Breaking News
Home / বই থেকে / মুহাজির নারী

মুহাজির নারী

আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءكُمُ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ فَامْتَحِنُوهُنَّ اللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِهِنَّ فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ وَآتُوهُم مَّا أَنفَقُوا وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ أَن تَنكِحُوهُنَّ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ وَلَا تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ وَاسْأَلُوا مَا أَنفَقْتُمْ وَلْيَسْأَلُوا مَا أَنفَقُوا ذَلِكُمْ حُكْمُ اللَّهِ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

 

হে মুমিনগণ, যখন তোমাদের কাছে ঈমানদার নারীরা হিজরত করে আগমন করে, তখন তাদেরকে পরীক্ষা কর। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জান যে, তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফেরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। এরা কাফেরদের জন্যে হালাল নয় এবং কাফেররা এদের জন্যে হালাল নয়। কাফেররা যা ব্যয় করেছে, তা তাদের দিয়ে দাও। তোমরা, এই নারীদেরকে প্রাপ্য মোহরানা দিয়ে বিবাহ করলে তোমাদের অপরাধ হবে না। তোমরা কাফের নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। তোমরা যা ব্যয় করেছ, তা চেয়ে নাও এবং তারাও চেয়ে নিবে যা তারা ব্যয় করেছে। এটা আল্লাহর বিধান; তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।–

সূরা—মুমতাহিনা—আয়াত ১০।

25উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা একজন মুহাজির নারী। মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করে সেখানই তিনি থাকতেন। ইসলামকে ভালবাসতেন একনিষ্ঠভাবে। জনৈক সাহাবী উম্মে কুলসুম ছাড়া আর কোন কুরাইশ নারী সম্পর্কে আমার জানা নাই। তিনি আত্মীয় স্বজন ছেড়ে এককীই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে হিজরত করেছেন। তিনি মক্কাতে এ নতুন ধর্ম নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় ভুগছিলেন। কারণ নারীরা সাধারণত একটু নাযুক প্রকৃতিরই হয়ে থাকে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্নেহের ছায়ায় বসবাসের জন্য তিনি খুবই উদগ্রীব ছিলেন। সম্পদ, স্বজন সব কিছুর মায়া ত্যাগ করে এক মহাপরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি মুহাজিরদের খাতায় নাম লেখান। মক্কার স্বামী—সন্তানহীন দুর্দশাগ্রস্ত ও অসহায় জীবনের ইতি টেনে কিভাবে তিনি মদীনায় হিযরত করেছিলেন। আল কুরআনে তাঁর একটি আভাস দেয়া আছে। একটু পরেই আমরা সে কাহিনীর সূত্রপাত করছি।

হুদায়বিয়ার সন্ধি

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু বায়তুল্লাহ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন। লড়াই বা যুদ্ধের কোন অভিসন্ধি তাঁর ছিল না। কুরাইশরা সহসাই আক্রমণাত্মক হতে পারে কিংবা বায়তুল্লাহর যিয়াররতে বাঁধা দিতে পারে এ আশংকায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য মুসলমানকে যাত্রার আদেশ করলেন। গ্রাম্য কিছু নবীন মুসলমান পরিবার—পরিজান ক্ষেত ফসলের অজুহাতে সফরে অস্বীকৃতি জানাল। যারা মদীনায় এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর চড়াও হতে পারে, তাদের হিংস্রতায় এরা মারাত্মক উদ্ধিগ্ন ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসার, মুহাজির ও সরলমনা বেদুঈনদের নিয়ে মক্কার পথে যাত্রা করলেন। রাস্তা—ঘাটের বিপদাপদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য তাদের সাথে শুধু খাপবদ্ধ তলোয়ার ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে উমরা করে কুরবানীর উদ্দেশ্যে ও বায়তুল্লাহর যিয়ারত ও সাফা—মারওয়া সাঈ করার জন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসছেন।

 

এদিকে কুরায়শদের মাঝে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ আগমনের সংবাদ বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ল। তারাও প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হল যে, কিছুতেই তারা মুহাম্মদকে মক্কায় প্রবেশ করতে দিবে না। পথিমধ্যে বিশির বিন সুফিয়ান (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন কুরায়শরা আপনার আগমন সংবাদ পেয়ে গেছে। তারা রণসাজে সজ্জিত হয়ে মহা সমারোহে মক্কা উপত্যকায় চলে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বল কী! এখন লড়াই বাঁধলে এটা তো তাদের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। আমার ও আরব জনগোষ্ঠীর মাঝে তারা কী জন্য যে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। এবার কিছু হলে এর মজাটা তারা ভালভাবেই টের পাবে। আল্লাহর ও দ্বীনের জন্য আমি আমরণ লড়াই করে যাব। হয়তো এ দ্বীনের বিজয় হবে নয়তো আমার জীবনটাই বিলীন হয়ে যাবে। এরপর তিনি বললেন—তোমাদের মধ্যে কি কেউ আমাদেরকে কুরায়শদের আটকে রাখা পথ ব্যতিরেকে ভিন্ন পথে মক্কা নিয়ে যেতে পারবে? একজন সাহাবী দাঁড়িয়ে গেলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশাল এক দুর্গম পথ বেয়ে মক্কা পানে নিয়ে চললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের ডান দিক লক্ষ্য করে এগুতে বললেন। কাফেররা অবস্থান স্থল থেকে অনেক দূরে ধুলি ঝড় দেখে বুঝতে পার্ক মুসলমানরা পথ পরিবর্তন করে ভিন্ন রাস্তায় চলে গেছে। তারাও ব্যতিব্যস্ত হয়ে কাল বিলম্ব না করে মক্কার দিকে ছুটে চলল।

 

এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উষ্ট্রী আল কাসওয়া হুদায়বিয়া নামক স্থানে এসে বসে পড়ে। লোকেরা বলতে লাগল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উষ্ট্রী বসে পড়েছে আর এগুচ্ছে না। রাসূল বললেন, আবরাহার হস্তিবাহিনী যিনি থামিয়েছিলেন, তিনিই একে থামিয়ে দিয়েছেন। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রক্ষা হয় এবং পারস্পরিক সম্পর্কে উন্নতি হয় এমন যে কাজই কুরায়শরা আমাকে করতে বলবে, আমি তাঁর জন্য প্রস্তুত। কুরায়শরা আসলে কী করতে চায় তা জানার অপেক্ষা রইলেন। এক লোক এসে জানাল কুরায়শরা এখনো যুদ্ধংদেহী হয়েই আছে। চরম পক্ষপাতিত্বে তারা উম্মাদ হয়ে আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ সময় চুপ করে রইলেন। তিনি তো লড়াইয়ের জন্য আসেননি। তিনি এসেছেন শুধু বায়তুল্লাহর যিয়ারতের জন্য। উমর (রাঃ) কে ডেকে তিনি বললেন—উমর! তুমি অত্যন্ত বিবেকসম্পন্ন ও জ্ঞানবান পুরুষ। তুমি তাদের কাছে গিয়ে আমাদের উদ্দেশ্যের কথা বুঝিয়ে বল। উমর (রাঃ) বললেন—সেখানে তো আমার জানেরই আশংকা দেখা দিবে। সেখানকার প্রত্যেকটি লোকের অন্তর আমার প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতায় ভরে আছে। আমার আত্মীয়রাও সবাই মক্কা ছেড়ে চলে গেছে। আমার স্বপক্ষে কথা বলার মত কেউই সেখানে নেই। পক্ষান্তরে উসমানের অনেক আত্মীয় স্বজন ওখানে আছে। তাঁর চাচাত ভাই আবু সুফিয়ান আবান বিন সাঈদ। সকলেই তাঁর স্বপক্ষে অবস্থান নিবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পয়গাম পৌঁছে দিলেন। সে গিয়ে জানিয়ে আসুক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু বায়তুল্লাহ যিয়ারয়তের উদ্দেশ্যেই এখানে এসেছেন, অন্য কোন অভিপ্রায় তাঁর নেই।

উসমান (রাঃ) মক্কা গিয়ে নেতৃস্থানীয় কুরায়শদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

এর পয়গাম পৌঁছে দিল। তারা বলল যদি তোমার তাওয়াফ করতে মন চায় তাহলে করে যাও। অন্য কোন কথা আমরা শুনব না। কিন্তু উসমান (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছাড়া তাওয়াফ করতে সম্মত হলেন না। এ দিকে মুসলমানদের মাঝে উসমান (রাঃ) এর শাহাদাতের খবর রটে গেল। তারা এক বৃক্ষের নিচে সমবেত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

এর হাতে জিহাদের শপথ নিলেন। অবশ্য পরবর্তীতে জানা যাউ উসমান (রাঃ) নিরাপদে ও সহীসালামতে আছেন। মক্কার কুরায়শরা সন্ধির জন্য জনৈক সুহায়লকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পাঠাল। মুসলমান ও কাফেরদের মাঝে নিম্মোক্ত সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হয়।

“মহান আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি।

মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ ও সুহায়ল বিন আমরের মাঝে এই সন্ধি স্বাক্ষরিত

হচ্ছে যে , দশ বছরের জন্য আমাদের মাঝে যুদ্ধ বিগ্রহ স্থগিত থাকবে।

যেন মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারে।

মক্কার লোক যদি যথাযথ অনুমোদন ছাড়া মদীনায় চলে যায়,

তাহলে তাঁকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে।

কিন্তু মদীনার কোন মক্কায় চলে আসলে কুরায়শরা তাঁকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য না।

আমরা এ মর্মেও একমত হচ্ছি যে, আরবের যে কোন গোত্র কুরাইশদের সাথে অথবা

মুহাম্মদের সাথে স্বাধীনভাবে সন্ধি সূত্র আবদ্ধ হতে পারবে।

আর আমাদের কোন পক্ষই সন্ধির খেয়ানত বা অবমূল্যায়ন করতে পারবে না।”

 

হুদায়বিয়ার সন্ধির এ আলোচনাটুকু আমরা ভূমিকা স্বরূপ করে নিলাম। একদিন বসে বসে উম্মে কুলসুম (রাঃ) তাঁর ভাই আম্মারার কাছ থেকে এ সন্ধির আলোচনা শুনছিলেন। কিভাবে মুসলমানদের সাথে কুরাইশদের সন্ধি সংঘটিত হল। কত কঠোর শর্তারোপ কুরায়শরা এ সন্ধিতে করেছিলো। তবুও তাদের সকল শর্তই মানা হচ্ছিলো, সাহাবাদের কেউ কেউ এ অবনমিত শর্ত দেখে প্রশ্নও তুলেছিলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—এর মধ্যেই হয়তো আল্লাহ কোন কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং এতেই মুসলমানদের কাঙ্খিত বিজয় লুকিয়ে আছে। কথাগুলো শুনতে শুনতে উম্মে কুলসুম গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন। মনে মনে তিনি কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। যে করেই হোক তিনি হিযরত করে মদীনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌঁছবেনই। তাঁর স্নেহের ছায়া ছাড়া তপ্ত এ হৃদয়ে কিছুতেই শান্তি আসেব না। কোন পার্থিব স্বার্থ শুধু আল্লাহর জন্যই হবে এ হিযরত।

 

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিযরত করে মদীনায় এসেছেন। অনেক দিন হয়ে গেল। এই সময়টাতে মুসলমানরা অনেক গুলো বিজয়ও অর্জন করেছে। তবুও হুদায়বিয়ার সন্ধি উম্মে কুলসুমের মনে মারাত্মক ভীতি সঞ্চার করল। কারণ এ সন্ধির শর্তানুযায়ী তিনি কিছুতেই হিযরত করে মদীনায় যেতে পারবেন না। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও শর্তগুলোর সামান্য লংঘন করবেন না। প্রতিশ্রতির মূল্যায়ন করা এবং অঙ্গীকার রক্ষা করাই তো তাঁর ধর্মের অন্যতম শিক্ষা। তারপরও আল্লাহর উপর ভরসা করে একটি সুবর্ণ সুযোগের অপেক্ষা তিনি করতে লাগলেন। ঘরে বসে বসে তিনি খেজুর শাখে লিখিত আল কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করতে থাকেন। যা মক্কার কাফেরদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এগুলো তেলাওয়াত করেই তিনি অনন্ত তৃপ্তি লাভ করতেন এবং খোদার নৈকট্যে একটু একটু করে এগিয়ে যেতেন।

ঘরে বসে বসেই দিন কাটাচ্ছিলেন উম্মে কুলসুম ((রাঃ)। একটি ঈমানী কাফেলার সাথে শরীক হওয়ার জন্য মনে মনে প্রযন্ড বেকারার হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু মুবারক এ সফরের জন্য মনের মত এমন কাউকেই তিনি খূঁজে পাচ্ছিলেন না। যার সহায়তায় কাফেরদের শ্যেন চক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে নিরাপদে তিনি মদীনা চলে যেতে পারবেন। এত বড় ঝুঁকি নেয়ার মত মানুষ আদৌ কি খুজে পাওয়া যাবে?

হঠাৎ খুজাআ গোত্রের এক লোকের কথা তাঁর মনে পড়ল। লোকটি ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই কাফেরদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। কাফেরদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সংগোপনে তিনি তাঁর ঠিকানায় পৌঁছে প্রয়োজনীয় আলোচনা সারলেন। লোকটি তাঁর সাথে একাত্মতা পোষণ করে পরবর্তী প্রভাতে উভয়ে তানঈম নামক স্থানে মিলিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। রাতের বেলা উম্মে কুলসুম ভাই আম্মারা ও ওলীদের অগোচরে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। সকালের সূর্য যখন মক্কায় উঁকি দিলো এবং নরম রশ্মির আলতো ছোয়া পড়ল মরুভূমির গায়ে উম্মে কুলসুম তখন তানঈমের পথে পৌঁছে গেছেন। খুজাই লোকটি আগে থেকেই তাঁর অপেক্ষায় ছিলেন। উষ্ট্রীর লাগাম টেনে তিনি আগে আগে চলা শুরু করলেন। কষ্টের দরিয়া পেরিয়ে দীর্ঘ সফরের পর তারা দূর দিগন্তে মদীনার খেজুর শাখা দেখতে পেলেন, মক্কায় যখন খবর ছড়িয়ে পড়ল উম্মে কুলসুম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌঁছার জন্য খুজাই লোকটির সহযোগিতায় মদীনার পথে রওয়ানা করেছে, তাঁর দুই ভাই অনতিবিলম্বে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। উম্মে কুলসুম তো ততক্ষণে নববী ছায়ায় হৃদয়—মন তৃপ্ত করে বসে রয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌঁছার আগেই বোনকে তারা ফিরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু সে কি আর সম্ভব? ওলীদ মদীনা পৌঁছে মসজিদে নববীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাক্ষাতে মিলিত হল। উম্মে কুলসুম তাদের আগমন সংবাদে ভীষণ ঘাবড়ে গেলেন। তিনি চিন্তা করতে লাগলেন সন্ধির শর্তানুযায়ী যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আম্মারা ও ওলীদের সাথে মক্কা পাঠিয়ে দেন তাহলে অপরিসীম যাতনার মুখোমুখী হতে হবে আমাকে। হতে পারে আমার জীবনটাও বিপন্ন হয়ে যাবে। কারণ আমি তো তাদেরকে ত্যাগ করেছি এবং তাদের ধর্মও পরিত্যাগ করেছি।

আম্মারা ও তাঁর ভাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলল মুহাম্মদ! সন্ধিতে গৃহীত শর্তানুযায়ী আমাদের বোন উম্মে কুলসুম কে আমাদের হাতে তুলে দাও। এ শর্ত ভঙ্গ করা তোমার জন্য শোভা পায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে কুলসুমকে তাঁর ভাইদের আগ্রহের কথা জানালে তিনি বললেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাকে কাফেরদের কাছে ফেরত পাঠাতে চান? এতে আমার দ্বীন ধর্ম জীবন সব বিপন্ন হয়ে পড়বে। নারীদের প্রকৃতির কথা আপনার তো অজানা নয়। এ সময়েই আল কুরআনের এ আয়াত অবতীর্ণ হয়—

 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءكُمُ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ فَامْتَحِنُوهُنَّ اللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِهِنَّ فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ وَآتُوهُم مَّا أَنفَقُوا وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ أَن تَنكِحُوهُنَّ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ وَلَا تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ وَاسْأَلُوا مَا أَنفَقْتُمْ وَلْيَسْأَلُوا مَا أَنفَقُوا ذَلِكُمْ حُكْمُ اللَّهِ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

 

হে মুমিনগণ, যখন তোমাদের কাছে ঈমানদার নারীরা হিজরত করে আগমন করে, তখন তাদেরকে পরীক্ষা কর। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জান যে, তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফেরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। এরা কাফেরদের জন্যে হালাল নয় এবং কাফেররা এদের জন্যে হালাল নয়। কাফেররা যা ব্যয় করেছে, তা তাদের দিয়ে দাও। তোমরা, এই নারীদেরকে প্রাপ্য মোহরানা দিয়ে বিবাহ করলে তোমাদের অপরাধ হবে না। তোমরা কাফের নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। তোমরা যা ব্যয় করেছ, তা চেয়ে নাও এবং তারাও চেয়ে নিবে যা তারা ব্যয় করেছে। এটা আল্লাহর বিধান; তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।–

সূরা—মুমতাহিনা—আয়াত ১০।

এ আয়াতের মাধ্যমে সন্ধির শর্তের মাঝে নারীরা যে অন্তর্ভুক্ত নয় তা স্পষ্ট করা হয়েছে। এখানে মুহাজির নারীদের পরীক্ষা করার কথাটিও উল্লেখ আছে। উম্মে কুলসুম ও তৎপরবর্তী সকল নারীকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরীক্ষা করে নিয়েছেন। নারীদের বায়আত সম্পর্কে আয়েশা (রাঃ) বলেন, এ আয়াতের উপর আমল করতঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মুহাজির নারীকেই পরীক্ষা করতেন, যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হত তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে শব্দাবলী উচ্চারণ করতেন, সেগুলো উচ্চারণ করত। আল্লাহর কসম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোন নারীর হাত স্পর্শ করেননি। সম্পূর্ণ বাইয়াতটাই ছিলো মৌখিক উচ্ছারণ সর্বস্ব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বলতেন, আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলো, কেবল আল্লাহ ও রাসূলের ভালবাসাতেই তোমরা হিযরত করেছো, পার্থিব কোন স্বার্থে তোমরা প্ররোচিত হওনি। এ কথা স্বীকার করে নিলে তাদেরকে আর কাফেরদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হত না।

গোটা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল হয়ে আসলে উম্মে কুলসুম (রাঃ) যায়দ বিন হারেসা (রাঃ) কে বিয়ে করেন। মূতার যুদ্ধে তিনি শহীদ হলে আব্দুর রহমান বিন আউফ (রাঃ) এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তিনিও ইন্তেকাল করলে আমর ইবনুল আস (রাঃ) তাঁকে বিয়ে করেন। আলী (রাঃ) এর খেলাফত কালে তিনি এ পৃথিবীকে বিদায় জানান।

লিখেছেনঃ শাইখ আব্দুল মুনঈম হাশেমী

অনুবাদঃ মাওলানা হাসান শরীফ

আল কুরআনে নারীর কাহিনী বই থেকে সংগ্রহ করা।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE