Breaking News
Home / বই থেকে / তিন (ব্যথিত হৃদয়)

তিন (ব্যথিত হৃদয়)

হোটেলের সামনের চেয়ারে বসে হাজী বশীর সাহেব ধুমায়িত চাপের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন। হঠাৎ তার সামনের দিয়ে একটি ছেলেকে চলে যেতে দেখে তাকে ডাকলেন। বললেন, এই ছেলে! বাড়ি কোথায়? নাম  কি তোমার? এখানে কিজন্য ঘোরাফেরা করছ?

সাকিব তার পরিচয় দিল। শহরে আসার উদ্দেশ্য জানাল। বশীর সাহেব বললেন—

হোটেলে কাজ করতে পারবে?

পারব, ইনশাআল্লাহ। আমার কি কাজ হবে স্যার?

আক আর কি! চা—নাস্তা এগিয়ে দিবি, কাপ—পিরিচগুলো ধুয়ে—মুছে ঠিক রাখবি। মাঝে মধ্যে ঘর ঝাড়ু দিবি, এই তো। এ ধরণের ছোটখাটো কাজই তোমাকে দিয়ে করাব।

ঠিক আছে স্যার।

এবার একটা ঠাঁয় খুঁজে পায় সাকিব। কৃতজ্ঞতায় মাথাটা নুয়ে আসতে চায় বশীর সাহেবের দিকে। যোগ দেয় হোটেলের কাজে। সে খানে পুরো দিন কাজ করে। সারাদিনের বিরামহীন পরিশ্রমে বড়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ে সাকিব। তাই গভীর রাতে দরজা জানালা বন্ধ করে বিছানায় যেতেই গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়ে সে।

হোটেল বয়ের কাজ করলেও এক ওয়াক্ত নামাজও কাযা করে না সাকিব। সে হোটেল মালিক বশীর সাহেবের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে আদায় করে। কোনো ওয়াক্তে মালিক না থাকলে একাই সে মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে আসে। অবশ্য কাজের চাপে প্রায়ই তার জামাত ছুটে যায়।

ধীরে ধীরে সিঙ্গারা ভাঁজা, পরাটা ভাঁজা এবং চা তৈরির কাজটাও রপ্ত করে নেয় সাকিব। তাছাড়া অল্প দিনের মধ্যেই গেঁয়ো চালচলন, কথাবার্তা ছেড়ে শহুরে ধাঁচে নিজেকে গড়ে নেয় সে। এখন তার থাকা—খাওয়ার কষ্ট যদিও আর নেই, কিন্তু তবু তার মনটা ভালো নেই। সর্বদাই কেমন একটা উদাস উদাস ভাব।

সকালে হোটেলের সামনে দিয়ে ব্যাগ হাতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যখন স্কুলে যায়, তখন তাদের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সাকিব। স্মৃতির সূত্র ধরে টান দিতেই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে ফেলে আসা বিদ্যালয় ও খেলার সাথীদের চেহারাগুলো। বিশেষ করে বাল্যবন্ধু শাকিলকে সে কিছুতেই মনের আড়াল করতে পারে না। তখন কেমন যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে সে। কিছুই তখন ভালো লাগে না তার। মন চায় আবার লেখা পড়া করতে। কারণ, হোটেলের কাজ তার জ্ঞানপিপাসু মনকে স্বস্তি দিতে পারে না। এভাবে বিভিন্ন চিন্তায় দিন গড়িয়ে রাত হয়। কাজ শেষ আবার ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবেই চলতে থাকে তার জীবনের মূল্যবান মুহুর্তগুলো।

গভীর রজনী। ঘোর অন্ধকার পৃথিবী আচ্ছন্ন। জন—প্রাণীর সাড়া শব্দ নেই। পথ, ঘাট, নগর, প্রান্তর নীরব—নিথর, নিস্তব্ধ। প্রকৃতি শান্তির সুখময় ক্রোড়ে নিদ্রিত। কেবল কতগুলো নিশাচরের শব্দ মাঝে মধ্যে তার শান্তি ভঙ্গ করছে।

সাকিব একটি চৌকিতে শুতে আছে। হঠাৎ সে স্বপ্নে দেখে, তার পরলকগত মা শিয়রে বসে তার মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছেন। আর মমতার সুরে বলছেন, বাবা! লেখাপড়া ছেড়ে কেন তুমি হোটেলের কাজ করছ? তুমি তো এখানে এসে জামাতের সাথে ঠিকমত নামাজও পড়তে পারছ না। আমি চেয়েছিলাম তুমি লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হবে। সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। আমার ইচ্ছা ছিল, প্রায়মারী পাশ করার পর তোমাকে মাদরাসায় ভর্তি করে দিব। সেখানে তুমি হাফেজ হবে। আলেম হবে। দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করবে। আত্মনিয়োগ করবে পবিত্র ধর্ম ইসলামের প্রচার—প্রসারে। কিন্তু সে আশা তো আর পূরণ হলো না। মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে আমাকে চলে আসতে হলো। শোন বাবা! জীবনে বড় হতে হলে অএঙ্ক কষ্ট ত্যাগ—তিতিক্ষা। কষ্ট ও ত্যাগ ছাড়া জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করা যায় না। বড় মাপের মানুষ হওয়া যায়। আজ আমরা যাদেরকে মনীষী বলি, তাদের জীবনী পাঠ করে দেখো, তারা বড় হওয়ার জন্য, জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য কত কুরবানী করেছেন, কত বিপদাপদ ও কষ্টের পাহাড় ডিঙ্গিয়েছেন। কত শক্ত বাধার প্রাচীর অতিক্রম করেছেন। মনে রেখো, যারা যত বেশি কষ্টসহিষ্ণু ও ত্যাগী হয় তারাই পরবর্তীতে ততোধিক সফলতা লাভ করে। উজ্জ্বল করে দেশ ও জাতির মুখ। তারাই জগতে স্বরণীয়-বরণীয় হয়ে থাকে। সকলের স্মৃতিতে হয়ে থাকে চির অমর, চির অম্লান।

একটি কালো বিড়াল খালি পাতিলটার কানায় পা দিতেই ভীষণ শব্দ করে পাতিলটা নিচে পড়ে যায়। ভয় পেয়ে দড়ফড় করে জেগে ওঠে সাকিব। অন্ধকারে চোখ কচলাতে কচলাতে বলতে থাকে—‘মা! মা! তুমি কোথায় গেলে মা। তোমার এই দুঃখী ছেলের হৃদয়স্পর্শী করুণ কথাগুলো শুনে যাও মা। ক্ষণিকের জন্য দেখা দিয়ে কোথায় হারিয়ে গেলে তুমি? জানো মা! তুমি চলে যাওয়ার পর থেকে আব্বু আর আমাকে একটুও আদর করেন না। নতুন জামাও কিনে দেন না। কেমন যেন হয়ে গেছেন তিনি। প্রায় দিনই আব্বু ছোট মারব কথা শুনে আমাকে মারপিট করেন। আর ছোট মা তো কয়েক ধাপ এগিয়ে। তুমি দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর এমন কোনো দিন যায় নি যেদিন আমি তার পিটুনি খায়নি; গালমন্দ শুনি নি। তুমি যদি এলেই মা, তাহলে আমাকে একা ফেলে কেন চলে গেলে মা!’

বলতে বলতে সাকিব হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।

পাখির কলকাকলিতে রাতের আঁধার কেটে ভোর হয়। উঁকি দেয় সোনালী আলো। ধীরে ধীরে চারিদিক ফর্সা হয়ে উঠে। কিন্তু সাকিবের আজ একটুও ভালো লাগছে না। মনটা তার ব্যাথায় টনটন করছে। কাজে বিঘ্ন ঘটছে বারবার। সারাক্ষণ কানে বাজছে মায়ের কথাগুলো—শোন বাবা! জীবনে বড় হতে হলে অনেক কষ্ট করতে হয়……………।

মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে সাকিব । বলে—না, আমাকে এভাবে হোটেলের কাজ করলে চলবে না। যেভাবেই হোক লেখাপড়া আমাকে শিখতে হবে। মায়ের আশা পূরণ করতে হবে। এসব কথা ভেবে হোটেলের কাজ শেষ হতে না হতেই সে জামাটা গায়ে দিয়ে বাংলাবাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। তারপর গত মাসের বেতনের টাকা দিয়ে ইসলামিয়া কুতুবখানা, আল—কাউছার প্রকাশনী, দারুল উলূম লাইব্রেরী ও আল হিকমাহ পাবলিকেশন্স থেকে বেশ কয়েকটি ধর্মীয় বাংলা বই কিনে আবার চলে আসে আপন আশ্রয়ে।

দিনে সাকিবের লেখাপড়ার সুযোগ নেই। তাই রাতকেই সে লেখাপড়ার জন্য বেছে নেয়। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখনই তার বই পড়া শুরু হয়। তার উদ্দেশ্য হলো, আপাতত ধর্মীয় বই—পুস্তুক পড়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনার জন্য মনটাকে আরেকটু মজবুত করা।

কর্মক্লান্ত দেহ নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত বই পড়ে সাকিব। অনেক সময় চোখ দুটো আপনা আপনি বুঁজে আসতে চায়। কিন্তু জোর করে নিজেকে পড়াশুনায় নিমগ্ন রাখে সে। কখনো হাত মুখ ধুয়ে, কখনো বা হাঁটাহাঁটি করে ঘুম তাড়াবার চেষ্টা করে। তদুপরি মায়ের স্বপ্ন যেন বাস্তবায়িত হয় সেজন্য প্রায়ই সে মহান প্রভুর দরবারে কেঁদে – কেটে দোয়া করে। হৃদয়ের গভীর থেকে আকুল আবেদন জানায়। এভাবেই সাকিব এগুতে থাকে আপন লক্ষ্য পানে।-আরো পড়ুন

আপনি পড়ছেনঃ ব্যথিত হৃদয় (ইসলামীক উপন্যাস)

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE