যে কোন যৌন বা স্বাস্থ্য সমস্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ডা.মনিরুজ্জামান এম.ডি স্যার। কল করুন- 01707-330660

বর্ণনা:Islam-Greenরাসূল সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ, অনুসরণ ও সামঞ্জস্য বিধান করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। কাফিরদের অনুকরণ, অনুসরণ ও তাদের সামঞ্জস্য বিধান করার বিষয়টি নিঃসন্দেহে মারাত্মক বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়, যা ইসলাম সীমাহীন গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে বহু হাদীসে এবং বিভিন্ন সময় ও সুযোগে কাফিরদের অনুকরণ করার ব্যাপারে কখনও সার্বিকভাবে আবার কখনও কখনও সবিস্তারে সতর্ক করে দিয়েছেন। অথচ এ উম্মতের মধ্য থেকে কতিপয় দল ও গোষ্ঠী এ অনুসরণ-অনুকরণ করার কাজে জড়িত হয়ে পড়েছে, যদিও তাদের তাতে জড়িত হওয়ার পর্যায় ভিন্ন ভিন্ন স্তরের। আলোচ্য বইটিতে এ সম্পর্কেই আলোকপাত করা হয়েছে।

লেখক : নাসের ইবন আব্দুল করীম আল-আকল

অনুবাদ: মো: আমিনুল ইসলাম

সম্পাদনা: আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

উৎস: ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ


 

download-pdf


সূচিপত্র

ক্রম বিষয় পৃষ্ঠা
1. ভূমিকা  
2. প্রথম বিষয়: ‘তাশাব্বুহ’ এর পরিচয় প্রসঙ্গে।  
3. দ্বিতীয় বিষয়: কেন আমাদেরকে কাফিরদের অনুকরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে?  
4. তৃতীয় বিষয়: কিছু মূলনীতির প্রতি ইঙ্গিত।  
5. চতুর্থ বিষয়: যেসব বিষয়ে কাফিরগণ ও অন্যান্যদের অনুকরণ করার ব্যাপারে ব্যাপক ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।  
6. পঞ্চম বিষয়:التشبه (অনুকরণ) এর বিধানাবলী প্রসঙ্গে।  
7. ষষ্ঠ বিষয়: যেসব ব্যক্তির অনুকরণ করতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, সেসব শ্রেণির লোকজন প্রসঙ্গে।  
8. প্রথম শ্রেণি: সকল কাফির  
9. দ্বিতীয় শ্রেণি: মুশরিকগণ  
10. তৃতীয় শ্রেণি: আহলে কিতাব  
11. চতুর্থ শ্রেণি: অগ্নিপূজক  
12. পঞ্চম শ্রেণি: পারস্য ও রোম  
13. ষষ্ঠ শ্রেণি: বিদেশী (অনারবী) অমুসলিমগণ  
14. সপ্তম শ্রেণি: জাহেলিয়াত ও তার অনুসারীগণ  
15. অষ্টম শ্রেণি: শয়তান  
16. নবম শ্রেণি: বেদুইন বা যাযাবর শ্রেণি যাদের দীন পূর্ণ হয় নি  
17. সপ্তম বিষয়: মুসলিমগণ কর্তৃক কাফিরগণকে অনুসরণ করার কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে  
18. প্রথম কারণ: ইসলাম ও মুসলিমগণের বিরুদ্ধে কাফিরেদর ষড়যন্ত্র  
19. দ্বিতীয় কারণ: মুসলিমগণের অংশবিশেষের অজ্ঞতা এবং দীন সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞানের অভাব  
20. তৃতীয় কারণ: মুসলিমগণের বস্তুগত, অভ্যন্তরীণ ও সামরিক দুর্বলতা  
21. চতুর্থ কারণ: মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র  
22. অষ্টম বিষয়: কাফিরদের অনুকরণ করার বিষয়ে যে ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তার কতিপয় নমুনা।  
23. প্রথমত: ধর্মের ক্ষেত্রে বিভিন্নতা।  
24. দ্বিতীয়ত: কবর উঁচু করা ও তার ওপর স্মৃতিসৌধ বানানো।  
25. তৃতীয়ত: নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া।  
26. চতুর্থত: শুভ্র কেশে রং ব্যবহার না করা।  
27. পঞ্চমত: দাড়ি মুণ্ডন করা ও গোঁফ কামিয়ে ফেলা।  
28. ষষ্ঠত: জুতা পরিধান করে সালাত আদায় না করা।  
29. সপ্তমত: নির্ধারিত দণ্ডবিধি প্রয়োগে পার্থক্য সৃষ্টি করা।  
30. অষ্টমত: সালাতের মধ্যে ‘সাদল’ বা কাপর ঝুলিয়ে রাখা।  
31. নবমত: নারী কর্তৃক সৌন্দর্য প্রদর্শন ও বেপর্দা।  
32. দশমত: সালাতের মধ্যে কোমরে হাত রাখা।  
33. একাদশতম: উৎসব, অনুষ্ঠান ও পর্বসমূহ।  
34. দ্বাদশতম: সাহরী না খাওয়া।  
35. ত্রয়োদশতম: ইফতারকে বিলম্বিত করা।  
36. চতুর্দশতম: ঋতুবর্তী নারীদেরকে বয়কট করা।  
37. পঞ্চদশতম: সূর্য উদয় এবং অস্তের সময় সালাত আদায় করা।  
38. ষোড়শতম: কোনো ব্যক্তিকে সম্মান করার উদ্দেশ্যে দাঁড়ানো।  
39. সপ্তদশতম: বিলাপ করার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির ওপর শোক প্রকাশ করা।  
40. অষ্টাদশতম: বংশ মর্যাদা নিয়ে গর্ব করা।  
41. ঊনবিংশতম: স্বজাতিপ্রীতি অথবা স্বদলপ্রীতি অথবা স্বদেশপ্রীতি।  
42. বিংশতম: মহররম মাসের দশম দিন দিনে শুধু একটি সাওম পালন করা।  
43. একবিংশতম: নারীদের পক্ষে পরচুলা লাগানো।  
44. দ্বাবিংশতম: হৃদয়ের কঠোরতা।  
45. ত্রয়োবিংশতম: বৈরাগ্যবাদ ও দীনের ব্যাপারে কঠোরতা।  
46. সারকথা  
47. উপসংহার  

 

ভূমিকা

بسماللهالرحمنالرحيم

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর নিকট সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর নিকট তাওবা করি, আর আমাদের নফসের জন্য ক্ষতিকর এমন সকল খারাপি এবং আমাদের সকল প্রকার মন্দ আমল থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই।আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই আর যাকে তিনি পথহারা করেন, তাকে পথ প্রদর্শনকারীও কেউ নেই।আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ব ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই, যিনি তাঁর সম্মানিত কিতাবে বলেছেন:

﴿وَلَنتَرۡضَىٰعَنكَٱلۡيَهُودُوَلَاٱلنَّصَٰرَىٰحَتَّىٰتَتَّبِعَمِلَّتَهُمۡۗ﴾ [البقرة: ١٢٠]

“আর ইয়াহূদী ও নাসারারা আপনার প্রতি কখনো সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না আপনি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ করেন”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১২০]

আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, যিনি বলেছেন:

«لتتبعنسننمنكان قبلكمشبرابشبروذراعابذراعحتىلودخلواجُحرَضبلتبعتموهم,قلنا :يارسولاللهاليهودوالنصارى؟قال :فمن؟».

“তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি পুরোপুরি অনুসরণ করবে, প্রতি বিঘতে বিঘতে এবং প্রতি গজে গজে। এমনকি তারা যদি ষাণ্ডার গর্তেও প্রবেশ করে থাকে, তবে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি ইয়াহূদী ও নাসারাদের কথা বলেছেন? জবাবে তিনি বললেন: তবে আর কার কথা বলছি”?[1]

যিনি আরও বলেছেন:

«منتشبهبقومفهومنهم».

“যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ, অনুসরণ ও সামঞ্জস্য বিধান করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে”।[2]

অতঃপর…….

হে সম্মানিত ভাইসব! কাফিরদের অনুকরণ, অনুসরণ ও তাদের সামঞ্জস্য বিধান করার বিষয়টি নিঃসন্দেহে মারাত্মক বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়, যা ইসলাম সীমাহীন গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি তার আমানত যথাযথভাবে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, রিসালাতের দায়িত্ব পূর্ণভাবে আদায় করেছেন এবং উম্মতের কল্যাণ কামনা করেছেন, তিনি উম্মতকে বহু হাদীসে এবং বিভিন্ন সময় ও সুযোগে কাফিরদের অনুকরণ করার ব্যাপারে কখনও সার্বিকভাবে আবার কখনও কখনও সবিস্তারে সতর্ক করে দিয়েছেন। অথচ এ উম্মতের মধ্য থেকে কতিপয় দল ও গোষ্ঠী এ অনুসরণ-অনুকরণ করার কাজে জড়িত হয়ে পড়েছে, যদিও তাদের তাতে জড়িত হওয়ার পর্যায় ভিন্ন ভিন্ন স্তরের। আবার সময়ে সময়ে এ কাজের ভয়াবহতাও ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের, তবে সম্ভবত আমার পক্ষ থেকে বাড়িয়ে বলা হবে না যদি এটা বলি যে, এ যুগের মুসলিমগণ যে হারে কাফিরদের অনুসরণ-অনুকরণ করছে, তা অতীতের যে কোনো সময়ে (উম্মত কর্তৃক কাফিরদের) অনুসরণ-অনুকরণ করার চেয়ে অত্যধিক ভয়ঙ্কর পর্যায়ের।

এ বিষয়টির ভয়াবহতা সত্ত্বেও আমি দেখছি গুণীজন ও জ্ঞানী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে খুব কমই গুরুত্ব দিতে। তাই আমি মনে করি যে, মুসলিমগণের জন্য এখন তার বর্ণনা করাটা অতীব জরুরি, যা জ্ঞান অনুসন্ধানকারী ব্যক্তিবর্গের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।

এটাই বলতে চেয়েছি, অচিরেই আমি কাফিরদের অনুকরণ করার বিষয়টির কয়েকটি দিক আলোচনায় আনব। কারণ, বিষয়টি বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত ও প্রলম্বিত; কিন্তু আমাদের জন্য জরুরি হচ্ছে এ বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু অতীব প্রয়োজনীয় মূলনীতি ও জরুরি নিয়ম-কানূন অনুধাবন করা, যার জ্ঞান রাখা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর কর্তব্য, যাতে সে আকীদা-বিশ্বাস অথবা ইবাদত অথবা আচার-আচরণ অথবা রীতি-নীতির ক্ষেত্রে কাফিরদের অনুসরণ-অনুকরণে লিপ্ত হওয়া থেকে সাবধান হতে পারে। সম্ভবত আমি সময়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে সামান্য কিছু বিষয়ের মধ্যেই আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব।[3]

প্রথম বিষয়

‘তাশাব্বুহ’ (অনুসরণ-অনুকরণ) বলতে যা বুঝায়

‘তাশাব্বুহ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ:

‘তাশাব্বুহ’শব্দটি ‘মুশাবাহাহ’ শব্দ থেকে গৃহীত।তার অর্থ হলো: ‘মুমাসালাহ’ বা সাদৃশ্য গ্রহণ, মিল করা; অনুরূপ অপর অর্থ ‘মুহাকাত’ বা অনুকরণ করা, নকল করা; তদ্রূপ অন্য অর্থ হচ্ছে, তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণ করা।

আর ‘তাশবীহ’ মানে হলো: তামসীল বা দৃষ্টান্ত স্থাপন, সাদৃশ্য নির্ধারণ।

পক্ষান্তরে ‘মুতাশাবিহাত’ মানে হলো: ‘মুতামাসিলাত’ বা সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়াদি। যেমন, বলা হয়,

أشبه فلان فلانا أي ماثله وحاكاه وقلده

“অমুক ব্যক্তি অমুক ব্যক্তির মতো হয়েছে, অর্থাৎ সে তার সাদৃশ্য গ্রহণ করেছে, তার অনুকরণ করেছে এবং সে তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেছে।

‘তাশাব্বুহ’ শব্দের পারিভাষিক অর্থ:

পরিভাষায় যে ‘তাশাব্বুহ’ তথা অনুসরণ-অনুকরণ করা নিষিদ্ধ করে কুরআন ও সুন্নায় বক্তব্য এসেছে, তা হলো: যে কোনো প্রকার কাফিরদের আকীদা-বিশ্বাস, তাদের পূজা-পার্বন, তাদের রীতি-নীতি, তাদের আচার-আচরণের অনুরূপ কাজ করা, যা একান্তভাবেই তাদের বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত বলে স্বীকৃত।

অনুরূপভাবে অসৎ ব্যক্তিদের অনুকরণ করা, যদিও তারা মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হোক না কেন। যেমন, ফাসিক (পাপচারী), জাহিল (অজ্ঞ) ও বেদুইন বা যাযাবরগণ, যাদের দীন পরিপূর্ণ হয় নি, যেমন খুব শীঘ্রই তার বিবরণ আসছে।

অতএব, আমরা মোটামুটিভাবে সংক্ষেপে বলতে পারি, যা কাফিরদের বৈশিষ্ট্য, আকীদা-বিশ্বাস, আচার-আচরণ ও পূজা-পার্বনসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং যা শরী‘আতের বক্তব্য বা মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক নয় আর তার ওপর ভিত্তি করে কোনো গোলযোগেরও উদ্ভব হয় না, তা ‘তাশাব্বুহ’ বা ‘অনুসরণ-অনুকরণ’ এর অন্তর্ভুক্ত হবে না আর এটাই হলো সংক্ষিপ্ত মূলনীতি।

********

দ্বিতীয় বিষয়

কেন আমাদেরকে কাফিরদের অনুকরণ-অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে?

শুরুতেই আমাদেরকে ইসলামের মূলনীতি সম্পর্কে বুঝতে হবে- নিশ্চয় দীনের মূলভিত্তি হলো ‘কায়মনোবাক্যে মেনে নেওয়া’। আল্লাহ তা‘আলার নিকট জন্য সবকিছু মেনে নেওয়া এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরসবকিছু মেনে নেওয়া।

আর ‘মেনে নেওয়া’ এর অর্থ: আল্লাহ তা‘আলার কর্তৃক প্রদত্ত সংবাদকে সত্য বলে স্বীকার করা, তাঁর নির্দেশ মেনে নেওয়া এবং তাঁর নিষেধকৃত বস্তু পরিত্যাগ করা। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রদত্ত সংবাদকে সত্য বলে স্বীকার করা, তাঁর নির্দেশ মেনে নেওয়া, তাঁর নিষেধ করা বস্তু বা বিষয় থেকে দূরে থাকা এবং তাঁর আদর্শ মেনে চলা।

সুতরাং যখন আমরা এ মূলনীতি সম্পর্কে জানতে পারব, তখন প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির জন্য উচিৎ হবে:

প্রথমত: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে যা কিছু এসেছে, তার সবকিছুকে মেনে নেওয়া।

দ্বিতীয়ত: তাঁর আনুগত্য করা এবং কাফিরদের সামঞ্জস্য বিধান করার ব্যাপারে তাঁর পক্ষ থেকে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তা মান্য করা।

তৃতীয়ত: আল্লাহর বাণী ও তাঁর শরী‘আতের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ, সেগুলোর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন এবং সেগুলোকে মেনে নেওয়ার পর তার জন্য (শরী‘আতের বিধি-বিধানের) কারণসমূহ অনুসন্ধান করতে কোনো বাধা নেই।

তাই আমরা বলতে পারি যে, কাফিরদের অনুসরণ-অনুকরণ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার কারণসমূহ অনেক; যার অধিকাংশই সুস্থ বিবেক ও সঠিক স্বভাব-প্রকৃতিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ খুব সহজে বুঝতে পারেন।

প্রথমত: কাফিরদের কর্মসমূহের ভিত্তিই হচ্ছে ভ্রষ্টতা ও ফাসাদের ওপর, বিষয়ের ওপর। এটাই হচ্ছে কাফিরদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে মূলনীতি। চাই সেসব কর্ম তোমাকে মুগ্ধ করুক অথবা নাই করুক; সেগুলো ফেতনা-ফাসাদপূর্ণ হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্য হউক বা অপ্রকাশ্য হউক; কারণ, কাফিরদের আকীদা-বিশ্বাস, আচার-আচরণ, পূজা-পার্বন, উৎসব ও রীতিনীতিসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের কর্মসমূহ হয়ে থাকে ভ্রষ্টতা, বিকৃতি ও অন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে। তাদের দ্বারা যে সব সৎকর্ম হয়ে থাকে তা হচ্ছে ব্যতিক্রম। সুতরাং যখন তাদের মাঝে কোনো সৎকর্ম দেখতে পাবে, তখন তোমাদের জানা থাকা উচিত যে, এগুলো এমন কর্মের অন্তর্ভুক্ত যার ব্যাপারে তাদের কাউকে কোনো প্রতিদান দেওয়া হবে না; যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿وَقَدِمۡنَآإِلَىٰمَاعَمِلُواْمِنۡعَمَلٖفَجَعَلۡنَٰهُهَبَآءٗمَّنثُورًا٢٣﴾ [الفرقان: ٢٣]

“আর আমরা তাদের কৃতকর্মের প্রতি অগ্রসর হয়ে সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব”। [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ২৩]

দ্বিতীয়ত: কাফিরদের অনুকরণ করার বিষয়টি মুসলিমগণকে তাদের অনুসারী বানিয়ে ছাড়বে। আর এর মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং অবিশ্বাসীদের পথ অনুসরণ করার বিষয় রয়েছে। আর এ ব্যাপারে কঠিন হুমকি প্রদান করা হয়েছে; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَمَنيُشَاقِقِٱلرَّسُولَمِنۢبَعۡدِمَاتَبَيَّنَلَهُٱلۡهُدَىٰوَيَتَّبِعۡغَيۡرَسَبِيلِٱلۡمُؤۡمِنِينَنُوَلِّهِۦمَاتَوَلَّىٰوَنُصۡلِهِۦجَهَنَّمَۖوَسَآءَتۡمَصِيرًا١١٥﴾ [النساء: ١١٥]

“আর কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায়, সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস”! [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৫]

তৃতীয়ত: অনুসরণকারী ব্যক্তি ও অনুসৃত ব্যক্তির সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়া, যা অনুসরণকারী ব্যক্তি ও অনুসৃত ব্যক্তির মাঝে কোনো না কোনো সামঞ্জস্য সৃষ্টি করবে। অর্থাৎ পরস্পরের কাঠামোগত সম্পৃক্ততা, আন্তরিক আকর্ষণ এবং কথায় ও কাজে পারস্পরিক মিল -এগুলো হলো এমন বিষয়, যা ঈমান বিনষ্টকারী; তাতে লিপ্ত হওয়া কোনো মুসলিম ব্যক্তির জন্য উচিত নয়।

চতুর্থত: অনুকরণ করার বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাফিরদের প্রতি মুগ্ধ বা তুষ্ট থাকার নীতি সৃষ্টি করবে। সেখান থেকে যেমন, তাদের ধর্ম, আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, কর্মকাণ্ড এবং তারা যে অন্যায় ও বিশৃঙ্খলার ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে, তার প্রতি মুগ্ধ থাকা, আর এ তুষ্টি অপরিহার্যভাবে সুন্নাতসমূহ এবং সত্য ও হিদায়াত প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করতে বাধ্য করবে, যা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে এসেছেন এবং যার ওপর পূর্ববর্তী সৎকর্মশীল ব্যক্তিগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কারণ, যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে ব্যক্তি তাদের মতো হয়ে যায় এবং সে তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে; আর এটা তাকে মুগ্ধ ও তুষ্ট করে; আর অপরদিকে বিপরীত কথা ও কাজ তখন আর তাকে আনন্দ দিবে না।

পঞ্চমত: পরস্পরের অনুকরণের বিষয়টি সম্প্রীতি ও ভালবাসা এবং অনুকরণকারীদের মাঝে পারস্পরিক বন্ধুত্বের সৃষ্টি করে; কারণ, মুসলিম ব্যক্তি যখন কাফিরের অনুসরণ করবে, তখন আবশ্যকীয়ভাবে তার মনের মাঝে তার জন্য বন্ধুত্বের আকর্ষণ পাওয়া যাবে আর এ অন্তরঙ্গতাই নিশ্চিতভাবে মুমিন, সৎকর্মশীল, মুত্তাকী, সুন্নাহর অনুসারী ও দীনের ওপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গকে বাদ দিয়ে অন্যদের জন্য ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও পারস্পরিক বন্ধুত্বের জন্ম দিবে; আর এটা আবশ্যকীয়ভাবেই একটি স্বভাবসুলভ ব্যাপার, যা প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তিই অনুভব করতে পারে; বিশেষ করে যখন অনুসরণকারী নিজে একাকিত্ব অনুভব করে অথবা অনুসরণকারী ব্যক্তি মানসিকভাবে পর্যুদস্ত থাকে, এ কারণে সে যখন অন্যকে অনুসরণ করে, তখন সে অনুসৃত ব্যক্তির মহত্ব, তার প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব এবং উভয়ের মধ্যকার মিল অনুভব করে। এটা যদি কেবল বাহ্যিক মিলেই সীমাবদ্ধ থাকতো তবুও তা হারাম হওয়ার জন্য যথেষ্ট হতো, অথচ বাহ্যিক মিল, অভ্যাসের মিল, চাল-চলনে মিল থাকা আবশ্যকীয়ভাবে অভ্যন্তরীণ মিল-মহব্বত সৃষ্টি করে। আর এটা এমন এক বিষয়, যা এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই অনুধাবন করতে পারে, মানুষের চালচলনের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিষয়সমূহ নিয়ে যে চিন্তাভাবনা করে।

এখানে আমি পরস্পর পরস্পরের অনুকরণকারীদের মাঝে বিদ্যমান সম্পর্ক, মহব্বত (ভালোবাসা) ও বন্ধুত্বের ব্যাপারে একটি দৃষ্টান্ত পেশ করছি:

যদি কোনো মানুষ ভিন্ন দেশে গমন করে, তবে সে তাতে একাকিত্ব অনুভব করতে থাকে, ফলে সে যদি তার মতো কোনো মানুষকে তার পোষাকের মতো পোষাক পরিধান করে বাজারে চলাফেরা করতে এবং তার ভাষায় কথা বলতে দেখে, তাহলে সে অবশ্যই তার কেন্দ্রিক অনেক বেশি পরিমাণে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা অনুভব করবে। আর এ ভালোবাসা ও হৃদ্যতার পরিমাণ তখন সে অবস্থার চেয়ে বেশি দেখা দিবে যদি এ লোকটিকে সে তার নিজ দেশে প্রত্যক্ষ করত।

অতএব, মানুষ যখন অনুভব করে যে, সে অপরের অনুসারী, তখন এ অনুকরণ মনের মধ্যে তার জন্য নিশ্চিতভাবে প্রভাব তৈরি করবে; এটা হচ্ছে স্বাভাবিক অবস্থায়। কিন্তু যদিকোনো মুসলিম কোনো কাফিরের প্রতি মুগ্ধ হয়ে তারঅনুকরণকরে, তাহলেতার অবস্থাকেমনহবে তা সহজেই অনুমেয়! আরএটাইহলোআসলকথা।কারণ কোনো মুসলিমব্যক্তিরপক্ষথেকেকোনো কাফিরব্যক্তিরঅনুসরণ-অনুকরণকরারবিষয়টিকেবল তখনই সংঘটিতহবে, যখন সে তার প্রতি মুগ্ধ হয়ে যায়, তার অনুসরণকে নিজের জন্য গৌরবের বিষয় মনে করে, তার মত চাল-চলনকে মনে স্থান দিবে, তার ভালোবাসায় মজে যাবে। আর এটাই তাদের পরস্পরেরমাঝেঅন্তরঙ্গ বন্ধুত্বও ভালোবাসার সৃষ্টি করবে।যেমনটিআমরাইউরোপিয়ান সভ্যতায় অভ্যস্ত মুসলিমগণেরমাঝেলক্ষ্য করে থাকি।

ষষ্ঠত: আমাদেরকে (কাফিরদের) অনুকরণ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে; কারণ, মুসলিম কর্তৃক কাফিরের অনুকরণ করার বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবশ্যকীয়ভাবে মুসলিমকে নীচ-অপমানিত ও দুর্বল অবস্থানে ফেলবে। ফলে সে নিজেকে হীন ও পরাজিত মনে করতে থাকবে। আর বর্তমানে কাফিরদেরকে অনুসরণকারীদের অনেকেই এ পরিস্থিতির মাঝেই আছে।-

আরো পড়ুন…..


[1]হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. বর্ণনা করেছেন; ‘ফতহুল বারী’: ১৩/৩০০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৬৯।

[2]ইমাম আহমদ, আল-মুসনাদ: ২/৫০; আবু দাউদ রহ. বর্ণনা করেছে উৎকৃষ্ট সনদে, হাদীস নং-৪০৩১; আর আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, ‘সহীহ আল-জামে‘ আস-সাগীর’, হাদীস নং-৬০২৫।

[3]মূলত এ বিষয়টি ছিল একটি বক্তব্য, যা আমি রিয়াদস্থ ‘মাসজিদে না‘য়ীম’ এর মধ্যে পেশ করেছি; পরবর্তীতে কিছু সংখ্যক শুভাকাঙ্খী তা বই আকারে প্রকাশ করার জন্য আমাকে পীড়াপীড়ি করল; ফলশ্রুতিতে কিছু টীকা সম্পাদন ও ঈষৎ পরিবর্তন করার পর আমি (তা প্রকাশ করতে) সম্মত হয়েছি।

Syed RubelPDF বইবইবর্ণনা:রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ, অনুসরণ ও সামঞ্জস্য বিধান করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। কাফিরদের অনুকরণ, অনুসরণ ও তাদের সামঞ্জস্য বিধান করার বিষয়টি নিঃসন্দেহে মারাত্মক বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়, যা ইসলাম সীমাহীন গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে...Amar Bangla Post