Breaking News
Home / বই থেকে / আঠার (ব্যথিত হৃদয়)

আঠার (ব্যথিত হৃদয়)

এর কয়েকদিন পরেই আসল রহস্য উদঘটিত হলো। আমি যে বিষয়ে আশঙ্কা করছিলাম, অবশেষে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে তাই হয়ে গেল। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, সে বেশ কিছুদিন ধরে তাঁর এক ক্লাসমেটের প্রেমে পড়েছে। চাপ দেওয়ার পর তাঁর কাছ থেকে সেই প্রেমিকের আটটি প্রেমপত্রও পাওয়া গেল। এরপর যখন তাঁর মুখ থেকে শুনলাম যে, সে নিজেও ঐ ছেলেকে চার পাঁচটি চিঠি দিয়েছে, তখন কিন্তু আমি আর আমার ভিতরে ছিলাম না। আমি আঘাত সহ্য করতে না পেরে তাঁর সামনেই ছোট্ট শিশুটির মতো কেঁদে ফেলেছিলাম। কারণ, আমি মনে করেছিলাম, শুধু ছেলেটিই তাঁর নিকট চিঠি লিখেছিল।

এ ঘটনায় আমার মনোবল একদম ভেঙ্গে যায়। একসঙ্গে ছীরে যায় হৃদয়ের সবকটি তাঁর।

সাকিব এতক্ষণ তন্ময় হয়ে সোহেলের কথা শুনে যাচ্ছিল। এবার সে বলল–

তারপর?

তারপরের কাহিনী বড়ই করুণ। বড়ই লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক ।

লাবণীর প্রেমিকার নাম পলাশ। একদিন পলাশের পরিবার এ সম্পর্কের কথা জেনে গেল। জেনে গেল লাবণীর পিতা-মাতাও। উভয় পরিবার ছিল বেশ স্বচ্চল। কিন্তু সমস্যা লাবণীদের পরিবারের কেউই যেমন পলাশকে মেনে নিতে রাজি নয়, তেমনি পলাশের পরিবারও লাবণীকে মেনে নিতে রাজী নয়।

সামনে উভয়ের এস, এস, সি পরীক্ষা। ২০০০ সালের ১৫ এপ্রিল পরীক্ষা শুরু হবে। দুদিন আগে এডমিট তোলার জন্য লাল্বণী স্কুলে এসেছে। এসেছে পলাশও। সেদিন তাদের মধ্যে অনেক কথাবার্তা হয়। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, পরীক্ষার পরের দিনই তারা গোপনে বিয়ে করে ফেলবে। তাদের বাসর হবে চিটাগাং-এর এক আত্মীয়ের বাসায়।

লাবণী ও পলাশ উভয় খুশি। কিন্তু তারা জানতো না যে, তাদের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে না। বরং এটাই তাদের শেষ কথাবার্তা, শেষ সাক্ষাৎ।

কোনো এক মাধ্যমে ওদের সিদ্ধান্তের কথাটা লাবণীর আব্বার কানে গিয়ে পৌঁছাল। রসায়ন পরীক্ষার দিন দেখা গেল,। লাবণি অনুপস্থিত। ও পরীক্ষা দিতে না আসায় সকলের মনে কৌতূহল জাগল। আর পলাশ হলো সাংঘাতিক রকমের অস্থির। সে আধ ঘন্টার বেশি পরীক্ষার হলে থাকতে পারল না। বাথরুমের যাওয়ার নাম করে সেই যে গেল, আর ফিরে এল না। পরীক্ষা শেষে পলাশের বাবা খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, পলাশ হাসপাতালে আছে।

ঘটনা হলো, পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে পলাশ লাবণীদের বাড়িতে গিয়েছিল। তখন লাবণীর ভাই ও চাচারা তাকে জনমের মতো পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। পলাশের বাবা পুরো বিষয়টা থানায় জানালেন এবং পলাশের ঘাড়ে প্রচন্ড আঘাত পাওয়ায় তাকে ঢাকা নিয়ে এলেন।

এই ঘটনার পর লাবণীর পিতা তাকে ঘরে আটকে রাখে। কোথাও যেতে দেয় না। এমন কি আত্মীয়-স্বজনদের বাসায়ও না।

লাবণীর পিতা ছেলে খোঁজতে থাকেন। একসময় তিনি মনের মতো ছেলে পেয়েও যান। তাই দেরী না করে তিনি বিয়ের তারিখও ঠিক করে ফেলেন।

এদিকে দীর্ঘ এগারো মাস হাসপাতালে থাকার পর পলাশ বাড়ি ফিরল। সে লোকমুখে শুনতে পেল, আর তিনদিন পর লাবণীর বিয়ে। একমাত্র ছেলে হিসেবে পলাশের মা পলাশকে শপথ করিয়েছেন যে, লাবণীর বিয়েতে সে কোনো বাধার সৃষ্টি করবে না।

লাবণীর বিয়ের সংবাদ শুনে পলাশ তাঁর বন্ধুদের বলেছিল, বুকের ভিতর তাঁর রক্তক্ষরণ হয়ে যাচ্ছে। হয়তো সে আর বেশিদিন বাঁচবে না।

লাবণীর বিয়ের দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পলাশ তাঁর এক ঘনিষ্ট বন্ধুর সাথেই ছিল। সারাদিন কিছুই খায়নি সে। বিকালে একবার সে তাঁর বন্ধুকে বলেছিল, আচ্ছা! লাবণী কি আমার কথা একবারও ভাবছে না?

রাত প্রায় তিনটা। ধীরে ধীরে পলাশ ঘর থেকে বের হয়। তারপর অন্ধকারে খোলা আকাশের নীচে বসে কাদতে থাকে। যে পলাশ জীবনে সবচেয়ে বেশি বয় কুরত অন্ধকারকে, সে-ই আজ অন্ধকারে বসে নীরবে অশ্রু ঝরাচ্ছে! বাকি রাতটুকু পলাশ আর ঘুমায় নি। যতই ভোর হচ্ছে ততই এক অজানা অস্থিরতা এসে পলাশকে গ্রাস করছে। তাঁর বুকটা হাহাকার করছে।

ফজরের নামাজের পর পরই একটি খবর পলাশের হৃদয়টাকে ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছে। সে বিশ্বস্তসূত্র খবর পায়, লাবণী আত্মহত্যা করেছে।

পলাশ দৌড়ে ছুটে যেতে চাইল। কিন্তু বাড়ির সবাই তাকে জোর করে ধরে রাখল। তাকে কতক্ষণ ধরে রাখা যাবে?

পলাশের নামে কেস হলো। তবে তাকে আর গ্রেফতার করার প্রয়োজন হয় নি। পরের দিন ওই একই সময়ে সেও আত্মহত্যা করে চিরবিদায় নিল এই পৃথিবী থেকে। অবৈধ প্রেমের নিষ্ঠুর পরিণতি হিসেবে ঝরে গেল দুটি তাজা প্রাণ!

বন্ধু! আমার লাবণী খুব ভালো মেয়ে ছিল। তাঁর এমন কিছু সৎ গুণ ছিল যা অন্য মেয়েদের মধ্যে বিরল। সহশিক্ষার এ পরিবেশ তাকে নষ্ট করেছে–এ আমি শপথ করে বলতে পারি। তাঁর আত্মা হয়তো অনেক যুদ্ধ করেছে ঐ পরিবেশের সাথে। হয়তো আপ্রাণ চেষ্টা করেছে আমার সাথে কৃত ওয়াদা রক্ষা করতে। কিন্ত না, সে পেরে ওঠতে পারে নি। সে পরাজিত হয়েছে ঐ পরিবেশের কাছে। অবশেষে গলাফল যা হওয়ার তাই হলো।

বন্ধু তুমিই বলো তো, সে কিভাবে পারবে ঐ পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে, যে পরিবেশে সে দিনের আটটি ঘন্টা কাটায় উঠতি বয়সের ছেলেদের সাথে? সেখানে তাঁর সব বান্ধবীরা নিজ নিজ বন্ধু বানিয়ে নিয়েছে? সে যখন দেখছে , তাঁর বান্ধবীরা সবাই নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী বন্ধু ঠিক করে নিয়েছে, তখন সে কতদিন একলা একজন হয়ে দিন কাটাতে পারবে? উপরন্তু সেখানে কোনো বাধাও নেই, বরং পরোক্ষভাবে এক ধরনের উৎসাহ পাওয়া যায়। বন্ধু! তুমিই বলো, এহেন পরিস্থিতিতে কতদিন সে কৃত প্রতিশ্রুতি বলবৎ রাখতে পারবে? এ স্কুলের পরিবেশই লাবণির মনকে নষ্ট করেছে। তাঁর পবিত্র আন্তরকে কলুষিত করেছে।

ধিক! শত ধিক!! এমন শিক্ষানীতি ও শিক্ষার পরিবেশের উপর।

বঁধু! আমি এখনো আমার ওয়াদার উপর অবিচল আছি। আর আমার জন্য এটা খুব সহজ। কারণ আমি মাদরাসায় পড়াশুনা করি। যেখানে অবৈধ প্রেম করার সুযোগ যেমন নেই, তেমনি সেখানে প্রেম-ভালোবাসা গড়ে তোলার কোনো পরিবেশও নেই।

এখন পথে-ঘাটে তাঁর বয়সী কোনো স্কুল ছাত্রী হঠাৎ নযরে পড়লে প্রাণটা হু হু করে কেদে ওঠে। তাই আমার মনে চায়, আমি এই মেয়েদের অভিভাবকদের কাছে গিয়ে চিৎকার করে বলি–আপনারা আপনাদের আদরের মেয়েদেরকে সহশিক্ষার হাইস্কুলে পাঠাবেন না। ওখানে গেলে ওদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। ওরা আপনাদের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা চুরমার করে দিবে। নারীর অপূর্ব ভূষণ-লজ্জাশীলতাকে বিদায় জানাবে। বেপর্দায় চলতে অভ্যস্ত হবে। বাড়িতে পাওয়া নৈতিক ও ঈমানী দীক্ষাগুলো ওখানে গিয়ে হারিয়ে আসবে। কারণ, ওখানকার পরিবেশটাই এরকম। ওখানে পাঠালে আপনারা তাদের উপর জুলুম করবেন। আমার অনুরোধ কেউ যেন তাঁর বড় মেয়েকে ছেলেদের স্কুলে না পাঠায়। এই স্কুলের পরিবেশই আমার লাবণীকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। আমার লাবণীর অন্তরকে পাল্টে দিয়ছে।

এতটুকু বলে সোহেল সাকিবের পূর্ণরূপে তাকায়। সে দেখল, সাকিবের চোখ দুটো ভিজে ওঠেছে।

সোহেলের কথা শেষ হলে সাকিব বলল, ভাই সোহেল! আল্লাহর হুকুম না মানার কারণেই আজ এ ধরণের মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার জম্ম হচ্ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সহশিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈধ ও হারাম। কেননা পবিত্র কোরআন ও হাদীসে পর্দাকে ফরজ করা হয়েছে। আর সহশিক্ষা দ্বারা সর্বপ্রথম এই বিধান লঙ্ঘিত হয়। অতঃপর এ থেকে সৃষ্টি হয় হাজারো সমস্যা। রচিত হয় তোমার শোনানো ঘটনার মতো নানাবিধ দুঃখজনক ঘটনা। আল্লাহ পাক সকল মুসলমান ভাইবোনদের কে একথাটি বুঝার ও আমল করার তাওফীক দান করুক।

সোহেল বলল, আমীন।

এতক্ষণে বাস সায়েদাবাদ চলে এসেছে। বাস থেকে নেমে সাকিব বলল, ভাই সোহেল! তোমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়ায় আকজের ভ্রমণটা যেমন ভালো লাগল, তেমনি তোমার বলা ঘটনা থেকে আমার চিন্তার জগতেও এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হলো। যা আমার গবেষণা সেন্টারে দারুণ কাজে আসবে। দু’একদিনের মধদ্দ্যেই আমার সাথীদের সাথে পরামর্শ করে ‘সহশিক্ষা’ ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা’ এবং এ জাতীয় কিছু বিষয় নির্ধারণ করে এসব বিষয়ের উপর একটি আলোচনা সভার আয়োজন করব। উক্ত আলোচনা সভায় নির্ধারিত বিষয়ের উপর দেশের খায়াতিমান ইসলামী চিন্তাবিদগণ যে মূল্যবান আলচনা পেশ করবেন, তা দিয়ে আমরা আমাদের রিচার্স সেন্টারের পক্ষ থেকে একটি সেমিনার স্মারক বের করব। আশা করি তুমিও সেদিন আসবে। তোমার অগ্রীম দাওয়াত রইল। তারিখটা তোমাকে পরে জানাব। এবলে সালাম ও বিদায়ী মোসাফাহা করে প্রত্যেক যার যার গন্তব্য অভিমুখে রওয়ানা দিল।-আরো পড়ুন

আপনি পড়ছেনঃ ব্যথিত হৃদয় (ইসলামীক উপন্যাস)

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE