Breaking News
Home / বই থেকে / নয় (ব্যথিত হৃদয়)

নয় (ব্যথিত হৃদয়)

আজ মঙ্গলবার দিবাগত রাত্রি। বই পড়তে পড়তে রাত গভীর হয়। অথচ সাকিবের চোখে ঘুমের লেশ মাত্র নেই। এ যেন কিসের এক প্রতিক্ষা!

দরজা খুলে বাইরে আসে সাকিব। পূর্ণিমার রাত। দালান-কোটা, রাস্তা—ঘাট সব কিছুই রূপালী আলোয় উদ্ভাসিত। নীরব নিস্তব্ধ পৃথিবী। চতুর্দিকে শুধুমাত্র ঝি-ঝি পোকার একটানা ডাক ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছে না। স্নিগ্ধ-শীতল ঝিরঝিরে বাতাস শরীরে আদরের পরশ বুলিয়ে মৃদুমন্দ গতিতে বয়ে চলছে। গাছের পত্র-পল্লবগুলো সমীরনের আলতু ছোঁয়ায় গাইছে আনন্দের গান।

সাকিবের দৃষ্টি তখন নিঃসীম নিলীমায়। সে কল্পনার পঙ্খিরাজে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত। যেখানে কোনো বাধা নেই। নেই কোনো জবাবদিহিতা।

এ সময় ছোট বেলার বেশ কিছু স্মৃতি ভেসে ওঠে সাকিবের মানসপটে। মনে পড়ে পরম শ্রদ্ধাভাজন মায়ের কথা, ছোট্ট বোন খালেদার কথা, মনে পড়ে প্রিয় বন্ধু শাকিলের কথা, মনে পড়ে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার কথা। সেই সাথে মনে পড়ে বিমাতার কিছু নিষ্ঠুর আচরণ ও অমানবিক কর্মকাণ্ডের কথা। মায়ের মৃত্যুর পর একদিন সে ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে শুয়ে শুয়ে কাঁদছিল। তখন পাশের বাড়ির এক মহিলা সাকিবকে জিজ্ঞেস করেছিল, কিরে সাকিব! কাঁদছিস কেন? ক্ষুধা পেয়েছে?

হ্যাঁ, সেদিন কিন্তু সাকিব ক্ষুধার কারণেই কেঁদেছিল। তবু সে মহিলার প্রশ্নের জবাব দেয়নি। দিতে পারে নি। মুখ খুলে বলতে পারে নি যে—ক্ষুধার যন্ত্রণায় অস্থির হয়েই আমি কাঁদছি। কারণ, ছোট মা রাশেদা খানম তখন দাঁড়ানো ছিল তাঁর কাছেই। সাকিব যদি জবাব দিত , তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে বলতেন, কি বললি তুই? নিমুক হারাম কোথাকার! পেটের ক্ষুধায় কাঁদছিস? তুই না একটু পূর্বে গলা পর্যন্ত খেয়ে গেলি? মূলত এ ভয়েই সাকিব সেদিন কিছু না বলে চুপ থেকেছিল।

এ ঘটনার দিন সাকিব খেয়েছিল ঠিকই। সেটা ছিল দুপুরের খাবার। কিন্তু খাবারের পরিমাণ এত কম ছিল যে, বিকেলেই তাঁর ক্ষিধে লেগে গিয়েছিল। ঘটনা হলো, সাকিব খেতে বসলে চেহারাটা কালো করে রাশেদা খানম প্রথমে সাকিবের প্লেটে অল্প কটি ভাত দেয়। সেগুলো শেষ গেলে সাকিব আবার ভাত চায়। রাশেদা খানম আবারো চেহারাটা কালো করে দু’চামচ পরিমাণ ভাত সাকিবের প্লেটে ছুড়ে মারে। সাকিবের পিতা তখন ঘরে ছিল না। তাছাড়া সে অনেকটা লাজুক প্রকৃতির ছেলে। তাই মায়ের এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আবার ভাত চাওয়া সম্ভব হয় নি তাঁর। সুতরাং সেদিন তাকে একরকম অভুক্ত থেকেই খাওয়া থেকে উঠে যেতে হয়েছিল।

সেদিনের পর থেকে এ ধরণের ঘটনা একদিন-দু’দিন নয়, প্রায়ই ঘটত। এমন কি রাশেদা খানম সাকিবের গায়ে হাত তুলতেও কোনোরূপ পরওয়া করত না। একবার সাকিবের পিতা তিন মাসের জন্য বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে ছিলেন। বাড়িতে ফিরে সাকিবের দিকে তাকাতেই আঁৎকে উঠেন। তাঁর দু’চোখ আড়ষ্ট হয়ে যায়। একি অবস্থা হয়েছে সাকিবের! জীর্ণ শীর্ণ হয়ে গেছে তাঁর কচি দেহখানা। কোঁকড়ানো চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে কপালের চার পাশে। চোখ দুটো বসে গেছে। কালো হয়ে গেছে মুখখানা। পিঠের কয়েক জায়গায় আঘাতের চিহ্ন বিদ্যমান। গায়ের জামা ছিঁড়ে গেছে। পিঠের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। আতাউর রহমানের বুকে যেন একটি ব্যাথা মোচড় দিয়ে ওঠল। অতি কষ্টে নিজেকে সংযত করে নিলেন তিনি। তারপর সাকিবের কাছে জানতে চাইলেন, তোমার এ অবস্থা কেন? সাকিব তখন কিছু না বলে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। অবশেষে অনেকবার বলার পর সে যখন সবকিছু খুলে বলল, তখন তিনি একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। স্ত্রীকে লক্ষ্য করে কেবল এতটুকু বলেছিলেন, রাশেদা! সাকিব তোমার সৎ ছেলে বলে তাঁর সাথে তুমি এমন নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারলে? এমন ভাবে তাকে মারতে পারলে? পারলে প্রয়োজনীয় খানাপিনা থেকে তাকে বঞ্চিত রাখতে? আচ্ছে তুমিই বলো, তোমার গর্ভের সন্তান হলে তুমি কি পারতে তাঁর সাথে এমন অমানবিক আচরণ করতে?

জবাবে তখন রাশেদা খানম হুংকার ছেড়ে বলেছিলেন, আমি যা করার করেছি। প্রয়োজনে আরো করব। ওর হাড্ডি আমি গুড়ো করে ছাড়ব। তুমি আমাকে কিছু করতে পারলে কইরো।

আতাউর রহমান বললেন, তোমার মতো বাঘিনী বউকে আমার মতো ভীরু পুরুষেরা কি-ই-বা করতে পারবে! তবে মনে রেখো, অত্যাচারের সাজা কিন্তু দুনিয়াতেই ভোগ করতে হয়।

এসব স্মৃতি মন্থন করতে করতে বিছানায় ফিরে এসে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ে সাকিব। পাখির প্রভাতী গানে ঘুম ভাঙ্গে তাঁর। পূর্বাকাশের কোল ঘেঁষে একটি লাল রেখা দিনের আগমনী বার্তা দিয়ে সকলকে সুপ্রভাত জানায়। হাজী সাহেবের বাগান থেকে ভেসে আসা কামিনী ফুলের সৌরভে এক মনমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এখন খুব ভাল লাগছে সাকিবের। ফজরের নামাজের কিছুক্ষণ পর সকালের নাস্তা সেরেই সে যাবে মাদরাসায় ভর্তি হতে। আবার সে ফিরে পাবে ছাত্র জীবন!

বেলা আটটার দিকে তিন সেট কাপড় নিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন হাজী বশীর সাহেব। বলেন, এই নাও সাকিব। তুমি পড়তে যাবে শুনে খুশি হলাম। আল্লাহ তাআলা তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করুন। আমার ছেলেগুলোকে লেখাপড়া শিখানোর জন্য অনেক চেষ্টা-তদবীর করলাম। টাকা পয়সাও কম খরচ করি নি। কিন্তু কোনো ফল হলো না। ছোট ছেলেটাতো কথাই শোনে না। কোথায় থাকে, কোথায় কি করে সে-ই জানে। খাবার সময় হলে চুপটি মেরে খেয়ে আবার বের হয়ে যায়। সারাদিন আর পাত্তা থাকে না।

ইমাম সাহেব মাদরাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে চলে আসেন। তিনি দরজার সামনে দাঁড়াতেই হাজী সাহেব সালাম দিয়ে বললেন, আসুন হুজুর আসুন। এই কে আছিস? হুজুরকে নাস্তা দে।

না, হাজী সাহেব। আমি এই মাত্র নাস্তা সেরে এসেছি। সাকিব যদি নাস্তা না খেয়ে থাকে তাহলে তাকে খাইয়ে দিন। সময় খুব কম। ওকে ভর্তি করে আমার ক্লাসে যেতে হবে।

ইমাম সাহেবের চা এগিয়ে দিয়ে নাস্তা খেয়ে নেয় সাকিব। তারপর কাপড়ের পুটুলিটা হাতে নিয়ে বিদায়ের জন্য হাজী সাহেবের পাশে এসে দাঁড়ায়। হাজী সাহেব সাকিবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে স্নেহমাখা কণ্ঠে বলেন, যাও বাবা। আল্লাহ তোমার সহায় হউন। তুমি বড় হও। অনেক বড় হও। দেশ ও জাতির সেবায় নিজকে নিয়োজিত রাখো—সব সময় দয়াময় মাবুদের কাছে এই দোয়াই করবো।

সাকিবের দু’গণ্ড বেয়ে ক্ষীণ দুটি অশ্রুধারা নীরবে বয়ে যায়। মনের পর্দায় ভেসে ওঠে স্বপ্নে শ্রুত মায়ের কথাগুলো। নতুন জীবনেরর আশায় ইমাম সাহেবের পিছু পিছু চলতে থাকে সাকিব। পিছনে পড়ে থাকে হোটেলের কর্মময় জীবনের অসংখ্য স্মৃতি। যে স্মৃতি তাকে কখনো হাসায় কখনো কাঁদায়।-আরো পড়ুন

আপনি পড়ছেনঃ ব্যথিত হৃদয় (ইসলামীক উপন্যাস)

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE