Breaking News
Home / বই থেকে / দুই (ব্যথিত হৃদয়)

দুই (ব্যথিত হৃদয়)

বিরামহীন কয়েক ঘন্টা চলার পর লঞ্চটি ঢাকা সদরঘাট টার্মিনালে এসে থামল। লোকজন নামতে শুরু করল। লঞ্চের দরজায় প্রচন্ড ভীড়। সাকিব এক পাশে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যাত্রীদের অবতরণ শেষে সাকিব পা রাখল ঢাকার মাটিতে।

সাকিব যদিও প্রায়মারীর গন্ডি ছাড়িয়ে হাইস্কুলের দোর গোড়ায় পা রেখেছিল, কিনতি এতো বড় শুহরে কোনোদিন সে আসে নি। অজানা অচেনা শহর। কোথায় যাবে, কি করবে কিছুই স্থির করতে পারে না সাকিব। ক্ষুধায় অস্থিইর। পকেটে পয়সাও নেই। যা ছিল, লঞ্চ ভাড়া দিতেই শেষ হয়ে গেছে। এখন তাহলে উপায়!

চারিদিক লোকে লোকারণ্য। লোকজনের কোনো অভাব নেই। কিন্তু সে তো কাউকে চিনে না। সাকিব রাস্তার ডানপাশ দিয়ে হাঁটছে। গভীর চিন্তায় নিমগ্ন সে। হঠাৎ সাদা ধবধবে বড় রকমের একটি মারুতি গাড়ি তার পাশে এসে ব্রেক করে এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে আসেন কোর্ট—টাই পরিহিত মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক।

লোকটিকে কিছু একটা বলবে সে সাহসও পাচ্ছে না সাকিব। এদিকে ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণাও সহ্য করতে পারছে না সে। অবশেষে কোনো উপায়ান্তর না দেখে বলেই ফেলল—

একটু সাহায্য করবেন স্যার? আজ সারাদিন কিছুই খায় নি আমি। বড্ড ক্ষিধে পেয়েছে। কিছু খেতে পারলে প্রাণটা বাঁচে। একটু দয়া করুণ স্যার!

ভদ্রলোক সাকিবের মায়াবী চেহারা পানে চোখ তুলে তাকান। তারপর পকেট থেকে মানিব্যাগটা খুলে বিশ টাকার একটি নোট তার জাতে গুঁজে দিয়ে ব্যস্ত পদে চলে যান।

টাকাটা পেয়ে সাকিবের কচিমন আনন্দে নেচে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণেই মক্তবে পড়াকালীন উস্তাদের মুখ থেকে শোনা একটি কথা মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। ফলে তার সব আনন্দ নিমেষেই হাওয়ায় মিশে যায়।

 

সাকিব সাহেবের পিছু নেয়। উদ্দেশ্য, টাকাটা ফেরত দেওয়া। কিন্তু সাহেব ততক্ষণে একটি তিনতলা বিল্ডিং—এ হারিয়ে গেছেন। নীচ তলার গেটে রাইফেল হাতে দুই প্রহরী দাঁড়িয়ে। এদের দেখে এক পা এগুতেও সাহস হয় না সাকিবের।

সাকিব আবার চিন্তায় নিমগ্ন হয়। ভাবে সে, এ আমি কি করলাম! আমি তো জোয়ান ছেলে। কাজ করে খাওয়ার মতো শক্তি আমার আছে। তাহলে কেন আমি আরেকজনের কাছে হাত পাতলাম? মক্তবের উস্তাদজী না বলেছেন—ভিক্ষা করা, পরের নিকট হাত পাতা অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। অন্যের নিকট হাত পাতার চেয়ে খেটে খাওয়া অনেক ভালো। সেদিন উস্তাদজী নবীজির একখান হাদীসও শুনিয়েছিলেন। নবীজি বলেছেন—উপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম।

সাকিব সিদ্ধান্ত নেয়, সে আর কারো কাছে হাত পাতবে না। না খেয়ে মরে গেলেও না। এখন থেকে সে কাজ করেই খাবে। কিন্তু পথঘাট না চেনা এক নতুন শহরে চাইলেই তো আর কাজ পাওয়া যায় না!

বাপ যেখানে গ্রামের একজন বিত্তশালী গৃহস্থ তার ছেলে সাকিব আক একটি কাজের আশায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। এখান থেকে ওখানে যাচ্ছে। নিজের মনের কথা খুলে বলছে। কিন্তু কেউই অপরিচিত গ্রামের ছেলেকে কাজ দিতে রাযী হচ্ছে না। দিচ্ছেনা মাথা গোঁজার মত এতটুকু ঠাঁই। অবশেষে কাজ না পেয়ে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে রাস্তার ফুটপাতে আশ্রয় নেয় সাকিব। তারপর ক্লান্ত দেহটিকে সঁপে দেয় ঘুমের কোলে। সত্যিই সে এক করুণ দৃশ্য!

 

পরের দিন কাজের সন্ধানে আশাভরা হৃদয় নিয়ে আবার বের হয় সাকিব। ঘুরতে থাকে এ গলি থেকে সে গলি, এপথ থেকে সেপথে। মনে মনে ডাকতে থাকে আল্লাহকে। বলে, ওগো দয়াময় প্রভু, করুণার আধার! তুমিতো দেখছো, আমি কত অসহায়! তুমি ছাড়া সাহায্য করার মত আমার কেউ নেই। আমি তোমার দয়ার মুখাপেক্ষী। তুমি আমাকে ছোট একটি কাজ হলেও জুটিয়ে দাও। যেন কারো কাছে আমাকে হাত পাততে না হয়।

ঘুরতে ঘুরতে বেলা প্রায় শেষ হয়ে এল। অস্তগামী সূর্যের শেষ কিরণ এসে পড়ল সাকিবের মুখে। এখনো তার কাজের কোনো ব্যবস্থা হয় নি। কোথাও মিলে নি একটু আশ্রয়। খানিক বাদেই সূর্য অস্তমিত হবে। এমন সময় সাকিব দেখল এক বৃদ্ধা জথর জ্বালায় অস্থির হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে আর অবিরাম বলে চলছে—বাবা! একটি টাকা দ্যান। আমি বড়ই ক্ষুধার্ত। বাবা! একটু খাবার দ্যান।

বৃদ্ধার এই হৃদয়—আকুতি আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে। ইথারে—পাথারে ভেসে চলছে করুণ মূর্ছনা তুলে। গাছপালা, তরুলতাও যেন তার কান্নার সাথে সুর মিলিয়ে কাঁদছে।

বৃদ্ধার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে অনেক নারী পুরুষ। কিন্তু কেউ তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না। যে যার যার মতো হেঁটে চলে যাচ্ছে। অথচ এদের মধ্যে এমন অনেকেই হয়তো আছেন যাদের পকেট ভর্তি টাকা আছে, আছে বাটি ভর্তি খাবার। মুখে রসালাপের সীমা নেই। তথাপী কোনো আদম সন্তান সামান্যতম কৃপা করছে না ঐ মহিলাটিকে।

এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে সাকিব আশ্চর্য হয়। ভাবে, মানুষ তো মানুষের জন্য। একজনের দুঃখে আরেকজন দুঃখি হবে, বিপদাপদে এগিয়ে আসবে—মানবধর্ম তো এমনই হওয়া উচিৎ। কিন্তু এ আমি কী দেখছি! কত ভদ্রলোক হেসে হেসে এদিক দিয়ে চলে যাচ্ছেন অথচ এই বৃদ্ধার দিকে ফিরে তাকানোর প্রয়োজনও তারা বোধ করছেন না? তার মর্মস্পর্শী করুণ আর্তনাদ কারো কর্ণ কুহরে প্রবেশ করছে না। সাকিব ভাবে, এদের মধ্যে কি তাহলে মানবতা বলতে কিছুই নেই? তারা কি বুঝে না ক্ষুধার জ্বালা কত কঠিন, কত মারাত্মক? হয়তো তারা বুঝে না। আর বুঝবেই বা কি করে? তারা তো কখনো অভাবে পড়ে নি, ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করে নি। তবে আমি বুঝেছি। হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। জঠর জ্বালা সে এক অসম্ভব জ্বালা। সকল জ্বালার উপরে এ জ্বালাই প্রবল হয়ে ওঠে, যদি কয়েক বেলা পেটে দানাপানি না পড়ে। গতকাল না খেয়ে একথাটি আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি। আরও বুঝেছি তখন, যখন আমার ছোট মা প্প্রয়োজনের চাইতে অর্ধেকেরও কম ভাত দিয়ে আমার দিকে কঠিন নযরে তাকাতেন। যেন আমি তার কাছে আর ভাত চাওয়ার সাহস না পাই। ফলে কিছুক্ষণ পরেই আমার ক্ষুধার যন্ত্রণা তীব্র আকার ধারণ করত। আমি তখন বিছানায় গিয়ে শুয়ে থাকতাম। কিন্তু ভয়ে কিছুই বলতে পারতাম না। এ কারণেই আমি জানি ক্ষুধার জ্বালা কত নির্মম, কত নিষ্ঠুর!

এসব ভাবতে ভাবতে সাকিব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে দৌড়ে গিয়ে হোটেল থেকে গতকালের বেঁচে যাওয়া টাকাগুলো দিয়ে দুটো পরটা ও সামান্য ভাজি কিনে মহিলার পাশে গিয়ে হাজির হয়। তারপর নিজ হাতে তাকে খাইয়ে দিয়ে হোটেল থেকে এক গ্লাস পানি এনে পান করায়। মহিলা খানা খেয়ে তৃপ্তিবোধ করে। সেই সাথে সাকিবের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া দিতে থাকে—বাবা! আল্লাহ তোমাকে বড় করুক। হায়াত দারাজ করুক। তোমার মনের আশা পূর্ণ করুক।

সাকিব ভেবে – চিনতে স্থির করেছিল, আজ যদি কোনো কাজ না পায় ত্তাহলে পকেটের টাকাগুলো দিয়ে কিছু কিনে খেয়ে ঘুমিয়ে থাকবে সে। কিন্তু তা আর হলো না। পকেট শূন্য থাকায় সামান্য পানি পান করেই তাকে ঘুমিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হলো।

হাদীসে শরীফে আছে—“তোমরা জমীনবাসীদের উপর রহম করো, তাহলে আসমানের অধিবাসী আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর রহম করবেন।”

সাকিব আল্লাহর এক অসহায় বান্দির উপর দয়া প্রদর্শন করেছে। নিজে উপোস থেকে তাকে খাইয়েছে। তার ক্ষুধার যন্ত্রণাকে সে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছে। তাই আল্লাহ পাক সাকিবের প্রতি দয়াপরবশ হলেন। আপন রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দিলেন। ধীরে ধীরে একদিন তাকে পৌঁছে দিলেন উন্নতির সুউচ্ছ শিখরে।-আরো পড়ুন

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE