Breaking News
Home / সাহিত্য / কিছু গল্প / গাধাও একেবারে গাধা নয়! (গাধা ও নেকড়ে বাঘের গল্প)

গাধাও একেবারে গাধা নয়! (গাধা ও নেকড়ে বাঘের গল্প)

একবার এক চাষী তার গাধার পিঠে বোঝা চাপিয়ে নিজেও চেপে বসলো এবং রুওনা হলো শহরের দিকে। গাধাটি ছিল বুড়ো ও দুর্বল। গ্রাম থেকে শহরে যাওয়ার রাস্তাটি ভাল ছিল না। এবড়ো থেবড়ো পাথুরে এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ গাধার পা একটি গর্তে ঢুকে পড়ায় সে টাল সামলাতে না পেরে বোঝা ও সওয়ারী সমেত পড়ে গেলো জমিনে। চাষী বহু কষ্ট করে গাধাটিকে দাঁড় করাতেই দেখতে পেলো গাধার একটি পা মচকে গেছে। সে চলতে পারছে না। চাষী বিরক্ত হয়ে বোঝা কাঁধে তলে নিয়ে গাধাকে সেখানে ফেলে রেখেই চলে গেলো।

হতভাগা গাধা খোঁড়া পায়ে কোথায় যাবে কোথায় না তার দিশা খুঁজে পেল না। সে মনে মনে ভাবলো, ‘এই বে-ইনসাফ মানুষগুলোর জন্যে সারাটা জীবন শুধু বোঝাই টানলাম। আজ যখন বুড়ো, দুর্বল ও খুড়া হয়ে পড়লাম তখন কিনা আমাকে একাকী ছেড়ে দিয়ে গেলো এই পাহাড়ী মরুভূমির হিংস্র নেকড়ের নাগালে। একটুও ভাবলো না আমার কি উপায় হবে।’

হায় আফসোস করতে করতে গাধা এদিক সেদিক তাকিয়ে কিছুই বুঝতে পারছিল না। হঠাৎ গাধা দেখতে পেলো যে, সত্যি সত্যি যম তার দিকে এগিয়ে আসছে। একটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে দাঁত বের করে এগুচ্ছে। গাধাকে মালিকবিহীন অবস্থায় একাকী এই নির্জনে পাহাড়ী এলাকায় পেয়ে নেকড়ের পোয়াবারো। সে আনন্দে হেঁকে উঠলো। আজ কি সৌভাগ্যই না তার। আস্ত এত বড় একটা গাধাকে মেরে বেশ ক’দিন নিশ্চিন্তে বসে বসে খেতে পারবে।

গাধা ভাবলো” যদি গায়ে সামর্থ্য থাকতো এবং পা-ও মচকে না যেতো তাহলে আপ্রাণ দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করতাম কিংবা নেকড়ের সাথে জোর খাটিয়ে আত্মরক্ষা করতে পারতাম। কিন্তু তাই বলে নিরূপায় হলে চলবে না। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। নেকড়ের কাছে নিজেকে এমনিতেই সঁপে দেয়া উচিৎ হবে না। পা ভেঙ্গেছে তো কি হয়েছে। যতক্ষণ মগজ আছে, হোক না তা গাধারই মগজ। তাঁকে কজে লাগিয়ে বিপদমুক্ত হওয়ার উপায় বের করতে হবে। ভাল করে চিন্তা-ভাবনা করলে নিশ্চয় আল্লাহ একটা পথ করে দেবেন।’

এরপর সে মনে মনে একটি পরিকল্পনা আঁটলো। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একটি সুবিধাজনক ঢালু জায়গায় পিছ করে দাঁড়ালো। এ পায়ে সে আর কোথাও যাওয়ার ক্ষমতাও রাখে না। এরপর যেই নেকড়ে তার কাছাকাছি এলো তখনি জোর গলায় বললোঃ হে হিংস্র জগতের সেনাপতি, আপনাকে জানাই অজস্র সালাম।’

নেকড়ে গাধার এহেন আচরণ দেখে তাজ্জব বনে গেলো। সে বললোঃ অলাইকুম সালাম! এখানে একাকী কি করছিস?দুর থেকে দেখলাম মাটিতে পড়ে গেলি এবং তোর মালিক তোকে টেনে তুললো। এরপর সে তোকে এখানে রেখেই চলে গেলো। কী খবর চলতে চলতে ঘুম্নিয়ে পড়েছিলি নাকি?’

গাধাঃ জ্বী না জনাব! ঘুমিয়ে পড়িনি।, হোঁচট খেয়ে গর্তে পড়ে গিয়েছিলাম। আমি অসুস্থ বৃদ্ধ। এখনও নড়তে পারছিনে। নড়তে গেলেই মনে হয় পরে যাবো। একটা পা-ও নাড়াতে পারছি না। গায়ে মোটেও জোর নেই। একেবারে নেতিয়ে পড়েছি। না পালানোর ক্ষমতা আছে, না ঝগড়া বিবাদের কোন মেজাজ আছে।[ এখন নিজেকে আপনার হাতে সম্পূর্ণ সঁপে দেয়ারই নিয়ত করেছি। দুনিয়া আর ভালো লাগে না। মরতে পারলেই বাঁচি। তবে মরার আগে আপনার কাছে আমার একটা শেষ আর্জি আছে।’

নেকড়ে বললোঃ আর্জি? সে আবার কী?

গাধাঃ হে সম্মানিত নেকড়ে। এটা ঠিক যে আমি একটি গাধা মাত্র। কিন্তু গাধাও যতক্ষণ জীবিত থাকে ততক্ষণ তার প্রাণ তার কাছে অত্যন্ত প্রিয় যেমন করে মানুষের কাছে মানুষের প্রাণ অত্যন্ত প্রিয় ও মিষ্ট। অবশ্য আমার মরণ খুবই ঘনিয়ে এসেছে এবং আমার গোশতও আপনার ভাগ্যে রয়েছে। এ অঞ্চলে আর কেউ এ গোশতে ভাগ বসাতে আসবে না। একা একা বেশ মজা করে ক’টা দিন খেতে পারবেন। আমিও এতে অসন্তুষ্ট নই। আশা করি আমাকে খেয়ে সুখী হবেন। দীর্ঘজীবী হবেন। তবে আমার আরজ হচ্ছে এই যে, একটু দয়া করুণ, অনুগ্রহ করে আর ক’টা মুহূর্ত ছবর করুণ। আমার হুশ থাকা পর্যন্ত হামলা করবেন না। আমার জানটা যখন বের হয়ে যাবে তখন খাওয়া শুরু করুণ। তাড়াহুড়া করে আমাকে হত্যা করলে প্রাণ হত্যার দায় বর্তাবে আপনার ঘাড়ে।কেনো কয়েক মুহূর্তের জন্য অধৈর্য হয়ে নিজে গুনাহের ভাগী হবেন? আমিতো এমনিতেই মরে যাচ্ছি। আমার হাত-পা এখন কাঁপছে। মাথা চক্কর খাচ্ছে। মৃত্যু যম এখন আমার চোখের সামনে। বহু জোর করে নিজেকে খাড়া রাখছি। আর ক’টা মুহূর্ত পরেই আমি এ নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেবো। আপনি যদি এ ক’টা মুহূর্তে ছবর করেন তাহলে আমিও আপনাকে এমন কিছু উপহার দেবো যা কখনো দেখেননি এবং যা দিয়ে আপনি অনায়াসে আরো এক শ’ গাধা কিনে নিতে পারবেন।

নেকড়েঃ ঠিক আছে, তর আর্জি মেনে নিলাম। কিন্তু ওই যে বলছিস উপহার, সে কোথায়? গাধাতো কিনতে হয় টাকা দিয়ে, গপ্প ছেড়ে নয়!

গাধাঃ ঠিক কথাই বলেছেন। আমিও আপনাকে টাকা নয়, একেবারে খাঁটি সোনা উপহার দেবো। শুনুন তাহলে, আমার মালিক এক মস্ত বড় জমিদার। তার সোনা রূপার কোন শেষ নেই। আমাকে তিনি খুব পছন্দ করতেন। জওয়ান বয়েসে আমি ঘোড়ার মতো কাজ করতাম। এ কারণে আমার আরাম আয়েশের জন্যে তিনি সর্বক্ষণ ব্যবস্থা করতেন। আমাকে মোজাইক করা বিদেশী টালির ঘরে রাখতেন। আমার গায়ে রেশমের কাপড় জড়িয়ে দিতেন। আমার বিছানা ছিল মখমলের তৈরি ও সোনার কাজ করা। আমাকে খড়কুটা ও যবভূষি দেয়ার বদলে সব সময় রসগোল্লা, সন্দেশ ও বাতাসা খাওয়াতেন। এ জন্যেইতো আমার গোশত এতো স্বাদের। খেলেই বুঝবেন কতো মজা! জমিদার যেহেতু আমাকে তার ছেলেমেয়ের মতো ভালবাসতো সেহেতু আমার হাত-পায়ের খুর বিশুদ্ধ সোনা দিয়ে বাঁধতেন। আজ মনিবের শরীরটা ভাল ছিল না বলে বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। এ সুযোগে এক চোর এসে বাড়ির কিছু জিনিসপত্রসহ আমাকে নিয়ে পালালো। ওই যে লোকটা দেখলেন সে আসলে চোর, মালিক নয়। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে আমাকে নিয়ে আসায় আমি ঠিক মতো পথ চলতে পারছিলাম না। তাছাড়া বয়েস হওয়ায় বহুদিন যাবৎ আমার মালিক আমাকে দিয়ে তেমন কিছু কাজ করাতেন না। তাই অলস হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু চোর বেটা জোর করে আমাকে নিয়ে যাচ্ছিল। এদিকে হঠাৎ আমার পা গর্তে ঢুকে পড়ায় আমি টাল সামলাতে পারিনি ও পড়ে যাই। যাহোক, আমি বহু আরাম আয়েশে ও নেয়ামতের মাঝে বড় হয়েছি। এখনো আমার হাত পায়ে মনিবের বাঁধানো সোনার খুর রয়েছে। আপনি মহান নেকড়ে বলে আপনাকে সত্য কথা বললাম। আপনাকে দেখেই অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত মা-বাবার সুসন্তান বলে মনে হচ্ছে। আপনি দয়া করে আমার খুরের সোনাগুলো খুলে নিয়ে যাবেন।

এগুলো দিয়ে নিঃসন্দেহ আরো অনেক গাধা কিন্নে জীবন ভর খেয়ে যেতে পারবেন। জীবনে আর কোন কায়ক্লেশ ও কষ্ট করতে হবে না। আসুন, আমার পেছনের পা দুটোর খুরগুলোও চেয়ে দেখুন কতো খাঁটি সোনার তৈরি।

গাধার চালাকি…

ধন সম্পদের লোভ লালসার মোহজালে যেমন করে অনেকেই ধরা পড়ে তেমনি নেকড়েও মোহগ্রস্ত হলো। তাই এগিয়ে গেলো গাধার পেছনে কিছুটা ঢালু অংশের দিকে। কিন্তু যেই সে গাধার পায়ের নাগালে নিজেকে পেঁচিয়ে মাথা নিচু করে খুর দেখতে গেলো অমনি গাধা তার সামনের দু’পায়ের উপর দাঁড়িয়ে পেছনের দু’পা তুলে সারা গাঁয়ের জোরে প্রচন্ডবেগে কষিয়ে লাথি মারলো। লাথির চোটে নেকড়ে মুহুর্তে উল্টে গিয়ে পাখির মতো আকাশে উঠলো তারপর বহুদূরে ছিটকে পড়লো ঢালুতে। এক পায়ের লাথি নেকড়ের মুখে লেগে তার বড় বড় দাঁত মুখের ভেতরেই ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হলো এবং আরেক পায়ের লাথি লাগলো গিয়ে পাঁজরের গাড়ে। কয়েকটা পাঁজর মড় মড় শব্দে ভেঙ্গে গেলো। রুদ্ধশ্বাসে কতক্ষণ মাটিতে গড়াগড়ির পর হুশ আসতেই নেকড়ে বলে উঠলোঃ বেটা, তুই একটা আস্ত গাধা! গাধা মনের আনন্দে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললোঃ আস্ত গাধাতো বটেই! যে কোন লাগলই তার নিজ কাজে বেশ সাবধান ও সতর্ক। গাধার গোশত খাওয়ার মজা তোকে দেখাচ্ছি, দাঁড়া!

নেকড়ে তখন মুখ ও পাঁজরের তীব্র ব্যথায় ফরিয়াদ করছিল। সে যেই দেখলো যে, গাধা তার দিকে এগুচ্ছে অমনি জানের ভয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে দে ছুট! বহু দূর ছুটে যাওয়ার পর নেকড়ের সামনে পড়লো এক শিয়াল। বললোঃ সম্মানিত বড় দা! আপনার এ কী হাল অবস্থা? আপনার হাত পা নাক মুখ কেনো এমন রক্তাক্ত? কোন শিকারীর তীর বর্শা লাগলো নাকি?

নেকড়ে কাতরাতে কাতরাতে বললোঃ শিকারীর তীর বর্শা নয় রে, আমি নিজেই এ বালা মুছিবত নিজের কপালে ডেকে এনেছি।

শিয়ালঃ নিজে? সে কী? কি করতে গেলেন?

নেকড়েঃ আহ! ব্যথায় মরে গেলাম। আর বলিসনে। পেশা বদলাতে গিয়েছিলাম। কসাই ছিলাম, গোশত ছিড়ে খেতাম। কামার ও স্বর্ণকারের কাজ জানতাম না। কিন্তু আজ কী যে হলো কামার আর স্বর্ণকারের কাজই করতে গিয়েছিলাম! আহ! উহ! হাড় মাংস গুঁড়ো হয়ে গেছেরে!

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

স্ত্রীর পরশে

স্ত্রীর পরশে বদলে গেলো স্বামী (ছোট্ট গল্প)

এক স্ত্রী গভীর রাতে প্রতিদিন স্বামীর পাশ থেকে ঘুম থেকে উঠে আধা ঘন্টা এক ঘন্টার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE