Home / ব্লগ / আমার একটা ব্যাংক ছিল-খেয়ে পেলেছি! ব্যাংক চোরদের কাহিনী

আমার একটা ব্যাংক ছিল-খেয়ে পেলেছি! ব্যাংক চোরদের কাহিনী

টিউটোরিয়াল – কিভাবে ব্যাংক খেয়ে ফেলতে হয়

আমার একটা ব্যাংক ছিল। খেয়ে ফেলেছি। আপনার একাউন্টের টাকাও । আপনি টের পাচ্ছেন না? পাবেন কেন? আমি তো আপনার থেকে অনেক বেশী চালাক।

আপনি খালি যে বুঝেন না যে আমি আপনার একাউন্টের টাকা খেয়ে ফেলেছি তাই নয় , আপনি নিজেই সেই খোয়া-যাওয়া টাকা কাভার করে (পুষিয়ে) দিচ্ছেন।
.
হাহাহা … বুঝতে পারেন নাই? হাহাহা … গর্ধব কোথাকার (গর্ধব শব্দটা চুপি চুপি বলেছি, আপনার শোনার কথা না)
.
শুনেন, অনেক লাইন-টাইন করে আমি একটা ব্যাংক খুলেছিলাম । আরে, কোনো একাউন্ট-ফেকাউন্ট না। আস্ত একটা ব্যাংকই খুলেছিলাম । অনেকেই একাউন্ট খুলেছিলো আমার সেই ব্যাংকে। টাকা জামানতও রেখেছিলো।
.
ব্যাংক হিসাবে আমার কাজ ছিল খাঁটি ব্যবসায়ীদেরকে টাকা ধার দেয়া যখন সে লোন (ঋণ) চাইবে। মনে করেন, ১০% ইন্টারেস্টে। সুদ বললাম না কারণ কিছু কিছু শব্দ ইংরেজিতে বলার আলাদা একটা মজা আছে। তো আমি যে টাকাটা ব্যবসায়ীকে ধার দিবো, সেই টাকাটা আমি পাবো কোথায় ?
.
কোথায় টাকাটা পাবো বললে আপনার মতো উজবুকের কথা আসে। জ্বি জ্বি, আপনি তো উজবুক বটেই। কেন উজবুক, সেইটা পরে বলছি। যাইহোক, আপনি আমার ব্যাংকে একাউন্ট খুলে টাকা জমা রাখেন। খুলতে গিয়ে একটা criterion-ই দেখেন বেশীরভাগ সময় — কত সহজে আপনি ব্যাংকে যাওয়া-আসা করতে পারেন ব্যাংকিংয়ের জন্য ।
.
সবাইই ব্যাংকেই টাকা রাখে — প্রাইভেট হোক বা সরকারি ব্যাংকেই হোক। আপনার মতো আরো বহু মানুষ আমার ব্যাংকে একাউন্ট খুলেছিলো নিজেদের টাকাগুলো নিরাপদে রাখার জন্য। ডিপোজিটরদেরকে আমি ৮% দিতাম ইন্টারেস্ট। তাহলে (১০ – ৮
২% আমার লাভ। প্লাস ইচ্ছামতো, আমার যেমন খুশি তেমনই সার্ভিস চার্জ আদায় করে নিতাম আপনার থেকে। আমার ইচ্ছা আমি যেমন খুশি তেমন সার্ভিস-চার্জ করতাম — আপনার ইয়ের ক্ষমতা আছে কিছু বলার ? কারণ সবার বড় বাপ তো আমার পায়ের তলায়। জ্বি, বিবির কথা বলছি। বাংলাদেশ ব্যাংক।
.
আমার ব্যাংক থেকে কোনো ব্যবসায়ীকে ধার দেয়ার ইন্টারেস্ট রেইট যেইটা আদায় করি এবং টাকা জমদানকারী-আপনাক
ে যেই ইন্টারেস্ট রেইট আমি খুশী হয়ে দেই, তার মধ্য থেকে আমি মাত্র (১০% – ৮% = ? ) ২% পাই। তো আপনি আমাকে চেনেন না? আমার ম্যানেজমেন্টে / ডিরেক্টরশীপে কারা আছে, আপনি সেইটা দেখেন না ? আপনি কি বুঝেন না যে ওই কচুর ২% আমাকে সন্তুষ্ট করে না ? আমার তো অনেক দরকার। কাড়ি কাড়ি টাকার দরকার। কাড়ি কাড়ি টাকার জন্য আমি কি করতে পারি ?
.
মজার ব্যাপার হচ্ছে যে আমাকে কিছুই করতে হবে না। কারণ আমি জানি, আমি যেই company keep করি (মানে হচ্ছে আমার বন্ধুরা, মানুষ বন্ধু, কোনো প্রতিষ্ঠান নয়), ওরা আমার কাছে আসবে। এসে বলবে, “দোস্ত, আমার তো কিছু টাকার প্রয়োজন”।
.
ওরা এসেছিলোও । আমিও বলেছিলাম, “আলবৎ”।
.
একজন বন্ধুকে ১০০ কোটি টাকার লোন approve করানো জন্য যা কিছু করার দরকার আমি করে দিলাম। আমি তো জানিই যে সে কোল্যাটারাল (বন্ধক) হিসাবে যা দিয়েছে, যেই জমির দলিল দিয়েছে, সেইটা তো একটা ১০-১৫ শতাংশের একটা পুকুরের দলিল বা একটা নীচু জমির দলিল , তাও যদি আমার বন্ধুটা ভালো হয় ; আর যদি আমার মতো কিছুটা crooked (অসৎ) হয়, তাইলে তো সে নিশ্চিত সরকারি কোনো জমির, যেমন ধরেন রেইলওয়ের জমির, ভুয়া দলিল জমা দিয়েছে আমার ব্যাংকে লোন নেয়ার জন্য । দিক না, অসুবিধা কি? আমার ব্যাংক, আমি বলে দিয়েছি। কোনো কর্মচারীর সাহস হবে আমি যেই লোন রেকমেন্ড করে দিয়েছি, সেই লোন এপ্রুভ না করার ?
.
আমার বন্ধু জানে যে আমি দাতা হাতেম-তাই নই । আমার বন্ধুর লোন আমার ব্যাংকে এপ্রুভড হবার পর আমার ত্রিশ কোটি টাকা কমিশন আমি যেইটা পেয়েছি বন্ধুর কাছ থেকে, সেইটা আমি বিভিন্ন উপায়ে আমার ছেলে-মেয়ের কাছে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছি। বা সুইস ব্যাংকে রেখেছি। আমি চোর হতে পারি কিন্তু ছেলে মেয়েদের কাছে ঐটা পুরোটাই obvious (পরিষ্কার) করে দেয়ার কি কোনো দরকার আছে ? সন্তানের কাছে মান ইজ্জত আছে না আমার ?
.
তারপর কি হয়েছে, শুনেন। আমি এইরকম ১০০ কোটি টাকার আরো দশটা লোন দিয়েছি। মোট ১,০০০ কোটি টাকার। বিভিন্ন জনের কাছে। কাউকে একাধিক দিয়েছি, যে আমাকে কমিশনটা একটু বেশী দিয়েছে। তাইলে আমার পকেটে কত টাকা গেলো ? আর আমার বন্ধুরাই বা কত পেলো ? আমি-ব্যাংক-মালিকের যেই বন্ধুরা ৩০০ কোটি টাকা কমিশন বাদ দেয়ার পর যে ৭০০ কোটি টাকা নেট (net, নীট উচ্চারণ নয়) পেলো, সেখান থেকে মনে করেন যে আরো ২০-২৫ কোটি টাকা আমার ব্যাংকের বিভিন্ন কর্মচারীদেরকে এইটা-সেইটা কিনে দেয়ার জন্য বখশিশ দিলো। আজকাল বড় সাহেব বলে দিলেও ছোটদেরকে খুশী রাখতে হয়। ঐটাই রেওয়াজ।
.
তো বুঝে গেলেন তো যে আমি এবং আমার বন্ধুরা আমার ব্যাংকে আপনাদের একাউন্ট-হোল্ডারদের গচ্ছিত টাকা থেকে ১,০০০ কোটি টাকা মেরে দিলাম।
.
এই যে এতো ভূমিকা, সেগুলো দিলাম পরবর্তী কথাগুলো বলার জন্য।
.
আপনি হয়তো জানেন না যে, ব্যাংকে জামানত হিসাবে যত টাকা উজবুকেরা রাখে, তার একটা নির্দিষ্ট অংশ — মনে করেন ৬.৫% — আবার বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হয়, নিরাপত্তার কারণে। ব্যাংকের কিছু একটা হয়ে-টয়ে গেলে বিবিতে গচ্ছিত রাখা টাকাটা কাজে লাগায় বিবি। জামানতকারীদের স্বার্থে।
.
তো আমার ব্যাংকে উজবুকদের ৫০০০ কোটি টাকা ছিল। সেইখান থেকে ৬.৫% হিসাব করে ৩০০ কোটির সামান্য কিছু বেশী টাকা বিবিতে রাখতে হয়েছে।
.
তাইলে ব্যবসা করার জন্য আমার কাছে, হেঁহেঁহেঁ মানে আমার ব্যাংকে, রইলো –>> ৫০০০ (গ্রাহকের জমাকৃত) – ১০০০ (চুরি) – ৩০০ (বিবি) = ৩৭০০ কোটি টাকা।
.
তো এই যে ৩৭০০ কোটি টাকা রইলো, এর মধ্যে থেকে তো আমার ব্যাংক জেনুয়াইন কিছু ব্যবসায়ীকে টাকা ধার দিয়েছে। ভালো কিছু মানুষকে ধার দিয়েছি এপার্টমেন্ট কেনার জন্য, তারেকের (লন্ডনী Tarek না ) মতো বা মুকুলের (আরেক ফেইসবুকার, Mobaidul ) মতো কাউকে বিয়ে করার জন্য লোন দিয়েছে । মনে করেন ৩৬০০ কোটি টাকা ভালো মানুষের কাছে লোন দিয়েছে । তাহলে আমার ব্যাংকের কাছে ক্যাশ রইলো (৩৭০০ – ৩৬০০ ১০০ কোটি টাকা।
.
এখন এই ১০০ কোটি টাকা দিয়ে আমার দৈনন্দিন সাধারণ (রিটেইল) ব্যাংকিং চালাতে হবে। অর্থাৎ আপনি চেক ভাঙানোর জন্য কাউন্টারে দিলে সেই পরিমান টাকা আপনাকে দিতে হবে।
.
কোনো কোনো উজবুক গ্রাহক হয়তো আবার ক্যাশ বা চেক জমা দিতে আসবে সেভিংস একাউন্টে জমা করবে বলে ।
.
কিন্তু মনে করেন, কোনো একদিন চেক ক্যাশ করতে অর্থাৎ ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে বেশী মানুষ চলে আসলো। সেইদিন কি হবে? খুলে বলছি।
.
মনে করেন আমার ব্যাংকে ক্যাশ আছে ১০০ কোটি টাকা। উজবুকেরা সেইদিন সেভিংসে জমা দিলো আরো ১০ কোটি টাকা। তাহলে মোট দাঁড়ালো ১১০ দশ কোটি টাকা। কিন্তু ঐদিনই মনে করেন চেক ভাঙাতে এলো এত্তো এত্তো গ্রাহক যে তাদের সম্মিলিত withdrawal amount দাঁড়ালো ১২৫ কোটি টাকায় । তাহলে এই যে একদিনে (১২৫ – ১০০ ১৫ কোটি টাকার ঘাটতি পড়ে গেলো, সেইটা কিভাবে সামাল দিবো ?
.
খুবই সহজ। আমার কর্মচারীরারা আপনার মতো উজবুককে বলে দিবে, “ভাই, টাকা নাই, কাল পরশু একবার আসেন”। আমার ব্যাংক তখন এই আশায় থাকবে যে আগামীকালকে হয়তো জমার পরিমান বেশী থাকবে withdrawal amount থেকে। না থাকলে ওই একই কাহিনী — বলবো, “পরে আসেন”।
.
কিন্তু এইভাবে তো আর প্রতিদিন চলতে পারে না। আর তাছাড়া আমি তো আপনার মতো আবাল না। আমি মাত্র ৩০০ কোটি টাকা চুরি করতে পেরেছি ৫০০০ কোটি টাকা থেকে। আমার তো আরো চাই। আরো অনেক। আরো. আরো। কিন্তু কিভাবে?
.
হেঁহেঁহেঁ … আমি প্রভাবশালী পক্ষের লোক। মানে হচ্ছে যে আমার ভালো কানেকশান আছে। আমি প্রভাবশালীদের কাছে গিয়ে বললাম, “আব্বা, ৩০০ কোটি যেইটা মেরে দিয়েছি, সেইখান থেকে তো আপনাকে ১০০ কোটি টাকা দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন তো ব্যাংকে তারল্য সঙ্কটের জন্য সাধারণ গ্রাহকের লেনদেন চালাতে পারছি না, এর একটা বিহিত করেন, আব্বা” ।
.
আব্বা বললেন, “হ্যা, জানি তুমি ১০০ কোটি দিয়েছো, আর তোমার বন্ধুরা যারা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে (১০০০ – ৩০০) নেট ৭০০ কোটি টাকা টাকা লোন নিয়েছে, ওরাও আমাকে দিয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা। মোট ৪৫০ কোটি টাকা পেয়েছি আমি । তুমি একা পেয়েছো ২০০ কোটি টাকা। আর তোমার সব বন্ধুরা মিলে পেয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা। মোট ১০০০ কোটি টাকা। ”
.
আব্বা চিন্তা করলেন কিছুক্ষন। তারপর আব্বা একজন গরু-চড়ানো লোককে ডাক দিলেন। ওকে জিজ্ঞেস করলেন , “কি করা যায়” ? রাখাল বলে, “আমার তো কিছু করার নাই। আপনি বললে আমি নতুন কচকচে টাকা প্রিন্ট করে ঘাটতি-ব্যাংকগুলোতে লোন হিসাবে দিতে পারি কিন্তু তখন তো দেশে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাবে, মানে দশ টাকার জিনিস ১৫ টাকায় কিনতে হবে কারণ তখন দেশে টাকার পরিমান বেড়ে যাবে ।”
.
“কেন বাড়বে ? টাকা চুরি করে বিদেশে পাঠিয়ে দিলে যেই পরিমানটা কমবে, তুমি ওই পরিমানেই ছাপিয়ে দিও “, বাবা বললেন ।
.
রাখাল বললো, “একটু বুঝিয়ে বলি। মনে করেন, আগে দেশের জনগণের হাতে সব মিলিয়ে মোট ৫০,০০০ কোটি টাকা ছিল। এই ৫০,০০০ কোটি টাকা দিয়ে মাছ, মাংস, এপার্টমেন্ট, গাড়ি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি কিনতো। এখন মনে করেন, আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকের অসুখের কথা মনে করে সেই ব্যাংকগুলোকে সুস্থ করে দেয়ার জন্য লোন হিসাবেই ধরেন দিলাম ১০,০০০ কোটি টাকা, ধরেন নতুন টাকা প্রিন্ট করেই দিলাম, তাহলে তো অর্থনীতিতে (দেশে) পঞ্চাশ প্লাস দশ, মোট ৬০,০০০ কোটি টাকা চলে আসবে। তখন ওই সমপরিমান জিনিসগুলোই ( মাছ, মাংস, এপার্টমেন্ট, গাড়ি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি) কিনতে তখন কিন্তু ঐ ৬০,০০০ টাকাই লেগে যাবে। তার মানে জিনিস পত্রের দাম বেড়ে যাবে, তার মানে মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে।”
.
“আরে ব্যাটা রাখাইল্ল্যা, দাঁড়াও, যেই টাকা চুরি হয়েছে, সেইটা তো বিদেশেই পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে, তাহলে টাকার পরিমান বাড়বে কিভাবে ? যেই দশ হাজার কোটি টাকা পাঁচার হয়েছে বিদেশে, সেই দশ হাজার কোটি টাকার নতুন বিল ছাপিয়ে না তুমি ব্যাংকগুলোকে দিবে। ”
রাখাল: “বিদেশে তো আর বাংলাদেশী টাকা (নোট) পাঠায় নাই। ওই চোরাই টাকা দিয়ে ডলার কিনে, ডলার পাঠিয়ে দিয়েছে বিদেশে। টাকাটা তো দেশের ডলার বিক্রেতার কাছেই রয়ে গেলো। তার মানে দেশেই রয়ে গেলো। টাকার সারকিউলেশন তো পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকাই আছে। খালি উজবুজকদের ব্যাংকের টাকাগুলো অন্য হাতে চলে গিয়েছে — ডলার বিক্রেতার কাছে । তাই না ব্যাংকে shortage (ঘাটতি) হয়েছে । তো আবারো বলছি, সেই ঘাটতি পূরণ করতে হলে যদি আমাকে টাকা ছাপাতে হয়, তাহলে কিন্তু ইনফ্লেশান বা মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে”
.
বাবা বললেন, “না, মুদ্রাস্ফীতি হলে তো অসুবিধা। জনগণ মুদ্রাস্ফীতি পছন্দ করে না। বড়-আব্বাও নাখোশ হবে। ঐটা ছাড়া আর কি উপায় আছে?”
.
তখন একজন জ্ঞানী বৃদ্ধ ব্যক্তিকে ডাকা হলো। সেও বললো, ” কিছু করার নাই। রাবিশ চোর-ব্যাংকারদের জেলে ভরতে পারেন। ভরলে চুরির সব টাকা ফেরত পাবেন, প্লাস ভবিষ্যতে কেউ আর চুরিও করবে না। ”
.
বাবার কথাটা পছন্দ হয় নাই। উনিও তো একটা কমিশন পাচ্ছেন।
.
আমি চুপচাপ কথা শুনছিলাম। মনে মনে বলি –আমি তো বানে ভেসে আসি নাই, আমার মাথায় কিছু বুদ্ধি শুদ্ধি আছে। আমি বললাম, “আব্বা, একটা বড়ই মোমিন-মুসলমান আছেন । এক্কেবারে খাঁটি সন্যাসী । ওনাকে ডাকি শলা-পরামর্শের জন্য ?”
.
বাবা খুশী হয়ে গেলো। হাসতে হাসতে বললো, “ডাকো, ডাকো, ওই হারমজাদারে ডাকো। ওর মাথায় দেখো না কত বুদ্ধি। সুন্দর দাড়ি রেখেছে, ধর্মটাকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করছে মুসলিম-লেবাস পড়ে ।”
.
সন্ন্যাসী তো রেডী হয়েই ছিলেন। কারণ আমি আসার আগে ওনাকে বলে এসেছিলাম যে আমি একটু ঐখানে যাচ্ছি । তো ফোন কল পেয়ে সন্ন্যাসী-বাবা দৌড়ে এলেন হাঁপাতে হাঁপাতে। সব শুনে বললেন — “একটা কাজ করা যায় না — জনগণের উপর করের (ট্যাক্স) বোঝাটা একটু বাড়িয়ে দেয়া যায় না? গ্যাস বিদ্যুৎ পানি ইত্যাদি ইত্যাদিতে রেইটটা একটু বাড়িয়ে দেন না, প্লীজ । এর ফলে যেই এক্সট্রা টাকাটা রাজস্ব হিসাবে আসবে সরকারের কাছে , সেইটা থেকে আমাদের ব্যাংকে ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার থেকে ব্যবস্থা করে দিবেন। আমাদেরও তারল্য সঙ্কট কেটে যাবে। আর যেহেতু নতুন টাকা ছাপানো হচ্ছে না, মুদ্রাস্ফীতিও হচ্ছে না ব্যাপকভাবে “।
.
বাবা বললেন, “জনগণের উপর অতিরিক্ত কর চাপিয়ে দিয়ে যেই রাজস্ব আদায় করবো, তোমাদেরকে সেই অতিরিক্ত-আদায়-করা-রাজস্বর টাকাটা দিয়ে দেয়া হবে ? জনগণকে কি বলে বুঝ দেয়া যাবে তখন ? ”
.
সন্ন্যাসী তখন বললেন যে জনগণকে উদ্দেশ্য করে এইভাবে বলতে বলবেন, “আহারে, রুগ্ন ব্যাংকগুলো ! ওদেরকে সুস্থ্য করার জন্য টাকা লোন দেয়া দরকার। না দিলে তো সাধারণ পাবলিক তাদের জমাকৃত টাকা ব্যাংক থেকে তুলতে পারবে না। .সুতরাং, জনগণের দিকে তাকিয়ে সরকার ‘ নিজের টাকা ‘ দিয়ে ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখছে, যাতে জনসাধারণের কষ্টার্জিত টাকা মার না খায়। এতে গর্ধভের-জাত-জনগ
ণ বরং খুশীই হবে যে সরকার মহোদয় কত দয়াপ্রবণ হয়েই না সরকারী টাকা জনগণের সেবায় ব্যয় করছে। অপদার্থ জনগণ কি বুঝবে যে যেই টাকা আমরা সবাই মিলে চুরি করেছি, সেই টাকাটাই জনগণের থেকে কর হিসাবে তুলে আবার তাদেরকে দিচ্ছি? হাহাহা … হাহাহা … ”
.
দেখলাম, বাবাও হেসে সন্ন্যাসীকে “হারামজাদা কাছে আয়” বলে আদর করে দিলো। আমিও হাঁটু গেঁড়ে, একেবারে নতজানু হয়ে, শ্রদ্ধায় গদগদ হয়ে সালাম করার মতো অঙ্গভঙ্গি করে সন্ন্যাসীকে সেজদা করলাম ।
.
সমস্যার সমাধান যখন হয়েই গেলো, তখন আমরা সব্বাই মিলে একেকজন বাংলাদেশের জনগণকে উজবুক বলে হাসি ঠাট্টা করলাম। তারপর একপর্যায়ে মিস্টার স্টেফানকে (কাল্পনিক চরিত্র) নিয়েও জোক করলাম। আপনারা জানেন না যে স্টেফান আমাদের সামনে এলে কাঁচুমাচু হয়ে হাত জোড় করে বসে থাকে যাতে আমারা তার সুইস ব্যাংকে আরো টাকা পাঠাই, সেইটা তদবির করার জন্য।
.
তো উপরের ঘটনা ছিল একটু আগের ঘটনা।
.
এইবছর, ব্যাংকে আবার তারল্য সঙ্কট।
.
চুরিটা একটু বেশী হয়ে গেছে। এখন অতিরিক্ত কর আদায় করেও সামাল দেয়া যাচ্ছে না। তাই সন্যাসী নতুন বুদ্ধি বের করলো। বললো, “বাবা, আপনার তো মনে আছে যে ব্যাংকগুলোর ৬.৫ % টাকা বিবিতে গচ্ছিত রাখতে হয়। আপনি যদি ওই রাখালের স্থলাভিষিক্ত যে হয়েছে, তাকে একটু বলে-টলে দেন যে বিবির ৬.৫% রিজার্ভ requirement থেকে কমিয়ে সেইটা এখন ৫.৫% করতে, তাহলে আমরা ব্যাংকগুলো ১২,৫০০ কোটি টাকা বিবি থেকে ফেরত নিতে পারি। বুঝতেই তো পারছেন, বাবা, ১২,৫০০ কোটি টাকা। …”
.
উপস্থিত সবার চোখ চিক চিক করে উঠলো। জিহবা বের হয়ে টুশটুশ করে লোল পড়তে লাগলো। চোখে লাল-নীল স্বপ্ন। অথচ ওদের সবার সামনেই গা-ঘেঁষে স্বল্প-বসনা পরীর মতো অপূর্ব দেখতে ১৮-১৯ বছরের মেয়েগুলো যে সুরা ঢালছে, সেইদিকে খেয়াল নেই। সে এক ভিন্ন জগৎ। জান্নাতুল ফেরদৌস পৃথিবীতে তারাই তৈরী করতে পারে। করেও । হরেক রকমের হুরপরী ঘুরঘুর করে সেইখানে । ৭২টা তে সীমাবদ্ধ নেই।
.
সাধারণ জনগণ (আমি-লীগ, বিম্পি, জামাত এবং অন্যান্যরা) সেই খবর পায় না। সাধারণ জনগণের মধ্যে যাদের কিছুটা ক্ষমতা আছে, তাদের কাছে বিউটিই সই। পাঁচ বছরের শিশুটিই সই। পাশের বাড়ির নিরীহ মানুষটির যেই চার গন্ডা জমি আছে, সেইটাই সই।
.
আমার কাল্পনিক চরিত্রটি থেকে বের হয়ে আসতে বড্ড ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে সেই হুরপরীগুলোর হাত ধরে আলতো করে কাছে টেনে নিয়ে আস্তে করে বলি, “চলো, মা হবে না ?”
.
 (সমাপ্ত)

পুনশ্চ:
(১)
আপনি উজবুক, কারণ আপনি বাংলাদেশে থেকেও বাংলাদেশীদের চরিত্র ধরতে পারেন না। To be specific, আপনি প্রভাবশালীদের আশীর্বাদে যারা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে, তাদের চরিত্র বুঝেন না। আপনার বুঝা উচিত ছিল যে ওরা চোর। আপনি বুঝেন নাই। ব্যাংকে একাউন্ট খোলার সময় দেখে নেননি যে পরিচালনা পর্ষদে কে কে আছে। তাই আপনি একটা উজবুক।
.
আপনারা যারা মনে করছেন যে চোর বিধায় প্রাইভেট ব্যাংকে একাউন্ট না খুলে সরকারী ব্যাংকে একাউন্ট খুলেছিলেন, তারা উজবুক নন। জ্বি না, আপনারাও উজবুক। কারণ যেইখানে সরকারী শব্দটা আছে, সেইখানেই তো চোরের আখড়া আছে, সেইটা আপনি বুঝেন নাই ।
.
তাইলে করণীয় কি?
.
করণীয় কি আমি বলতে পারবো না। আপনারা বুঝে নিবেন।
আমি আপনাদেরকে বলতে পারি না যে আপনারা ব্যাংক থেকে যতখানি সম্ভব টাকা তুলে ফেলেন। কারণ বললে আপনারা যখন কয়েকজন ব্যাংকে যাবেন টাকা তুলতে, তখন ব্যাংক বলবে টাকা নেই । আপনারা panicked (আতংকিত) হয়ে যাবেন। ফেইসবুকে দিবেন। তখন অন্যরাও জেনে যাবে। সব্বাই তখন উর্দ্ধশ্বাসে দৌঁড়ে যাবে ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে। কিন্তু কেউ টাকা তুলতে পারবে না। ব্যাংকের সামনে লাখো জামানতকারীদের ভীড় হবে। এইটাকে Bank Run বলে। ব্যাঙ্ক রানের সময় মানুষজন মারমুখো হয়ে উঠবে। দেশে বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। অথোরিটিজেদের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। সুতরাং, সেইরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি করবেন না।
.
আমি বলতে পারি না যে আপনি টাকাকে ডলার বানিয়ে রেখে দেন। কারণ ডলারগুলো রাখবেন কোথায় ? সন্ন্যাসীদের মতো আপনার কুটিরটি তো আর সুরক্ষিত নয়। আর সেইটা আইনসম্মত কিনা, আমি সেইটা জানি না।
.
(২)
কেউ কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারেন যে এই পোস্টের শেষে ব্যাংক চোরদের শাস্তি দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ না করে অন্য ইচ্ছা প্রকাশ করলেন যে? তাদেরকে খালি এতটুকুই বলবো, “কারো সাধ্যি আছে ওই চোরদেরকে কিছু বলার ?”
.
(৩)
আপনারা জানেন কি যে এই চোর-ব্যাংকাররা এখন আবদার তুলেছে যেন তাদের এই চুরির অপকর্মগুলো বাংলাদেশের কোনো মিডিয়া পাবলিশ (প্রকাশ) করতে না পারে, সরকার যেন সেই ব্যবস্থা করে দেয় ? দোয়া করতে থাকুন যেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এইরকম আবাল-আবদার ছুঁড়ে ফেলে দেন ।
.
(৪)
এই পোস্টে গল্পের কারণে আমার কতগুলো শব্দ ব্যবহার করতে হয়েছে, যেমন: গর্ধব, উজবুক, অপদার্থ। আশা করি আপনারা বুঝবেন যে গল্পের মেসেজটা ড্রাইভ করতে আমি এই শব্দগুলো ব্যবহার করেছি। যারা offended হয়েছেন, তাদের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাচ্ছি।
অবশ্য আমি এইটাও চিন্তা করবো যে আমি অতি-সেনসিটিভ ওনাদের
লিস্টে কিভাবেই বা স্থান পেলাম?
.
.

লেখক : মোহাম্মদ আলী

 

আরও পড়ুন : বাংলাদেশের যেসব খাবারে শুকরের চর্বি আছে

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মিশর

বিপ্লবের ঘটনাঃ মিসর, ২০১১। হোসনে মোবারকের পতন যেভাবে ঘটেছিল

২০১০ সালে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় ২৮ বছর বয়স্ক খালেদ সৈয়দ কে পুলিশ নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *