Breaking News
Home / বই থেকে / বাইশ (ব্যথিত হৃদয়)

বাইশ (ব্যথিত হৃদয়)

ঢাকা আসার পর সাকিবের ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কয়েকদিনের মধ্যে সাথীদের সাথে সে পাঁচবার বৈঠক করে। মুফতি সাহেবের সাথ বারবার যোগাযোগ করে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নেয়। সাকিব এবং তাঁর সাথীদের মাথায় এখন কেবল একটাই চিন্তা–কিভাবে দেশের প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদদের রিচার্স সেন্টারে একত্রিত করে একটি সেমিনারের আয়োজন করা যায় এবং সেমিনারের পর সবার মূল্যবান বক্তব্যগুলো বই আকারে প্রকাশ করে দেশের প্রতিটি মুসলিম নরনারীর হাতে পৌঁছে যায়।

দেখতে দেখতে সেমিনারের তারিখ এসে গেল। আজ বহু প্রত্যাশিত সেই সেমিনার যার জন্য সাকিব ও তাঁর সাথীদের সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তবে এই কষ্টের জন্য তারা মোটেও দুঃখিত নয়। কারণ তারা জানে যে, বড় ধরণের ত্যাগ ও কষ্ট ছাড়া বড় কিছু অর্জন করা যায় না।

সাকিব তাঁর হোটেল মালিক হাজী বশীর সাহেব, মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ, বাল্যবন্ধু শাকিল ও মাদরাসা দারুর রাশাদের ছাত্র সোহেল সহ বিশেষ বিশেষ লোকদের কাছে আগেই দাওয়াত নামা পাঠিয়ে দিয়েছিল। দাওয়াত পেয়ে সকলেই যথাসময়ে উপস্থিত হয়েছে। তাছাড়া অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার বেশ আগেই অসংখ্য লোকের আগমনে পুরো হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। তারা সাকিবের বিশাল রিচার্স সেন্টার, হাজারো প্রকারের কিতাবপত্র, ২০ টি কম্পিউটার সহ অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা দেখে যারপরনাই বিস্মিত হয়েছে।সোহেল তো বলেই ফেলেছে, ভাই! বর্তমান জমানায় আপনার মতো আলেমই দরকার। আপনার মধ্যে তো আমি একজন দাঈর সবগুলো গুণই দেখতে পাচ্ছি। আল্লাহ আপনাকে আরো বেশি করে দীনের খেদমত করার তাওফীক দান করুন।

সাকিব সোহেলকে শাকিলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। তারপর তাদেরকে চা-নাস্তা খাওয়ানোর কথা বলে সে একটু বাইরে যায়। এই ফাঁকে শাকিল ও সোহেলের মধ্যে বেশ আলাপ জমে ওঠে। এক পর্যায়ে শাকিল সোহেলকে জিজ্ঞেস করে–ভাই! কিছুক্ষণ আগে আপনি দাঈ শব্দটি উল্লেখ করেছেন। সেই সাথে এও বলেছেন যে, সাকিব ভাইয়ের মধ্যে নাকি দাঈর সব গুণাবলীই বিদ্যমান। এখন আপনার কাছে আমার জানার বিষয় হলো, দাঈ শব্দের অর্থ কি?

এবং দাঈর গুণাবলী-ই বা কি?

সোহেল বলল, দাঈ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো, আহবান কারী। আর পরিভাষায় দাঈ বলা হয়, ঐ ব্যক্তিকে যিনি মানুষকে সত্যের পথে, আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের পথে এক কথায় –ইসলামের পথে আহবান করেন।

আর একজন দাঈর সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তাঁর মনের মধ্যে সব সময় একটা জ্বলন থাকতে হবে। অর্থাৎ সবসময় তাঁর অন্তরে এ চিন্তা বিরাজ করবে যে, কী করে বিপথে পরিচালিত প্রতিটি মানুষকে সঠিক পথে আনা যায়। কি করে তাদেরকে জাহান্নামের পথ থেকে উঠিয়ে জান্নাতের পথে তুলে দেওয়া যায়।

এছাড়া একজন দাঈর মধ্যে আরো কয়েকটি গুণ থাকতে হবে। যথাঃ

১। দাঈর কাজকর্ম ও আচার – আচরণগুলো হবে সুন্দর।

২। তাঁর ভাষা হবে মিষ্ট ও সুস্পষ্ট।

৩। যুগের চাহিদা সম্পর্কে তিনি হবেন সম্যক ওয়াকেফহাল । অর্থাৎ তিনি যে যুগে বাস করেন সে যুগের মানুষদের রুচি-অভিরুচি অনুধাবন করে সে অনুযায়ী তাদেরকে দীনের পথে আহবান করবেন।

আজকের সভার সভাপতির আসন অলংকৃত করছেন মুফতি শফীউল্লাহ সাহেব।

সকাল দশটা বাজার সাথে সাথে কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সভার কার্যক্রম শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মেহমানরা পূর্ব নির্ধারিত নিজ নিজ বিষয়ের উপর তাদের মূল্যবান বক্তব্য পেশ করেন। কেউ আলোচনা করেন সহশিক্ষা নিয়ে, কেউ আলোচনা করেন মুসলমানদের বর্তমান পশ্চাদপদতার কারণ ও তাঁর প্রতিকার নিয়ে, আবার কেউ আলোচনা করেন মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে চলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। সবশেষে হামদ ও সালাতের পর সাকিব তাঁর ভাষণ শুরু করে। সে তাঁর বক্তব্যে বলে–

সম্মানিত সভাপতি, হাযরাতে উলামায়ে কেরাম ও বেরাদারানে ইসলাম! আজকের এই মহতী অনুষ্ঠানে আমাকে আলোচনা করার জন্য যে বিষয়টি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে তা হলো, ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার। উক্ত বিষয় নিয়ে আলোচনার শুরুতেই আমি বলব, ইসলামে নারীকে যে ইযযত ও সম্মান দিয়েছে, আর কোনো ধর্ম-দর্শন তা দিতে পারে নি। পৃথিবীর সকল জাতি–ধর্ম, বিদ্যা-দর্শন নারীকে ছোট করেছে, মানহীন করেছে, পরিণত করেছে সস্তা বেসাতিতে। পক্ষান্তরে ইসলামই একমাত্র জীবনাদর্শ, যা নারীকে মর্যাদার সুউচ্চ আসনে সমাসীণ করেছে, করেছে জীবন – সভ্যতার সমান ভাগীদার।

প্রিয় শ্রোতামন্ডলী! খুটিয়ে দেখলে সহজেই অনুমিত হয় যে, জীবন-সভ্যতার সমান ভাগীদার এই নারী শারীরিক বল-বীর্য, গঠন-সৌষ্ঠব, মানসিক কর্মক্ষমতা, মনন-চিন্তা, সৃজন ও আবিস্কারের পুরুষের চাইতে দুর্বল। উথচ ইস্প্লাম তাকে জীবন জলসায় এনে তুলে ধরেছে, যাতে সে ঘুর্ণাক্ষরেও বুঝতে না পারে আমি দুর্বল, আমি হতবল, আমার রন্দ্রে রন্দ্রে বাজে সদা ভীরুতার চাপা সুর।

মুহতারাম ভাইগণ! একজন নারী জীবনে তিনটি স্তর অতিক্রম করে। প্রথম স্তর হলো, শঈশব থেকে কৌশোর পর্যন্ত। দ্বিতীউ স্তর হলো, যৌবনকাল। আর তৃতীয় স্তর হলো, বার্ধক্য। আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, এই তিনটি স্তরের প্রতিটিতেই নারী অন্যের ভরসায় প্রতিষ্ঠিত। প্রথমত তাঁর বাল্যকাল কাটে মা-বাবার স্নেহ-ভালবাসা ও ভরাট যত্নে। মা-বাবার এই মমতাময় ছায়ার নীচে তাঁর জীবন কাটে স্বর্গীয় নিরাপত্তায়। অতঃপর যৌবনে পদার্পন করার পর ‘স্বামী’ নামক এক কর্তব্যনিষ্ঠ পুরুষ এসে কাঁধে তুলে নেয় তাঁর সকল চাওয়া পাওয়ার দায়িত্ব। অতঃপর বার্ধক্যের দুয়ারে কদম ফেলতেই শত শ্রদ্ধা, মমতা ও হৃদ্যতার ডালি নিয়ে পদতলে উপস্থিত হয় আদরের ছেলে-মেয়েরা। ইসলাম নারীকে এভাবেই দেখেছে আদ্যোপান্ত। এক কথায়–জীবনের পদে পদে তাকে মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালবাসা আর শ্রদ্ধাসহ আগলে রাখার, দেখাশুনা করার মানুষ জোগান দিয়েছে ইসলাম।

নারী যখন জীবনের প্রথম স্তরে অবস্থান করে তখন তাঁর সম্পর্কে ইসলাম বলেছে, কন্যাসন্তান তোমাদের জন্য পুণ্যমালা-নেকীসমূহ । আর ছেলেদের সম্পর্কে বলেছে, ছেলে সন্তান তোমাদের জন্য আল্লাহর নিয়ামত। এর জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো।

অর্থাৎ ছেলেরা আল্লাহর নেয়ামত । যদি এদের কদর না করো, তাহলে শাস্তি পেত হবে। কিন্তু কন্যাদের সম্পর্কে বলেছেন, এরা সরাসরি তোমাদের জন্য নেকী-পুণ্যমালা। নেকী যেভাবে মানুষকে বেহশতে নিয়ে যায়, এই কন্যারাও তাদের পিতা-মাতাকে বেহেশতে পৌঁছে দেবে। মূলত এভাবেই ইসলাম কন্যাদের প্রতি মা-বাবার দৃষ্টি, দরদ, আন্তরিকতা ও মমতকে আকর্ষণ করেছে। উৎসাহিত করেছে তাতদের মাধ্যমে নিজেদের পরকালের ধনবান করে তুলতে।

এমনিভাবে নারী যখন জীবনের দ্বিতীয় স্তরে উপনীত হয় এবং বধূ হয়ে স্বামীর ঘরে যায় তখন তাঁর সম্পর্কে ইসলাম বলেছে, তোমাদের মাঝে সর্বাধিক কামেল ও পূর্ণ ঈমানের অধিকারী ঐ ব্যক্তি যে সর্বাধিক চরিত্রবান এবং যে তাঁর স্ত্রীর সাথে স্পদাচপ্রপণ করে। (তিরমিযী)

অর্থাৎ উত্তম ও পূর্ণ মুমিন যে , যার চরিত্র উত্তম ও পবিত্র। আর চরিত্র উত্তম তারই, যে তাঁর স্ত্রীর সাথে প্রাণপূর্ণ, প্রেমভরা কোমল আচরণে অভ্যস্ত। স্ত্রীর কোনো ভুল ক্রটি হয়ে রেগে আগুন হয়ে যায় না। বরং মমতার শীতল পরশ তাকে ধৈর্যধারণ করতে বাধ্য করে।

তারপর নারী যখন জননী হন, তখন তাঁর প্রতি সন্তানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে অত্যন্ত কঠিনরূপে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলিহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মায়ের পায়ে নিচে সন্তানের বেহেশত। তাই সন্তান মায়ের আনুগত্যে যতটা সচেষ্ট হবে, ততটাই বেহেশতের নিকটবর্তী হবে। আর অবাধ্য হবে যতখানি, বেহেশতের সুবাসিত প্রাঙ্গণ থেকে দূরে সরে পড়বে ঠিক ততখানিই।

মানব দেহের সর্বাধিক স্বল্প মর্যাদাপূর্ণ বরং সবচেয়ে মানহীন অঙ্গ হচ্চে পা।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মায়ের এই সবচেয়ে কমমূল্যের অঙ্গ পায়ের তলায়ই তোমার বেহেশত। সুতরাং এই মায়ের মূল্য যে কত, তা সহজেই অনুমেয়।

পক্ষান্তরে আমরা যদি অন্যান্য ধর্ম-দর্শনের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ইসলাম পূর্বকালে ইহুদীদের দাপট ছিল প্রচন্ড। কিন্তু তাদের সমাজ দর্শনে নারী ছিল চরমভাবে অবহেলিত। তাদের সামাজিক আইনে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার বিধান অনুমোদিত ছিল। তাই কোনো পিতা জাহেলী যুগে নিজের কন্যাকে জীবন্ত প্রোথিত করলে তাঁর কোনো বিচার হতো না

গ্রিক দর্শন মন্থন করলে বুঝা যায়, কোনো নারী স্বামী সংসারে আসার পর তাকে দাসীরূপে বিবেচনা করা হতো। বরং মর্যাদা ছিল দাসীরও নীচে। সামান্য ক্রটি কিংবা অপরাধে স্বামী তাঁর স্ত্রীর গর্দান উড়িয়ে দিত পারত। আর এটাছিল তাঁর বিধিবদ্ধ ও অনুমোদিত অধিকার। সামান্য অন্যায়ের শাস্তিস্বরূপ নারীকে ঘোড়ার পায়ের সাথে বঁধে ক্ষমতাধর স্বামী দ্রুত গতিতে হাঁকিয়ে নিয়ে যেত ঘোড়া। আর অসহায় অবলা স্ত্রীর কোবল নরম দেহ কংকরের আঘাতে রক্তাক্ত হতো, ক্ষতবিক্ষত হতো। কিন্তু রা’ করার ক্ষমতা ছিল না তাঁর।

তারপর এলো ইসলাম। ইসলাম নারীকে করল মহা মর্যাদাবান। ঘোষণা করল, নারী নাড়ীর ধন, পরকালের সম্পদ, অপরিসীম কল্যাণের আঁধার। নারী নরের সহধর্মিনী, অর্ধাঙ্গিনী, আত্মার একান্ত আত্মীয়। বরং নারীই মহান জননী।

প্রিয় উপস্থিতি! নারী মানব ও মানব সভ্যতার অর্ধাংশ। তাই সভ্যতার বিকাশ ও নির্মাণে মানবগোষ্ঠির পদচারণা ঘটেছে যত অঙ্গনে, নারী তাঁর অংশীদার ও সঙ্গী হয়েছে সদাসন্তর্পণে। পুরুষ সংসার পেতেছে, নারী দিয়েছে তাতে সার্বক্ষণিক শ্রম। পুরুষ সমাজ গড়েছে, নারী দিয়েছে তাতে হৃদ্যতার প্রাণ, পুরুষ শাসন করেছে দেশ, সভ্যতা, যুদ্ধ প্রভৃতি ক্ষেত্রেই নারীর অবদান অসামান্য, সূর্যের আলোর মতো দেদিপ্যমান।

অপরাধীরা অপরাধ চর্চার পথ মুক্ত করতে যখনই সভ্যজনদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে , সমাজের বীর পুরুষেরা মহাপরাক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। তখন নারীরাও ঘরে বসে থাকেনি। মানবতা, সভ্যতা ও সত্যের প্রতি অসীম প্রেম, বিশ্বাস ও অনুরাগ নিয়ে তারাও এগিয়ে এসেছেন বীরঙ্গনার বেশে। কখনো বা বীর দর্পে অবতীর্ণ হয়েছেন সরাসরি লড়াইয়ের ময়দানে। কখনো বা নিজের কলজে ছেঁড়া ধন আদরের দুলালদেরকে ছেড়ে দিয়েছেন আল্লাহর পথে, দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। ইতিহাস তাদের নাম আজো গর্বের সাথে স্মরণ করে।

প্রিয় শ্রোতৃমণ্ডলী! নারী প্রেমময়ী, নারী প্রেমের আকর। জগতে হৃদ্যতা, আন্তরিকতা, স্নেহ-ভালবাসা ও মমতা প্রতিষ্ঠায় নারীর অবদান সীমাহীন। নারী যখন কাউকে ভালোবাসে, তখন হৃদয়ের গভীরতায় ঢুকেই তাকে ভালোবাসে। হৃদয়ে সঞ্চিত তপ্ত খুনে জ্বালিয়ে রাখে প্রেমের প্রদীপ। পার্থিব এই ছোট্ট পৃথিবীর সব কিছুই তখন তাঁর কাছে হয়ে পড়ে একেবারে মূল্যহীন। প্প্রেম-ভালোবাসার এই প্রাণময় ভূবনে নারীর ত্যাগের স্বাক্ষর জগৎব্যাপী। পৃথিবীর সকল সভ্যসমাজই তা জানে, প্রত্যক্ষ করে প্রতিনিয়ত।

সম্মানিত সুধী! বর্তমান সভ্য পৃথিবীর একটি বড় জিজ্ঞাসা হলো, নারীর অবস্থান কোথায় হবে? ঘরে না বাইরে! সুরক্ষিত অন্দর মহলে না অতক্ষিত শিল্প-ভূবনে-যেখানে আলো অন্ধকার, ভাল-মন্দ, সভ্য-অসভ্য সবাই এক সাথে গলাগলি করে বসবাস করে।

মতামত উভয় দিকেই আছে। যুক্তিরও কোনো শেষ নেই। সুতরাং ওসব যুক্তিতর্ক আর মতলবী কথার উর্ধ্বে ওঠে এই নারী-পুরুষের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর কাছেই তাঁর সমাধান চাওয়া অধিক নিরাপদ ও বিবেকসিদ্ধ। কারণ, যিনি যা তৈরি করেন, আবিস্কার করেন, নির্মাণ করেন তিনিই সেই জিনিষ সম্পর্কে অন্যের চাইতে ভালো জানেন, এ ব্যাপারে বেশি জ্ঞান রাখেন তিনিই। উদাহরণ স্বরূপ একটি গাড়ির ক্তহাই ধরুণ। সর্বপ্রথম যিনি গাড়ি আবিস্কার করেছেন, তখন গাড়িস ব্যাপারে সেই আবিস্কারকর্তার যতটুকু জ্ঞান ছিল, ততটুকু জ্ঞান কি তখন আর কারো ছিল? অর্থাৎ গাড়িটি কিভাবে চালাতে হবে, কিভাবে রাখতে হবে, কিভাবে উহাকে ড্রাইভ করলে চালক ও আরোহী উভয়ের জন্য মঙ্গল হবে, কিভাবে উহাকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে ইত্যাদি তিনি যেমন জানতেন, সেরূপ কি অন্য কেউ জানতো? না। জানতো না। হ্যাঁ, পরবর্তীতে তিনি নিজে যখন অন্যদেরকে এ ব্যাপারে জ্ঞান দিয়েছেন, শিখিয়েছেন তখন তারা জানতে পেরেছে।

সুতরাং আল্লাহ পাক যখন মানুষ নামক এ গাড়ি তৈরি করেছেন, বানিয়েছেন, তখন তিনিই যে উহার কল্যাণ-অকল্যাণের ব্যাপয়ারে অধিক ভালো জানেন, সে সম্পর্কে কারো কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়। বরং উপরি উক্ত উদাহরণের আলোকে একথা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলা যায় যে, মানুষ নামের এ গাড়ি কিভাবে চললে, কোথায় থাকলে ভালো থাকবে, তা মহান আল্লাহ পাকই সবচেয়ে ভালো জানেন।

প্রিয় শ্রোতামণ্ডলী! উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা একথা দিবালোকের ন্যায় পরিস্কার হয়ে গেল যে, নারীর অবস্থান কোথায় হবে, তা মহান রাব্বুল আল্লাহ তাআলাই পরিপূর্ণভাবে জানেন এবং তিনি যা জানেন, সেটাই হবে গ্রহণযোগ্য। কারণ নারীর সৃষ্টিকর্তা তো তিনিই। তাই আসুন, আমরা এবার লক্ষ্য করে দেখি, নারী কোথায় থাকবে কোথায় অবস্থান করবে, সে সম্পর্কে মহান প্রভু কি বলেছেন। তিনি বলেছেন–

“তোমরা তোমাদের ঘরেই অবস্থান করো। আর প্রাচীন মূর্খযুগের নারীদের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়িও না। ” [আযহাবঃ৩১]

আলোচ্য আয়াত থেকে একথা পরিস্কার ভাবে প্রতিভাত হয়ে ওঠে যে, আল্লাহ পাক চান, নারীরা তাদের বাড়ির ভেতর অবস্থান করুক। কারণ, গৃহকর্ম নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা ও সম্পাদনের মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যেই তাদের সৃষ্টি। তাই তারা গৃহে, গৃহকর্মে, গৃহ সৌন্দর্য নিয়ে ব্যস্ত থাকবে এই তো কাম্য।

অধিকন্তু এই কারণেই আল্লাহ তাআলা নারীদেরকে ‘আহলে বাইত’ তথা ঘর ওয়ালী বলে সম্বোধন করেছেন। বলেছেন, স্ত্রীরা হলো ঘরের মালিক। যেমন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্ত্রী হযরত সরা রাঃ কে আইলে বাইত শব্দে স্মরণ করেছেন। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনসঙ্গিনী আমাদের আম্মাজানদেরকে আহলে বাইত বলেছেন। এর অর্থ হলো, নারীরাই ঘরের অভিভাবক ও পুরিচালক। ঘরের নিয়ন্ত্রণ, পরিচর্যা ও পরিচালনা দায়িত্ব তাদেরই। এ মর্মে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, স্ত্রী তাঁর স্বামীর ঘরের অভিভাবক। [বুখারী]

এই হাদীসের অর্থ খুবই স্পষ্ট। দিবালোকের ন্যায় পরিস্কার। অর্থাৎ নারীর ভূবন হলো সুরক্ষিত সংসার জগৎ। এই জগতের শান্তি-শৃঙ্খলা, উন্নতি ও সমৃদ্ধির কথা ভাবাই তাঁর কাজ। স্বামী-সন্তানের পরিচর্যা ও গৃহ কর্মের শিল্পময় অভিভাককত্বের জন্যেই আগমন তাঁর এই সুন্দর পৃথিবীতে। এই লক্ষ্য ও বাস্তবতা উপলদ্ধি করতে যারা সক্ষম হয়েছে, তারাই মূলত সফল, সার্থক ও কল্যাণময় জীবনের অধিকারী–এই জগতে এবং পরকালেও।

পক্ষান্তরে যারা আল্লাহ তাআলার এই সুন্দর ফায়সালার আআভাময় সত্যকে উপলদ্ধি করতে অক্ষম হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছে বিতাড়িত শয়তান ও স্বীয় নফসের কুমন্ত্রণায়, আল্লাহ পাক কর্তৃক নির্ধারিত এই সুরক্ষিত আবাস ঘরকে মনে করেছে বদ্ধ খাঁচা–তাা বিফল, ব্যর্থ ও অশান্তির আকর। দুনিয়ার জীবনে তারা হাজারো পেরেশানী ও লাঞ্ছনার সম্মুখীন হবে, আর আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শস্তি।

প্রিয় হাজেরীন! আজকাল অনেকেই বলে থাকেন, মেয়েরা বাড়ির ভেতর আবদ্ধ পরিবেশে অবস্থান করলে তাদের স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যাবে। বিভিন্ন রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়বে।

এ বিষয়ে মৌলিক কথা হলো, প্রথমেই প্রতিটি মুসলমানকে এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ পাক যেভাবে সমগ্র জাহানের মালিক, সুস্থতা-অসুস্থতারও তিনিই মালিক। অর্থাৎ এই বিশাল পৃথিবীর সবকিছু যেভাবে তাঁর নির্দেশের অধীন, তেমনি স্বাস্থ্য, ব্যাধি, সুখ, শান্তি সবই তাঁর নির্দেশের অধীন। সুতরাং আল্লাহর বিধানের অনুসরণ করতে গিয়ে কেউ রোগ-ব্যাধির প্রকোপে পড়বে এটা কেবল অবাস্তবই নয় অযৌক্তিকও বটে। বরং যারা প্রকৃত অর্থে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে প্রভু হিসেবে বরণ করে নিয়েছে, তাদের স্বাস্থ্য, সুখ, সমৃদ্ধি সবই নিহিত ওই সুরক্ষিত ঘরের ভেতর, আল্লাহর আইন মান্য করার ভেতর। আর যারা মুখে আল্লাহ স্বীকার করলেও প্রকৃত অর্থে শয়তানকে গ্রহণ করেছে বন্ধুরূপে, বদ্ধ সুরক্ষিত অঞ্চলে তারা নিজেদেরকে আবদ্ধ-আক্রান্ত, অসুস্থ-ব্যাধিগ্রস্থ ও পীড়িত মনে করবে এটাই স্বাভাবিক।

মুহতারাম শ্রোতৃমণ্ডলী! ‘পর্দার বিধান নারী-স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’–এ ধরণের উক্তি সত্যের অপলাপ ও একশ ভাগ মিথ্যা বৈ কিছু নয়। কারণ আজ চৌদ্দশ বছর যাবত মুসলিম মা–বোনের পর্দার বিধান মেনে আসছেন। পর্দা যদি সত্যিই নারীদের জন্য স্বাস্থ্যহানীর কারণ হতো, তাহলে তো পর্দানশীন প্রতিটি নারীই থাকতো রুগ্ন, অসুস্থ্য, ব্যাধিগ্রস্থ। তারা হতো দুর্বল, শক্তিহীন ও অক্ষম। কিন্তু বাস্তবতা কি তাঁর উল্টো নয়? জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, পর্দানশীল মেয়েদের তুলনায় বেপর্দা নারীর স্বাস্থ্য অধিক দুর্বল।

পর্দা যদি নারী স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতো, তবে তো পুরুষের তুলনায় নারী মৃত্যুর হার বেশি হতো। অথচ স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট কিন্তু সে কথা বলে না।

পর্দা যদি নারী স্বাস্থ্যের পরিপন্থি হতো, তাহলে পর্দানশীন মেয়েদের বাচ্চারা বেপর্দা নারীদের বাচ্চাদের চেয়ে বেশি সবল ও সুস্থ হতো না। অথচ স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, বেপর্দা নারীর সন্তানএর তুলনায় পর্দানশীন নারীর সন্তানই অধিক সুস্থ ও সবল থাকে।

আসল কথা হলো, পর্দার বিধান পালন নয়, পর্ার বিধান বর্জনই নারী স্বাস্থ্যের অবনতির মূল কারণ। এটা আমার নিজের কথা নয়, পাশ্চাত্য মনীষীরাই একথা স্বীকার করে গেছেন। তারা বলেছেন, পর্দা পরিহারের ফলে সহনশীলতা, বিচার-বুদ্ধি ও কাণ্ডজ্ঞান বিপন্ন হয়। তাই পাশ্চাত্য নারীরা এশীয় নারীদের তুলনায় অধিক পরিমাণে আত্মহত্যা করে থাকে।

বাস্তব সত্য হলো, ‘পর্দার বিধান মেনে চলা এবং অবাধ মেলামেশা থেকে দূরে থাকা নারী স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’–এ উক্তির সপক্ষে আজ পর্যন্ত একটা যুক্তিও খোঁজে পাওয়া যায় নি। পক্ষান্তরে পর্দার বিধান বর্জনে নারীর স্বাস্থ্যহানী ও চেহারার কোমলতা বিনষ্ট হয়, তা অনেকেই স্বীকার করেছেন।

প্রিয় উপস্থিতি! আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই–যা পরীক্ষিত সত্যও বটে–কোনো নারী যদি আল্লাহ তাআলার আদেশ মান্য করে ঘরবাসিনী হয়ে যায় এবং ঘর-দোরের নিয়ন্ত্রণ ও কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব স্বীয় কাঁধে তুলে নেয়, তাহলে তাকে স্বাস্থ্যগত ব্যায়ামের লক্ষ্য হলো–১. শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুততর হওয়া, ২. দেহ ঘর্মাক্ত হওয়া, ৩. দেহের পরতে পরতে কর্মক্লান্তি অনুভূতি হওয়া। মূলত এ কয়টি কার্য হাসিলের জন্যই ব্যায়াম করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো নারী যদি ঘর-সংসারের কাজকর্ম নিজ হাতে আঞ্জাম দেয়, স্বামীর খেদমত ও স্বীয় সন্তানের স্বাস্থ্য পরিচর্যায় নিজেই শ্রম নিবেদন করে, ঘর-দোর নিজেই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট হয়, তাহলে একদিকে যেমন তাঁর সিন্তানেরা সুন্দর ও চমৎকার ভবিষ্যৎ নিয়ে গরে ওঠে, তেমনি তাঁর শরীর, স্বাস্থ্য, মন-চিন্তাও থাকে সবল ও পূতঃপবিত্র। মূলত আজকের এই আধুনিক পৃথিবীও সেই স্বাস্থ্যবতী, কর্মপ্রেমী ও সংসার প্রিত নারীদের দিকেই তাকিয়ে আছে–যাদের হাতে গড়া সুস্থ-সবল সন্তানেরা অশান্ত, যুদ্ধমুখর এই পতিত পৃথিবীকে শোনাবে নতুন স্বপ্নের কথা, কল্যাণময় সৃষ্টি ও বিপ্লবের কথা।

মোট কথা, নারী যদি তাঁর নির্ধারিত আপন ভূবনে এসে যায়, তবেই সে পাবে পূর্ণ নিরাপত্তা-যেখানে তাঁর জীবন, সম্ভ্রম ব্যক্তিত্ব নিয়ে তাকে ভুগতে হবে না কোনো সংশয়ে। নিশ্চয়ই ঘরই নারীর ভুবন, নিরাপদ ইলাহী আশ্রয়।

সজুল, কলেজ ও ভার্সিটির শিক্ষিত ভাইবোনদের জন্য আজ আমাদের দুঃখ হয়। কেননা তাদের অনেকেই ইসলাম সম্পর্কে না জেনে, পাশ্চাত্যের প্ররোচনায় ইসলাম ও ইসলামী বিধি-বিধান যেমন, পর্দা, নারী অধিকার ইত্যাদি নিয়ে মিথ্যা সমালোচনা করে ভ্রান্ত পথে ধাবিত হচ্ছেন। আর তাদেরই সমালোচনায় প্রভাবিত হয়ে কিছু নারীও আজ শ্লোগান দিচ্ছে–

“পর্দা প্রথা মানবো না, বদ্ধ ঘরে থাকব না”। আমি ঐসব মেয়েদের জিজ্ঞেস করতে চাই, হে নারী! কে তোমাকে বদ্ধ ঘরে আটকে রেখেছে? পর্দার বিধান তো তোমার অমঙ্গল কিংবা ক্ষতির জন্য দেওয়া হয়নি, বরং এ বিধান তো দেওয়া হয়েছে তোমার ইজ্জত ও নিরাপত্তা রক্ষার খাতিরেই। তদুপরি ইসলাম তো তোমাকে জরুরী প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া তো পুরুষেরাও ঘর থেকে বের হতে চায় না। তবে তুমি কেন বিনা প্রয়োজনে হাটে-ঘাটে ঘুরে বেড়াবে” নর শিকারের জন্য? কেন? তোমার বর্তমান স্বামী যদি তোমাকে তৃপ্ত করতে না পারে তাহলে কোর্টের মাধ্যমে তাকে তালাক দিচ্ছ না কেন? এবং মনের মনের মতো একজন পুরুষ বেছে নিয়ে বিয়ে বসতে লজ্জা করছ কেন? এতে তো ইসলাম তোমাকে বাধা দিচ্ছে না, বরং তোমার পক্ষেই রায় দিচ্ছে।

ইসলাম বলেছে–দরকারে হাটে যাবে, মেডিকেলে যাবে, গাড়িতে করে বিভিন্ন স্থানে যাবে। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা করবে। যাওয়া যদি আবশ্যক হয়, যাবে না কেন? যাবে। কিন্তু যুবকদের মাথাটা খাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনের ছুতোয় ঘরের বাইরে বের হয়ে শালীনতা নষ্ট করা বা বেহায়া হওয়াটা ইসলাম অনুমোওদন করে না।

ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করে–অন্ধকার যুগের ললনাদের মতো অশ্লীল ঢংয়ে রাস্তায় বের হওয়াকে। নিষেধ করে-পাতলা ফিনিফিনে কাপড় পরে, ওড়নাটা গলায় ঝুলিয়ে, ঠোঁটে লিপিস্টিক, গালে রুজ, ভ্রু যুগলে কাজল দিয়ে সেই রকম ভাবে সেজেগুজে, আধুনিক স্টাইলে কেশ বিন্যাস করে উলঙ্গ মস্তক নিয়ে ঘুরাফেরা করতে।

আমি আজ সকল মুসলিম মা-বোনকে উদ্দেশ্য করে বলতে চাই, হে মুসলিম নারীরা! তোমরা সমান অধিকারের শ্লোগান তুলে যেভাবে দিগ্মবরী নৃত্য আরম্ভ করে দিয়েছ, সেই সমান অধিকার তো ইসলাম তোমাদেরকে চৌদ্দশ বছর পূর্বেই প্রদান করেছে। শুধু তোমাদের দৈহিক সামর্থ্য ও কাঠামোর কথা বিবেচনা করেই ইসলাম তোমাদের দায়িত্ব, কর্ম ও পোষাক নরদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে।

হে ললনা! তুমি যখন আলট্রামর্ডান পোষাক পরে সর্বাঙ্গে প্রসাধনী লেপে পথে প্রান্তরে, পার্কে–মার্কেটে ঘুরাফেরা কর এবং শত শত পুরুষের সামনে দিয়ে গা ঘেঁষে চলো তখন তুমিই বলো তো, শতকরা কতজন পুরুষ তোমার দিকে তাকায় না? তাদের এ দৃষ্টি সম্পর্কে তোমার অভিমত কি? এ দৃষ্টি কি স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক?

হে যুবতী! আমি জানি, তুমি যদি সত্যপ্রিয় হও তাহলে প্রশ্নের জবাবে তুমি বলবে, ‘আমার অনুভব হয়, নরগণ যেন আমাকে আক্রমণ করে বসবে’। আর তোমারও মনেও একটা বিকৃত কামাচারের ভাব সৃষ্টি হয় নিশ্চয়ই।

তাছাড়া এই কুদৃষ্টির ফলাফল এমনও হতে পারে যে, এর দ্বারাই ব্যভিচারের পথ খুলে যেতে পারে। কারণ, দেখা থেকে যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে দেখা, তারপর চোখ লাগা, তারপর কামানলের উৎপত্তি আর তার পরই যতকিছু ঘটার ঘটে থাকে। সুতরাং দেখতেই যদি না পারত, তাহলে ব্যভিচার পর্যন্ত পৌঁছার কোনো প্রশ্নই ওঠত না। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুক।

সম্মানিত শ্রোতৃমণ্ডলী! আমার বক্তব্য দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। আপনারা বোধ হয় বিরক্ত হচ্ছেন। আমি আর.. .. .. ।

‘না, না আপনি বলে যান। আমাদের খুব ভালো লাআগছে। এমন মূল্যবান কথা আমরা সারাদিন শুনতেও রাযি আছি।’ সাকিব তাঁর মুখের কথা শেষ করার আগেই উপস্থিত জনতা সমসবরে বলল।

সাকিব আবার শুরু করল। বলল, আপনারা যখন শুনতে আগ্রহী, তাই আরো দু’চারটা কথা বলি। এ পররায্যে আমি আপনাদের সামনে মামা-ভাগীনির একটা চমৎকার গল্প শুনাতে চাই। কী বলেন আপ্নাররা, শুনতে রাযি আছেন?

গল্পের কথা শুনে সবাই একটু নড়েচড়ে বসল। সেই সাথে বিকট আওয়াজে বলল, বলুন হুজুর বলুন। সামরা তো শুন্তেই এসেছি। এমন সারগর্ভ ও হৃদয়গ্রাহী কথা আমরা পাবো কোথায়!

সাকিব তাঁর গলাটা একটু পরিস্কার করে বলতে লাগল–

নরসিংদী জেলা সদরের অন্তর্গত বালি গ্রামে একটি মেয়ে ছিল। মেয়েটির একমাত্র মামা বি.বাড়িয়া সদর হাস্পাতালের বড় ডাক্তার। নাম ডাঃ মাজহারুল ইসলাম। প্রায়ই তিনি একমাত্র ভাগীনী আয়েশা আখতারকে দেখতে যেতেন। বিশেষ করে প্রতি ইংরেজী মাসের শেষ শুক্রবারে আলোকবালি যাওয়াটা তাঁর রুটিনে পরিণত হয়েছিল। তিনি যখনই ভাগীনীকে দেখতে যেতেন, তখন তাঁর জন্য আর কিছু না পারলেও একখানা গল্পের বই অবশ্যই নিয়ে যেতেন।

একদিনের ঘটনা। শ্রাবণের বারি তখনো বর্ষিত হচ্ছিল অঝোর ধারায়, অথচ দিনের শেষ বিকেলে অতিবাহিত হচ্ছে। সেই যে সকাল থেকে শুরু এখনো বন্ধ হওয়ার কোনো নাম-গন্ধ নেই। এমন দিনে মানুষ বিশেষ প্রয়োজন ব্যতিরেকে ঘর থেকে বের হয় না।

দিনটা ছিল শুক্রবার। তাও আবার শেষ শুক্রবার। সুতরাং বৃষ্টি মাথায় করে হলেও মাজহার সাহেবকে আজ আলোকবালী যেতে হবে। কারণ ভাগিনীটা নিশ্চয়ই মামার অপেক্ষায় পথ পানে চেয়ে আছে। একবার না গেলে, পরের বার সে মামার কাছেই আসবে না। অভিমান করবে। মুখ ভয়ার করে বসে থাকবে। অতএব কী আর করা।

বৃষ্টিমুখর এ অলস বিকেলে আয়েশার একমাত্র সাথী মামার দেওয়া কোনো বই। আয়েশা জানে, তাঁর মামা এ বৃষ্টির দিনেও আসবেন। তাই সে জানালার কাছে একটি বই খুলে পড়তে পড়তে মামার প্রতিক্ষায় সময় কাটতে থাকে।

আয়েশা একটি গল্প শেষ করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। দেখতে চেষ্টা করে, তাঁর মামাকে দূরে, বহুদূরে আসতে দেখা যায় কি না। কিন্তু না, মামা আসছেন না। বারবার তাঁর দৃষ্টি গিয়ে ঐ নীল আকাশে গিয়ে স্থির হয়। তখন সে মনে মনে ভাবে, ঐ বিরাট আকাশ আর বিশাল পৃথিবীর স্রষ্টা কত মহান! কত অসীম তিনি। দিগন্ত জুড়ে তাঁর সৃষ্টি। তাঁর রহম-রকম সৃষ্টির প্রতিটি অনু-পরমানুতে বিদ্যমান। তাঁর নিয়ন্ত্রণ কত সুনিপুণ-যার সাক্ষী এ বিন্যস্ত বর্ষণ ধারা।

আয়েশা যখন গল্পের বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে মহান মাবুদের কারিগরী কৌশল ও সৃষ্টিশৈলী নিয়ে ভাবছিল, তখনই হঠাৎ দেখা গেল, মামা এক পা দু পা করে এগিয়ে আসছেন ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে। ডান হাতে ছাতা আর বাম হাতে সপিং ব্যাগ ভর্তি কিছু জিনিষ। আয়েশা বুঝে ফেলে, এ ব্যাগে আর যাই থাকুক, তাঁর প্রিয় লেখকের নতুন কোনো বই তো নিশ্চয়ই আছে।

মামার নিয়ে আসা এ মূল্যবান বইগুলোকে জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে আয়েশা হাত পেতে গ্রহণ করে। সে তাঁর মামাকে একবার দু বার নয়, বারবার বলেছে, মামা! বই আমার অবসরের সাথী, জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সুতরাং বই না এনে আপনি আর যাই আনুন কেন, আমি কিন্তু মোটেও খুশি হবো না।

সেদিন মাজহার সাহেব ঘরে ঢুকেই আয়েশার হাতে শপিং ব্যাগটা তুলে দেন। বলেন, নে। তোর জন্য আজ হৃদয় গলে সিরিজের ১৯ ও ২০ নং খন্ডটি নিয়ে এলাম। ব্যাগের ভিতর একটি দৈনিক পত্রিকাও আছে। ট্রেন থেকে নেমে নরসিংদী রেল স্টেশন থেকে পত্রকাটি কিনেছি। পড়ার সুযোগ হয় নি। তাই ওটাকে নষ্ট করিস না। জরুরী প্রয়োজনে আমাকে তা পড়তে হবে।

বৃষ্টিতে পত্রিকাটি প্রায় ভিজেই গিয়েছিল। আয়েশা পত্রিকাটি ব্যাগ থেকে খুলেই দেখল, প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে ছাপানো হয়েছে একটি নারী মিছিল। মিছিলের অগ্রভাগে কতগুলো মহিলা হাত উচিয়ে যেন চিৎকার করে আছে। অবশ্য মিছিলের অবস্থা দেখে বুঝাই যাচ্ছে, মহিলার সংখ্যা বেশি হবে না। তবু যেন এ স্বল্প কয়েকজন মহিলা রাজপথ কাঁপিয়ে তুলছে। বয়স্কা এসব মহিলার চেহারায় দাম্ভিকতার ছাপ স্পষ্ট।

আয়েশা ছবির নীচের লেখাটি পড়ল। পড়ে বুঝল, মিছিলটা নারী মুক্তি আন্দোলনের মিছিল।

ডাঃ মাজহাব সাহেব ততক্ষণে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এসেছেন। আয়েশা মিছিলের ছবিটা মামাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল–

মামা! ওদেরকে কে বন্দী করেছে?

কেন রে আয়েশা! এমন প্রশ্ন করছিস কেন?

এই যে তারা মুক্তি চাচ্ছে। বন্দী না হলে কি আর মানুষ মুক্তি চায়?

আয়েশার কথায় মাজহার সাহেব মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন–

ওরা তো তো তোদের জন্যেই কাজ করছে। তারা মিছিল করছে, তোদের অধিকার, তোদের মুক্তি, তোদের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তার জন্য।

এ কথা শুনে আয়েশা যা বুঝার বুঝে নিল। সেই সাথে এও অনুভব করছে, মামা যদিও তাঁর কথাগুলো ব্যঙ্গ করে বলেছেন, তথাপী এ বিষয়ে তাঁর মনে কত যে দুঃখ, কত যে ক্ষভ পুঞ্জিভূত হয়ে পর্বতসম উচু হয়ে আছে, তাঁর কোনো সীমা পরিসীমা নেই। মামার কাছ থেকে এ সম্পর্কে আরো কিছু জেনে নেই। তাই সে মামাকে আবার বলল, মামা! কথাটা ভালো করে বুঝতে পারলাম না। দয়া করা একটু খুলে বলুন।

মামা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আয়েশা! স্বাধীনতা শব্দটি বড়ই মজার, বড়ই শ্রুতিমধুর। সকলেও স্বাধীন থাকতে চায়। পরাধীনতার শৃঙ্খলে কেউ আবদ্ধ হতে চায় না। কিন্তু যে ব্যক্তি আগে থেকেই স্বাধীন, সে যদি আবার স্বাধীনতার দাবী করে বসে তাহলে তাঁর এই পদক্ষেপ হাস্যকর নয় কি? আয়েশা! ইসলাম পূর্ব যুগে নারীরা স্বাধীন ছিল না। পুরুষের গোলামী করেই তাদের জীবন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু ইসলাম কোনো আন্দোলন ছাড়াই তাদেরকে স্বাধীনতা দিয়েছে। সমাজে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। ইসলামী আইনে নারীরা এখন স্বাধীন। তাই স্বাধীনতার নতুন ভাবে তাদের ভকোনো আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই। কোনো মুসলিম নারী যদি স্বিয় অধিকার আদায়ের জন্য, স্বাধীনতা লাভের জন্য আন্দোলের ব্রতী হয়, তাহলে বুঝতে হবে–হয়তো সে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ; ইসলাম তাকে যে অধিকার দিয়েছে সে সম্পর্কে সে বেখবর, নয়তো সে সবকিছু জেনে বুঝে পশ্চিমাদের থেকে টাকা খেয়ে তাদের দালালী করছে।

একথা বলার সাথে সাথে চতুর্দিকে থেকে শ্লোগান ওঠল, নারায়ে তাকবীর-আল্লাহু আকবার। পশ্চিমাদের দালালরা হুঁশিয়ার, সাবধান। যদি তোমরা ভালো চাও, এদেশ ছেড়ে চলে যাও। নারায়ে তাকবীর-আল্লাহু আকবর।

শ্লোগানের ফাঁকে সাকিবও একটু জিরিয়ে নেয়। সামনে রাখা পানিটুকু খেয়ে গলাটা একটু ভিজিয়ে নেয়। তারাপর সে আবার বলতে থাকে–

বেরাদারানে ইসলাম! আমার প্রশ্ন হলো-কেন নারীরা এভাবে অর্ধউলঙ্গ হয়ে রাস্তায় হাত উচিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বেড়াবে? কেন তারা রাস্তায় দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের হাসির খোরাক হবে? কেন তারা মাথায় ঘোমটা ফেলে মাজায় আঁচল বেঁধে কখনো বা পুলিশের পিটুনি খেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফিরবে? তার কোন স্বাধীনতা চায়? কিসের মুক্তি চায়? কী ওদের দাবী?

দাবী আদায়ের জন্য তারা যে পথ অনুসরণ করে চলেছে, সেপথ যে বড় দুর্গম, কণ্ঠকাকীর্ণ । সে পথে যে বিরম্বনার অন্ত নেই, বরঞ্চনার শেষ নেই।

অথচ নারী, সে তো ফুলের বাগিচা। সে তো চলবে ফুলঝরা পথে। তাঁর পথ তো কুসুমাস্তীর্ণ। কিন্তু যে পথ সে আজ অবলম্বন করেছে সে পথে চলে কি পারবে স্বাধীনতার বিজয় কেতন ব্যক্তি জীবনে উড়তে? সম্ভব হবে কি মুক্তির মিনারে পৌঁছা এসব মিলিছকারীদের? পারবে কি অধিকার নামক অবাস্তব সোনার হরিণ ধরতে?

জানি, তা কখনো সম্ভব নয়। কারণ তারা ভুল পথে এগিয়ে চলেছে। আর ভুল পথে চলে কখনো মনযিলে মাকসুদে পৌছা যায় না। তারা মনে করছে, পাশ্চাত্য নারীদের মতো বলগাহীন অশ্বের ন্যায় চলতে পারাটাই বুঝি আসল স্বাধীনতা। এতেই বুঝি মুক্তি, এখানেই বুঝি জীবনের সব আনন্দ আর সফলতা লুকিয়ে আছে।

তাদের এ ধারণা ভুল। তাদের এ পদক্ষেপ তাদের অসার চিন্তারই ফসল।

আসল কথা হলো, পাশ্চাত্যে জগত নারীরা প্রকৃত অধিকার দানের ব্যর্থ হয়েছে। নারীকে স্বামীর সোহাগ, পিতার স্নেহ, ভাইয়ের আদর ও সন্তানের ভক্তির মতো বিরল সম্মান পাশ্চাত্য জগৎ দিতে পারেনি। পাশ্চাত্যের নারীরা আজ স্বামী ও সংসারের অধিকার হতে বঞ্চিত। তারা খুঁজে পাচ্ছে না নারীত্বের মর্যাদা, পাচ্ছেনা গৃহ-সংসারের সুখ-শান্তি। বুঝতে পারছে না, পুরুষের অভিভাবকত্বে নারীর মর্যাদা কত বেশি ও কত কল্যাণকর। তাই পাশ্চাত্যের নারীরা অধিকারের জন্য রাস্তায় নামে, দাবি আদায়ের জন্য মিছিল নিয়ে বের হয়। কাজের জন্য সংগ্রাম করে।

পাশ্চাত্য জগতে নারী-পুরুষের মাঝে ভালোবাসার গভীরতা নেই। তাই তাদের বৈবাহিক সম্পর্কও হয় ভঙ্গুর ও ঠুনকো। তারা পরিবারের কারো কাছ থেকেই প্রকৃত আদর সোহাগ ও স্নেহ পায় না। আদর-সোহাগ থেকে বঞ্চিত এসব নারীরা স্বাবলম্বী হতে চায়। দাঁড়াতে চায় নিজ পায়ে। কারণ সেখানকার পরিবেশ ও অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আয়-উপার্জন ব্যতীত নিজ পরিবারেও নারীরা চরমভাবে অবহেলিত ও ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠে। সাধারণ সম্মানটুকুও তারা পায় না। রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান থেকে শুরু করে পারিবারিক আইনে পর্যন্ত একজন নারীকে পুরুষের সমক্ষক হয়ে কাজ করতে হয়। তবেই খাবার মিলবে । নচেৎ নয়। এটার নামই কি সমান অধিকার? না, এটা মূলত সমান অধিকার নয়। বরং এটা হচ্ছে, ঘরে বসে খাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে গুরুদায়িত্বের বোঝা মাথা পেতে গ্রহণকরণ। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ নসীব করুণ।

সম্মানিত ভাইগণ! আজ পশ্চিমা নারীরা এতই অসহায় যে, স্কুল জীবন থেকেই তারা সম্ভ্রম হারাতে শুরু করে। এরপর লিভ টুগেদারের শিকারের হয় যুবতী থাকা অবস্থায়। বিনিময়ে তারা কী পায়? কিছুই না। সেখানকার নারীরা সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ক্লান্ত শ্রান্ত দেহ নিয়ে। বাসায় যখন তাঁর বিশ্রামের প্রয়োজন, তখন তাঁর কাজ করে দেওয়ার মতো কেউ নেই। নেই কোনো সহযোগী। ফলে বাধ্য হয়ে তাকেই সব কাজ করতে হয়। তদুপরি সন্তান জম্ম দেওয়া ও লালন পালনের কাজটিও তাকেই হয়। গর্ভকালীন সময়ে, মাসিক চলাকালে এমনকি সন্তান ভুমিষ্ঠ হওয়ার পর অসুস্থ অবস্থায়ও তাকে জীবন সংগ্রামের ঘানি বিরামহীন ভাবে টেনে যেতে হয়। কেউ তাকে সহায়তা করে না, কেউ তাকে সাহায্য করে না। কে করবে তাঁর সহায়তা? কে করবে সাহায্য? কে আছে তাঁর?

পিতা-মাতা? না, না পিতা-মাতা আসবে কোত্থেকে! তাদেরকে তো বৃদ্ধ বয়সে প্রবীণ সদন বা প্রবীণ আশ্রালয়ে দিনাতিপাত করতে হয়।

স্বামী মহোদন? না, তাও অনেকের ভাগ্যে জোটে না। কারণ সেখানে স্বামী বলে অনেকেরই কেউ নেই। সেখানে আছে বয়ফ্রেণ্ড। আর বয়ফ্রেণ্ড থেকে কি স্বামীর মতো সোহাগ-ভালোবাসা, সাহায্য সহানুভুতি কখনো আশা করা যায় ? কেননা সেতো সম্ভোগী, লম্পট। নিজের স্বার্থটুকু আদায় হলেই কেটে পড়তে চায়।

অনুরূপ ভাবে সন্তান-সন্তুতির শ্রদ্ধা-সুহযোগিতাও পাশ্চাত্য নারীরা পায় না। যে সন্তান জানে, সে তাঁর বাবা-মার লাম্পট্যের অবৈধ ফসল, সে সন্তান কখনো তাঁর বাবা মাকে শ্রদ্ধার নযরে দেখতে পারে না। পারে না আন্তরিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেও।

প্রিয় শ্রোতামণ্ডলী! প্রতারক বুদ্ধিজীবীদের সস্তা শ্লোগানে প্রতারিত হয়ে ঘর ছাড়ার কারণে পশ্চিমা নারীদের আজ সতীত্ব-সম্ভ্রম কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। আজ সেখানকার নারীরা যথেচ্ছ ভোগের পাত্র। সামান্য কটি ডলারের বিনিময়ে তারা ইজ্জত-সম্মান বলিয়ে দিচ্ছে পুরুষের কাছে। পশ্চিমা সমাজের পুরুষেরা পা থেকে মাথা পর্যন্ত শার্ট-প্যান্ট-হ্যাট দিয়ে গোটা শরীর ঢেকে রাখে। অথচ কোমল অঙ্গ ও মসৃণ ত্বক বিশিষ্ট নারীদেরকে বিবস্ত্র করে রাস্তায় নামিয়ে দেয়। আজ সেখানকার মহিলাদের নিজের শরীরটুকু পর্যন্ত ঢাকার স্বাধীনতা নেই। তাঁর সর্বাঙ্গ খোলা। এমনকি প্রচন্ড শীতের মৌসুমে যখন পুরুষরা হ্যাট-কোট লাগিয়ে স্যুটেড বোটেড হয়ে আপাদমস্তক ঢেকে ইউরোপ আমেরিকার শোভা বর্ধন করে, তখনো সেখানকার মহিলাদের দেখা যায় হাঁটু থেকে নীচের পুরো অংশ খোলা। কনকনে শীতের কারণে ঠকঠক করে কাঁপছে। তথাপী পুরো শরীর আবৃত করার অনুমতি তাদের নেই। অনুমতি থাকবেই বা কিভাবে! শীতকাল বলে কি যুবতী নারীর উদোম শরীরে দৃষ্টি ফেলার মজা থেকে বঞ্চিত হওয়া যায়? কেউ যদি ঢাকে তাহলে পুরুষদের দৃষ্টিতে সে হয়ে যায়–আনকালচালর্ড, আনসিভিলাইজড অথবা ব্যাগডেটেড।

নারি স্বাধীনতার প্রবক্তাদের মধুর শ্লোগান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নারীরা তো রাস্তায় বেরিয়ে আসল ঠিকই কিন্তু তারা কখনো ভেবে দেখেনি যে, এই চটকদার বুলি ও মায়াকান্না দ্বার এসব পুরুষদের মতলবটা কি? একবারও তার চিন্তা করে দেখল না যে, কোট-টাই পঅা এসব ভদ্রবেশি লম্পটেরা কেন নারীদেরকে রাস্তায় নামাতে চায় আসলে এসব পুরুষেরা পণ্যদ্রব্যের মতো ভোগের সামগ্রীরূপে যথেচ্ছা ভোগ করার জন্যেই নারীদেরকে পুরুষের পাশাপাশি রাস্তায় টেনে এনেছে, অফিস-আদালতে নিজেদের পাশের সীটে বসার জায়গা করে দিয়েছে। ওরা নারীদের হাত ধরে ঘরে তুলে নি; বরং ঘর থেকে টেনে এনে রাস্তায় নামিয়েছে। ফলে এর দুঃখজক পরিণতি তাদেরকে আজ বিনা বাক্য ব্যয়ে বরণ করে নিতে হচ্ছে।

প্রিয় হাজেরীন! নারী স্বাধীনতার প্রবক্তারা অবলা নারীদেরকে বুঝিয়েছিল, তোমরা এতদিন ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ ছিলে। এখন আর আবদ্ধ থাকার মোটেও প্রয়োজন নেই। এখন স্বাধীনতার যুগ। এই স্বাধীনতা তোমাদেরও পাওনা। সুতরাং তোমরা ঘরের এই বন্দীশালা থেকে বের হয়ে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করো। এতদিন পর্যন্ত তোমাদেরকে রাজনীতির লাল ঘোড়া থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। এখন তোমরা বাইরে বের হয়ে জীবনকে আচ্ছামত ভোগ করো। স্বাধীন ভাবে বিচরণ করো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।

এই চমকদার শ্লোগনটি নারীদের কাছে বেশ ভালো লাগে। তাই তারা ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে যায়। আর পুরুষরা যখন তাদেরকে নিয়ে অফিসের ক্লার্ক বানায়, মডেল গার্ল বানায়, ব্যবসার উন্নতির জন্য তাকে সেলস গার্ল হিসেবে নিয়োগ দেয়, ভূষিত করে অপরিচিত পুরুষের প্রাইভেট সেক্রেটারীর মর্যাদায়।

সম্মানিত উপস্থিতি! আপনাদের সামনে কষ্টের কথা আর কি বল্ব? আজ পশ্চিমারা নারীকে মর্যাদা দানের নামে কী পরিমাণ মর্যাদাহীন করেছে তা ভাবতে গেলেও গা শিহরিত হয়ে ওঠে। আজ নারীর সতীত্ পশ্চিমা জগতে যত সস্তা, অন্য কোনো জিনিস মনে হয় তত সস্তা নয়। আপনারা যদিন কখনো ইউরোপ আমেরিকা সফর করেন তবে দেখবেন, নারী অধিকারের নামে সেখানকার মেয়েদেরকে ঘর থেকে করে সমাজের যত ছোট ও নিকৃষ্ট মানের কাজ আছে তাঁর সবই তাদের দ্বারা করানো হচ্ছে। সেখানকার রেষ্টুরেন্ট গুলোতে আপনি পুরুষ ওয়েটার খুব কমই পাবেন। হোটলে মুসাফিরের কামড়া ঝাড় দেওয়া, বিছানার চাদর বদনালো, রুম সার্ভিসের দায়িত্ব সবই মহিলাদের কাঁধে ন্যস্ত । মোট কথা, পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য এমন কোনো কাজ নেই যা তারা করে না।

আমার ভাবতে কষ্ট হয়, কোনো নারী যদি তাঁর পরিবার–পরিজন আর ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাহলে তাঁর এ সুন্দর জীবনকে বলা হয় আবদ্ধ জীবন। সেটাকে বলা হয় গোঁড়ামী আর সেকেলে কাজ। অথচ এই নারীই যখন অল্প কটি টাকার বিনিময়েব বিমানবালা হয়ে হাজার পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির শিকার হয়ে তাদের সেবায় আত্মনিয়োগ করে, তখন সেটা হয় আধুনিকতা আর স্বাধীনতা, তাঁর এই জীবন হয় স্বাধীন জীবন। বাহ! কী চমৎকার দর্শন।

কোনো নারী যখন তাঁর স্বামী-সন্তান নিয়ে জীবন কাটায়, পিতা-মাতা, ভাই-বোনের জন্য সংসারের বিভিন্ন কাজ করতে থাকে তখন তাকে আখ্যায়িত করা হয় বন্দীশালার বন্দিনীরূপে।

অথচ এই নারীই যখন পর পুরুষের জন্য রান্নাবান্না করে, তাঁর ঘর-দোর পরিস্কার করে, হোটেল আর জাহাজে তাদের পরিচর্যা করে, দোকানে বসে মুচকি হাসি দিয়ে গ্রাহকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং অফিস আদালতে হাজারো পুরুষের মনোরঞ্জন করার উদ্দেশ্যে তাদেরই ফুটফরমাস পালন করে জীবন কাটায়, তখন সে হয়-স্বাধীন, পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত! এরই নাম নাকি প্রকৃত স্বাধীনতা ও সমুন্নত মর্যাদা। বাহ! কি সুন্দর লজিক!

মনে প্রশ্ন জাগে, কোনো পুরুষের জন্য যদি তাঁর কার্যক্ষেত্রটি বন্দীশালা না হয়, তাহলে কোনো নারীর জন্য তাঁর সংসার নামক কর্মক্ষেত্রটি কোন যুক্তিতে বন্দীশালা হবে?

সাকিব এতটুকু বলার পর হঠাৎ মাইকের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে হৈ চৈ শুরু হয়। কেউ কেউ বলে ওঠে, ইস! কেমন একটা মুহূর্তে মাইকটা ডিস্টার্ব করল। কেউ কেউ মাইক অপারেটরকে ধমকাতে ধমকাতে বলে, কেমন মাইক তুমি নিয়ে এসেছ যে, হঠাৎ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়?

অপারেটর বলল, ভাই! মেশিনারী জিনিস। এমন একটু একটু আধটু অসুবিধা হওয়া স্বাভাবিক। এ বলে সে সামান্য চেষ্টা চালাতেই মাইক পুনরায় সচল হয়ে ওঠল।

সাকিব আবার শুরু করল–

ভাইগণ! নারী স্বাধীনতার প্রবক্তারা আজ জোরালো কণ্ঠে উচ্চারণ করে যে, নারীদের যোগ্যত ও মেধার কল্যাণে আমাদের সমাজ যতটুকু অগ্রসর হওয়ার কথা ছিল, তাদেরকে চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রেখে সংার কর্মে ব্যস্ত রাখার দরুণ ততটুকু হয় নি। উন্নতি অগ্রগতির পথে পুরুষরা যতটুকু শক্তি-সামর্থ্য খরচ করছে, নারীরাও যদি পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেই পরিমাণ শক্তি সামর্থ্য ও মেধা খরচ করত, তারা যদি ঘর থেকে বেরিয়ে অফিস আদালত, হাসপাতাল-রেল ষ্টেশন ও এয়ারপোর্টসহ সকল কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তাহলে উন্নয়নের চাকা আরো দ্রুত হতো। আমরা পৌঁছে যেতাম উন্নতির চরম শিখরে। তারা আরো বলে যে, পর্দা একটি উবরোধ ব্যবস্থা। এর দ্বারা নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। জীবন ও জগতের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ করা হয়েছে বৈষয়িক জীবনধারাকে। পৃথিবীর অর্ধেক জনশক্তি নারীকে অবরুদ্ধ করে মানবজাতির সর্বনাশ করা হয়েছে। কেউ কেউ তো একটু আগে বেড়ে এ কথাও বলে ফেলেন, পর্দা ব্যবস্থাই নাকি নারী নির্যাতনের মূল কারণ। নাউযুবিল্লাহ।

এসব কথার দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, নারী পুরষের কাজের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পুরুষরা যে কাজ করবে নারীদেরকেও সে কাজ করতে হবে।

একথা গুলো মুলত সেই পশ্চিমাদের গালভরা বুলি, যারা নারীর অধিকার নিয়ে লড়ছেন। কাঁপিয়ে তুলছেন নারী স্বাধীনতার জন্য রাজপথ।

আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করি, নারী পুরুষ উভয়কে যদি একই কাজের জন্য সৃষ্টি করা হতো তাহলে উভয়ের শারীরিক গঠনের মধ্যে এত তারতম্য কেন? পুরুষের গঠন প্রণালী ভিন্ন, নারীর গঠন প্রনালী ভিন্ন। পুরুষের মেজাজ আলাদা, নারীর মেজাজ আলাদা, পুরুষের যোগ্যতা আর নারীর যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। মহান আল্লাহ তাআলা উভয়কে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, উভয়ের গঠন প্রকৃতির মধ্যেই মৌলিক পার্থক্য পাওয়া যায়। সুতরাং একথা বলা যে, নারী পুরুষের গঠনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, তাই উভয়কে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের উন্নতির চাকাকে বেগবান করার জন্য সব ধরণের কাজ করে যেতে হবে–এটা প্রকৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং চোখে দেখা জিনিসকে অস্বীকার করার নামান্তর। কেননা এই চর্ম চোখে দেখা যাচ্ছে যে, নারী পুরুষের গঠন প্রণালীর মধ্যে কত পার্থক্য!

মানুষের জীবন দুটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত। একটি হলো বাড়ির ভিতরে, আরেকটি হলো বাড়ির বাইরে। আর এ দুটি ধারাই এমন যে, কোনো একটির অনুপস্থিতিতে একটি সুন্দর পরিবার গঠন মুসকিল। বাড়ির ভেতরের ব্যবস্থাপনা যেমন জরুরী তেমনি বাড়ির বাইরের কাজকর্মও। যখন এই উভয় প্রকার স্ব স্ব স্থানে সুষ্ঠুভাবে চলতে থাকবে তখন মানুষের জীবনও স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকবে। কিন্তু এ দুটি কাজ থেকে যদি একটিকে বাদ দেওয়া হয় অথবা অসম্পুর্ণ রাখা হয়, তাহলে মানবজীবনের ছন্দময় গতিও বাধগ্রস্ত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে বাধ্য হবে।

নারী পুরুষের কাজকে আল্লাহ পাকই বণ্টন করে দিয়েছেন। পুরুষের দায়িত্ব দিয়েছেন বাড়ির বাইরের কাজ। যথাঃ রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করা, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি। পক্ষন্তরে, গৃহের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিয়েছেন মেয়দেরকে। তারাই এটাকে সামাল দেবে।

এ তো গেল শরীয়তের হুজুম। বিবেক বুদ্ধি দ্বারা যদি নারী পুরুষের সৃষ্টিগত পার্থক্য চিন্তা করা হয় তাহলে বিবেকও একথার সাক্ষ্য দেবে যে, নারীকে যে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেটাই তাঁর জন্য যুক্তিযুক্ত ও কল্যাণকর। কেননা পুরুষের গায়ে যতটুকু শক্তি আল্লাহ পাক দিয়েছেন, নারীকে ততটুকু দেন নি। আর গৃহের বাইরের যত কাজ সব গুলির মধ্যেই শক্তি প্রয়োজন। সুতরাং সৃষ্টি কৌশলের তাগাদাও এতাই যে, পুরুষ বাইরের কাজ করবে আর নারীরা ঘরের কাজ করবে।

আমরা যদি হুযরত সাহাবায়ে কেরামের দিকে তাকাই তাহলে আমাদের সামনে এ দৃশ্যই ভেসে ওঠবে। যেমন, হযরত আলী রাযী, এবং হযরত ফাতেমা রাযি, এভাবেই নিজেদের কর্ম বণ্টন করে নিয়েছিলেন। হযরত আলী রাযি. বাইরের কাজ করতেন আর তাঁর প্রিয়তম সহধর্মিনী হযরত ফাতেমা রাযি. ঘরের কাজ যথাঃ আটা পিষা, কুয়া থেকে পানি তোলা, ঘর ঝাড় দেওয়া, খানা পাকানো ইত্যাদি তিনি করতেন।

প্রিয় শ্রোতৃমণ্ডলী! মজার বিষয় হলো, যারা নারী স্বাধীনতার বুলি আউড়িয়ে নারীদেরকেও পুরুষদের কাজে অংশীদার বানাতে চায়, তাদের এসব কথার জবাব দিয়েছেন, তাদেরেই এমন কিছু নারী-সহকর্মী যারা এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন এবং এই আন্দোলনকে সফলকাম করার জন্য ঘর-সংসার, স্বামী-সন্তান সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু আফসোস স্বাধীনতার সেই সোনার হরিণ তারা ধরতে পারেন নি। বরং উল্টো স্বাধীনতার এই স্পৃহা তাদের দাসত্বের শৃঙ্খলকে আরো মজবুত করেছে, উন্নতির রঙিন স্বপ্ন তাদেরকে আরো পিছনে ঠেলে দিয়েছে। তা এভাবে যে, প্রথমে তো তারা শুধু স্বামীর অধীনে ছিল, কিন্তু এখন তারা বস কিংবা কর্মকর্তাদের কথায় উঠাবসা করছে। তাদেরকে খুশি করার জন্য দিন দিন ফ্যাশন পরিবর্তন করছে। তাদের ইশারায় নাচছে, তাদের জন্য গাইছে। এমনকি মজলিশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য নিজের সতীত্ব পর্যন্ত বিলীন করে দিতে হচ্ছে। এরই নাম কি স্বাধীনতা? এ-ই কি শত বছরের আন্দোলনের ফসল?

প্রিয় উপস্থিতি! মার্লিন মোনরু নামের ইউরোপীয় নায়িকা ছিল। সিনেমা জগতের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার পর তাঁর বিত্ত-বৈভবের কোনো অভাব ছিল না। তাঁর বাহ্যিক শান-শওকত আর সম্মান প্রতিপত্তি দেখে তাঁর বান্ধবীও চেয়েছিল চিত্র জগতে পা বাড়াতে। একথা জানতে পেরে মার্লিন তাঁর আপন মনোভাব ব্যক্ত করে বান্ধবীর নিকট একটি চিঠি লিখে। কিন্তু চিঠি আর পাঠানোর সময় হয় নি তাঁর। এর আগেই সে আত্মহত্যা করে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। তাঁর আত্মহত্যার পর তল্লাশীর সময় এই চিঠিখানা পাওয়া যায়।

চিঠিতে লেখা ছিলঃ প্রিয়! আমার বাহ্যিক জাক-জমক আর ঠাঁট-বাট দেখে তুমি ধোঁকা খেও না। এ জগতে আমার চেয়ে হতভাগা আর অন্য কোনো মহিলা আছে বলে মনে হয় না। আমার জীবনে মা হওয়ার আশা ছিল। এটা ছিল আমার সবচেয়ে বড় আশা। কিন্তু সে আশা পূরণ হয়নি। আমার স্বপ্ন ছিল, আমার বাড়ির আঙ্গিনায় শিশুদের কলরব হবে। তাদের হৈ চৈয়ে বাড়ি-ঘর মুখরিত থাকবে। কিন্তু আজ আমার ,বাড়ি-বাগান ঘর-দোয়ার সবই বিরান। একটি শিশুও আমার বাড়তে নেই। তাদের শিশুসুলভ দুষ্টমী আর চঞ্চলতায় আমার বাড়ি-ঘর মুখরিত হয় না।

বোন! আমি চেয়েছিলাম সতী–সাধ্বী নারীর মতো পবিত্র জীবন যাপন করতে। যে জীবনে থাকবে–প্রেমময় স্বামীর বুকভরা ভালোবাসা, মাতা-পিতার অকৃত্রিম স্নেহ-মমতা, ভাই-বোনের আদর-সোহাগ। কিন্তু আমার সে ইচ্ছা ভেঙ্গে চুরে খান খান হয়ে গেছ, মিশে গেছে ধূলোর সাথে। এখন এ চাকচিক্যময় দুনিয়া প্রতিমুহূর্তে আমাকে দংশন করে চলেছে। যা সহ্য করা আমার জন্য একেবারেই অসম্ভব। তাই আমি দুনিয়া থেকে স্বেচ্ছায় বিদায় গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে বিদায় বেলায় তোমাকে বারবার একটি কথা সতর্ক করে যাচ্ছি–নারী স্বাধীনতার এ ভয়ঙ্কর পথে কখনো তুমি পা রেখো না। কারণ এ পথের উপরের আবরণটি চমকদার আর নযরকাড়া হলেও ভিতরটা অনেক কুৎসিত, সীমাহীন কদাকার। তাঁর এ ভয়ঙ্কর পথে না গিয়ে তুমি বরং সাদাসিধে পবিত্র জীবন যাপনে ব্রতী হও। নারীর জন্য এতাই সবচেয়ে বড় সফলতা, এটাই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অঙ্গন।

মুহতারাম শ্রোতৃমণ্ডলী! নারী স্বাধীনতার উপর এই মন্তব্য কোনো মাওলানা মুফতির নয়, বরং এমন এক মহিলার যিনি নারী স্বাধীনতার জগতেই লালিত পালিত হয়েছেন, ধীরে ধীরে বড় হয়েছেন সেখানেই। অতঃপর সেই স্বাধীনতার দিকে আহবান করেছেন অন্য নারীদেরকে। কিন্তু পরিশেষে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন যে, চৌদ্দশত বছর আগে মুসলমানদের উম্মী নবী সায়্যিদুল মুরসালিন মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলিহি ওয়া সাল্লাম নারীদের যে অধিকারের কথা ঘোষণা করে গেছেন, সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট । আমাদের মা-বোনেরা যদি এসব ভুক্তভোগী মেয়েদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করত তাহলে কতই না ভালো হত। নারী স্বাধীনতার শ্লোগান আসলে যে তাদেরকে গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ করার অপকৌশল ও বড় রকমের চক্রান্ত তা যদি তারা উপলব্ধি করতে পারত এবং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হত তাহলে কতই না মঙ্গল হতো। তাদের ইহকালীন জীবনে বইতে থাকতো শান্তির সুবাতাস আর পরকালীন জীবন হতো অশেষ কল্যাণময়।

আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে সোভিয়েত উইনিয়নের শেষ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ একটি বই লিখেছিলেন। বইটির নাম পেরেস্ত্রইকা। এটি সারা দুনিয়ার বহুল আলোচিত একটির গ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থে তিনি পরিস্কারভাবে লিখেছেন যে, আমাদেরত পশ্চিমা দেশগুলিতে নারীদেরকে ঘর থেকে বের করা হয়েছে। তাদের এই ঘর ছেড়ে ভের হওয়ার কারণে আমরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছুটা লাভবান হয়েছি সত্য, উৎপাদনও সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে-একথও অস্বীকার করার জো নেই, কিন্তু এই উৎপাদন বেশি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের পারিবারিক প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যদ্দরুণ আমাদেরকে এমন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে যা ঐ উৎপাদনের চাইতে অনেক বেশি।

এমন উদাহরণ আরো অনেক দেওয়া যাবে। এখন আমার কথা হলো, উপরের কথাগুলো যুদি আমি একা বলতাম, তাহলে হয়তো কেউ বলতে পারতেন যে, এসব একপেশে কথা আপনি আপনার গোড়ামীর কারণে বলছেন। কিন্তু তাদেরই লোক মার্লিন মোনরু ও প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ যখন এসব কথা বলছেন, তখন তো আর আপনারা আমাকে দোষারোপ করতে পারেন না। বলতে পারেন না, আপ্নিব গোড়ামীর কারণে এসব বলছেন।

সম্মানিত হাজেরীন! আমার অত্যন্ত দুঃখ হয় তখন, যখন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কোনো নামকরা পণ্ডিতের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়–‘পর্দা নারী শিক্ষার অন্তরায়, উচ্চ শিক্ষার পরিপন্থি’।

এ ব্যাপারে আমার প্রথম কথা হলো –আসলে এ উক্তি একেবারেই অবাস্তব।

এর কোনো মৌল ভিত্তি নেই। একননা ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক বিদূষী মহিলার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে যাদের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের কাছে অনেক পণ্ডিতকে হার মানতে হয়েছে। এসব মহিলারা নিজেরাই কেবল শিক্ষিত ছিলেন না, বরং শত শত নরনারীকে তারা বিদ্যা ও জ্ঞানের অমৃত পরিবেশন করে গেছেন। যেমন, যহরত আয়েশা, হযরত আমেনা রামালিয়্যাহ, হযরত কারীমা বিনতে আহমাদ, হযরত ফখরুণ নিসা শাহিদা, হযরত উলায়্যাহ বিনতে হাসসান, হযরত ফাতেমা, হযরত হাফসা বিনতে সিরীন রহ, । লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই জ্ঞান-পাণ্ডিত্য অর্জন করার জন্য তাদের কিন্তু পর্দা ছাড়তে হয় নি।

মেয়েরা সাধারণত বার বছর বয়সের আগে সাবালিকা হয় না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে একটি মেয়ে পর্দার বয়সে পৌঁছার আগেই পড়াশুনার জন্য পাঁচ/সাত বছর সময় পেয়ে যাচ্ছে? আমার প্রশ্ন হলো, এই পাঁচ সাত বছর সময় কি প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য কম সময়? পর্দা-বিধানের বাধ্যবাধকতা আসার আগেই তো এই উল্লেখিত সময়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা সেরে নেওয়া যায়। এই সময়ে পর্দাই যখন নেই, তখন পর্দাকে নারী শিক্ষার অন্তরায় বলে অভিযোগ উত্থাপন করা বোকামী নয় কি? হ্যাঁ, এরপর থাকে উচ্চ শিক্ষার কথা। তাতেই বাধা কোথায়? যেখানে সহশিক্ষা নেই, নারী পুরুষের একত্রে উঠাবুসা নেই, যেখানে শুধুমাত্র নারী শিক্ষিকা ও নারী কর্মচারী দ্বারা গার্লস স্কুল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি পরিচালিত, সেখনে পর্দার সাথে উচ্চশিক্ষার জন্য যাতায়াতে তো ইসলাম বাধা দেয় না। সুতরাং ‘নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে পর্দা একটি বড় রকমের বাধা’ বলার আদৌ কোনো যৌক্তিকতা আছে কি?

উপরি উক্ত আলোচনার উপসংহারে আমি বলতে চাই, পর্দা ব্যবস্থা অবরোধ নয়, নয় শিক্ষা অর্জন কিংবা উন্নতির পথে বাধা। বরং পর্দা হলো, নারীর মান সম্মানের রক্ষাকবচ, মর্যাদার গ্যারান্টি, মুক্তির প্রতীক। নারী জাতির মান সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্যই ইসলামের পর্দা ব্যবস্থা । যে সব নারীরা বেপর্দা চলে সেসব দেশের অধিবাসীদের নৈতিক মান এক ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করেছে। সেখানে নারীর সাওতীত্বের কোনো বালাই নেই, মাতৃত্বের কোনো মর্যাদা নেই। সন্তানের কোনো পরিচয় নেই, রক্ত সম্পর্কের ভেদ নেই, আত্মীয়তার কোনো বন্ধন নেই। জাত নেই, কুল নেই, নেই কোনো মনুষ্যত্ব। সেসব দেশ ভরে গেছে জারজ সন্তানে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

সম্মানিত ভাইগণ! আমি আর আমার বক্তব্য দীর্ঘায়িত করতে চাই না। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে কথাগুলো বুঝে তদানুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুণ। আমীন। আর সবশেষে আনাদেরকে আরেকটি সুসংবাদ জানাতে চাই। তা এই যে, আজকের এই সেমিনারে প্রদত্ত বক্তব্যগুলো বই আকারে ছাপানো হবে। আপনারা কি তাতে খুশি নন?

সবাই তখন বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলে ওঠে, হ্যাঁ অবশ্যই খুশি।

সাকিবের আলোচনা শেষ হওয়ার পর সংক্ষিপ্ত দোয়ার মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দর ও সুষ্ঠভাবে সেমিনারের কার্যক্রম সমাপ্ত হয়।-আরো পড়ুন

আপনি পড়ছেনঃ ব্যথিত হৃদয় (ইসলামীক উপন্যাস)

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE