকে তাকালেই সন্তানের কষ্ট বুঝে নিতে পারেন, রাসূলুল্লাহও তেমনি বুঝে নিলেন আবু হুরায়রার কষ্ট।

আবু হুরায়রার দিকে তাকিয়ে তিনি স্মিত হাসলেন।  অভয়ের হাসি। আশ্বাসের হাসি। এরপর বললেন-আবু হুরায়রা! উঠো, আমার সাথে চলো।

ক্ষুধার্ত আবু হুরায়রার পেট খাদ্যের অভাবে খালী হয়ে আছে; কিন্তু তাঁর বুক আনন্দে ভরাট হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহর একটি স্মিত হাসি যেন তাঁর কষ্টের কালি ধুয়ে সাফ করে দিয়েছে।

আবু হুরায়রা নবীজীর সাথে বাড়িতে এলেন। ভিতর থেকে এক পেয়ালা দুধ নবীজীর সামনে হাজির করা হলো। নবীজী আবু হুরায়রাকে তাঁর সব সঙ্গী-সাথীদের ডেকে আনতে বললেন।

মসজিদে নববীর পাশে হযরত আবু হুরায়রার মত আরো প্রায় সত্তরজন সাহাবী থাকতেন। এদের সবারই পরিচয় হলো আছহাবে ছুফফা। আবু হুরায়রা বড় বিষণ্ন মনে সবাইকে ডাকতে গেলেন।

এক পেয়ালা দুধ। পেট ভরে পান করতে চাইলো তো একজনেরই হবে না। সেই দুধ পান করবে সত্তর-বাহাত্তজন! কী অবস্থা যে হবে! ভাবতে ভাবতে আবু হুরায়রা অস্থির হয়ে উঠেছেন।

আবু হুরায়রা সবাইকে ডেকে নিয়ে এলেন। সবাইকে একসঙ্গে বসানো হলো। সবাইকে এবার দুধের পেয়ালা এগিয়ে দিতে হবে আবু হুরায়রাকেই। আবু হুরায়রা এক রকম নিশ্চিত হয়ে গেলেন। তাঁর আশায় গুড়েবালি পড়ে গেছে। আজকে তাঁর কোন হিল্লে হবে না। তাঁকে দুধ পান না করেই থাকতে হবে। কিন্তু কিছুই করার নেই। রাসূলুল্লাহর হুকুম।

আবু হুরায়রা একজন করে প্রত্যেকের সামনে পেয়ালা এগিয়ে দিলেন। সবাই পেয়ালায় চুমুক দিয়ে দুধ পান করলেন। সবাই জানালেন, তাঁরা তৃপ্তি হয়ে দুধ পান করেছেন। আবু হুরায়রা তাজ্জব বনে গেলেন। এটা কী করে সম্ভব হচ্ছে!

সবাইকে দুধ পান করানো শেষ হলে আবু হুরায়রা পেয়ালাটি নবীজীর হাতে তুলে দিলেন।

এবার নবীজি  আবু হুরায়রার মুখের দিকে আবারো গভীরভাবে তাকালেন এবং মৃদ হাসলেন। তারপর ব্ললেন-আবু হুরায়রা, এখন শুধু তোমার আর  আমার পালা।

সঙ্গে সঙ্গে মরিয়া হয়ে আবু হুরায়রা বললেন—নিঃসন্দেহে হুজুর! আপনি আর আমি বাকি রয়ে গেছি।

মৃদ হেসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পেয়ালাটি আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর হাতে তুলে দিলেন। আবু হুরায়রা আর দেরি করলেন না। পেয়ালায় চুমুক দিলেন। দীর্ঘ চুমুক। কিন্তু দুধ শেষ হলো না!

তিনি মুখ তুললেন।  নবীজি বললেন-আবারো পান করো।

আবু হুরায়রা আবারো পেয়ালায় মুখ রাখলেন এবং দুধ পান করলেন।

এরপর আবারো দুধ পানের নির্দেশ হলো। কিন্তু ক্ষুধার্ত আবু হুরায়রা এবার এতটাই তৃপ্তি হয়ে গেলেন যে, আর সামান্য দুধ পান করত্বেও অপারগ হয়ে গেলেন।

এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দুধ পান করলেন। পেয়ালার  দুধ ফুরিয়ে গেলো।

এক পেয়ালা দুধ ক্ষুধার্ত আবু হুরায়রার ক্ষুধা মিটালো। ক্ষুধা মিটালো আরো সত্তরজন আছহাবে ছুফফার। সেই দুধ শেষ পর্যন্ত স্বয়ং নবীজিও পান করলেন।

ক্ষুধায় ক্ষুধায় অসুস্থ হয়ে যাওয়া মানুষ, মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া মানুষ হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) এই বিস্ময়কর ঘটনাটি দেখে বড় তৃপ্তিবোধ করলেন।

আপনি পড়ছেনঃ  সাহাবা কেরামের  গল্প বই থেকে।

About Syed Rubel

Creative Writer/Editor And CEO At Amar Bangla Post. most populer bloger of bangladesh. Amar Bangla Post bangla blog site was created in 2014 and Start social blogging.

Check Also

উমর (রাঃ) অনুতাপ

হযরত উমর (রাঃ) এর অনুতাপ। (গল্প)

সারাক্ষণ তিনি ব্যস্ত থাকেন।  তিনি ব্যস্ত থাকেন সাধারণ মানুষের জন্য।  দেশের জন্য। জাতির জন্য। নিজের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *