Breaking News
Home / বই থেকে / মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুর প্রস্তুতি

মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুর প্রস্তুতি

মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুর প্রস্তুতি

mader

১৯৯৬ ইং সনের ৩১ শে করাচীর বাইতুল মুকাররম জামে মসজিদে হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ তাকী উছমানী ছাহেব নিম্নোক্ত বয়ানটি পেশ করেছেন।

মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুর প্রস্তুতি

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বয়ান (আরবী) হওয়াতে আমরা তা এখানে দিতে পারেনি বলে দুঃখিত। পাঠক আমাদেরকে ক্ষমা করুণ।

দুটি হাদীস আপনাদের সামনে পেশ করা হয়েছে, যার শাব্দিক তরজমা নিম্মরূপ-

প্রথম হাদীছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ অধিক পরিমাণে সকল জিনিসের স্বাদ বিনাশকারীকে অর্থাৎ মৃত্যুকে স্মরণ কর। (তিরমিযী ২/৫৭ পৃঃ)

 

অপর হাদীসে হযরত উমর (রাযিঃ) বলনেঃ তোমাদের হিসাব নেওয়ার পূর্বে নিজেরাই নিওজদের হিসাব নাও। বড় হিসাবের জন্য প্রস্তুত হও। কিয়ামতের দিন ঐ হিসাব সহজ হবে, যে দুনিয়াতে নিজের হিসাব নিয়েছে। (তিরমিযী ২/৭২ পৃঃ)

মৃত্যু একটি অপরিহার্য বিষয়

মউত অবশ্যই আসবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। মৃত্যু অনিবার্য হওয়ার ব্যাপারে আজ পর্যন্ত কেউ দ্বিমত পোষণ করেনি। মউতের আগমনের কথাও কেউ অস্বীকার করেনি। নাস্তিকেরা (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহকে অস্বীকার করে বলেছে, আমরা আল্লাহকে মানি না। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অস্বীকার করেছে। কিন্তু তারাও মউতকে অস্বীকার করতে পারেনি। প্রতিটি লোক একথা স্বীকার করে যে, যারাই এ দুনিয়ায় আগমন করেছে তাদের সকলকেই একদিন না একদিন মৃত্যুমুখে পতিত হতে হবে। এ ব্যাপারেও দুনিয়ার সকল মানুষ একমত যে, মউতের জন্য কোন বয়স নির্দিষ্ট নয়। হতে পারে–এখনই মৃত্যু সংঘটিত হবে, অথবা এক মিনিট পরে সংঘটিত হবে, এখন থেকে এক ঘন্টা পরেও মউত আসতে পারে, একদিন পরেও মৃত্যু হতে পারে, এক মাস কিংবা এক বছর পরেও মউত আসতে পারে। এ ব্যাপারে কিছুই জানা নেই। বর্তমানে বিজ্ঞানের গবেষণা উন্নতির চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজ্ঞান একথা উদঘাটন করতে সম্পূর্ণ অক্ষম যে, কে কখন মারা যাবে।

মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুর প্রস্তুতি অর্থ

 

উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা বুঝা গেল যে, মউত অবশ্যই আসবে। এবং এ কথাও অনিবার্য যে, মউতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। সুতরাং কোন মানুষ যদি গাফেল-অসতর্ক অবস্থায় দুনিয়া থেকে চলে যায় তাহলে সেখানে (কবরে) পৌঁছে তাঁর কি অবস্থা হবে তা আল্লাহ লাকই ভাল জানেন। এমন যেন না হয় যে, কবরে পৌঁছে আল্লাহ পাকের ক্রোধ ও আযাবের সন্মুখীন হতে হয়। এজন্য উপদেশ দেওয়া হচ্ছে যে, প্রকৃত মউত আসার পূর্বেই তোমরা মউতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর। কিভাবে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করবে? হিসাব নেওয়ার পূর্বে নিজে নিজের হিসাব নেওয়ার অর্থ কি? উলামায়ে কেরাম এ কথার দু’টি অর্থ করেছেন। একটি অর্থ এই যে, প্রকৃত মউত আসার পূর্বে তুমি স্বীয় প্রবৃত্তির ঐ সকল চাহিদা (খাহেশাতে নফস )যা আল্লাহ পাকের হুকুমের পরিপন্থী, সেগুলোকে এবং আল্লাহ পাকের অবাধ্যতা ও পাপের যে আগ্রহ তোমাদের অন্তরে জাগ্রত হয়, সেগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সমূলে বিনাশ করে দাও।

 

আমাকে এক দিন মৃত্যুবরণ করতে হবে

 

উলামায়ে কেরাম মউত আসার পূর্বে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ কররা অপর একটি অর্থ এই করেছেন যে, মউতের পূর্বে নিজের মৃত্যুর ধ্যান করো। অর্থাৎ মাঝে মাঝে এই চিন্তা করবে যে, একদিন না একদিন আমাকে এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। এ দুনিয়া থেকে বিদায়ের সময় টাকা–কুড়ি, সন্তান-সন্ততি কিছুই আমার সঙ্গে যাবে না, আমাকে শূন্য হাতে যেতে হবে। বাংলো–প্রাসাদ, বন্ধু–বান্ধব কিছুই সাথে যাবে না। সব কিছু ছেড়ে খালি হাতে একাই যেতে হবে। এ বিষয়টি একটু গভীরভাবে চিন্তা কর।

আসলে আমাদের দ্বারা এ দুনিয়াতে যত অন্যায়-অত্যাচার অপরাধ ও গোনাহ হয়ে থাকে তাঁর সবচেয়ে বড় কারণ এটাই যে, মানুষ তাঁর মৃত্যুকে ভুলে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের শরীর সুস্থ ও সবল থাকে এবং হাত-পা সচল থাকে ততক্ষণ মানুষ ভাবতে থাকে-

“আমাদের চেয়ে বড় আর কেউ নেই”।

জমিন ও আসমানকে সে এক করে ফেলে। সে সময় মানুষ অহংকারে লিপ্ত হয়, নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করে। অন্যের উপর অত্যাচারও করে থাকে। অন্যের অধিকার (হক) খর্ব করে। সুস্থ ও যুবক অবস্থায় এ সকল অপকর্ম করতে থাকে। কখনো এ খেয়াল হয় না যে, একদিন আমাকেও এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। নিজের হাতে নিজের প্রিয়জনকে মাটি দিয়ে আসে, নিজের কাঁধে নিজের প্রিয়জনের লাশ বহন করে। তা সত্ত্বেও একথা চিন্তা করে যে, মৃত্যু তো তাঁর হয়েছে এ ঘটনা তো আমার সাথে ঘটেনি। এভাবে গাফেল অবস্থায় জীওবন যাপন করে সে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করে না।

 

দুটি বড় নেয়ামত সম্পর্কে গাফলতী

 

এক হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত সুন্দর কথা বলেছেন—

(আরবী)

অর্থাৎ, আল্লাহ পাকের দুটি নিয়ামত এমন রয়েছে, যা সম্পর্কে অধিকাংশ লোকই ধোঁকায় পড়ে আছে, একটি নেয়ামত হলো সুস্থতা–অপরটি হলো অবকাশ।

 

অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ সুস্থতার নেয়ামত ভোগ করতে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সে এই ভুল ধারণায় পড়ে থাকে যে, সুস্থতার এই নেয়ামত সর্বদাই অব্যাহত থাকবে। সুস্থ অবস্থায় সৎ ও নেক কাজে টালবাহানা করতে থাকে যে, আজকের এই নেক কাজ আগামী দিন করব। আগামী দিন না হলে পরশু করবো। কিনতি পরবর্তীতে এমন একটি সময় আসে যখন সুস্থতার এ সময় পেরিয়ে যায়। অপর নেয়ামত হলো অবকাশ।

অর্থাৎ সৎ ও নেক কাজ করার অবকাশ ও সময় পেয়েও মানুষ সৎ ও নেক কাজকে এ কথা চিন্তা করে ফেলে রাখে যে, এখনো সময় যথেষ্ট আছে। এ কাজ পরে করে নিবো। এখন তো মাত্র যৌবন কাল। মানুষ যৌবন কালে পাহাড়কেও হটিয়ে দিতে পারে। কঠিন থেকে কঠিন কাজ সম্পন্ন করতে পারে। আর যদি ইচ্ছা করে, তাহলে যৌবনে অনেক ইবাদতও করতে পারে। অনেক পরিশ্রম ও সাধনাও করতে পারে। মানুষের সেবা করতে পারে। আল্লাহ পাককে সন্তুষ্ট করার জন্য নেকীর ভাণ্ডার গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু মন-মস্তিঙ্কে এ কথা চেপে বসে থাকে যে, আমিতো এখনো যুবক। এখন একটু জীবনের স্বাদ উপভোগ করে নিই। ইবাদত -বন্দেগী করার এবং নেক কাজ করার জীবনে এখনো ঢের সময় আছে, এ সকল কাজ পরে করব। এভাবে সে নেক কাজকে টালতে থাকে। এমনকি এভাবে একদিন তাঁর অজান্তেই যৌবনে ধস নেমে আসে, শরীর খারাপ হয়ে যায়। দুর্বলতা চেপে বসে। ফলশ্রুতিতে যৌবন চলে যাওয়ার পর ইবাদত-বন্দেগী ও নেক কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও শক্তি-সামর্থ না থাকার কারণে পেরে উঠে না। অথবা অবকাশ মিলে না। কারণ তখন ব্যস্ততা এত বেশী হয়ে যায় যে, ইবাদত-বন্দেগী করার মত ফুরসত মিলে না। এ সকল বিষয় এজন্য সামনে আসে যে, মানুষ মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিন্ত উদাসীন থাকে। মৃত্যুর কথা খেয়ালই থাকে না। যদি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় মৃত্যুকে এভাবে স্মরণ করত যে, একদিন আমাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে এবং মৃত্যুর পূর্বে আমাকে এ কাজ করতে হবে। এ ধরনের চিন্তা মানুষকে গোনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখে এবং সৎ পথে পরিচালিত করে। এজন্যই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করতে বলেছেন।

 

হযরত বাহলুল (রহঃ) এর নসীহতমূলক ঘটনা

 

খলীফা হারুনুর রশীদের শাসনকালে হযরত বাহলুল (রহঃ) নামে আত্মহারা (মাযজুব) প্রকৃতির একজন বুযুর্গ ছিলেন। হারুনুর রশীদ এই বুযুর্গের সঙ্গে প্রায়ই হাস্য-কৌতুক করতেন। ইতি যদিও আত্মহারা প্রকৃতির ছিলেন কিন্তু কথাবার্তা অত্যন্ত গভীর জ্ঞানসম্পন্ন বলতেন। খলীফা হারুনুর রশীদ প্রহরীদের বলে রেখেছিলেন, এই বুযুর্গ যখন আমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আসবেন, তাকে আসতে দিবে, কোন প্রকার বাধা দিবে না। কাজেই যখনই তাঁর ইচ্ছে হত নির্বিঘ্নে দরবারে পৌঁছলেন তখন তাঁর হাতে একটি লাঠি দেখতে পেলেন। খলীফা হারুনুর রুশীদ হযরত বাহলুল (রহঃ) কে কিছুটা হাস্যচ্ছলে বললেনঃ বাহলুল সাহেব! আপনার নিকট আমার একটি অনুরোধ। তিনি বললেন, কি সেই অনুরোধ? হারুনুর রশীদ বললেন, আমি এই লাঠি আমানতরূপে আপনাকে দিচ্ছি। আপনি যদি আপনার চেয়ে নির্বোধ কাউকে দুনিয়াতে খুঁজে পান, তাহলে এটা আমার পক্ষে থেকে তাকে হাদীয়া স্বরূপ দিয়ে দিবেন। হযরত বাহলুল (রহ:) ঠিক আছে বলে সে লাঠি রেখে দিলেন। খলীফা হারুনুর রশীদ কৌতুক করে এ কথা বলতে চেয়েছিলেন যে, দুনিয়াতে আপনিই সবচেয়ে নির্বোধ। আপনার চেয়ে বোকা আর কেউ নেই। হযরত বাহলুল (রহঃ) সেই লাঠি নিয়ে চলে গেলেন।

 

এ ঘটনার কয়েক বছর পর হযরত বাহলুল (রহঃ) একদা জানতে পারলেন যে, খলীফা হারুনুর রশীদ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। অনেক চিকিৎসা করা হচ্ছে কিন্তু কোন উপকার হচ্ছে না। তাই তিনি বাদশাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ আমীরুল মুমিনীন! কেমন আছেন? হারুবুর রুশীদ বললেন, আর কেমন আছি! সামনে সফর করতে হবে। হযরত বাহলুল (রহঃ) প্রশ্ন করলেন , কোথাকার সফর? বাদশাহ বললেন, আখেরাতের সফর । দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় হয়েছে। হযরত বাহলুল (রহঃ) জিজ্ঞেস করলেন, কতদিন পর ফিরে আসবেন? হারুনুর রশীদ বললেন, ভাই এটা আখেরাতের সফর। এ সফর থেকে কেউ ফিরে আসে না। হযরত বাহলুল (রহঃ) বললেন, তাহলে আপনি আর ফিরে আসবেন না! আচ্ছা এ সফরের আরাম ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনার জন্য কতজন সৈন্য-সামান্ত আগে প্রেরণ করেছেন? বাদশাহ বললেনঃ ভাই, তুমি আবার নির্বোধের মতো কথা বলছ। আখেরাতের সফরে কেউ সাথে যায় না। কোন বডিগার্ড, কোন সৈন্য, কোন লোক-লশকর সাথে নেওয়া যায় না। ঐ সফরে তো মানুষকে একাই যেতে হয়। হযরত বাহলুল (রহঃ) বললেন, এত দীর্ঘ সফর, তারপর সেখান থেকে আর ফিরেও আসবেন না, তা সত্ত্বেও আপনি কোন সৈন্য-সামান্ত পূর্বে পাঠালেন না। অথচ এর আগে আপনি যত সফর করেছেন, সকল সফরেই আরামের ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা করার জন্য আপনার পূর্বে বিরাট সৈন্যবাহিনী ও আসবাবপত্র প্রেরণ করা হত। এ সফরে কেন সেগুলো পাঠাচ্ছেন না? বাদশাহ বললেন, না ভাই, এ সফরেই এমন যে, এ সফরে সৈন্য-সামন্ত ও লোক-লশকর প্রেরণ করা যায় না।

হযরত বাহলুল (রহঃ) বললেন, জনাব বাদশাহ! অনেক দিন থেকে আপনার একটি আমানত আমার নিকট পড়ে আছে। আর তাহলো একটি লাঠি। আপনি সেই লাঠিটি আমাকে এ কথা বলে দিয়েছিলেন যে, যদি দুনিয়াতে তোমার চেয়ে বোকা কাউকে পাও তাহলে এটা আমার পক্ষ থেকে তাকে হাদীয়া স্বরূপ দিয়ে দিও। আমি অনেক খুঁজেছি কিন্তু আমি আমার চেয়ে বোকা একমাত্র আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে পাইনি। আর এটা এ জন্য যে, আমি দেখেছি আপনার ছোট থেকে ছোট সফর সামান্য সময়ের জন্য হলেও প্রায় মাসখানেক পূর্ব থেকে তাঁর প্রস্তুতি চলত। পানাহারের জিনিস্পত্র, তাঁবু, লোক-লশকর, বডিগার্ড সব কিছুই আপনার সফরের পূর্বে পাঠানো হত। আর এখন এত দীর্ঘ সফর এবং এমন সফর যেখান থেকে আর ফেরাও হবে না, তাঁর কোন প্রস্তুতি নেই। আপনার চেয়ে বোকা আমি দুনিয়াতে আর কাউকে দেখনি। কাজেই আপনাকে আমি আপনার দেওয়া আমানত ফিরিয়ে দিচ্ছি।

একথা শুনে খলীফা হারুনুর রশীদ কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, বাহলুল, তুমি ঠিক বলেছ, সারাজীবন আমি তোমাকে বোকা মনে করেছি। কিন্তু আসল বুদ্ধিমানের মত কথা তুমিই বলেছ। আসলেই আমি আমার জীবন নষ্ট করেছি। কারণ, আখেরাতের এ সফরের কোন প্রস্তুতি নেইনি।

 

বুদ্ধিমান কে?

প্রকৃত পক্ষে হযরত বাহলুল (রহঃ) যে কথা বলেছেন, সেটা হাদীছেরই কথা। হাদীছ শরীফে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–

(আরবী)

অর্থাৎ বুদ্ধিমান ঐ ব্যক্তি যে স্বিয় নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করী। (তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ শরীফ)

এ হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দিয়েছেন, বুদ্ধিমান কে। আজকের দুনিয়ায় বুদ্ধিমান ঐ ব্যক্তিকে বলে, যে খুব উপার্জন করতে পারে, ধনভান্ডার গড়ে তোলা ও পয়সা থেকে পয়সা বানানোতে যে বেশী পারদর্শী তাকেই বুদ্ধিমান মনে করা হয়। আর যে মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে তাকেও বুদ্ধিমান মনে করা হয়। কিন্তু এই হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে বুদ্ধিমান বলেছেন, যে নিজের নফসকে (প্রবৃত্তিকে) নিয়ন্ত্রণে রাখে, প্রবৃত্তির সকল চাহিদা পূরণ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে না। বরং সে নিজের নফসকে আল্লাহ পাকের হুকুমের অধীন রাখে। আর মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এমন ব্যক্তিই বুদ্ধিমান। যদি এ কাজ না করে তাহলে তাকে বোকা বলা হবে। কারণ, সে তাঁর সমগ্র জীবন অহেতুক কাজে ব্যয় করল। যেখানে সর্বদা থাকতে হবে, সেখানের জন্য কোন প্রস্তুতি গ্রহণ করল না।

 

আমরা সবাই নির্বোধ

 

খলীফা হারুনুর রশীদকে সম্বোধন করে বাহলুল (রহঃ) যে কথা বলেছিলেন, গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে তা আমাদের সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ, দুনিয়ায় থাকা অবস্থায় আমাদের প্রত্যেককে সর্বদা এই চিন্তা আচ্ছন্ন করে রাখে যে, বাড়ী কোথায় বানাব, কিরূপে বানাব, সেখানে আরাম-আয়েশের কি কি উপায়-উপকরণ থাকনে! আর দুনিয়ার জীবনে যদি কোথাও যেতে হয়, তাহলে বেশ কিছুদিন পূর্বেই সিট বুকিং দেওয়া হয় যাতে সময় মত সিট পেতে কোন অসুবিধা না হয়। হোটেলে সিট বুক করানো । এ সকল কাজ সফরের পূর্বেই সম্পন্ন করা হয়। অথচ দুনিয়ার এ সফর খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হয়ে থাকে। কিন্তু যেখানে সদা-সর্বদা থাকতে হবে, যে জীবনের কোন শেষ নেই, সে জগতের জন্য কোন চিন্তা নেই যে, সেখানের বাড়ী কিভাবে নির্মাণ করবো। সে জগতের জন্য কোন সিট বুক কিভাবে করবো। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, বুদ্ধিমান ঐ ব্যক্তি, যে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। যদি মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ না করে, তাহলে সে নিতান্তই বোকা। চাই সে যত বড় ধনী ও সম্পদশালীই হোক না কেন। আখেরাতের জন্য প্রস্তুতির পথ এই যে, মৃত্যুর পূর্বেই মৃত্যু পরবর্তী জীবনের কথা অধিক পরিমাণে স্মরণ করবে এবং তাঁর জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।

 

মৃত্যু ও আখেরাতের চিন্তা করার পদ্ধতি

 

হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহঃ) ইরশাদ করেন, প্রতিদিনের একটি নির্ধারিত সময়ে নির্জনে একাকী বসে একথা চিন্তা করবে যে, আমার শেষ সময় উপস্থিত। ফেরেশতা আমার জান কবয করার জন্য পৌঁছে গেছে এবং সে আমার জান কবয করে নিয়েছে। আমার আত্মীয়-স্বজন আমার গোসল ও কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেছে। শেষ পর্যন্ত তারা আমাকে গোসল দিয়ে কাফন পরিয়ে খাটে করে কবরস্থানে নিয়ে গেল। জানাযার নামায পড়ে আমাকে কবরে রেখে দিল। অতঃপর কবরকে মাটি দিয়ে বন্ধ করে দিল। আমার উপরে কয়েক মণ মাটি দিয়ে সেটাকে সযত্নে নিখুঁতভাবে বন্ধ করে দিয়ে সকলেই চলে গেল। এখন অন্ধকার কবরে আমি একা অবস্থান করছি। ইতিমধ্যে প্রশ্নোত্তরের জন্য ফেরেশতারা কবরে আগমন করলেন। তারা আমাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন।

অতঃপর আখেরাতের চিন্তা এভাবে করবে যে, আমাকে কবর থেকে পুনরায় উঠানো হলো। এখন হাশরের ময়দান কায়েম হচ্ছে। সকল মানুষ হাশরের ময়দানে একত্রিত হয়েছে। সেখানে মারাত্মক গরম। সকলের শরীর হতে ঘাম ঝরছে। সূর্য একেবারে নিকটে। সকলে মারাত্মক চিন্তিত। মানুষেরা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের খেদমতে হাযির হয়ে নিবেদন করছেন যে, আল্লাহ পাকের নিকট দরখাস্ত করুন যাতে হিসাব-কিতাব শুরু করা হয়। অতঃপর এভাবে হিসাব-কিতাব, পুলসিরাত, বেহেশত ও দোযখের কথা চিন্তা করবে। প্রতিদিন ফজর নামায আদায়ের পর কুরআন শরীফ তেলাওয়াত, মুনাজাতে মাকবুল পাঠ ও অন্যান্য যিকির-আযকার থেকে ফারেগ হয়ে একটু চিন্তা করবে যে, এ ঘটনাগুলো আমার জীবনে ঘটবে, এ (মৃত্যুর) সময় আমার জীবনে অবশ্যই আসবে। আর এটা আমার জানা নেই যে, এ সময় কখন এসে যাবে। এটাও আমার জানা নেই যে, আজই এসে যায় কিনা। এই চিন্তা (মুরাকাবাহ) করার পর আল্লাহ পাকের নিকট এই বলে দুআ করবে যে, ইয়া আল্লাহ! আমি দুনিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য ও কাজ-কারবারের জন্য বের হচ্ছি, এমন কাজ যেন আমার দ্বারা না হয়, যা আমার জন্য আখেরাতে ধ্বংসের কারণ হুয়। প্রতিদিন এভাবে চিন্তা (মুরাকাবাহ) করবে। একবার যখন অন্তরে মৃত্যুর চিন্তা ও আখেরাতের ধ্যান বসে যাবে, তখন ইনশাআল্লাহ আত্মশুদ্ধির ফিকির হবে।

 

হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবু নুআম (রহঃ) এর কাহিনী

 

হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবু নু’আম (রহঃ) নামে একজন বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ও বুযুর্গ ছিলেন। তাঁর সময়ে এক ব্যক্তির অন্তরে একথা জাগ্রত হলো যে, আমি বিভিন্ন মুহাদ্দিছ, ফকীহ, উলামায়ে কেরাম ও বুযুর্গানে দ্বীনের খেদমতে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে প্রশ্ন করব যে, আপনি যদি কোনভাবে জানতে পারেন যে, আপনার জীবনের মাত্র একটি দিন বাকী আছে, আগামী কালই আপনার মৃত্যু হবে, তাহলে আপনি এই একটি দিন কিভাবে অতিবাহিত করবেন? এবং এই একটি দিন কি কাজে ব্যয় করবেন? প্রশ্নের কারণ এই ছিল যে, এ সকল বড় বড় মুহাদ্দিস, ফকীহ ও বুযুর্গানে দ্বীন এর উত্তরে হয়ত উত্তম আমলের কথা বলবেন এবং সর্বোত্তম কাজে এ দিনটি অতিবাহিত করবেন। আর এভাবে আমি সর্বোত্তম আমল সম্পর্কে অবগত হতে পারব এবং আমি ভবিষ্যৎ জীবনে সে সকল উত্তম আমল করব। এ লক্ষ্য নিয়ে ঐ ব্যক্তি এ প্রশ্ন অনেক বুযুর্গের নিকট করেছেন। এ প্রশ্নের উত্তরে একেক জন একেক কথা বলেছেন। কিন্তু প্রশ্নকর্তা যখন হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবু নু’আম (রহঃ) নিকট এসে এ প্রশ্ন করলেন তখন তিনি উত্তরে বললেন, আমি প্রতিদিন যে কাজ করি এদিনও সে কাজই করব। কারণ, আমি প্রথম দিন থেকেই আমার রুটিন ও কর্মসূচী একথা লক্ষ্য করে সাজিয়েছি যে, এদিনই হয়ত আমার জীবনের শেষ দিন। হয়ত আজই আমার মৃত্যু হবে। আমার পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচীতে এতটুকুও ফাঁক নেই যে, তাতে নতুন কোন আমল সংযোজন করব। যে কাজ প্রতিদিন করি, জীবনের শেষ দিনও সেই একই কাজ (আমল) করব। এটাই ঐ হাদীসের উদ্দেশ্য, যে হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–

(আরবী…………)

অর্থাৎ সকল স্বাদ বিনাশকারীকে (তথা মৃত্যুকে) অধিক পরিমাণে স্মরণ কর

হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবু নু’আম (রহঃ) এই হাদীছের উপর আমল করার জন্য মৃত্যুর ধ্যান-খেয়াল ও চিন্তাকে এমন ভাবে বাস্তবে রূপায়িত করেছিলেন যে, সর্বদা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন–মৃত্যু যখন আসতে চায় আসুক।

 

আল্লাহ পাকের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ

 

আল্লাহ পাকের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ সম্পর্কে হাদীছ শরীফে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–

(আরবী………)

অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ পাকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাকে পছন্দ করে এবং আল্লাহ পাকের সঙ্গে সাক্ষাতের (প্রবল) আগ্রহ রাখে, আল্লাহ পাকও তাঁর সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ রাখেন।

এ ধরনের লোকেরা সর্বদা মৃত্যুর অপেক্ষায় বসে থাকে এবং মনে মনে বলতে থাকে–

(আরবী…….)

অর্থাৎ আগামীকাল স্বীয় বন্ধু অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে।

এই মৃত্যু চিন্তার ফলেই মানুষের জীবন শরীঅত ও সুন্নাতের অনুসরণে অভুস্ত হয়ে গড়ে ওঠে। এতে কার মৃত্যুর জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকে। মোটকথা, প্রতিদিন সামান্য কিছু সময় বের করে এভাবে মৃত্যুর চিন্তা করবে যে, একদিন নিশ্চয়ই আমার মৃত্যু আসবে। আমি তাঁর জন্য কি ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি!

 

আজই নিজের হিসাব নাও

আমি অপর যে হাদীছটি দিয়ে শুরুতে পাঠ করেছিলাম, তাঁর এক অংশ হলো–

(আরবী…….)

অর্থাৎ আল্লাহ পাক তোমার হিসাব নেওয়ার পূর্বেই তুমি নিজে নিজের হিসাব নাও। কারণ, আখেরাতে তোমার প্রতিটি আমল ও প্রতিটি কাজের হিসাব নেওয়া হবে।

আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন–

(আরবী……)

অর্থাৎ ‘তোমরা যে সকল সৎকর্ম করেছ সেগুলোও দেখতে পাবে আর যে সকল অপকর্ম করেছ সেগুলোও দেখতে পাবে’।

এ কথাটিকেই কোন এক কবি খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন–

(আরবী…….)

অর্থাৎ তুমি আজকের দিনকেই বিচারের দিন মনে করে নিজের হিসাব নাও।

কেয়ামতের দিন যে হিসাব নেওয়া হবে তুমি সেদিনের হিসাবের পূর্বেই নিজের হিসাব নিজে নিতে শুরু কর। অর্থাৎ প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর পূর্বে সারাদিনের কাজ-কর্ম ও কথাবার্তার হিসাব এভাবে নিবে যে, আজকে আমি সারাদিন যে সকল কাজ করলাম তা সম্পর্কে যদি কেয়ামতের দিন আল্লাহ পাক প্রশ্ন করেন তাহলে আমি তাঁর কি উত্তর দিব। এভাবে প্রতিদিন কৃতকর্ম সম্পর্কে চিন্তা করবে।

 

সকালে নফসের (মনের) সাথে চুক্তিবদ্ধ হবে

ইমাম গাযালী (রহঃ) আত্মশুদ্ধি ও সংশোধনে জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ও ফলদায়ক একটি পন্থা উদ্ভাবন করেছেন। আমরা যদি তাঁর বাতলানো তরীকার উপর আমল করতে পারি, তাহলে এটা আমাদের জন্য অব্যর্থ মহৌষধ প্রমাণিত হবে। এর চেয়ে উত্তম কোন ব্যবস্থাপত্র পাওয়া দুঙ্কর। তিনি বলেন, প্রতিদিন তোমাকে কয়েকটি কাজ করতে হবেঃ-

প্রথম কাজ__

নফসের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া

সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের নফস তথা মনের সাথে এভাবে চুক্তিবদ্ধ হবে যে, আজ আমি সকালে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর হতে রাতে পুনরায় ঘুমানো পর্যন্ত কোন প্রকার গোনাহ করব না। আর আমার উপর শরীঅত কর্তৃক নির্ধারিত ফিরিয, ওয়াজিব ও সুন্নাত সমূহ যথাযথভাবে আদায় করব। এছাড়া আমার দায়িত্বে আল্লাহ পাক ও তাঁর বান্দাদের যত হক আছে তাও পরিপূর্ণরূপে আদায় করব। যদি ভুলেও এ চুক্তির খেলাফ কোন কাজ আমার দ্বারা হয়, তাহলে এর জন্য হে নফস তোমাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। এই চুক্তি একটি (মূল্যবান) কাজ। এটাকে পরিভাষায় পরস্পরে শর্তারোপ করা বলে।

 

চুক্তির পুর দু’আ করা

আমাদের শ্রদ্বেয় মুরুব্বী হযরত ডাঃ আব্দুল হাই আরেফী (রহঃ) ইমাম গাযালী (রহঃ) এর উপরোক্ত প্রস্তাবের প্রথমাংশের সাথে আরেকটি বিষয় সংযোজন করেন। তিনি বলেন, নফসের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর আল্লাহ পাকের নিকট এই দু’আ কর–হে আল্লাহ! আমি স্বীয় নফসের সাথে এই ওয়াদা করেছি যে, আজ কোন গোনাহ করব না এবং ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত সব আদায় করব। শরীঅতের বিধান মত চলব। আল্লাহর হক, বান্দার হক সব ঠিক মত আদায় করব। কিন্তু হে আমার আল্লাহ! আপনি যদি তাওফীক দান না করেন, তাহলে আমি ঐ চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারব না। কাজেই আমি যখন ঐ চুক্তি করে ফেলেছি, আপনি তা রক্ষা করুন। আমাকে ঐ চুক্তির উপর অটল ও অবিচল থাকার তাওফীক দান করুন। আমাকে চুক্তি ভঙ্গ করা থেকে বাঁচান এবং আমাকে এই চুক্তির উপর পরিপূর্ণভাবে আমল করার তাওফীক দান করুন। চুক্তির পর এভাবে দু’আ করবে।

 

দ্বিতীয় কাজ–

 

২. সারাদিন আমলের মুরাকাবাহ

 

উপরোক্ত নিয়মে দু’আ করার পর দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজে বের হবে। যদি চাকুরীজীবী হও, তাহলে চাকুরীতে বেরিয়ে পড়। যদি ব্যবসায়ী হও, তাহলে ব্যবসার কাজে লেগে যাও। কর্মক্ষেত্রে পৌঁছা প্রতিটি কাজ করার আগে এভাবে একটু ভেবে দেখো যে, আমি সকালে স্বীয় নফসের সাথে যে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি, এটা তাঁর পরিপন্থী নয় তো? কথা বলার আগে ভেবে দেখবে আমি যে কথা বলছি, তা আমার চুক্তির খেলাফ তো নয়? চিন্তা-ভাবনার পর যদি সেই কাজ বা কথাকে চুক্তির পরিপন্থী ও বিরোধী বলে মনে হয়, তাহলে তা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করো। এটা দ্বিতীয় কাজ, যাকে ‘মুরাকাবাহ’ বলা হয়।

তৃতীয় কাজ–

৩. ঘুমানোর পূর্বে ‘মুহাসাবাহ’ (হিসাব নেওয়া)

এ কাজটি রাতে ঘুমানোর পূর্বে সম্পন্ন করতে হবে। আর তা হলো, ‘মুহাসাবাহ’–স্বীয় নফসকে সম্বোধন করে বলবে যে, তুমি সকালে এই চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে যে, কোন প্রকার গোনাহের কাজ করবে না। সকল কাজ শরীঅতের হুকুম অনুযায়ী করব। আল্লাহ পাকের হক এবং বান্দার হক যথাযথভাবে আদায় করব। এখন হিসাব নিয়ে দেখ! তুমি সারাদিন কোন কাজ চুক্তি অনুযায়ী করেছ। আর কোন কাজ চুক্তির খেলাফ করেছ। অতঃপর এভাবে নিজের সারাদিনের কাজ-কর্মের হিসাব নিবে যে, সকালে তখন আমি বাড়ী থেকে বের হয়েছি তখন অমুকের সাথে দেখা হয়েছে, তাঁর সাথে কি কথা হয়েছে। যখন কর্মস্থলে পৌঁছেছি তখন সেখানে নিজ দায়িত্ব কিভাবে পালন করেছি। আমি ব্যবসায়ী ব্যবসা কিভাবে, কি নিয়মে করেছি। হালাল পন্থায় না হারাম পন্থায়? আর যত লোকের সাথে সাক্ষাৎ করেছি, তাদের হক কি ভাবে আদায় করেছি? স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির হক কি ভাবে আদায় করেছি? এ সকল বিষয়ের হিসাব নিতে হবে-এর নাম ‘মুহাসাবাহ’।

 

অতঃপর শোকর আদায় করা

 

উপরোক্ত পদ্ধতিতে সকল কর্মের হিসাব নেওয়ার পর যদি দেখা যায় যে, তুমি সকালে যে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলে তা পালন করার ব্যাপারে সফল হয়েছ, তাহলে আল্লাহ পাকের শোকর আদায় করো–হে আল্লাহ, তোমার শোকর যে, তুমি আমার ঐ চুক্তির উপর অবিচল থাকার তাওফীক দিয়েছ।

(আরবী………)

(হে আল্লাহ! তোমার জন্যই সকল প্রশংসা এবং তোমার জন্যই সকল কৃতজ্ঞতা।)

 

এই শোকর আদায়ের ফল তা-ই হবে, যার নিম্মোক্ত আয়াতে আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছেন–

(আরবী)

অর্থাৎ তোমরা যদি আল্লাহর নেআমতের শোকরিয়া আদায় কর তবে আল্লাহ পাক ঐ নেআমত আরও বাড়িয়ে দিবেন। সুতরাং তোমরা যখন স্বীয় চুক্তিতে অবিচল থাকার মত নেয়ামত লাভ করে তাঁর শোকর আদায় করেছ, তখন ভবিষ্যতে ঐ নেআমতের মধ্যে আরও প্রবৃদ্ধি ঘটবে এবং তাঁর উপর ছওয়াবও লাভ করবে।

 

অন্যথা হলে তওবা করো

 

আর যদি হিসাবের ফলে একথা প্রকাশ পায় যে, অমুক সময় আমি স্বীয় চুক্তির খেলাফ করেছি, অমুক কাজে আমার পদস্খলন ঘটেছে, আমি স্বীয় চুক্তির উপর টিকে থাকতে পারিনি, তাহলে সাথে সাথে তাওবা করবে। এবং বলবে ইয়া আল্লাহ! আমি এই চুক্তি তো করেছিলাম কিন্তু নফস ও শয়তানের ফাঁদে পড়ে ঐ চুক্তিতে অটল থাকতে পারিনি। ইয়া আল্লাহ, আমি আপনার নিকট ক্ষমা চাই এবং তাওবা করছি। আপনি দয়া করে আমাকে মাফ করে দিন।

 

নিজের উপর শাস্তি প্রয়োগ করো

 

তাওবা করার সাথে সাত্রহে স্বীয় নফসের উপর কিছু শাস্তিও প্রয়োগ করবে। সে শাস্তি এভাবেও হতে পারে যে, তুমি তোমার নফসকে উদ্দেশ্য করে বলবে, যেহেতু তুমি চুক্তি ভঙ্গ করেছ, তাই তোমার এখন আট রাকাআত নফল নামায পড়তে হবে। এই শাস্তির ব্যাপারটি সকালে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সময়ই নির্ধারণ করে নিবে। রাতে সমগ্র দিনের কাজের হিসেব নিয়ে শাস্তি প্রয়োগ কালে নফসকে সম্বোধন করে বলবে, তুমি নিজের সামান্য মজা ও আরামের জন্য ক্ষণিকের উপভোগ লাভের জন্য আমাকে চুক্তি ভঙ্গের মত অন্যায় কাজে লিপ্ত করেছ, এজন্য তোমাকে এখন সামান্য শাস্তি পেতে হবে। আর তোমার শাস্তি এই যে, ঘুমানোর পূর্বে আট রাকাআত নফল নামায আদায় করতে হবে। নামায পড়ার পরই ঘুমানোর জন্য বিছানায় যেতে পারবে, এর পূর্বে শুতে পারবে না।

 

শাস্তি উপযুক্ত ও মধ্যম ধরনের হওয়া বাঞ্ছনীয়

হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী (রহঃ) বলেন, শাস্তি এমন নির্দিষ্ট করবে যাতে নফসের উপর সামান্য চাপ পড়ে। তবে এমন কঠোর শাস্তিও দিবে না যাতে নফস ভয় পেয়ে যায়, আবার এমন হালকা শাস্তিও দিবে না যে, এ শাস্তির কোন আছরই নফসের উপর হয় না। যেমন মরহুম স্যার সাইয়েদ সাহেব নিয়ম যখন ইন্ডিয়ায় আলীগড় কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন তখন এই নিয়ম করেন যে, সকল ছাত্রকে পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে এসে জামাআতের সঙ্গে আদায় করতে হবে। যে সকল ছাত্র জামাআতে হাজির হবে না তাদেরকে জরিমানা দিতে হবে। সম্ভবতঃ এক ওয়াক্ত নামাযের জন্য এক আনা জরিমানা নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। এর ফল এই হলো যে, যারা সম্পদশালী তারা পুরো মাসের সকল নামাযের জরিমানার টাকা একত্রে মাসের শুরুতেই অগ্রীম জমা দিয়ে দিত। এভাবে জরিমানা দিয়ে নামায থেকে ছুটি নিয়ে নিত। এজন্য থানবী (রহঃ) বলেন, এত সামান্য জরিমানাও নির্ধারণ করবে না যে, একত্রে আদায় করে দিয়ে মুক্ত হয়ে যাবে। আনার এত বেশী নির্ধারণ করবে না যে, নফস পলায়ন করে। বরং মধ্যম পর্যায়ের ভারসাম্যপূর্ণ জরিমানা নির্ধারণ করবে। যেমন এক এক অন্যায়ের জন্য আট রাকাআত নফল নামায নির্দিষ্ট করা একটি মুনাসিব (সমীচীন) শাস্তি।

 

কিছুটা হিম্মত করতে হবে

সুতরাং তুমি যদি আত্মশুদ্ধি করতে চাও, তাহলে তোমাকে সামান্য একটু হাত-পা নাড়তে হবে, কিছুটা কষ্ট সহ্য করতে হবে। একটু হলেও হিম্মত করতে হবে। প্রতিজ্ঞা ও পণ করতে হবে। এমনি বসে বসে তো আর আত্মশুদ্ধি হবে না। কাজেই এই ফায়সালা করে নাও যে, যখনই নফস কোন ভুল পথে যাবে, তখন আট রাকাআত নফল নামায অবশ্যই পড়ব। নফস যখন দেখবে যে, আট রাকাআত নফল নামায পড়ার মত একটি নতুন বিপদ চেপে বসেছে, তপখন আগামীতে এই নফসই তোমাকে গোনাহ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে, যেন সে এই আট রাকাআত পড়ার কষ্ট থেকে বেঁচে যায়। এভাবে তোমার নফস ধীরে ধীরে ইনশাআল্লাহ সঠিক পথে এসে যাবে। এরপর আর তোমাকে পথভ্রষ্ট করবে না।

 

নিম্মোক্ত চারটি কাজ করবে

ইমাম জ্ঞাযালী (রহঃ) এর নসীহতের সারকথা এই যে, নিম্মোক্ত চারটি কাজ তোমাকে করতে হবে–

১. সকালে নফসের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া।

২. সকল কাজের আগে তাঁর বৈধতা ও অবৈধতা চিন্তা করা।

৩. রাতে ঘুমানোর পূর্বে সারাদিনের আমলের হিসাব নেওয়া।

৪. যদি নফস অবাধ্য হয়, তাহলে রাতে ঘুমানোর পূর্বে তাকে শাস্তি দেওয়া।

 

এ আমল বরাবর করতে হবে

 

আরও একটি কথা মনে রাখতে হবে। তা এই যে, দু’চার দিন এই আমল করে এ কথা মনে করা যাবে না, ব্যাস! এখন তো আমি মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছে গেছি। বুযুর্গ হয়ে গেছি। বরং এ আমল বরাবর করতে হবে। এ সময় কখনো তুমি জয়ী হবে আবার কখনো শয়তান জয়ী হবে। তবে এমন যেন না হয় যে, শয়তান কোনদিন জয়ী হলে তুমি ভয় পেয়ে এ আমল ছেড়ে দাও। কারণ, এতেও আল্লাহ পাকের বিশেষ হেকমত নিহিত আছে। এভাবে হোঁচট খেয়েও যদি তুমি চলতে থাক, তাহলে ইনশাআল্লাহ একদিন মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছে যাবে। আর যদি এ আমল করে প্রথম দিনই মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছে যাও, তাহলে তাঁর ফল এই হবে যে, মস্তিঙ্কে শয়তানের এই ধোঁকা বাসা বাধবে যে, আমি তো হযরত জুনায়েদ বাগদাদী অথবা শিবলী নোমানী হয়ে গেছি। সুতরাং একথা মনে রাখতে যে, এই আমলে কখনো তুমি সফল হবে আবার কখনো ব্যর্থ হবে। যেদিন সফল হও সেদিন এই সফলতার জন্য আল্লাহ পাকের শোকরিয়া আদায় করো। আর যেদিন ব্যর্থ হও সেদিন এই ব্যর্থতার জন্য তাওবা ও ইস্তিগফার করো এবং স্বীয় নফসের উপর শাস্তি প্রয়োগ করো। সাথে সাথে নিজের অসৎ কর্মের প্রতি অনুতপ্ত ও লজ্জিত হও। এই অনুতাপ ও অনুশোচনা মানুষকে ব্যররথতার অতল গহ্বর থেকে সফলতার শীর্ষে পৌঁছে দেয়।

 

হযরত মুআবিয়া (রাযিঃ) এর একটি কাহিনী

হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী (রহঃ) হযরত মুআবিয়া (রাযিঃ) এর একটি কাহিনী লিখেছেন। হযরত মুআবিয়া (রাযিঃ) প্রতি রাতে তাহাজ্জুদ নামায আদায়ের জন্য উঠতেন। এক রাতে তিনি জাগ্রত হতে পারলেন না। ফলে তাহাজ্জুদ কাযা হয়ে গেল। সারাদিন কেঁদে কেঁদে অতিবাহিত করলেন। সাথে সাথে তাওবা ও ইস্তিগফার করে দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! আজ আমার তাহাজ্জুদ ছুটে গেল। পরবর্তী রাতে তিনি ঘুমিয়ে আছেন, তাহাজ্জুদের সময় এক ব্যক্তি এসে তাঁকে তাহাজ্জুদের জন্য জাগিয়ে তুলল। তিনি জাগ্রত হয়ে লক্ষ্য করলেন, যে তাঁকে জাগিয়ে তুলেছে সে অপরিচিত। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? ঐ ব্যক্তি বলল, আমি ইবলিশ। হযরত মুআবিয়া (রাযিঃ) বললেন, তুমি যদি ইবলিশ হয়ে থাক, তাহলে আমাকে তাহাজ্জুদের জন্য জাগ্রত করায় তোমার কি লাভ? শয়তান বলল, আপনি উঠুন এবং তাহাজ্জুদ পড়ুন। হযরত মুআবিয়া (রাযিঃ) বললেন, তুমি তো মানুষকে তাহাজ্জুদ থেকে বিরত রাখ, এখন তাহাজ্জুদের সহায়তাকারী কি ভাবে হলে? শয়তান বলল, আসল কথা হল, গতরাতে আমি আপনাকে তাহাজ্জুদের সময় ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি, ফলে আপনার তাহাজ্জুদ ছুটে গেছে। কিন্তু সমগ্র দিন আপনি এজন্য কেঁদেছেন এবং ইস্তিগফার করেছেন। ফলে আল্লাহ পাকের নিকট আপনার মর্যাদা এত বেশী বেড়েছে যে, তাহাজ্জুদ পড়লেও এত বৃদ্ধি পেত না। কাজেই এটাই ভাল ছিল যে, আপনি তাহাজ্জুদ পড়েন। এজন্যই আজ আমি নিজেই আপনাকে ডাকতে এসেছি যেন আপনার মর্যাদা আরো বা বাড়ে।

 

অনুশোচনা ও তাওবা দ্বারা মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়া

 

উপরোক্ত কাহিনী থেকে জানা গেল যে, মানুষ যদি সত্যিকার অর্থে তাঁর বিগত দিনের কোন ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে সে ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার পণ করে, তাহলে এই তাওবা ও অনুশোচনার বদৌলেতে আল্লাহ পাক বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করে কোথা থেকে কোথয় পৌঁছে দেন। আমাদের শ্রদ্বেয় মুরব্বী হযরত ডাক্তার আব্দুল হাই আরেফী (রহঃ) বলতেন, যখন আল্লাহ পাকের কোন বান্দা অন্যায় করার পর আল্লাহ পাকের প্রতি প্রত্যাবর্তন করে এবং আল্লাহ পাকের কাছে ক্ষমা চায়, তখন আল্লাহ পাক ঐ বান্দাকে বলেন, তুমি যে অন্যায় করেছ, তোমার এই অন্যায়ই তোমাকে আমার করুণা, রহমত ও অসীম দয়া ও ক্ষমার যোগ্য করেছে। তোমার এই অন্যায়ই তোমার জন্য উপকারী হয়েছে।

 

হাদীছ শরীফে আছে, ঈদুল ফিতরের দিন আল্লাহ পাক স্বীয় ইজ্জত ও প্রতাপের কসম খেয়ে ফেরেশতাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আজ এ সকল লোক এখানে (ঈদগাহে) একত্রিত হয়ে তাদের উপর অর্পিত ফরীযাহ (দায়িত্ব) আদায় করছে এবং আমাকে ডাকছে, আমার নিকট ক্ষমা চাচ্ছে। নিজেদের আশা-আকাংখা পূরণের জন্য দু’আ করছে। আমার ইজ্জত ও প্রতাপের কসম, আমি অবশ্যই তাদের দু’আ কবুল করব। তাদের ভুল-ক্রটি ও অন্যায়কে নেকীতে পরিবর্তিত করে দিব। এখানে প্রশ্ন হয়, এ সকল গোনাহ কি ভাবে নেকীতে পরিণত হবে? এর উত্তর এই যে, যখন কোন মানুষ দ্বারা অজ্ঞতা অসতর্কতার মুহূর্তে কোন গোনাহ হয়ে যায়, তখন যদি সে অনুতপ্ত হয়ে আফসোস করে আল্লাহ পাকের দিকে প্রত্যাবর্তন করে, আল্লাহ পাককে ডাকতে থাকে আর বলে ইয়া আল্লাহ, অজ্ঞতা ও অসতর্কতায় এ গোনাহ করে ফেলেছি, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। তাহলে আল্লাহ পাক তাঁর অনুতাপের কারণে শুধু যে কেবল তাঁর গোনাহ মাফ করেন তা নয়, বরং এর ফলশ্রুতিতে তাঁর মর্যাদাও বৃদ্ধি করেন। এভাবে এ গোনাহও তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হয়ে থাকে এটা তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়ে থাকে। যেমন কুরআন শরীফে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন–

(আরবী…….)

অর্থাৎ আল্লাহ পাক তাদের গোনাহসমূহকে নেকীতে পরিবর্তিত করেন।

 

হযরত বাবা নজম আহসান সাহেব (রহঃ) নামে আমাদের একজন বুযুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি হযরত থানবী (রহঃ) এর খলীফা ছিলেন। উচ্চ পর্যায়ের ওলী আল্লাহ ছিলেন। মাঝে মাঝে কবিতাও রচনা করতেন। তাঁর রচিত কবিতার নিম্মোক্ত পংক্তিটি আমার খুবই প্রিয়, যার দরুণ এটা বারবার মনে পড়ে–

(আরবী…..)

অর্থাৎ আল্লাহ পাক যখন আমাদেরকে আপন গোনাহর কারণে অনুতপ্ত হয়ে অনুনয়-বিনয় সহ ক্রন্দন করার মত সৌভাগ্য দান করেছেন এবং আল্লাহ পাকের নিকট এই বলে দু’আ করছি, ইয়া আল্লাহ! আপনি আমার এ গোনাহ মাফ করে দিন, আমি ভুল করেছি। এ আন্তরিক দু’আর পর গোনাহ আর আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এই গোনাহও যেহেতু আল্লাহ পাকের সৃষ্টি, আর আল্লাহ পাক কোন জিনিস হেকমত ছাড়া সৃষ্টি করেননি। কাজেই গোনাহ সৃষ্টির মধ্যেও কোন না কোন হেকমত কল্যান নিহিত আছে। আর সে হেকমত ও কল্যাণ এই যে, গোনাহ করে ফেলার পর যখন অনুতপ্ত হয়ে কান্নাকাটি করবে এবং তাওবা করবে এবং ভবিষ্যতে গোনাহ না করার দৃঢ় পণ করবে, তখন এই তাওবার বদৌলতে আল্লাহ পাক তোমার মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিবেন।

 

নফসের সাথে সমগ্র জীবনব্যাপী লড়াই করতে হবে

কাজেই রাতে সারাদিনের আমলের হিসাব নিয়ে যখন জানতে পারবে যে, আজ গোনাহ হয়ে গেছে, সাথে সাথে তাওবা ও ইস্তিগফার করবে, আল্লাহ পাকের দিকে প্রত্যাবর্তন (তথা মনোনিবেশ) করবে। হতাশ হয়ো না। কারণ, এই জীবন একটি জিহাদ ও সংগ্রামের নাম। কাজেই মৃত্যু পর্যন্ত নফস ও শয়তানের মুকাবিলা করতে হবে, লড়াই করতে হবে। আর মুকাবিলা ও লড়াইতে এমন তো হয়েই থাকে যে, কখনো তুমি বিজয়ী হবে শত্রু পরাজিত হবে, আবার কখনো তুমি পরাজিত আর তোমার শত্রু বিজয়ী হবে।

 

সুতরাং কখনো শয়তান যদি তোমাকে ফেলে দেয়, তাহলে সাহস হারাবে না, পড়ে থাকবে না। বরং পুনরায় নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াবে এবং শয়তানের মুকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। আল্লাহ পাক তোমার সঙ্গে এ ওয়াদা করেছেন যে, যদি তুমি হিম্মত না হারিয়ে পুনরায় শয়তানের মুকাবিলার জন্য দাঁড়িয়ে যাও এবং আল্লাহ পাকের কাছে সাহায্য চাও, তাহলে ইনশাআল্লাহ চূড়ান্ত বিজয় তোমারই হবে। আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছেন–

(আরবী……)

অর্থাৎ শেষ পরিণতি মুত্তাকিদের হাতে। বিজয় তোমারই হবে। আল্লাহ পাক অন্যত্র ইরশাদ করেন–

(আরবী……..)

অর্থাৎ যারা আমার রাস্তায় জেহাদ করল, অর্থাৎ নফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে এভাবে জেহাদে অবতীর্ণ হলে যে, শয়তান ধোঁকা দিয়ে তোমাকে ভুল পথে নিতে চাচ্ছে তাঁর সাথে তুমি মোকাবিলা করছ, চেষ্টা করে ভুল পথ থেকে বেঁচে থাকছ, তাহলে আমার ওয়াদা যে, আমি অবশ্য অবশ্যই শয়তানের সাথে মুকাবেলাকারী এবং প্রচেষ্টাকারীদেরকে আমার সন্তুষ্টির পথ দেখিয়ে দিব।

 

হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী (রহঃ) বলেন, আমি এই আয়াতের অর্থ এই করে থাকি যে, যে সকল লোক আমার সন্তুষ্টির পথে চলার জন্য চেষ্টা করে, আমি তাদের হাত ধরে নিজের রাস্তায় চালাই। অতঃপর তিনি একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে এই আয়াত সম্পর্কে বলেন যে, যখন বাচ্চা হাঁটতে শিখে, তখন বাবা-মার এই আকাঙ্ক্ষা হয় যে, বাচ্চা যেন নিজে নিজে হাঁটে, কাজেই তারা তাঁকে এভাবে হাঁটতে শিখায় যে, বাচ্চাকে সামান্য দূরে দাঁড় করে দিয়ে নিজে একটু সরে গিয়ে বাচ্চাকে নিজের কাছে ডাকে। বাচ্চা যদি অগ্রসর না হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে বাবা-মাও দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, তাঁকে কোলে তুলে নেয় না। কিন্তু যদি বাচ্চা এক কদম অগ্রসর হয়ে দ্বিতীয় কদমেই পড়ে যেতে থাকে, তাহলে বাবা-মা তাঁকে পড়তে দেয় না বরং নিজে অগ্রসর হয়ে তাঁকে ধরে ফেলে এবং কোলে তুলে নেয়। কারণ, বাচ্চা কদম বাড়িয়ে নিজ সামর্থ্য অনুসারে চেষ্টা করেছে। তদ্রূপ যখন মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির রাস্তায় চলবে, তখন কি আল্লাহ পাক তাঁকে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় একা ছেড়ে দিবেন? তাঁকে ধরবেন না? এরূপ করবেন না। বরং এ আয়াতে আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছেন যে, যখন তোমরা আমার সন্তুষ্টির রাস্তায় চলার চেষ্টা করবে, তখন আমি অগ্রসর হয়ে তোমাকে কোলে তুলে নিয়ে যাব। কাজেই হিম্মত করে অগ্রসর হয়ে তোমার সাধ্য মত তুমি চেষ্টা কর। নিরাশ হয়ে বসে থেকো না।

(আরবী………)

অর্থাৎ আল্লাহ পাকের দরবারে নৈরাশ্য বলে কিছু নেই, সবই আশার আলো। কারণ, অন্ধকার ঐ দরবারে প্রবেশ করতে পারে না। সুতরাং নফস ও শয়তানের সাথে মুকাবিলা করতে থাক। যদি ভুল হয়ে যায়, তাহলে আশার আঁচল ছেড়ে দিও না। নিরাশ হইও না। বরং প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখ, তাহলে ইনশাআল্লাহ একদিন তুমি অবশ্যই সফলকাম হবে।

 

মোটকথা এই যে, তুমি তোমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন কর, আল্লাহ তাঁর কাজ অবশ্যি করবেন। মনে রেখো! তোমার দায়িত্বে যে কাজ আছে, তাতে ক্রটি-বিচ্যুতি হতে পারে। আল্লাহ পাকের কাজে কোন প্রকার ক্রটি-বিচ্যুতি হবে না। কাজেই তুমি যখন কদম বাড়াবে, তখন ইনশাআল্লাহ তোমার রাস্তা খুলে যাবে।

হযরত উমর (রাযিঃ) এর হাদীছে এ দিকেই ইশারা করা হয়েছে–

(আরবী……….)

অর্থাৎ আখেরাতের হিসাবের পূর্বে নিজে নিজের হিসাব নাও।

 

আল্লাহ তাআলাকেও কি এ উত্তর দিবে?

আমাদের শ্রদ্বেয় মুরুব্বী হযরত আব্দুল হাই সাহেব (রহঃ) বলতেন, নিজে নিজের হিসাব নেওয়ার একটি পদ্ধতি এই যে, তুমি এই কল্পনা কর যে, আজ তুমি হাশরের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছ। তোমার হিসাব-কিতাব হচ্ছে। আমলনামা দেখানো হচ্ছে। তোমার আমলনামায় যে সকল অন্যায় কাজ লেখা আছে তা তোমার সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আল্লাহ তাআলা তোমাকে জিজ্ঞেস করছেন, তুমি এই অপকর্ম ও গোনাহের কাজ কেন করেছ? তোমার কি সে সময় আল্লাহ তাআলাকেও সেই একই উত্তর দিবে, যা আজ মৌলবীদেরকে দিয়ে থাক? আজকে যখন তোমাদেরকে কোন মাওলানা ছাহেব বা পীর সাহেব এ কথা বলেন যে, অমুক কাজ করো না। দৃষ্টির হেজাযত কর। সুদ খাওয়া থেকে বেঁচে থাক। গীবত ও মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাক। টেলিভিশনে পরিবেশিত অশ্লীল ও বেহায়াপনার প্রোগ্রাম দেখো না। বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানে পর্দাহীনতা থেকে বেঁচে থাক। তোমরা মাওলানা সাহেবদের এ কথার উত্তরে আজকাল বলে থাক যে, আমরা কি করব? যুগ এমন খারাপ হয়ে গেছে। সারা দুনিয়ার মানুষ উন্নতি করছে। মানুষ চাঁদে পৌঁছে গেছে। আমরা এই উন্নতির যুগেও তাদের চেয়ে পিছে পড়ে থাকব? দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে থাকব? আজকের এই সমাজে মানুষ এ সকল কাজ না করে বাঁচতে পারে না। এটা ঐ উত্তর যা আজ তোমরা মাওলানা সাহেবদেরকে দিয়ে থাক। আল্লাহ তাআলার নিকটও কি এই উত্তরই দিবে? এই উত্তর কি আল্লাহ পাকের নিকট যথার্থ হবে? নিজের বুকে হাত রেখে চিন্তা করে বল। এই উত্তর যদি আখেরাতে আল্লাহ তাআলার নিকট না চলে, তাহলে আজ দুনিয়াতেও এটা যথেষ্ট নয়।

 

সাহস ও উদ্দীপনা আল্লাহপাকের নিকটই চাও

 

যদি তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট এই উত্তর দাও যে, ইয়া আল্লাহ! সমাজ ও পরিবেশের কারনে আমি গোনাহর কাজ করতে বাধ্য হয়েছি। তাহলে আল্লাহ তাআলা একথা জিজ্ঞেস করবেন, আচ্ছা বল তো, তুমি অক্ষম ছিলে না আমি অক্ষম ছিলাম? তোমরা এই উত্তরই দিবে যে, ইয়া আল্লাহ! আমিই অক্ষম ছিলাম। আপনি অক্ষম ছিলেন না। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি যখন অক্ষম ছিলাম না, তুমি তাহলে নিজ অক্ষমতা দূর করার জন্য আমার নিকট দু’আ করলে না কেন? আমার কি তোমার ঐ অক্ষমতাকে দূর করার ক্ষমতা ছিল না? আমার যদি ক্ষমতা থেকে থাকে, তাহলে আমার নিকট সাহায্য চাইতে এবং বলতে ইয়া আল্লাহ! আমার সামনে এই বিপদ (গোনাহর কাজ) এসেছে। হয় আপনি আমাকে বিপদ (গোনাহ) থেকে রক্ষা করুন, না হয় আমাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না। এবং আমাকে এ (গোনাহর) জন্য শাস্তি দিবেন না।

 

এখন বল, আল্লাহ পাক যদি উপরোক্ত প্রশ্ন করেন, তাহলে এ প্রশ্নের কোন উত্তর তোমাদের নিকট আছে কি? যদি এর কোন উত্তর তোমাদের নিকট না থাকে, তাহলে আজ জীবন থাকতেই নিম্মোক্ত কাজগুলো করে নাও। আর তা এই যে, যে সকল কাজের ক্ষেত্রে তুমি নিজকে অক্ষম মনে কর, চাই না (ত্যাগ করা) অসম্ভব হোক। উভয় প্রকারের জন্য প্রতিদিন আল্লাহ পাকের নিকট এই বলে দু’আ করবে–

ইয়া আল্লাহ! এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, যার দরুন আমি নিজে এ (গোনাহ) থেকে বিরত থাকার সাহস পাচ্ছি না, হিম্মত হচ্ছে না। আপনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, আমার এই সমস্যাকেও দূর করে দিতে পারেন। এবং আমার এই সাহসহীনতাও (ভীরুতা) দূর করতে পারেন। আমার এই বিপদকে (সমস্যা) দূর করে দিন এবং আমাকে এই গোনাহ থেকে বিরত থাকার উদ্দীপনা ও সাহস দান করুন।

 

তাঁর দয়ার কোন সীমা নেই

মোটকথা, আল্লাহ পাকের নিকট চাইতে হবে। অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথা বলা যায় যে, যখন কোন বান্দা আল্লাহ তাআলার নিকট এভাবে দু’আ করে তখন অবশ্যই আল্লাহ পাক তাঁর দু’আ কবুল করেন। কেউ যদি দু’আই না করে, তাহলে তাঁর সমস্যার কোন সমাধান নেই। আমাদের মুরুব্বী হযরত ডাঃ আব্দুল হাই সাহেব (রহঃ) এ কবিতা পাঠ করতেন–

(উর্দু)

অর্থাৎ সৌন্দর্য অবলোকন করার মত দৃষ্টিই যদি না থাকে তবে তাঁর কি ব্যবস্থা হতে পারে? তাঁর দয়ার তো কোন সীমা নেই।

সুতরাং যদি দু’আই না করা হয়, তাহলে তাঁর কোন সমাধান নেই। আল্লাহ পাকের দয়ার ভান্ডার তো অনেক প্রশস্ত, সব সময় খোলা। আজ আমরা সকালে ও রাতে যে চারটি কাজ করার (ব্যবস্থাপত্রের) কথা আলোচনা করলাম, যদি আমরা সেমতে আমল করতে শুরু করি, তবে ঐ উপদেশের উপর আমলকারী সাব্যস্থ হব। আক্কাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মাফ করুন এবং উপরোক্ত বয়ান অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

মূলঃ শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী।

জগদ্বিখ্যাত আলেমে দ্বীন, দাঈ, বহু কালজয়ী গ্রন্থের রচয়ীতা

ভাইস প্রেসিডেন্টঃ ইসলামী ফিকহ একাডেমী, জেদ্দা, সৌদী আরব

শাইখুল হাদীস ও নায়েবে মুসতামিমঃ দারূল উলূম, করাচী।

অনুবাদ

মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান খান।

দাওরা ও ইফতাঃ জামি’আ ফারুকিয়া, করাচী।

দুনিয়ার ওপারে বই থেকে নেওয়া।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE