Home / বই থেকে / অনুবাদকের কথা ।

অনুবাদকের কথা ।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

অনুবাদকের কথা ।

আমাদের বর্তমান বই ‘দুনিয়ার ওপারে’ আমেরিকার বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ডাক্তার ‘রেমণ্ড এ মোদী’ কর্তৃক রচিত সমগ্র দুনিয়াব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থদ্বয়

  1. Life After Life
  2. The Light Beyond
  3. Reflection on Life After Life

সম্পর্কে জগদ্বিখ্যাত আলেমে দ্বীন, জাষ্টিস মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উছমানী সাহেব কর্তৃক ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপিত পর্যালোচনামূলক রচনা(উর্দু) এর বঙ্গানুবাদ।

ডাক্তার মোদীর প্রথম গ্রন্থ Life After Life প্রকাশিত হওয়ার পর মাত্র এক বছরের সামান্য সময়ে ত্রিশ লক্ষ কপি বিক্রি হয়।

এতিনটি গ্রন্থে তিনি মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা লোকদের মৃতপ্রায় অবস্থায় অবলকনকৃত বিস্ময়কর ও কৌতুহলোদ্দীপক দৃশ্যাবলী ও অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন।

পাকিস্তানের স্বনামধন্য আলেমে দ্বীন জাষ্টিস মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উছমানী সাহেব কুরআন ও হাদীছের আলোকে ডাক্তার মোদীর উপস্থাপিত এ সকল বিষয়ের পর্যালোচনা করেছেন, যা পাকিস্থানের বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা, রোজনামা জঙ্গ’-এর উপসম্পাদকীয় কলামে ৩০ শে মে ১৯৯৬ ইং, ৫ই জুন ১৯৯৬ ইং ও ১২ই জুন ১৯৯৬ ইং তিন সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর ফলে পরবর্তীতে এই পর্যালোচনা পুস্তিকা আকারেও প্রকাশ করা হয়।

মৃত্যুপরবর্তী জীবন সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট আকীদা এই যে, মানুষের দুনিয়ার জীবনই শেষ নয়, তাঁর জীবন অনন্ত। মৃত্যু আসলে স্থান পরিবর্তনের নাম। এ সম্পর্কে ইসলামী আকীদা স্বচ্ছ ও সুদৃঢ় করার জন্য মৌলিক বিষয়ে আমাদের ধারণা রাখতে হবে। সে বিষয়গুলো এখানে সংক্ষেপে পেশ করা হচ্ছেঃ-

১. আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে আল্লাহ পাক যে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তাহলো আমাদেরকে ঐ সকল বিষয়ে অবগত করানো যা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরী, কিন্তু আমরা নিজে নিজে নিজস্ব বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয় দ্বারা তা জানতে পারি না। অর্থাৎ, তা আমাদের মেধাবহির্ভূত।

২. আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের জন্য নিশ্চিত ইলম হাসিল করার একটি বিশেষ মাধ্যম যা সাধারণ মানুষের নিকট নেই, তাহলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে ওহী লাভ করা। সেই ওহীর মাধ্যমেই তারা ঐ সকল বিষয়ে জানতে পারেন, যা আমরা স্বীয় দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা অনুধাবন করতে অক্ষম। যেমন দূরবীক্ষণ দ্বারা মানুষ দূরের এমন বস্তু দর্শন করতে পারে, যা সাধারণ দৃষ্টিতে দর্শন করা সম্ভব নয়।

৩. কোন নবীকে স্বীকার করে তাঁর প্রতি ঈমান আনার অর্থ এই যে, আমরা এ কথা স্বীকৃতি দিয়েছি এবং পরিপূর্ণরূপে মেনে নিয়েছি যে, এমন যা কিছু তিনি বর্ণনা করেন যা আমরা জানি না, দেখি না, তা সবকিছুই তিনি আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে ওহীর মাধ্যমে জেনে আমাদেরকে অবগত করান। সে সকল বিষয়ের সবকিছুই অক্ষরে সত্য, এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

৪. আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম কখনো এমন কোন কথা বলেন না, যা অযোক্তিক ও অসম্ভব। অবশ্য আমাদের মস্তিঙ্ক ও ইন্দ্রিয় তথা মেধা ও অনুভূতি হয়ত সেটা অনুধাবন করতে অক্ষম। বরং এ সকল বিষয়ে এমন হওয়াটাই জরুরী। যদি নবী-রাসূলগণ শুধু ঐ সকল কথাই বলেন, যা আমরা চিন্তা করে, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয় দ্বারা বুঝতে সক্ষম হই, তাহলে তাদের নবী-রাসূলরূপে প্রেরিত হওয়ার প্রয়োজনই বা কি?

৫. আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম মৃত্যুপরবর্তী জীবন, অর্থাৎ কবর জগত ও আখেরাত সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন, তাঁর মধ্যে একটি বিষয়ও এমন নেই যা অযৌক্তিক ও অসম্ভব। ঐ সকল বিষয়ের মধ্যে এমন বিষয় অবশ্যই আছে যা আমরা নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও বুদ্ধি-বিবেক দ্বারা নিজে নিজে অনুধাবন করতে পারি না। এ দুনিয়ার সে সকল বিষয়ের কোন নমুনা না থাকার কারণে এ দুনিয়ার অন্যান্য অনুভূত বিষয়ের ন্যায় সেগুলো বুঝতেও পারি না।

৬. ইলম হাসিল করার জন্য সাধারণ ও প্রাকৃতিকভাবে আমাদেরকে যে সকল মাধ্যম ও উপকরণ দান করা হয়েছে, যেমন চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা ও বুদ্ধি-বিবেক, এগুলোর সব ক’টির কার্যপরিধি ও ক্ষমতা একান্তই সীমিত। আমরা এটাও দেখি যে, নব আবিস্কৃত যন্ত্রপাতির সাহায্যে এমন অনেক বিষয়ই আমরা জানতে পারি, যা পূর্বে কখনো কল্পনাও করা যায়নি। যেমন পানি বা রক্তে সৃষ্ট জীবাণু খালি চোখে যা দৃষ্টিগোচর হওয়া একেবারেই অসম্ভব, অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে আমরা তা দেখতে পাই। রেডিওর সাহায্যে হাজার হাজার মেইল দূরের শব্দও আমাদের কান শুনতে পারে। সাধারণ লোকেরা ইন্দ্রিয়প্রসূত অভিজ্ঞতার আলোকে যা অনুধাবন করতে পারে, শিক্ষিত লোকেরা কিতাব পড়ে তাঁর চেয়ে অনেক বেশী অনুধাবন করতে সক্ষম হন।

উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা জানা গেলো যে, কোন বিষয়কে কেবলমাত্র এজন্য অস্বীকার করা যে, আমরা আজ তা দেখতে পাই না, শুনতে পাই না, অথবা আমাদের মেধা তা অনুধাবন করতে পারে না, এটা নিতান্তই বোকামী। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-

(আরবী………)

অর্থাৎ তোমাদেরকে সামান্যই ইলম দান করা হয়েছে। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৮৫)

৭. মানুষ দুটি জিনিসের সমন্বয়ে গঠিত। এক, শরীর যা প্রকাশ্য ও দৃষ্টিগোচর হয়। দ্বিতীয়, রূহ বা আত্মা, যদিও আমরা রূহকে চোখে দেখি না কিন্তু তাঁর অস্তিত্ব আমরা সবাই স্বীকার করি। এ দুনিয়াতে মানুষের এই দুই অংশের পরস্পর সম্পর্ক এরূপ যে, মানুষের উপর দুঃখ-কষ্ট, শান্তি ও আরামের যে অবস্থা আপতিত হয় তা শরীরের উপর প্রত্যক্ষভাবে অনুভূত হয়। আর রূহ শরীরের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে তা অনুভব করে। যেমন কোন মানুষ আঘাত লেগে আহত হলো, অথবা আগুনে জ্বলে গেলো। এ ক্ষেত্রে আঘাত বা আগুনের সম্পর্ক যদিও সরাসরি তাঁর দেহের সাথে, কিন্তু তাঁর প্রতিক্রিয়ায় রূহও কষ্ট পায়। তদ্রূপ পানাহারের যে স্বাদ পাওয়া যায়, সেটাও সরাসরি শরীরই লাভ করে থাকে, কিন্তু এতে রূহও তৃপ্ত হয়।

মোটকথা, মানুষের দুনিয়াবী হালাত ও পার্থিব জীবনে শরীরই আসল, আর রূহ তাঁর অধীন। কিন্তু কুরআন ও হাদীছে কবর-জগত সম্পর্কে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝে আসে যে, সেখানকার ব্যাপার সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থাৎ, মানুষের সেখানকার জীবনে যে সুখ-দুঃখ ও ভাল-মন্দ অবস্থা আপতিত হবে তা মূলতঃ সরাসরি রূহের উপরেই বর্তাবে। আর শরীর পরোক্ষভাবে তা অনুভব করবে। এ ব্যাপারটি অনুধাবন করা যেন আমাদের জন্য সহজ হয়, আল্লাহগ পাক সম্ভবতঃ এ জন্যই দুনিয়াতেও তাঁর একটি নমুনা রেখেছেন। আর তাহলো, স্বন। বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন প্রতিটি মানুষই তাঁর জীবনে এমন স্বপ্ন একাধিক বার দেখে থাকে যাতে তাঁর খুবই মজা লাগে এবং আনন্দ লাভ করে। অথবা খুবই কষ্ট লাগে, মারাত্মক দুঃখ অনুভব করে। কিন্তু স্বপ্নের এই দুঃখ-কষ্ট বা আরাম-আয়েশ প্রত্যক্ষভাবে তা অনুভব করে। অর্থাৎ স্বপ্নে যখন দেখে যে, সে খুবই মজাদার খাবার খাচ্ছে তখন সে শুধু নিজ রূহ ও কল্পনা শক্তিকে খেতে দেখে না, বরং সে দেখে জাগ্রত অবস্থার মতই সে তাঁর ঐ শারীরিক মুখ দিয়ে খাচ্ছে, যে মুখ দিয়ে দুনিয়াতে সে প্রতিদিন খানা খায়। তদ্রূপ যদি কেউ স্বপ্নে এ দৃশ্য দেখে যে, কেউ তাকে প্রহার করলো, তাহলে সে এটা দেখে না যে, তাঁর রূহকে প্রহার করা হলো, বরং সে স্বপ্নে এ দৃশ্যই দেখে যে, প্রহার তাঁর দেহের উপরই পতিত হচ্ছে। সে সময়ও তাঁর শরীরে ঐ রকম আঘাতই লাগে যেরূপ আঘাত জাগ্রত অবস্থায় প্রহারের দরুন শরীরে লাগে। অথচ স্বপ্নের সময় যা কিছু হয় তা সরাসরি রূহের উপরেই সংঘটিত হয়ে থাকে। শরীর পরোক্ষভাবে তা অনুভব করে। অবশ্য স্বপ্নের সময় শরীরে পরোক্ষভাবে পতিত আঘাত কখনো কখনো এত বেশী অনুভূত হয়ে থাকে যে, মানুষ স্বপ্ন ভেঙ্গে জাগ্রত হওয়ার পর শরীরে তাঁর চিহ্ন ও প্রতিক্রিয়া দেখতে পায়।

মোটকথা, ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ ভাল বা মন্দ স্বপ্ন দেখে যে সুখ বা দুঃখ অনুভব করে তাঁর অবস্থা এই যে, সেগুলো মূলতঃ সরাসরি রূহের উপর সংঘটিত হয় এবং পরোক্ষভাবে শরীরের উপরও তাঁর আছর হয়। এ কারণেই স্বপ্নদ্রষ্টার অতি নিকটে উপস্থিত ব্যক্তিও তাঁর শরীরের উপর কোন কিছু সংঘটিত হতে দেখে না। আসল কথা এই যে, আমরা দুনিয়াতে কেবলমাত্র মানুষের ঐ সকল অবস্থাই দেখতে সক্ষম, যার সম্পর্ক সরাসরি দেহের সাথে। সুতরাং ‘আলমে বরযখে’ (অর্থাৎ মৃত্যুর পর হতে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ে ) মানুষের (নেক আমল ও বদ আমলের দরুন) যা কিছু হবে তাও এ প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ সেগুলো মূলতঃ সরাসরি রূহের উপরই সংঘটিত হবে আর দেহ তাঁর প্রভাবে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হবে। আলমে বরযখ তথা কবর জগতের ঘটনাকে স্বপ্নের অভিজ্ঞতার আলোকে অনুধাবন করা কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য কোন কঠিন ব্যাপার নয়।

 

উপরোক্ত আলোচনার পর আশা করা যায় যে, এ দুনিয়ার ঘটনাবলী ও কবর জগতের অবস্থা ও ঘটনাবলীর পার্থক্য বুঝে আসবে এবং কবরের প্রশ্নোত্তর, আযাব, হাশর, হিসাব-কিতাব, পুলসিরাত ও বেহেশত-দোযখ সম্পর্কে ইসলামী আকীদা ও শিক্ষা সম্পর্কে দুর্বল ঈমান ও নির্বোধ লোকদের মত অহেতুক কন সংশয় ও প্রশ্ন জাগ্রত হবে না। (মাআরেফুল হাদীছ, ১ম খণ্ড, ১৮৬-১৮৯ পৃঃ)

নিম্মে আমরা হাদীছের আলোকে সংক্ষিপ্তাকারে মৃত্যু ও তাঁর পরবর্তী জীবনের (অর্থাৎ কবর জগতের) অবস্থা সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক আকীদা ও শিক্ষা পেশ করছি, যাতে সহজেই আখিরাত সম্পর্কে আমাদের ঈমান পূর্ণতা লাভ করতে পারে।

হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে–

হযরত বারা ইবনে আযেব (রাযিঃ) বলেন, আমরা একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলিহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আনসারীদের মধ্যে এক ব্যক্তির জানাযায় গেলাম। আমরা কবরের নিকট গেলাম, কিন্তু তখনো কবর খোঁড়া হয়নি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে গেলেন এবং আমরাএ তাঁর আশেপাশে বসে গেলাম, যেমন আমাদের মাথায় পাখী বসেছে (অর্থাৎ চুপচাপ)। তখন হুযূরের হাতে একটি কাঠের টুকরো ছিল, যদ্দ্বারা তিনি (চিন্তিত ব্যক্তির ন্যায়) মাটিতে দাগ কাটছিলেন। অতঃপর তিনি মাথা উঠালেন এবং বললেনঃ আল্লাহর নিকট কবরের আযাব থেকে পানাহ চাও। তিনি তা দুই কি তিন বার বললেন। তারপর বললেন, মুমিন বান্দা যখন দুনিয়াকে ত্যাগ করতে এবং আখেরাতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখন তাঁর নিকট আসমান হতে উজ্জ্বল চেহারাবিশিষ্ট একদল ফেরেশতা আসেন, তাদের চেহারা যেন সূর্য। তাদের সঙ্গে বেহেশতের কাফনসমূহের একটি কাফন (কাপড়) থাকে এবং বেহেশতের খুশবুসমূহের (মধ্য হতে) এক রকম খুশবু থাকে। তারা তাঁর নিকট থেকে দৃষ্টির সীমার দূরে বসেন। অতঃপর মালাকুল মউত (আযরাঈল আঃ) তাঁর নিকট আসেন এবং তাঁর মাথার নিকটে বসে বলেন, হে পবিত্র রূহ! বের হয়ে এস আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তোষের দিকে। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন তাঁর রূহ বের হয়ে আসে যেমন মশক হতে পানি বের হয়ে আসে (অর্থাত সহজে)। তখন মালাকুল মউত তা গ্রহণ করেন এবং এক মুহূর্তের জন্যও নিজের হাতে রাখেন না; বরং ঐ সকল অপেক্ষমান ফেরেশতা এসে তাকে গ্রহণ করেন এবং ঐ কাফন ও ঐ খুশবুতে রাখেন। তখন তা থেকে পৃথিবীতে প্রাপ্ত সমস্ত খুশবু অপেক্ষা উত্তম মেশকের খুশবু বের হতে থাকে।

হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাকে নিয়ে ফেরেশতারা উপরে উঠতে থাকেন এবং যখনই তারা ফেরেশতাদের মধ্য হতে কোন ফেরেশতাদলের নিকটে পৌছেন তখন তারা জিজ্ঞসা করেন, এই পবিত্র রূহ কার! তখন ফেরেশতারা দুনিয়াতে তাকে লোকেরা যে সকল ইপাধি দ্বারা ভূষিত করত, সে সকলের মধ্যে থেকে উত্তমটি দ্বারা ভূষিত করে বলেন, এ অমুকের পুত্র অমুকের রূহ, যাবৎ না তারা তাকে নিয়ে প্রথম আসমান পর্যন্ত পৌঁছেন (এরূপ প্রশ্নোত্তর চলতে থাকে)। অতঃপর তারা আসমানের দরজা খুলতে চান, আর অমনি তাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়। তখন প্রত্যেক আসমানের সম্মানিত ফেরেশতারা তাদের পশ্চাৎগামী হন পরবর্তী উপরের আসমান পর্যন্ত–যাবৎ না তারা সপ্তম আসমান পর্যন্ত পৌঁছেন। এ সময় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমার বান্দার ঠিকানা ‘ইল্লিয়্যীনে’ লিখ এবং তফাকে (তাকে কবরে ) যমীনে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কেননা, আমি তাদেরকে যমীন থেকে সৃষ্টি করেছি এবং যমীনের দিকেই তাদের প্রত্যাবর্তন করব, অতঃপর যমীন থেকে আমি তাদেরকে পুনরায় (হাশরের মাঠে) বের করব। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সুতরাং তাঁর রূহ তাঁর শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

অতঃপর তাঁর নিকট দু’জন ফেরেশতা আসেন এবং তাকে উঠিয়ে বসান। তারপর তারা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার রব কে? তখন সে উত্তর দেয়, আমার রব আল্লাহ। অতঃপর (ফেরেশতারা) জিজ্ঞেস করেন, তোমার দ্বীন কি? তখন সে বলে, আমার দ্বীন ইসলাম। আবার তারা তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের মধ্যে যিনি প্রেরিত হয়েছিলেন তিনি কে? সে উত্তর করে, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পুনরায় তারা তাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি একথা কি করে জানতে পারলে? সে বলে, আমি আল্লাহর কিতাব পড়েছি, অতঃপর তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাকে সুত্যবাদী বলে বিশ্বাস করেছি। তখন আসমানের দিক থেকে একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করেন, আমার বান্দা সত্য বলেছে। সুতরাং তাঁর জন্য বেহেশতের একটি বিছানা বিছিয়ে দাও এবং তাকে বেহেশতের একটি লেবাশ পরিয়ে দাও। এ ছাড়া তাঁর জন্য বেহেশতের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর তাঁর নিকট এক সুন্দর চেহারাবিশিষ্ট সুবেশী ও সুগন্ধিযুক্ত ব্যক্তি আসে এবং তাকে বলে, তোমাকে সন্তুষ্টি দান করবে এমন জিনিসের সুসংবাদ গ্রহণ কর। এই দিবসেরই তোমাকে ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল। তখন সে তাকে জিজ্ঞেস করবে,   তুমি কে? তোমার চেহারা তো দেখার মতো চেহারা, যা কল্যাণের বার্তা বহন করে। তখন সে বলে, আমি তোমার নেক আমল। তখন সে বলবে, হে আল্লাহ! কিয়ামত কায়েম কর! হে আল্লাহ! কিয়ামত কায়েম কর, যাতে আমি আমার পরিবার ও সম্পদের দিকে যেতে পারি (অর্থাৎ হুর, গিলমান এ বেহেশতী সম্পদ তাড়াতাড়ি পেতে পারি)।

পক্ষান্তরে, কাফের বান্দা যখন দুনিয়া ত্যাগ করতে ও আখেরাতের দিক অগ্রসর হতে থাকে তখন তাঁর নিকট আসমান হতে একদল কাল চেহারাবিশিষ্ট ফেরেশতা অবতীর্ণ হন, যাদের সাথে শক্ত চট থাকে। তারা তাঁর নিকট থেকে দৃষ্টি সীমার দূরে বসেন। অতঃপর মালাকুল মউত আসেন এবং তাঁর মাথার নিকটে বসেন, অতঃপর বলেন, হে খবীছ (অপবিত্র) রূহ! বের হয়ে আস আল্লাহর ক্রোধের দিকে। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ সময় রূহ ভয়ে তাঁর শরীরের এদিক সেদিক পালাতে থাকে। তখন মালাকুল মউত তাকে টেনে বের করেন, যেমন লোহার গরম শলাকা ভিজা পশম থেকে টেনে বের করা হয় (আর তাতে পশম লেগে থাকে) । তখন তিনি তাকে গ্রহণ করেন। কিন্তু যখন গ্রহণ করেন, মুহূর্ত কালের জন্যও নিজের হাতে রাখেন না; বরং অপেক্ষামান ফেরেশতারা তাড়াতাড়ি তাকে সেই চটে জড়িয়ে নেন। তখন তা থেকে দুর্গন্ধ বের হতে থাকে–পৃথিবীতে প্রাপ্ত সমস্ত গলিত শবদেহের দুর্গন্ধ অপেক্ষা অধিক দুর্গন্ধ যুক্ত। ওকে নিয়ে তারা উপরে উঠতে থাকেন। কিন্তু যখনই তারা তাকে নিয়ে ফেরেশতাদের কোন দলের নিকট পৌঁছেন, তারা জিজ্ঞেস করেন, এই খবীছ রূহ কার? তখন তারা তাকে দুনিয়াতে যে সকল খারপ উপাধি দ্বারা ভূষিত করা হত, সেগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা লহারপটি দ্বারা ভূষিত করে বলেন, অমুকের পুত্র অমুকের, যাবৎ না তাকে প্রথম আসমান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। অতঃপর তাঁর জন্য আসমানের দরজা খুলে দিতে চাওয়া হুয়; কিন্তু খুলে দেওয়া হয় না। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমর্থনে কুরআনের এ আয়াতটি পাঠ করলেনঃ

(আরবী………)

অর্থাৎ “তাদের জন্য আসমানের দরজা খোলা হবে না এবং তারা বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না যে পর্যন্ত না সূচের ছিদ্র দিয়ে ঊট প্রবেশ করে।” (সূরা আল আ’রাফ, আয়াত ৪০)

তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, তাঁর ঠিকানা ‘সিজ্জীনে’ লেক, যমীনের সর্বনিম্ন স্তরে।

সুতরাং তাঁর রূহকে যমীনে খুব জোরে নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সমর্থনে এই আয়াত পাঠ করলেনঃ

(আরবী……….)

অর্থাৎ ;যে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করেছে, সে যেন আকাশ থেকে পড়েছে, অতঃপর পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে অথবা ঝঞ্জা তাকে বহু দূরে নিক্ষেপ করেছে;। (সূরা হজ্জ, আয়াত ৩১)

সুতরাং তাঁর রূহ তাঁর দেহে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তখন তাঁর নিকট দু’জন ফেরেশতা আসেন এবং তাকে উঠিয়ে বসা। অতঃপর তারা তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার প্রতিপালক কে? সে বলে, হায়, হায়, আমি জানিনা। অতঃপর জিজ্ঞেস করেন, তোমার দ্বীন কি? সে বলে, হায়, হায়, আমি জানি না। অতঃপর জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের মধ্যে যিনি প্রেরিত হয়েছেন, তিনি কে? সে বলে, হায়, হায়, আমি জানিনা। এ সময় আকাশের দিক থেকে এক ঘোষণাকারী ঘোষণা করেন, সে মিথ্যা বলেছে, সুতরাং তাঁর জন্য দোযখের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং দোযখের পোশাক পরিয়ে দাও এবং দোযখের দিকে একটা দরজা খুলে দাও। সুতরাং তাঁর দিকে দোযখের উত্তাপ ও লু আসতে থাকে এবং তাঁর কবর তাঁর প্রতি এত সংকুচিত হয়ে যায়, যাতে তাঁর এক দিকের পাঁজর অপর দিকে ঢুকে যায়। এ সময় তাঁর নিকট একটা অতি কুৎসিত চেহারাবিশিষ্ট নোংরাবেশী দুর্গন্ধ যুক্ত লোক আসে ও বলে, তোমাকে দুঃখিত করবে এমন জিনিসের দুঃসংবাদ গ্রহণ কর। এই দিবস সম্পর্কেই (দুনিয়াতে) তোমাকে ওয়াদা দেওয়া হতো। তখন সে জিজ্ঞেস করে, তুমি কে? কী কুৎসিত তোমার চেহারা, যা মন্দ সংবাদ বহন । সে বলে, আমি তোমার বদ আমল। তখন সে বলে, হে খোদা! কিয়ামত কায়েম কর না। (তখন আমার উপায় থাকবে না)। (মুসনাদে আহমাদঃ ৪/২৮৭-৮৮ পৃঃ)

আমরা বইটিকে অনুবাদ ও মুদ্রণের ক্ষেত্রে ক্রটিমুক্ত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছি, তা সত্ত্বেও কিছু ভুল-ক্রটি থেকে যাওয়া বিচিত্র নয়। সুতরাং সুধী পাঠকের দৃষ্টিতে কোন অসংগতি ধরা পড়লে আমাদেরকে জানানোর অনুরোধ রইল। ইনশাআল্লাহ পরবর্তী সংঙ্করণে তা সংশোধনের চেষ্টা করবো।

পরিশেষ এই সুন্দর বইটি প্রকাশের মুহূর্তে আমার দু’জন হিতাকাংখীর কথা উল্লেখ না করলে চরম অকৃতজ্ঞতা হবে। তাদের প্রথমজন হলেনঃ আমার সন্তানদের মামা জনাব মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ মাসীহুর রহমান ছাহেব, যিনি পাকিস্তান থেকে মূল বইটি এনে অনুবাদ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। অপরজন হলেন, আমার পরম শ্রদ্বেয় মুরুব্বী জনাব প্রফেসর মাওলানা গিয়াসুদ্দীন আহমাদ ছাহেব, যিনি মারাত্মক অসুস্থতায় শয্যাশায়ী হওয়া সত্ত্বেও পূর্ণ বইটির একটি গ্রুপ দেখে দিয়ে অনেক অসংগতি দূর করে দিয়েছেন। আমি উভয়ের নিকট চিরকৃতজ্ঞ। আল্লাহ পাক উভয়কে উত্তম বিনিময় দান করুন।

বইটি পাঠ করে যদি কারো মধ্যে মৃত্যু ও কবর জগত সম্পর্কে চেতনা সৃষ্টি হয় এবং তিনি আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর হন, তাহলে আমাদের শ্রম সার্থক মনে করব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলে পরকালের সঠিক পথের সংগ্রহ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

নিবেদক–

মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান খান।

জামি’আ ইসলামিয়া, ঢাকা।

২৫শে জিলকদ, ১৪২১ হিজরী।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

[পঞ্চম পরিচ্ছেদ] ইসলামী শরী‘য়াহ বাস্তবায়নের হুকুম

আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাস এটাই দাবী যে, আমরা ঈমান আনব যে, তিনি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *