Breaking News
Home / বই থেকে / সাতাশ (ব্যথিত হৃদয়)

সাতাশ (ব্যথিত হৃদয়)

শাকিল এখন প্রায়ই ঢাকা আসে। যখনই তাঁর মনটা ভাল থাকে না তখনই সে দু’একদিনের জন্য সাকিবের কাছে চলে আসে। এতে সাকিব দারুণ খুশি হয়। বন্ধুর জন্য নানবিধ আদর আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে। সেদিন দু’ বন্ধুর মধ্যে আলাপ-আলোচনা বেশ জমে ওঠেছিল। কথার ফাঁকে এক সময় শাকিল বলে ওঠে–

সাকিব! তোমার কি একটা কথা মনে আছে?

কোন কথা?

ঐ যে দীর্ঘদিন পর তোমার সাথে যখন কুমিল্লায় দেখা হয়েছিল এবং আমি তোমাকে আমার জীবন কাহিনী শুনিয়েছিলাম, তখন তুমি বলেছিলে যে আমারও এ ধরণের একটি ঘটনা জানা আছে। সময় হলে একদিন তোমাকে বলব।

হ্যাঁ হ্যাঁ স্মরণ আছে। তা এখনই শুনতে চাও নাকি সেই ঘটনা?

হ্যাঁ, এখনই শুনতে চাই। সত্যি কথা কি জানো?

কী?

আমি এবার তোমার কছে এ উদ্দেশ্যেই এসেছি যে, তোমার মুখ থেকে ঘটনটি শুনব। তারপর……….।

বলো। থেমে গেল কেন?
তারপর তোমাকে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দেব।

সেটা বার কোন কথা?

আচ্ছা সেকথাটা পরে বলছি। আগে কাহিনী শুনাও। আমার আর ধৈর্য কুলাচ্ছে না।

‘ঠিক আছে শোনো তাহলে’ বলে সাকিব তাঁর জানা একটি সত্য ঘটনা বলতে শুরু করল–

সুনামগঞ্জ সদর থানাধীন উলুতুলু একটি গ্রাম। জাহানারা এ গ্রামেরই মেয়ে। দেখতে তেমন একটা সুন্দর না হলেও শারীরিক গঠন বেশ চমৎকার। তাঁর পিতার নাম মজুমদার আলী। আর্থিক অবস্থা মোটামুটি ভাল। প্রাইমারী পাহসের পর মজুমদার সাহেব মেয়ে জাহানারাকে পার্শ্ববর্তী গ্রামের একটি নামকরা হাইস্কুলে ভর্তি করি দেন।

জাহানারা স্কুলে ভর্তি হওয়ার ঠিক দু’বছরের মাথায় মজুমদার সাহেব ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের পূর্বে তিনি বাড়ির সবাই কে ডেকে বলেন–জাহানারাকে বি, এ পাশ করানো আমার জীবনের একটি বিরাট সেপ্ন ছিল। কিন্তু আমি তো আর সময় পেলাম না। আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো তোমাদের থেকে চিরতরে বিদায় নেব। তবে যাওয়ার বেলায় তোমাদের কাছে আমার একটি মাত্র অনুরোধ থাকবে। তা হলো, আমার কলিজার টুকরা জাহানারাকে তোমরা যেভাবেই হোক বি, এ পর্যন্ত পড়াশুনা করার সু-যোগ করে দি—।

মজুমদার সাহেব আর বলতে পারলেন না। তাঁর মাথাটা একদিকে কাত হয়ে পড়ল। যাত্রা শুরু হলো অনন্তের পথে।

জাহানারা তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। লেখাপড়ায় বেশ ভালো। নিয়মিত স্কুলে যায়। পিতার মৃত্যুতে সে একদম ভেঙ্গে পড়ে। কয়েকদিন স্কুলে যেতে পারে নি।

জাহানারার আর কোনো ভাই বোন নেই। সে একা। একাই স্কুলে যায়। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। কাঁচা ও ভাঙ্গাচোরা রাস্তা হওয়ায় দুই কিলোমিটার। কাঁচা ও ভাঙ্গাচোরা রাস্তা হওয়ায় সেপথে কোনো যানবাহন চলাচল করে না। সেজন্য জাহানারাকে প্রতিদিন হেঁটেই স্কুলে আসা যাওয়া করতে হয়।

পিতার মৃত্যুর পর জাহানারার মনে কেমন একটু ভয় ঢুকে যায়। নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। এজন্য প্রায়ই সে স্কুল কামায় করে। আগের মতো নিয়মিত সে স্কুলে যায়।

মহিবুল্লাহ জাহানারার সাথে একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। সেও বেশ ভালো ছাত্র। ক্লাসের প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানটি কয়েক বছর যাবত তাদেরই দখলে। পরীক্ষায় জাহানারা ফার্স্ট হলে মুহিবুল্লাহ দ্বিতীয় হয়। আর জাহানারা দ্বিতীয় হলে মুহিব্বুল্লাহ ফার্স্ট হয়।

জাহানারা এখন বড় হয়েছে। পুরুষদের চোখে পড়ার মতো বয়সে উপনীত হয়েছে। এতদিন মুহিব্বুল্লাহর সাথে জাহানারার তেমন একটা কথা হতো না। জাহানারা নিজেও মুহিব্বুল্লাহসহ সকল ছেলেদেরকে এড়িয়ে চলত। প্রয়োজনের বেশি একটা কথাও সে বলত না। তাই সবাই তাকে ভয় পেত। অকারণে কথা বলার বা হাসি তামাশা করার সাহস পেত না।

জাহানারা কোনো ছেলেকে পাত্তা দিত না ঠিকই, কিন্তু তাকে নিয়ে চিন্তা করতে মুহিব্বুল্লাহর বেশ ভালো লাগত। তাঁর কথা মনে হতেই হৃদয়টা আনন্দে নেচে ওঠত। তবে আজও সে ভাল লাগার কথাটি জাহানারাকে বলতে পারে নি। বলার সাহসও হয় নি। সে বরাবরই চাইত, জাহানার আর সে একত্রে স্কুলে আসা যাওয়া করবে। গল্প করতে করতে পথ চলবে, হাসি-মজাক করবে ইত্যাদি। কিন্তু জাহানারার এক রোখা মেজাজের কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। মুহিব্বুল্লাহ তাঁর সাথে একত্রে আসা যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে। জাহানারার অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তঁর সাথে পথ চলতে চেয়েছে। কিন্তু জাহানারা তা বুঝতে পেরে কৌশলে তাকে এড়িয়ে গেছে। কোনোদিন তাকে সাথে নেয় নি। মুহিব্বুল্লাহ তাঁর পিছনে পিছনে হাঁটলেও পথে তাঁর সাথে একটি কথাও বলে নি।

মুহিব্বুল্লাহ হাল ছাড়ার পাত্র নয়। সে সুযোগের অপেক্ষায় থকে। একদিন সে সুযোগ পেয়েও যায়। সে যখন জানতে পারল, ভয়জনিত কারণে জাহানারা নিয়মিত স্কুলে আসে না, তখন সে জাহানারার কাছে গিয়ে বলল, জাহানারা! আমি শুনেছি তুমি নাকি ভয়ের কারণে প্রতিদিন স্কুলে আসতে পারো না? কথাটি কি ঠিক?

হ্যাঁ তুমি ঠিকই শুনেছ। আব্বা মারা যাওয়ার পর আমার মনে একটা ভয় ঢুকে গেছে। শত চেষ্টা করেও তা বের করতে পারছি না। আশেপাশে কোনো মেয়েও নেই যে, তাঁর সাথে স্কুলে আসা যাওয়া করব।

মুহিবুল্লাহ এবার সুযোগ পেয়ে যায়। সে বলে, মেয়ের কি দরকার? আমরা তো একই গ্রামের লোক। তুমি ইচ্ছা করলে আমার সাথেই আসা যাওয়া করতে পারো। আমি তোমার সাথে থাকলে এমন কোনো বাপের বেটা নেই যে, তোমার দিকে চোখ তুলে তাকাবে । তুমি যদি আমার প্রস্তাবে রাযী থাকো, তাহলে আগামীকাল থেকেই শুরু করতে পারো। আমি তোমার অপেক্ষায় রেডি হয়ে বসে থাকব। তুমি এলেই এক সাথে স্কুলে চলে যাব ।

এত দিন জাহানারা মুহিব্বুল্লাহকে উপেক্ষা করলেও আজ আর পারে নি। তাই সে মুহিব্বুল্লাহর প্রস্তাবে রাযী হয়ে যায়। বলে, ঠিক আছে, তাই হবে।

পরদিন থেকেই শুরু হয় দুজনের একত্রে যাতায়াত। প্রথম প্রথম অপ্রয়োজনীয় কোনো কতজাই হতো না দু জনের মাঝে। কিন্তু দিন যতই যায় ততই কথাবার্তার পরিমাণ চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়তে থাকে। এভাবে বাড়তে বাড়তে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, এখন আর প্রয়োজন অপ্রয়োজনের বালাই নেই। যখন যার মনে যা আসছে তাই অবলীলায় বলে চলছে। কেউ কিছু মনে করছে না। এমনকি এক পর্যায়ে তাদের মাঝে হাসি মজাকও শুরু হয়। এতে উভয়ই তৃপ্তিবোধ করে। আনন্দে নেচে ওঠে হৃদয়-মন।

দিন যায়, মাস যায়, বছর পেরিয়ে নতুন বছর শুরু হয়। সময়ের তালে তালে তাদের সম্পর্কেও জটিল আকার ধারণ করে। এখন তাঁর তাদের সম্পর্ক কথাবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একে অপরের বাড়িতে যাওয়া, নির্জনে দেখা–সাক্ষাৎ করা, চিঠি–পত্র বিনিময় করা ইত্যাদি সব কিছুই এখন অবলীলায় চলছে।

গ্রামের লোকদের কাছে তাদের আচরগুলো প্রাথমিক অবস্থায় একটি সহনীয় পর্যায়ে ছিল। তারা মনে করত ওরা একই সাথে একই স্কুলে পড়ে। সুতরাং পড়াসংক্রান্ত নানাবিধ প্রয়োজনে একজন আরেকজনের বাড়িতে যেতেই পারে। দেখা সাক্ষাৎ করতেই পারে। কিন্তু পর্যায়ক্রমে তাদ্রে আচরগুলো যখন গ্রামের লোকদের দৃষ্টিতে সহনীয় পর্যায় অতিক্রম করল, তখন এ নিয়ে তাদের মাঝে কানাঘুষা শুরু হয়। এমনকি কয়েকজন সচেতন গ্রামবাসী একরামুল হকের কাছেও কথাটি জানিয়ে দেয়।

মুহিব্বুল্লাহরা মোট দুই ভাই। সে ছোট, একরামুল হক বড়। ওদের পিতার নাম মুদাব্বির হোসেন। বার্ধক্য এসে যাওয়ায় সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব গত কয়েক বছর আগে একরামুলের হাতেই অর্পণ করেছেন তিনি। সুতরাং একরামই এখন সংসার চালায়, সবদিক দেখাশুনা করে।

জাহানারার সাথে মুহিব্বুল্লাহর সীমাতিরিক্ত মাখামাখি একরামের চোখে যে পড়ে নি তা নয়। কিন্তু লজ্জার কারণে সে তাঁর ছোট ভাইকে কিছুই বলে নি। বলতে পারে নি। কিন্তু এখন যেহেতু ব্যাপারটি সবার চোখের পড়ে গেছে; হাটে- ঘাটে, বাজারে-বন্দরে এ নিয়ে কথা হচ্ছে, কয়েকজন তাকে সতর্কও করেছে, সর্বত্র বয়ে যাচ্ছে সমালোচনার ঝড়, তখন আর একরাম বসে থাকতে পারে নি। সে ব্যাপারটি নিয়ে দারুণ চিন্তিত হয়। মনে হয়, তাঁর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। এমতাবস্থায় কী করবে সে কিছুই বুঝে ওঠতে পারছে না।

একরাম বড় হলেও এখনো সে বিয়ে করে নি। ভাবে সে, আমি যদি এখন বিয়ে করতে যাই, তাতে সময় অনেক ফুরিয়ে যাবে এবং এরই মধ্যে হয়তো কোনো অঘটন ঘটে যাবে। তাই সে নিজের বিয়ের ভিন্তা মাথা থেকে একদম ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মুহিব্বুল্লাহর বিয়ের জন্য ওঠে পড়ে লেগে যায়।

একরামকে খুব বেশি কষ্ট করতে হয় নি। মাস খানেকের মধ্যেই সে মুহিব্বুল্লাহর জন্য ভাল একজন পাত্রি খুঁজে পায়। শুধু তাই নয়, উভয় পক্ষের আলোচনা শেষে বিয়ের দিন তারিখও নির্ধারিত হয়ে যায়।

শুক্রবার। ১৭ নভেম্বর ২০০৬। আজই মুহিব্বুল্লাহর বিয়ে। আত্মীয়-স্বজন প্রায় সবাই এসে গেছে। কনের বাড়িতে গিয়ে জুমুআ পড়ার কথা। বরযাত্রীরা প্রস্তুত হচ্ছে। গাড়িও উপস্থিত। রং-বে রংয়ের ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে বরের গাড়িটি।

মুহুব্বুল্লাহ ও বিয়েতে রাযী ছিল না। কিন্তু মুরব্বীদের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সে রাযী হয়। এখন সে দুলহার সাজে সজ্জিত। সবাইকেবাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য একরাম বারবার তাগাদা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে কেউ কেউ বেরও হয়ে গেছে। খানিক বাদেই কনের বাড়ির উদ্দেশে সবাই একত্রে বরযাত্রা শুরু করবে।

এরই মধ্যে ঘটে যায় একটু বিস্ময়কর ঘটনা। জাহানারা দৌড়ে এসে একরামের সামনে উপস্থিত হয়।

এ মুহূর্তে জাহানারাকে দেখে একরাম ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলে সে। তাকে কী বলবে, কী বলা উচিত৫ কিছুই সে ঠিক করতে পারছে না। তাছাড়া তাকে কোনো কথা বলার সুযোগেও দেয় নি জাহানারা। সে তাঁর সামনে মৃত্যুদূতের মতো ঝড়ের বেগে হাজির হয়েই চরম ক্ষোভ নিয়ে বলতে থাকে–

“মুহিবুল কোথায়? আজ নাকি ওর বিয়ে! আমি কিছুতেই এ বিয়ে হতে দিব না। আজ তিন বছর যাবত সে আমাকে বয়ে করবে বলে কথা দিয়ে আসছে, সে আমাকে বারবার বলেছে, আমাকে ছাড়া আর কাউকে সে বিবাহ করবে না। আমাকে আশ্বাস দিয়ে, আমার সবকিছু শেষ করে সে আজ অন্যত্র বিবাহ করতে রওয়ানা দিচ্ছে? কোথায় সে? আমি একবার তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই”। কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে শেষ করে জাহানারা।

শাকিলকে ঘটনাটা এতটুকু শুনানোর পর খালেদার স্বামী সোহেল এসে সেখানে উপস্থিত হয়। তাকে দেখেই সাকিব একটু এগিয়ে এসে হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসে। ঘরে ঢুকে শাকিলের উপর চোখ পড়তেই তাকে জড়িয়ে ধরে সোহেল বলতে থাকে–আরে! আপনি এখানে? ভাইয়ার রিচার্স সেন্টারে সেই যে একবার আপনার সাথে দেখা হলো, আর দেখা হওয়ার কোনো নাম গন্ধ নেই। ভেবেছিলাম, আপনি খালেদার বিয়েতে আসবেন। কিন্তু সাকিব ভাইয়ার কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম আপনি নাকি অসুস্থ। তাই আসতে পারবেন না। যা হোক অনেক দিন পর আপনাকে পেয় খুব খুশি লাগছে।

শাকিল বলল, আমিও আপনাকে পেয়ে বেশ আনন্দিত হয়েছি।

আপনারা বোধ হয় কোনো জরুরী কথা আলোচনা করছিলেন। আমি তাহলে বাইরে একটু ঘুরে আসি। সোহেল বলল।

না, না, জরুরী কনো কথা নয়। দীর্ঘদিন পূর্বে সাকিব ভাই আমাকে একটি ঘটনা শুনাবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। আজ তাকে সেকথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম।

তাহলে সেই ঘটনাই এখন হচ্ছিল?

হ্যাঁ।

আমি কি শুনতে পারব সেই ঘটনা?

অবশ্যই শুনতে পারবেন। তবে ঘটনার যে অংশটুকু বলা হয়ে গেছে তাঁর কী হবে?

সেটুকু আমি আপনার কাছে থেকে পরে শুনে নেব। এখন সামনে চলা যাক। এতক্ষণ সাকিব সোহেল ও শাকিলের কথোপকথন শুনছিল। তাদের কথা শেষ হলে সে আবার বলতে লাগল–

জাহানারার কথায় একরাম কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর সে কঠিন কণ্ঠে বলল, এমন পাগলামী শুরু করেচ কেন? এখন বরযাত্রী রওয়ানা দিচ্ছে। কিছু বলার থাকলে পরে এসে বলো।

পাগলামী করছি মানে? আমি আর আপনার সাথে একটি কথাও বলতে চাই না। যা বলার মহিব্বুল্লাহর কাছেই বলব। আমি তাকে শুধু একটি কথাই জিজ্ঞেস করব যে, অন্যত্র বিবাহ করার ইচ্ছাই যদি তাঁর থাকে তাহলে সে আমার সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছিল কেন? কেন সে আমার জীবনটাকে নষ্ট করল? কী অপরাধ করেছি আমি?

এতক্ষণে আত্মীয়-স্বজন সবাই জড়ো হয়ে গেছে। এমন একটা পরিস্থিতির জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। কেউ কল্পনাও করতে পারে নি যে, আজকের এই শুভ দিনে তাদেরেকে এরূপ একটা কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।

জাহানারাকে অনেক বুঝাল। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। কারো কথাই সে কানে নেয় নি। সে পরিস্কার ভাষায় বলে দিয়েছে, আমার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই আপনারা যা করার করবেন। তাতে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না।

জাহানারাকে ফিরিয়ে দিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত একরাম একথা বলতে বাধ্য হলো যে, আচ্ছা ঠিক আছে। জুমুআর পর এলাকার মুরব্বীদের নিয়ে আলোচনা করে এর একটা সমাধানে যাব।

যাওয়ার পথে এই যে বাধা পড়ল, সেই বাধা আর দূর হলো না। যাওয়া হলো না কনের বাড়িতে। আনন্দের দিনে এক ঝাপটা কালো মেঘ এসে সবার সুখ-স্বপ্নকে ধূলির সাথে মিশিয়ে দিয়ে গেল। আলোকোজ্জ্বল চেহারাগুলো হয়ে গেল বিবর্ণ–ফ্যাকাশে।

এদিকে কনের বাড়ির লোকজন যখন এ সংবাদ শুনল তখন তারাও বেঁকে বসল। তারা বলল, এমন ছেলের কাছে আমরা আমদের মেয়ে দেব না। তবে ইজ্জত রক্ষার্থে ঐদিনই তারা অন্যত্র বিবাহ ঠিক করে মেয়েকে নতুন বরের হাতে উঠিয়ে দিল।

জুমআর পর গোটা বাড়ি লোকে লোকারণ্য। তিল ধারণের জায়গাও বাকি নেই। জাহানারা প্রখর রৌদ্রে বসে আছে। ঘরে গিয়ে বসার জন্য তাকে বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু সে কারো কথা শুনে নি। সে বলছে, আমার ব্যাপারটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে আমি এখান থেকে এক পা-ও নড়ব না। মুহিব্বুল্লাহকে পাওয়ার আশায় কোনো কষ্টই যেন অনুভব হচ্ছে না তাঁর।

গ্রামের মুরব্বীগণ ইতোমধ্যেই নিজ নিজ আসন গ্রহণ করেছেন। তারা জাহানারাকে তাঁর বক্তব্য পেশ করা জন্য বললে সে সব কিছু সবিস্তারে খুলে বলল।

এবার মুহিব্বুল্লাহ পালা। মুরব্বীরা তাঁর দিকে মনোযোগী হলেন। জাহানারার দেওয়া বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তাঁর কোনো কথা আছে কিন জানতে চাইলেন।

মুহুব্বুল্লাহ চাপের মুখে সবকিছু অস্বীকার করে বসল। শুধু এতটুকু বলল, গ্রামের মেয়ে হিসেবে এবং আমরা একসাথে পড়াশুনা করি বিধায় তাকে যতটুকু চিনা দরকার ততটুকু চিনি। এর বাইরে তাঁর সাথে আমার কোনো ধরনের সম্পর্ক আগেও ছিল না, এখনও নেই।

মুরব্বীগণ পুনরায় জাহানারার দিকে মনোনিবেশ করলেন। তারা বললেন, তোমার বক্তব্যের স্বপক্ষে তোমার হাতে কোনো প্রমাণ আছে কী?

জাহানারা বলল, হ্যাঁ আছে। আমি যে খাটে ঘুমাই, ঐ খাটেই আমার একমাত্র প্রমাণ।

অর্থাৎ?

অর্থাৎ এই তিন বছরে সে আমার কাছে যতগুলো চিঠি দিয়েছে সবগুলো ঐ খাটের বিছানার নীচে আজও সংরক্ষিত আছে।

সঙ্গে সঙ্গে জাহানারাদের বাড়িতে দুজন লোক পাঠানো হলো। কিছুক্ষণ পর লোক দুজন সত্যি সত্যি অসংখ্য চিঠি নিয়ে ফিরে এল। চিঠিগুলো যে মুহিব্বুল্লাহর হাতে লেখা তাতে কোনো সন্দেহ রইল না। কারণ প্রতিটি চিঠির নীচেই তাঁর নাম লিখা আছে। তাছাড়া তাঁর হাতের লেখাও অনেকেই চিনে।

কয়েকটি চিঠি মজলিশে পাঠ করা হলো। এতে বিচারের আসনে সমাসীন বিজ্ঞ মুরব্বীগণ পরিস্কার বুঝতে পারলেন যে, ওদের দুজনের মধ্যে আসলেই গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। তাই শেষ পর্যন্ত তারা ফায়সালা দিলেন যে, মুহিব্বুল্লাহ যেহেতু জাহানারার জীবন নষ্ট করেছে, বিয়ে করার প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর সবকিছু ছিনিয়ে নিয়েছে, সুতরাং মুহিব্বুল্লাহ এখন জাহানারাকেই বিয়ে করবে। তাকেই গ্রহণ করবে জীবনসঙ্গীনি হিসেবে।

মুহিব্বুল্লাহর পরিবার এ ফায়সালা মেনে নিল না। কিন্তু মেনে না নিলে কি হবে? গোটা গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে কি একা অবস্থান নিয়ে টিকে থাকা যায়? সুতরাং শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই ফয়সালা মেনে নিতে হলো। তবে একরাম বলল, আমাদের কে দু’দিনের সময় দিন। এর মধ্যে আমরা জাহানারার সাথে মুহিব্বুল্লাহর বিবাহের কাজ সমাধা করব।

বৈঠক শেষ হওয়ার পরও জাহানারা তাঁর নিজ বাড়িতে যায় নি। মুহিবুলদের বাড়িতেই অবস্থান করছে। উভয়ের জন্য শক্ত পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাতে কেউই কোনো অঘটন ঘটাতে না পারে।

আজ দুদিন শেষ হতে চলেছে। কিন্তু এখনো বিয়ের কোনো ব্যবস্থা করা হয় নি। আগামী কালই বিচারকদের কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে। একরাম আজ দারুণ চিন্তিত। যদি আজ বিয়ে না হয়, তাহলে আগামীকাল কী জবাব দিবে সে! এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে একরাম তাঁর মায়ের কাছে যায়। অবশেষে সবদিক চিন্তা করে আজ রাতেই বিয়ের কাজ সমাধা করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

মুহিব্বুল্লাহ রাত ন’টার মধ্যেই খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন রাত দশটা। বাড়ির সবাই নিশ্চিন্ত যে, মুহিব্বুল্কলাহ তাঁর বিছানায় শুয়ে আছে। একরাম বিয়ে পড়ানো জন্য কাজী সাহেবকে নিয়ে আসে। তাপর মুহিব্বুল্লাহকে ডেকে আনার উদ্দেশ্যে তাঁর ঘরের দিকে পা বাড়ায়। একরাম মুহিব্বুল্লাহর ঘরে গিয়ে দরজা খোলা পেল। বিছানা খালি। সারা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজল সে। ছোট ভাইয়ের নাম নিয়ে বারবার দাকল। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। এ ঘটনায় গোটা বাড়িতে হৈ চৈ পড়ে গেল।

চাঁদনী রাত। জোৎস্নার আলোতে চারিদিক ফক ফক করছে। একরাম তাঁর আত্মীয়-স্বজন সহ সবাইকে নিয়ে মুহিব্বুল্লাহকে খোঁজার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেল। সম্ভাব্য সব জায়গায় তাকে খোঁজা হলো। কিন্মতি কোথাও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

এখন রাত প্রায় আড়াইটা। সবাই উদ্বিগ্ন। ভীষণ রকমের চিন্তিত। এমন সময় একজন ‘পেয়ে গেছি, পেয়ে গেছি’ বলে চিৎকার করে ওঠল। সেই সাথে বলল, এই তো মুহিবুল কে গাছের ডালে ঝুলন্ত দেখা যাচ্ছে। তাঁর কথা শুনে সবাই দৌড়ে গেল নদীর ধারের সেই বৃক্ষটির দিকে।

এতক্ষণ জাহানারা কড়া প্রহরায় বেষ্টিত ছিল। কিন্তু মুহিবুলের দুঃসংবাদ শুনে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। হন্তদন্ত হয়ে ছূটে গেল মুহিবুলকে দেখার জন্য। ফলে একমাত্র একজন বৃদ্ধা ছাড়া জাহানারার কাছে তখন আর কেউ রইল না।

মুহিব্বুল্লাহর আত্মহত্যা করার সসংবাদ শুনতে পেয়ে জাহানারা মনে মনে ভাবল, যার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিলাম, ইজ্জত সম্মান নষ্ট করলাম, সে-ই যখন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, তখন আমার আর এ জীবন রেখে লাভ নেই। বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। মুহিবুল ছাড়া অন্য কারো শয্যাশায়িনী হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ সে তো আমার সবকিছু.. .. ..।

জাহানারা আর ভাবতে পারে না। সে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। বৃদ্ধা তাকে আটকে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেন নি। তাই অন্যরা এসে কী বলবে এই ভয়ে তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পর কয়েকজন মহিলা ফিরে এল। তারা বৃদ্ধা মহিলাকে জাদতে দেখে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করল। বৃদ্ধা জবাবে বললেন, তোমরা চলে যাওয়ার একটু পরেই জাহানারা চলে গেছে। আমি তাকে বহু চেষ্টা করেও রুখতে পারি নি। ঘর থেকে বের হয়ে কোন দিকে গেল তাও আন্দাজ করতে পারি নি।

এবার শুরু হলো আরেক হৈ চৈ। একরাম পাগলের মতো হয়ে গেল। তাঁর পায়ের নীচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। একদিকে সে ভাইকে হারাল। আবার এদিকে এ কালনাগিনোও চলে গেল। তবে বেশিক্ষণ ভাবার সময় নেই তাঁর। সে সবাইকে নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ল জাহানারার সন্ধানে।

একরাম প্রথমে জাহানারাদের বাড়িতে গেল। সে বাড়ির ভিতর ঢুকতে চাইলে জাহানারার মা তাকে বাধা দিল। বলল, তোমরা আমার মেয়েকে হত্যা করে তা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এখানে তাকে খুঁজতে এসেছ?

একরাম বাধা উপেক্ষা করে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। সমস্ত বাড়ি খুঁজে দেখল। জাহানারাকে কোথাও খুঁজে পেল না।

এবার একরামের সর্বাঙ্গ কাঁপতে লাগল। চিন্তার অথৈই সাগরে হারিয়ে গেল সে । সবাইকে বলল, তোমরা গোটা গ্রামের প্রতিটি বৃক্ষ তন্ন তন্ন কুরে খুঁজে দেখ।

সবাই খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না । এভাবে অনেকক্ষণ খোঁজার পর একজন একরামের কানের কাছে এসে বলল, একরাম ভাই! ওই যে ওখানের ভাঙ্গা কবরটার উপর মানুষের মত কি যেন একটা দেখা যায়। চলুন না সেখানে গিয়ে দেখি আসলে ব্যাপারটা কি।

একরাম সেদিকে পা চালাল। উপস্থিত সবাই তাঁর অনুসরণ করল। সেখানে গিয়ে তারা দেখল, জাহানারা তাঁর গলায় উড়না পেঁচিয়ে কবরের পাশে একটি ছোট গাছের ডালে ঝুলে আছে।

জাহানারা যেখানে আত্মহত্যা করেছিল তাঁর অদূরেই ছিল মুহিব্বুল্লাহর আত্মহত্যার স্থানটি। যদি রাতের অন্ধকার না থাকত তাহলে একে অপরকে স্পষ্ট দেখতে পেত। ভাবখানা এমন, মুহিব্বুল্লাহ যেন জাহানারার দিকে চেয়ে আছে, আর জাহানারা যেন চেয়ে আছে মুহিব্বুল্লাহর দিকে।

শাকিল! এভাবেই এক রাত ঝরে দু টি তরতাজা প্রাণ। যাওয়ার বেলায় তারা যেন সবাইকে এ শিক্ষাই দিয়ে গেল–হে জগতের যুবক-যুবতীরা! আমাদের মতো অবৈধ প্রেমে মত্ত হয়ে তোমরা তোমাদের মূল্যবান জীবন নষ্ট করো না।

সাকিবের বলা কাহিনী শুনে শাকিল ও সোহেল উভয়ে নির্বাক, বিমুঢ় ও বিহ্বল। আঁখিগুলো অশ্রু ছল ছল করছে। কান্নার একটা ঝড় তাদের মরুতে তাণ্ডব তুলে বারবার ঠোঁটগুলোকে কাঁপিয়ে তুলছে।-আরো পড়ুন

আপনি পড়ছেনঃ ব্যথিত হৃদয় (ইসলামীক উপন্যাস)

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE