Breaking News
Home / ইসলাম / ইসলাম ও সমাজ / আন্তঃধর্মীয় সংলাপ: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

আন্তঃধর্মীয় সংলাপ: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

আন্তঃধর্মীয় সংলাপের পরিচিতি ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

বিশ্বায়নের এ যুগে বিভিন্ন ধর্মের অস্তিত্ব লক্ষণীয়। সামাজিক, অথনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলাসহ ব্যবসা-বাণিজ্য, সভা-সমাবেশ ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানুষ পরস্পরের কাছে আসছে, একত্রিত হচ্ছে ও একসঙ্গে কথাবার্তা বলছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন-যাপন যেমন সহজতর হয়ে উঠছে, তেমনি বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি ইত্যাদির মাঝে মতপার্থক্য দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও পরমত অসহিষ্ণুতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পরিস্থিতি অবসানপূর্বক পারস্পরিক অনুপম পরিবেশ সৃষ্টির অনন্য মাধ্যম হল সংলাপ; যার মাধ্যমে পরস্পরের ভুল বুঝাবুঝির অবসান হয়ে মনে সংকীর্ণতা দূর করে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা যায়। ফলে বিভিন্ন মহলে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের প্রতি ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তঃধর্মীয় সংলাপ (Inter Religion Dialogue) ও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি (Inter Religion Harmony) সাম্প্রতিক বিশ্বের একটি বহুল আলোচিত বিষয়। পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, নিরাপদ সহাবস্থান, বিশ্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সম্প্রীতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ পরিচিতি, গুরুত্ব, তাৎপর্য এবং এ সম্পর্কে আল-কুরআনের দিক নিদের্শনা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথম পরিচ্ছেদ: আন্তঃধর্মীয় সংলাপের সংজ্ঞা

সংলাপ এর পরিচয়

বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্যে ‘সংলাপ’ পদবাচ্যটির ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। বাংলা ভাষায় এটি বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়; যা দুটি শব্দ (সম্+লপ্+অ)-[1]এর সমষ্টি। এর অর্থ: আলাপ, কথোপকথন, নাটকের চরিত্রসমূহের পরস্পরের সঙ্গে কথাবার্তা[2] ইত্যাদি। সংলাপ শব্দের আভিধানিক অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘সং’ শব্দের অর্থ সম বা সমান[3]। ইংরেজিতে ‘সংলাপ’ এর প্রতিশব্দ ডায়ালগ (Dialogue) ব্যবহৃত হয়। এ প্রসঙ্গে: সিলভানো গারেল্লে স্বীয় English-Bengali Christian Terminology নামক বইতে এভাবে উল্লেখ করেন: Dialogue: আলাপ-আলোচনা; কথোপকথন, সংলাপ[4]। আরবীতে সংলাপ-এর প্রতিশব্দ ‘আল-হিওয়ার’ (الحوار) ব্যবহৃত হয়। ‘হিওয়ার’ (حوار) শব্দটি الحور ধাতুমূল থেকে উৎপত্তি। এর অর্থ কোনো কিছু থেকে প্রত্যাবর্তন করা (الرجوع عن الشيء); কোনো কিছু বৃদ্ধির পর তা আবার কমে আসা (النقصان بعد الزيادة) অর্থ্যাৎ পুনরায় পূর্বের অবস্থায় ফেরত আসা[5]। কুরআন মাজীদে এ অর্থটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় সূরা ইনশিকাকে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴿ إِنَّهُۥ ظَنَّ أَن لَّن يَحُورَ ١٤ ﴾ [الانشقاق: ١٤]   “নিশ্চয় সে মনে করেছে যে, তার কখনই পরিবর্তন নেই।” আলোচ্য আয়াত প্রসঙ্গে আল্লামা শাওকানী বলেন: ‘লাঁই-ইয়াহূরা’ (لن يحور) এর অর্থ হল: লান-ইয়ারজিআ (لن يرجع) “সে কখনই ফিরে যাবে না”।[6]

পারিভাষিক দিক থেকে ‘সংলাপ’ এর বিভিন্ন অর্থ লক্ষ্য করা যায়। সংলাপ হল নিজের সত্যতা, ধর্মীয় মূল বিশ্বাস, ন্যায্যতা, তথা সমুদয় মূল্যবোধ বজায় রেখে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও মহানুভবতা প্রদর্শন করে পারস্পরিক যে আলাপ সহভাগিতা করা হয়, তাই সংলাপ।[7]

‘সংলাপ’ হচ্ছে, অন্যদেরকে বুঝবার বাসনায় তাদেরকে শ্রবণের সামর্থতা[8] ও বিবেকের আদান-প্রদানের প্রকাশ[9]

‘সংলাপ’ মানে একজন অন্যজনের সাথে অন্তর হতে কথা বলা ও তার কথা শোনা। এর অর্থ পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়া, পারস্পরিক আদান-প্রদান, ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস, অভিজ্ঞতার পারস্পরিক সহভাগিতা।[10]

আন্তঃধর্মীয় সংলাপ পরিচিতি

সাধারণত বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যকার সংলাপই আন্তঃধর্মীয় সংলাপ। ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, সম্মান প্রদর্শনপূর্বক পারস্পরিক যে ধর্মীয় যে আলোচনা করা হয়; তাই আন্তঃধর্মীয় সংলাপ। এ প্রসঙ্গে খালিদ মুহাম্মদ আল-মুগামিসি বলেন:

هو حديث بين طرفين او اكثر حول قضية معينة، الهدف منها الوصول إلى الحقيقة، بعيدا عن الخصومة والتعصب، بل بطريقة علمية إقناعية، ولا يشترط فيها الحصول على نتائج فورية.

‘মোলিক সত্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দু’ বা ততোধিক ব্যক্তির মাঝে পারস্পরিক এমন আলাপ-আলোচনা যা প্রজ্ঞাপূর্ণ পন্থায় পরিচালিত এবং ঝগড়া বিবাদ ও জাতি-ধর্ম-বর্ণ প্রীতিমুক্ত এবং তাৎক্ষণিক ফলাফল লাভের আকাংখা বিমুক্ত[11]

ড. মুহাম্মদ আলী জা‘লুক আরো বলেন,

حديث بين طرفين او اطراف عدة لعرض وجهات النظر فيهم حول مسألة تنازع عليها، بقصد التوصل إلى حل مناسب، او نتيجة مناسبة.

‘সংলাপ’ হল বিরোধপূর্ণ কোনো বিষয়ে পরিপূর্ণ অথবা কাছাকাছি সমাধানে পৌঁছার লক্ষ্যে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মাঝে কথোপকথন।[12]

 

আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি

সাম্প্রতিককালে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের ন্যায় আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি (Inter Religion Hermony) পরিভাষাটিও অত্যন্ত সুপরিচিত। আন্তঃসংলাপের পথপরিক্রমায় চূড়ান্তভাবে অর্জিত হয় আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি। বিশ্বায়নের এ যুগে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ‘হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম যারাই নিজের ধর্মের পাশাপাশি অন্য ধর্মকে আন্তরিকভাবে অধ্যয়ন করেছেন তাদের প্রায় সবাই আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য কাজ করেছেন এবং করছেন। সারা পৃথিবীতে আজ অনেক খ্যাতনামা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদ তাদের লেখা ও বক্তৃতার মাধ্যমে ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি, ভণ্ডামি ইত্যাদি দূর করার চেষ্টায় নিয়োজিত। এদের মধ্যে বাংলাদেশের ড. মহানামব্রত ব্রক্ষ্মাচারী, স্বামী অক্ষরানন্দ, সিস্টার ইউজিনিয়া, অধ্যক্ষ দেওয়ান মুহম্মদ আজরফ প্রমুখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের দুইজন অধ্যাপক আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে ছিলেন পথিকৃৎ। এরা হলেন ড. গোবিন্দ্রচন্দ্র দেব ও সাইয়েদ আব্দুল হাই। ভারতের ড. রাইমু- পানিকর, ড. এমন. এসা. এসা. রমন, ইংল্যান্ডের ড. কিনেথ ক্রাগ, ড. ফ্রান্সিস কার্ক, জাপানের নামামোরা হাজিমি, জার্মানি ড. সি. ডবিস্নউ, ট্রল, ইতালির ড. ফ্রান্সিস জান্নিনি, আমেরিকার ড. মোঃ আইয়ুব, ড. হুস্টান স্মিথ এবং ড. ক্যান্টওয়েল স্মিথের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এদের প্রত্যেকই মনে করেন যে, আন্তঃধর্মীয় সংলাপের মাধ্যমেই ধর্মীয় সম্প্রীতির পথ অনেকটা সুগম হয়।[13]

আন্তঃধর্মীয় সংলাপের উদ্দেশ্য

আন্তঃধর্মীয় সংলাপের উদ্দেশ্য হলো পরস্পরকে জানা। এর উদ্দেশ্য অন্য ধর্মকে জয় করা নয়। অন্য ধর্মের সাথে সম্পূর্ণ একমত হয়ে বিশ্বজনীন ধর্ম প্রতিষ্ঠাও এর উদ্দেশ্য নয়। এর উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন ধমের্র মধ্যে অজ্ঞতাজনিত যে বিরোধ আছে তার মধ্যে সেতু বন্ধন রচনা করা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন সাংস্কৃতিকে অনুধাবন করা। যার ফলে প্রত্যেকেই তার নিজেদের ভাষায় নিজস্ব বক্তব্যকে ব্যক্ত করতে পারবে[14]। আধুনিক ধর্মতত্ত্ববিদ ড. কাজী নুরুল ইসলাম স্বীয় গবেষণা প্রবন্ধে তুলনামূলক ধর্ম ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপের উদ্দেশ্য এভাবে ব্যক্ত করেন, ‘‘তুলনামূলক ধর্ম ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপের উদ্দেশ্য হচ্ছে একাত্মতা নয় বরং ঐক্য ও উপলব্ধি, কর্তৃত্ব বা প্রভুত্ব নয় বরং উন্নয়ন। সংলাপের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি ব্যক্তি-হৃদয়ে অন্য সকলের জন্য কিছু জায়গা সৃষ্টি করা, সহানুভূতির উন্মেষ ঘটানো।[15]

অতএব, বলা যায় যে, বিভিন্ন ধর্মানুসারীর মধ্যে সংলাপের উদ্দেশ্য কোনো ধর্মকে জয় করা নয়, কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা নয়,  বা সামগ্রিক চুক্তি সম্পাদন বা সর্বজনীন ধর্মপ্রতিষ্ঠাও নয়; বরং বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যকার পারস্পরিক অজ্ঞানতা ও ভ্রান্ত ধারণার ফলে সৃষ্ট বিশাল শুণ্যতার ক্ষেত্রে একটা সেতু নির্মাণ করে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করার ব্যবস্থা করা। বস্তুত, আন্তঃধর্মীয় সংলাপের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো, প্রত্যেককে তার নিজের কথা বলতে দেওয়া এবং নিজস্ব উক্তির মাধ্যমে স্ব স্ব অন্তর্দৃষ্টি বা মর্মকথা প্রকাশ করতে দেওয়া।[16]

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: আন্তঃধর্মীয় সংলাপের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

বিশ্বায়নের ফলে ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী। পৃথিবীর এক প্রান্তে কি ঘটছে এক নিমিষে শুধু খবরই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পৌঁছে না, তার দ্বারা প্রভাবিতও হয়। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় বিভিন্ন বর্ণ, গোত্র ও ধর্মের লোক আজ একত্রে বাস করতে বাধ্য। পারস্পরিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সহাবস্থান নিশ্চিত সহ বিভিন্ন কারণে আজ বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে আলোচনা এবং এ বিষয়ে গবেষণা অত্যন্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে। এসব কারণের মধ্যে রাজনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক, ধর্মীয় ও ধর্মতাত্ত্বিক কারণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রকৃত কোনো অবদান রাখতে চাইলে প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক সংলাপ এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরী। বিভিন্ন ধর্মের পর্যালোচনা, উন্নয়ন, পরিশোধন ও সঠিক ব্যাখ্যার জন্য আন্তঃধর্মীয় সংলাপ বা বিনিময় অত্যাবশ্যকীয়। আমরা কে এবং কী তা জানার জন্য আমাদেরকে অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানতে হবে। অন্য ধর্মকে জানার একটা আবশ্যিক শর্ত হচ্ছে আমাদের নিজেদেরকে জানা এবং আমাদের নিজেদেরকে জানার একটি আবশ্যিক শর্ত হচ্ছে অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানা। ভাষা সম্পর্কে যেমন বলা হয়, যে শুধু একটি ভাষা জানে সে দাবি করতে পারে না যে ঐ ভাষা সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান আছে। ঠিক তেমনিভাবে বলা যায়, যে শুধু একটি মাত্র ধর্মকে জানে সে কোনো ধর্মই সঠিকভাবে জানে না। তাই ‘যোয়াকিম ওয়াচ’ বলেন, ধর্ম সম্পর্কে যথার্থ দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এরূপ, যখন সবগুলি ধর্মকে অন্তত কিছুটা জানতে সক্ষম হবে একমাত্র তখনই আমরা কোনো একটি ধর্মকে যথার্থভাবে জানি বলে দাবি করতে পারবো।

আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি চাই তাহলে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, আমরা একটি বৃহৎ সত্তায় অন্তর্ভুক্ত একটি বিশাল পরিবারের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন ধরনের কাজ করছি এবং আমরা সকলেই ভালোবাসা ও সত্যের আত্মিক বাস্তবায়নের দিকে ধাবমান। আন্তঃধর্মীয় সংলাপে বিশ্বাসী কেউ কেউ বলেন, জগদ্বাসীকে নতুন করে আবার আহ্বান জানাতে হবে: ‘‘বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয় পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি।’’

ইসলামের দৃষ্টিতে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ

ইসলাম আন্তঃধর্মীয় সংলাপের সমর্থক। সমগ্র মানবজাতির কাছে ইসলামকে বিশ্বজনীনরূপে প্রচার, প্রসার করতে সংলাপের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম মূলত সকল ধর্মের সহাবস্থানের স্বীকৃতি প্রদান এবং মানুষের প্রতি সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণের উৎসাহ প্রদান করে।

মানবজীবনের পরম কল্যাণ ও শান্তি নিশ্চিতকারী জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম সুপরিচিত। আল-কুরআনে যা ‘আদ-দ্বীন’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকলের মাঝে শান্তি স্থাপনে এর মূল লক্ষ্য। পরমত সহিষ্ণুতা ইসলামের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য; যা আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুপম জীবনীতে লক্ষ্য করি। প্রায়শই তাঁর কাছে আলোচনার জন্য নাসারা ও ইয়াহূদীরা আসত। তিনি তাদের সাথে আলোচনা করতেন। তবে যে বর্ণনাটি খুব ঘটা করে বর্ণনা করা হয় যে, নাজরান থেকে আগত খ্রিষ্টান প্রতিনিধিদলকে তার নিজ মসজিদের অভ্যন্তরে তাদের সান্ধ্য-আরাধনা সম্পাদন করতে অনুমতি প্রদান করেছিলেন। এ বর্ণনাটি শুদ্ধ নয়। কারণ ইসলাম কখনও তার কর্মকাণ্ড ও নিজস্ব গণ্ডিতে অন্য কোনো ধর্মের হস্তক্ষেপ মেনে নেয় না। মসজিদ ইসলামের নিজস্ব এলাকা, এখানে অন্যের হস্তক্ষেপ কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নিজের দ্বীনের কোনো অংশ তর্কের খাতিরে ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতাও কোনো মুসলিম করতে পারে না। যারা এটা করবে তারা মূলত ইসলাম বিদ্বেষী, মুনাফিক ও যিন্দীক।

এর বিপরীতে ইসলাম নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে আলোচনায় বিশ্বাসী, যদি তা ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারনের উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়।

ইসলাম বিশ্বাস করে, মানুষ মানুষে ও জাতিতে জাতিতে বিভেদ থাকতে পারে; কিন্তু তারা সবাই একই স্রষ্টার সৃষ্টি। তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় ভাষাগত পার্থক্য, ভৌগলিক অসংলগ্নতা ও সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার কোনো অন্তরায় নয়। মানবজাতির বিশ্বজনীন ঐক্য বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে এবং জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি নির্বিশেষে পারস্পরিক সদাচার, ন্যায়বিচার, সার্বজনীন মানবীয় মূল্যবোধ নিশ্চিত করে ইসলাম।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: আন্তঃধর্মীয় সংলাপের শরয়ী বিধান

আল-কুরআন মহান আল্লাহর বাণী। বিশ্বের সর্বশেষ, সর্বশ্রেষ্ঠ ও বিশুদ্ধতম গ্রন্থ। সংলাপের শর‘ঈ মর্যাদা বা ভিত্তি, বিষয়বস্তু, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, কৌশল ও পদ্ধতিসমূহ, মূলনীতি, কাদের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে ইত্যাদি বিষয়ে আল-কুরআন দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছে। আল-কুরআন মুসলিমদেরকে এভাবে উৎসাহ প্রদান করে মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ فَمَنۡ حَآجَّكَ فِيهِ مِنۢ بَعۡدِ مَا جَآءَكَ مِنَ ٱلۡعِلۡمِ فَقُلۡ تَعَالَوۡاْ نَدۡعُ أَبۡنَآءَنَا وَأَبۡنَآءَكُمۡ وَنِسَآءَنَا وَنِسَآءَكُمۡ وَأَنفُسَنَا وَأَنفُسَكُمۡ ثُمَّ نَبۡتَهِلۡ فَنَجۡعَل لَّعۡنَتَ ٱللَّهِ عَلَى ٱلۡكَٰذِبِينَ ٦١ ﴾ [ال عمران: ٦١] 

“ঈসা সম্বন্ধে তোমার সাথে যে তর্ক করে তাকে বল, এস আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রগণকে ও তোমাদের পুত্রগণকে, আমাদের নারীগণকে ও তোমাদের নারীগণকে আমাদের নিজেদের ও তোমাদের নিজেদের তারপর অন্তর দিয়ে প্রার্থনা করি, বিনীত আবেদন করি এবং রাখি মিথ্যাবাদীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ।[17]

আল-কুরআনের অনুপম প্রেরণায়  উজ্জীবিত ইসলামে বিশ্বাসীগণ ভিন্ন বিশ্বাসীদের ধর্মীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ উৎসাহিত করেছে। মুসলিমরা সাধারণত কখনো কারোর ধর্মকে দমন করে রাখে নি বা ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে নি, সম্মান দেখিয়েছে। ইসলামী সাম্রাজ্যে সব নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ ছিল। বিভিন্ন ধর্মীয় পন্ডিতদের উপস্থিতিতে আন্তঃধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম খলিফা হারুন অর রশীদ ৮ম শতাব্দির শেষের দিকে বিভিন্ন ধর্মের স্কলার নিয়ে আলোচনা করতেন ধর্মনীতি। বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মীয় মুল্যবোধের প্রতি যথাপোযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যমে বক্তব্য উপস্থাপন এবং সংলাপীয় পদ্ধতিতে কুরআনের অবতরণ কুরআনুল কারীমের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।

সংলাপের ভিত্তি বা শরয়ী মর্যাদা

জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও সংস্কৃতি নির্বিশেষে ইসলামকে গোটা মানবজাতির কাছে সার্বজনীনরূপে বিশ্বব্যাপী প্রচার, প্রসার করতে ইসলামে যে সকল আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে সংলাপ বা ‘হিওয়ার’ তন্মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।  ইসলাম সংলাপকে শুধু সমর্থনই করে না বরং সংলাপের ভিত্তি, বিষয়বস্তু, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কৌশল ও পদ্ধতিসমূহ, মুলনীতি, কাদের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে ইত্যাদি বিষয়ে নান্দনিক যে দিক-নিদের্শনা প্রদান করেছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংলাপ এর শর‘ঈ মর্যাদা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:

﴿ ٱدۡعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلۡحِكۡمَةِ وَٱلۡمَوۡعِظَةِ ٱلۡحَسَنَةِۖ وَجَٰدِلۡهُم بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُۚ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعۡلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِۦ وَهُوَ أَعۡلَمُ بِٱلۡمُهۡتَدِينَ ١٢٥ ﴾ [النحل: ١٢٥] 

“আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন জ্ঞানগর্ভ কথা ও উত্তম উপদেশসমূহের দ্বারা এবং তাদের সহিত উত্তম পদ্ধতিতে বির্তক করুন। আপনার রব, তার পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়, সে সম্বন্ধে বিশেষ অবহিত এবং কারা সৎপথে আছে তাও তিনি সবিশেষ অবগত।” [18]

উল্লেখিত আয়াতে কারীমায় বর্ণিত আদেশসূচক ক্রিয়াপদ “জা-দিলহুম” পদবাচ্যটির উৎপত্তি হয়েছে ‘জাদলুন’ ধাতুমূল থেকে। এর অর্থ ঝগড়া করা, বিবাদ করা, বির্তক করা। অর্থাৎ আপনি তাদের সাথে বির্তক করুন সর্বোত্তম পদ্ধতিতে। আদেশসূচক এ ক্রিয়াপদকে কেউ কেউ সাধারণ পর্যায়ের নির্দেশ মনে করলেও এর উপর গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, সংলাপ শুধু জায়েযই নয় বরং ফরয এবং সংলাপের ব্যাপারে আমরা আদিষ্ট। উল্লেখিত আয়াতে কারীমায় একই সাথে দুটি আদেশসূচক বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে, যাতে কুরআন মাজীদের অভিনব বাচনভঙ্গি ও অলঙ্কারিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।  আরবীতে আদেশ বুঝানোর জন্য ফি‘লুল আমর (فعل الأمر) বা আদেশসূচক ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়। উক্ত আয়াতে কারীমাতেও অনুরূপ আদেশ বুঝানোর জন্য যথাক্রমে উদ‘উ (ادع)  এবং জাদিলহুম جادلهم  শীর্ষক দুটি আদেশসূচক ক্রিয়া উল্লেখ হয়েছে; যা ফরয হওয়া বা আবশ্যক হওয়াকে বুঝায়।

মুসলিম বিশ্বের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ড. ইউসুফ আল-কারযাভী পবিত্র মক্কা নগরীতে রাবেতা আলম আল ইসলামীর উদ্দেশ্যে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন: “সংলাপের ব্যাপারে আমরা আদিষ্ট। কেউ কেউ বলেন, সংলাপ জায়েয। আমি আরেকটু বাড়িয়ে বলবো সংলাপ ফরয। আমরা সংলাপের ব্যাপারে নির্দেশিত। কেননা এটা দাওয়াতেরই একটি অংশ। সূরা আন-নাহলে যে আয়াতে দাওয়াতের নীতিমালা বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন জ্ঞানগর্ভ কথা ও  উত্তম উপদেশসমূহের দ্বারা এবং তাদের সহিত উত্তমপদ্ধতিতে বির্তক করুন। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে উত্তম উপদেশ ও জ্ঞানগর্ভ কথা এটি মুসলিমদের জন্য যারা দ্বীনকে সমর্থন করে; আর উত্তম পদ্ধতিতে বিতর্কটি হল দীনের বিরোধীদের জন্য। ইসলামের সমর্থকদের জন্য উত্তম উপদেশ যথেষ্ট। কিন্তু ইসলামকে যারা সমর্থন করে না তাদের ব্যাপারে উত্তম উপদেশ যথেষ্ট নয় বরং তাদের সাথে বির্তক করতে হবে উত্তম পন্থায়। বিতর্কের সঠিক ব্যাপার হল উত্তম পন্থায়। অর্থাৎ নম্র পন্থায় ভদ্রোচিতভাবে, এমন ভাষায় যা অন্তরে দাগ কাটে ।

আন্তঃধর্মীয় সংলাপে আল-কুরআনের পদ্বতি

মার্জিত সম্বোধন

মার্জিত ‘সম্বোধন’ সংলাপের প্রাণ। একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিষয়ের গুরুত্ব বুঝানো ও শ্রোতামণ্ডলীর মনোযোগ আকর্ষণই এর অন্যতম লক্ষ্য। আল-কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর সংলাপগুলোতে যে সকল ‘সম্বোধন’ বিদ্যমান সেগুলোতে মানবজাতির জন্য রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ দিকনিদের্শনা। এক্ষেত্রে কোনরূপ পার্থক্য ছাড়াই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষকে মহান আল্লাহ বিভিন্নভাবে সম্বোধন করেছেন।

আন্তঃধর্মীয় সংলাপে সম্বোধনের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ কখনো ইয়া আয়্যুহান-নাছ (يايها الناس) বা হে মানবজাতি! কখনো ইয়া আয়্যুহান নাছ(يايها الناس)-এর পরিবর্তে ‘‘ইয়া আয়্যুহাল ইনসান’’ (يايها الإنسان) কখনো বা ইয়া আহলাল কিতাব يا اهل الكتاب বা হে কিতাবধারী! বলে সম্বোধন করেছেন। কুরআন মাজীদে ‘ইয়া আয়্যুহান-নাছ (يايها الناس) বা হে মানবজাতি! শীর্ষক পদবাচ্যটি ৯টি সূরার ১৯টি স্থানে ইয়া আয়্যুহাল ইনসান’’ (يايها الإنسان) শীর্ষক পদবাচ্যটি ২টি সূরায় ২টি স্থানে ও ইয়া আহলাল কিতাব يا اهل الكتاب বা হে কিতাবধারী! শীর্ষক পদবাচ্যটি ৩টি সূরার ১২টি স্থানে উল্লেখিত হয়েছে। এছাড়া সম্বোধন ব্যতিরেকে শুধু  ‘আন-নাছ’ (মানবজাতি) এ শব্দটি ৫৪ সূরায় ২৪০ স্থানে উল্লেখ রয়েছে।[19]

আন্তঃধর্মীয় সংলাপের ধারাবাহিকতায় আল-কুরআনে বর্ণিত মহান আল্লাহর অনুপম ও হৃদয়স্পর্শী সম্বোধন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। অবিশ্বাসীদের প্রতি আল-কুরআনের মর্যাদাপূর্ণ ও মার্জিত সম্বোধন মানব হৃদয়কে স্পর্শ করে। কুরআনে কারীমে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কারো প্রতি অসম্মানজনক আচরণমূলক কোনো শব্দও খুঁজে পাওয়া যায় না।

কৌশল ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপস্থাপন

সংলাপের উপাদানসমূহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার সাথে বক্তব্য উপস্থাপন। মহান আল্লাহ বলে,

“কৌশল ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ দ্বারা তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান কর এবং তাদের সাথে উত্তম পদ্ধতিতে বিতর্ক কর।”[20]

সূরা আন-নাহল-এর উল্লেখিত আয়াতে কারীমায় দাওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালাসহ মুসলিম এবং অমুসলিমদের মাঝে অনুষ্ঠিতব্য সংলাপের নীতিমালা ব্যক্ত হয়েছে; যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ তাদের সাথে দাওয়াতের পদ্ধতি হচ্ছে, নম্র পন্থায়, ভদ্রোচিতভাবে, এমন ভাষায় যা অন্তরে দাগ কাটে যেমন কুরআন আমাদের শিখিয়েছে।

অযাচিত তর্ক-বিতর্ক বর্জন

অযাচিত তর্ক-বিতর্ক মানুষের সম্পর্ক বিনষ্ট করে এবং হৃদয়ের গভীর থেকে ভালবাসার সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য ধ্বংস করে। তাই সব সময়েই এ ধরণের তর্ক-বিতর্ক পরিত্যাজ্য। আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে ফলপ্রসু করতে হলে অযাচিত তর্ক-বিতর্ক বর্জন আবশ্যক। সংলাপে অংশগ্রহণকারী চাই সে ইয়াহূদী বা খ্রিষ্টান হোক বা ভিন্ন বিশ্বাসের হোক সকলের সাথে অযাচিত তর্ক বিতর্ক পরিহার করতে নির্দেশ প্রদান করে ইসলাম। সূরা আনকাবুতে এ প্রসঙ্গটি এভাবে এসেছে:

﴿ ۞وَلَا تُجَٰدِلُوٓاْ أَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ إِلَّا بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مِنۡهُمۡۖ وَقُولُوٓاْ ءَامَنَّا بِٱلَّذِيٓ أُنزِلَ إِلَيۡنَا وَأُنزِلَ إِلَيۡكُمۡ وَإِلَٰهُنَا وَإِلَٰهُكُمۡ وَٰحِدٞ وَنَحۡنُ لَهُۥ مُسۡلِمُونَ ٤٦ ﴾ [العنكبوت: ٤٦] 

‘‘তোমরা উত্তম পন্থা ব্যতীত কিতাবীদের সাথে বিতর্ক করবে না, তবে তাদের সাথে করতে পার, যারা তাদের মধ্যে সীমালংঘনকারী এবং বল, ‘আমাদের প্রতি ও তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তাকে আমরা বিশ্বাস করি এবং আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ একই এবং আমরা তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী।’’[21]

উল্লেখিত আয়াতে কারীমায় আন্তঃধর্মীয় সংলাপের এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনিদের্শনা ব্যক্ত করা হয়েছে। আহলে কিতাব বা ইয়াহূদী খ্রিষ্টানদের সাথে অকারণে জাদল (তর্ক-বিতর্ক) করতে নিষেধ করা হয়েছে। ইমাম রাযী স্বীয় তাফসীর আল-কাবীর-এ উল্লেখ করেন: আল-জিদাল বা বিতর্ক দু’প্রকার: ‘হক’ বা সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তর্ক বিতর্ক এবং বাতিল মিথ্যা প্রতিষ্ঠার জন্যে তর্ক-বিতর্ক। সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে জিদাল করা হয় তা মূলত: নবী রাসূলদের পেশা। আর মিথ্যা প্রতিষ্ঠায় যে তর্ক-বিতর্ক তা নিন্দনীয়।’ তাই জিদাল বা তর্ক করতে হলে অত্যন্ত সুন্দর পদ্ধতিতে হক প্রতিষ্ঠার জন্য করতে হবে, শুধুমাত্র তর্কের জন্য তর্ক যেন না করা হয়।

বিনয়-নম্রতা

বিনয়-নম্রতা সংলাপের এক অন্যতম উপাদান। সংলাপকে ফলপ্রসু ও অর্থবহ করে তুলতে বিনয়-নম্রতা ও কোমলতার অনুসরণ অপরিহার্য। বিশেষ করে আন্তঃধর্মীয় সংলাপে এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এর প্রসঙ্গে আল-কুরআনে বর্ণিত মূসা আলাইহিস সালাম ও হারুন আলাইহিস সালাম এবং ফিরাউনের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য সংলাপ কিভাবে পরিচালিত হবে তার নির্দেশনা ব্যক্ত হয়েছে সূরা ত্বহায়। মহান আল্লাহ বলেন:

﴿ ٱذۡهَبۡ أَنتَ وَأَخُوكَ بِ‍َٔايَٰتِي وَلَا تَنِيَا فِي ذِكۡرِي ٤٢ ٱذۡهَبَآ إِلَىٰ فِرۡعَوۡنَ إِنَّهُۥ طَغَىٰ ٤٣ فَقُولَا لَهُۥ قَوۡلٗا لَّيِّنٗا لَّعَلَّهُۥ يَتَذَكَّرُ أَوۡ يَخۡشَىٰ ٤٤ ﴾ [طه: ٤٢،  ٤٤] 

‘‘তুমি ও তোমার ভ্রাতা আমার নিদের্শনসহ যাত্রা কর এবং আমার স্মরণে শৈথিল্য করিও না। তোমরা উভয়ে ফির‘আউনের নিকট যাও, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে। তোমরা তার সাথে নম্র কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’’[22]

যে সকল বিষয় ঐক্যমত রয়েছে সেগুলি থেকেই সংলাপের শুভ সূচনা

আন্তঃধর্মীয় সংলাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনিদের্শনা হল, সংলাপে অংশগ্রহণকারী পক্ষদ্বয়ের কাছে যে সকল  বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে সেগুলো থেকেই সংলাপের সূচনা হওয়া। সূরা আশ-শু‘আরা-এর ﴿ وَأَنذِرۡ عَشِيرَتَكَ ٱلۡأَقۡرَبِينَ ٢١٤ ﴾ [الشعراء: ٢١٤]  “এবং আপনি আপনার নিকট আত্মীয়-স্বজনদেরকে ভীতি প্রদর্শন করুন।” শীর্ষক আয়াতে কারীমা অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতের প্রেক্ষিতে কুরায়শদের সাথে সাফা পর্বতের পাদদেশে তাদেরকে আহ্বান পূর্বক একটি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ করেন; যা মূলত: দিকনির্দেশনাপূর্ণ একটি আন্তঃধর্মীয় সংলাপ। এ প্রসঙ্গটি ইমাম বুখারী ইবন আব্বাস রা-এর উদ্ধৃতি এভাবে উল্লেখ করেন, তিনি বলেন:

لَمَّا نَزَلَتْ: {وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الأَقْرَبِينَ} [الشعراء: 214]، صَعِدَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الصَّفَا، فَجَعَلَ يُنَادِي: «يَا بَنِي فِهْرٍ، يَا بَنِي عَدِيٍّ» – لِبُطُونِ قُرَيْشٍ – حَتَّى اجْتَمَعُوا فَجَعَلَ الرَّجُلُ إِذَا لَمْ يَسْتَطِعْ أَنْ يَخْرُجَ أَرْسَلَ رَسُولًا لِيَنْظُرَ مَا هُوَ، فَجَاءَ أَبُو لَهَبٍ وَقُرَيْشٌ، فَقَالَ: «أَرَأَيْتَكُمْ لَوْ أَخْبَرْتُكُمْ أَنَّ خَيْلًا بِالوَادِي تُرِيدُ أَنْ تُغِيرَ عَلَيْكُمْ، أَكُنْتُمْ مُصَدِّقِيَّ؟» قَالُوا: نَعَمْ، مَا جَرَّبْنَا عَلَيْكَ إِلَّا صِدْقًا، قَالَ: «فَإِنِّي نَذِيرٌ لَكُمْ بَيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ»

অর্থাৎ যখন﴿ وَأَنذِرۡ عَشِيرَتَكَ ٱلۡأَقۡرَبِينَ ٢١٤ ﴾ [الشعراء: ٢١٤]   শীর্ষক আয়াতে কারীমা নাযিল হল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পবর্তে আরোহন করে কুরায়শদের দুই গোত্রকে এভাবে আহ্বান করতে থাকেন, ওহে বনী ফিহর। ওহে বনী আদী! অর্থাৎ ওহে ফিহরের বংশধর! ওহে ‘আদীর বংশধরেরা! এরপর উভয় গোত্রের লোকজন আহ্বানে সাড়া দিয়ে একত্রিত হল। যারা উপস্থিত হতে পারল না তারা স্বীয় প্রতিনিধি প্রেরণ করল যাতে তারাও আহুত বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারে। গোত্রপতি আবু লাহাবও সেখানে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি আমি তোমাদেরকে এ সংবাদ দেই যে, পাহাড়ের পাদদেশে এমন এক অশ্বরোহী বাহিনী অবস্থান করছে যারা তোমাদেরকে নিশ্চিত আক্রমন করবে, তোমরা কি আমার এ সংবাদটি বিশ্বাস করবে? তারা বলল; হ্যাঁ, আমরা সকলেই বিশ্বাস করব। কেননা তোমার ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতা এ যে, তুমি সত্যবাদী। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আখিরাতের কঠিন শাস্তির ব্যাপারে আমি তোমাদের জন্য একজন ভীতি প্রদর্শনকারী।’[23]

উল্লেখিত আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যায় বর্ণিত হাদীসে বনী ‘আদী ও বনী ফিহর ও কুরায়শদের অন্যান্য প্রতিনিধিদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সংলাপ বর্ণিত হয়েছে তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ বিষয়ের উল্লেখের মাধ্যমে সংলাপ আরম্ভ করেছেন যে বিষয়ে সংলাপে অংশগ্রহণকারীদের উভয় পক্ষ ঐকমত্য ছিলেন। সে বিষয়টি ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সত্যবাদিতা।

ক্ষমা-মার্জনা, উদারতা ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন

পরমত সহিষ্ণুতা সংলাপের অনন্য ভূষণ। পারস্পরিক ক্ষমা, মার্জনা, উদারতা ইত্যাদি গুণাবলীর মাধ্যমেই পরমত সহিষ্ণুতা অর্জিত হয়। উল্লি­খিত গুণাবলি অর্জনে মহান আল্লাহ এভাবে নির্দেশ করেছে:

﴿ خُذِ ٱلۡعَفۡوَ وَأۡمُرۡ بِٱلۡعُرۡفِ وَأَعۡرِضۡ عَنِ ٱلۡجَٰهِلِينَ ١٩٩ ﴾ [الاعراف: ١٩٩] 

তুমি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর, সৎকার্যের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদিগকে এড়িয়ে চল।[24]

পারস্পরিক ক্ষমা, মার্জনা, উদারতা ও পরমত সহিষ্ণুতা অর্জনে ইসলামের নির্দেশনা সুষ্পষ্ট। ইসলামের প্রাথমিক যুগে একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাসজিদুল হারামে অবস্থান করছিলেন। এ সময় কতিপয় মুশরিক দলবদ্ধভাবে ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য সমবেত হন এবং তারা নানাভাবে তর্কবিতর্ক করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জ্ঞানগর্ভ, ধৈর্যপূর্ণ ও মনোজ্ঞ আলোচনায় মুগ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

পরমত অনুসারীর প্রতি গালমন্দ বা কটাক্ষতা বর্জন

কটাক্ষ বা গালমন্দ মানবমর্যাদা পরিপন্থী। আত্মসম্মানে আঘাত হানে এবং হৃদয়ে গভীর যখম সৃষ্টি করে। সংলাপের কাংখিত সফলতা অর্জনে গালমন্দ ও কটাক্ষতা পরিত্যাজ্য। মহান আল্লাহ বলেন:

﴿ وَلَا تَسُبُّواْ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ فَيَسُبُّواْ ٱللَّهَ عَدۡوَۢا بِغَيۡرِ عِلۡمٖۗ كَذَٰلِكَ زَيَّنَّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلَهُمۡ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّهِم مَّرۡجِعُهُمۡ فَيُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ١٠٨ ﴾ [الانعام: ١٠٨] 

আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে তারা ডাকে তাদেরকে তোমরা গালি দিও না। কেননা তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞনতাবশত আল্লাহকেও গালি দিবে।[25]

ইসলাম অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি খারাপ ব্যবহার পরিহারের নির্দেশ প্রদান করে। অন্য ধর্মাবলম্বীদের শির্ক, কুফর, দুর্নীতি ইত্যাদি কজের গঠনমূলক সমালোচনা করা হলেও তাদেরকে গালি-গালাজ, কটুক্তি বা দুর্ব্যবহার সর্বোতভাবে বর্জনের চেষ্টা করা হয়েছে।

বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রামাণ্য যুক্তি উপস্থাপন

সংলাপের কাংখিত সফলতা অর্জনে প্রয়োজন প্রামাণ্য, নির্ভরযোগ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি ও প্রামাণাদি উপস্থাপন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী:

﴿ قُلۡ أَتَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَمۡلِكُ لَكُمۡ ضَرّٗا وَلَا نَفۡعٗاۚ وَٱللَّهُ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ ٧٦ ﴾ [المائ‍دة: ٧٦] 

‘‘বল, তোমরা কি আল্লাহ ব্যতীত এমন কিছুর ইবাদাত কর যারা তোমাদের কোনো ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা নেই? আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’’[26]

অতএব, যে ধর্মের সাথে সংলাপ হবে তাকে অবশ্যই সে ধর্ম সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান রাখতে হবে। শুধুমাত্র ধর্মীয় জ্ঞান সেখানে যথেষ্ট মনে করার কোনো উপায় নেই।

জ্ঞানের গভীরতা

নিজ বিশ্বাসসহ ভিন্ন বিশ্বাসের প্রতি জ্ঞানের গভীরতা সংলাপের কাংখিত সফলতা অর্জনের জন্য অত্যাবশ্যক। আল-কুরআন প্রসঙ্গটি এভাবে ব্যক্ত করে:

 ﴿ وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يُجَٰدِلُ فِي ٱللَّهِ بِغَيۡرِ عِلۡمٖ وَلَا هُدٗى وَلَا كِتَٰبٖ مُّنِيرٖ ٨ ﴾ [الحج: ٨] 

“মানুষের মধ্য কেউ কেউ আল্লাহ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে; তাদের না আছে জ্ঞান, না আছে পথ নির্দেশ, না আছে কোনো দীপ্তিমান কিতাব।[27]

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: পবিত্র কুরআনে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ

কুরআনে কারীম এমন এক গ্রন্থ যাতে পূর্ববর্তীদের কাহিনী ও পরবর্তীদের কথা সন্নিবেশিত হয়েছে। এখানে একদিকে রয়েছে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের উত্থান-পতনের ইতিহাস অপরদিকে রয়েছে দীন ও আকীদার বর্ণনা। কুরআন একদিকে বর্ণনা করছে তাদের আচার-আচরণ লেন-দেন অপরদিকে তাদের সমসাময়িক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিবর্গের কাহিনীও বিধৃত হয়েছে।

এছাড়াও পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিরোধ রয়েছে তারও উল্লেখ রয়েছে। এর বিভিন্ন স্থানে ইয়াহূদী, খ্রিষ্টান, সাবায়ী, মুশরিক, প্রকৃতিবাদী প্রভৃতি মতাদর্শ ও তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে আলোচনা দেখতে পাই। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে,

﴿ قُلۡ يَٰٓأَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ تَعَالَوۡاْ إِلَىٰ كَلِمَةٖ سَوَآءِۢ بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمۡ أَلَّا نَعۡبُدَ إِلَّا ٱللَّهَ وَلَا نُشۡرِكَ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗا وَلَا يَتَّخِذَ بَعۡضُنَا بَعۡضًا أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِۚ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَقُولُواْ ٱشۡهَدُواْ بِأَنَّا مُسۡلِمُونَ ٦٤ ﴾ [ال عمران: ٦٤] 

‘‘বল, হে কিতাবীগণ! এস সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি এবং তার সাথে কাউকে শরীক না করি। আর আমাদের কেউ যেন আল্লাহ্ ছাড়া অন্যকে রব হিসেবে গ্রহণ না করে। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, অবশ্যই আমরা মুসলিম।’’[28]

এ আয়াতে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি বর্ণিত হয়েছে। তাহলো, বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে ঐক্যসুত্রের সন্ধান। আলোচ্য আয়াতে কিতাবীদেরকে বলা হয়েছে যে, যদি তোমরা এক আল্লাহতে ঈমান এনে থাক তবে তোমাদের এবং মুসলিমদের মধ্যে এই ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু থেকেই সংলাপ ও আলোচনার সুত্রপাত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ: সুন্নাতে নববীতে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ

রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদী, খ্রিষ্টান ও মুশরিকদের সাথে যেসব মুজাদালাহ বা সর্বোত্তম পন্থায় যুক্তি উপস্থাপন করেছেন সেগুলোর কিছু দৃষ্টান্ত নিম্নে তুলে ধরা হলো:

  • ইয়াহূদীদের সাথে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিতর্ক:

মদীনায় বিভিন্ন সময়ে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীদের সাথে ধর্মীয় বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন। কারণ তারা তাঁর আশে-পাশেই থাকত। তারাও তাঁর সাথে ধর্মীয় বিষয়ে অনেক মতবিনিময় করত এবং বিভিন্ন ভ্রান্ত প্রশ্ন ও সন্দেহের অবতারণা করত। আর তিনি রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলোর অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ জওয়াব দিতেন। যার কিছু নমূনা নিম্নে উপস্থাপিত হলো:

  1. আব্দুল্লাহ ইবন্ সালাম এর সাথে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথোপকথনের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে,

আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আব্দুল্লাহ ইবন সালাম শুনলেন যে, রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করেছেন। তিনি তাঁর কাছে এসে বললেন, আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করব যা নবী ব্যতীত কেউ উত্তর দিতে পারে না। তারপর তিনি বললেন, কিয়ামতের প্রথম আলামত কি? জান্নাতীরা প্রথম কোনো খাবার খাবে? সন্তান কিভাবে পিতার মত এবং কিভাবে তার মাতুলদের মত হয়?তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,আমাকে এই মাত্র জিবরাঈল তা জানিয়েছে। তখন আব্দুল্লাহ বললেন,ইয়াহূদীদের নিকট এ ফেরেশতা তাদের শত্রু। তারপর রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,কিয়ামতের প্রথম আলামত হচ্ছে,একটি আগুন বের হয়ে মানুষকে পূর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে নিয়ে যাবে। আর জান্নাতীদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজা। আর সন্তান কারো সাদৃশ্য হওয়ার পিছনে যুক্তি হলো, যদি কেউ তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে তখন যদি পুরুষের বীর্য অগ্রণী হয় সন্তান পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে যদি স্ত্রীর বীর্য অগ্রণী হয় তখন সন্তান স্ত্রীর মত হয়। তখন তিনি বললেন,আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে,আপনি আল্লাহর  রাসূল। তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহূদীরা মিথ্যুক জাতি, যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করার আগে আমার ইসলামের কথা তারা জেনে যায় তবে আমাকে মিথ্যুক বানিয়ে ছাড়বে। তারপর আব্দুল্লাহ ইয়াহূদীদের কাছে আসলেন এবং তাদের ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম কেমন লোক? তারা বলল: আমাদের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি এবং জ্ঞানী ব্যক্তির সন্তান। আমাদের সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি এবং উত্তম ব্যক্তির সন্তান। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে? তারা বলল, আলস্নাহ্ তাকে এ ধরনের কাজ করা থেকে বাঁচিয়ে রাখুন। তখন আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম বের হয়ে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত হক কোনো মা‘বুদ নেই, আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। তখন তারা বলল,সে আমাদের সবচেয়ে খারাপ লোক এবং খারাপ লোকের সন্তান। এভাবে তারা তার উপর আক্রমনাত্মক কথা বলতে লাগল[29]

  1. আব্দুল্লাহ ইবন্ উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

 ‘‘ইয়াহূদীরা রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে এসে বলল: তাদের মধ্যে একজন পুরুষ ও মহিলা যিনা করেছে। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন: তোমরা কি তাওরাতে রজম সম্পর্কে কিছু পেয়েছ?তারা বলল: ‘‘তাদেরকে অপমানিত করব এবং তাদেরকে বেত্রাঘাত করা হবে।’’তখন তাদের আব্দুল্লাহ ইবন্ সালাম বলেন: তোমরা মিথ্যা বলেছ, সেখানে রজমের কথা রয়েছে। তখন তারা তাওরাত নিয়ে এসে তা খুলে ধরল। অতঃপর তাদের একজন রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে আগের ও পরের বাক্যাবলী পাঠ করল। তখন আব্দুল্লাহ্ ইবন্ সালাম বললেন: তুমি হাত উঠাও। অতঃপর যখন হাত উঠানো হলো তখনি সেখানে রজমের আয়াত দেখা গেল। তখন তারা বলল: হে মুহাম্মাদ! আপনি সত্য বলেছেন। এতে রজমের আয়াত রয়েছে। তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  তাদেরকে রজম তথা পাথর মেরে হত্যার নির্দেশ দিলেন। আর তাদেরকে পাথর মারা হলো।’’[30]

  1. তাছাড়া, ধর্মীয় আলোচনার জন্য রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং ইহুদীদের ‘মিদরাস’[31]-এর গমন করেছেন। এ আলোচনায় সাধারণত উলুহিয়্যাত-ঈশ্বরতত্ত্ব, ধর্মীয় গ্রন্থ, রাসূলতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরূপ পারস্পরিক আলোচনার ফলে আবদুল্লাহ ইবন সালাম,সা‘লাবা ইবন সাঈদ,আসাদ ইবন উসাইদ-এর মত প্রভাবশালী ইহুদী পন্ডিত ও নেতৃবৃন্দ ইসলাম গ্রহণ করেন। ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

‘‘একবার রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীদের একটি শিক্ষায়তনে প্রবেশ করলেন যেখানে একদল ইয়াহূদী অবস্থান করছিল। তিনি তাদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করলেন। তখন নু’মান ইবন্ আমর এবং হারেস ইবন্ যায়দ বলেন: হে মুহাম্মাদ! তোমার দিন কোনটি?তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আমি ইবরাহীমের দীনের উপর। তখন তারা উভয়ে বলল: ইবরাহীম তো ইয়াহূদী ছিল। তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তাহলে তাওরাত নিয়ে আস, আমাদের ও তোমাদের মাঝে সেটাকে ফয়সালাকারী হিসেবে গ্রহণ কর। কিন্তু তারা উভয়ে তা করতে অস্বীকার করল। তখন আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন: ‘‘আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যাদেরকে কিতাবের অংশ প্রদান করা হয়েছিল?তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের দিকে আহ্বান করা হয়েছিল যাতে ওটা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়;তারপর তাদের একদল ফিরে দাঁড়ায়,আর তারাই পরাম্মুখ।’’[32]

  1. এ ছাড়াও ইয়াহূদীদের বিভিন্ন প্রতিনিধিদল রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসত, বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করত এবং বিতর্কে লিপ্ত হত[33]
  • খ্রিষ্টানদের সাথে তাদের ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্ক:

খ্রিষ্টানদের সাথে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীদের তুলনায় স্বল্প পরিমাণ ধর্মীয় বিতর্ক করেছেন। কারণ তারা মূলত মদীনা থেকে দূরে অবস্থান করত। ফলে মুসলিমদের সাথে তাদের খুব কম সাক্ষাত হতো। তারপরও যখনি কোনো প্রতিনিধিদল রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আগমন করত তখনি তারা ধর্মীয় বিষয়ে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হত। এক্ষেত্রে হাবশা ও নাজরানের খ্রিষ্টানদের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যেতে পারে।

  1. সীরাতে ইবন্ হিশামে এ জাতীয় একর্টি ধর্মীয় সংলাপ এসেছে। যার বিষয়বস্তু হলো: খ্রিষ্টানগণ রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে ঈসা ইবন্ মারইয়াম সম্পর্কে বিতর্ক সৃষ্টি করল। তারা রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  কে ঈসা আলাইহিসসালামের পিতা সম্পর্কে প্রশ্ন করল এবং তারা আল্লাহ্ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার অপবাদ ও মিথ্যা বলে বেড়াতে লাগল। তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন: ‘তোমরা জান যে, যত সন্তানই আছে তারা তাদের পিতার সদৃশ হয়? তারা বলল: অবশ্যই । তিনি বললেন: তোমরা কি জান না যে, আমাদের প্রভু চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই? অথচ ঈসার অস্তিত্ব বিলীন হবে?তখন তারা বলল: অবশ্যই। তিনি আরও বললেন: আমাদের রব সবকিছুর ধারক-বাহক,তিনি সবকিছুর সংরক্ষণ করেন ও রিযক দিয়ে থাকেন? তারা বলল: নিশ্চয়ই। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তাহলে ঈসা ইবন্ মারঈয়াম কি এগুলোর কোনো কিছু করতে সক্ষম? তখন তারা বলল: না। তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা কি জান না যে, আসমান ও যমীনের কোনো সৃষ্টিই তাঁর কাছে গোপন নেই? তারা বলল: নিশ্চয়ই। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বললেন: আমার প্রভু ঈসাকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে রেহেমের মধ্যে আকৃতি দান করেছেন। তিনি আরও বললেন: আর আমার প্রতিপালক খানা-পিনা করেন না এবং কোনো অপবিত্র কাজও ঘটান না?তখন তারা বলল: নিশ্চয়ই। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা কি জান না যে,অন্যান্য মহিলাদের মত ঈসাও মায়ের গর্ভে লালিত-পালিত হয়েছেন? তারপর অন্যান্য মহিলারা যেভাবে বাচ্ছা প্রসব করে তিনি তার মাও তাকে সেভাবে প্রসব করেছেন এবং অন্যান্য বাচ্ছাদের মত তাকেও খাওয়ানো হয়েছে। তারপর তিনি খাবারও খেয়েছেন,পানও করেছেন এবং অপবিত্রও হয়েছেন? তারা বলল: অবশ্যই। তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তাহলে তোমরা যা ধারনা করছ তা কিভাবে সম্ভব হতে পারে? এরপর তাদের সবাই চুপ হয়ে গেল। এ পরিপ্রেক্ষিতেই প্রথম থেকে আশির অধিক আয়াত নাযিল হয়।[34]
  2. অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে,হাবশা থেকে একদল খ্রিষ্টান রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ধর্মীয় বিষয়ে আলাপ-আলোচনার উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমণ করে। তারা রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিভিন্ন দীনি প্রশ্ন করে দু’ধর্মের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে ইসলাম গ্রহণ করে[35]
  3. অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদী ইবন্ হাতিমের সাথে তার দীন খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে আলোচনা করে তাকে যুক্তিতে পরাস্ত করে আল্লাহর দীন মানতে উদ্বুদ্ধ করেন। যার ফলশ্রতিতেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ‘আদী ইবন্ হাতিম বলেন: ‘‘যখন আল্লাহ্ তা‘আলা রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন,তখন তাঁকে এমন প্রচন্ড আকারে ঘৃণা করলাম এবং তাঁর থেকে পালিয়ে যমীনের একপ্রান্ত রোমের পাশ্বস্থ আরবভূমিতে আশ্রয় নিলাম। তারপর আমি আমার প্রথম স্থানের চেয়েও সে স্থানে অবস্থান করাটা অত্যধিক অপছন্দ করলাম। তারপর আমি স্বয়ং বললাম, আমি যদি লোকটির কাছে যেতাম এবং তার কাছ থেকে কিছু শুনতাম তাহলে কেমন হয়। তারপর আমি মদীনায় আসলাম। মানুষের মধ্যে এ কথা ছড়িয়ে পড়ল। তারা বলাবলি করতে লাগল যে,আদী ইবন্ হাতিম আত-ত্বায়ী এসেছে। তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: হে ‘আদী! তুমি ইসলাম গ্রহণ কর তাহলে নিরাপত্তা পাবে। আমি বললাম আমি একটি দীনের উপর আছি। তিনি  সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমার দীন সম্পর্কে আমি তোমার থেকেও অধিক জ্ঞাত। আমি বললাম: আপনি কি আমার দীন সম্পর্কে আমার থেকেও অধিক জ্ঞাত?তিনি বললেন: হাঁ। ‘আদী ইবন্ হাতেম বলেন: রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাটি তিনবার উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বললেন: তুমি কি ‘রন্ডকুচী’ নও? (অর্থাৎ এমন সম্প্রদায় যারা খ্রিষ্টান ও সাবেয়ী এ দু’ধরনের ধর্মের মধ্য পন্থার অনুসারী) আমি বললাম: অবশ্যই। তিনি বললেন: তুমি কি তোমার সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দাও না? আমি বললাম: হাঁ। তিনি বললেন: তুমি কি ‘লুটের সম্পদের চারভাগে এক ভাগ নাও না? আমি বললাম: নিশ্চয়ই। তিনি বললেন: কিন্তু এটা তো তোমার ধর্মমতে অবৈধ। ‘আদী ইবন্ হাতিম বলেন: এতে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। তারপর রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: সম্ভবত এটাই সম্ভবত তোমাকে আমাদের দীন থেকে দূরে রেখেছে, কারণ তুমি দেখতে পাচ্ছ যে, আমাদের এখানে অভাব-অনটন রয়েছে।’’[36]

ইবনে কাইয়্যেম রাহেমাহুল্লাহ এ সমস্ত কুরআনের আয়াত ও হাদীসের ভাষ্য এবং সীরাতের বিভিন্ন ঘটনা যেমন নাজরানের খ্রিষ্টানদের সাথে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধর্মীয় বিতর্ক এগুলোর শিক্ষা বর্ণনায় বলেন:

এ ঘটনা থেকে যে শিক্ষা আমরা পাই তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: আহলে কিতাবদের সাথে ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্ক করা জায়েয বরং মুস্তাহাব। আবার ক্ষেত্রবিশেষে ওয়াজিবও যখন এটা স্পষ্ট হবে যে,এ আলোচনায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে তাদের অনেকেই ইসলামের সুমহান আদর্শ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে। আর বুদ্ধিভিত্তিক ও জ্ঞান ভিত্তিক যুক্তি উপস্থাপন করে তাদের বিভিন্ন সন্দেহ ও প্রশ্নের অপনোদন করা প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়[37]

তাছাড়া, মহানবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পর আরব-খ্রিষ্টানদের প্রধান কেন্দ্র-নাজরান থেকে একদল প্রতিনিধি মদীনায় আসেন। খ্রিষ্টানদের এক নেতার নেতৃত্বে চৌদ্দ জন পাদ্রীসহ ষাটজন প্রতিনিধি এতে অংশগ্রহণ করেন। তারা ইসলাম ও খ্রিষ্টানধর্ম সম্পর্কে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাদের ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।[38] এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর সূরা আলে-ইমরান অবর্তীণ হয়।

অনুরূপভাবে ইরানের আধিবাসী প্রখ্যাত সাহাবী সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুও সত্যদীন অনুসন্ধানের জন্য বহু কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে মদীনায় আসেন। তিনি জন্মসূত্রে ছিলেন মাজদাক ধর্মের অনুসারী। এ ধর্মমত তাঁকে পরিতৃপ্ত করে পারেনি। তাই তিনি খ্রিষ্টানধর্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু এতেও তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত সত্য লাভে অসমর্থ হন। পরিশেষে মদীনায় রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আগমন করেন এবং বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ইসলামের সত্যতায় স্থিরচিত্ত হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।[39]

  • মুশরিকদের সাথে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধর্মীয় বিতর্ক:

বিভিন্ন বর্ণনায় প্রায়শই দেখা যায় যে, কতিপয় মুশরিক দলবদ্ধভাবে ধর্ম সম্পর্কে বিতর্ক-জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাঁর পাশে সমবেত হয়। মহানবী  সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের  সাথে আলোচনায় তাঁরা সন্তুষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।[40] তন্মধ্যে নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:

  1. তুফাইল ইবন আমর আদ্-দাওসী ছিলেন ঘোর পৌত্তলিক। কেবল ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ নিয়ে তিনি মক্কায় রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দীর্ঘ আলোচনা শেষে তিনি রাসূল রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সত্যতায় বিশ্বাস স্থাপন করে কৃতার্থ হন।[41] এভাবে অনেক পৌত্তলিক দলগত ও ব্যক্তিগতভাবে রাসূলের সাথে ধর্মালোচনায় মিলিত হন।
  2. ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 ‘‘হে কুরাইশ সম্প্রদায়! নিশ্চয় আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারও ইবাদতে কোনো কল্যাণ নেই। কিন্তু কুরাইশগণ জানত যে, খ্রিষ্টানগণ ঈসা আলাইহিসসালামের ইবাদত করত। সুতরাং মুহাম্মাদ সম্পর্কে তুমি কি বলবে? তখন তারা মুহাম্মাদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে উদ্দেশ্য করে বলল: হে মুহাম্মাদ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! তুমি কি বিশ্বাস করনা যে, ঈসা নবী ছিলেন এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের মধ্যে একজন ছিলেন? যদি তুমি তোমার কথায় সত্য হও তাহলে তাদের ইলাহও তো তোমাদের বক্তব্যমত হওয়া উচিত। তখন কুরআনে ইরশাদ হলো, যখন মারইয়াম-তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন আপনার সম্প্রদায় তাতে শোরগোল আরম্ভ করে দেয়, এবং বলে, ‘আমাদের উপাস্যগুলো শ্রেষ্ঠ না ‘ঈসা?’ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই আপনাকে এ কথা বলে। বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায়। তিনি তো ছিলেন আমারই এক বান্দা, যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বনী ইস্রাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত।’’[42]

  1. অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমরান ইবন্ হুসাইনের পিতা হুসাইনকে বলেন:

হে হুসাইন! তুমি আজ কয়জনের ইবাদত কর? হুসাইন উত্তর করলেন: সাতজনের, ছয়জন যমীনে আর একজন আসমানে। তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমার আবেগ ও ভীতির জন্য কাকে গণ্য করো? উত্তরে হুসাইন বলেন: যিনি আসমানে আছেন। তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: হে হুসাইন! তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ করো তবে আমি তোমাকে এমন দু’টি কালেমা শিক্ষা দেব যা তোমার উপকারে আসবে। তারপর যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে যে দু’টি কালেমা শেখানোর ওয়াদা করেছেন সে দু’টি শিক্ষা দিন। তখন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: বল,হে আল্লাহ ! আমাকে সঠিক পথের দিশা মনে ঢেলে দিন এবং আমাকে আমার অন্তরের অকল্যাণ থেকে বাঁচান।[43]

এখানেও আমরা দেখতে পাই যে,মুশরিকদের দীনের ব্যাপারে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্যক অবগত হয়ে তাদের সাথে দীনি বিতর্ক করে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন।

  1. অনুরূপভাবে ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন  ﴿ إِنَّكُمۡ وَمَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ أَنتُمۡ لَهَا وَٰرِدُونَ ٩٨ ﴾ [الانبياء: ٩٨]    ‘‘তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ‘ইবাদাত কর সেগুলো তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে।’’[সূরা আল-আম্বিয়া:৯৮] এ আয়াত নাযিল হলো, তখন মুশরিকরা বলতে লাগল, ফেরেশতা, উযাইর এবং ঈসা এরও তো ইবাদত করা হয়, তারাও কি জাহান্নামে যাবে? তখন আল্লাহ্ নাযিল করলেন,

﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ سَبَقَتۡ لَهُم مِّنَّا ٱلۡحُسۡنَىٰٓ أُوْلَٰٓئِكَ عَنۡهَا مُبۡعَدُونَ ١٠١ ﴾ [الانبياء: ١٠١]   

‘‘যাদের জন্য আমার কাছ থেকে পূর্ব থেকেই কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা থেকে দূরে রাখা হবে।’’ [সূরা আল-আম্বিয়া:১০১][44]

  1. অন্য বর্ণনায় এসেছে,কাফের মুশরিকরা রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের  কাছে এসে ঈসা আলাইহিস্ সালাম নিয়ে বাদানুবাদ শুরু করে দিল। বিশেষ করে ওলীদ ইবনে মুগীরাহ। তখন আল্লাহ্ নাযিল করলেন,

﴿ ۞وَلَمَّا ضُرِبَ ٱبۡنُ مَرۡيَمَ مَثَلًا إِذَا قَوۡمُكَ مِنۡهُ يَصِدُّونَ ٥٧ وَقَالُوٓاْ ءَأَٰلِهَتُنَا خَيۡرٌ أَمۡ هُوَۚ مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلَۢاۚ بَلۡ هُمۡ قَوۡمٌ خَصِمُونَ ٥٨ إِنۡ هُوَ إِلَّا عَبۡدٌ أَنۡعَمۡنَا عَلَيۡهِ وَجَعَلۡنَٰهُ مَثَلٗا لِّبَنِيٓ إِسۡرَٰٓءِيلَ ٥٩ وَلَوۡ نَشَآءُ لَجَعَلۡنَا مِنكُم مَّلَٰٓئِكَةٗ فِي ٱلۡأَرۡضِ يَخۡلُفُونَ ٦٠ وَإِنَّهُۥ لَعِلۡمٞ لِّلسَّاعَةِ فَلَا تَمۡتَرُنَّ بِهَا  ٦١ ﴾ [الزخرف: ٥٧،  ٦١]    

‘‘যখন মারইয়াম-তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন আপনার সম্প্রদায় তাতে শোরগোল আরম্ভ করে দেয়, এবং বলে, ‘আমাদের উপাস্যগুলো শ্রেষ্ঠ না ‘ঈসা?’ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই আপনাকে এ কথা বলে। বস্তুত এরা তো এক বিণ্ডাকারী সম্প্রদায়। তিনি তো ছিলেন আমারই এক বান্দা, যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বনী ইস্রাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছে করলে তোমাদের মধ্য থেকে ফিরিশ্তা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হত।‘ঈসা তো কিয়ামতের নিশ্চিত নিদর্শন; কাজেই তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ করো না এবং আমাকে অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।’’ [সূরা আয-যুখরুফ: ৫৭-৬১][45]

  1. তদ্রুপ মুশরিকদের পুনরুত্থান সংক্রান্ত সংলাপ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ। পবিত্র কুরআনে ও রাসূলের হাদীসে তার বর্ণনা এসেছে,একবার উবাই ইবনে খালাফ রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসল। তার হাতে ছিল একটি পুরাতন হাঁড়। সে সেটা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বলল, হে মুহাম্মাদ! তুমি কি মনে কর যে, আল্লাহ্ এটারও পুনরুত্থান ঘটাবেন? তিনি বললেন, হাঁ, তোমাকেও আল্লাহ্ মৃত্যু দিবেন এবং পুনরুত্থান করবেন তারপর তোমাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। তখন আল্লাহ্ আগত আয়াতসমূহ নাযিল করেন:

﴿ أَوَ لَمۡ يَرَ ٱلۡإِنسَٰنُ أَنَّا خَلَقۡنَٰهُ مِن نُّطۡفَةٖ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٞ مُّبِينٞ ٧٧ وَضَرَبَ لَنَا مَثَلٗا وَنَسِيَ خَلۡقَهُۥۖ قَالَ مَن يُحۡيِ ٱلۡعِظَٰمَ وَهِيَ رَمِيمٞ ٧٨ قُلۡ يُحۡيِيهَا ٱلَّذِيٓ أَنشَأَهَآ أَوَّلَ مَرَّةٖۖ وَهُوَ بِكُلِّ خَلۡقٍ عَلِيمٌ ٧٩ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُم مِّنَ ٱلشَّجَرِ ٱلۡأَخۡضَرِ نَارٗا فَإِذَآ أَنتُم مِّنۡهُ تُوقِدُونَ ٨٠ ﴾ [يس: ٧٧،  ٨٠]    

‘‘মানুষ কি দেখে না যে, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু থেকে? অথচ পরে সে হয়ে পড়ে প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী। এবং সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়। সে বলে, ‘কে অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে যখন তা পচে গলে যাবে?’ বলুন,‘তাতে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।’ তিনি তোমাদের জন্য সবুজ গাছ থেকে আগুন উৎপাদন করেন এবং তোমরা তা থেকে প্রজ্বলিত কর। যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি কি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সমর্থ নন? হাঁ, নিশ্চয়ই তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ।’’ [সূরা ইয়াসীন:৭৭-৮০][46]

 

লিখেছেনঃ ড. মোঃ আবদুল কাদের

সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

 


[1] সম্পাদকমন্ডলী, বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পরিমার্জিত সংস্করণ (ঢাকা: চতুর্থ মুদ্রণ, ২০০৩) পৃ.১১০২।

[2] প্রাগুক্ত।

[3] মি.যোসেফ বিশ্বাস, জাতীয় সংলাপ সেমিনার ১৯৯২-এর সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট, (মাসিক মঙ্গলবার্তা, ২য় বর্ষ ২য় সংখ্যা) পৃ.২৩।

[4] সিলভানো গারেলেস্না ও সন্তোষ মন্ডল, English-Bengali Christian Terminology, পৃ, ১০২।

[5] মুহাম্মদ শামছুদ্দীন খাজা, আল হিওয়ার আদাবুহু ওয়া মুনতালাকাতুহু ওয়া তারবিয়াতুল আবনাই আলাইহি, (রিয়াদ: মারকাজুল মালিক আব্দুল আযীয লিল হিওয়ার আল ওয়াতানী, ২য় সংস্করণ, ২০০৮ খ্রি.) পৃ.১৭।

[6] আশ-শাওকানী, মুহাম্মদ আলী, ফাতহুল কাদীর, সূরা ইনশিকাকের ১৪ নং আয়াতের তাফসীর, খ ৭, তা বি, পৃ. ৪৫৪।

[7] মি. যোসেফ বিশ্বাস, জাতীয় সংলাপ সেমিনার ১৯৯২-এর সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট, প্রাগুক্ত, পৃ.২৩।

[8] সম্পাদকীয়, দ্বিমাসিক মঙ্গলবার্তা, (যশোর, জাতীয় ধর্মীয় সামাজিক প্রশিক্ষন কেন্দ্র, ১০ম বর্ষ, ৬সংখ্যা, নভেম্বর-ডিসেম্বর, ২০০৫) পৃ.১।

[9] প্রাগুক্ত।

[10] সম্পাদনা পরিষদ কর্তৃক সম্পাদিত, অধিবেশন১৪: সংলাপ, দ্বিমাসিক মঙ্গলবার্তা, (যশোর, জাতীয় ধর্মীয় সামাজিক প্রশিক্ষন কেন্দ্র, ২য় বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, মে-জুন, ১৯৯৭)পৃ৬২।

[11] খালিদ মুহাম্মদ আল-মুগামিসি, আল হিওয়ার আদাবুহু ওয়া তাতবিকাতুহু ফীত তারবিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, (রিয়াদ:মারকাজুল মালিক আব্দুল আযীয লিল হিওয়ার আল ওয়াতানী, ১ম সংস্করণ, ১৪২৫হি.) পৃ ২২।

[12] মুহাম্মদ শামছুদ্দীন খাজা, প্রাগুক্ত, পৃ১৭।

[13] ড.আজিজুন্নাহার ইসলাম ও ড. কাজী নূরূল ইসলাম, তুলনামূলক ধর্ম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, (ঢাকা:বাংলা একাডেমী, )পৃ৬৫-৬৬।

[14] প্রাগুক্ত।

[15] প্রাগুক্ত।

[16] প্রাগুক্ত।

[17] .আল-কুরআন, সূরা আলে-ইমরান ৩: ৬১।

[18] . আল-কুরআন, সূরা আন-নাহল: ১২৫-১২৬।

[19] . আল-কুরআন, সূরা আলে ইমরান, মায়েদা।

[20] . আল-কুরআন, সূরা আল-নাহল: ১২৫-১২৬।

[21] . সূরা আল আনকাবুত ২৯:৪৬।

[22] সূরা- ত্বা-হা: ৪২-৪৪।

[23] বুখারী, হাদীস নং ৪৭৭০।

[24] . আল-কুরআন, সূরা আল আরাফ ৭: ১৯৯।

[25] . আল-কুরআন, সূরা আল আনআম ৬: ১০৮।

[26] . আল-কুরআন, সূরা আল মায়িদা: ৭৬।

[27] আল-কুরআন, সূরা হাজ্জ ২২:৮।

[28]. আল-কুরআন,  সূরা আলে ইমরান: ৬৪।

[29] ইমাম বুখারী, প্রাগুক্ত, হাদীস নং ৩৩২৯, ৩৯১১, ৩৯৩৮, ৪৪৮০।

[30] প্রাগুক্ত, হাদীস নং ৩৩৬৩।

[31] প্রাগুক্ত

[32] ইবন্ হিশাম, আবদুল মালিক ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নবওয়ীয়্যাহ, ২য় খ- (জর্দান: মাকতাবাতুল মানার, ১ম সংস্করণ, ১৪০৯ হি.), পৃ. ২৩০; তাবারী, প্রাগুক্ত, ষষ্ট খ-, পৃ. ২৭৭, আয়াতটি সূরা আলে ইমরানের ২৩ নং আয়াত।

[33] ইবনে হিশাম, প্রাগুক্ত, ২য় খ-, পৃ.২১৮-২১৯।

[34] ওয়াহেদী, আবুল হাসান আলী, আসবাবু নুযুলিল কুরআন (সৌদী আরব: দারুল কিবলাহ, ১৪০৪ হি.), পৃ.৯০-৯১।

[35] সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রাগুক্ত, ২য় খ- , পৃ.৩৬।

[36] ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, প্রাগুক্ত, ৪র্থ খ-, পৃ. ৩৭৮, ২৫৭-২৫৮।

[37] ইবনুল কাইয়্যেম, যাদুল মাআদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ, ৩য় খ-, পৃ. ৬৩৯।

[38] ইবনে হিশাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫০৮-৫১৭।

[39] প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৭-২২৫।

[40] ড. আহমদ শালাবী, আল-মানাহিজুল ইসলামিয়্যা, ১ম খ- (কায়রো : মাকতাবাতুন নাহদাতুল মিসরিয়্যা, ১৯৯৩), পৃ. ১৩৯।

[41] ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৭।

[42] ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, প্রাগুক্ত, ১/৩১৩, ৬/৩০২। আয়াতটি সূরা আয-যুখরুফঃ ৫৭-৫৯।

[43] ইমাম তিরমিযী, প্রাগুক্ত, হাদীস নং ৩৪০৫।

[44] হাফেয ইমাদুদ্দিন ইসমাইল ইবনে কাসীর আদ-দামেশকী, তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৫ম খ-(বৈরুত, দারুল মা‘রিফাহ, ১৪০৭ হি.) পৃ. ৩৮০।

[45] প্রাগুক্ত

 

[46] প্রাগুক্ত

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

কেউ কারও দাস নয়, সবাই আল্লাহর দাস

কেউ কারও দাস নয়, সবাই আল্লাহর দাস সম্প্রতি থাইল্যান্ডে ১৩০ বাংলাদেশী দাস শ্রমিক উদ্ধার হয়েছে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE