Breaking News
Home / বই থেকে / ত্যাগের মহিমা-১

ত্যাগের মহিমা-১

আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—

وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّى يُغْنِيَهُمْ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَالَّذِينَ يَبْتَغُونَ الْكِتَابَ مِمَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ فَكَاتِبُوهُمْ إِنْ عَلِمْتُمْ فِيهِمْ خَيْرًا وَآتُوهُم مِّن مَّالِ اللَّهِ الَّذِي آتَاكُمْ وَلَا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاء إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنًا لِّتَبْتَغُوا عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَن يُكْرِههُّنَّ فَإِنَّ اللَّهَ مِن بَعْدِ إِكْرَاهِهِنَّ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

যারা বিবাহে সামর্থ নয়, তারা যেন সংযম অবলম্বন করে যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন। তোমাদের অধিকারভুক্তদের মধ্যে যারা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করতে চায়, তাদের সাথে তোমরা লিখিত চুক্তি কর যদি জান যে, তাদের মধ্যে কল্যাণ আছে। আল্লাহ তোমাদেরকে যে, অর্থ-কড়ি দিয়েছেন, তা থেকে তাদেরকে দান কর। তোমাদের দাসীরা নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করতে চাইলে তোমরা পার্থিব জীবনের সম্পদের লালসায় তাদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য কারো না। যদি কেহ তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করে, তবে তাদের উপর জোর-জবরদস্তির পর আল্লাহ তাদের প্রতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।–

সূরা—নূর—আয়াত—৩৩।

 

h83আরবের জাহেলী সমাজে অতিশয় জঘন্য ও নোংরা একটি প্রথা প্রচলিত ছিল। কতক ধনী শ্রেণীর লোক নিজ ক্রীতদাসীদের অবৈধ যৌনাচার ও ব্যভিচারে বাধ্য করে তাদের সম্ভ্রম ও সতীত্বের বাণিজ্য করত। বেচারী ক্রীতদাসীরা এ গর্হিত কাজে বাধ্য ও অসহায় ছিল। এহেন অসহায় মানুষ যদি শুচিমনে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করে তাহলে তাঁর ক্ষমার দরিয়ায় জোয়ার শুরু হয়ে যায়। ইসলাম জাহেলী বর্বরতা আর আগ্রাসনের বিপরীতে উদারতা ও সহমর্মিতার পয়গাম নিয়ে এসেছে। মানবীয় অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে যারা স্বার্থপরতার সয়লাভ ঘটাতে চায়। পাপের কালিমায় যারা সমাজকে কলুষিত করতে চায় তাদেরকে দমন করতে ইসলাম বজ্রশপথে মুষ্টিবদ্ধ।

মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাই মদীনাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিরোধিতা ও তাঁর ক্ষতি সাধনে চেষ্টার সামান্য ক্রটি করে নাই। এ পাপাত্মা মুনাফিক কেবল নিখিল বিশ্বের পবিত্রতম পরিবার অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সতী—সাধ্বী ও পবিত্র স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) এর কপালে মিথ্যা অপবাদের ভিত্তিহীণ কালিমা লেপ্টে ক্ষান্ত হয়নি। অবশ্য আল্লাহ পাক আল কুরআনের মাধ্যমে এ অপবাদের অপনোদন করে আয়েশা (রাঃ) এর শুচিতাকে অম্লান করে দিয়েছেন বরং আরো নোংরা জঘন্য কাজ হরহামেশাই করে যাচ্ছিল। কয়েকজন দাসীকে সে জোরপূর্বক ব্যভিচারে লিপ্ত করত। স্বগোত্রীয় শরীফ ও মান্যবর একজন লোক আগত অতিথিদের মুখে পাপের পেয়ালা তুলে ধরবে; এর চেয়ে লজ্জাকর আর কী হতে পারে? আব্দুল্লাহ জোর করে তাঁকে ব্যভিচারে নিয়োজিত করে সম্পদ হাসিল করত দু হাত ভরে। বলা যায় ইসলামের জম্ম শত্রু ইয়াহুদী ও মুনাফিকরা এক অঘোষিত চারিত্রিক আগ্রাসনের সূচনা করতে চেয়ছিল এর মাধ্যমে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিজরতের পূর্বে মদীনার লোকেরা আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে নিজদের বাদশাহ বানানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়র ফেলেছিল। কেউ কেউ তো তাঁকে পরানোর জন্য একটি সুদৃশ্য মুকুট বানানোও শুরু করে দিয়েছিল। এ জন্যই এ মুনাফিকটার অন্তর ইসলাম ও মুসলমানের প্রতি প্রচন্ড হিংসা ও বিদ্বেষে ভরপুর ছিল। মুসলমানদের কোন বিজয় বা ঐশী সাহায্যের সংবাদ পেলেই ক্রোধে ও হিংসা আক্রোশে ফেটে পড়তে চাইত সে। তাঁর অত্যতম একটি অপকর্ম হল উহুদ যুদ্ধের সময় সৈন্যবাহিনীর এক তৃতীয়াংশ নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আলাদা হয়ে সে মদীনা ফিরে এসেছিল। তাদের এ পশ্চাদপদতার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই মনক্ষুণ্ন হন।

একে একে বে মুনাফিকের সকল অপচেষ্টাই যখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, তখন জাহেলী যুগের অশ্লীল পন্থায় অবৈধ ফায়দা হাসিলের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে সে। মদীনার নবগঠিত মুসলিম সমাজে অশ্লীলতা ও অসভ্যতার বিষাক্ত বীজ বপন করে অংকুরে এ সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে চেষ্টা ও উদ্যোগের কোন কমতি ছিল না তাঁর। ফেতনা ফাসাদ সে একটি সর্বগ্রাসী রূপ দেয়ার জন্য গোপনে এক পতিতালয় গড়ে তুলে সে। সেখানে ইহুদী ও অন্যান্য ধর্মের রুপসী মেয়েদের সমাবেশ ঘটানো হতো, পরিচিতির জন্য এসব পতিতালয়ের দ্বারপ্রান্তে লাল পতাকা গেড়ে রাখা হত। এসব দ্বারা তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল মুসলিম নওজোয়ানদেরকে পবিত্র ও সভ্য জীবনের বন্ধন থেকে মুক্ত করে অশ্লীলতার স্রোতে ভাসিয়ে দেয়া। মদীনাতে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ার বেশ আগে থেকে আব্দুল্লাহ বিন উবাই মাসিকার মত আরো অনেক ক্রীতদাসীকে জোর করে নিয়োজিত করে রেখেছিল এ রুচিহীন কাজে। মাসিকা ও তাঁর বান্ধবী মুআজা দীর্ঘ সময় পাষন্ডের নরক যন্ত্রণায় পিষ্ট হয়েছেন। দুঃসহ এ যন্ত্রণাকে নিয়তি বলেই ভাবতেন তারা তাই উত্তোরণের পথ খুঁজে দেখেননি কখনো।

এক সময় মদীনাতে ইসলামের অপূর্ব আলো ছড়িয়ে পড়ল। যতসব শয়তানী সরাইখানার অবসান ঘটিয়ে অশ্লীলতা ও অসভ্যতাকে সমাজ থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিল ইসলাম। নারীদের অভাবিত সব সম্মান ও মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে লাগল। পবিত্রতার অনাবিল মহিমা ও মানবীয় অধিকার প্রদান করে ঠাঁই দিল তাদের। মানুষের উপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপকে অবৈধ ঘোষণা করে এক শান্তিময় জীবনের সরল পথের সন্ধান দিল ইসলাম। নতুন এ ধর্মের কথা মাসিকার কানেও একদিন পৌঁছল। সখী মুআজার সাথে কীর্তিমান সেই পুরুষটি নিয়ে আলোচনা করতে লাগল। যিনি মক্কা থেকে মদীনায় এসেছেন। তারা ভাবছিল, এ লোকটি নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করে? সে নাকি নারীদের পরাধীনতা তো পছন্দ করেই না; বরং যারা এটা করে কিংবা এ কাজে সহায়তা করে তাদেরকে সে ঘৃণা করে দু চোখ ভরে। ঘটনাক্রমে আব্দুল্লাহ এ আলোচনা শুনে ফেলে। যে সকল নারীর স্বামীরা ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদের সাথে মেলামেশা করতে ও এ দুজনকে নিষেধ করে দেয় সে। এতেই সে ক্ষ্যান্ত হয় না। তাদের প্রতিশ্রুতি নেয়, তারা যদি কোন মুসলিম যুবককে নিজেদের রূপের জৌলুসে বিভ্রান্ত করে। এ পাষান্ড মনিবের এ অসৎ আচরণ দেখে আশ্চর্য হয়ে মাসিকা ভাবতে থাকে নিশ্চয় ইসলামের আলাদা বৈশিষ্ট্য পবিত্র মহিমা আছে। মাসিকা সংগোপনে আনসারী নারীদের কাছে যাতায়াত করতে লাগল। আব্দুল্লাহর নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে একটি নব জীবনের সন্ধানে সে বেপরোয়া হয়ে উঠল। এমন ক’জন নারীর সন্ধান সে পেল। ইসলামের আলোয় যাদের হৃদয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সবার কাছেই মাসিকা ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন কথা জানতে চাইত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবাদের চরিত্র ও আদর্শ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করত। সে অবাক হত মুসলিম নারীদের সম্মান ও স্বাধীনতার অবস্থা দেখে। অথচ একই নারী হয়ে সে নোংরামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ। কতটা লাঞ্ছনাকর ও রুচিহীন জীবনের বোঝা সে টেনে চলছে। অবৈধ বাণিজ্যের পণ্য হয়ে দেদারছে বিকিকিনি চলছে তাঁর। মুসলিম পুরুষদের আত্মসচেতনতা ও নারীদের সতীত্বানুভূতি সম্পর্কে অনেক কথাই মাসিকা শুনল। মার্জিত ও রুচিশীল আনসারী নারীদের সব কথাই হৃদয়ঙ্গম করতে চেষ্টা করল সে। ব্যভিচারের শাস্তি সম্পর্কেও সে অবগত হল। মাসিকা বুঝতে পারল শুধু জৈবিক তাড়নায় উদ্ধুব্ধ হয়ে নয়, বিবাহের জন্য ইসলাম সুস্পষ্ট কিছু শর্ত আরোপ করেছে। অলঙ্ঘনীয় কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। নারীদের প্রাপ্য অধিকার প্রদান করেছে। পাশাপাশি এও বলে দিয়েছে কে কার জন্য বৈধ আর কে কার জন্য বৈধ নয়। সর্বোপরি বলে দিয়েছে বিবাহ হতে হবে প্রকাশ্যভাবে।

এসব শুনে মাসিকা অঝোরে কাঁদতে লাগল। জঘন্য অশ্লীলতাকে চিরতরে পরিত্যাগ করার পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত নিল সে। আল্লাহ পাকের অপরিসীম ক্ষমা ও রহমতের কথা অনেকবারই সে শুনেছে। কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু ফোঁটাগুলো সে তওবার সওগাত হিসেবে আল্লাহর কাছে পেশ করতে লাগল। জাহেলী নরপশুদের অন্যায় অপকর্মের সে তো এক অসহায় শিকার। আনসারী এক নারীর কণ্ঠে আল কুরআনের একটি আয়াত শুনে প্রশান্তিতে তাঁর অন্তরটা আশ্বাস্ত হয়ে গেল। ইসলামের এতটা উদারতা সে কল্পনাও করতে পারে নি। সুললিত কণ্ঠে সে নারী তেলাওয়াত করছেন—

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।–সূরা যুমারঃ আয়াতঃ ৫৩।

একটু সময় নিয়ে মাসিকা একদিন আনসারী নারীইদের জিজ্ঞেস করল—ইসলাম আসলে কী? এটা আমাদের কী করতে বলে? আনসারী নারীরা তাঁকে জানাল—ইসলামের মূল কথা হচ্ছে, আল্লাহকে একমাত্র মাবুদ বলে স্বীকার করা এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরিত রাসূল বলে বিশ্বাস করা, নামাজ কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানে রোজা রাখা এবং সক্ষমতা থাকলে বায়তুল্লাহর হজ্ব করা। সে এমন আরো কিছু বিষয় শুনল। যা অতীতে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি হাদীসও তাঁকে শোনানো হলো, তিনি বলেন—রাতের বেলা আল্লাহ তাঁর ক্ষমার হাত মেলে ধরেন যেন দিনের গোনাহগাররা তাওবার সুযোগ পায়, আবার দিনের বেলাও তিনি ক্ষমার হাত মেলে ধরেন যেন রাতের গোনাহগাররা তাওবার সুযোগ পায়। অর্থাৎ সব সময়ই আল্লাহ বান্দার তাওবার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন।

 

বিস্মিত হয়ে সে ভাবতে লাগল ইসলাম এত উদার! ক্ষমা ও মার্জনার দরজা ইসলামে এত প্রশস্ত! অথচ মুনাফিক আব্দুল্লাহ অমূলক আত্মগৌরব ও নিরেট পার্থিব স্বার্থে ইসলামকে ঘৃণা করে আসছে। মানবতাকে পদদলিত করে, অবৈধ পন্থায় সম্পদের পাহাড় গড়ে কেন সে সম্মান ও কর্তৃত্ব সে হাসিল করতে চায়? পবিত্র এ সমাজে অসভ্যতার সয়লাব ঘটানোই তো এখন তাঁর জীবনের প্রধান টার্গেট হয়ে দাঁড়িয়েছেন। মাসিকা মনে মনে এক নতুন প্রত্যয়ের জম্ম দিল। জীবন গেলেও এর অন্যথা সে করবে না কিছুতেই। আর কখনো সে ঐ পাপের জগতে পা রাখেন না। সুদৃঢ় এ প্রত্যয় নিয়ে মনিবের ঘরে ফিরে চলল।

সখী মুআজাকে মাসিকা বলল—যে নোংরা কাজ আমরা করছি, এতে সামান্য কোন কল্যাণ নেই। সময় এসেছে এসো এ কাজ আমরা পরিত্যাগ করি। সে আরো বলল—আমি আজীবনের জন্য এ বাদশাহকে বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পরিণামে যত শাস্তিই আমাকে ভোগ করতে হয় করব। তবুও এর কোন পরোয়া আমি করি না। মুআযা বলল, ঠিক আছে, আমিও তোমার সাথে এ ব্যাপারে একমত। আমাদের সম্ভ্রম বিকিয়ে তাঁর অর্থ ভান্ডার সমৃদ্ধ করার কোন মানেই হয় না। আমি শুনেছি মুহাম্মদের সাথীগণ পতিতালয়ের নারীদের সুন্দর জীবনের সন্ধান দেয়ার জন্য তাদেরকে বিয়ে করতে খুব আগ্রহী। আমি আরো শুনেছি, তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়া নারীদের সাথে যৌন চাহিদা নিবারণ করাকে শক্তভাবে নিষিব্ধ করা হয়েছে। তাদের গ্রন্থে আছে,

“ব্যভিচারী পুরুষরাই ব্যভিচারী নারী অথবা মুশরিক নারীকে বিয়ে করে।”

সবশেষে সে বল বল খাটিয়ে আমাদেরকে এ জঘণ্য কাজে বাধ্য করা হচ্ছে। নির্মমতার শিকার হয়ে এ নোংরা জীবন গ্রহণে আমরা বাধ্য হচ্ছি। এর পর যে যার ঘরে চলে গেল।

 

এ দিকে মুনাফিক সর্দার প্রতিদিনই তাঁর নোংরা উপার্জনের হিসাব গুণে গুণে দেখত। দিন দিন সে এতে ঘাটতি পরিলক্ষ্য করল। তাঁর কর্মচারী ও পতিতালয়ের ব্যবস্থাপকদের এর কারণ জিজ্ঞেস করল সে। তারা বলল এর কারণ আপনি খুব ভাল করেই জানেন। সে বলল কী সে কারণ? আমাকে খুলে বল। তারা জবাব দিল—এর প্রধান কারণ হচ্ছে মুহাম্মদ ও তাঁর সাথীরা। তারা অশ্লীল ও গর্হিত কাজের ধারে কাছেও যায় না। মুসলিম নারীরাও খুবই আত্মসচেতন ও পতিব্রতা। আল্লাহর আদেশের বাইরে এক চুলেও তারা নড়ে না। আল্লাহ ও রাসূল যা অপছন্দ করেন তা তারা সযত্নে এড়িয়ে চলে। এ জবাব শুনে আব্দুল্লাহ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। চিৎকার করে বলল তোমরা ঠিক কথাই বলেছ। মদীনায় ভাবী বাদশাহ ছিলাম আমি। আমার সে অধিকার মুহাম্মদ ছিনিয়ে নিয়েছে। লোকেরা আমাকে পেছনে ফেলে তার দ্বীনকে প্রাধন্য দিয়েছে। তাঁর আনীত আদর্শ অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করছে। কবে যে এ আপদটা মদীনা থেকে দূর হবে। তবেই না নিরংকুশ ক্ষমতার মহা আনন্দে জীবনটা আমার ধন্য হবে।

 

এরই মাঝে একদিন দূরবর্তী এক এলাকা থেকে কিছু লোক নিজেদের যৌন ক্ষুধা মিটানোর জন্য এবং আব্দুল্লাহর গড়ে তোলা অশ্লীল আড্ডাখানার মধু চোখে দেখার জন্য মদীনায় আগমন করল। নিত্যকার অভ্যাস অনুযায়ী এক গাল হাসি হেসে আব্দুল্লাহ তাদের স্বাগত জানাল। ভেতরে এনে উন্নত শরাবে আপ্যায়িত করল তাদের। নেশার ঘোরে মাতাল হয়ে আগতদের একজন কথার মাঝেই বলে উঠল—আব্দুল্লাহ! তোমার রূপসী ললনাদের কোথায় লুকিয়ে রেখেছঃ ডাক না একটু তাদের! মনটা একটু তৃপ্ত করি। আব্দুল্লাহ বলল, কোন চিন্তা করো না, তোমাদের চাহিদা ও রুচি মোতাবেক যুৎসই মাল আমি প্রস্তুত করে রেখেছি। কথাগুলো বলে সে নিজের কর্মচারীর কাছে গিয়ে বলল মাসিকা ও মুআজা কোথায়? আগত এ লোকগুলো বেশ ধনবান। বেশ টাকা পয়সা তারা উড়ায়। এদের কাছ থেকে বিশাল অর্থ আমাদের অর্জন করতে হবে। জলদি যাও! এক্ষুণি তাদের ডেকে নিয়ে আস।

কর্মচারী মাসিকার ঘরে আসল। সে পূর্বেই বলে রেখেছিল আল্লাহর কসম! আজকের পর আর কখনোই আমি খোদার নাফরমানি করব না। এতে আমাকে হত্যা করা হোক চাই কেটে টুকরো টুকরো করা হোক। আজও সে এ কথারই পুনরাবৃত্তি করল। কর্মচারী বলল এটাই কি তোমার চূড়ান্ত ফয়সালা? দেখ! বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নাও। মাসিকা বলল—আস্তাগফিরুল্লাহ! আমি অনেক ভেবে চিন্তেই এ পথে পা বাড়িয়েছি। আমি প্রবল আশাবাদী যে, আল্লাহ পাক আমার অতীতের অপরাধ মার্জনা করে দিবেন। তিনি আমার জন্য যথেষ্ট। তাঁর উপরে আমার পূর্ণ আস্থা আছে। তাঁর শাস্তি থেকে পরিক্রাণের জন্য এবং আমার তাওবা কবুলের জন্য নিরন্তর আমি দুআ করে যাচ্ছি।

কর্মচারী মনিবের কাছে ফিরে এসে দেখল সঙ্গীদের সাথে সে নেশায় মদমত্ত হয়ে রয়েছে। এগিয়ে গিয়ে মনিবের কানে কানে সে বলল মাসিকা এ ধরণের করতে শুধু অস্বীকারই করছে না, বরং ভবিষ্যতে কখনোই আর এ পথে পা বাড়াবে না বলে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে। এতে তাঁর জীবন চলে গেলেও কোন পরোয়া সে করবে না। এ কথা শুনে মুহূর্তেই আব্দুল্লাহর চেহারায় রঙ পালটে গেল। তাঁর রক্তে যেনা গুন ধরে গেল। কিন্তু মেহমানদের সামনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল সে। কর্মচারীকে নিয়ে বাইরে এসে বলল—আমার হাত থেকে মাসিকা কিছুতেই রেহাই পাবে না। বাধ্য ও অপদস্ত হয়ে আমার কথা সে মেনে নিবে। সেখানে পৌঁছে প্রচন্ড জোরে এক লাথি হাকাল দরজায়। দুর্বল দরজা খুলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। পাষাণ্ড এ মুনাফিক হিংস্র পশুর মত ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁর উপর। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আঘাতের পর আঘাত করতে লাগল তাঁকে। এ আঘাতের বদলায় হয়তো আল্লাহ তাঁর অতীত অপরাধ মাফ করে দিবেন এই আশায় মাসিকা সব আঘাত নীরবে সহ্য করতে লাগল। যাবার সময় ঐ পাপিষ্ঠ বলে গেল—নেমকহারাম। তুই যদি আমার কথা না শুনিস তাহলে অচিরেই তোকে আমি হত্যা করে ফেলব। তাঁর এক কর্মচারী বলল—হে আব্দুল্লাহ! সাবধান এ কাজ ভুলেও করতে যেয়ো না। সে বলল তুমি এ কথা বলছ কেন? আমি বুঝতে পারছি মুহাম্মাদের অপচ্ছায়া সব জায়গা থেকেই আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ঠিক আছে আমি ধৈর্য ধরব। তবে এটাও জেনে রেখ, এ অবাধ্য নারীর নাক আমি কেটে দেবই দেব। এ কথা বলে সে চলে গেল। আর মাসিকা ঝরে পড়া রক্তধারাকে তাঁর কৃত পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য খোদার কাছে পেশ করে কাতরকণ্ঠে দুআ করতে লাগল—হে আল্লাহ! এ রক্ত দিয়ে আমার পাপগুলো তুমি ধুয়ে দাও। আমার তাওবা তুমি কবুল কর আর আমার জন্য মুক্তির একটি বন্দোবস্ত তুমি করে দাও।

একটু পরেই মুআজা এসে তাঁর অশ্রু মুছে দিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগল নানাভাবে তাঁকে কষ্ট ভুলাবার প্রয়াস করছিল সে। এভাবেই কেটে গেল রাতের কয়েকটি প্রহর। তারা ভাবতে লাগল পাষাণ্ডকে নিয়ে কী করা যায়? তাঁর জুলুম নির্যাতন থেকে বাঁচা যায় কিভাবে? সহসাই মাসিকা একটু গলা ছড়িয়ে বলে উঠল মুআজা! চল কাল সকালে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে এ মুহূর্তে আমাদের করণীয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। প্রভাত হতে না হতেই তারা উভয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা করল। পথে আবু বকর (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তাঁকে অবস্থা জানানো হল। তাদের অসহায়ত্বে তিনি বেশ পীড়িত হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে হাজির হয়ে তারা নিজেদের দুঃখের দাস্তান তুলে ধরলেন।

“শুধু পার্থিব কিছু স্বার্থ হাসিলের জন্য তোমরতা ক্রীতদাসীদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য করো না, যদি তারা সতীত্ব বজায় রাখতে চায়। আর যে ব্যক্তি তাদের প্রতি তাদের অনিচ্ছায় বল প্রয়োগ করবে, তবে বল প্রযুক্ত হওয়ার পর আল্লাহ তাদের প্রতি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। ”

আল কুরআন এও বলে দিয়েছে অবিবাহিত নারী—পুরুষ যদি অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তাহলে তাদেরকে একশটি বেত্রাঘাত কর।–

الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِئَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ

ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর কারণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।

(সূরা—নুরঃ আয়াত—২)

আর বিবাহিত নারী পুরুষ এ অপরাধে লিপ্ত হলে তাদেরকে প্রস্তরঘাতে মেরে ফেলতে হবে। ব্যভিচার সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—এটি অতি জঘন্য ও নির্লজ্জ একটি কাজ। ক্রীতদাসীদের দিয়ে এ ধরনের কাজ করানোরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শক্ত হাতে প্রতিহিত করেছেন।

মাসিকা ও মুআজা নিজেদের সম্পর্কে আল কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হতে দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলল। তাদের তাওবা কবুলের মহা আনন্দ চোখের অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। আল্লাহর অবধারিত রহমতের ছোঁয়া পেয়ে তৎক্ষণাৎ তারা সেজদায় লুটিয়ে পড়ল।

আর এভাবেই তারা সত্যের কাফেলায় সংযুক্ত হয়ে গেল। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল সকলের মাঝে। আব্দুল্লাহ বিন উবাইর জ্ঞান চক্ষু তবু খুলল না। ক্রোধে উম্মাদ হয়ে সে বলতে লাগল—মুহাম্মদ আমাদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছে। এর একটি আশু বিহিত করা প্রয়োজন।

লিখেছেনঃ শাইখ আব্দুল মুনঈম হাশেমী

অনুবাদঃ মাওলানা হাসান শরীফ

আল কুরআনে নারীর কাহিনী বই থেকে সংগ্রহ করা।

সমাপ্ত।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE