Breaking News
Home / বই থেকে / এগার (ব্যথিত হৃদয়)

এগার (ব্যথিত হৃদয়)

সাকিব লেখাপড়ায় বেশ ভাল। মাত্র দেড় বছরে হেফয শেষ করেছে সে। তারপর জামাত বিভাগে ভর্তি হয়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। ভর্তি হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর একটি ক্লাসও বাদ যায় নি। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হওয়াকে সে নিজের জন্য অপরিহার্য করে নিয়েছে। প্রতিদিন সে ভালোভাবে পড়া মুখস্থ করে আসে। যেসব ছাত্র ক্লাসের পড়া ভালো করে বুঝতে পারে না, সে তাদেরকে আবার বুঝিয়ে দেয়। সে সবাইকে বলে দিয়েছে, পড়া সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যার জন্য আমি তোমাদের পাশে আছি। তোমরা যে কোনো সময় নির্দ্বিধায় আমার কাছে আসতে পারো।

সময় আপন গতিতে গতিময়। এর ঘুর্ণায়মান চাকাটি কখনো ক্লান্ত হয় না। চলতে থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। কার সাধ্য আছে তাঁর পথ রুখে দাঁড়াবার!

কালের এই পরিক্রমায় সাকিব ধীরে ধীরে বড় হয়। সেই সাথে প্রতিটি ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করে আজ সে ইফতা বিভাগের নামকরা ছাত্র। গতবছর দাওরায়ে হাদীসের পরীক্ষায় বোর্ডের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে সে।

সাকিবদের ক্লাসে নিয়মিত আসতেন তাদের শ্রদ্ধেয় উস্তাদ মুফতি শফীউল্লাহ সাহেব। তিনি খুব মিশুক প্রকৃতির লোক। নামকরা এক আল্লাহর ওলী থেকে প্রায় এক যুগ আগে খেলাফত প্রাপ্ত হয়েছেন। সর্বদা তাঁর মুখে আল্লাহর জিকির লেগেই থাকে। ঠোঁট দুটি নড়তে থাকে অবিরতভাবে। তাঁর বিনম্র আচরণ ও স্বভাব-চরিত্র সত্যিই ঈর্ষাণীয়। ছাত্রদেরকে তিনি আপন সন্তানের মতোই ভালোবাসেন। আদর করেন। এজন্য সব ছাত্রই নিঃসংকোচে মনে উদয় হওয়া বিভিন্ন প্রশ্ন তাঁর নিকট করে। তিনি হাসিমুখে জবাব দেন। অতি জটিল বিষয়গুলোও খুব সহজভাবে বুঝিয়ে দেন। তাঁর একটি বড় বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি তাঁর ছাত্রদেরকে যুগোপযোগী আলেম বানানোর জন্য বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা চ্চালান। মজবুত ঈমান ও পরিপূর্ণ আমলদার তৈরির ফিকির করেন।

একদিন মুফতি সাহেব যথারীতি ক্লাস করলেন। যাওয়ার পূর্বে ছাত্রদের বললেন, আচ্ছা! তোমরা তো মাশাআল্লাহ আল্লাহর উপর ভরসা ও তাঁর অসীম শক্তি সম্পর্কে অনেক কিছু পড়েছ। জানোও অনেক কিছু। আমি আগামীকাল তোমাদের মুখ থেকে এ বিষয়ে কিছু শুনতে চাই। কী বলো তোমরা?

ছাত্ররা বলল, জ্বী হুজুর। আমরা তৈরি থাকব।

সাকিবদের ক্লাসে মোট বারজন ছাত্র। সবাই মেধাবী এবং যুগ সচেতন আলেম। ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী হওয়া ছাড়াও দুনিয়ার উত্থান-পতন ও অবস্থা সম্পর্কে বেশ ওয়াকেফহাল তারা। পরদিন মুফতি সাহেব ক্লাসে এসে বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রশ্ন করে নির্ধারিত বিষয়ের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা শুনলেন। সবশেষে তিনি সাকিবকে লক্ষ্য করে বললেন, মাওলানা সাকিবুল হাসান! তুমি বলো তো, সুখি জীবন লাভের উদ্দেশ্যে উপায়-উপকরণ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তালার উপর একজন মুমিন ও কাফেরের বিশ্বাস কেমন হয়ে থাকে?

সাকিব দাঁড়িয়ে যায়। সবার দৃষ্টি তখন সাকিবের মুখের দিকে। কক্ষে পিনপতন নীরবতা। আধঘন্টা পরেই আছরের আযান হবে। সুতরাং এর মধ্যেই সাকিবের মূল কথাগুলো বলে শেষ করতে হবে। সে বলতে থাক—

সুখী জীবন সবাই কামনা করে। সুখী ও স্বাচ্ছন্দময় জীবনের প্রত্যাশায় মানুষ শারীরিক সুস্থতা ও দুনিয়াবী বস্তু—সামগ্রী হাসিল করার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালায়। এ চেষ্টা কাফেররা যেমন করে, মুমিনরাও করে। তবে এ ব্যাপারে একজন মুমিন ও কাফিরের মাঝে আক্বিদা-বিশ্বাস ও ধ্যান—ধারণার ক্ষেত্রে আকাশ পাতাল ব্যবধান বিদ্যমান। যদিও মুমিন ব্যক্তি দুনিয়াবী কোনো কার্যসিদ্ধির জন্য বিভিন্ন মাধ্যম ও উপায়-উপকরণ গ্রহণ করে, কিন্তু মুমিনের হৃদয়ে সর্বদাই এ বিশ্বাস বদ্ধমূল থাকে যে, এসব মাধ্যম ও উপকরণ ওসিলামাত্র। এগুলোর দ্বারা কিছুই হবে না, হতে পারে না—যদি আল্লাহ তাআলা চান। আবার তিনি যদি চান, তবে কোনো আসবাব ও উপকরণ ছাড়াই সব কিছু হতে পারে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কোনো কার্য হাসিল হওয়ার ব্যাপারে মুমিনগণ একমাত্র আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা করে এবং তাঁর প্রতিই তাদের নিবদ্ধ রাখে।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যদি কোনো ব্যক্তি বেকার থাকে, আর সে চাকরীর প্রত্যাশী হয়, তাহলে সে চাকুরী পাওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে এবং চাকুরী পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন সব প্রতিষ্ঠানে আবেদনপত্র জমা দেয়। তৎসঙ্গে প্রয়োজনে সুপারিশ করানো সম্ভব হলে, সুপারিশও করায়। এসব হচ্ছে বাহ্যিক কার্যকলাপ, যেখানে একজন কাফের ও একজন মুমিনের কোনো পার্থক্য নেই।

কিন্তু এ বিষয়ে আক্বিদা-বিশ্বাসস ও চিন্তাধারার ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। তা হলো-কাফির ব্যক্তি নিজের কর্মদক্ষতা, আবেদন পত্র নির্ভুল হওয়া এবং উপযুক্ত ব্যক্তি দ্বারা সুপারিশ করানো ইত্যাদির উপরই ভরসা করে থাকে এবং এসব উপায়-উপকরণগুলোকেই কার্য হাসিল হওয়ার একমাত্র মাধ্যম বলে মনে করে। পক্ষান্তরে একজন মুমিন যদিও চাকুরীর জন্য এসব উপায় উপকরণ গ্রহণ করেন, কিন্তু কার্যসিদ্ধির জন্য একমাত্র আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা করেন।

অনুরূপভাবে অসুখ—বিসুখ হলে আরোগ্য লাভের জন্য ডাক্তার দেখানো, ঔষধ সেবন এবং দাক্তারের বিধি-নিষেধ মান্যকরণ ইত্যাদি যদিও একজন মুমিন ও কাফের উভয়েই গ্রহণ করে থাকে, কিন্তু উভয়ের আক্বিদা-বিশ্বাস ও চিন্তাধারার ক্ষেত্রে রয়েছে অসামান্য ফারাক। তা এই যে, একজন কাফের, রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সঠিক হওয়া, উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা, ডাক্তার অভিজ্ঞ হওয়া প্রভৃতির উপরই ভরসা করে থাকে। কিন্তু একজন মুমিন আরোগ্য লাভের ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা পূর্ণ আস্থা ও ভরসা করে থাকেন। তিনি এ বিশ্বাস পোষণ করেন যে, আল্লাহ যদি আরোগ্য দান করেন, তবেই ডাক্তারের চিকিৎসা ও ঔষধের দ্বারা আরোগ্য লাভ হতে পারে। আর তিনি যদি আরোগ্য দান না করেন, তবে দুনিয়ার যত বড় ডাক্তার আর উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতিই অবলম্বন করা হউক না কেন, কোনো কিছুই কাজে আসবে না।

এমনিভাবে কৃষিকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি মুমিন-কাফের উভয়েই করে।

তবে কাফের ব্যক্তি এসব ক্ষেত্রে উন্নত পদ্ধতি ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারকেই সফলতার সোপান বলে মনে করে। সে মনে করে, যদি উপযুক্ত সময়ে নিয়মানুযায়ী কৃষি বীজ বপন করা যায়, প্রয়োজনীয় পরিচর্চা করা যায়, সার-পানি ঠিকমত দেওয়া যায়, উপযুক্ত পরিবেশে দক্ষ লোক দ্বারা ব্যবসা পরিচালনা করা যায়, তাহলে এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই কামিয়াব হওয়া যাবে।

পক্ষান্তরে মুমিন ব্যক্তি বিশ্বাস করে, ব্যবসায় লাভ হওয়া, কৃষিপণ্য ঘরে তোলা ইত্যাদি তখনই সম্ভব যখন আল্লাহ তাআলা চাইবেন। যদি আল্লাহ পাক না চান, তবে কৃষি পদ্ধতি যত উন্নতমানেরই হউক না কেন, ব্যবসা-বাণিজ্য যত অত্যাধুনিক সিস্টেমেই করা হউক না কেন, তা কখনোই সফলতার মুখ দেখবে না। বরং দিন দিন কেবল অবনতির দিকেই যেতে থাকবে।

নবী করীম (সাঃ) আমাদেরকে এ শিক্ষাই দিয়েছেন যে, রোগ হলে তোমরা ঔষুধ সেবন করো, বিভিন্ন কাজ ও সমস্যা সমাধানের জন্য উপায়-উপকরণ ও মাধ্যম গ্রহণ করো, কিন্তু আরোগ্য লাভ বা কার্যসিদ্ধির ব্যাপারে তোমাদের ভরসা ও আস্থা যেন বস্তুত প্রতি না হয়, বরং একমাত্র আল্লাহর উপরই যেন হয়।

বস্তুত লক্ষ্য উদ্দেশ্য সঠিক হওয়ার মধ্যেই দীনদারীর মূল তত্ত্ব নিহিত আছে। বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার শক্তি ও ক্ষমতার উপর ভরসা করে কোনো কাজ করে তখন ঐ কাজ তাঁর দীনদারী ও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আর যদি উক্ত কাজটি দুনিয়ার বস্তু—সামগ্রীর উপর ভরসা করে করা হয়, তবে তা দুনিয়াবী কার্য বলে গণ্য হয়। সুতরাং মানবজীবনে কৃতকার্য হওয়ার একমাত্র পথ হচ্ছে—জীবনের প্রতিটি কার্য সমাধার ক্ষেত্রে বস্তু ও আসবাব থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে একমাত্র আল্লাহ পাকের শক্তি ও ক্ষমতার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা এবং এই আস্থা ও ভরসা স্থাপন করা যে, যা কিছু হচ্ছে এবং যা কিছু হবে, সবই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় হচ্ছে এবং হবে। আল্লাহ পাকের ইচ্ছা ছাড়া বস্তু ও উপকরণের এককভাবে কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই।

একাহেন প্রশ্ন হতে পারে, বস্তুত যখন কোনো কিছুই এককভাবে করার ক্ষমতা নেই, তাহলে আল্লাহ তাআলা বস্তুত মধ্যে বিভিন্ন প্রভাব দিতে রেখেছেন কেন? যেমন, আগুনের মধ্যে পুড়ানোর ক্ষমতা, পানির মধ্যে ডুবানোর ক্ষমতা, ঔষধের মধ্যে রোগ আরোগ্যের ক্ষমতা ইত্যাদি। এর সহজ জবাব এই যে, এসকল বস্তুত মধ্যে আল্লাহ তাআলা এজন্যেই প্রভাব সৃষ্টি করে দিয়েছেন যে, মানুষের দৃষ্টি কি এসব বস্তু ও উপকরণের মধদ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি মানুষ এসকল বিষয়ের অন্তরালে মহান আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, তা পরীক্ষা করে দেখা।

তবে দুঃখের বিষয় এই যে, বাস্তবে তালাশ করলে দেখা যায়, এসব ক্ষেত্রে বিশ্বাসের বেলায় আজকাল অনেক মুমিন ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না। একজন কাফের যেমন বস্তুত উপর ভরসা করে, তেমনি অনেক মুমিনও বস্তুত উপর ভরসা করে বসে থাকে। তাদের দৃষ্টিও কাফেরদের ন্যায় বস্তু ও উপায়-উপকরণের উর্ধ্বে ওঠে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছায় না। এ যে মুমিন জীবনের কত বড় ব্যর্থতা, দুনিয়া ও আখেরাতে কত বড় ক্ষতির কারণ, তা ভাবতে গেলে শরীর শিহরিয়ে ওঠে। দু’চোখ দিয়ে নেমে আসে অশ্রু-বন্যা।

তাই আমাদের উচিৎ হবে, সকল কাজ ও সমস্যা সমাধানের জন্য সামর্থানুযায়ী প্রয়োজনীয় সবকিছু করার পরও মহান আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা করা এবং দুনিয়ার চীজ ও আসবাবকে আল্লাহ তাআলার হুকুমের দাস বলে জ্ঞান করা। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন আমীন।

এ বলে সাকিব তাঁর কথা শেষ করে।

সাকিবের সংক্ষিপ্ত অথচ বিষয়ভিত্তিক সারগর্ভ আলোচনা শুনে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে যায়। হতবাক হন মুফতি শফীউল্লাহ সাহেবও। তিনি চিন্তা করতে থাকেন, এই সোনার ছেলেকে সঠিকভাবে গাইড করতে পারলে তাঁর দ্বারা আল্লাহ চাহে তো, দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ সমাধা করা সম্ভব হবে।

কিছুক্ষণ পর আছরের আযান শুরু হলে সবাই নামাজের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।-আরো পড়ুন

আপনি পড়ছেনঃ ব্যথিত হৃদয় (ইসলামীক উপন্যাস)

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE