Breaking News
Home / বই থেকে / 02 (মা)

02 (মা)

১৯৮৫ সাল ৷ শরৎ এসেছে এই বাংলায়, এই ঢাকায়, সদ্য-মাজা কাঁসার বাসনের মতো আলোকোজ্জ্বল আকাশ, তার তীব্র নীল, আর ভাসমান দুধের সরের মতো মেঘমালা, আর শিউলির বোঁটায় বোঁটায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু নিয়ে ৷ রাতের রাজপথ এখানে এখন কারফিউ-কাতর, দিনের রাজপথ জনতার বিক্ষোভ-মিছিলের পদচ্ছাপগুলো ধারণ করবে বলে প্রতীক্ষমাণ ৷ প্রতিবছর শরৎ এলেই ঢাকার বেশ কজন মুক্তিযোদ্ধার মাথা এলোমেলো হয়ে যেতে থাকে ৷ স্বাধীনতার ১৪ বছর পর ১৯৮৫-র এই শরৎও তার ব্যতিক্রম নয় ৷ বরং ৩০শে আগস্ট আজাদের মায়ের মৃতু্য আর ৩১শে আগস্ট তাঁর দাফনের পর ঢাকার মুক্তিযোদ্ধারা সবাই যেন বড় বেশি তাড়িত, বড় বেশি নিমজ্জিত হয়ে পড়েন ৷ অতীত তাঁদের তাড়িয়ে ফেরে, স্মৃতি তাঁদের ঘিরে ধরে অক্টোপাসের মতো ৷ কাজী কামাল উদ্দিন বীরবিক্রম চন্দ্রগ্রস্তের মতো হয়ে যান ৷ চাঁদটা যেন তাঁর কাছে একটা পেয়ালা, জ্যোৎস্না যেন পানযোগ্য, চরাচরব্যাপী যতটা জ্যোৎস্না, সবটা তিনি গলাধঃকরণ করে ফেলতে পারেন ৷ তাঁর আফসোস হতে থাকে, রেইডের রাতে তিনি যদি সমর্থ হতেন পাকিস্তানি আর্মি অফিসারের হাত থেকে মেশিনগানটা কেড়ে নিয়ে পুরোপুরি তার দখল নিয়ে নিতে, যদি জিম্মি করতে পারতেন পাকিস্তানি অফিসারটাকে, তাহলে তো তাঁদের হারাতে হতো না এত এত সহযোদ্ধাকে! আর কী দামি একেকটা অস্ত্র ৷ তাঁর প্রিয় পিস্তলটা! আর সেই রকেট লাঞ্চারটা! হাবিবুল আলম বীরপ্রতীকের মনে হতে থাকে, আরেকটু সাবধান বোধহয় হওয়া যেতে পারত ৷ খালেদ মোশাররফ তো বলেইছেন, ইউ ডিড নট ফাইট লাইক আ গেরিলা, ইউ ফট লাইক আ কাউবয় ৷ শাহাদত চৌধুরী চোখের জল আটকাতে পারেন না ৷ তাঁর চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে যায় ৷ সামান্য ভুলের জন্যে এতগুলো প্রাণ গেল, এত অস্ত্র গোলাবারুদ! তিনি বা আলম যদি তখন ঢাকায় থাকতেন, তাহলে হয়তো এতগুলো তরুণপ্রাণের ক্ষয় রোধ করা যেত! বড় ভাই হিসাবে, শাচৌ হিসাবে মৃতু্যভয়-তুচ্ছজ্ঞানকারী এইসব কিশোর-তরুণের নিরাপত্তা-বিধানের তথা তাদের গাইড করার একটা অলিখিত দায়িত্ব তাঁর ছিলই! ফতেহ চৌধুরীর মনে হয়, ২৯শে আগস্ট বিকালেই যখন জানা গেল, উলফত খবর দিল, সামাদ ভাই ধরা পড়েছে, তখনও যদি তিনি সবগুলো বাড়ি চিনতেন, যদি সবাইকে বলে দিতে পারতেন, সাবধান, তাহলে হয়তো রুমী মরত না, জুয়েল মরত না, আজাদ মরত না, বাশার মরত না…

শহীদ রুমীর মা জাহানারা ইমামের মনে হয়, রুমী যখন যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে জিদ ধরল, তখন তিনি কেন বলে ফেললেন, যা, তোকে দেশের জন্যে কুরবানি করে দিলাম, আল্লাহ বুঝি তাঁর কুরবানি কথাটাই শুনেছেন, আহা রে, এ কথাটা যদি তিনি না বলতেন, যদি বলতেন, যা রুমী যুদ্ধ জয় করে বীরের বেশে স্বাধীন দেশে ফিরে আয়, তাহলে হয়তো আল্লাহ তাঁর ছেলেটাকে নিতেন না, ছেলেটা ফিরে আসত ১৬ই ডিসেম্বরে, যেমন করে ১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ তাঁর এলিফ্যান্ট রোডের বাসা কণিকায় এসেছিল শাহাদত, মেজর হায়দার, বাচ্চু, হাবিবুল আলমেরা, স্টেনগান কাঁধে নিয়ে, লম্বা চুল, কারো কারো গালে দাড়ি, দাড়িতে কেমন লাগত রুমীকে… আচ্ছা ওটা তো আমার মনের কথা ছিল না, শাহাদত, বাচ্চু, উলফত, চুল্লু, হাবিব, কামাল, ওটা তো আমার মনের কথা ছিল না, আল্লাহ না অন্তর্যামী, তিনি আমার মুখের কথাটা ধরলেন, আমার মনের কথাটা পড়তে পারলেন না…

শরৎ এলেই এইসব স্মৃতি আর শোচনা তাঁদের উদ্বান্ত করে ফেলে, মনে হয়, পৃথিবীর সমান নিঃসঙ্গতা তাঁদের গিলে ফেলতে আসছে, তার আগেই যদি তাঁরা ধরে ফেলতে পারেন পরস্পরের বিশ্বস্ত আঙুল ৷ কিন্তু এটা ১৯৮৫ সাল, ১৯৭১ নয় ৷ যুদ্ধদিনের পরশপাথর ছোঁয়ানো দিন কি আর ফিরে আসবে ? কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের কুলি সর্দার রশিদ আর সাপ্তাহিক বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী কি আবার একই সিগারেট ভাগ করে খাওয়ার শ্রেণীভেদাভেদ ভুলে যাওয়া দিনে ফিরে যেতে পারেন ?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ঘুমহীনতায় জেগে ওঠেন! কেবল যুদ্ধে হারানো সহযোদ্ধাদের মুখই নয়, নয় শুধু কিশোর মুক্তিযোদ্ধা টিটোর গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত দেহের ছবি, নয় শুধু গুলিবেঁধা শরীর নিয়ে শেষবারের মতো নড়ে ওঠা মানিকের চোয়াল আর দুই ঠোঁটের অব্যক্ত ধ্বনির ফিসফাস, তিনি দেখতে পান যুদ্ধের পরও প্রতিবাদী মুক্তিযোদ্ধাদের একে একে মরে যাওয়ার ছবি, চলচ্চিত্রের মতো, একের পর এক, সার সার মৃতদেহ শুধু, মুক্তিযোদ্ধাদের-খালেদ মোশাররফ নাই, হায়দার নাই, মুখতারের লাশ পড়ে আছে স্বাধীন দেশের রাস্তায়, খালেদ মোশাররফ বলতেন, স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলাদের নিতে পারে না, তার চাই শহীদ…

জায়েদ হাহাকার করে ওঠে ৷ মোটরের গ্যারাজ থেকে ফিরতে ফিরতে রাতের বেলা সে ফিসফিস করে, ‘আমি আজাদ দাদাকে সাবধান কইরা দিছলাম, ওই বেটা কামরুজ্জামান পাকিস্তানি আর্মির ইনফরমার, ওই বেটা ক্যান আমগো বাড়ির চারদিকে ঘুরে, দাদা কয় বাদ দে, তুই আজাইরা ভয় পাস! ক্যান ওই বাড়িতে রাইতের বেলা ওনারা থাকতে গেল ?’

আফসোস করে ওঠেন আজাদের বন্ধু বাস্কেটবল খেলোয়াড় ইব্রাহিম সাবেরও-ওই দিন দুপুরবেলা, একাত্তরের ২৯শে আগস্টেই, তিনি যখন আজাদদের বাসায় যাচ্ছিলেন-প্রায়ই তিনি ওদের বাসায় দুপুরে খেতে যেতেন, আজাদের মা ইলিশ পোলাওটা খুব ভালো রাঁধতেন-বাসার কাছেই একটা দোকান, তাতে তিনজন যুবক বসে, তিনি আজাদের বাসার দিকে হেঁটে যাচ্ছেন আর যুবকত্রয় মাথা বের করে দেখছে, একজন তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, ‘ভৈরব ব্রিজটা পাহারা দিতেছে পাকিস্তানি আর্মিরা, ওই আর্মিগো অ্যাটাক করতে হইলে আমি সাহায্য করতে পারি’, শুনে তাঁর সন্দেহ হয়, এরা বাসাটায় নজর রাখছে নাকি, আর্মির ইনফরমার নয় তো, আজাদদের বাসায় গিয়ে তিনি আজাদকে বলেন, ‘আজকের রাতটা তোরা এখানে থাকিস না’, কিন্তু ওরা তাঁর কথায় পাত্তাই দিল না, কেন যে দিল না ?

একেকজন মুক্তিযোদ্ধার বিচ্ছিন্ন দশটা আঙুল কোনো এক সহযোদ্ধার আরো দশটা আঙুলের সন্ধানে মিকেলাঞ্জেলোর ছবির মতো সঞ্চরণশীল হয়ে ওঠে ৷ একজন আরেকজনকে পেয়ে যান ৷ সরব স্মৃতিচারণ কিংবা নীরব স্মৃতি রোমন্থনের মধ্যে জন্ম নিতে থাকে নিজেদেরই যাপিত জীবনের কিংবদন্তি ৷ এ-কথা সে-কথায় এসে যায় আজাদের প্রসঙ্গ ৷ উচ্চারিত হয়, কিংবা স্মৃত হয়, শেষ পর্যন্ত মাথা নত না করে লড়ে যাওয়া আজাদের মায়ের অবিস্মরণীয় ব্যক্তিগত সংগ্রামের কথা ৷

তাঁদের মনে পড়ে যায়, আজাদের শেষ দিনগুলো কেটেছে মগবাজারের বাসায়, যুদ্ধদিনের বন্ধুরা এ বাসায় গেছেন অনেকেই ৷ কিন্তু যাঁরা তার ছোটবেলার বন্ধু, তাঁরা স্মরণ করেন যে, ২০৮ নিউ ইস্কাটনে আজাদদের বাসাটা ছিল ঢাকা শহরের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বাসা ৷ তাঁরা নিঃসন্দেহ যে এই বাসার কোনো তুলনা ছিল না ৷

‘বাসাটা ছিল দুই বিঘা জমির ওপরে’-একজন বলেন ৷

‘বাসাটায় হরিণ ছিল, একদিন আমার হাত থেকে বাদাম নিতে গিয়ে একটা হরিণ আমার হাতের তালু চেটে দিয়েছিল ৷’ কাজী কামাল এ কথা বলতেই পারেন ৷ কারণ তিনি ছিলেন আজাদের সহপাঠী ৷ সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ছাত্র ছিল আজাদ ৷ গ্রেগরি স্কুলের ছাত্র ছিল লে. সেলিমও ৷ সেও তো শহীদ ৷ সেন্ট গ্রেগরির ছাত্র ছিল রুমী, রউফুল হাসান, ওমর ফারুক, চৌধুরী কামরান আলী বেগ, মেজর সালেক চৌধুরী ৷ তাঁদের মনে না পড়ে কোনো উপায় থাকে না ৷ তাঁরা ফিরে যান সুদূর অতীতে, তাঁদের শৈশবের দিনগুলোয়, যে-অতীত এত দিন ঢাকা ছিল কালের যবনিকার আড়ালে ৷

‘হরিণের বাচ্চা হচ্ছে, সেগুলো বড় হচ্ছে, এইভাবে হরিণের সংখ্যা দাঁড়ায় অনেকগুলো’-স্মরণ করে টগর, আজাদের আরেক খালাতো ভাই, জায়েদের সঙ্গে একাত্তরের ৩০শে আগস্টের সেই রাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল যে ৷

‘বাড়িতে তাদের ঝরনা ছিল, সরোবরে রাজহাঁস সাঁতার কাটত, বিরাট লন ছিল, ছিল মসলার বাগান ৷ আমি একদিন ওদের দারুচিনির গাছ থেকে পকেট ভরে ছালবাকল এনেছিলাম’-একজন বিড়বিড় করেন ৷

‘বিরাট বাড়ি, আগাপাস্তলা মোজাইক, ঝকঝকে দামি সব ফিটিংস, আজাদের মায়ের ড্রেসিং রুমটাই একটা বেডরুমের সমান বড়’-জাহানারা ইমাম লেখেন ৷

‘আজাদের বাবা ইউনুস চৌধুরী ছিল ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড়লোকদের একজন’-বলেন একজন ৷

‘বড়লোকদের একজন না ৷ সবচেয়ে বড়লোক’-আরেকজন প্রতিবাদ করে ওঠেন ৷

তখন অভিজ্ঞতা আর কিংবদন্তি এসে তাঁদের সম্মিলিত স্মৃতিকে সরগরম করে তোলে ৷ সেই স্মৃতি, সেই কিংবদন্তি, সেই ইতিহাস, সেই পুরাণ, মগবাজারের সেই বাড়িটার দেয়ালে বিঁধে থাকা গুলির প্রত্নগাথা, জায়েদের ট্রাঙ্কে সযত্নে তুলে রাখা আজাদের মাকে লেখা আজাদের চিঠির মধ্যে চিরস্থায়ী হয়ে বেঁচে থাকা ইতিহাস-এইসব যদি জোড়া দেওয়া যায়, কী দাঁড়ায় ?

যুদ্ধের ভেতর থেকে উঠে আসে আরেক যুদ্ধ, ইতিহাসের ভেতর থেকে উঠে আসে এক মহিলার নিজস্ব সংগ্রামের অবিশ্বাস্য অবিস্মরণীয় উপ্যাখ্যান ৷

তখনও আদমজীর বাড়ি হয়নি ৷ বাওয়ানির বাড়িও ছিল খুব বিখ্যাত, কিন্তু সেটা আজাদদের ইস্কাটনের বাড়ির তুলনায় ছিল নিষ্প্রভ ৷ আজাদের বাবা ইউনুস চৌধুরী ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, টাটা কোম্পানিতে চাকরি করতেন, ছিলেন বোম্বেতে, কানপুরে, কলকাতায় ৷ কানপুরেই জন্ম হয় আজাদের ৷ ইউনুস চৌধুরী আর সাফিয়া বেগমের একটা মেয়ে হয়েছিল, তার নাম ছিল বিন্দু, কিন্তু সে বেশি দিন বাঁচেনি ৷ বসন্ত কেড়ে নিয়েছিল তার জীবন ৷ প্রথম মেয়েকে হারিয়ে সাফিয়া বেগম অনেকটা পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন, ফলে তাঁর কোলে যখন আজাদ এল, তিনি আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো করে আগলে রাখতে শুরু করলেন ছেলেকে ৷ আজাদের একটা ছোট ভাইও হয়েছিল পরে, বিক্রমপুরে, কিন্তু সাত দিনের মাথায় সেও মারা যায় আঁতুড়ঘরেই ৷ ফলে আগে-পরে আজাদই ছিল সাফিয়া বেগমের একমাত্র সন্তান ৷ অন্ধের যষ্টি বাগধারাটা আজাদ আর তার মায়ের বেলায় প্রয়োগ করা যেতে পারত ৷ আজাদ ছিল পাকিস্তানের প্রায় সমবয়সী, তবে আজাদই একটু বয়োজ্যেষ্ঠ ৷ তাঁর জন্ম হয় ১১ই জুলাই, ১৯৪৬ ৷ আজাদি আজাদি বলে যখন পাগল হয়ে উঠেছিল সারা ভারতবর্ষ, তখনই আজাদের জন্ম বলে তার নাম রাখা হয় আজাদ ৷ ১৯৪৭-এর আগস্টে ভারত-পাকিস্তান দুটো দেশ আলাদা হওয়ার পর বোম্বে থেকে চৌধুরী সাহেব চলে আসেন ঢাকায় ৷ নিয়তির হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে চলে আসেন তিনি ৷ আসবার ইচ্ছা তেমন ছিল না তাঁর, কিন্তু সাফিয়া বেগম জন্মভূমি ফেলে রেখে অন্য দেশে রয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না একেবারেই ৷ ইউনুস চৌধুরী বিক্রমপুরের ছেলে, মেদিনীমণ্ডল গ্রামে তাঁর পৈতৃক নিবাস ৷ টাটা কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় এসে ইউনুস চৌধুরী ব্যবসা শুরু করেন ৷ নানা ধরনের ব্যবসা ৷ যেমন সাপ্লাই আর কন্ট্রাকটরি ৷ প্রভূত উন্নতি করেন তিনি, বিষয়-সম্পত্তি বাড়তে থাকে অভাবনীয় হারে ৷ লোকে বলে, ইউনুস চৌধুরীও বলে বেড়ান, এসবের মূলে ছিল একজনের সৌভাগ্য : আজাদের মা ৷ বউয়ের ভাগ্যেই সৌভাগ্যের সিংহদুয়ার খুলে যায় চৌধুরীর ৷ যদিও তাত্তি্বকেরা এ রকম ব্যাখ্যা দিতে পারে যে, পাকিস্তান কায়েম করাই হয়েছিল মুসলমান মুৎসুদ্দি ও উঠতি ধনিকদের স্বার্থকে নিরঙ্কুশ করার জন্যে, সে-সুযোগ কাজে লাগান ইউনুস চৌধুরী; তবু, চৌধুরী নিজেই তাঁর বৈষয়িক উন্নতির জন্য তাঁর স্ত্রীর ভাগ্যকে মূল্য দিতেন ৷ আসলে, এটা দৃষ্টিগ্রাহ্য যে, বিয়ের পরই ধীরে ধীরে ভাগ্য খুলতে থাকে তাঁর ৷ ইউনুস চৌধুরী যে কানপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়েছেন, তার টাকা যুগিয়েছেন সাফিয়া বেগম ৷ ঢাকায় আসার পর তিনি যে ব্যবসাপাতি শুরু করেন, তারও প্রাথমিক মূলধন যুগিয়েছিলেন সাফিয়া বেগমই, বাবার কাছ থেকে বিয়ের সময় পাওয়া গয়নার কিয়দংশ বিক্রি করে ৷ পাকিস্তানে চলে আসার পর আস্তে আস্তে আজাদের বাবা হয়ে ওঠেন ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান, চিত্তরঞ্জন কটন মিলের চেয়ারম্যান, একুয়াটি শিপিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ৷ একটা কাস্টম ফোর্ড গাড়ি ছিল তাঁর ৷ গাড়ির নম্বর ছিল ইপিডি ৪৩৪৯ ৷ জনশ্রুতি আছে যে, ইরানের শাহ পাহলভি যখন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন, তখন তাঁর গাড়ি হিসাবে ব্যবহারের জন্য ইউনুস চৌধুরীর গাড়ি সরকার ধার নিয়েছিল ৷ এ রকমও শোনা যায়, প্রিন্স ফিলিপ শিকারে এসে আজাদদের বাসায় উঠেছিলেন ৷ ভিন্নমতও শোনা যায়, না ঠিক বাসায় ওঠেননি, চৌধুরীর গাড়িটা প্রিন্সের জন্যে ধার নিয়েছিল সরকার, আর আজাদের বাবা তাদের সফরসঙ্গী হয়েছিলেন ৷

যা-ই হোক না কেন, আজাদের বাবা ছিলেন এই শহরের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তি ৷

আর আজাদদের ইস্কাটনের বাড়িটা ছিল শহরের সবচেয়ে দর্শনীয় বাড়ি ৷ বহু লোক শুধু বাড়ি দেখতেই এ ঠিকানায় আসত ৷

স্মৃতিচারণকারীদের মনে পড়ে যায়, এই বাড়ির একটা রেকর্ড রয়ে গেছে ৩৫ মিলিমিটার সেলুলয়েডে ৷ ডাকে পাখি, খোলো আঁখি, দেখো সোনালি আকাশ, বহে ভোরের বাতাস-সিনেমার এই গানটা শুটিং হয়েছিল এই বাসাতেই ৷ টেলিভিশনের ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠানে এটা অনেকবার দেখানো হয়েছে ৷

সিনেমার ওই গানের অংশটা খেয়াল করে দেখলেই বোঝা যাবে বড় জব্বর ছিল ওই বাড়িটা ৷

আজাদ ছিল বাড়ির একমাত্র ছেলে ৷

আর আজাদের মা সাফিয়া বেগম ছিলেন বাড়ির সুখী গৃহিণী ৷ ছোটখাটো মানুষটার শাড়ির আঁচলে থাকত চাবি ৷ তিনি বাড়িময় ঘুরে বেড়াতেন ৷ আর আল্লার কাছে শোকর করতেন ৷ জাহানারা ইমামের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোয়-আজাদের মাকে তিনি দেখেছেন এ রকম : ‘ভরাস্বাস্থ্যে গায়ের রঙ ফেটে পড়ছে, হাতে-কানে-গলায় সোনার গহনা ঝকমক করছে, চওড়া পাড়ের দামি শাড়ির আঁচলে চাবি বাঁধা, পানের রসে ঠোঁট টুকটুকে, মুখে সব সময় মৃদু হাসি, সনাতন বাঙালির গৃহলক্ষ্মীর প্রতিমূর্তি ৷’

ইউনুস চৌধুরী সেদিন বলেছেন, ‘ওগো শুনছ, আজাদের মা! বাড়িটা আমি তোমার নামেই রেজিস্ট্রি করিয়েছি ৷ এ বাড়ির মালিক তো তুমি ৷’

সাফিয়া বেগম রাগ করেছেন ৷ ‘আমি বিষয়-সম্পত্তির কী বুঝি ? এটা আপনি কী করেছেন ? না না ৷ আপনার বাড়ি আপনি নিজের নামে রেখে দিন ৷’

ইউনুস চৌধুরী হেসে উঠেছেন ৷ ছাদ কাঁপানো হাসি ৷ ‘তুমি তো আমার আছই ৷ তাইলে বিষয়-সম্পত্তিও আমার আছে ৷ কেন, ফরাশগঞ্জের বাড়িও তো আমি তোমার নামে রেখেছি ৷ হা-হা-হা ৷’ তারপর হাসি থামিয়ে বলেছেন, ‘তোমার বরাতেই আমার বরাত খুলেছে ৷ বাড়িটা তোমার নামেই রাখাটা ন্যায্য ৷’

স্বামীর কথা শুনে আশ্বস্ত বোধ করলেও কী এক অজানা আশঙ্কায় সাফিয়া বেগমের মনটা তবু যেন কেন কেঁপে উঠেছে ৷ বেশি সম্পত্তির মালিক হওয়া ভালো নয় ৷ টাকা-পয়সা বেশি হলে মানুষ বদলে যায় ৷ আর আজাদের বাবা লোকটা দেখতে এত সুন্দর-তিনি লম্বা, তাঁর গাত্রবর্ণ ফরসা, গাঢ় ভুরু, উন্নত কপাল, উন্নত নাক, উজ্জ্বল চোখ, ভরাট কন্ঠস্বর-সব মিলিয়ে তিনি এমনি যে মেয়ে-মাত্রই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হতে বাধ্য ৷ আরেকটা ছবি, হয়তো অকারণেই, সাফিয়া বেগমের মনের পটে মাঝে মধ্যে উদিত হতে থাকে ৷ বোম্বে থাকতে ইউনুস চৌধুরী একটা মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছিলেন কৃষ্ণের চরিত্রে, একদিকে রাধা, অন্যদিকে অনেকগুলো গোপিনী কৃষ্ণের জন্যে প্রাণপাত করছে, এই দৃশ্য প্রেক্ষাগৃহের সামনের আসনে বসে দেখেছিলেন সাফিয়া বেগম, বহুদিন আগে, কিন্তু এ দৃশ্যটা মাঝে মধ্যেই দুঃস্বপ্নের মতো তাঁকে তাড়া করে ফেরে ৷

এই বাড়ি এত বড়, তবু যেন মনে হয় ফরাশগঞ্জের বাড়িই ভালো ছিল ৷ তিনতলার ও-বাড়িটা এত জাঁকজমকঅলা নয়, কিন্তু যেন ওই বাড়িটাতে তিনি নিজেকে খুঁজে পেতেন ৷ ইস্কাটনের বাড়িটা বাড়াবাড়ি রকমের বড় ৷ এটায় নিজেকে কেমন অথৈ বলে মনে হয় ৷ তাই তো তিনি চাবি আঁচলে বেঁধে বাড়িময় ঘুরে বেড়ান ৷ চাকর-বাকর, মালি-বাবুর্চি, দারোয়ান-ড্রাইভার মিলে বাড়ি সারাক্ষণই গমগম করছে ৷ আর আছে আত্মীয়স্বজন, আশ্রিতরা ৷ বাড়িতে রোজ রান্না হয় ৫০ জনের খাবার ৷ তাদের কে কী খায়, না খায়, এসব দিকেও খুবই খেয়াল রাখেন আজাদের মা ৷ আল্লাহতায়ালা তাঁদের দু হাত ভরে দিয়েছেন, সেখান থেকে আল্লাহর বান্দাদের খানিকটা দেওয়া-থোয়া করলে তো তাঁদের কমছে না, বরং ওদেরও হক আছে এসবের ওপর ৷

ফরাশগঞ্জের তিনতলা বাড়িটাই যেন তাঁর বেশি প্রিয় ছিল বলে মনে হয় ৷ ওখান থেকে আজাদের স্কুলও ছিল কাছে ৷ আজাদ সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে ভর্তি হয়েছিল ইনফ্যান্ট ক্লাস থেকেই ৷ একেক দিন একেক পোশাক আর জুতো-মোজা পরে সে যখন স্কুলের দিকে রওনা হতো, ছেলের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সাফিয়া বেগমের চোখে অশ্রু এসে যেত ৷ আনন্দের অশ্রু, মায়ার অশ্রু ৷ ছেলেটা দেখতেও হয়েছে মাশাল্লাহ চোখজুড়োনো ৷ নিজের ছেলে বলে কি তাকে বেশি সুন্দর দেখছেন ? না ৷ ফরসা, লম্বা, নাকটা টিকালো, চমৎকার বুদ্ধিদীপ্ত চোখ ৷ স্বাস্থ্যও মাশাল্লাহ ভালো ৷ কাছেই বুড়িগঙ্গা ৷ স্টিমারের শব্দ শোনা যেত ৷ রাত্রিবেলা যখন স্টিমারের সিটির আওয়াজ আসত কানে, কিংবা সার্চ লাইটের বিক্ষিপ্ত আলোয় হঠাৎ হঠাৎ ঝলকে উঠত আকাশ, বাড়ির ছাদ, মাওয়ার সারেং পরিবারের মেয়ে সাফিয়া বেগমের মনটা নিজের অজান্তেই চলে যেত তাঁর শৈশবের দিনগুলোতে ৷ তাঁদের মাওয়ার বাড়িতে ছিল নতুন টিনের চকচকে বড় বড় ঘর, তাতে নানা নকশা কাটা, টিনের চালে টিন-কাটা মোরগ, বাতাসে ঘুরছে আর বাতাসের দিক বলে দিচ্ছে ৷ দূর থেকে লোকে দেখতে আসত তাদের পৈতৃক বাড়িটা ৷ তাঁর বাবার সারেং হওয়ার কাহিনীটাও কিংবদন্তির মতো ভাসছে মাওয়ার আকাশে-বাতাসে : তাঁর বাবা ভাগ্যান্বেষণে উঠে পড়েছিলেন এক ব্রিটিশ জাহাজে, স্টিম ইঞ্জিনচালিত জাহাজ ৷ কী কারণে ব্রিটিশরা তাঁকে ছুড়ে ফেলেছিল গনগনে কয়লার আগুনে, তারপর তাঁকে ফেলে দিয়েছিল সমুদ্রের জলে, কিন্তু তিনি মারা যাননি ৷ তখন ব্রিটিশ নাবিকেরা বলাবলি করতে লাগল, এই ছেলে যদি বাঁচে, তাহলে সে একদিন কাপ্তান হবে ৷ অগি্নদগ্ধ শরীরটাকে নিয়ে আসা হলো মাওয়ায়, তাঁকে ডুবিয়ে রাখা হতো কেঁচোর তেলে, মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে তোলা হতো কেঁচো আর কেঁচো, তখন সারেংবাড়ির আশপাশে লোকজনের প্রধান কাজ দাঁড়িয়ে যায় কোদাল হাতে খুরপি হাতে মাটি খোঁড়া আর কেঁচো ধরা, বড় বড় চাড়িতে কেঁচো সব কিলবিল করছে, মোটা কেঁচো, চিকন কেঁচো, লাল কেঁচো, কালচে কেঁচো, সেসব পিষে তৈরি করা হচ্ছে তেল, আর সেই তেল দু বেলা মাখা হতো আজাদের নানার শরীরে, এই আশ্চর্য ওষুধের গুণে তিনি বেঁচে যান, সেরে ওঠেন এবং শেষতক ফিরিঙ্গিদের ভবিষ্যদ্বাণীকে অব্যর্থ প্রমাণ করে হয়ে ওঠেন জাহাজের কাপ্তান ৷ ধনসম্পদের মালিক হন, মাওয়ার সবচেয়ে দর্শনীয় বাড়িটার অধিকারী হন ৷ সারেংবাড়ির মেয়ে হিসাবে সাফিয়া বেগমের মাথা সব সময় উঁচুই ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও বলতে হবে, মাওয়ার দিনগুলোতে, বিয়ের আগে, নিজের বিবাহোত্তর জীবনের যে সুখ-সম্পদময় ছবি সাফিয়া কল্পনা করতেন, নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সওদাগরি বড় নৌকাগুলোর দিকে তাকিয়ে যে বিত্তবৈভবশালী সওদাগর বরের কথা তিনি ভাবতে পারতেন, বিয়ের রাতে বিশেষভাবে রিজার্ভ করা লঞ্চে করে শ্বশুরবাড়ি বিক্রমপুর যাওয়ার পথে নদীর বাতাস চুলে-মাথায়-ঘোমটায় মাখতে মাখতে যে ঐশ্বর্যময় ভবিষ্যতের ছবি তিনি আঁকতে পেরেছিলেন, তার জঙ্গিতম সংস্করণের চেয়েও আজ তিনি পেয়েছেন বেশি ৷ এই বোম্বে কানপুর, এই ঢাকার ফরাশগঞ্জের বাড়ি, আবার ইস্কাটনে দুবিঘা জমির ওপর নিজের প্রাসাদোপম বাড়ি ৷

তাঁরা ফরাশগঞ্জের বাড়িতে থাকতেই আজাদদের স্কুলে একটা মজার কাণ্ড ঘটেছিল ৷ ব্রাদার ফুল জেম তখন সেন্ট গ্রেগরির প্রিন্সিপ্যাল ৷ সে-সময় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন এক বিখ্যাত বাঙালি ৷ ভালো ছাত্র হিসাবে যাঁর নামডাক এখনও রয়ে গেছে কিংবদন্তি হিসেবে ৷ তাঁর ছেলে পড়ত সেন্ট গ্রেগরিতে ৷ গভর্নর সাহেব একদিন স্কুলের শিক্ষকসহ বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিকে দাওয়াত করলেন নিজের বাসভবনে ৷ উদ্দেশ্য, তাঁদের ভালো করে খাওয়াবেন ৷ সে দাওয়াতে আজাদরাও ছিল আমন্ত্রিত ৷ ভোজনপর্ব যা হলো তা ঐতিহাসিকই বলা চলে ৷ তবে খেতে খেতে শিক্ষকদের মধ্যে শুরু হলো গুঞ্জন ৷ কারণ গভর্নর জানাচ্ছেন, আজকের এই মজলিশের উপলক্ষ হলো তাঁর সেন্ট গ্রেগরিতে অধ্যয়নরত ছেলের ভালো ফল ৷ শিক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে-গর্ভনরের ছেলে তো মোটেও ভালো ফল করেনি! তাহলে গভর্নর কেন এত বড় পার্টি এত ধুমধামের সাথে দিলেন ? পরে জানা গেল ঘটনার গোমর ৷ একই নামে দুজন ছাত্র আছে ক্লাসে ৷ এর মধ্যে অপরজনের রেজাল্ট খুবই ভালো ৷ গভর্নরের ছেলে সেই চমৎকার প্রগ্রেসিভ রিপোর্টটা তুলে দিয়েছে তার বাবার হাতে ৷ সেটা দেখেই বাবা উচ্ছ্বসিত হয়েছেন-বাহ্, এক বছরেই ছেলের এত উন্নতি ৷ যাক, ছেলে তাঁর বাবার নাম রেখেছে ৷ কী সুখের বিষয়! দাওয়াত করো সবাইকে ৷ সেই দাওয়াত খেয়ে শিক্ষকদের সবার মনমেজাজ অন্তত এক মাস খারাপ ছিল ৷ বাকী অংশ পড়ুন>>>

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE