Home / বই থেকে / সুন্নাতের অনুসরণ করার প্রশ্নে পূর্ববর্তী ভালো মানুষজনের অবস্থান

সুন্নাতের অনুসরণ করার প্রশ্নে পূর্ববর্তী ভালো মানুষজনের অবস্থান

এ উম্মতের ভালো মানুষগণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতকে ভালোবেসেছেন, তা আমল করেছেন, তার দিকে জনগণকে দা‘ওয়াত দিয়েছেন এবং তাকে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ করেছেন, আর তা প্রচার ও প্রসারের পথে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন এবং তার শত্রুদের সাথে রীতিমত যুদ্ধ করেছেন, অবশেষে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের কালেমা বিজয় লাভ করেছে; আর প্রবৃত্তির পূজারী ও বিদ‘আতের অনুসারী ব্যক্তি-গোষ্ঠীর মতবাদ ও চিন্তধারার পতন হয়েছে।

প্রথমত: সাহাবীগণ:

১. এই তো আবূ বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, তিনি বলেন:

«لَسْتُ تَارِكًا شَيْئًا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَعْمَلُ بِهِ إِلا عَمِلْتُ بِهِ ، إِنِّي أَخْشَى إِنْ تَرَكْتُ شَيْئًا مِنْ أَمْرِهِ أَنْ أَزِيغَ».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা আমল করতেন, আমি তার কোনো কিছুই ছেড়ে দিতে পারি না, বরং আমি তাই আমল করব। কারণ, আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করি, যদি আমি তাঁর কোনো কথা বা নির্দেশনা ছেড়ে দিই।”[1]

২. আর এই তো উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, তিনি বলেন:

«إِنِّي لَأَعْلَمُ أَنَّكَ حَجَرٌ لَا تَضُرُّ ولَا تَنْفَعُ، وَلَوْلَا أَنِّي رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَبِّلُكَ مَا قَبَّلْتُكَ!».

“আমি ভালো করেই জানি যে, তুমি একটি পাথর মাত্র, না তুমি কোনো ক্ষতি করতে পার, আর না পার কোনো উপকার করতে। আমি যদি তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলো আমি কখনও তোমাকে চুমু দিতাম না।”[2]

৩. সা‘ঈদ ইবন মানসূর রহ. সাহাবী ‘ইমরান ইবন হোসাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

«أنهم كانوا يتذاكرون الحديث، فقال رجل: دعونا من هذا، وجيئونا بكتاب الله، فقال عمران: إنك أحمق؛ أتجد في كتاب الله الصلاة مفسرة؟ أتجد في كتاب الله الصوم مفسراً؟ إن هذا القرآن أحكم ذلك، والسنة تفسِّره».

“তারা হাদীস নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন এক ব্যক্তি বলল: আমাদের নিকট এ বিষয়ে আলোচনা করা থেকে বিরত থাক এবং আমাদের নিকট আল্লাহর কিতাব তথা কুরআন নিয়ে আস। জবাবে ‘ইমরান বললেন: তুমি একটা আহাম্মক। তুমি কি আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনের মধ্যে সালাতে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পাবে? তুমি কি আল্লাহর কিতাবের মধ্যে সাওমের বিষয়টিকে বিস্তারিতভাবে পাবে? আল-কুরআনুল কারীম এ বিষয়ে বিধান বা সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে; আর সুন্নাহ তাকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছে।”

৪. আর এই তো আলী ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, তিনি বলেন:

«مَا كُنْتُ لِأَدَعَ سُنّةَ رَسُولِ اللّهِ صَلّى اللّهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ لِقَوْلِ أَحَدٍ مِنَ النَّاسِ».

“আমি কোনো মানুষের কথায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতকে ছেড়ে দিতে পারি না।”[3]

৫. আলী ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আরও বলেন:

«لَو كانَ الدِّينُ بالرأْي، لَكانَ باطنُ الخُفين أَحَقَّ بالمَسْحِ منْ ظاهِرهِما وَلَكِنْ رأَيتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَمْسَحُ عَلَى ظاهِرهِما».

“যদি দীনের বিষয়টি যুক্তি-তর্কের দ্বারা পরিচালিত হত, তাহলে মোজাদ্বয়ের বাইরের অংশের চেয়ে ভিতরের অংশ মাসেহ করার বিষয়টি অগ্রধিকার পাওয়ার মত ছিল; কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মোজার বাইরের অংশে মাসেহ করতে দেখেছি।”[4]

৬. আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:

«الاِقْتِصَادُ فِى السُّنَّةِ خيرٌ مِنَ الاِجْتِهَادِ فِى الْبِدْعَةِ».

“বিদ‘আত নিয়ে কষ্টকর আমল করার চেয়েসুন্নাতের(অনুসরণকরার) ব্যাপারেমধ্যমপন্থাঅবলম্বনকরাঅনেকউত্তম।”[5]

৭. উবাই ইবন কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:

«عَلَيْكُمْ بِالسَّبِيلِ وَالسُّنَّةِ، فَإِنَّهُ لَيْسَ مِنْ عَبْدٍ عَلَى سَبِيلٍ وَسُنَّةٍ، ذَكَرَ الرحْمنَ فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ ،فَمَسَّتْه النَّارُ أَبَدًا، وَإِنْ اقْتِصَادًا فِي سَبِيلٍ وَسُنَّةٍ خَيْرٌ مِنْ اجْتِهَادٍ فِي خِلَافِ سَبِيلٍ وَسُنَّةٍ».

“তোমাদের জন্য অপরিহার্য হলো আল্লাহর পথ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ করা। কারণ, যে ব্যক্তিই আল্লাহর পথ ও সুন্নাতের উপর অবিচল থেকে দয়মায় আল্লাহকে স্মরণ করে, তারপর আল্লাহর ভয়ে তার দু’চোখ অশ্রু বিসর্জন করে, সে ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন কখনও স্পর্শ করবে না, আর আল্লাহর পথ ও সুন্নাতের বিপরীত বিষয়ে কষ্টকর আমল করার চেয়ে আল্লাহর পথ ওসুন্নাতের(অনুসরণকরার) ব্যাপারেমধ্যমপন্থাঅবলম্বনকরাঅনেকউত্তম।”[6]

৮. আর এই তো আদুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার কথা বলছি: হুবহু নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ করার কারণে কেউ যখন তাঁকে দেখত, তখন সে মনে করত যে, তাকে কোনো কিছু পেয়ে বসেছে! তার আযাদকৃত গোলাম নাফে‘ বলেন:

«لو نظرت إلى ابن عمر رضي الله عنهما إذ اتبع سنّةَ النبي صلى الله عليه وسلم لقلت : هذا مجنون!!».

“যদি তুমিআদুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার দিকে তাকাতে যখন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ করেন, তখন তুমি বলতে: এ তো পাগল!!”[7]

৯. আর আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন:

«أما تخافون أن تعذبوا ويخسف بكم؟ أن تقولوا : قال رسول الله وقال فلان!».

“তোমাদের কি ভয় হয় না যে, তোমাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে এবং তোমাদেরকে নিয়ে যমীন ধ্বসে যাবে? কারণ, তোমরা বল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন এবং অমুক ব্যক্তি বলেছেন।” (অর্থাৎ তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা এবং সাধারণ ব্যক্তির কথাকে এক পাল্লায় ওজন কর এবং একই রকম মনে কর। সাবধান! বিষয়টি কখনও এক রকম হতে পারে না)

১০. আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা আরও বলেন:

«أيها النَّاس! تُوشكُ أَنْ تَنزلَ عَليكُم حِجارة من السماءِ؛ أَقولُ لَكُم: قالَ رسولُ الله صلى الله عليه وعلى آله وسلمَّ وتقُولونَ: قالَ أَبو بكر وعُمر!!».

“হে জনগণ! অচিরেই তোমাদের উপর আকাশ থেকে পাথরের বৃষ্টি বর্ষিত হবে! আমি তোমাদেরকে বলছি: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; আর তোমরা বলছ: আবূ বকর ও উমাররাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেছেন!!” (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা এবং আবূ বকর ও উমাররাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার কথার মান কখনও এক নয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার বিপরীতে আবূ বকর ও উমাররাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির কথাও গ্রহণযোগ্য হবে না)।

দ্বিতীয়ত: তাবে‘ঈগণ ও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম:

১. আবূল ‘আলিয়া রহ. বলেন:

«عليكم بالأمر الأول الذي كانوا عليه قبل أن يفترقوا».

“তোমাদের ওপর আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো প্রথম বিষয় ও নির্দেশনাটিকে আঁকড়িয়ে ধরা, যার উপর তাঁরা মতানৈক্য সৃষ্টির পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত ছিল।”[8]

২. আওযা‘ঈ রহ. বলেন:

«اصبر نفسك على السنة , وقف حيث وقف القوم , وقل بما قالوا , وكفَّ عما كفوا عنه , واسلك سبيل سلفك الصالح , فإنه يسعك ما وسعهم».

“তুমি নিজেকে সুন্নাহর ওপর ধৈর্যের সাথে প্রতিষ্ঠিত রাখ, আর তুমি থেমে যাও, যেখানে জাতি থেমে গেছে; আর তুমি বল, তাঁরা যা বলেছে, আর তুমি তা থেকে বিরত থাক, যা থেকে তারা বিরত থেকেছে, আর তুমি তোমার পূর্ববর্তী সজ্জনদের পথে চল। কারণ, তা তোমাকে শক্তি যোগাবে, যা তাদেরকে শক্তি যুগিয়েছে।”

৩. ইউসূফ ইবন আসবাত রহ. বলেন:

«إِذا بَلغكَ عن رجُلٍ بالمشرق؛ أَنه صَاحبُ سُنة، فابعثْ إِليه بالسلام؛ فقد قل أَهل السنَّة».

“প্রাচ্যের কোনো লোকের কাছ থেকে যখন তোমার কাছে কোনো খবর পৌঁছে যে, সে সুন্নাহর অনুসারী, তখন তুমি তাঁর কাছে সালাম পৌঁছাও। কারণ, সুন্নাহর অনুসারীর সংখ্যা কমে গেছে।”

৪. আর আইয়ূব রহ. বলেন:

«إِنِّي لأخْبَرُ بموتِ الرجُلِ من أَهلِ السنة؛ فكأنِّي أَفقدُ بعضَ أَعضائي».

“আমাকে সুন্নাহর অনুসারী কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া হলে, মনে হয় যেন আমি আমার কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারিয়ে ফেলি।”

৫. আইয়ূব রহ. আরও বলেন:

«إن من سعادة الحَدَث والأعجميّ أن يوفقهما الله لعالمٍ مِنْ أهل السنة».

“যুবকওঅনারবব্যক্তিরজন্যসৌভাগ্যেরকারণহলো,আল্লাহতা‘আলাতাদেরকেতাওফীক দিবেনসুন্নাহরঅনুসারীএকজনআলেমেরঅনুসরণ করার।”

৬. আবূ বকর ইবন ‘আইয়াশ রহ. বলেন:

«السنة في الإسلام أعز من الإسلام في سائر الأديان».

“সকল ধর্মের মধ্যে ইসলামের মর্যাদাগত অবস্থানের চেয়ে ইসলামের মধ্যে সুন্নাহর অবস্থানের বিষয়টি অধিক শক্তিশালী।”

৭. সুফিয়ান সাওরী রহ. বলেন:

«استوصوا بأهل السنة خيراً، فإنهم غرباء».

“তোমরা সুন্নাহর অনুসারীগণের কল্যাণ কামনা কর। কারণ, তারা অপরিচিত হয়ে গেছে (হারিয়ে যাচ্ছে)।”

৮. জুনায়েদ রহ. বলেন:

«الطرق كلها مسدودة إلا على المقتفين آثار رسول الله صلى الله عليه وسلم، والمتبعين سنته وطريقته، فإن طرق الخيرات كلها مفتوحة عليه كما قال الله تعالى:﴿لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ﴾ [الاحزاب: ٢١]».

“(মানুষের জন্য) সকল পথ বন্ধ, তবে তাদের জন্য নয়, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদাঙ্ক অনুসরণকারী এবং তাঁর সুন্নাত ও কর্মপন্থার অনুকরণকারী। কারণ, কল্যাণের সকল পথ তার জন্য খোলা রয়েছে, যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২১]-আরো পড়ুন

* * *

[1]সহীহ বুখারী,হাদীস নং ২৯২৬; মুসলিম, হাদীস নং ৪৬৮১

[2]সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫২০; মুসলিম, হাদীস নং- ৩১২৮

[3]সহীহ বুখারী,হাদীস নং ১৪৮৮

[4]ইবন আবি শায়বা হাদীসটি ‘আল-মুসান্নাফ’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন।

[5]বায়হাকী ও হাকেম।

[6]ইবন আবি শায়বা হাদীসটি ‘আল-মুসান্নাফ’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন, হাদীস নং ৩৫৫২৬

[7]আবূ না‘ঈম, মা‘রেফাতুস সাহাবা।

[8] তাফসীরে কুরতুবী, ৭ম খণ্ড, পৃ. ১৪১

About Syed Rubel

Creative Writer/Editor And CEO At Amar Bangla Post. most populer bloger of bangladesh. Amar Bangla Post bangla blog site was created in 2014 and Start social blogging.

Check Also

জাপান

সম্ভ্রমহানীর কাঠুরিয়া

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এক দেশের সাথে আরেক দেশের সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। এই সুসম্পর্কের মধ্য দিয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *