Breaking News
Home / বই থেকে / হযরত খাওলা বিনতে ছা’লাবা (রাঃ)

হযরত খাওলা বিনতে ছা’লাবা (রাঃ)

আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—

قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ

 

الَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنكُم مِّن نِّسَائِهِم مَّا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ إِلَّا اللَّائِي وَلَدْنَهُمْ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُورًا وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورٌ

وَالَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِن نِّسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مِّن قَبْلِ أَن يَتَمَاسَّا ذَلِكُمْ تُوعَظُونَ بِهِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِن قَبْلِ أَن يَتَمَاسَّا فَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا ذَلِكَ لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ أَلِيمٌ

 হে রাসূল ! যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং অভিযোগ পেশ করছে আল্লাহর দরবারে, আল্লাহ তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন, সবকিছু দেখেন।

তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীগণকে মাতা বলে ফেলে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা কেবল তারাই, যারা তাদেরকে জন্মদান করেছে। তারা তো অসমীচীন ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয় আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল।

যারা তাদের স্ত্রীগণকে মাতা বলে ফেলে, অতঃপর নিজেদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তাদের কাফফারা এই একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাসকে মুক্তি দিবে। এটা তোমাদের জন্যে উপদেশ হবে। আল্লাহ খবর রাখেন তোমরা যা কর।

যার এ সামর্থ্য নেই, সে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখবে। যে এতেও অক্ষম হয় সে ষাট জন মিসকীনকে আহার করাবে। এটা এজন্যে, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি। আর কাফেরদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণা দায়ক আযাব।–সূরা—মুজাদালহঃ আয়াত ১-৪।

h83হে মহিয়সী নারী! শত মোবারকবাদ আপনাকে। অনন্ত গর্বের মহা মর্যাদা ছুঁয়ে গেছে তোমায়। তোমার প্রভু তোমার কথা শুনেছেন। তোমার ফরিয়াদ কবুল করেছেন। তাঁর মহাগ্রন্থ আল কুরআনে চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন। সব গোপন তাঁর কাছে প্রকাশ্যমান। সব অদৃশ্য তাঁর কাছে দৃশ্যমান।

মদীনা মুনাওয়ারায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় তাঁর গৃহটি ছিল সব দুর্দশাগ্রস্থ ও অসহায়দের আশ্রয়স্থল। সকল যাত্রাকারী ও জ্ঞান পিপাসুদের জন্য তাঁর বসত বাড়িটি ছিল অবিরাম বয়ে চলা এক অনিঃশেষ ঝরণা ধারা। যারা নবীগৃহকে নিজেদের দুঃখ উপশমের অব্যর্থ মহৌষধ মনে করতেন তাদেরই একজন হলেন আনসারী নারী খাওলা বিনতে সালাবা (রাঃ)। সামনের লাইনগুলোতে তাঁর কিছু কথাই আমরা তুলে ধরব।

শুরুতেই ইসলাম গ্রহণকারী এবং ইসলামের সাথে গভীর হৃদ্যতা পোষণকারী এক সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান আউস বিন সামেত (রা) এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। সে সময় তিনি অনিন্দ্র্য সুন্দরী ও একজন গুণবতী নারী বলে সবার কাছে প্রসিদ্ধ ছিলেন। ধনসম্পদও ছিল তাঁর পর্যাপ্ত পরিমাণ। সুখী, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও আনন্দঘন দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছিলেন তারা। ইসলামের অমোঘ বাণী তাদের কাছে পৌঁছতেই বিনাবাক্যে তারা তা বরণ করে নেন। নবীজির কাছে দীক্ষা গ্রহনকারী সর্বপ্রথম আনসারী নারী তিনিই । তাঁর স্বামীও নবীজির হাতে হাত রেখে ইসলামে দীক্ষিত হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদিনা আগমনে তাঁর গোত্রই সর্বাধিক আনন্দে মাতোয়ারা হয়েছিল।

সময় ছুটে চলল আগামীর পানে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তাঁর বয়সও বেড়ে চলল সমান তালে। ঋতু পরিক্রমায় জীবনে যেমন বসন্ত আসে ঠিক তেমনি খরাও আসে। কিন্তু খাওলার অপরূপ সৌন্দর্যের কোন ভাটা নেই। অনন্ত আলোয় তা যেন দীপ্তিমান। একদিন তিনি নিত্যকর্ম সেরে নামাজের নিয়ত বাঁধলেন। পাশেই বসে ছিলেন আউস (রাঃ)। নিস্পলক তাকিয়ে ছিলেন তিনি প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে। তাঁর স্মরণে এল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন গুণবতী স্ত্রীর বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন—যখন তুমি তাঁর দিকে তাকাবে প্রশান্তিতে ভরে উঠবে তোমার মন। হ্যাঁ, খাওলার মাঝে তো সে গুণ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। স্ত্রীর প্রতি অসম্ভব ভালবাসায় ব্যাকুল হয়ে উঠলেন তিনি। কিন্তু তাঁকে নামাজরত দেখে বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি। নামাজ শেষ হলে তৃষ্ণার্ত স্বামী একটু মধুর ভালবাসার ছোঁয়া পেতে স্ত্রীর কাছে ফিরে গেলেন। খুব ঘনিষ্ঠভাবে উজাড় করে পেত্তে চাইলেন তাঁকে। কিন্তু হঠাৎ করেই এ কাজের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না খাওলা (রাঃ)। তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিলেন এবং স্বামীর বাসনা পূরণে কিছুটা অনাগ্রহ দেখালেন। ধাক্কাটা আঊস (রাঃ) এর খুব জোড়েশোরে লাগল। রাগের কাছে হেরে গেলেন তিনি। নিজেরে স্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলনা করে তিনি বললেন—আমার মা আমার জন্য যেমন হারাম তোমাকেও আমার উপর তেমন হারাম করলাম। সাময়িক ক্ষোভে তিনি স্ত্রীর সাথে যিহার করে বসলেন।

আউস (রাঃ) এর এ বাক্য শুনে খাওলা (রাঃ) বজ্রাহতের ন্যায় আৎকে উঠলেন। কারণ জাহেলী যুগে স্ত্রীকে চিরতরে হারাম সাব্যস্ত করার জন্যই এ বাক্য ব্যবহৃত হত। স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে চিরদিনের জন্য দূর হয়ে যেত। তালাকের চূড়ান্ত ছিল এটি। এরপর স্ত্রীকে গ্রহণ করার ক্ষীণ কোন সম্ভাবনাও থাকত না। দাম্পত্য জীবনের এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হত ছোট্ট এ বাক্যকে কেন্দ্র করে। ঘটনার আকস্মিকতায় মুষড়ে পড়লেন খাওলা (রাঃ)। পিতার স্নেহের ছায়ায় যেও সন্তানরা ঘুরে বেড়াত নিশিদিন। সন্তানদের কোলে নিয়ে পিতা রাজ্যের প্রশান্তি লাভ করত। তাদের মাঝে আর কোন সম্পর্ক থাকবে না। যে স্বামীর পরম সান্নিধ্য কেটে গেল জীবনের এতগুলো বসন্ত, একটি মুহূর্তের জন্যএ যার সাথে সামান্য মনোমালিন্য দেখা দেয় নি, তাঁকে আজ হারাতে হবে চিরদিনের জন্য? চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলেন তিনি। হে আল্লাহ! এ কী হল? নিজের কাজের জন্য তিনি চরম লজ্জিত হলেন তিনি। নিজেকে খুব করে শাসাতে লাগলেন। আব্দারটুকু মেনে নিলেই তো এ পরিস্থিতির সূত্রপাত হত না। স্বামীকেও তিনি আবেগী ভর্ৎসনায় ভরিয়ে তুললেন। একটু ধৈর্য ধরলে কী এমন ক্ষতি তোমার হত? আমাদের অনিশ্চয়তার মুখোমুখী হত না। আল্লাহ মাফ করুণ। এ কী হয়ে গেল আউস?

খাওলা (রাঃ) এর অবস্থা এলোমেলো হয়ে গেল। হাঁটতে গিয়ে যেন টলে পরেন তিনি। দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনায় গোটা শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। অনুশোচনা ও লজ্জায় তিনি কুকড়ে গেছেন। শুধু একটি আশার প্রদীপ তাঁর মনের মাঝে ক্ষীণ হয়ে জ্বলছিল। হয়তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গেল এর একটি সুরাহা পাওয়া যাবে। আউস (রাঃ) ও সমান যাতনায় ভুগছিলেন। আফসোস তাঁকে বিবর্ণ করে ফেলেছে। ঘর থেকে বেরুবার পূর্বে তিনি স্ত্রীকে বললেন—খাওলা! তুমি তো চিরতরে আমার জন্য হারাম হয়ে গেছ। আমাদের পুনঃমিলনের কোন সুযোগ আপাতত আমার নজরে আসছে না। জবাবে খাওলা (রাঃ) বললেন—তুমি তো আমাকে স্পষ্ট করে তালাক দাও নি। এ বাক্য জাহেলী যুগে চিরস্থায়ী সারামের জন্য ব্যবহৃত হত। নিশ্চয়ই ইসলাম এতে কোন রদবদল আনবে। তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে যাও। আউস (রাঃ) বললেন—তাঁর কাছে যেতে আমার লজ্জ্বাবোধ হচ্ছে। আমি তাঁকে এ সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারবো না। এর চেয়ে বরং তুমিই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে যাও। আশা করা যায়, এ দুঃসহ অবস্থা থেকে পরিক্রাণের একটি পথ আল্লাহ পাক আমাদের দেখিয়ে দিবেন।

খাওলা (রাঃ) আয়েশা (রাঃ) এর গৃহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। এমনিতে আনসারী নারীরা উম্মুল মুমিনীনদের সাথে দেখা সাক্ষাতের জন্য প্রায়ই আসতেন। এদের সাথে তাদের গভীর হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। নবীগৃহ ছিল সব আশাহতদের ভরসাস্থল। আর জ্ঞানপিপাসুদের অমৃত নহর। আয়েশা (রাঃ) তাঁকে সুস্বাগতম জানিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে পেশ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে বসে গেলেন খাওলা (রাঃ)। নিজের উপর আপতিত মুসিবত সবিস্তারে বর্ণনা করতে লাগলেন তিনি। পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যত এবং নিজেদের কৃতকর্মের অনুশোচনা কোন কিছুই বাদ গেল না কথা থেকে। তিনি বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আউসকে আপনি ভাল করেই জানেন। আমার ভরা যৌবন কালে তাঁর সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল। আমার প্প্রতি অসম্ভব রকমের টান ছিলো তাঁর। এখন বার্ধক্য আমাকে ছুঁই ছুঁই করছে। আর এ মুহূর্তে সে কিনা আমাকে নিজ মায়ের সাথে উমপা দিচ্ছে। সে আমাকে স্পষ্ট করে তালাক দেয়নি। সে বলছে তুমি আমার জন্য আমারত মায়ের মতই হারাম। তাঁর ঘরে আমার ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটি সন্তান আছে । তাদেরকে তাঁর কাছে রেখে দিলে তারা অযত্নে মারা যাবে। আর যদি আমার কাছে রেখে দেই তাহলে অনাহারে তাদের অবস্থা চরম হয়ে উঠবে।

দীর্ঘক্ষণ ভেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—এখানে তো হারাম হওয়া ছাড়া বিকল্প কোন বিধান আমার চোখে পড়ছে না। তবে এ ব্যাপারে কোন খোদায়ী বিধান আমার জানা নেই। আর নিজের বিবেচনাবোধ থেকে আমি তো কোন নতুন বিধান জারি করতে পারিনা। আমার কাছে তোমার বিষয়ে কোন ঐশী বিধান নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উক্তি শুনে খাওলা (রাঃ) তাঁর সাথে বাদানুবাদে লিপ্ত হলেন এবং এ সমস্যার একটি সুষ্ঠু সমাধানের জন্য নাছোড়বান্দার মত আবদার শুরু করে দিলেন। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে আর কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না অনন্যোপায় হয়ে তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনার প্রশস্ত হাত মেলে ধরলেন। কাতরকণ্ঠে তিনি বলতে লাগলেন—হে আল্লাহ! আমার সব অনুযোগ আমি আপনার দরবারেই পেশ করক্সহি। স্বামী বিচ্ছেদের দুঃসহ যাতনা থেকে আপনি আমাকে উদ্ধার করুন। হে আল্লাহ! আপনার নবীর জবানীতে এ মুসিবত থেকে পরিক্রাণের একটি উপায় আপনি বের করে দিন। খাওলা (রাঃ) এর করুণ মিনতি আয়েশা (রাঃ) এবং গৃহে বসেই হচ্ছিল। উপস্থিত সকলেই অনুভব করছিলেন তাঁর গভীর কষ্ট। আয়েশা (রাঃ) বলেন—

খাওলার কাতরতায় ব্যথিত হয়ে তাঁর প্রতি সহানুভূতিতে আমরাও কাঁদতে লাগলাম।

এ দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘটনার পুরো বিবরণ শোনার জন্য আউস (রাঃ) কে ডেকে পাঠালেন। তিনি আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন—তোমার স্ত্রী যা বলছে তা কি সত্যি? আউস (রাঃ) বললেন সে সত্যিই বলছে। আমি তাঁর সাথে সত্যই যিহার করেছি। ইয়া রাসূলাল্লাহ! এখন এ ব্যাপারে আপনার হুকুম কী? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আমার কাছ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তুমি তাঁর কাছে যেয়ো না। এ আদেশ শুনে আউস (রাঃ) নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। আর খাওলা (রাঃ) বলতে লাগলেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাঁর কাছে কানাকড়ি পয়সাও নেই। তাঁর খরচাদি তো আমিই বহন করে থাকি। এরপর সবাই মিলে একটি ঐশী প্রত্যাদেশের অপেক্ষা করতে লাগলেন। খাওলা ও আউস (রাঃ) অবিরাম রোনাজারি করতে লাগলেন আল্লাহর দরবারে। নিজেদের ভয়াবহ কষ্টগুলি খুলে বলতে লাগলেন আল্লাহর সকাশে। তাদের কান্নার প্রচন্ড বেগে খুলে গেল আসমানের বন্ধ দরজা। আল্লাহ পাক তাদের আবেদন শুনলেন। আশা নিরাশায় দোদুল্যমান খাওলা (রাঃ) প্রবল কান্নার মাঝেই একবার চোখ তুলে তাকান আসমানের দিকে, আবার ফিরে তাকান উপস্থিত লোকগুলোর দিকে । কখনো আবার এক বুক আশা নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে তাকিয়ে থাকেন। দেখেন তাঁর পবিত্র জবান থেকে দুঃখ ঘোচাবার ঐশী বাণী রহমত হয়ে বেরিয়ে আসে কি না? ইত্যবসরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেতে লাগল। বিন্দু বন্দু ঘামে ভরে উঠল তাঁর প্রশস্ত ললাট।

পরিস্থিতি আঁচ করতে পারে আয়েশা (রাঃ) বললেন—খাওলা হয়তো তোমার সম্পর্কে কোন বিধান অবতীর্ণ হবে এখন। খাওলা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহ! আপনি একটি কল্যাণের ফয়সালা করে দিন। আপনার নবীর কাছ থেকে আমি কেবল কল্যাণের প্রত্যশা রাখি। আয়েশা (রাঃ) বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছিল। আর স্বামী বিচ্ছেদের অনিশ্চিত আশংকায় হতাশাগ্রস্ত খাওলার পাংশু মুখ দেখে আমরাও দিশ্চিন্তায় ভুগছিলাম। না জানি কী বিধান অবতীর্ণ হয়। স্বামী সংসারের ভাগ্য তাঁর জুটবে তো?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়া সম্পন্ন হল। মুচকী হেসে তিনি বললেন—হে খাওলা! ব্যস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে খাওলা (রাঃ) বললেন—জি ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূলের মুখে মুচকি হাসি দেখে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করেছে তাঁর হৃদয় নদীতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আল্লাহ পাক তোমাদের ব্যাপারে বিধান নাজিল করেছেন। এরপর তিনি যিহারের বিধান সম্বলিত আয়াতগুলো তেলাওয়াত করেন। তেলাওয়াত শেষ হলে আউস (রাঃ) এর দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি বলেন—একজন ক্রীতদাস মুক্ত করার সামর্থ আছে তোমার? আউস (রাঃ) বললেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য এটা সম্ভব নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন তাহলে একাধারে ষাটটি রোযা রাখতে পারবে তো? তিনি বললেন—এও আমার সাধ্যে কুলাবে না ইয়া রাসূলুল্লাহ! দিনে দু একবার খাওয়ার পরও আমার মনে হয় দৃষ্টি শক্তি লোপ পেয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে আমার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে ষাটজন অভাবীকে খাবার খাইয়ে দাও। আউস (রাঃ) বললেন, আপনি যদি সাহায্য করেন তাহলে এটা আমি করতে পারব। আর স্ত্রীকে সম্বোধন করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—তোমার স্বামীকে বল, যে যেন উম্মুল মুনজিরের কাছে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে কিছু খেজুর নিয়ে ষাটজন অভাবীর মাঝে বন্টন করে দেয়। ঝটপট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদেশ তামিল করে উম্মুল মুনজিরের কাছ থেকে কেজুর এনে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে আউস (রাঃ) তা বন্টন করে দিলেন। এবার স্ত্রীকে আগের মত করে ফিরে পেলেন তিনি। আর এভাবেই জাহেলী যুগের এক গলত প্রথার অবসান ঘটে গেল।

দুঃসহ যাতনার মর্মাহত খাওলা (রাঃ) এর উপখ্যান এখানেই শেষ। অনাগত লোকদের জন্য এবং নিজেদের কৃতকর্মে অনুশোচিতদের জন্য এক আলোকিত আদর্শ রেখে গেছেন তিনি। আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি অগাধ ভালবাসা ও বিশ্বাসে সিক্ত ছিল তাঁর হৃদয়। আল্লাহর সাহায্যের প্রগাঢ় প্রত্যাশায় এক অতুলনীয় উপমা তাঁর অবদান। আল্লাহ পাক তাঁর কথা শুনে আয়াত নাজিল করেছেন এ সৌভাগ্য ছুঁতে পারে এমন বড় আর কী আছে?

লিখেছেনঃ শাইখ আব্দুল মুনঈম হাশেমী

অনুবাদঃ মাওলানা হাসান শরীফ

আল কুরআনে নারীর কাহিনী বই থেকে সংগ্রহ করা।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE