Home / নারী / মা ও শিশু / লাইগেশনের পরও মাইক্রো সার্জারিতে গর্ভধারণ

লাইগেশনের পরও মাইক্রো সার্জারিতে গর্ভধারণ

লাইগেশন“সন্তান” পেয়ে মায়ের হাসি চোখে না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। “আমার বংশ রক্ষা হল। আমি এখন আনন্দিত…” কথাগুলি বলতে বলতে সদ্যোজাত সন্তানের মা মমতাদেবীর চোখ চিক চিক করছিল। বাচ্চাটিকে বারবার আসর করে বোঝাতে চাইছিল হারানো জিনিস আবার পেয়েছি।

এই মমতাদেবীর বাড়ি বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলী থানার অন্তর্গত পাটুলি গ্রামে। বছর আট আগে শিবনাথবাবুর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। একটি কন্যা ও পুত্রসন্তান জন্মানোর পর   ধুলিয়ান ক্যাম্পে “ল্যাপারোস্কোপিক লাইগেশন” অপারেশন করান মমতাদেবী। এর পরেই আড়াই বছর বয়সের পুত্রসন্তান ‘বাবু’ পানিতে ডুবে মারা যায়। অন্ধকার ঘনিয়ে আসে মমতাদেবীর জীবনে। পুত্রশোকে কাতর মমতাদেবী বর্ধমান মেডিকেল কলেজের আসেন—যদি আবার অপারেশন করে সন্তান ধারণ সম্ভব হয়।

মমতাদেবীকে আউটডোরে দেখার পর সেদিনই ভর্তি করে নেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৯৯০সালের ২৯ জুন মমতাদেবীর “স্টেরিলাইজেশন রিভার্সাল’ (সংক্ষেপ এস.আর) অপারেশন করি। তিনমাস বাদে যখন মমতা দেবী আউটডোরে আসেন তখন তিনি ২ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এরপর প্রসবের জন্য তাকে এপ্রিল মাসে ভর্তি করি। ২০ এপ্রিল সকালে সিজারিয়ান করি, পুত্রসন্তান হয়। সন্তানের ওজন ছিল ২.৭৫ কেজি।

  • স্টেরিলাইজেশন রিভার্সাল (এস.আর) বলতে কি বোঝায়?

স্টেরিলাইজেশন বা বন্ধ্যাত্বকরণ অপারেশনে মেয়েদের ফ্যালোপিয়ান টিউব অর্থাৎ ডিম্ববাহী নালীর বিশেষ জায়গায় কেটে বা বাঁধন দিয়ে বা বিশেষ ধরণের রিং পরিয়ে দেওয়া হয়, ফলে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মাধ্যমে দ্বিখণ্ডিত ফ্যালোপিয়ান টিউবকে পুন সংযোজন করে শুক্রকীট ও ডিম্বাণুর মিলনের রাস্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিশেষ ধরনের অপারেশনের মাধ্যমে দ্বিখণ্ডিত ফ্যালোপিয়ান টিউবকে পুন সংযোজন করে শুক্রকীট ও ডিম্বাণুর মিলনের রাস্তা প্রশস্ত করে দেওয়াই হল স্টেরিলাইজেশন রিভার্সাল যাকে সংক্ষেপে ‘এস আর’ বলা হয়।

  • আমাদের দেশে জনবিস্ফোরণ যখন সমস্যা, জন্মনিয়ন্ত্রণ জাতীয় কর্মসূচি সেখানে এই অপারেশনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

এর প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য মমতা দেবীর ঘটনাই যথেষ্ট। তাছাড়া জনবিস্ফোরণ রোধ করার জন্য যে ব্যাপকহারে বন্ধ্যাত্বকরণ অপারেশন করা হচ্ছে সেখানে কেস সিলেকশন ঠিকমত করা হচ্ছে না, ফলে অনেক অবাঞ্ছিত ক্ষেত্রে এই অপারেশন করে ফেলা হচ্ছে। এই বর্ধপমানেই আমি অন্য একটি মেয়ের এই এস আর অপারেশন করেছি যার কোনও বাচ্চা না থাকা সত্ত্বেও বন্ধ্যাত্বকরণ অপারেশন করা হয়েছিল। আর আজ এই “এস আর” অপারেশন করার ফলে সে দুটি সন্তানের মা। এই দুজন যদি মাতৃত্ব ফিরে না পেত তবে সঙ্গত কারণেই এরা জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বিরোধিতা করত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির চুড়ান্ত সাফল্য ‘এস আর’ অপারেশনের সাফল্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আর তাছাড়াও আমাদের দেশে অপুষ্টি, ডাইরিয়া, ডিপথরিয়া ইত্যাদি রোগে শিশু মৃত্যুর হার এত বেশি যে এইসব শিশুদের মায়ের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য ‘এস আর’ অপারেশনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

  • ‘এস আর’ অপারেশনের সাফল্যের হার কতটা?

এই অপারেশনের সাফল্য অনেকগুলি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। তবে আগের বন্ধ্যাত্বকরণ অপারেশন কিভাবে করা হয়েছিল তারা গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। যেসব মায়েরা এই অপারেশনের জন্য আসেন তাদের বেশিরভাগকেই অর্থাৎ প্রায় শতকরা ৭০ জনকেই অপারেশনের অযোগ্য বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আর বাছাই করে যে শতকরা ৩০ জনকে অপারেশন করা হয় তাদের মধ্যে যারা ল্যাপারোস্কোপিক বন্ধ্যাত্বকরণ করিয়েছিল তাদের সাফল্যের হার শতকরা ৮২ ভাগ কিন্তু পূর্ববর্তী অপারেশন যেখানে মিনিল্যাপ বা আরও অন্য পদ্ধতিতে করা হয়েছিল যেখানে সাফল্যের হার মাত্র শতকরা ২৫ ভাগ।

  • ‘এস আর’ অপারেশনের সাফল্য কি কি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল?

এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে এই অপারেশনের জন্য যেসব মায়েরা আসেন তাদের শতকরা ৭০ জনকেই অপারেশন করা সম্ভব হয় না। এইসব ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে আগের বন্ধ্যাত্বকরণ অপারেশন তাড়াহুড়ো করার জনব্য হোক বা যথেষ্ট সাবধানতা না নেওয়ার জন্য হোক ফ্যালোপিয়ান টিউব এত বেশী বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে বা টিউবের ফিমব্রিয়ার অংশটুকুকুই বাদ পড়ে গেছে যে ‘এস আর’ অপারেশন করার জন্য অবশিষ্ট কিছু থাকে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে বেশি ঘাটাঘাটির জন্য টুব এবং তার সংলগ্ন জায়গায় ইনফেকশনের জন্য টিউব নষ্ট হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই এই কেসগুলিকে বাছাই করে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু ল্যাপারোস্কোপিক স্টেরিলাইজেশনে এইসব পার্শ্বক্রিয়ায় সম্ভাবনা বেশ কম তাই সাফল্যও সেখানে বেশী। বিশেষ করে যদি ‘এস আর’ অপারেশন মাইক্রোসার্জারি টেকনিকে করা হয়।

  • মাইক্রোসার্জারি ব্যাপারটা কি?

মাইক্রোসার্জারি মানেই এই নয় যে এই অপারেশন সব সময় মাইক্রোস্কোপ অথবা ল্যাপারোস্কোপের সাহায্যে করা হয়। মাইক্রোসার্জারি হল এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে অপারেশন খুব সাবধানে ও সূচারুরূপে করা হয় যাতে পার্শ্বক্রিয়া না হয়। ক্ষতস্থান ও তার সংলগ্ন অংশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য বিশেষ ধরণের সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়, সেলাই করার জন্যও বিশেষ ধরণের সূক্ষ্ম সুতো ব্যবহার করা হয়, অপারেশনের জায়গা স্যালাইন পানি দিয়ে সব সময় সিক্ত রাখা হয়, রক্তক্ষরণ রোধের জন্য গজ, মপ ব্যবহার না করে ইলেক্টো কোয়াওলেশন করা হয় এবং বিশেষ যত্ন নেওয়া হয় যেন টিসুর সংযোজন যথাযথ হয়।

  • ল্যাপারোস্কোপিক লাইগেশন কীভাবে করা হয়?

ল্যাপারোস্কোপিক লাইগেশনে পেট না কেটে নাভির কাছে একটি ক্ষুদ্র ছিদ্রের মধ্যে টেলিস্কোপ জাতীয় যন্ত্রের সাহায্য পেটের ভিতরের বিভিন্ন অংশ দেখা হয় এবং স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ অপারেশন করা হয়। এই অপারেশনে সময় লাগে খুব কম, রক্তপাত হয় না বললেই চলে এবং কোন বিরূপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না। অপারেশনের চার ঘন্টার মধ্যেই বাড়ি যাওয়া যায় এবং পরদিন থেকেই স্বাভাবিক কাজকর্ম করা সম্ভব। এর সব থেকে বড় সুবিধে হল এই অপারেশনের পর যদি ‘এস আর’ অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে সেক্ষেত্রে ‘এস আর’ অপারেশনে সাফল্যের হার বেশি।

  • ল্যাপারোস্কোপিক বন্ধ্যাত্বকরণ সব সময় সহজলভ্য নয়। সেক্ষেত্রে আপনি কি বলেন?

এটা সত্যি যে ল্যাপারোস্কোপিক বন্ধ্যাত্বকরণ সবসময় সহজলভ্য নয়, তাছাড়া যারা এই বিষয়ে পারদর্শী তাদের দিয়েই এই অপারেশন করলে আকাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা সম্ভব। কিন্তু বন্ধ্যাত্বকরণ অপারেশনের সময় যদি ‘এস আর’ অপারেশনের প্রয়োজনীয়তার কথা মনে রাখা হয় তবে মিনিল্যাপ পোমেরয় পদ্ধতি বা অন্য পদ্ধতিতেও উল্লেখ্যযোগ্য সাফল্য সম্ভব। এই লেখক তার নিজস্ব পদ্ধতিতে অপারেশন করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। এই বিশেষ পদ্ধতিতে ফ্যালোপিয়ান টিউবের ইস্তমিক অংশে আধ সেন্টিমিটার তফাতে দু-জায়গায় সিল্ক দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর দুই বাধঁনের মধ্যবর্তী অংশ কেটে টিউবের কাটা অংশ যাতে নিজে থেকে পুনঃসংযোজিত না হয় সেজন্য ফিমব্রিয়ার দিকের কাটা টিউবকে জরায়ুর দিকের কাটা টিউবের মেসোম্যালপিকসে সংযোজন করে দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে টিউবের কোনো অংশ বাদ যায় না বা ফিমদ্রিয়ার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এই প্রক্রিয়ায় রক্তপাত ও কোনরকম দূষণ যাতে না হয় তার জন্যই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

“এই পদ্ধতির বিশেষ বিবরণ ‘প্রসিডিংস অফ দি ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অফ ভলান্টারি স্টেরিলাইজেশন অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার -১৯৮৬’-তে প্রকাশিত হয়েছে।”

লিখেছেনঃ ডা. প্রশান্ত কুমার সেন গুপ্ত।

About Syed Rubel

Creative Writer/Editor And CEO At Amar Bangla Post. most populer bloger of bangladesh. Amar Bangla Post bangla blog site was created in 2014 and Start social blogging.

Check Also

আমি কিভাবে শিশুর যত্ন নিবো?

প্রশ্নঃ আমার বাচ্ছাকে কিভাবে যত্ন নেব জানতে চাই? বাচ্চার স্বাস্থ্য কিভাবে ঠিক রাখব? আমি কিভাবে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: