Breaking News
Home / বই থেকে / নবী পরিবার-২

নবী পরিবার-২

আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—

وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكْ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَاهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا

আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে দেবেন আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে।–

(সুরা আযহাব—আয়াত-৩৭) ।

 

Modina-amarbanglapost.com_জয়নাব বিনতে জাহাশ (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার অন্যান্য স্ত্রীদের মত নই। আপানার সাথে তাদের বিবাহ হয়তো তাঁর পিতা, ভাই কিংবা পরিবারের অন্য কেউ করিয়েছেন কিন্তু আমার বিবাহ স্বয়ং আল্লাহ তায়াল আসমানের উপর থেকে নিজে করিয়েছেন। এটা নিয়র তিনি গর্ব করতেন যে, আল কুরআনের মাধ্যমে তাঁর বিবাহের ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যান্য স্ত্রীদের তিনি বুক ফুলিয়ে বললতেন—আমাকে বিবাহ করিয়েছেন আরশের মালিক আল্লাহ। জয়নাব (রাঃ) তাকওয়া ও খোদাভীরুতার উচ্চাসনে সমাসীন ছিলেন। দান ও বদান্যতায় তিনি ছিলেন অনন্য সাধারণ। কী সে ঘটনা, যার কারণে স্বয়ং আল্লাহ পাক নিজের হাবীবের সাথে তাঁর শুভ পরিণয় ঘটিয়ে দিলেন। কেন ঐশী আদেশে তাঁর বিবাহ সংঘটিত হল? ঘটনা মূলত কী ঘটেছিল। যায়েদ বিন হারেসা (রাঃ) এর সাথে তাঁর দাম্পত্য জীবন কেমন কাটল? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে সামনের আলোচনা নির্মাণ করব আমরা।

 

জয়নাব বিনতে জাহাশ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ফুফাত বোন ছিলেন। হিজরতের সূচনালগ্নেই তিনি মদিনা চলে আসেন।   তাঁর মা হচ্ছেন উমায়মা বিনতে আব্দুল মুত্তালিব। এ হিসেবে তিনি আব্দুল মুত্তালিবের নাতনি। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিতা আব্দুল্লাহ ও উমায়মা সহোদর ভাই বোন ছিলেন। প্রথমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোলাম যায়দ বিন হারেসার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। পরবর্তীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাঁকে শাদী করেন।

এ ঘটনার বিশদ বিবরণ জানতে হলে আমাদেরকে একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। নবুয়ত পূর্ব যুগে কিছুটা সময় আমাদের কাটাতে হবে। যায়েদ (রাঃ) জম্মগত ভাবে দাস ছিলেন। তাঁর মা বাল্যকালে তাঁকে নিয়ে বনী মাআন গোত্রে তাঁর মাতুলালয়ে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে বনী কায়স গোত্রের কিছু দস্যু আক্রমণ করে যায়দ (রাঃ) কে ছিনিয়ে নিয়ে উকাজ বাজারে চার হাজার দিরহামের বিনিময়ে হাকীম বিন হিশামের কাছে বিক্রি করে দেয়। হাকীম বিন হিশাম তাঁর ফুফু খাদিজা (রাঃ) এর খেদমত করার জন্য যায়েদ (রাঃ) কে উপঢৌকন স্বরূপ ফুফুর হাতে অর্পণ করেন। পরবর্তীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমত করার জন্য খাদীজা (রাঃ) তাঁকে স্থায়ীভাবে নিয়োজিত করেন ।

হারেসা বিন শুরাহবিল পুত্র যায়দের সংবাদ পেয়ে ভাই কা’বকে নিয়ে মক্কা মুকাররমা চলে আসেন। মসজিদে হারামে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন—

হে আব্দুল মুত্তালিবের উত্তরসুরী। হে গোত্রের অধিপতি! তোমরা আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশী। তোমরা বন্দীদের মুক্ত করে দাও, অনাহারীকে অন্ন দাও, আমাদের সন্তান সম্পর্কে কথাবার্তা বলার জন্য তোমার কাছে এসেছিও। তাঁর মুক্তিপণ গ্রহণ করে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি এর চেয়ে বেশী অনুগ্রহ চাও? তারা বল সে আবার কী? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আমি তাঁকে ডেকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিচ্ছি, যদি সে যেতে চায় তাহলে বিনা মুক্তিপণে সে মুক্ত আর যদি যেতে না চায় তাহলে আমি কিছুই করতে পারবো না। তারা বলল, ঠিক আছে আমরা এটা মেনে নিলাম। বালক যায়দেকে ডাকা হল। পিতা ও চাচাকে ভালভাবেই চিনতে পারলেন তিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে বললেন—যদি তাদের সাথে চলে যেতে মন চায় তাহলে সে পথ তোমার খোলা, আর মন চাইলে আমার কাছেও থাকতে পারো। আশ্চর্যজনক ভাবে যায়েদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে থাকাটাই বেশী পছন্দ করলেন।

হারেসা স্নেহ ও আবেগভরা কণ্ঠে যায়েদকে উৎসাহ দিয়ে বললেন তুমি কি আপন পিতা—মাতা পরিবার পরিজন আর শহরবাসীর চেয়ে গোলামীর জিঞ্জিরকেই বেশী পছন্দ করছ? জবাবে যায়দ (রাঃ) বললেন—আব্বাজান! আমি এ মানুষটির মাঝে এমন কিছু পেয়েছি যার কারণে তাঁকে ছেড়ে কিছুতেই আমি থাকতে পারব না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়দকে নিয়ে জনসম্মুখে ঘোষণা করলেন, আজ থেকে যায়দ আমার পুত্র, আমার মৃত্যুর পর সে আমার উত্তরাধিকারী হবে। তখন থেকে যায়দ (রাঃ) যায়দ বিন মুহাম্মদ নামেই লোকমুখে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠলেন। আলী (রাঃ) এর পরে তিনি সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহনকারী বালক।

ধীরে ধীরে তিনি বড় হয়ে উঠলেন এবং বিবাহের বয়সে উপনীত হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ফুফাত বোন যয়নব বিনতে জাহাশকে তাঁর জন্য মনোনীত করলেন। কিন্তু জয়নব ও তাঁর ভাই আব্দুল্লাহ সম্পর্কটা পছন্দ করলেন না। আব্দুল্লাহ বিন জাহাশকে তিনি বুঝালেন, যায়দ উঁচু মাপের একজন মুমিন। এমনকি জয়নাব (রাঃ) বলেই ফেললেন—আমি কিছুতেই তাঁকে বিয়ে করব না। কিন্তু জয়নাব (রাঃ) এর   সাথে আত্মীয়তার সুবাদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি নিয়ে একটু বাড়তি গুরুত্ব দিলেন, আব্দুল্লাহ বিন জাহাশ (রাঃ) কে তিনি বুঝালেন, যায়েদ উঁচু মাপের একজন মুমিন। পিতা মাতা উভয় দিক থেকেই তিনি আরব বংশোদ্ভূত। কাজেই এখানে অমতের কী আছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উৎসাহ পেয়ে ভাই বোন উভয়েই সম্মতির মাথা ঝুঁকিয়ে দিলেন। এই সময়ে নিম্নোক্ত আয়াওটি অবতীর্ণ হয়,

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا

আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন ক্ষমতা নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট তায় পতিত হয়।

(সূরা—আহযাব-আয়াত-৩৬)।

আল্লাহ পাকের আদেশের পর যায়দ ও জয়নাব (রাঃ) সন্তুষ্ট চিত্তে শুভ পরিণয় সম্পন্ন করলেন। জীবন্ত দৃষ্টান্তের মাধ্যমে মুসলমানরা নতুন করে জেনে নিল।

শুধু তাকওয়ার ভিত্তিতেই একজন আরবীর উপর একজন আরবী মর্যাদা পেতে পারে, অন্য কোন ভিত্তিতে নয়। আল্লাহ পাকের তাওফীক ও মেহেরবানীএত যায়দ ও যয়নাব (রাঃ) এর দাম্পত্যজীবন হাসি খুশিতেই কেটে যাচ্ছিল। বড় আনন্দঘন ও প্রেমময় জীবন কাটাচ্ছিলেন তারা। শান্তি ও সুখের যাবত্রীয় ব্যবস্থাপনা আল্লাহ তাদের জন্য আসান করে দিয়েছগিলেন। আসলে আল্লাহ পাক যা চান অতি অল্পসময়ে অবিশ্বাস্যভাবে তা করে দেখান। তিনি কোন কাজের ইচ্ছা করলে কেউ তাঁর অন্যথা করতে পারবে না। আল্লাহ পাক চাচ্ছিলেন, এমন একটি পরিস্থিতি সামনে আসুক যার দ্বারা মুসলমানদের একটি ধর্মীয় সমস্যার অবসান ঘটতবে এবং ধারণাপূজারী লোকদের ধারণার বিলোপ সাধন হবে।

খুব বেশী সময় অতিবাহিত হয়নি। ইতোমধ্যে যায়দ ও জয়নাব (রাঃ) এর সম্পর্কের নদীতে ভাটা পড়ে গেল। তাদের ভালবাসায় কিছুটা ফাটল পরিলক্ষিত হল। সময় গড়াতে থাকে আর যায়দ (রাঃ) এর ধৈর্যের বাঁধ ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তিনি অভিযোগ করলেন—যয়নাবের সাথে ঘর করা আমার জন্য আর সম্ভব হচ্ছে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন এবং পিঠ চাপড়ে বললেন—বেটা স্ত্রীকে নিজের কাছেই রেখে দুআ করতে থাক, যেন তোমাদের সম্পর্ক আগের মত সুন্দর ও সুখময় হয়ে যায়। যায়দ আল্লাহকে ভয় করো এবং বুদ্ধি ও বিবেচনার সাথে যে কোন সিদ্ধান্ত নাও। কিন্তু জয়নাব (রাঃ) যায়দ (রাঃ) এর সাথে সেই অমধুর আচরণ করে যেতে লাগলেন। নিজের সৌন্দর্য ও মোহনীয়তা এক সুপ্ত অনুভূতি তাঁর ভেতর কাজ করে যাচ্ছিলো। অঘোষিত এ গৌরবে যায়দ (রাঃ) অনেকটা সংক্যচিত হয়ে পরলেন এবং স্ত্রীর সাথে শান্তি ও নিশ্চিন্ত দাম্পত্যজীবন তাঁর কাছে অসম্ভব মনে হতে লাগল। কারণ জয়নাব (রাঃ) তাঁর কথা ঠিকমত শুনতেন না এবং তিনিও এ জীবনের একটি চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি চাচ্ছিলেন।

যায়দ (রাঃ) পুনর্বার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে অভিযোগ করে বললেন—ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি আর পারছি না। আমি তাঁকে এতালাক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কি তাঁর কাছ থেকে খুব বেশি কষ্ট পাচ্ছ? যায়দ (রাঃ) বললেন না, খুব বেশী কষ্ট আমি পাচ্ছি না, যাবতীয় সৌন্দর্যই তাঁর মাঝে আছে তবে নিজের আভিজাত্যের গৌরবে সে একটু বাড়াবাড়ি করে। তাঁর ভেতর সুপ্ত একটি অহমিকা খুব ক্রিয়াশীল। বিভিন্ন কথাবার্তা ও আকার ইঙ্গিতে সে আমাকে কষ্ট দিতে চায়। তারপরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন বেটা! নিজের স্ত্রীকে নিজের কাছেই রেখে দাও।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো যায়দ (রা) কে বলছিলেন ;স্ত্রীকে নিজের কাছেই রেখে দাও, কিন্তু আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে তিনি জেনে গিয়েছিলেন, যায়দ (রাঃ) অচিরেই যয়নাব (রাঃ) তালাক দিবেন এরপর যয়নাব (রাঃ) তাঁর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন। তবুও তিনি আল্লাহ অয়াকের অফুরন্ত রহমতের দিকে তাকিয়ে মনে মনে দুআ করছিলেন। হতে পারে আল্লাহ পাক তাঁর সিদ্ধান্তে কোন পরিবর্তনএনে যায়দ ও যয়নাব (রাঃ) এর অবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে দিবেন। কিন্তু ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ পাক জানিয়ে দিলেন। এটা আসমানি সিদ্ধান্ত । এ সিদ্ধান্তের কোন ব্যত্যয় হবে নয়া। আপনি লোকের কথায় কা দিবেন নয়া। ওহীর অমোঘ বাণী—

وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكْ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَاهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا

আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে দেবেন আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে।–সুরা—আহযাব—আয়াত ৩৭।

অল্পকালেই এ সিদ্ধান্ত পরিণতি লাভ করল। যায়দ (রাঃ) জয়নাব (রাঃ) কে তালাক দিয়েছিলেন। ইদ্দত পালনান্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে জয়নাব (রাঃ) এর নতুন করে বিয়ে হয়। তিনটি বিষয়ে জয়নাব (রাঃ) খুব গর্ববোধ করতেন। ১. তাঁর ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শেকড় তথা বংশীয় মূল একই ব্যক্তি, অর্থাৎ আব্দুল মুত্তালিব। ২. আল্লাহ নিজেই তাঁর বিবাহ সংঘটন করেছেন। ৩ তাঁর বিবাহের প্যগাম বয়ে আনেন জিব্রাঈল (আঃ)। এ সকল কারণে তিনি অন্যান্য স্ত্রীদের মাঝে গর্ব করে বেড়াতেন যে, তোমাদের বিয়ে দিয়েছেন তোমার পরিবারের কেউ আর আমার বিয়ে সাত আসমানের উপর থেকে স্বয়ং আল্লাহ পাক দিয়েছেন।

এবার আমরা আলোচনা করব এ বিবাহ কিভাবে হল? এ সুসংবাদ যয়নাব (রাঃ) কখন পেলেন? ইত্যাদি। হাদীস থেকে জানা যায়, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা (রাঃ) এর সাথে বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ অন্যমনঙ্কতা তাঁকে ছেয়ে ধরল। ওহী অবতীর্ণ হওয়া শুরু হল তাঁর উপর। একটু পুরে মুচকি হেসে তিনি বললেন—যয়নাবের কাছে এ সুসংবাদটি পৌঁছে দিতে কে আছ এখানে? এরপর রাসূল তেলাওয়াত করলেন—

‘আর যখন আপনি তাঁকে বলেছিলেন, যার উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও অনুগ্রহ করেছেন, তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখো এবং আল্লাহকে ভয় করো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খাদেম সুলায়ম (রাঃ) দৌড়ে এ সংবাদ যায়নাব (রাঃ) এর কাছে পৌঁছে দিলেন। সুসংবাদ শুনেই যায়নাব (রাঃ) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং শুকরিয়ার নামাজ পড়া শুরু করে দিলেন সঙ্গে সঙ্গেই।

অবশেষে শুভ বিবাহের দিন এসে হাজির হল। ওলীমা আয়োজনে বেশ লোকজন অংশ নিয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বকরী জবেহ করে খাদেম আনাস (রাঃ) কে বললেন যাও লোকদের ওলীমার দাওয়াত দাও। লোকজন বিক্ষিপ্ত আসছিলো এবং খেয়ে দেয়ে চলে যাচ্ছিলো। ওলীমা আয়োজন সম্পর্কে আনাস (রাঃ) বলেন—সবার খাওয়া—দাওয়া শেষ হয়ে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন আনাস! জিনিস পত্র উঠিয়ে নিয়ে যাও, এ দিকে কয়েকজন লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘরে বসে কথাবার্তা বলছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেখানে কিছু সময় বসে রইলেন। এ সময় তাঁর স্ত্রীর দেয়ালের দিকে মুখ করে বসেছিলেন। লোকজনের এভাবে বসে থাকাটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অশোভন মনে হচ্ছিল। অনেকেই চলে গেলেও দুজন তখনো বসে বসে গল্প করছিলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য স্ত্রীদের ঘরে গিয়ে তাদের সালাম দিয়ে হাল পুরুস্তি করছিলেন। তারা বলছিলেন—আমরা সবাই ভালো আছি। নতুন স্ত্রীকে কেমন লাগল আপনার? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছিলেন—ভাল আলহামদুলিল্লাহ। সবার সাথে সাক্ষাৎ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এলেন। আমিও তাঁর সাথে ফিরে এলাম। দরজায় এসে দেখলেন, সেদুজন লোক এখনো বসে আছে। একটু পরে তারা চলে গেল। আমার মনে নেই, তাদের চলে যাওয়ার সংবাদ আমিই দিয়েছিলাম না ওহীর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেয়েছিলেন। ভেতরে ঢুকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ও তাঁর মাঝে একটি পর্দা টেনে দিলেন। এ সময় নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ إِلَّا أَن يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلَى طَعَامٍ غَيْرَ نَاظِرِينَ إِنَاهُ وَلَكِنْ إِذَا دُعِيتُمْ فَادْخُلُوا فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانتَشِرُوا وَلَا مُسْتَأْنِسِينَ لِحَدِيثٍ إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ يُؤْذِي النَّبِيَّ فَيَسْتَحْيِي مِنكُمْ وَاللَّهُ لَا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاء حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ وَمَا كَانَ لَكُمْ أَن تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَن تَنكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِن بَعْدِهِ أَبَدًا إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ عِندَ اللَّهِ عَظِيمًا

হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া না হলে তোমরা খাওয়ার জন্য আহার্য রন্ধনের অপেক্ষা না করে নবীর গৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমরা আহুত হলে প্রবেশ করো, তবে অতঃপর খাওয়া শেষে আপনা আপনি চলে যেয়ো, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে যেয়ো না। নিশ্চয় এটা নবীর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কাছে সংকোচ বোধ করেন; কিন্তু আল্লাহ সত্যকথা বলতে সংকোচ করেন না। তোমরা তাঁর পত্নীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্যে এবং তাঁদের অন্তরের জন্যে অধিকতর পবিত্রতার কারণ। আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর ওফাতের পর তাঁর পত্নীগণকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর কাছে এটা গুরুতর অপরাধ।–

সূরা আহযাব, আয়াত ৫৩।

এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর পর্দার বিধানটি উম্মুল মুমিনদের জন্য আবশ্যক হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বিবাহের সময় যয়নাব (রাঃ) এর বয়স পয়ত্রিশ বছর। তাঁর পূর্ব নাম ছিল বাররাহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটা পাল্টে যয়নাব রাখেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সৎ মেয়ে যয়নাব বিনতে আবু সুলামা বলেন—আগে আমার নামও বাররাহ ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বদলে জয়নাব রাখেন। আমার পরে যয়নাব বিনতে জাহাশ রাসূল এর ঘরে আসেন। তাঁর নামও তিনি জয়নাব রাখেন। আয়েশা (রাঃ) নিজে স্বীকার করে বলেন—জয়নাব ও উম্মে সালামার প্রতি আমার খুব ঈর্ষা হয়। কারণ আমারে পরে তারাই ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সব চেয়ে বেশি প্রিয় পাত্র। অন্যত্র তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের মাঝে এক মাত্র জয়নাব ছাড়া কেউ আমার সমকক্ষ ছিল না। অবশ্য সমকক্ষ এই মানুষটির সাথে তাঁর কিছুটা মৌন মধুর কলহ ছিলো। মধু পানের ঘটনাতি তো প্রায় সর্বজনবিদিত। যে ঘটনায় সাফসা (রাঃ) ও আয়েশা (রাঃ) স্বপক্ষে ছিলেন। তারা উভয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জয়নাব (রাঃ) এর খাবারের প্রতি একটি বদ ধারণা দেয়ার জন্য বলেছিলেন, আমরা আপনার মুখ থেকে রসুনের গন্ধ পাচ্ছি। অথচ জয়নাব (রাঃ) এর খাবার খুবই উন্নতমানের ছিল। বিশ্রী কোন গন্ধ তাতে ছিল না। একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনেই আয়েশা ও জয়নাব (রাঃ) এর অম্লামধুর বচসা শুরু হয়। যয়নাব (রাঃ) কেপরাজিত করে আয়েশা (রাঃ) বিজয়ী হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—সর্বোপরি এতো আবু বকরেরই মেয়ে।

তবে ইতিহাস স্বাক্ষী, যখন আয়েশা (রাঃ) এর উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা হয় তখন জয়নাব (রাঃ) আয়েশা (রাঃ) এর অনুকূলে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন। আপন বোন হামনা বিনতে জাহাশের বিপরীতে অত্যন্ত মার্জিত অবস্থান গ্রহণ করেন তিনি। এ সম্পর্কে আয়েশা (রাঃ) বলেন—

আমার উপর অপবাদ আরোপ করা ছিল নেয়ায়েত জঘন্য ব্যাপার। খাযরাজ গোত্রীয় আব্দুল্লাহ বিন উবাই, মিসতাহ ও হামনা বিনতে জাহাশ এতে শরীক ছিল। হামনা এতে এজন্য অংশ নিয়েছিল যে, একমাত্র তাঁর বোন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের মাঝে আমার সমমানের ছিল। কিন্তু জয়নাব এ ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের পূর্ণ আমানত রক্ষা করেন। ভাল ছাড়া কোন মন্দ তিনি আমার ব্যাপারে বলেনি। ফলে হামনা তাঁর বোনকে অনেক কটু কথা বলে। এতে আমি খুব কষ্ট পাই।

অন্য এক জায়গায় আয়েশা (রাঃ) বলেন এমন কোন নারীকে দেখেনি, যে ধর্মীয় ব্যাপারে জয়নাবের চেয়ে অধিক সংবেদনশীল। অতিমাত্রায় খোদাভীতি পরায়ণ, অনেক বেশি স্বজনমুখী ও সর্বাধিক দানশীল। যে সব আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন তরান্বিত হয় সেসব আমলে তিনি সদা আত্মনিয়োজিত থাকতেন। এগুলো জয়নাব (রাঃ) এর স্বপক্ষে সতীনদের সাক্ষ্য। যা তাঁর পরম খোদাভীতি, আত্মীয়তা প্রীতি ও উন্নত গুণাবলীর প্রমাণ বহন করছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জয়নাব (রাঃ) কে বিবাহ করার পূর্বে জাহেলী যুগ থেকে আরব সমাজে এই প্রথা প্রচলিত ছিল যে, তারা ঔরসজাত সন্তান ও পোষ্যপুত্রকে উত্তরাধিকার এবং আইন বিধিবদ্ধতায় বরাবর মনে করত। ধর্মীয় ও যৌক্তিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এ বিষয়টা চরম ক্রটিপূর্ণ । এ ভ্রান্তির বিলোপ সাধন করে সত্যকে সমুন্নত করার জন্যই আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীর জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অনাগত মুসলমানদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তোলে ধরলেন। যেন সকল মুসলমন নির্দ্বিধায় মেনে নিতে পারে। আল কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে ঔরসজাত সন্তান ও পোষ্যপুত্রের মাঝে পার্থক্য ফুটিয়ে তুলা হয়েছে স্পষ্টভাবে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—

যখন যায়েদ তাঁর (জয়নাবের) সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলো, তখন আমি তাঁকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম। যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা নিজ স্ত্রীদের সম্পর্ক ছিন্ন করলে তাদেরকে বিয়ে করার ব্যাপারে মুমিনদের মাঝে কোন অসুবিধা না থাকে। আর আল্লাহর আদেশ তো কার্যকরী হয়েই থাকে। এরপর আল্লাহ পাক আরো বলেন,

আল্লাহ নবীর জন্য যা বিধিবদ্ধ করেছেন সে বিষয়ে তাঁর উপর কোনো দোষারূপ নেই। আল্লাহ সেই নবীদের জন্যও এই নিয়ম করে রেখেছিলেন যারা পূর্বে অতীত হয়েছেন। আর আল্লাহর বিধান নির্ধারিত, অবধারিত।

(সূরা আহযাব, আয়াত ৮ )

এর মাধ্যমেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়দ (রাঃ) এর পিতা হওয়ার বিষয়টি অমূলক হয়ে যায়। তাই আর জিছুতেই বলা যাবে না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ পুত্রবধুকে বিবাহ করেছেন। আল কুরআন আরেকটু খোলাসা করে বলে দিয়েছে—

যয়নাব (রাঃ) আজীবন রাসূল (সাঃ) এর একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী ও অনুগত থেকেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আমার ইন্তেকালের পর সর্বপ্রথম আমার সাথে সেই মিলিত হবে যার হাত লম্বা। আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘আমার নবী পত্নীরা পরবর্তীতে যখনই মিলিত হতাম, দেয়ালে নিজেদের হাত মেপে দেখতাম কার হাত বেশী লম্বা। এরই মাঝে যয়নাব (রাঃ) ইন্তেকাল করলেন। গঠনগত দিক থেকে তিনি আমাদের মাঝে খুব লম্বা ছিলেন না। তখন আমরা বুঝতে পারলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যধিক দানশীলতাই বুঝিয়েছেন। যয়নাব (রাঃ) নিজ হাতে কাজ করতেন, চামড়া সেলাই করতেন, যা কিছু এতে উপার্জন হতো সবই সদকা করে দিতেন। তিনি সর্বমোট বারটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে দুটি বুখারী ও মুসলিম উভয় কিতাবেই পাওয়া যায়।

বর্ণিত আছে, একবার উমর (রাঃ) বায়তুল মাল থেকে বার হাজার দেরহাম যয়নাব (রাঃ০ কে হাদিয়া পাঠান। সম্পদ হাতে পেয়ে তিনি বলেন—আয় আল্লাহ! ভবিষ্যতে যেন এমন সম্পদ আমার হাতে না আসে। এগুলো তো ফেতনা। এরপর সমুদয় সম্পদ তিনি আত্মীয় ও অভাবীদের মাঝে বন্টন করে দেন এটা জানতে পেরে উমর (রাঃ) তাঁর কাছে আসেন এবং সালাম দিয়ে আরজ করেন—আপনার সম্পদ বন্টন করে দেয়ার সংবাদ আমি পেয়েছি। অতিরিক্ত আরো এক হাজার দেরহাম পাঠিয়ে দিচ্ছি। অন্তত সেগুলো কবুল করবেন। অতিরিক্ত এক হাজার দেরহাম পাওয়ার পর সেগুলোও তিনি দান করে দেন। একটি দেরহামও নিজের কাছে তিনি অবশিষ্ট রাখেননি।

বিশ হিজরীতে যখন তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, উপস্থিত লোকদের তিনি বলেন আমি নিজের কাফন প্রস্তুত করে রেখেছি। উমর আমার জন্য একটি কাফন পাঠাবে। তোমরা যে কোন একটিকে সদকা করে দিও। আর আমার পরিধেয় পোশাক সদকা করতে পারলে আরো ভালো হয়। আল্লাহ পাক ইবাদত প্রেমী ও নবী পত্নীর উপর শত ধারায় রহমত বর্ষণ করুণ। দানের প্রকৃত অর্থ তিনি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন। মৃত্যু শয্যায় শুয়েও সদকার কথা তিনি ভোলেননি। আমাদের মায়েদের জন্য, আমাদের মেয়েদের জন্য যায়নাব (রাঃ) এর মতো খোদা ভক্ত ও রাসূল প্রেমী আদর্শ খুঁজে নেয়া সত্যিই আজ বড় প্রয়োজন।

লিখেছেনঃ শাইখ আব্দুল মুনঈম হাশেমী

অনুবাদঃ মাওলানা হাসান শরীফ

আল কুরআনে নারীর কাহিনী বই থেকে সংগ্রহ করা।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE