Home / নারী / নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা / আপৎকালীন গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা (গর্ভ নিরোধ ও গর্ভপাত)

আপৎকালীন গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা (গর্ভ নিরোধ ও গর্ভপাত)

আর্টিকেলটি পড়ে আমরা জানবো “আপৎকালীন গর্ভনিরোধক ব্যবস্থাগুলি কি কি, আপৎকালীন গর্ভনিরোধক ওষুধ, ওষুধ খেয়ে গর্ভমোচন” ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে।

০১ সন্তানধারনের ইচ্ছুক নন, অথচ অসতর্ক অবস্থায় যৌন সহবাস হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে কী করনীয়?

উত্তরঃ করণীয় আছে। অসতর্ক সহবাসের পাঁচ দিনের মধ্যে এই উপায় অবলম্বন করলে গর্ভসঞ্চার রোধ করা সম্ভব। অথবা যখন জন্মনিরোধক পদ্ধতি ব্যর্থ হয়, তখন এই উপায়ে গর্ভরোধ করা সম্ভব। এই উপায় কিন্তু গর্ভমোচন করানোর অনুরূপ নয়, কারণ আপৎকালীন গর্ভরোধ ব্যবস্থা গর্ভসঞ্চার হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করে। বর্তমানে অবশ্য ওষুধ খেয়ে গর্ভমোচন করা সম্ভব, সেটা অবশ্য আলাদা বিষয়।

০২ আপৎকালীন গর্ভনিরোধক ব্যবস্থাগুলি কি কি?

২.১ হরমোনের সাহায্যে গর্ভসঞ্চার রোধ।

২.২ অ্যান্টি-প্রজেস্টরোন ওষুধের সাহায্য গর্ভরোধ।

২.৩ জরায়ুতে কপার-টি বা মাল্টিলোড কপার স্থাপন করে গর্ভসঞ্চার রোধ।

০৩ কখন জরুরী গর্ভনিরোধক পদ্ধতি অবলম্বন করার দরকার?

৩.১ কোনো গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা না নিয়ে সহবাস হলে, বিশেষ করে অবিবাহিত তরুণীর ক্ষেত্রে।

৩.২ জোর করে সহবাসে বাধ্য হল। যেমন—ধর্ষণের জন্য।

৩.৩ পরপর দু’দিন বা তার বেশি গর্ভনিরোধ বড়ি খেতে ভুলে গেলে।

৩.৪ যখন সহবাসকালে কনডম ফেটে যায় বা সঠিক ব্যবহার করা হয়নি।

৩.৫ সহবাসের পর স্ত্রী যদি বুঝতে পারেন যে, কপার-টি বা লুপ সঠিক স্থানে নেই।

৩.৬ যেমন স্বামী withdrawal Method মেনে গর্ভনিয়ন্ত্রণ করেন, সেক্ষেত্রে বীর্য যোনিতে স্খলন হয়ে গেলে।

৩.৭ কোনো কোনো স্বামী ডিম্বাণু নিঃসরণ হওয়ার সময় সহবাস না করার উপায় (Safe period) মেনে চলেন এবং ঋতুচক্রের হিসাব ভুল হওয়ার জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন, সেক্ষেত্রে।

৩.৮ পিল বা বড়ি খাওয়ার সময় খুব বেশি বমি বা ডায়রিয়া হলে পিলের হরমোনের বিশোষণ  সঠিক না হওয়ার জন্য গর্ভসঞ্চার হতে পারে—এইসব ক্ষেত্রে।

০৪ আপৎকালীন গর্ভনিরোধক বড়িঃ

এগুলি আসলে উচ্চমাত্রার প্রোজেস্টরোন বড়ি। একটি প্যাকেটে দুটি বড়ি থাকে। প্রতিটি বড়ি ০.৭৫ মিলিগ্রামের। ২০০২ সালে এই বড়ি ভারতের বাজারে প্রবেশ করেছে। বিভিন্ন কোম্পানির  এই বড়িগুলির নাম হল—

নরলিভো (norlevo), পিল-৭২ (Pill-72), ই সি-২ (ECee2)

সহবাসের পর ব্যবহার করা হয় বলে এই বড়িগুলির নাম Post coital  pill বা Morning after pill।

বড়িগুলি খাবার নিয়মঃ

অসতর্ক যৌন সহবাসের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব (অবশ্যই সহবাসের ৭২ ঘন্টার মধ্যে) ১ টি বড়ি খেতে হবে। পরের বড়ি প্রথম বড়ি খাওয়ার  ১২ ঘন্টা বাদে খেতে হবে।

বড়িগুলি কতটা কার্যকরিঃ

অসতর্ক এবং একবার যৌন সহবাসের পর ইমার্জেন্সি কনট্রাসেপটিভ বড়ি খেলে প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে গর্ভরোধ করা সম্ভব।

বড়ির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিঃ

কোনো কোনো মহিলার গা-বমি ভাব বা বমি হতে পারে। আবার কারোর কারোর মাথাধরা, ক্লান্তিভাব ও স্তন ভারী-ভারী ইত্যাদি হয়। ওষুধ খাওয়ার এক ঘন্টার মধ্যে বমি হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো, কারণ এক্ষেত্রে ওই ওষুধের ডোজ পুনরায় প্রয়োগ করতে হতে পারে।

অন্য ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়াঃ

এই ওষুধ খাওয়াকালীন অন্য কিছু কিছু ওষুধ খেলে এই ওষুধের কাজের ক্ষমতা অবদমিত হয় বা কমে যায়। ওই ওষুধগুলি হল—

  • মৃগী রোগে ব্যবহৃত ওষুধ—Phenoberbitone, Phenytoin, Carbamazepin ইত্যাদি।
  • কড়া অ্যান্টিবায়োটিকস ও টিবি’র জন্য ব্যবহৃত ওষুধ—Rifampicin।
  • ছত্রাক সংক্রমণের জন্য ব্যবহৃত ওষুধ—Griseofulvin।

বড়িগুলি কতবার খাওয়া যেতে পারেঃ

যতবার প্রয়োজন ততবারই খাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এটা জেনে রাখা উচিত যে, এই বড়ি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির বিকল্প নয়।

বড়িগুলি কীভাবে কাজ করেঃ

ডিম্বাণুকে নিঃসরণ প্রতিরোধ করে বা নিঃসরণ হতে দেরি করায়—যদি এই বড়ি মাসিক শুরুর প্রথম দিকে ব্যবহৃত হয়।

  • ডিম্বাণুকে নিষিক্ত হতে দেয় না।
  • জরায়ুতে ভ্রূনের প্রতিস্থাপন হতে দেয়, যেহেতু এই বড়ি এন্ডোমেট্রিয়ামের যে পরিবর্তন ঘটায় তা ভ্রূণ স্থাপনের পক্ষে প্রতিকুল।
  • করপাস লুটিয়ামের কার্যকারিতায় বাঁধার সৃষ্টি করে।

যদি আপৎকালীন গর্ভনিরোধক ওষুধ কাজ না করে এবং গর্ভসঞ্চার হয়, তাহলে গর্ভস্থ শিশুর কোনো ক্ষতি হয় কি নাঃ

ক্ষতি হয় না। এখনও ওইরকম কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, আপৎকালীন গর্ভনিরোধ বড়ি বিকাশমান ভ্রূণের ক্ষতি করে।

আপৎকালিন জন্মনিরোধক বড়ি ছাড়া অসতর্ক সহবাসের পর গর্ভরোধের অন্যান্য উপায়

  • একটি উপায় হল—অ্যান্টি-প্রোজেস্টেরোন ওষুধ সেবন।
  • আর দ্বিতীয় উপায়—জরায়ুতে কপার টি বা মাল্টিলোড কপার প্রতিস্থাপন।

অ্যান্টিপ্রোজেস্টেরোন মাইফিপ্রিস্টোন

Ru-486 একধরনের স্টেরয়েড হরমোন, যা প্রোজেস্টেরোনের বিপরীতধর্মী। ফ্রান্সের ডাক্তার Etienne-Emile beaulieu ১৯৮০ সালে Ru-486 আবিস্কার করেন। ওষুধটি ওই দেশে ১৯৮৯ সাল থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ভারতের বাজারে ওষুধটি প্রবেশ করেছে এপ্রিল ২০০২ সালে। এই ওষুধ জরায়ু-অভ্যন্তরের এন্ডোমেট্রিয়ামের প্রোজেস্টরোন রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শরীরে প্রোজেস্টেরোন হরমোনের প্রভাবমুক্ত করে। ফলে গর্ভফুলের পচন ধরে এবং স্খলন (ডিটার্চমেন্ট) হয়। এই হরমোন সার্ভিক্সকে নরম করে এবং জরায়ুর মৃদু সঙ্কোচন সৃষ্টি করে। বিভিন্ন কোম্পানির ওই ওষুধ যে নামে বাজারে পাওয়া যায়, তা হল—

  • মাইফিপ্রিন-২০০ মিগ্রা।
  • মাইফিজেস্ট-২০০ মিগ্রা
  • এম.টি. পিল-২০০ মিগ্রা

ওষুধ গুলি খাওয়ার নিয়মঃ

২০০ মিলিগ্রামের ৩ টি বড়ি (৬০০ মিগ্রা) মাসিকের ২৭ দিনের মধ্যে খেতে হবে। (তা সে যে দিন বা যতবার অসতর্ক যৌন সহবাস হোক না কেন)। এক্ষেত্রে গর্ভসঞ্চার হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

জরায়ুর মধ্যে স্থাপিত লুপ বা কপারটি, মাল্টিলোড কপার ইত্যাদি

গর্ভপাত বা গর্ভনিরোধ
ছবিঃ গর্ভধারণের পরীক্ষা

অসতর্ক যৌন সহবাসের পাঁচ দিনের মধ্যে জরায়ুতে কপার-টি বা মাল্টিলোড কপার লাগালে গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই উপায় জরায়ুতে ভ্রূণ প্রতিস্থাপিত হতেদ দেয় না। এই উপায় অবলম্বন করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা  প্রায় নেই। তবে যারা সন্তানের মা হননি (বিবাহিত বা অবিবাহিত তরুণী), তাঁদের ক্ষেত্রে জরায়ুতে প্রতিস্থাপিত করা ব্যবস্থা, যেমন—কপার-টি বা মাল্টিলোড দেওয়া  উচিৎ নয়। তবে এক্ষেত্রে লাভ হল আপৎকালীন গর্ভনিরোধকের কাজটি হবার পরও তিন থেকে পাঁচ বছর গর্ভসঞ্চার প্রতিরোধ করা সম্ভব, যদি কপার-টি বা  মাল্টিলোড কপার জরায়ু থেকে খুলে না দেওয়ার হয়। বর্তমানে অবশ্য দশ থেকে পনেরো বছরের জন্য গর্ভনিরোধক কপার-টি বা মাল্টিলোড পাওয়া যাচ্ছে।

Enova-দশ বছর আর T-Cu-380 Ag—পনেরো বছর গর্ভসঞ্চার রোধ করে।

ওষুধ খেয়ে গর্ভমোচন

সম্প্রতি এধরনের ওষুধ বাজারে এসেছে। গর্ভসঞ্চারের সাত সপ্তাহ বা ঊনপঞ্চাশ দিনের মধ্যে এই ওষুধ খেলে গর্ভমোচন করা সম্ভব। Ru-486 বড়ি (Mifeprin-200mg, Mifegest-200mg বা M.T. Pill-200mg) তিনটি বড়ি একসঙ্গে খেতে হবে। এই বড়ি খাওয়ার আটচল্লিশ ঘণ্টা বাদে প্রস্টাগ্লান্ডিন ই-২ বড়ি (misoprost-200mcg বা cytology-200mcg) ২ টি বড়ি খেতে হবে অথবা যোনিতে প্রবেশ করাতে হবে। দশ দিনের মধ্যে ঘরে বসেই গর্ভপাত হয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ গর্ভমোচন হয়। অল্প কিছু ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ গর্ভমোচন হয় এবং সেক্ষেত্রে সাকশন ইভাকুয়েশন বা ডি/ই অপারেশন কর‍তে হবে। তবে যে সমস্ত মহিলা ধূমপান করেব, যাদের হার্টের রোগ বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাঁদের ওপর এই ওষুধ প্রয়োগ করা নিরাপদ নয়।

লেখকঃ ডাঃ অবিনাশ চন্দ্র রায়। (স্ত্রীরোগ-বিশেষজ্ঞ)

লেখকের গর্ভবতী মা ও সন্তান বই থেকে নেওয়া।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ

গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ-মা ও শিশুর বিপদ ও চিকিৎসা

গর্ভাবস্থায় যে-কোন সংক্রমণ মা ও শিশুর বিপদের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। এর জন্য মা ও শিশু …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *