Breaking News
Home / বই থেকে / দুনিয়ার ওপারে–পর্ব-৩

দুনিয়ার ওপারে–পর্ব-৩

দুনিয়ার ওপারে–পর্ব-৩

বিগত দু’ সংখ্যায় আমি ঐ সকল লোকের বর্ণনার সারাংশ পেশ করেছি যারা মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে ফিরে এসেছে। তাদের বক্তব্যের সংক্ষিপ্তসার এ ছিল যে, তারা নিজেদেরকে নিজ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেখেছে, একটি অন্ধকার সুড়ঙ্গ অতিক্রম করেছে, একটি নূরানী মাখলুকের অস্তিত্ব অনুভব (প্রত্যক্ষ) করেছে। পরবর্তীতে সেই নূরানী মাখলুক তাদের সামনে তাদের বিগত জীবনের পুর্ণ বিবরণ (নকশা) পেশ করেছিল।

একথা স্পষ্ট যে এ সকল লোক মৃত্যুবরণ করেনি। কারণ, যদি তারা মৃত্যুবরণ করে থাকত তাহলে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে আসতে পারত না। স্বয়ং ডাঃ মোদিও (যিনি এ সকল লোকের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন) এ কথা বলেছেন যে, তারা মৃত্যু দেখেনি। অবশ্য মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে কিছু আশ্চর্য ও অভিনব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে। সুতরাং এ সকল অবস্থা বর্ণনা করার জন্য তারা যে পরিভাষা ব্যবহার করেছে, তা হচ্ছে, (Near-Death Experience) তথা ‘মৃত্যুর দুয়ারের অভিজ্ঞতা’) সংক্ষেপে যাকে N|D|E বলা হয়। এই পরিভাষাই পরবর্তী লেখকরা ব্যবহার করেছেন। কাজেই যদি এ সকল লোকের বর্ণনা সত্যি বলে মেনে নেওয়া হয় (ডাঃ মোদীর চূড়ান্ত মতও এটাই যে, এত অধিক সংখ্যক লোককে একই সাথে একই বক্তব্যে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা সহজ নয়) তাহলেও একথা বলা যায় না যে, তারা নিজকে হারানো অবস্থায় ঐ জগতের (মৃত্যু পরবর্তী জীবনের) কিছু ঝলক দেখেছে, যে জগতের সীমান্ত বা দরজা হলো মৃত্যু।

মেডিক্যাল সাইন্সের অক্ষমতা

মেডিক্যাল সাইন্স তথা চিকিৎসা বিজ্ঞান যেহেতু শুধুমাত্র ঐ সকল বিষয়েই বিশ্বাস রাখে, যা দৃষ্টিগোচর হয় অথবা অন্য কোন ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত হয়, সেহেতু চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন পর্যন্ত মানুষের শরীরে রূহ নামক কোন জিনিস আবিস্কার করতে পারেনি। তাছাড়া রূহের হাজীকত (প্রকৃত অবস্থা) পর্যন্ত পৌঁছাও সম্ভব নয়। সম্ভবতঃ দূহের আসল অবস্থা মেডিক্যাল সাইন্স কোন কালেও উদঘাটন করতে পারবে না। কারণ, পবিত্র কুরআন রূহ সম্পর্কে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গিয়ে বলেছে–

“রূহ আমার প্রতিপালকের হুকুম বিশেষ’ আর (এ সম্পর্কে) তোমাদেরকে খুবই কম ইলম দেওয়া হয়েছে” ।

মৃত্যুর হাকীকত

তবে কুরআন ও হাদীছ থেকে এ কথা স্পষ্টভাবেজানা যায় যে, হায়াত (বা জীবন) রূহ ও দেহের মজবুত সম্পর্কের নাম। আর মউত বলা হয় রূহ ও দেহের এ সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাওয়াকে। এ বিষয়ে এ কথাটি মনে রাখার মত যে, আমরা আমাদের দৈনন্দিন আলাপচারিতায় মউতের অর্থ বুঝানোর জন্য ‘ওফাত’ শব্দ ব্যবহার করে থাকি। এটা পবিত্র কুরআনের শব্দ (আরবী) হতে নির্গত। কুরআনের পূর্বে আরবী ভাষায় এ শব্দটি মউতের অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। আরবী ভাষায় মউতের অর্থ বুঝানোর জন্য প্রায় চব্বিশটি শব্দ ব্যবহৃত হত। কিন্তু ‘ওফাত’ বা” (আরবী) শব্দের (মউতের অর্থে) অস্থিত্বই ছিল না। পবিত্র কুরআনেই সর্বপ্রথম মউতের অর্থে এ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মউত বুঝানোর জন্য এই (নতুন) শব্দ ব্যবহারের কারণ হলো, জাহেলী যুগের আরব সম্প্রদায় মউতের জন্য যে সকল শব্দ প্রণয়ন করেছিল তা তাদের ঐ ভ্রান্ত ধারণা ও আকীদার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, মউতের পর আর কোন জীবন নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক (আরবী) শব্দ ব্যবহার করে সূক্ষ্মভাবে ওদের (কাফেরদের) ঐ আকীদা খণ্ডন করেছেন। (আরবী) শব্দের অর্থ হলো, কোন জিনিস পরিপূর্ণরূপে উসূল কুরে নেওয়া। কাজেই মউতের জন্য ঐ শব্দ ব্যবহার করে এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মৃত্যুর সময় মানুষের রূহকে তাঁর শরীর হতে পৃথক করে তাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এই হাকীকতটি সুস্পষ্ট ভাষায় পবিত্র কুরআনের সূরা ‘যুমার’এ এভাবে বর্ণিত হয়েছে__

 

অর্থাৎ ‘আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তাঁর মৃত্যুর সময়, আর যে মরে না তাঁর নিদ্রাকালে। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তাঁর প্রাণ ছাড়েন না এবং অন্যদের ছেড়ে দেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।’ (সূরা আয যুমার-আয়াত ৪২)

 

অপর দিকে হযরত আদম (আঃ) এর জীবন দান প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে হযরত আদম (আঃ) এর ভিতরে ‘রূহ ফুঁকে দেওয়া’ (সঞ্চার করা) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

 

জীবন ও মৃত্যু

 

পবিত্র কুরআনের এ সকল বর্ণনা থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে জানা যায় যে, দেহ ও শরীরের সাথে রূহের মজবুত সম্পর্ককেই জীবন বলে। দেহের সাথে রূহের সম্পর্ক যত বেশি মজবুত হবে, জীবনের লক্ষণ তত বেশী স্পষ্ট ও প্রদীপ্ত হবে। আর এ সম্পর্ক যত বেশী দুর্বল হতে থাকবে, জীবনের লক্ষণ ততবেশী নিষ্প্রভ হতে থাকবে। জাগ্রত অবস্থায় দেহ ও রূহের এ সম্পর্কে অত্যন্ত মজবুত থাকে, যার দরুণ এ সময় জীবন স্পন্দন তাঁর সকল লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্যসহ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান থাকে। জাগ্রত অবস্থায় মানুষের সকল ইন্দ্রিয় কাজ করতে থাকে। সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সতর্ক ও প্রস্তুত থাকে। এ সময় মানুষ তাঁর কার্যকমতাকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করতে পারে এবং তাঁর চিন্তা-চেতনায় কোন বাধা থাকে না। কিন্তু ঘুমের সময় দেহ ও রূহের এ সম্পর্ক কিছুটা দুর্বল হয়ে যায়, যার দরুন ঘুমন্ত অবুস্থায় মানুষের মধ্যে জিবনের সপকল লক্ষণ প্রকাশিত হয় না। ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ তাঁর পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে বে-খবর থাকে এবং স্বেচ্ছায় স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করতে পারে না। সে সময় সে যথাযথভাবে চিন্তা-ভাবনা করার মত অবস্থায়ও থাকে না। তথাপি ঘুমন্ত অবস্থায়ও মানুষের রূহের সম্পর্ক এই পরিমাণ মজবুত থাকে যে, তাঁর শরীরে কোন কিছু ঘটলে সে তা অনুভব করতে পারে। কাজেই ঘুমের মধ্যেও যদি তাঁর শরীরে কেউ সুঁই ঢুকিয়ে দেয়, তাহলে সে তাঁর ব্যথা অনুভব কুরে জাগ্রত হয়ে যায়।

 

ঘুমের চেয়ে আরো দুর্বল অবস্থা হলো সংজ্ঞাহীন (বেহুঁশ) অবস্থা। এই অচেতন অবস্থায় দেহের সাথে রূহের সম্পর্ক ঘুমন্ত অবস্থার চেয়েও দুর্বল হয়ে যায়। এ কারণেই পরিপূর্ণ অচেতন অবস্থায় যদি মানুষের দেহ অস্ত্রোপাচারও করা হয় তবুও সে ব্যথা অনুভব করে না। এ অচেতন অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে (প্রয়োজনে) বড় বড় অপারেশনও করা হয়। বেহুঁশ অবস্থায় মানুষের দেহ থেকে জীবনের অধিকাংশ লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য গায়েব হয়ে যায়। অবশ্য হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকে। এতে তাঁর জীবন্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

 

বেহুঁশ অবস্থার চেয়েও আরো দুর্বল একটি অবস্থা মারাত্মক অসুস্থতার সময় কোন কোন লোকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যাকে সাধারণ আরবীতে ‘অসাড় –বাহ্যজ্ঞানহীন’ অবস্থা বলা হয়। এ অবস্থায় মানুষের এমনকি বিজ্ঞ ডাক্তার পর্যন্তও ঐ ব্যক্তির দেহ জীবনের সামান্য লক্ষনও দেখতে পায় না। হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়, শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ থাকে, রক্তচাপ (ব্লাডপ্রেসার) গায়েব হয়ে যায়, এমনকি শরীরের উষ্ণতাও প্রায় শেষ হয়ে যায়। এতদসত্ত্বেও মস্তিকের কোন এক গোপন কোষে জীবন স্পন্দন বাকি থাকে। এটাই সেই মুমূর্ষ অবস্থা, যে অবস্থায় ডাক্তাররা শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন বহাল রাখার জন্য কিছু কৃত্রিম পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। কোন কোন লোকের ক্ষেত্রে এ সকল পদ্ধতি ফলদায়ক হয়। ফলে সেই মুমূর্ষ ব্যক্তিও সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে সক্ষম হয়। তাঁর সুস্থ হওয়ার পরই এ কথা বুঝা যায় যে, সে তখন মৃত্যুবরণ করেনি এবং তাঁর রূহও শরীর থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক হয়নি। এ অবস্থাটা জীবনের সর্বাধিক দুর্বলতম অবস্থা। এ সময় মানুষের রূহের সম্পর্ক দেহের সাথে খুবই দুর্বল থাকে। আর রূহের সম্পর্ক দেহের সাথে যত বেশী দুর্বল হয়, রূহ দেহের বন্ধন থেকে তত বেশী স্বাধীন হয়। সুতরাং ঘুমন্ত অবস্থায় এই স্বাধীনতা কম হয়, তুলনামূলকভাবে বেহুঁশ অবস্থায় এর চেয়ে বেশী হয় এবং (আরবী) তথা অসাড় ও বাহ্যজ্ঞানহীন অবস্থায় আরো বেশী স্বাধীন হয়। কাজেই (আরবী) অসাড় ও বাহ্যজ্ঞানহীন অবস্থায় যখন রূহের সম্পর্ক দেহের সাথে খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রূহ দেহর বন্ধন থেকে অনেকাংশে মুক্ত হয়ে যায়। সে সময় যদি কোন ব্যক্তির বোধশক্তি তাঁর রূহের সফরে শরীক হয় এবং সে জাগতিক জীবনের ওপারে অবস্থিত অপর জগতের কিছু ঝলক দেখে নেয় তাহলে এটা অযৌক্তিক কিছু নয়। ইতিহাসেও এ ধরনের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ অবস্থায় এ ধরনের লোকেরা ঊধর্ব জগতের কিছু দৃশ্য অবলোকন করে থাকে। ইতিপূর্বে আমি ডঃ মোদীর উদ্ধৃতি দিয়ে যে সকল লোকের বক্তব্য পেশ করেছি, যদি তাদের সম্পর্কে এ কথা মেনে নেওয়া হয় যে, তাদের বক্তব্য মিথ্যা ও প্রতারণামূলক নয়, তহলে তাদের এ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ এ ধরনের বিষয়ই হবে। তবে তাদের সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবে।

 

১. যে সকল লোক এসব দৃশ্য দেখেছে, তারা এখনো মৃত্যুবরণ করেনি, সুতরাং তারা যা কিছু দেখেছে, সেগুলোকে পরজগতের ঝলক বলা যেতে পারে। তবে মৃত্যুর পর যেসব ঘটনা ঘটবে এগুলো তাঁর অন্তর্ভুক্ত নয়।

২. যে অবস্থায় তারা এসব দৃশ্য দেখেছে, সেটা ইহজীবনেরই একটি বিশেষ অবস্থা। অন্ততপক্ষে তখনো তাদের মস্তিঙ্কের কোন গোপন কোষে জীবনস্পন্দন অবশিষ্ট ছিল বিধায় এ সকল দৃশ্য অবলোকনের ক্ষেত্রে মস্তিঙ্কের কলা-কৌশল কার্যকরী হওয়াটা অযৌক্তিক নয়।

 

৩. যারা এ সকল দৃশ্যাবলীর বিবরণ দিয়েছে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছে তারা সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, সেই পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একথা বলা সত্ত্বেও তারা তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার জন্য এই সীমিত শব্দাবলীর আশ্রয়ই নিয়েছে। কাজেই এখনো এ বিষয়টি সন্দেহযুক্ত যে, তারা সে অবস্থা এই সীমিত শব্দাবলীতে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কতটুকু সফল হয়েছে এবং সে সময়ের কোন কথা তাদের যথাযথভাবে কতটুকু স্মরণ আছে। তাছাড়া তাদের দেখা দৃশ্যাবলীর সর্বাংশের উপর আস্থা রাখাও সম্ভব নয় এবং এ সকল বিষয়কে মৃত্যুর পরবর্তী ঘটনাবলীর আকীদার জন্য ভিত্তি বানানো যাবে না। মৃত্যুর পরের যে সকল হাকীকত জানা আমাদের জন্য আবশ্যক, তাঁর সবকিছুই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর সন্দেহাতীত নির্ভুল পথে (লাভ করে) আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। এগুলো সত্য বলে প্রমাণিত হওয়ার জন্য এ ধরণের বর্ণনার মুখাপেক্ষী নয়। তবে ঐ সকল লোকের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও বর্ণনার কিছু কিছু অংশের সমর্থন কুরআন ও হাদীছের বর্ণনার দ্বারা অবশ্যই হয়ে থাকে। যেমন, তাদের সকলের বর্ণনাকৃত এ অংশটুকু কুরআন ও হাদীছ দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, মানুষের জীবন শুধু এই দুনিয়ার জীবনেই সীমিত নয় বরং দুনিয়ার ওপারে আরো একটি জগত আছে। আমরা আমাদের বৈষয়িক ও স্থুল জীবনের খাঁচায় আবদ্ধ থেকে সে জগতের অবস্থাসমূহ যথাযথভাবে অনুহদাবন করতে পারব না। সে জগতে যে সকল ঘতনা ঘটবে, তা আমাদের ইহকালের জীবনে ব্যবহৃত স্থান, কাল ও পাত্রের প্রচলিত মিয়মাবলীর অনেক অনেক ঊধের্ব। আমরা আমাদের দুনিয়ার জীবনে এটা কল্পনাও করতে পারি না, যে কাজের জন্য বছরের পর বছরের প্রয়োজন হয়, সে কাজ মুহূর্তের মধ্যে কিভাবে সম্পন্ন হতে পারে। কিন্তু পরকালে যে সব ঘটনা ঘটবে, তা সময়ের বন্ধনমুক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন–

অর্থাৎ আপনার পালনকর্তার নিকট একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান। (সূরা হজ্জ, আয়াত ৪৭)

সেই জগৎ কেমন? তাঁর চাহিদাই বা কি? সেই জগতে পৌঁছার জন্য কি ধরনের প্রস্তুতির প্রয়োজন ? এ সকল জানানোর জন্যই যুগে যুগে নবী-রাসূল (আলাইহিমুস সালাম) দুনিয়াতে এসেছেন। কারণ, সে জগতের বিষয়বলী আমরা শুধুমাত্র আমাদের ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধি দিয়ে জানতে পারি না। সর্বশেষ যুগে আমাদেরকে এ সকল বিষয় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ইসলামী শরী’অত’-এর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। কাজেই যে ব্যক্তি মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুতি নিতে চায়, সে যেন ‘ইসলামী শরী’অত’ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। ফলে তাঁর সামনে পারলৌকিক জগতের হাকীকত স্পষ্ট হয়ে যাবে এবং সেখানে পৌঁছার সঠিক পথ ও পন্থা সে অর্জন করতে পারবে।

একটি প্রশ্ন ও তাঁর উত্তর

পাকিস্তানের বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক জঙ্গ’ ২৮ জানুয়ারী ১৯৯৮ ইং সংখ্যায় ‘ভুলে যাওয়ার মত নয়’ শিরোনামে ডাক্তার সাইয়্যেদ আমজাদ আলী সাহেব নিজের একটি বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার কাহিনী লিখেছেন। তাঁর লিখিত কাহিনীর সারাংশ এই –

১৯৮৪ সনের মার্চের ২৩ তারিখে তিনি মারাত্মক হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তিনি বলেন যে, এক পর্যায়ে আমার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। আমি প্রায় বিশ মিনিট মৃত অবস্থায় কাটাই। এ সময় আমাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। আমি মৃত্যুর পূর্বক্ষণে নূরের তৈরি এক ব্যক্তিকে আমার নিকট আসতে দেখি। তাঁর শরীরকে স্পর্শ করার সাথে সাথেই আমার শরীরের জীবনশক্তি অত্যন্ত দ্রুত পায়ের দিক থেকে আরম্ভ করে মাথার দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। ফলে আমি সম্পূর্ণরূপে আলোর ন্যায় অতি হালকা বস্তুতে পরিণত হই। আমি ঐ নূরানী ব্যক্তির সংসর্গে প্রশান্ত ছিলাম। আমি হাসপাতালের সকল ওয়ার্ড বিশেষ করে অতি মুমূর্ষু রোগীদের ওয়ার্ড পর্যবেক্ষণ করে এক কোণে দাঁড়িয়ে গেলাম। এ সকল ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে ঘতে গেল। আমি ঐ নূরানী ব্যক্তির সঙ্গে আমার শরীরের কাছে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম যে, আমার শরীরের সাথে কি আচরণ করা হচ্ছে। আমার ডান হঠাৎ সুড়ঙ্গের আকৃতিতে ক্ষণিকের মধ্যেই লাল রংয়ের আলোর বৃত্ত গড়ে উঠল। আমি প্রশান্ত চিত্তে সুড়ঙ্গের ঐ আলোকবর্তিকা থেকে আনন্দ উপভোগ করতে লাগলাম। আমার মনে হলো, আমি যেন ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। আমার শরীরের উপর যে সকল ডাক্তারী পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে তাঁর সাথে আমার যেন কোন সম্পর্ক নেই। হাসপাতালের বিভিন্ন অংশ থেকে শক্তির তরঙ্গ উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। আমাকে বলা হলো, এগুলো লোকদের দু’আ । কিন্তু যখন আমি আধ্যাত্মিকভাবে এ সংবাদ পেলাম যে, আমাকে ফিরে যেতে হবে, তখন আমার ফিরে যাওয়ার এ সংবাদ ভাল মনে হলো না। অথচ এছাড়া আমার আর কোন উপায়ও ছিল না। অতঃপর আমি বাতাসে উড়ে এসে আমার শূন্য শরীরে ঢুকে পড়লাম। এ সময় আমার মনে হলো আমি অতীতেও এই (দেহের) ভার বহন করে চলেছি এবং ভবিষ্যতেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এটা টেনে চলতে হবে। এরপর যখন আমার চোখ খুলল তখন আমি দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তিত হয়েছি।

এখন আমার প্রশ্ন হলো–

১. কোন ব্যক্তি কি বিশ মিনিট মৃত্যু অবস্থায় থেকে পুনরায় জীবিত হতে পারে?

২. মৃত ব্যক্তি কি কোন নূরানী মানুষের সাথে ভ্রমন করতে পারে?

৩. মৃত ব্যক্তির রূহ কি অপর জগতে (পরকালে) যা কিছু হচ্ছে, তা দেখতে পারে?

আশা করি কুরআন ও হাদীসের আলোকে এর যথাযথ উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন।-

নিবেদকঃ হাফেজ নূর মুহাম্মাদ ।

পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-দারুল উলূম করাচীর ফতোয়া বিভাগ থেকে প্রদত্ত উত্তরঃ

উত্তরঃ ডাক্তার সাইয়েদ আমজাদ আলী সাহেব যে সকল দৃশ্য ও ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন, তা মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিতব্য ঘটনাবলী নয়। কারণ, তিনি যদি মৃত্যুই বরণ করে থাকতেন, তাহলে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে আসতেন না। অবশ্য একথা বলা যেতে পারে যে, তিনি অসাড়-বাহ্যজ্ঞানহীন অবস্থায় মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে অপর জগতের (পরকালের) কিছু ঝলক দেখেছেন।

এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা অনেকটা এরূপঃ জীবন বলা হয় দেহের সাথে রূহের গভীর ও মজবুত সম্পর্ককে। কাজেই দেহের সাথে রূহের সম্পর্ক যত বেশী মজবুত হবে জীবনের লক্ষণও তত বেশী সুস্পষ্ট ও দীপ্ত হবে। আর এ সম্পর্ক যত বেশী দুর্বল হবে জীবনের লক্ষণ ততবেশী নিষ্প্রভ হতে থাকবে। জাগ্রত অবস্থায় যেহেতু দেহ ও রূহের এ সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত থাকে, সেহেতু এ সময় জীবনের লক্ষণ বৈশিষ্ট্যাবলী পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান থাকে। জাগ্রত অবস্থায় মানুষের সকল ইন্দ্রিয় কাজ করতে থাকে। দেহের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সতর্ক ও প্রস্তুত থাকে। মানুষ এ সময় তাঁর স্বাধীন কর্মক্ষমতাকে পূর্ণরূপে ব্যবহার করতে থাকে। কিন্তু ঘুমন্ত অবস্থায় এ সম্পর্ক কিছুটা দুর্বল হয়ে যায়, ফলে নিদ্রাবস্থায় জীবনের সকল লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এ সময় মানুষ তাঁর আশে-পাশের অবস্থা সম্পর্কে বেখবর হয়ে যায়। আর মানুষ এ সময় স্বেচ্ছায় স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করতে পারে না। তাছাড়া ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ চিন্তা-ভাবনা ও বিচার-বিবেচনা করার পজিশনেও থাকে না। তা সত্ত্বেও ঘুমন্ত অবস্থায় দেহের সাথে রূহের সম্পর্ক এতটুকু মজবুত অবশ্যই থাকে যে, তাঁর শরীরের উপর ঘটে যাওয়া অবস্থাসমূহ অনুভব করার ক্ষমতা তাঁর থাকে। সুতরাং ঘুমন্ত অবস্থায় যদি কেউ তাঁর শরীরে সুঁই বিদ্ধ করে তাহলে সে তাঁর ব্যথা অনুভব করে জাগ্রত হয়ে যায়।

 

বেহুঁশ-সংজ্ঞাহীন অবস্থা ঘুমের চেয়ে আরো দুর্বল অবস্থা। বেহুঁশ অবস্থায় দেহের সাথে রূহের সম্পর্ক ঘুমন্ত অবস্থার চেয়েও আরো দুর্বল হয়ে যায়। এ কারনেই সম্পূর্ণ বেহুঁশ অবস্থায় যদি মানুষের শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয় তাহলে সে তাঁর ব্যথা অনুভব করে না। বেহুঁশীর এ অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে এ সময় বড় বড় অপারেশন করা হয়। বেহুঁশ অবস্থায় মানুষের শরীর থেকে জীবনের অধিকাংশ লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য গায়েব হয়ে যায়। অবশ্য হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস অবশিষ্ট থাকে। ফলে তাঁর জীবন্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

 

বেহুঁশ অবস্থার চেয়েও আরো একটি দুর্বলতম অবস্থা মারাত্মক অসুস্থতার দরুন কোন লোকের মধেয় ঘটে থাকে, যাকে প্রচলিত আরবী ভাষায় (আরবী) তথা অসাড়–বাহ্যজ্ঞানহীন অবস্থা বলে আখ্যায়িত ক্রা হয়। এ অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে জীবনের সকল বাহ্যিক লক্ষণাদি শেষ হয়ে যায়। এ সময় কেবলমাত্র সাধারণ মানুষই নয়, ডাক্তারদের চোখেও বাহ্যিকভাবে জীবনের কোন স্পন্দন দৃষ্টিগোচর হয় না, হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়। শ্বাস-প্রশ্বাস থেমে যায়। রক্তচাপ গায়েব হয়ে যায়। শরীরের উষ্ণতাও প্রায় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু মস্তিঙ্কের কোন গোপন কোষে জীবন স্পন্দন অবশিষ্ট থাকে। এটাই সেই মুমূর্ষ   অবস্থা, যখন ডাক্তাররা সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে শ্বাস-প্রশ্বাস বা হৃদস্পন্দন বহাল করার জন্য কিছু কিছু কৃত্রিম উপায় প্রয়োগ করে থাকেন। কোন কোন রোগী এই ব্যবস্থা প্রয়োগের পর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তাঁর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ফলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সে তখন মৃত্যুবরণ করেনি এবং তাঁর রূহ দেহ থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক হয়ে যায়নি। এটাই জীবনের সব চেয়ে দুর্বলতম অবস্থা। এ অবস্থায় মানুষের রূহের সম্পর্ক দেহের সাথে খুবই সামান্য অবশিষ্ট থাকে। অতঃপর রূহের সম্পর্ক দেহের সাথে যতই দুর্বল হতে থাকে, রূহ দেহের বন্ধন থেকে ততই মুক্ত হতে থাকে। ঘুমন্ত অবস্থায় এই আযাদী কম হয়। পক্ষান্তরে বেহুঁশ অবস্থায় এর চেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে যায়। কাজেই (আরবী)র এ অবস্থায় যখন রূহের সম্পর্ক দেহের সাথে সামান্যই অবশিষ্ট থাকে এবং রূহ দেহের বন্ধন থেকে অনেকাংশে মুক্ত হয়ে যায়। তখন যদি কোন মানুষের বোধশক্তি স্বীয় রূহের সাথে সফরে শরীক হয় এবং এই জাগতিক জীবনের ওপারে অপর জগতের (তথা আখেরাতের) কোন ঝলক অবলোকন করে নেয়, তাহলে এটা অসম্ভব কিছু নয়। ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায় যে, এ অবস্থায় এ ধরনের লোকেরা ঊধর্ধজগতের কতিপয় দৃশ্য অবলোকন করেছে। তবে এ ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবে–

 

১. উল্লেখিত ব্যক্তি এবং অন্যান্য যারা এ সকল দৃশ্য দেখেছে, তারা কেউই তখনো মৃত্যুবরণ করেনি। কাজেই তারা যা কিছু দেখেছে তা অপর জগতের ঝলক তো হতে পারে, কিন্তু মৃত্যু পরবর্তী জীবনে অনুষ্ঠেয় ঘটনাবলী নয়।

২. যে অবস্থায় তারা এ সকল দৃশ্য দেখেছে, সেটা ইহজীবনের একটি অবস্থা। কারণ, মস্তিঙ্কের গোপন কোষে তখনও জীবন স্পন্দন অবশিষ্ট ছিল। সুতরাং ঐ দৃশ্যাবলী মস্তিঙ্কপ্রসূত হওয়াটাও বিচিত্র নয়।

(উত্তরের এ অংশ ‘দুনিয়ার ওপারে’ নামক প্রবন্ধ থেকে নেওয়া।)

উত্তর সঠিক হয়েছে

মাহমুদ আশরাফ উছমানী

মুফতীঃ দারুল উলূম করাচী

তারিখঃ ২৪/৫/১৪১৯ হিঃ

 

উত্তরদাতা–

মুহাম্মাদ ইয়াকুব

দারুল ইফতা (ফতোয়া বিভাগ)

দারুল উলূম করাচী।

তারিখঃ ২৪/৫/১৪১৯ হিঃ

 

 

লিখেছেনঃ

শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE