Home / বই থেকে / 55 (মা)

55 (মা)

১৭ই ডিসেম্বরেই দুপুরবেলা বোন শাহনাজ আর মুক্তিযোদ্ধা ফতেহ আলী চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে হাবিবুল আলম একটা জিপ চালিয়ে যায় নাজিমুদ্দিন রোডের জেলখানায়৷ তারা জানতে পেরেছে, চুল্লু ভাই আর সামাদ ভাই আছেন এখানে৷ তাদের মনে আশা, হয়তো আছে জুয়েল, রুমী, বারেক, আজাদ৷ তারা তাদের জন্যে ফুল নিয়ে যায়৷ আলম জেলারকে বলে, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের ছেড়ে দিতে হবে৷’ জেলার যথাযথ কতৃপক্ষের লিখিত হুকুম ছাড়া মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান৷ তখন হাবিবুল আলম নিজে সেক্টর টু আর প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাসহ সব যুদ্ধবন্দিকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশপত্র লিখে স্বাক্ষর করে দেয়৷ জেলার তার ঊর্ধতন কর্তার সঙ্গে ফোনে কথা বলে মুক্তিযোদ্ধাসহ যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন৷

মুক্তিযোদ্ধারা বেরিয়ে আসে৷ কাজী ইকবাল, মাহবুবুল্লাহসহ অনেককেই দেখা যায় সেই দলে৷ তারা হাবিবুল আলম আর ফতেহর সঙ্গে মোলাকাত করে৷ শাহনাজ তাদের হাতে ফুল তুলে দেয়৷ মুক্তিপ্রাপ্ত অন্য মুক্তিযোদ্ধা আর যুদ্ধবন্দিরাও তাদের ঘিরে ধরে৷ তারা চিৎকার করে ওঠে : জয় বাংলা৷ তাদেরকেও ফুল দিয়ে বরণ করে শাহনাজ৷ তাদের অনেকেরই চোখে জল৷ তারা কেউ কেউ জেলখানা চত্বরে হাঁটু গেড়ে বসে মাথাটা ঠেকায় মাটিতে, মাটিকে চুমু দেয়, মুক্ত ভূমিকে, দু হাত মাটিতে বুলিয়ে নিয়ে সেই হাত বোলায় চোখে মুখে মাথায়…

শাহনাজ, হাবিবুল আলম আর ফতেহ তাদের জিপে ফিরে আসে৷ সঙ্গে নিয়ে আসে চুল্লু ভাই আর সামাদ ভাইকে৷ গত কয়েক মাসে শাহনাজসহ হাবিবুল আলমের বোনেরা তাদের দিলু রোডের বাসায় এত অস্ত্র নেড়েছে, পরিষ্কার করেছে যে, একেকজন পরিণত হয়েছে একেকটা অস্ত্র-বিশেষজ্ঞে৷ আবার মুক্তিযোদ্ধারা তাদের বাসায় আসত, বিশেষ করে আহত হওয়ার পরে কয়েক দিন জুয়েল ছিল তাদের বাসায়, সেই সূত্রে জুয়েল, বদি, রুমী, আজাদদের জন্যে তাদের এক ধরনের মায়া জমে গেছে৷ শাহনাজ আগে থেকেই জানত, ঢাকা কারাগারে চুল্লু ভাই আর সামাদ ভাই ছাড়া ঢাকার গেরিলাদের আর কেউ নাই৷ তবু তার একটা ক্ষীণ আশা ছিল, হয়তো জুয়েল ভাইকে পাওয়া যাবে, রুমী-বদি-আজাদদের দেখা মিলবে৷ কিন্তু যখন বাস্তবতা এসে তার সেই ক্ষীণ আশাটুকুকে উড়িয়ে নিয়ে গেল, শাহনাজ কিন্তু ভেতরে ভেতরে মন খারাপ করে৷ জিপে উঠে সে আলমের হাত থেকে স্টেনগান তুলে নিজের হাতে নেয়৷ তারপর যে হাতে এত দিন সে শুধু অস্ত্র পরিষ্কারই করেছে, আজ মুক্ত বাংলাদেশের আকাশ লক্ষ্য করে সেই হাত দিয়ে সে গুলি ছুড়তে থাকে৷ তাকে গুলি করতে দেখে মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিরা আবার চিৎকার করে ওঠে : জয় বাংলা৷ সবাই ধরেই নেয় শাহনাজের মতো মেয়ে গুলি ছুড়ছে আনন্দে৷ কিন্তু শাহনাজ জানে না, গুলি কেন সে ছুড়ছে ? বিজয়ের আনন্দে, ভাইকে ফিরে পাওয়ার প্রশান্তিতে, নাকি অন্য সব গেরিলাকে খুঁজে না পাওয়ার ক্ষোভে! গুলির আওয়াজে জেলখানার সানশেডে বাসা বানানো পায়রাগুলো উড়ে উঠে ছেয়ে ফেলে নাজিমুদ্দিন রোডের আকাশ-বাতাস৷

জিপ স্টার্ট নেয়৷ একটু একটু করে তারা ছেড়ে আসছে জেলখানা চত্বর৷ ১৭ই ডিসেম্বরের এই দুপুর রোদে এমনভাবে ঝলকাচ্ছে, যেন বিজয়ের জমক এসে লেগেছে আকাশে-বাতাসে৷ মুক্ত পায়রাগুলো যেন ছড়াচ্ছে শান্তির আশ্বাস৷ শাহনাজ স্টেনগানটা হাতে নিয়েই বারবার পেছনে তাকায়, কারাগারের দরজার দিকে তার চোখ যেন আরো কাউকে কাউকে খোঁজে৷

এক সময় কারাগারের দেয়াল তার দৃষ্টিসীমা থেকে অদৃষ্ট হয়ে যায়৷

বাকী অংশ পড়ুন…

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মোজার উপর মাসাহ

মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান (হাদিস)

জেনে নিন মোজার উপরে মাসাহ করার বিধান। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ চামড়ার মোজা পরিধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE