Breaking News

হযরত সারা (আঃ)

আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—

وَلَقَدْ جَاءتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُـشْرَى قَالُواْ سَلاَمًا قَالَ سَلاَمٌ فَمَا لَبِثَ أَن جَاء بِعِجْلٍ حَنِيذٍ

 

فَلَمَّا رَأَى أَيْدِيَهُمْ لاَ تَصِلُ إِلَيْهِ نَكِرَهُمْ وَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً قَالُواْ لاَ تَخَفْ إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَى قَوْمِ لُوطٍ

 

وَامْرَأَتُهُ قَآئِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشَّرْنَاهَا بِإِسْحَقَ وَمِن وَرَاء إِسْحَقَ يَعْقُوبَ

 

قَالَتْ يَا وَيْلَتَى أَأَلِدُ وَأَنَاْ عَجُوزٌ وَهَـذَا بَعْلِي شَيْخًا إِنَّ هَـذَا لَشَيْءٌ عَجِيبٌ

 

قَالُواْ أَتَعْجَبِينَ مِنْ أَمْرِ اللّهِ رَحْمَتُ اللّهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

আমার প্রেরিত ফেরেশতারা ইব্রাহীমেরে কাছে সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল তারা বলল সালাম, তিনিও বললেন-সালাম। অতঃপর অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি একটি ভুনা করা বাছুর নিয়ে এলেন!

কিন্তু যখন দেখলেন যে, আহার্য্যের দিকে তাদের হস্ত প্রসারিত হচ্ছে না, তখন তিনি সন্ধিগ্ধ হলেন এবং মনে মনে তাঁদের সম্পর্কে ভয় অনুভব করতে লাগলেন। তারা বলল-ভয় পাবেন না। আমরা লূতের কওমের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।

তাঁর স্ত্রীও নিকটেই দাড়িয়েছিল, সে হেসে ফেলল। অতঃপর আমি তাকে ইসহাকের জন্মের সুখবর দিলাম এবং ইসহাকের পরের ইয়াকুবেরও।

সে বলল-কি দুর্ভাগ্য আমার! আমি সন্তান প্রসব করব? অথচ আমি বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছি আর আমার স্বামীও বৃদ্ধ, এতো ভারী আশ্চর্য কথা।

তারা বলল-তুমি আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে বিস্ময়বোধ করছ? হে গৃহবাসীরা, তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত ও প্রভুত বরকত রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রশংসিত মহিমাময়।–সুরা হুদ-আয়াত-৬৯—৭৩।

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ইরাকের সেই স্বেচ্ছাচারী, অহংকারী আর খোদা দাবীদার সম্রাটের সাথে অত্যন্ত দূরদর্শিতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি ঐ নির্বোধ ও বেওকুফ বাদশার প্রমাণের তাসের ঘর মুহূর্তে তছনছ করে দেন। সে সময় দেশের বাদশাহ ছিলো নমরূদ বিন কেনাআন। ঐতিহাসিকগণ লিখেন গোটা পৃথিবী জুড়ে দু’জন কাফের বাদশাহ রাজত্ব করেছে। একজন নমরূদ, দ্বিতীয় জন বুখতে নসর। পাশাপাশি দু’জন মুমিনও সমগ্র দুনিয়াব্যাপী রাজত্ব করেছেন। তারা হচ্ছেন সুলায়মান (আঃ) ও জুলকারনাইন। বলা হয়ে থাকে, নমরূদ দীর্ঘ চারশত বছর রাজত্ব করে। ছিলো প্রচন্ড প্রতাপশালী ও স্বেচ্ছাচারী বাদশাহ। তাঁর ভোগ বিলাস, পার্থিব আমোদ—আহ্লাদের সামনে দ্বীন ও ধর্মের কোন গুরুত্ব ছিল না। যে লোক তাঁকে ন্যায় ইনসাফের পথ দেখাত, সত্যের পথে চলতে আহ্বান করত, তাঁর উপর সে আক্রোশে খড়্গহস্ত হয়ে যেত। চিরন্তন নীতি অনুসারে আল্লাহ পাক মানুষের মুক্তি ও হেদায়েতের জন্য নবী—রাসুল পাঠিয়ে থাকেন। যারা লোকদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেন। মুক্তির পথ বাতল দেন। কল্যাণের রুদ্ধ দুয়ার উন্নুক্ত করে দিয়ে সৎকাজ ও উত্তম ইবাদতের পদ্ধতি শিখিয়ে দেন তাদের। সর্বোপরি শয়তানের প্রতারণা ও চক্রান্ত থেকে তাদের হেফাজত করেন। এ পথ ধরেই ইব্রাহীম (আঃ) হেদায়েতের মশাল হাতে ঐ স্বেচ্ছাচারী সম্রাটের কাছে প্রেরিত হন। তিনি তাঁকে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান। কিন্তু এ অহংকারী বাদশাহর চরম ভ্রষ্টতা এ পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। ইব্রাহীম (আঃ) এর শিক্ষাকে সে সদম্ভে প্রত্যাখ্যান করার দুঃসাহস দেখাল। উল্টো সে নিজেকে খোদা দাবী করে কমযোর যুক্তি আর হাস্যকর দলিল নিয়ে ইব্রাহীম (আঃ) এর সাথে বিতর্কে লিপ্ত হল। তাঁর কাছে তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে গিয়ে ইব্রাহীম (আঃ) যখন বললেন—

আমার প্রভু জীবনদাতা ও মৃত্যুদাতা। সূরা—বাকারা—আয়াত—২৫৮। মর্ম না বুঝেই নমরূদ বলে উঠলো—আমিও জীবন দিতে পারি, মৃত্যু ঘটাতে পারি। একটি সীমিত চিন্তার পরিসর থেকেই সে এ কথাগুলো বললো। তাই মৃত্যুর দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত দুজন আসামী সে তাঁর সামনে আনার আদেশ দিল। তারা উপস্থিত হলে তাদের একজনকে হত্যা ও অপরজনকে খালাস করে দেয়ার হুকুম জারি করল। সে এরপর বললো, দেখ! আমিও একজনকে জীবন দিলাম আরেকজনের মৃত্যু ঘটালাম। ইব্রাহীম (আঃ) বুঝলেন এ নির্বোধকে এভাবে নয়, একটু জটিলভাবে ঘায়েল করতে হবে। তাঁকে নিরুত্তর করার জন্য তিনি সহসাই বলে ফেললেন—

আল্লাহ পাক প্রতিদিন সূর্যকে পূর্ব দিগন্ত থেকে উদিত করেন, তো তুমি পশ্চিম দিগন্ত থেকে সূর্যের উদয় ঘটাও। সূরা—বাকারা—আয়াত—২৫৮।

নমরূদ এবার দিশেহারা হয়ে গেল। তাঁর মুখে আর কোন কথা ফুটলো না।

‘সে একদম দিশেহারা হয়ে পড়লো। আর কোন কথাই বলতে পারল না। আর আল্লাহ পাকের অভ্যাস হল তিনি এমন হঠকারীকে সাধারণত সথিক পথের দিশা দেন না।’সূরা বাকার, আয়াতঃ ২৫৮।

নমরূদ মনে মনে ইব্রাহীম (আঃ) এর বিরুদ্ধে চরম ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। এ দিকে ইব্রাহীম (আঃ) এই হঠকারী স্বেচ্ছাচারী সম্প্রদায় থেকে বহু দূরেকোথাও চলে যাওয়ার জকন্য হিজরতের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছেন। প্রয়োজন মাফিক কিছু জিনিস তিনি সঙ্গে নিলেন। তাঁর সহযাত্রী হলেন সহধর্মীনী সারা। তিনিই সর্বপ্রথম স্বামীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঈমানী ধনে ধন্য হয়েছিলেন। ইব্রাহিম (আঃ) এর ভাতীজা লুতও তাদের সঙ্গী হলেন। তিনিও ইতোপূর্বে ঈমান এনেছিলেন ইব্রাহীম (আঃ) বললেন,

আমি আমার প্রভুর (নির্দেশিত জায়গায়) দিকে হিযরত করে যাচ্ছি। নিশ্চয়ই তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান। সূরা আনকাবুতঃআয়াত ২৬।

ক্ষুদ্র ঈমানী কাফেলা পথ চলা শুরু করল। ইরাক পেরিয়ে হাররান নগরী পাড়ি দিয়ে ফিলিস্তিন পৌঁছে সফর মূলতবি করলেন তারা। ভেবেছিলেন হয়ত এখানে সহজ ও নির্বিঘ্নে জীবন যাপন এবং রোজগারের একটি উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু ভাবনা বাধাগ্রস্ত হল। তিনি দেখলেন চতুর্দিকে চরম দুর্ভিক্ষের হাহাকার। অনাবৃষ্টিতে মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে অতিষ্ঠ মানুষজন । তাদের অর্থনৈতিক জীবনে চরম ধ্বস নেমেছে। মন্দা আর দরিদ্রতার নিরীহ শিকার তারা। এ দেখে ইব্রাহীম (আঃ) ভাতিজা লুত ও স্ত্রী সারাসহ পুনঃ সফরের বন্দোবস্ত করে মিসরে এসে পৌঁছলেন। সেকালে এক দিশ্চরিত্র বদমেজাজী রাজা এ অঞ্চল অরাজকতায় আক্রান্ত ছিল মিসরের জনপদ।

মনোহর রূপমাধুরী আর অনন্য সৌন্দর্যের সাক্ষাত পরী ছিলেন সারা। আল্লাহ পাক তাঁকে বাতেনী সম্পদ তথা ঈমানী দৌলত দানের পাশাপাশি বাহ্যিক সৌন্দর্য ও লাবণ্যেও অপরূপ করে গড়েছিলেন। প্রথম দেখাতে যে কেউই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যেত। রাজার নৈকট্যলোভী জনৈক ব্যক্তি সারাকে ইব্রাহীম (আঃ) এর সাথে দেখে রাজদরবারে এ সংবাদ পৌঁছালো। রাজার সামান্য কৃপাদৃষ্টি লাভের জন্য সারার সে অপরূপ সৌন্দর্য সে স্বচক্ষে অবলোকন করেছিল, রাজার সামনে তা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও মনোলোভা করে উপস্থাপন করলো। রাজার অন্তরে সে সারার প্রতি তুমুল একটি আকর্ষণ ও উদ্দীপনা পয়দা করতে সমর্থ হল। এমনিতেই নাচুনে বুড়ি, তাঁর উপরে ঢোলের বাড়ি। তাঁর কথা মেনে নিয়ে রাজা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী রমণীকে আমার পেতেই হবে। সে ইব্রাহীম (আঃ) কে তাঁর কাছে ডেকে পাঠাল। এমন, যেন জটিল বিষয়ের জরুরী আলোচনা। কিন্তু আল্লাহর নবী শুরুতেই ঠাহর করতে পারলেন এ ধুরুন্ধের আসল উদ্দেশ্য কী? ইব্রাহীম (আঃ) রাজদরবারে পৌঁছলে রাজার প্রথম কথাই ছিল ঐ মেয়েটি মে? তাঁর সাথে তোমার সম্পর্ক কী? ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর অসৎ উদ্দেশ্য ও সুপ্ত বাসনা ভাল করেই জানতেন। তিনি যদি বলে দেন সে আমার স্ত্রী, তাহলে নিজের জীবনের উপরও একটি বিপদের ঘনঘটা নেমে আসার আশংকা করলেন। চোর তো কখনো ধর্মের কাহিনী শোনে না। এ জন্য তিনি রাজাকে বল্লেন—মেয়েটি আমার বোন। রাজা এবার বুঝতে পারলো, সারা এখনো অবিবাহিত কুমারী। সে তাঁর সেবক ও প্রহরীদের ইঙ্গিতে আদেশ করলো সারাকে আমার খাস মহলে নিয়ে যাও আর আতিথ্যের সুবন্দোবস্ত কর।

ইব্রাহীম (আঃ) চটজলদি সারার কাছে ফিরে এসেই গোটা পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করলেন। তিনি বললেন, রাজা আমাকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। আমি বলেছি তুমি আমার বোন। কারণ এখানে আমরা ছাড়া অন্য কোন মুসলমান নেই। আর তুমি আমার দ্বীনি বোনও বটে। কাজেই তাঁর সামনে আমাকে ছোট করো না। রাজপ্রহরীরা সারাকে আটক করে শাহী মহলে নিয়ে গেল। রাজা কুবাসনায় তাঁর দিকে হাত বাড়াতেই আল্লাহ পাক সঙ্গে সঙ্গে তা অবশ করে দিলেন। কোন ভাবেই সে তাঁর হাত নাড়াতেই পারলো না। অসহায় হয়ে সে বললো সারা! আমি আর অসৎ উদ্দেশ্যে তোমার দিএ হাত বাড়াবো না। সারা দুআ করলে আল্লাহ তাঁর হাত সুস্থ করে দেন। কিন্তু অপদার্থ রাজা এ বিপদ থেকে শিক্ষা নিল না। পুনর্বার সে সারার দিকে হাত বাড়ালো। এবারও তাঁর হাত অবশ হয়ে গেল। পুনরায় সে সারার কাছে ক্ষমা চেয়ে বলল, আমি হাত বাড়াবো না। সারা এবারও ক্ষমা করে দেন। আল্লাহর ফজলে তাঁর হাত পূর্ববৎ হয়ে গেল। কিন্তু নষ্টামি ছড়িয়েব ছিল লোকটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে, আবার সে লোলুপ হাত প্রসারিত করলো সারার দিকে। এবার তাঁর হাত একদম নিথর নিশ্চল হয়ে পড়লো। আতংকে চিৎকার জুড়ে দিল সে। অনেক অনুনয় করে সে বলতে লাগলো, শেষবারের মত আমাকে সুযোগ দাও। কথা দিচ্ছি জীবনে আর কখনো তোমার নাম নিব না । আর একবার আল্লাহর কাছে বলে আমার সুস্থতার ব্যবস্থা করে দাও। সারা শেষবার দুআ করলেন। আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করে তুললেন। রাজা তখন চিৎকার করে প্রহরীদের বলতে লাগলো কে আছে? এ মেয়েকে এখান থেকে নিয়ে যাও। তাঁকে তাঁর স্বাধীনতা অনুযায়ী চলতে দাও। যে লোকটি সারার সংবাদ দিয়েছিলো রাজা তাঁকে ডেকে বললো, তুমি আমার কাছে কাকে নিয়ে এসেছো, এতো মানুষ নয় আস্ত জীন। যাও আমার মহল থেকে বের করে দাও। রাজা এবার বুঝতে পারলো মেয়েটি আসলে ইব্রাহীমের স্ত্রী। সে আর বাড়াবাড়ি করা সমিচিন মনে করলো না। সারাকে সে মুক্ত করে দিল। সিদ্ধান্ত নিল আর কখনো সে তাঁর দিকে লোলুপ হাত বাড়াবে না।

হাজেরা নাম্নীও নিজের এক রূপবতী তরুণী দাসী তাঁকে উপহার দিয়ে স্বামীর হাতে তুলে দিল তাঁকে। গোটা ঘটনাটা ইব্রাহীম (আঃ) এর জন্য এক চরম পরীক্ষা ছিল। জীবন ও জীবিকার অনুসন্ধানে পরদেশী হয়ে পথিমধ্যে এমন এক লোকের মুখোমুখী হলেন যে তাঁর স্ত্রীকেই ছিনিয়ে নিতে চাইল। মধুর দাম্পত্য জীবনে ঢেলে দিতে চাইলো বিচ্ছেদের বিষ। কিন্তু মহামহিম আল্লাহ তাঁর সহিষ্ণু বন্ধু ইব্রাহীমের সাহায্য করলেন। তাঁর জান, মাল ও পরিবার, পরিজন অভাবিতরূপে হেফাজত করলেন।

সুদীর্ঘ একটি সময় ইব্রাহীম (আঃ) মিসরে অবস্থান করেন। যে সময়ে তাঁর অনেক ধন সম্পদও গড়ে ওঠে। জীবিকার অনুসন্ধানে কঠোর সাধনা ও পরিশ্রমের ফলে আল্লাহর অগনিত নেয়ামতের মাঝে দিন কাটতে থাকে তাঁর। যদিও হিংসুক ও নিন্দুকের অসদ্ব্যবহার মাঝে মাঝে তাঁকে ভীষণ কষ্ট দিত। তিনি অনুভব করতেন তাঁর খোদা প্প্রদত্ত নেয়ামত ও প্রাচুর্যে অসহ্য হয়ে অনেক মানুষই তাঁর প্রতি রুষ্ট। কিন্তু এগুলোতে তাঁর কোন খেয়াল নেই।তিনি বিভোর থাকতেন খোদার প্রেমে। তাঁর প্রশংসা, গুণকীর্তন ও কৃতপজ্ঞতায় নিমগ্ন থাকতেন তিনি নিশি দিন। একদিন নিরালায় বসে তিনি অতীতের পৃষ্ঠাগুলো উল্টে উল্টে দেখছিলেন। এক অত্যাচারী রাজার কুৎসিত থাবা এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে, তাঁর স্ত্রীর দিকে। বিমর্ষ হয়ে পড়লেন তিনি। তাঁর স্ত্রী ওজু করে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে কাতর হয়ে প্রার্থনা করলেন তিনি আল্লাহর কাছে। ইব্রাহীম (আঃ) এর চোখের সামনে থেকে দুর্ভোদ্য সব পর্দা সরে গেল। তিনি স্বচক্ষে দেখতে লাগলেন, নিঃশঙ্ক সারাকে। উদ্ধত রাজাকে। বড় অসহায় তিনি। কিন্তু আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় পয়গাম্বরের প্রিয় স্ত্রীকে সহায়হীন করে রাখতে পারেন না। অভাবিতরূপে নেমে এল তাঁর সাহায্য। দাম্ভিক রাজার দম্ভকে চূর্ণ করে দিল সে সাহায্য। নিরাপদে স্বামির বুকে ফিরে এল সারা। ইব্রাহীম (আঃ) এর হৃদয় প্রশান্ত হল। চক্ষু শীতল হল। অসামান্য প্রাপ্তিতে বুকটা তাঁর কানায় কানায় ভরে উঠলো। কারণ তিনি সারাকে অপরিসীম ভালবাসতেন। তাঁর সততা, সহিষ্ণুতা, খোদাভক্তি আর ইবাদত প্রেম মুগ্ধ করত তাঁকে। তাঁর অমায়িক ব্যবহার ও নির্মল নিষ্ঠা সে ভালবাসা আরো গভীর করে তুলত। তাঁর রূপ, লাবণ্য ও কমনীয়তা পতিপ্রেমের সুধা ছড়িয়ে যেত নিরন্তর। বলা হয়ে থাকে আদমপত্নী হাওয়ার পরে সে জমানা পর্যন্ত সারার চেয়ে রূপবতী কোন নারী ঐ সুনীল আকাশ অবলোকন করেনি।

ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তন

ইব্রাহীম (আঃ) বরকত বিধৌত পবিত্র নগরী ফিলিস্তিনের উদ্দেশে মিসত ত্যাগ করেন। নিজের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সম্পদ, দাস—দাসী ও চতুষ্পদ জন্তু নিয়ে আসেন। সারা, হাজেরা ও লুতও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর ভাতিজা লুতকে প্রয়োজনীয় মাল—সামানা নিয়ে সিরিয়ায় বসবাস করতে বলেন। সামুদ সম্প্রদায়ের বসবাস সহ এ অঞ্চলটি পার্শ্ববর্তী জনপদের কেন্দ্রস্থল বলে বিবেচিত হত। এখানকার লোকগুলো ছিল বড়ই অসৎ প্রকৃতির ও দুরাচার। কুফর ও শিরক তাদের মজ্জাগত হয়ে গিয়েছিল।

আল্লাহ তাআলা ওহী মারফত ইব্রাহীম (আঃ) কে সুসংবাদ প্রদান করে বললেন, এই গোটা ভূখণ্ডজুড়ে তোমার ও তোমার উত্তরসূরীদের রাজত্ব ও কর্তৃত্ব করতে হবে। তিনি আরো জানালেন—তার সন্তানও হবে অনেক। আল্লাহ তাদেরকে বরণীয় একটি জাতিতে পরিণত করবেন। গোটা ভূখন্ডকে তারা ইনসাফ ও সাম্যের বিভায় উজ্জ্বল করে তুলবেন। আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করার এক নজীর স্থাপন করবেন তারা। (আমাদের ইসলামী ও আরব সাম্রাজ্য দীর্ঘকাল ধরে এই সুসংবাদের গনীমত ভোগ করেছেন।) ইব্রাহীম (আঃ) ও সারা ফিলিস্থিনে একাদিক্রমে বিশ বছর কাটিয়ে দিলেন। তাদের ঘরে কোন সন্তানের শুভাগমন ঘটলো না। ইব্রাহীম (আঃ) একটি সুসন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে নিরন্তর দুয়া করতেই থাকলেন। অবশেষে একদিন আল্লাহ পাক তাঁর কাছে এক মহাসুসংবাদের বার্তা পাঠালেন। এক নিশুতি লগ্নে সারা ইব্রাহীম (আঃ) এর একান্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে বললেন, আমাকে তো আল্লাহ পাক কোন সন্তান দিলেন না। আপনি এক কাজ করুণ। আমার সেবিকা হাজেরাকে আপনি বিবাহ করুণ। হয়তো তাঁর গর্ভে আল্লাহ পাক আমাদেরকে একটি সন্তান দান করবেন।

হাজেরা নেহায়েত বিশ্বত, ন্যায়পরায়ণ ও অভিজাত চরিত্রের অধিকারী নারী ছিলেন। প্রাণ উজাড় করে তিনি ইব্রাহীম (আঃ) এ নিজের নিঃসন্তান মনিব সারার সেবা করতেন। ইব্রাহীম (আঃ) সারার পরামর্শ সাদরে গ্রহণ করলেন। হাজেরার প্রতি তারও যথেষ্ট আস্থা ও নির্ভরতা ছিল। হাজেরাও উৎফুল্লচিত্তে ও প্রস্তাব মেনে নিলেন। সারা ইব্রাহীম (আঃ) এর সাথে হাজেরার শুভ বিবাহ সম্পন্ন করে দিলেন। তিনি মনে মনে বললেন, ভালই হলো, প্রাণের স্বামীকে কোন অপরিচিত নারীর প্রণয়ে সঁপে দিতে হল না। না জানি হয়ত সে স্বামীকে আমার প্রতি বিরাগভাজন করে তুলত। হাজেরা তো আমার একান্ত ভক্ত, অনুয়রাগী সেবিকা। অন্তত এখন আমাকে আর কোন অযাচিত আশংকায় ভুগতে হবেনা। কিছুদিন যেতেই হাজেরা গর্ভবর্তী হয়ে উঠলেন। তাঁর কোলজুড়ে নেমে এল এক ফুটফুটে সুদর্শন পুত্র সন্তান । তাঁর নাম রাখা হল ইসমাইল। পুত্রকে দেখে ইব্রাহীম (আঃ) এর চোখ জুড়িয়ে গেল। অস্থির অন্তরে প্রবাহিত হল শান্তির সুবাতাস। সারাও এ আনন্দে শরীক হলেন। গোটা নবী পরিবারই খুশীর জোয়ারে প্লাবিত হয়ে উঠলো। মহামহিম আল্লাহ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এক মহাসম্পদ দান করেছেন তাদের। জীবন সায়াহ্নের সন্ধ্যা তারায় তারা আলোকিত হয়ে উঠেছেন। আল্লাহ পাক বলে—

سَلاَمٌ عَلَيْكُم بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ

তোমাদের সবরের কারণে তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আর তোমাদের এ পরিণাম-গৃহ কতই না চমৎকার। কোরআন ১৩/২৪।

কিন্তু মানুষের মন তো আকাশের রঙ, বদলাতে খুব বেশি সময় লাগে না। সারার মনে এক অচেনা অস্থিরতা তোলপাড় শুরু করে দিল। অনেকটা বদলে গেলেন তিনি। হাজেরা তনয় ইসমাঈলের প্রতি আগের মত স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন না তিনি। নির্জনে মনমরা হয়ে তিনি নানা জল্পনা কল্পনা করতেন। আর বেদনার অশ্রু ঝরাতেন। হায়! তাঁর ঘরে কেন এমন একটি প্রিয় দর্শন ফুটফুটে সন্তান হলো না। তিনি কি ইব্রাহীম (আঃ) এর সাথে হিযরত করেননি? জালামের জুলুম সহ্য করেননি? তিনি কি প্রভুর আনুগত্যে অবিচল আর স্বামী সেবায় নিবেদিত স্ত্রী ছিলেন না? তাঁর জান ও মালের বিশ্বস্ত প্রহরী ছিলেন না? তাহলে কেন এই পরিণতি? বাস্তব কথা হলো আল্লাহ পাক কাউকে চিরহতাশা ও বিষণ্নাতায় ভোগান না। তাঁর প্রতিটি কাজের পেছনেই একটি সুক্ষ্ম কল্যাণ চিন্তা নিহিত থাকে। প্রতিটি বিষয়ের ক্ষেত্রেই তাঁর কাছে একটি সময় নির্ধারিত আছে। এক মুহূর্তে আগেও তা প্রকাশ পায় না। এক মুহূর্তে বিলম্বও তাতে ঘটে না।

ধৈর্য ধরা ছাড়া সারার দ্বিতীয় কোন পথ নেই। আল্লাহ তাআলা ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখতে লাগলেন। নিঃসন্তান থাকাটা সারা নিজের দুর্ভাগ্য মনে করলেন। কেটে গেল এভাবেই। তবু তিনি ভগ্ন হৃদয়ে হলেন না। তাঁর শরীরের বাঁধন ঢিলে হয়ে গেল। চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ পড়ে গেল। প্রবণশক্তি ও দৃষ্টি শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ল। তারপরও তাঁর অন্তর খোদার উপর অটুট আস্থায় অবিচল। আশার হাল ছাড়তে রাজী নন তিনি কিছুতেই। নিজের যাতনা ও অস্থিরতা সযত্নে নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। পাছে কেউ টের পেয়ে যায়। তথাপি তিনি তো একজন মানুষ বৈ ছিলেন না। মনের জল্পনা কল্পনা আর কতদিন ঢেকে রাখবেন। পূর্ণ চেষ্টা সত্ত্বেও আবেগের বাঁধ তিনি ধরে রাখতে পারলেন না। অন্য দিনের মতই হাসিমুখে ঘরে এলেন ইব্রাহীম (আঃ)। বাঁধভাঙ্গা আবেগের ধাক্কায় নিজেকে হারিয়ে ফেললেন সারা। মনের গোপন কথাগুলো অকপটে বলে ফেললেন স্বামীর কাছে। হাজেরা ও ইসমাঈলকে বহুদূরে কোথাও রেখে আসার আবেদন করলেন তিনি, যেখানে গেলে তাদের কথা তিনি শুনতে পাবেন না। স্বপ্ন কাতর চোখ দুটি দিয়ে তিনি তাদেরকে দেখতেও পাবেন না। সারার এই অসংলগ্ন আবেদনের একটিই মাত্র কারণ ছিল। স্বামীকেই তিনি ভালবাসতেন হৃদয়ের গভীর থেকে। ভালবাসার এ অধিকার শুধু নিজের জন্যই পেতে চাচ্ছিলেন তিনি। মানবীয় উপাদানে গড়া সারা এখানে অনেকটা অপারগ। তিনি তো কোন অতিমানব নন। ইব্রাহীম (আঃ) বললেন হাজেরা না তোমার একান্ত ভক্ত সেবিকা। তুমিও তো তাঁর প্রিয়ভাজন। তুমিও তো তাঁর প্রতি নেহায়েত অনুরাগী। সারা বললেন—নিশ্চয় সে আমার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। তাঁর প্রতি আমার কোনও অভিযোগ নেই। তবুও আমি আর পারছি না। আসলে সারাকে নিয়ে আল্লাহ পাকের গোপন কোন পরিকল্পনা ছিল। নইলে ওহী মারফত তিনি আদিষ্ট হয়েছিলেন। যেন বিনা বাক্যে এ প্রস্তাব মেনে নেয়া হয়।

ইব্রাহীম (আঃ) এক সওয়ারীতে চড়ে হাজেরা ও ইসমাঈলকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। বহুদূরে কোথাও যেতে হবে তাদের। তারা এগিয়ে চললেন। বৃদ্ধ ইব্রাহীম, অবলা হাজেরা আর দুগ্ধপোষ্য ইসমাঈলের জন্য এ সফর ছিল বড়ই কঠিন। অবশ্য গোটা সফরেই আল্লাহই আমাকে আদেশ করেছেন। হাজেরা আর কথা বাড়ালেন না। পূর্ণ আস্থার সাথে প্রশান্ত ভঙ্গিতে তিনি বললেন, তাহলে নিশ্চয় তিনি আমাদের দুর্ভোগ হবে এমন কিছু করবেন না। একথা বলে তিনি স্বামীর পথে ছেড়ে সন্তানের কাছে চলে গেলেন।

ইব্রাহীম (আঃ) রওয়ানা হলেন। হাজেরার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে এলেন তিনি। চলতে চলতে পাহাড়ী পথে পৌঁছে হাজেরার দৃষ্টির আড়াল হওয়া মাত্রই হাত দুটি আসমানের দিকে উঠিয়ে কাতরকণ্ঠে তিনি দুআ করলেন,

رَّبَّنَا إِنِّي أَسْكَنتُ مِن ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِندَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُواْ الصَّلاَةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُم مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ   

হে আমাদের পালনকর্তা, আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় আবাদ করেছি; হে আমাদের পালনকর্তা, যাতে তারা নামায কায়েম রাখে। অতঃপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদেরকে ফলাদি দ্বারা রুযী দান করুন, সম্ভবতঃ তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে-কোরআন ১৪/৩৭।

ইব্রাহীম (আঃ) এর সম্মানিত মেহমানবৃন্দ।

আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ ضَيْفِ إِبْرَاهِيمَ الْمُكْرَمِينَ

 

إِذْ دَخَلُوا عَلَيْهِ فَقَالُوا سَلَامًا قَالَ سَلَامٌ قَوْمٌ مُّنكَرُونَ

 

فَرَاغَ إِلَى أَهْلِهِ فَجَاء بِعِجْلٍ سَمِينٍ

 

فَقَرَّبَهُ إِلَيْهِمْ قَالَ أَلَا تَأْكُلُونَ

 

فَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً قَالُوا لَا تَخَفْ وَبَشَّرُوهُ بِغُلَامٍ عَلِيمٍ

 

فَأَقْبَلَتِ امْرَأَتُهُ فِي صَرَّةٍ فَصَكَّتْ وَجْهَهَا وَقَالَتْ عَجُوزٌ عَقِيمٌ

 

قَالُوا كَذَلِكَ قَالَ رَبُّكِ إِنَّهُ هُوَ الْحَكِيمُ الْعَلِيمُ

 

হে রাসুল! আপনার কাছে ইব্রাহীমের সম্মানিত মেহমানদের বৃত্তান্ত এসেছে কি?

যখন তারা তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে বললঃ সালাম, তখন সে বললঃ সালাম। এরা তো অপরিচিত লোক।

অতঃপর সে গ্রহে গেল এবং একটি ঘৃতেপক্ক মোটা গোবৎস নিয়ে হাযির হল।

সে গোবৎসটি তাদের সামনে রেখে বললঃ তোমরা আহার করছ না কেন?

অতঃপর তাদের সম্পর্কে সে মনে মনে ভীত হলঃ তারা বললঃ ভীত হবেন না। তারা তাঁকে একট জ্ঞানীগুণী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল।

অতঃপর তাঁর স্ত্রী চীৎকার করতে করতে সামনে এল এবং মুখ চাপড়িয়ে বললঃ আমি তো বৃদ্ধা, বন্ধ্যা।

তারা বললঃ তোমার পালনকর্তা এরূপই বলেছেন। নিশ্চয় তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। কোরআন-৫১/২৪-৩০।

সারার জন্য এ দিনটি ছিল মহাসুখের একটি দিন। অভাবিত মুযিযার বিস্ময়কর একটি দিন। বৃদ্ধা ও বন্ধ্যা এক নারীকে শোনানো হচ্ছে নেক সন্তানের খোশ খবর। অত্যাচারী নগরীর দুরাত্মা লোকদের জনবসতিকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়ার আসমানী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে এ দিন। ইতিহাসের এক স্মরণীয় দিন এটি।

ইতোপূর্বে হাজেরা ও ইসমাঈল সংশ্লিষ্ট যে আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে। সারার সাথে তাঁর তেমন কোন সম্বন্ধ নেই। এখানেই তাঁর সমাপ্তি টানা হচ্ছে। এখন আলোচনা শুধু সারাকে নিয়ে, তাঁর হীরন্ময় সময়গুলো নিয়ে। মহাকালের মহাদুর্যোগ ছাপিয়ে যা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে অনন্ত কাল ধরে। একদা ইব্রাহীম (আঃ) নিজগৃহে আল্লাহর আরাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। অল্প কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে। হঠাৎ তিনজন নওজোয়ান সেখানে আসলেন। সৌন্দর্য, কমনীয়তা, তাকওয়া ও বিনয়ের ঝলক ঠিকবে পড়েছে তাদের চোখ মুখ থেকে। তারা প্রথমে সালাম দিলেন। ইব্রাহীম (আঃ) তাদের স্বাগত জানালেন এবং অভিজাত মেজবানের উদারতায় সম্মানিত এ মেহমানদের আতিথ্যে সামান্য কার্পণ্য করলেন না তিনি। এ মেহমানত্রয় ছিলেন মূলতঃ ফেরেশতা। জিবরীল মীকাঈল ও ইসরাফিল (আঃ) মেহমানদের সাদরে বরণ করে ইবরাহীম (আঃ)। গৃহাভ্যন্তরে নিজের আস্তাবলে চলে গেলেন। গাভী বকরী ও দুম্বায় ভরপুর ছিল সেটি। সেখানে থেকে একটি মেহমানখানায় তা পরিবেশন করলেন। খাবারের প্রতি মেহমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন—এই ভুনা খাবারটা বেশ সুস্বাদু। আশা করি আপনাদের ভাল লাগবে। খাবারের প্রতি তাদের অনাগ্রহ আঁচ করতে পেরে তিনি বললেন—আপনারা খাচ্ছেন না কেন? এক মেহমান বললেন—আমরা বিনামূল্যে খাবার খাই না। ইব্রাহীম (আঃ) বললেন—এ চিন্তা আদৌ প্রয়োজন নেই। বিনামূল্যের খাবার এটি নয়। আপনারা স্বাচ্ছন্দে খাওয়া শুরু করুণ। জিবরাইল (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন এ খাবারের মূল্য তাহলে কি? ইব্রাহীম (আঃ) বললেন, এর মূল্য হল, আপনারা আল্লাহর নামে খাবার শুরু করবেন। জিবরীল ৯য়াঃ) মীকাঈল (আঃ) এর দিকে তাকিয়ে বললেন—সত্যিই এ লোকটির মাঝে তাঁর প্রভুর একান্ত আপনজন হওয়ার যোগ্যতা আছে।

কিছু সময় অপেক্ষা করে ইব্রাহীম (আঃ) দেখলেন অতিথিরা খাবার খাচ্চেন না। এতে তিনি মনে মনে শংকিত হয়ে উঠলেন। সারাও মেহমানদের আপ্যায়নে নিয়োজিত ছিলেন। তিনিও ঘাবড়ে গেলেন। সারা দাঁড়িয়ে ছিলেন মেহমানদের শিয়রে। আর ইব্রাহীম (আঃ) সামনে থেকে খাবার পরিবেশন করছিলেন। মেহমানগণ খাবারের প্রতি সামান্য আগ্রহও দেখালেন না। কারণ তারাতো ফেরেস্তা। ফেরেশ্তাদের খাবারের কোনো চাহিদা থাকে না। একটু পরে জিবরীল (আঃ) ভুনাকৃত গো—বাছুরের গায়ে হাত বুলালে তা উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে আস্তাবলে মায়ের কাছে চলে গেল। এ দৃশ্য দেখে ইব্রাহীম (আঃ) মেহমানদের ব্যাপারে আরো বেশী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সঙ্গীসমেত জিবরীল (আঃ) বললেন—

فَلَمَّا رَأَى أَيْدِيَهُمْ لاَ تَصِلُ إِلَيْهِ نَكِرَهُمْ وَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً قَالُواْ لاَ تَخَفْ إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَى قَوْمِ لُوطٍ

‘আপনি ভয় পাবেন না। আমরা লূতের কওমের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।সুরা হুদ-আয়াত ৭০।

আমরা আল্লাহ পাকের ফেরেশ্তা। আমরা লূত সম্রদায়কে নাস্তানাবুদ করার জন্য এসেছি। অন্যায় অপকর্ম আর বিশৃংখলার শেকড় উপড়ে ফেলতেই আমরা প্রেরিত হয়েছি। অচিরেই আমরা তাদেরকে সমূলে নির্বংশ করে ফেলবো। রাত পোহাবার আগেই আল্লাহর নির্দেশে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে। তাদের ঘর বাড়ী আর সেখানকার দুরাচার লোকগুলোকে আমরা চিরতরে মাটির সাথে মিশিয়ে ফেলব। কেউ আমাদের হাত থেকে রেহাই পাবে না। এটা আমাদের মিশন। হে ইব্রাহীম ! আপনার ভয়ের কোনও কারণ নেই। আপনি পেরেশানিতে ভুগবেন না। আমরা সব কিছুই আপনার রবের নির্দেশনা অনুযায়ী আঞ্জাম দিব।

সারা লুত সম্প্রদায়ের ধ্বংসের কথা শুনে হেসে উঠলেন। আশ্চর্য! অত্যল্পকাল পরেই চরম ধ্বংস আর ভয়ানক শাস্তির মুখোমুখী হতে যাচ্ছে তারা, অথচ এর সামান্য তাদের নেই। তাদের অবস্থা তো হল, দিন দিন তাদের কুফর ও অসৎ মনোবৃত্তির মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জিঘাংসা ও পাষাণ্ডতায় তারা উন্নত্ত। লুত (আঃ) তাদের ব্যাকুল হয়ে বুঝাচ্ছেন। কিন্তু আত্মোপলদ্ধিহীন মানুষগুলো কোন কিছুর পরোয়া করছে না। সীমালঙ্গন আর বাড়াবাড়ির প্রতিক্রিয়া যে পরিণতি হয়ে প্রকাশ পায় তাঁর কোন তোয়াক্কাই তারা করছে না। শয়তান তাদের সামনে অপকর্ম সুশোভিত করে করে তুলে ধরেছে। অবলীলায় তারা তা করে যাচ্ছে। ঘরের স্ত্রীদের ছেড়ে তারা উঠতি বয়সের বালকদের সাথে কুকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। সুস্থ রুচিবোধ আর মানবীয় মর্যাদার কোন মূল্য নেই তাদের কাছে। সভ্যতা আর শালীনতার গায়ে তারা কালিমা লেপে দিচ্ছে অহর্নিশিশ। যাই হোক, লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংস সংবাদ হেসে উঠা সারাকে এক মহাসুসংবাদের সওগাত দিলেন ফেরেশতারা। ফেরেশতা তাঁকে প্রিয় দর্শন শুচিময় একটি সন্তান—ইসহাকের খোশখবর দিলেন। অনন্তর ইসহাকের ঔরসে ইয়াকুবের সংবাদটিও তারা আগাম জানিয়ে দিলেন।

আনন্দে আত্মহারা সারা বিস্ময়াভিভুত হয়ে অন্যান্য মেয়েদের মতই মাথায় হাত চাপড়ে বলতে লাগলেন—কী তাজ্জব ব্যাপার! এ সন্তান কোত্থেকে হবে? আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি। আমার স্বামীও বয়সের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে বার্ধকেরুপনীত হয়েছেন। নব্বই ছুঁই ছুঁই করছে আমার বয়স। এ জীবন সন্ধ্যায় আমার সন্তান হবে কীভাবে? এটা তো বড়ই আশ্চর্যের কথা! ফেরশ্তারা শুধু বললেন—

قَالُواْ أَتَعْجَبِينَ مِنْ أَمْرِ اللّهِ رَحْمَتُ اللّهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

তুমি আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে বিস্ময়বোধ করছ? হে গৃহবাসীরা, তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত ও প্রভুত বরকত রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রশংসিত মহিমাময়।–সুরা—হুদ , আয়াত ৭৩।

এ সংবাদে কেবল সারা একাই বিস্মিত হননি। ইব্রাহীম (আঃ) ও যারপর নাই বিস্মিত । যুগপৎ আনন্দ ও বিস্ময়ে আপ্লুত হয়ে তিনি ফেরেশ্তাদের বললেন—

قَالُواْ لاَ تَوْجَلْ إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلامٍ عَلِيمٍ

قَالَ أَبَشَّرْتُمُونِي عَلَى أَن مَّسَّنِيَ الْكِبَرُ فَبِمَ تُبَشِّرُونَ

 

এ বার্ধক্য পীড়িত বয়সে তোমরা আমাকে সুসংবাদ দিচ্ছ? তোমরা আমাকে কী সুসংবাদ দিচ্ছ? তারা বললেন, আমরা আপনাকে সত্য সংবাদই দিচ্ছি। সুতরাং আপনি নিরাশ হবেন না।–

সুরা—আল হিজর, আয়াত ৫৪—৫৫।)

ফেরেশ্তারা শুধু একটি সুপুত্রের সংবাদই দিলেন না, তারা আরো জানালেন ইসমাঈলের ভাই ইসহাক অতীব জ্ঞানী ও দয়াবান হবে। পিতার মতই ধৈর্য ও সহিষ্ণুতায় ভরপুর থাকবে তাঁর অন্তর্জগত। ইব্রাহীম (আঃ) ও সারা দম্পতিকে ফেরেশ্তারা পুত্র ইসহাকের পাশাপাশি পৌত্র ইয়াকুবেরও সুসংবাদ দিলেন।

ইরশাদ হচ্ছে—

وَامْرَأَتُهُ قَآئِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشَّرْنَاهَا بِإِسْحَقَ وَمِن وَرَاء إِسْحَقَ يَعْقُوبَ

আমি তাকে ইসহাকের জন্মের সুখবর দিলাম এবং ইসহাকের পরের ইয়াকুবেরও।–

সূরা—হুদ—আয়াত—৭১।

সবশেষে ফেরেশতারা সারাকে লক্ষ্য করে বললেন—তোমাদের এ নবী পরিবারকে আল্লাহ পাক অফুরন্ত অগনিত বরকত দিয়ে ভরপুর করে রেখেছেন। কাজেই আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? তারা আরো বললেন—আপন কার্যাবালী ও ইচ্ছা অভিপ্রায় বিচারে আল্লাহ পাক চির প্রশংসিত । নিজের সত্তাগত গুণের বিবেচনায় তিনি বড়ই মহিমান্বিত। এরপর সারা ঘরের কাজকর্মে মনোযোগ দিলেন। কিছুদিন না যেতেই নতুন করে তাঁর ঋতুস্রাব দেখা দিল। অথচ বয়সের নব্বই কোঠা তিনি পেরিয়ে এসেছেন আরো আগেই।

এ দিকে ইব্রাহীম (আঃ) এর মন থেকে ভয় ও আতংকের মেঘ কেটে যেতেই এবং সারার গর্ভে এক সুপুত্রের সুখবর পেতেই আল্লাহ পাকের মহিমা গাথা ও প্রশংসায় ডুবে গেলেন তিনি। আল্লাহ পাকের অশেষ অনুগ্রহ ও অনুকম্পা পেয়ে শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতার অশ্রু নিবেদন করে তিনি বলতে লাগলেন—

الْحَمْدُ لِلّهِ الَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى الْكِبَرِ إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَقَ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاء

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلاَةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاء

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাকে এই বার্ধক্যে ইসমাঈল ও ইসহাক দান করেছেন নিশ্চয় আমার পালনকর্তা দোয়া শ্রবণ করেন।

হে আমার পালনকর্তা, আমাকে নামায কায়েমকারী করুন এবং আমার সন্তানদের মধ্যে থেকেও। হে আমাদের পালনকর্তা, এবং কবুল করুন আমাদের দোয়া।

হে আমাদের পালনকর্তা, আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করুন, যেদিন হিসাব কায়েম হবে।–

সূরা—ইব্রাহীম—আয়াত—৩৯—৪১।

হঠাৎ ইব্রাহীম (আঃ) এর খেয়াল হলো, ফেরেশতারা তো লুত এর জনবসতি ধ্বংস করতে যাচ্ছে। তাই তিনি তাদের মুখোমুখী হয়ে জিজ্ঞাস করলেন—তোমরা কি এমন কোন জনপদ ধ্বংস করে দাও যেখানে তিনশত মুমিন বসবাস করে। ফেরেশতারা বললেন না, আমরা এমনটি করি না।

তিনি ফের জিজ্ঞেস করলেন—তাহলে যে জনপদে দুইশত জন মুমিন থাকে সেটা? ফেরেশতারা বললেন—না। এবার ইব্রাহীম (আঃ) বললেন— ত্রিশ বা চল্লিশজন মুমিন যদি সেখানে থাকে তাহলেও? ফেরেশতারা বললেন—হ্যাঁ, তাহলেও আমরা তাদের উপর চড়াও হইনা। এভাবে জিজ্ঞেস করতে করতে ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর প্রশ্নের সংখ্যা এক পর্যন্ত নামিয়ে আনলেন। শেষ মুহূর্তে ফেরেশতারা শুধু নেতিবাচক উত্তর দিয়ে গেলেন। এবার ইব্রাহীম (আঃ) বললেন—তাহলে যে জনপদকে ধ্বংস করার জন্য তোমরা যাচ্চ সেখানে তো আল্লাহর নবী লুত বসবাস করছেন।

ফেরেশতারা জবাব দিলেন—

قَالَ إِنَّ فِيهَا لُوطًا قَالُوا نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَن فِيهَا لَنُنَجِّيَنَّهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ

সেখানে কে আছে, তা আমরা ভাল জানি। আমরা অবশ্যই তাকে ও তাঁর পরিবারবর্গকে রক্ষা করব তাঁর স্ত্রী ব্যতীত; সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত থাকবে।–

সুরা—আনকাবুত—আয়াত—৩২।

সারার সব আশা পূরণ হল। শতবর্ষ পেরিয়ে তিনি এখনো বেঁচে রইলেন নতুন করে গর্ভধারণের জন্য নয়, নতুন কোন সন্তানের প্রত্যাশায় ও নয়। তিনি বেঁচে রইলেন পুত্র ইসহাকের জন্য তাঁর তরফে নবুয়তের যে প্রতিশ্রুতি করা হয়েছে তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার জন্য। কখনোই আল্লাহর প্রতিশ্রুতির কোন ব্যতিক্রম হয় না। তিনি সবার সঙ্গে কৃত ওয়াদা পুরা করলেন। তাঁর জীবদ্দশাতেই ঐশী সম্পদ দান করলেন তাঁর ছেলেকে। নাতির মুখে দাদী ডাক শোনার সৌভাগ্যও হাত ছাড়া হল না তাঁর। নাতি একদিন তাঁর কাছে এসে বলল—দাদী মা! আমাদের উপর আল্লাহপাকের কী অফুরন্ত রহমত আর বরকত, তাই না? তৃপ্তুতে তাঁর চোখ দুটি ঝিলিক দিয়ে উথল। মাতৃত্বের গৌরবে ধন্য সারা জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো ইব্রাহীম (আঃ) এর সঙ্গেই কাটিয়ে দিলেন। একশ সাতাশ মতান্তরে ত্রিশ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।

 

সারা আল্লাহর অত্যধিক প্রিয় ছিলেন। ফেরেশতাদের সঙ্গে পর্যন্ত তিনি কথা বলেছেন। অনন্য সব নেয়ামতে ভরপুর হয়েছিলেন তিনি। সহিষ্ণু স্বামীর সুহাসিনী স্ত্রী সন্তান—সন্ততিদের শোকে ভাসিয়ে ফিলিস্তিনের আল খলিল’ অঞ্চলে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন স্বামীভক্তি ও আনুগত্যের শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। অনাগত নারীদের এক মহা আদর্শ। আমরা কি পারি না। তাঁর মতই জীবনের সব চাওয়া পাওয়াকে আল্লাহর সমীপে সোপর্দ করতে? তিনি তো যাকে চান উজাড় করে দেন। তাঁর মত দয়াবান তাঁর মত মহান আর কি কেউ আছে?

সে সারা! অনন্ত রহমত ও শান্তিতে সিক্ত হোন আপনি। হে ইব্রাহীম পরিবার। তোমাদের সকলের উপর আল্লাহর অশেষ দয়া আর অনুকম্পা বর্ষিত হতে থাক চিরকাল ধরে।

লিখেছেনঃ শাইখ আব্দুল মুনঈম হাশেমী

অনুবাদঃ মাওলানা হাসান শরীফ

আল কুরআনে নারীর কাহিনী বই থেকে সংগ্রহ করা।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE