Breaking News
Home / বই থেকে / নবী পরিবার—১।

নবী পরিবার—১।

আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

 

قَدْ فَرَضَ اللَّهُ لَكُمْ تَحِلَّةَ أَيْمَانِكُمْ وَاللَّهُ مَوْلَاكُمْ وَهُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ

 

وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَن بَعْضٍ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِ قَالَتْ مَنْ أَنبَأَكَ هَذَا قَالَ نَبَّأَنِيَ الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ       

 

إِن تَتُوبَا إِلَى اللَّهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا وَإِن تَظَاهَرَا عَلَيْهِ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ مَوْلَاهُ وَجِبْرِيلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمَلَائِكَةُ بَعْدَ ذَلِكَ ظَهِيرٌ

 

عَسَى رَبُّهُ إِن طَلَّقَكُنَّ أَن يُبْدِلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِّنكُنَّ مُسْلِمَاتٍ مُّؤْمِنَاتٍ قَانِتَاتٍ تَائِبَاتٍ عَابِدَاتٍ سَائِحَاتٍ ثَيِّبَاتٍ وَأَبْكَارًا

 হে নবী, আল্লাহ আপনার জন্যে যা হালাল করছেন, আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে খুশী করার জন্যে তা নিজের জন্যে হারাম করেছেন কেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়।

আল্লাহ তোমাদের জন্যে কসম থেকে অব্যহতি লাভের উপায় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তোমাদের মালিক। তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

যখন নবী তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে একটি কথা গোপনে বললেন, অতঃপর স্ত্রী যখন তা বলে দিল এবং আল্লাহ নবীকে তা জানিয়ে দিলেন, তখন নবী সে বিষয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন এবং কিছু বললেন না। নবী যখন তা স্ত্রীকে বললেন, তখন স্ত্রী বললেনঃ কে আপনাকে এ সম্পর্কে অবহিত করল? নবী বললেন,ঃ যিনি সর্বজ্ঞ, ওয়াকিফহাল, তিনি আমাকে অবহিত করেছেন।

তোমাদের অন্তর অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে যদি তোমরা উভয়ে তওবা কর, তবে ভাল কথা। আর যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য কর, তবে জেনে রেখ আল্লাহ জিবরাঈল এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণ তাঁর সহায়। উপরন্তুত ফেরেশতাগণও তাঁর সাহায্যকারী।

যদি নবী তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন, তবে সম্ভবতঃ তাঁর পালনকর্তা তাঁকে পরিবর্তে দিবেন তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী, যারা হবে আজ্ঞাবহ, ঈমানদার, নামাযী তওবাকারিণী, এবাদতকারিণী, রোযাদার, অকুমারী ও কুমারী।

সূরা—আত তাহরীম—আয়াত ১—৫।

 

Modina-amarbanglapost.com_রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবার হচ্ছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য এক আদর্শ দৃষ্টান্ত। তাঁর পরিবারে আত্মীয়তা ও সৌহার্দ্যের উন্নততর সব বৈশিষ্টাবলী পূর্ণ বিদ্যমান ছিল । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের প্রত্যেকের ঐকান্তিক কামনা ছিল যেন তিনি স্বামীর সবচেয়ে প্রিয় পাত্র হতে পারেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মন ও মনন যেন তাঁর প্রতিই সবচেয়ে বেশী ঝঁকে থাকে। এর পরিণতিতে অনেক সময়েই দেখা যেত নারীসুলভ আবেগের বশবর্তী হয়ে তাদের মাঝে প্রতিযোগিতাসুলভ মনোভাব জেগে উঠত। এ মধুর প্রতিযোগিতায় প্রত্যেকেই চাইতেন তাঁর হৃদয়ের ভালবাসাটা যেন সর্বাধিক স্পষ্ট হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে প্রকাশ পায় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও্যাসাল্লামও বেহেশতী ভালবাসায় তাঁকে ভরিয়ে তোলেন।

খাদিজা (রাঃ) এর গর্ভে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চারজন কন্যা সন্তান ছিল। ফাতেমা, জয়নব, রুকাইয়া ও উম্মে কুলসুম (রাঃ)। তাদের সান্নিধ্যে রাসূল স্বর্গীয় আনন্দ উপভোগ করতেন। তাদের নিখাদ ভালবাসার ছোঁয়া পেয়ে তাঁর ব্যথা বেদনাগুলো শতক্রোশ দূরে চলে যেত। তারা ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নুয়নের মণি। কিন্তু মানবীয় উপাদানে গড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরও একটি সুপ্ত বাসনা ছিল যে, আল্লাহ পাক তাদের একটি পুত্র সন্তানকে বড় করে তুলবেন। যে তাঁর চোখের জ্যোতি হয়ে গোটা জীবনটাকেই আলোয় আলোয় ভরিয়ে তুলবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম— এর বয়সের কাটা ঘুরতে ঘুরতে ষাটের ঘরে গিয়ে পৌঁছল। কিন্তু নতুন করে একটি পুত্র সন্তানের সওগাত কোন নবী পত্নী পেশ করতে পারলেন না। আসলে আল্লাহ পাকের পরিকল্পনাই ছিল এখানে ভিন্ন কিছু।

শেষ জীবনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর পার্শ্ববর্তী রাজ্যের রাজা—বাদশাহদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র প্রেরণ করতেন। এ সূত্রে আলেকজান্দ্রিয়ার বাদশাহ, মিসরের অধিপতি ও কিবত সম্রাট মুকাওকিসের নিকট প্রসিদ্ধ সাহাবী হাতেব বিন আবী বালতা (রাঃ) এর মারফত একটি পত্র পাঠানো হয়। যার ভাষ্য ছিলো মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহর পক্ষ হতে কিরত সম্রাট মুকাওকিসের প্রতি, যে ব্যক্তি হেদায়াতের অনুসারী হয় তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক। পর কথা, আমি তোমাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম কবুল কর, নিশ্চিন্তে নিরাপদে থাকতে পারবে।

قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْاْ إِلَى كَلَمَةٍ سَوَاء بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلاَّ نَعْبُدَ إِلاَّ اللّهَ وَلاَ نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلاَ يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضاً أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللّهِ فَإِن تَوَلَّوْاْ فَقُولُواْ اشْهَدُواْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ

‘হে আহলে-কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আস-যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান-যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে, ‘সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত।

সূরা—আল ইমরান—আয়াত ৬০।

সম্রাট মুকাওকিস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পত্র অত্যন্ত সম্মান ও মনোযোগের সাথে পাঠ করেন। হাতেব (রাঃ) ও আলেকজান্দ্রিয়ায় মুকাওকিসের রাজ দরবারে উপস্থিত ছিলেন। মুকাওকিস পত্র পাঠ করে তা একজন বাদীর হাতে রেখে দেন। এরপর হাতেব (রাঃ) এর মুখোমুখী হয়ে তাঁকে বলেন—এ নবী সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত জানাও। হাতেব (রাঃ) অত্যন্ত বিশদ ভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিচিত ও তাঁর দ্বীনি দাওয়াতের কার্যক্রম তুলে ধরেন। মুকাওকিস কিছু সময় চুপ থেকে মাথা তুলে বলেন—আমার জানা ছিল যে, পৃথিবীতে একজন নবী আসবেন। তবে আমার ধারণা ছিল তিনি সিরিয়াতে আবির্ভূত হবেন, কারণ সিরিয়াই হচ্ছে অধিকাংশ নবীদের আবাস ভূমি। কিন্তু এখন দেখছি তিনি আরবে আত্মপ্রকাশ করেছেন কিন্তু এ কিরতি লোকগুলো আমার আনুগত্য করবে না। মুকাওকিসের এ কথাগুলো থেকে স্পষ্টতই বুঝে আসে, তিনি নিজের রাজত্বের প্রতি বড় বেশী সংবেদনশীল ছিলেন। এরপর নিজের মুন্সিকে ডেকে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে জবাব লিখতে শুরু করেন। পরকথা হল, আপনার পত্র আমি পড়েছি। আপনার আলোচ্য বিষয় ও দাওয়াত আমি যথার্থই বুঝেছি। আমার জানা ছিল পৃথিবীতে আরো একজন নবী আসবেন, তবে আমি মনে করতাম তিনিসিরিয়াতে আবির্ভূত হবেন। আমি আপনার দূতের যথাযথ সম্মান করেছি। আমি আপনার জন্য দু’জন দাসী উপঢৌকন পাঠাচ্ছি। এদেরকে এদেশে খুব কদর করা হয়। সবার তারা প্রিয় পাত্র। এ ছাড়া কিছু কাপড় ও আরোহনের জন্য একটি সওয়ারী পাঠাচ্ছি। আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।

কিবতীদের আপন ধর্মের উপর অবিচল দেখে অপারগতা প্রকাশ করে মুকাওকিস তাঁর পত্র হাতেব (রাঃ) এর হাতে অর্পণ করেন এবং বলেন প্রাসাদের বাইরে গিয়ে আমাদের এ আলোচনা দয়া করে কারো কাছেই আপনি প্রকাশ করবেন না। হাতেব (রাঃ) মুকাওকিসের দেয়া এক জোড়া মসৃন মিসরী পোশাক, দুলদুল নামী উৎকৃষ্টমানের একটি খচ্চর, কিছু মধু, চন্দন আর মেশক নিয়ে মদীনার পথে রওয়ানা করেন। পথিমধ্যে হাতেব (রাঃ) মারিয়া ও তাঁর বোনকে মক্কা—মদীনার ইতিহাস শোনান এবং প্রসঙ্গক্রমে ইসলাম ও তাঁর সৌন্দর্যও তাদের সামনে তুলে ধরেন। পাশাপাশি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেওও তাদেরকে অবহিত করেন। সব শুনে মারিয়া ও তাঁর বোন ইসলামের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহী হয়ে ওঠেন। হাতেব (রাঃ) তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলে সানন্দে তারা তা কবুল করে ঈমানী কাফেলায় শরীক হয়ে যান।

 

এসব উপঢৌকন নিয়ে হাতেব (রাঃ) সপ্তম হিজরীতে মদীনা পৌঁছেন। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়া সন্ধি সেরে মদীনাতেই অবস্থান করছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পত্র ও উপঢৌকন কবুল করলেন। মারিয়াকে তাঁর খুব পছন্দ হল। আর মারিয়ার বোনকে রাসুল কবি হাসসান (রাঃ) কে হাদিয়া দিলেন। এ দিকে নবীজীর ঘরে এ সংবাদ পৌঁছল যে, সোনালী চুলের হৃদয়গ্রাহী মিসরী দুই সহোদর বোন সম্রাট মুকাওকিসের তরফ হতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—কে উপঢৌকন দেয়া হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে মসজিদে নববীর সন্নিকটে হারেসা বিন নোমানের বাড়িতে রেখে দিয়েছেন। এ সংবাদ শুনে তারা ভীষণ মনোকষ্ট পেলেন। কারণ প্রত্যেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ভালবাসতেন মন—প্রাণ উড়ার করে এবং প্রত্যেকেই চাইতেন স্বামীর সবটুকু ভালবাসা যেন শুধু তাঁকে ঘিরেই বিকশিত হয়।

আয়েশা (রাঃ) এর সাথেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গভীর ভালবাসায় নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তিনি শুনলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারিয়ার ঘরে খুব বেশী যাতায়াত করেন এবং নিজের অবসরের অধিকাংশ সময় তাঁর কাছেই কাটান, তখন তিনি বেশ অভিমানী হয়ে উঠলেন। মারিয়া (রাঃ) কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহুত পছন্দ করতেন। অসাধারণ রূপবতী ছিলেন তিনি। দুধে আলতা ছিল তাঁর গায়ের রঙ। মসজিদে নববী থেকে একটু দূরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে একটি ঘর বানিয়ে দেন। পরবর্তীতে আরবের লোকেরা এটাকে উম্মে ইব্রাহীম পাড়া নামে অভিহিত করত। এ স্থানটি ছিল মদীনার এক পার্শ্বে। খেজুর ও অন্যান্য চাষাবাদের জন্য জায়গাটি খুবই প্রসিদ্ধ ছিলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উপপত্নী বানিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহগমন হতে থাকে। এক পর্যায়ে মারিয়া গর্ভবতী হয়ে পড়লেন। তাঁর গর্ভে ফুটফুটে একটি পুত্র সন্তান জম্ম নেয়। পুত্র সন্তানের সুসংবাদ পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্তর তৃপ্তিতে ভরপুর হয়ে ওঠে। আবেগ ও স্নেহের জোয়ার উথলে ওঠে তাঁর হৃদয় নদীতে। খোদার অপার অনুগ্রহের সামনে শুকরিয়ার মাথা নুয়ে পড়ে তাঁর।

ইব্রাহীমের জম্মের পর মারিয়া (রাঃ) এর মর্যাদা ও মহিমা আরো বেড়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্তরে তাঁর স্থান আরো প্রশস্ত আরো প্রেমময় হয়ে উঠল। অভাবিত এ নেয়ামত পেয়ে মারিয়া (রাঃ) কৃতজ্ঞতার ভারে আল্লাহর দরবারে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। পুত্র পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দে অন্য রকম হয়ে গেলেন। মারিয়া (রাঃ) এর ঘরে তাঁর যাতায়াত আগের চেয়ে বেড়ে গেল। শিশুপুত্রের মুচকি হাসিতে ভেতরটা তাঁর ভরে উঠত। শেষ বিকেলের সূর্যটাকে আদর দিয়ে স্নেহ দ্বিয়ে বুকে জড়িয়ে রাখতেন তিনি। একদিন পুত্র ইব্রাহীমকে কোলে করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা (রাঃ) এর ঘরে এলেন। আনন্দভরা কণ্ঠে আয়েশা (রাঃ) কে ডেকে তিনি বললেন—আয়েশা! দেখে যাও, ইব্রাহীম যেন ঠিক পিতার মত হয়েছে। এ দিকে আয়েশা (রাঃ) এর মনে তখন অন্য একটি ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিল। তিনি ভাবছিলেন যদি আল্লাহ পাক আমার গর্ভে এমন একটি সন্তান দান করতেন। তাহলে তাকেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠিক এমনি আদর করতেন, আর আমার অবস্থানটাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আরো ব্যতিক্রম হয়ে উঠত। ভাবতে ভাবতে এক সময় তিনি কেঁদেই ফেললেন। বহু কষ্ট করে চোখের অশ্রু গোপন করলেন তিনি। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুভবে তা ধরা পড়ে গেল। আয়েশা (রাঃ) এর নারী সুলভ এ দুর্বলতা খুব অপছন্দ হল তাঁর।

 

এক দিনের ঘটনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মুল মুমিনীন হাফসা বিনতে উমর (রাঃ) এর ঘরেওবস্থান করছিলেন। হাফসা (রাঃ) কিছু সময়ের জন্য পিত্রালয়ে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে তিনি চলে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকী ঘরে বসেছিলেন। হঠাৎ করেই মারিয়া (রাঃ) সেখানে আসলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একা পেয়ে কিছুক্ষণ তাঁর সান্নিধ্যে অবস্থান করলেন। ইত্যবসরে হাফসা (রাঃ) ঘরে ফিরে এসে মারিয়া (রাঃ) কে সেখানে দেখতে পেলেন। যদিও মারিয়া (রাঃ) কে নিয়ে তাঁর ভেতরে একটি চালা ঈর্ষা জাগ্রত ছিল। তথাপি তাঁর চলে যাওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করলেন। তিনি চলে গেলে হাফসা (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন আপনার কাছে এ আমি কাকে দেখলাম? আপনি তো আমাকে একদম ছোট করে দিলেন। আপনার মনে আমার প্রতি সামান্য ভালবাসা থাকলে এমনটি করতেন না। কথাগুলো বলে তিনি অখোরে কাঁদতে লাগলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুটা লজ্জা আর কিছুটা কষ্টে সংকুচিত হয়ে গেলেন। পরম বন্ধুত্বের খাতিরে প্রিয় সাহাবী উপরের কন্যাকে তিনি বিয়ে করেছেন নিজে উদ্যোগী হয়ে। সেই স্ত্রীকে কি তিনি কষ্ট দিতে পারেন? তিনি বুঝতে পারলেন নিজের আত্মসম্মানের পরিপন্থী মনে করে হাফসা এ কথা অন্যান্য স্ত্রীদের কাছেও ছড়িয়ে দিবে। আর তারাও এটাকে নিজেদের আত্মমর্যাদার জন্য একটি অভিঘাত মনে করবে, এসব বিষয় চিন্তা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসা (রাঃ) কে খুশি করার জন্য একটি অত্যন্ত গোপন বিষয় জানালেন এবং বললেন এটা কারো কাছে প্রকাশ করবে না। কিন্তু হাফসা (রাঃ) প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারলেন না। আসলে কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। অন্য একজন স্ত্রীকে তিনি বিষয়টা বলে দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূলতঃ একটি চূড়ান্ত শপথ করে বলেছিলেন যা কিছু হয়েছে মনে করো এর কিছুই হয়নি। হাফসা (রাঃ) যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খুব কাছের মানুষ ও প্রিয় পাত্র ছিলেন এবং গোটা বিষয়টা তাঁর কাছে খুব সহজ হয়ে গিয়েছিলো। তথাপি গোপন বিষয়টি তিনি গোপন রাখতে পারলেন না। আয়েশা (রাঃ) এর কাছে তা প্রকাশ করে দিলেন। ঐ ঘটনাটি তাঁর আত্মসম্মানেও বাঁধল। সকল উম্মুল মুমিনীনকে একত্র করার জন্য তিনি এ সুযোগকে একটি গণিমত মনে করলেন। আগাপিছ না ভেবে সকলের কাছে ছড়িয়ে দিলেন বিষয়টি। সকলের কাছে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা হতে লাগলো। এ আলোচনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কানেও পৌঁছলো। খুবই রুষ্ট হলেন তিনি। সকল স্ত্রীকে ভুলতে না পারা কঠিন শিক্ষা দেয়ার মনস্থ করলেন তিনি। সময়ে সময়ে একেক স্ত্রীর বাঁকা শুনতে শুনতে এক সময় বিষয়টি এমনিতেই চাপা পড়ে যাবে, এটা কোনো প্রকৃত সমাধান নয়। স্ত্রীদের বাঁকা কথা বন্ধ করে তাদের অনতিদূরে খেজুর বাগান বেষ্টিত এক গৃহে চলে গেলেন তিনি। সেখানে দরির একটি চাটাই ছাড়া দ্বিতীয় কিছুই ছিল না। ঘরের দরজায় অতন্দ্র প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে রইলেন তারই একান্ত ভক্ত গোলাম বারাহ। ঘটনার অভাবিত এ পরিণতিতে সবচেয়ে বেশি লজ্জিত হলেন হাফসা (রাঃ)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রদত্ত অঙ্গীকার তিনি রক্ষা করতে পারলেন না। তাঁর গোপন কথা অন্যের কাছে তিনি ফাঁস করে দিলেন। এ বিষয়টি তাঁর মনে প্রচন্ড যাতনা দিয়ে যাচ্ছিল। এ দিকে মদীনা জুড়ে খবড় রটিয়ে পড়ল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসা (রাঃ) কে কিংবা সকল স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন। এ সংবাদ শোনামাত্রই উমর (রাঃ) হাফসা (রাঃ) এর বাড়িতে এলেন। তাঁকে কাদতে দেখে তিনি বললেন মনে হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে তালাক দিয়েছেন? ইতোপূর্বে আরও একবার তোমাকে তিনি তালাক দিয়েছিলেন। সেবার শুধু আমার সম্মানেই তিনি তা প্রত্যাহার করেন। এবার যদি তিনি তোমাকে তালাক দিয়ে থাকেন তাহলে তোমার সাথে আমি আর কথাই বলব না। উমর (রাঃ) সেখান থেকে চলে আসলেন। এই সময়টাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে কথা বলার মত সাহস কারো হচ্ছিল না। কিন্তু উমর (রাঃ) হাফসা কে কেন্দ্র করেই এ অবস্থার সুত্রপাত; এটা জানতে পেরে সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছায় তাঁর অবস্থানস্থলে গেলেন। নবীজির গোলাম বারাহ দরজায় সটান দাঁড়িয়েছিলেন। উমর (রাঃ) ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। বারাহ অনুমতি ভেতরে গিয়ে ফিরে এসে নিইশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। হ্যাঁ—না কিছুই বললেন না। উমর (রাঃ) পুনরায় অনুমতি চাইলেন। ভেতর থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশের অনুমতি দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে হাজির হয়ে উমর (রাঃ) বসে কাঁদতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন কাঁদছ কেন উমর?

উমর (রাঃ) বললেন—আপনি আপনার স্ত্রীদের নিয়ে এতো দুশ্চিন্তায় ভুগছেন কেন? আপনি যদি তাদের তালাক দিয়ে থাকেন তাহলে আল্লাহ তাআলা সহ সকল ফেরেশতা, আবু বকর ও সব মুসলমান আপনার সঙ্গে আছে। উমর (রাঃ) এর কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক খুশি হলেন এবং হেসে বললেন—আমি তো তাদেরকে তালাক দেইনি। এক মাসের জন্য তাদের থেকে কিছুটা দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি মাত্র।

 

মহা আনন্দের এ কথাটি শোনা মাত্রই উমর (রাঃ) মসজিদে চলে এলেন। সকল মুসলমানকে জানিয়ে দিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের তালাক দেননি। কোন কারণে তাদের থেকে এক মাস দূরে অবস্থান করছেন মাত্র। এ কথা শুনে সবাই অত্যন্ত খুশী হলেন। নবী পরিবারের সকলের দিশ্চিন্তা নিমেষেই দূর হয়ে গেল।

উম্মুল মুমিনীনগণ যখন শুনলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে ফিরে আসছেন তো সকলেই নিজ নিজ দরজায় দাঁড়িয়ে তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। আয়েশা (রাঃ) এর সাথে তাঁর চোখাচোখি হতেই তিনি বলে উঠলেন—ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার জন্য আমার পিতা—মাতা উৎসর্গ হোক! আপনি কি আমার উপর খুব বেশী ব্বেজার হয়ে আছেন?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মর্মে গিয়ে স্পর্শ করল কথাটি। মুচকি হাসিতে অপরূপ হয়ে উঠল তাঁর চেহারা। নুরানী সে হাসির বিভায় গোটা পরিবেশটাই আনন্দময় হয়ে উঠল।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE