Breaking News
Home / বই / ইসলামে সার্বভৌমত্বের স্বরূপ

ইসলামে সার্বভৌমত্বের স্বরূপ

cms.somewhereinblog.netসংক্ষিপ্ত বর্ণনা: ইসলামের দৃষ্টিতে সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য নির্দিষ্ট। তাঁর প্রভুত্ব, একচ্ছত্র মালিকানা এবং নিরংকুশ শাসন ক্ষমতা- অখন্ড, অবিভাজ্য এবং অংশহীন, বিশ্ব নিখিলের প্রত্যেকটি বস্তুই আল্লাহর একচ্ছত্র প্রভুত্বের অধীন ও তাঁর অনুগত হয়ে আছে, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব সর্বাত্মক ও অবিভাজ্য। এটাই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা, একে বিভিন্নভাবে ভাগ করে এক এক ভাগের জন্য এক একজনকে সার্বভৌমত্বের মালিক মনে করা স্পষ্ট শির্ক। আলোচ্য প্রবন্ধে তা তুলে ধরার প্রয়াস চালানো হয়েছে।

লিখেছেনঃ ড. মোঃ আব্দুল কাদের

সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

০১

ইসলামে সার্বভৌমত্বের স্বরূপ

ভূমিকা

মহাগ্রন্থ আল-কুরআন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এটি বিশ্ব মানবের শাশ্বত জীবন বিধান। মানুষের ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি লাভের উপায়সহ মানব জীবনের সার্বিক দিক ও বিভাগের বিশদ বিবরণ এ মহাগ্রন্থে বিধৃত হয়েছে, যা সর্বকালের, সর্বযুগের মানুষের জন্যে চিরন্তন আদর্শ। মানব জাতির চলার পাথেয় হিসেবে এ গ্রন্থের অবতারণা হয়েছে। এটি যাবতীয় কল্যাণের আঁধার, যার অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষ পেতে পারে সরল সঠিক পথের দিশা।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ। ইসলাম যুক্তিবিরোধী, প্রগতি-বিমূখ বা আত্মবিশ্বাস নির্ভর ধর্ম নয়। ইসলাম আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য দীন। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন বা জীবন ব্যবস্থা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে আল- কুরআনের ঘোষণা দ্বীর্থহীন:

﴿ إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلۡإِسۡلَٰمُۗ ٩ ﴾ [ال عمران: ١٩]

‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহর মনোনীত দীন হচ্ছে ইসলাম।’’ [1]

ইসলাম সর্বপ্রকার বর্বরতা, অসত্যতা, উচ্ছৃঙ্খলতা, অন্যায় ও অসত্যকে দূর করার জন্য প্রচেষ্টা চালায়। ইসলাম একমাত্র আল্লাহর প্রভুত্বই স্বীকার করে। এ প্রভুত্ব আর সব কিছু হতে মহীয়ান, সম্পূর্ণ রূপে অবিভাজ্য, এর কোনো অংশীদার নেই। ইসলাম বিশুদ্ধ তাওহীদের ধারক। তাওহীদ বিরোধী ভাবধারার সঙ্গে ইসলামের কোনো আপোষ নেই। ইসলাম হলো আল্লাহর কাছে তাওহীদের মাধ্যমে আত্মসমপর্ণ করা, তাঁর আনুগত্য মেনে নেয়া, শির্ক থেকে মুক্ত থাকা।

মহান আল্লাহ বলেন:

﴿ قُلۡ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحۡيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ١٦٢ لَا شَرِيكَ لَهُۥۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرۡتُ وَأَنَا۠ أَوَّلُ ٱلۡمُسۡلِمِينَ ١٦٣ ﴾ [الانعام: ، ١٦٣]

‘‘বলুন: আমার সালাত, আমার ইবাদত (কুরবানী ও হজ্জ) আমার জীবন মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই উদ্দেশ্যে, তাঁর কোনো শরীক নেই, আর আমি এরই জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।’’[2]

ইসলাম মানবতার একমাত্র মুক্তিরপথ, ইসলামই পারে মানবতাকে যাবতীয় সমস্যা হতে মুক্তি দিতে। সকল মানুষের নিকট আজ একটি প্রশ্ন উত্থিত হচ্ছে যে, প্রকৃত সার্বভৌমত্ব কার? এ নিয়ে পণ্ডিতরা অনেক দ্বিধা বিভক্ত। সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি। সার্বভৌমত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত সকলের ওপর স্থাপিত এক অপ্রতিহত ক্ষমতা। এর রাষ্ট্রের রয়েছে প্রত্যেক প্রজা ও প্রত্যেক জসমঙ্ঘের ওপর শাসন করার ও বশ্যতা আদায় করার সীমাহীন ক্ষমতা। সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের সে-ই বিশেষত্ব, যার ফলে রাষ্ট্র নিজের ইচ্ছা ব্যতীত অন্য কোনো কিছু মেনে নিতে বা অপর কারো কাছে আইনত দায়ী হতে পারে না, এ ক্ষমতার কারণে অন্য কোনো শক্তিই রাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রন আরোপ করতে পারে না। সার্বভৌমত্ব থাকার জন্যই রাষ্ট্র অভ্যন্তরীন সকল ব্যাপারে অগাধ কর্তৃত্ব করার অধিকারী হয়ে থাকে; অনুরূপভাবে সার্বভৌম গুণের জন্যই রাষ্ট্র বাইরের সকল শক্তির অধীনতা বা নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।

সার্বভৌমত্ব শব্দটি উচ্চতর ক্ষমতা, নিরংকুশ কর্তৃত্ব ও আধিপত্ব্যের অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর কোনো ব্যক্তির বা ব্যক্তি সমষ্টির কিংবা প্রতিষ্ঠানের সার্বভৌমত্বের অধিকারী অর্থ এ যে, তাঁর নির্দেশই আইন। আর এ আইন রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপর জারি করার সর্বময় কর্তৃত্ব তারই। নাগরিকরা তার শর্তহীন আনুগত্য করতে বাধ্য। তা ইচ্ছায় ও আগ্রহে হোক কিংবা বাধ্য হয়ে হোক।

ইসলামের দৃষ্টিতে সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য নির্দিষ্ট। তাঁর প্রভুত্ব, একচ্ছত্র মালিকানা এবং নিরংকুশ শাসন ক্ষমতা- এ উভয় দিক দিয়ে অখণ্ড, অবিভাজ্য এবং অংশহীন, বিশ্ব নিখিলের প্রত্যেকটি বস্তুই আল্লাহর একচ্ছত্র প্রভুত্বের অধীন ও তাঁর অনুগত হয়ে আছে। মহান আল্লাহ বলেন:

﴿ وَلَهُۥ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ كُلّٞ لَّهُۥ قَٰنِتُونَ ٢٦ ﴾ [الروم: ٢٦]

‘‘আসমান- যমীনে যা কিছু আছে সবকিছুর তাঁর। সবকিছুই তাঁর ফরমানের অনুগত।’’

এমনকি তাঁর রাজত্বেও কেউ অংশদারী নয়।[3]

মহান আল্লাহ আরও বলেন:

﴿ وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ شَرِيكٞ فِي ٱلۡمُلۡكِ﴾ [الفرقان: ٢]

“এবং রাজত্বে তাঁর কোনো শরীক নেই।’’ আর শাসন ক্ষমতা ও আইন রচনা এবং প্রভুত্ব নিরংকুশ অধিকার একমাত্র আল্লাহর। কোনো মানুষ, সংসদ, কোনো রাজশক্তি এ দিক দিয়ে তার অংশীদার হতে পারেনা, তিনি বলেন, ‘‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ফয়সালার ইখতিয়ার নেই।’’[4]

অবশ্য এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণে কোনোরূপ ঐক্যমতে পৌঁছতে পারেননি। পশ্চিমা দুনিয়ায় সার্বভৌমত্বের ওপর প্রথম গবেষক Jean Bodin (১৫২৯-১৫৯৬ খি.) এর জন্মের প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে মহানবী মুহাম্মদ (সা:) (৫৭০-৬৩২খি.) এর উপর পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়, যার মাধ্যমে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে একটি স্বচ্ছ স্বাধীন ধারণা হিসেবে তুলে ধরে মানবজাতির জন্য ঘোষণা করেন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। আল-কুরআন হল সে আসমানী বিধান; যাতে আল্লাহ তা‘আলা আইনের মৌলিক প্রকৃতি ও বিধিবিধান প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রমাণ ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলার বিধানের উপর ভিত্তি করে মুসলিম রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ইমাম রাগেব ইসফাহানী, আবুল হাসান মাওয়ার্দী, ইমাম-গাযালী, ইবনে তাইমিয়া প্রমুখ অধিকতর বিশ্লেষণর্ধমী ও সূক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গীতে সার্বভৌমত্বের ধারণাটি পর্যালোচনা করেছেন। যা পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের তুলনায় অনেক বেশী গভীর এবং বিজ্ঞানসম্মত।

মানুষ হল শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতিনিধি। তাই সে মহান আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী আইন-কানুন অনুয়ায়ী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করবে। সরকার স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো আইন রচনার অধিকারী নন। সার্বভৌমত্ব নিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণের ধারণা ও পাশ্চাত্য রাষ্ট্র চিন্তাবিদদের ধারণা সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই শুধুমাত্র সার্বভৌমত্ব শব্দটি দিয়ে পরিষ্কারভাবে ইসলাম এবং বিপরীত পদ্ধতিদ্বয়ের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা সম্ভব। বস্তুত পাশ্চাত্যের সার্বভৌমত্বের ধারণা ও ইসলমের দৃষ্টিতে সার্বভৌমত্বের ধারণার মাঝে মৌলিক পার্থক্য হলো সার্বভৌমত্বের উৎস সম্পর্কিত প্রশ্নের উপর। ইসলামকে বাদ দিয়ে আলোচনা করলে সার্বভৌমত্বের উৎস হল রাজতন্ত্রে রাজা, একনায়কতন্ত্রে একনায়ক, অভিজাততন্ত্রে মুষ্টিমেয় কতিপয় ব্যক্তি এবং গণতন্ত্রে জনগণ। ইসলামের দৃষ্টিতে সৃষ্টি করার ব্যাপারে যেমন আল্লাহ নিরংকুশ ক্ষমতার মালিক তেমনি মানুষের রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন দেওয়ার বেলায়ও আল্লাহ নিরংকুশ ক্ষমতার মালিক। পাশ্চাত্য রাষ্ট্রতত্ত্বসমূহের প্রভাবে মানুষ ক্রমেই অধিকতর সংখ্যায় এ মত প্রচার করতে শুরু করেছেন যে, চূড়ান্ত সার্বভৌম শক্তির অধিকারী হচ্ছে ‘‘জনসাধারণ’’। সমস্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থার গঠন এবং সামরিক আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কেবল এ ‘‘জনসাধারণের’’ ইচ্ছাই হবে চূড়ান্ত। এমনকি যারা আধুনিক ইসলামী রাষ্ট্রের ভাব-কল্পনাকে স্বীকার করে নেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এমন ব্যক্তিও রয়েছেন, যাঁরা রাসূল (সা:) এর একটি উক্তির ভিত্তিতে সমগ্র জাতির ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছাই (ইজমা) সার্বভৌম শক্তি এ দাবী করে থাকেন।

আল্লাহ সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, সার্বভৌমত্বের অধিকারী, এ কথা প্রত্যেক মুসলিমের বিশ্বাস করতে হবে। কেননা মানুষ কখনো মানুষের উপর রাজা-বাদশাহ হতে পারে না, এটাই আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। পাশ্চাত্য সার্বভৌমত্বে জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস বলে মনে করা হয়, যা ঈমান আকিদার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তা সুস্পষ্টভাবে সকল মানবজাতির কাছে তুলে ধরার জন্য তথা তাদের আকিদা-বিশ্বাসকে শির্ক মুক্ত করার জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা আলোচ্য নিবন্ধে স্থান পেয়েছে।[1] সূরা আলে ইমরান: ১৯।

[2] সূরা আল আন‘আম:১৬১-১৬২।

[3] সূরা আর রূম:২৬।

[4] সূরা আল ফুরকান:২।

০২ সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা:সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি ব্যতীত স্বাধীন কোনো রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। কোনো রাষ্ট্রে যদি সার্বভৌমত্ব না থাকে তবে সেটা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে এ উপাদানটির সমন্বয়ে রাষ্ট্র যাবতীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব পরিচালনা করে থাকে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও নাগরিকদের আনুগত্য প্রর্দশনে সার্বভৌমত্বের ধারণা অতীব জরুরী।যে সমস্ত প্রশ্ন রাজনীতির চিন্তা-ভাবনায় একটি স্থায়ী বির্তকের সূচনা করেছে, সে রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের নাম সার্বভৌমত্ব। সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা আজও সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রচিন্তাবিদরা বিভিন্নভাবে এর সংজ্ঞা নিরূপন করেছেন।

ব্যুৎপত্তিগত অর্থ :

‘‘সার্বভৌমত্বের ইংরেজী প্রতিশব্দ Sovereignty’ যা ল্যাটিন শব্দ ‘Superanus’ এবং Sovrano থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এ দু’টি ল্যাটিন শব্দের অর্থ হলো ‘Supreme’ অর্থাৎ প্রধান বা চূড়ান্ত। সুতরাং ব্যুৎপত্তিগত অর্থে সার্বভৌমত্ব বলতে এক বিশেষ ক্ষমতাকে বুঝায়। এ ক্ষমতা হল: চরম, চূড়ান্ত ও অবাধ, এ ক্ষমতার অধিকারী হলো রাষ্ট্র।[1]

শাব্দিক অর্থ বিশ্লেষণ করলে, আমরা বলতে পারি, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে সার্বভৌমত্ব বলে।

রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা বলতে বুঝায়, রাষ্ট্রের সে সব মৌলিক, সর্বোচ্চ ও অসীম ক্ষমতা, যা ব্যক্তি সংসদ বা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত যে কোনো বস্তুর উপর অবাধভাবে প্রয়োগ করা চলে।

একটু গভীরে শাব্দিক অর্থকে চিন্তা করলে পাই, কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির কিংবা প্রতিষ্ঠানের সার্বভৌমত্বের অধিকারী হওয়ার অর্থ এ যে, তাঁর নির্দেশই আইন। আর এ আইন রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপর জারি করার সর্বময় কর্তৃত্ব তারই। নাগরিকরা তার শর্তহীন আনুগত্য করতে বাধ্য তা ইচ্ছায় ও আগ্রহে হোক কিংবা বাধ্য হয়ে হোক। তাঁর নিজের ইচ্ছা ব্যতীত বাইরের কোনো শক্তি তার শাসন ক্ষমতাকে বিন্দুমাত্র সীমাবদ্ধ ও সংকোচিত করতে পারে না।

সার্বভৌমত্বের অধিকারীর ইচ্ছারই আইন অস্তিত্ব লাভ করে এবং তা নাগরিকদেরকে আনুগত্যের রজ্জুতে বেঁধে দেয়।

A Dictionary of social science অভিধান অনুসারে সার্বভৌমত্বের অর্থ হল;

ক. কোনো আইন-ব্যবস্থায় বিধি-বিধান দ্বারা প্রদত্ত আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করার কর্তৃত্ব;

খ. রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও নৈতিক কর্তৃত্ব;

গ. রাজনৈতিক ও আইনগত ক্ষমতা চর্চার কার্যকর উৎস বা এইরূপ ক্ষমতা চর্চার উপর কার্যকর প্রভাব;

ঘ. কোনো জনসমাজের স্বাধীন আইনগত বা নৈতিক মর্যাদা।[2]

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ সার্বভৌমত্বকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞাগুলো উল্লেখ করা হলো।

ষোড়শ শতাব্দির ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ বোঁদা (Bodin) প্রথম সার্বভৌমত্বের ধারণাটি সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন। তিনি বলেছেন, Sovereignty is supreme power over citizens and subjects, Unrestrained by law. অর্থাৎ ‘‘সার্বভৌমত্ব হলো নাগরিক এবং জনগণের উপর প্রযুক্ত আইনের দ্বারা অনিয়ন্ত্রিত চূড়ান্ত ক্ষমতা’’[3]

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানিদের মধ্যে খ্যাতনামা মার্কিন অধ্যাপক বার্জেস (Prof.burgess) এর মতে সার্বভৌমত্ব হলো: ‘The original, absolute, unlimited power over the individual subject and over all associations of subject’’. অর্থাৎ “ব্যক্তি-প্রজা ও প্রজাদের অন্যান্য সংঘের উপর মৌলিক চূড়ান্ত ও অপরিসীম ক্ষমতাই সার্বভৌমত্ব।[4]

জন অষ্টিন (John Austin) বলেন, ‘‘যদি কোনো সুনির্দিষ্ট উর্ধ্বতন ব্যক্তি অনুরূপ কোনো উর্ধ্বতন ব্যক্তির প্রতি স্বাভাবিকভাবে অনুগত না থাকে অথচ কোনো নির্দিষ্ট সমাজের অধিকাংশ ব্যক্তির নিকট হতে স্বাভাবিক আনুগত্য লাভ করেন, তা হলে সেই সুনিদিষ্ট ব্যক্তি ঐ সমাজের সার্বভৌম এবং সমাজ (উর্ধ্বতন ব্যক্তিসহ) রাষ্ট্রীয় ও স্বতন্ত্র সমাজ বিশেষ।[5]

প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পোলক (Pollock) বলেছেন, ‘‘সার্বভৌমত্ব সেই ক্ষমতা যা সাময়িক নয়, যা অন্য কারো নিকট থেকে প্রাপ্ত ক্ষমতা নয়, যা এমন কোনো নিয়মের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয় যা রাষ্ট্র বদলাতে পারে না।’’[6]

উইলোবী (Willoughby) বলেছেন, sovereignty is the supreme will of the state ‘‘সার্বভৌমত্ব হল রাষ্ট্রের চরম ইচ্ছা।’’[7]

রূশোর (১৭৪২-১৮৩২) মতে, সার্বভৌম শক্তি সর্বোচ্চ এবং অবারিত ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা শাসকের হাতে সীমিত থাকতে পারে না। রূশো সার্বভৌমত্বকে অবিভাজ্য একক এবং অসীম বলেছেন।[8] তাছাড়া ‘রূশো সার্বভৌমত্বকে অদুষনীয়, অবিচ্ছেদ্য, প্রতিনিধিত্বের অযোগ্য, অবিভাজ্য ও অবিনশ্বর বলে বর্ণনা করেছেন’’।[9]

তিনি সার্বভৌমত্বকে রাষ্ট্রের সেই গুণ হিসাবে গণ্য করেন, যার ফলে রাষ্ট্র তার নিজস্ব ইচ্ছা্ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর দ্বারা আইনগতভাবে বাধিত থাকতে পারে না, বা নিজের ব্যতীত অন্য কোনো শক্তির দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না’’

গ্রোটিয়াস (Hugo Grotius) বলেছেন , ‘‘সার্বভৌমত্ব হল চূড়ান্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা যা সেই ব্যক্তির উপর ন্যস্ত আছে, যার কার্যকলাপ অপর কারও আজ্ঞাধীন নয়, যার ইচ্ছা কেউ অতিক্রম করিতে পারে না’’।[10]

হব্স (Hobbes) এর মতে ‘‘সার্বভৌম কথা হল ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টির সেই ক্ষমতা যা যুদ্ধের অবস্থা থেকে শান্তির ও শৃঙ্খলার অবস্থায় পৌঁছার জন্য মানুষ পারস্পরিক চুক্তি করে পদাধিকারির হাতে তুলে দিয়েছে’’।[11]

উপরোক্ত আলোচনায়, আমাদের কাছে ফুটে উঠে, যার বলে রাষ্ট্র অপ্রতিরোধ্য অন্তহীন ক্ষমতাসম্পন্ন এবং অসীম প্রতিপত্তির অধিকারী হতে পারে তাই সার্বভৌমত্ব। রাষ্ট্র বল প্রয়োগ এবং শাস্তি প্রদানের ভীতির সাহায্যে সকলকে তার নির্দেশ ও আইন পালনে বাধ্য করতে পারে।

[1] গোলাম মোস্তফা চৌধুরী, রাষ্ট্র বিজ্ঞান পরিচিতি (ঢাকা: গ্রন্থ কুটির, এপ্রিল ২০০৯ইং), পৃ.৭৩।

[2] বিপুল রঞ্জন নাথ, রাজনৈতিক তত্ত্ব ও সংগঠন (ঢাকা বাংলাবাজার , বুক সোসাইটি, , জুলাই, ১৯৯৭ ইং), পৃ.১০৪।

[3] প্রফেসর ইয়াসমিন আহমেদ, রাষ্ট্রীয় তত্ত্ব ও সংগঠন (ঢাকা: আজিজিয়া বুক ডিপো, ৭ম প্রকাশ: এপ্রিল, ২০০৬ ইং), পৃ: ২১।

[4] বিপুল রঞ্জন নাথ, রাজনৈতিক তত্ত্ব ও সংগঠন (ঢাকা: বক সোসাইটি, ৪র্থ সংস্করণ, জুলাই ১৯৯৭ইং), পৃ: ১০৩।

[5] সৈয়দ মকসুদ আলী, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ১ম সংস্করণ, এপ্রিল ১৯৬৬ইং, পঙৃ. ৬৬।

[6] প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ, রাষ্ট্র বিজ্ঞানের কথা, ঢাকা: প্রকাশনায় বাংলাদেশ বুক করপোরেশন লি: জানুয়ারী ২০০৬, পৃ.২০৬।

[7] মো: মোরশেদুজ্জামান, রাজনৈতিক তত্ত্ব ও সংগঠন, ঢাকা: কোয়ালিটি পাবলিকেশন, ডিসেম্বর ২০০৫, পৃ.২২৪।

[8] মো: নূরুল ইসলাম, ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থা, আহসান পাবলিকেশন, , এপ্রিল ২০০৯ইং, পৃ.২৪৩।

[9] মুহাম্মদ, আয়েশ উদ্দীন, রাষ্ট্র চিন্তা পরিচিতি মৌসুমী পাবলিকেশন্স, সিপাইপাড়া, রাজশাহী, জুন, ২০০৫, পৃ, ৪৪২।

[10] মুহাম্মদ, আয়েশ উদ্দীন, রাষ্ট্র চিন্তা পরিচিতি মৌসুমী পাবলিকেশন্স, সিপাইপাড়া, রাজশাহী, জুন, ২০০৫, পৃ, ৪৪২।

[11] বিপুল রঞ্জন নাথ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৪।

০৩ ইসলামে সার্বভৌমত্বের ধারণারাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান হল সার্বভৌমত্ব। সার্বভৌম ক্ষমতা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি। অনৈসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তি, গোত্র, শ্রেণী অথবা বিশেষ জনসংখ্যা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সাধারণ রাষ্ট্রে সার্বভৌম ক্ষমতার দু’টো দিক আছে। একটি হচ্ছে আভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব, অপরটি হচ্ছে বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব। আভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের কারণে রাষ্ট্র তার অধীনস্থ জনসংখ্যা ও সংগঠণগুলোর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।বাহ্যিক সার্বভৌমত্বের কারণে একটি রাষ্ট্র অন্য সকল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, কর্তৃত্ব ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকে। অতএব, সার্বভৌমত্ব হচ্ছে অবিভাজ্য, হস্তান্তর অযোগ্য ও চরম ক্ষমতা।

সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি। রাষ্ট্র যে ক’টি উপাদান নিয়ে গঠিত সার্বভৌমত্ব তাদের অন্যমত। রাষ্ট্রের অসীম এবং সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে (Supreme power) সার্বভৌমত্ব বলা হয়। সার্বভৌমত্ব ছাড়া রাষ্ট্র গঠন হতে পারে না। এছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। সার্বভৌমত্ব ক্ষমতাই রাষ্ট্রকে অপরাপর সামাজিক সংগঠন হতে পৃথক করেছে। সার্বভৌমত্বের বলে রাষ্ট্র আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োজনবোধে ক্ষমতা প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগ (Coercive power) দ্বারা আইন প্রবর্তনের চরম অধিকারপ্রাপ্ত হয় এবং বহির্দেশীয় ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে অন্যান্য স্বাধীন রাষ্ট্রের সাথে সর্ম্পক স্থাপন বা ছিন্ন প্রবর্তনের চরম অধিকারপ্রাপ্ত হয় এবং বহির্দেশীয় ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে অন্যান্য স্বাধীন রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন বা ছিন্ন করতে পারে।

অধ্যাপক গেটেল মনে করেন যে, “সার্বভৌমত্ব ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভিত্তিস্বরূপ। এটি সকল আইনকে অনুমোদন দান করে এবং সকল আন্তর্জাতিকসম্পর্ক সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে।’’ (The concept of Sovereignty is the basis of modern political science. It underlines the validity of all laws determines all international relations)

সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সরকারের মাধ্যমে এর প্রকাশ ও প্রয়োগ ঘটে মাত্র। সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ইচ্ছার যে প্রকাশ ও প্রয়োগ ঘটে থাকে তা-ই আইনের মর্যাদা ও স্বীকৃতি লাভ করে। অতএব, রাষ্ট্রশক্তির স্বাধীন সত্তা, আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের পূর্ণ ক্ষমতাকেই সার্বভৌমত্ব বলা হয়।

ইসলামী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের উক্ত ব্যাখ্যা অচল। ইসলামী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতার একচ্ছত্র ও নিরঙ্কুশ মালিক হলেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা‘আলা। রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষ আল্লাহর খলীফা বা প্রতিনিধি মাত্র। মহান আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে সরকার ইসলামী আইনকানুন অনুযায়ী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করবেন। সরকার স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো আইন রচনার অধিকারী নন।

এ মর্মে আল্লাহর ঘোষণা করেছেন

﴿أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ ﴾ [الاعراف: ٥٤]

“সতর্ক হও, তাঁর সৃষ্টিতে তাঁরই হুকুম চলবে।[1]

ইসলামী রাজনীতিতে সার্বভৌম প্রভুত্ব (Sovereignty) একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য নির্দিষ্ট। তার প্রভুত্ব, একচ্ছত্র মালিকানা এবং নিরঙ্কুশ শাসন ক্ষমতা এ উভয় দিক দিয়েই অখণ্ড, অবিভাজ্য এবং অংশহীন। বিশ্ব নিখিলের প্রত্যেকটি বস্তুই আল্লাহর একচ্ছত্র প্রভুত্বের অধীন ও তাঁর অনুগত হয়ে আছে। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ وَلَهُۥٓ أَسۡلَمَ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ طَوۡعٗا وَكَرۡهٗا ٨٣ ﴾ [ال عمران: ٨٣]

“আল্লাহর এ সৃষ্টি রাজ্যের একমাত্র মালিক তিনিই, এ ব্যাপারে কেউই তাঁর শরীক নয়”[2]

﴿ وَهُوَ ٱلۡقَاهِرُ فَوۡقَ عِبَادِهِۦۚ ١٨ ﴾ [الانعام: ١٨]

“তিনি তাঁর বান্দাদের উপর একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী”[3]

﴿ ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖ وَهُوَ ٱلۡوَٰحِدُ ٱلۡقَهَّٰرُ ١٦ ﴾ [الرعد: ١٦]

“যাবতীয় সৃষ্টির স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, তিনি এক ও মহাপরাক্রমশালী”[4]

﴿ وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ شَرِيكٞ فِي ٱلۡمُلۡكِ ٢ ﴾ [الفرقان: ٢]

“আর তাঁর রাজত্বে কোনো শরীক নেই”[5]

অতএব, শাসন ক্ষমতা ও আইন রচনা এবং প্রভুত্বে নিরঙ্কুশ অধিকার একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। কোনো ব্যক্তি মানুষ, পার্লামেন্ট বা কোনো রাজশক্তিও এদিক দিয়ে তাঁর অংশীদার হতে পারে না।

কারণ কুরআনের ঘোষণা :

﴿ ٓۚ إِنِ ٱلۡحُكۡمُ إِلَّا لِلَّهِۖ يَقُصُّ ٱلۡحَقَّۖ ٥٧ ﴾ [الانعام: ٥٧]

“প্রভুত্ব ও আইন রচনায় মৌলিক এবং চূড়ান্ত অধিকার একমাত্র আল্লাহর” [6]

আল্লাহর এ প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী নিরঙ্কুশ, অন্য কেউই তাঁর অংশীদার হতে পারে না। কাউকে তিনি এ কাজে তার শরীক করেন না।

প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ব্লেঞ্চলী বলেন, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের মধ্যে নিহিত। অথচ কুরআন বহু শতক পূর্বেই তা ঘোষণা করেছে।

﴿ فَعَّالٞ لِّمَا يُرِيدُ ١٦ ﴾ [البروج: ١٦]

“তিনি যা ইচ্ছে তাই করার অধিকারী।’’ [7]

তার এ স্বাধীনতাকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাঁর উপরও কোনরূপ বাধ্যবাধকতা কেউই আরোপ করতে পারে না। কুরআনের ঘোষণা,

﴿ لَا يُسۡ‍َٔلُ عَمَّا يَفۡعَلُ وَهُمۡ يُسۡ‍َٔلُونَ ٢٣ ﴾ [الانبياء: ٢٣]

“ সার্বভৌম সত্তা যা করেন, সে বিষয়ে তাঁকে কেউ জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে না। তিনি কারো নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য নন”[8]

বরং সকলেই একমাত্র তাঁর সমীপেই জবাবদিহি করতে বাধ্য : সার্বভৌম সর্বোতভাবে আল্লাহর জন্য। তিনি বলেন,

﴿ هُوَ ٱلۡمَلِكُ ٱلۡقُدُّوسُ ٱلسَّلَٰمُ ٢٣ ﴾ [الحشر: ٢٣]

“তিনি মালিক-বাদশা, অতীব মহান পবিত্র। পুরোপুরি শান্তি নিরাপত্তা দাতা”[9]

তিনি মহৎ মহান। মহানত্ব তাঁর একটি বিশেষ গুণ। এ গুণ বিশেষভাবে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। বস্তুত আল্লাহর সার্বভৌমত্ব সর্বাত্মক ও অবিভাজ্য। এটাই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা, একে বিভিন্নভাবে ভাগ করে এক এক ভাগের জন্য এক একজনকে সার্বভৌমত্বের মালিক মনে করা সুস্পষ্ট শির্ক।

[1] সূরা আল আ‘রাফ:৫৪।

[2] সূরা আলে ইমরান:৮৩।

[3] সূরা আল আন‘আম:১৮।

[4] সূরা আর রা‘দ:১৬।

[5] সূরা আল ফুরকান:২।

[6] সূরা আল আন‘আম:৫৭।

[7] সুরা আল বুরূজ:১৬।

[8] সূরা আল আম্বিয়া:২৩।

[9] সূরা আল হাশর:২৩।

০৪ কুরআন মজীদে ব্যবহৃত সার্বভৌমত্ব বিষয়ক পরিভাষা : সার্বভৌমত্ব শব্দটির অন্তর্নিহিত ভাবধারা প্রকাশের জন্য কুরআন মাজীদে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন :ক. (মালাকূত) কুরআনে এসেছে,[10]

﴿ أَوَلَمۡ يَنظُرُواْ فِي مَلَكُوتِ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ ١٨٥ ﴾ [الاعراف: ١٨٥]

এখানে ‘মালাকুত’ বলতে তার কর্তৃত্ব ও মহত্বকে বুঝানো হয়েছে। আর এটি সম্পূর্ণ তার জন্য নির্দিষ্ট।

অনুরূপভাবে কুরআনে এসেছে,

﴿مَنۢ بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيۡءٖ ٨٨ ﴾ [المؤمنون: ٨٨]

‘‘সমগ্র জিনিসের সার্বভৌমত্ব কার হাতে?’’[11]

﴿ فَسُبۡحَٰنَ ٱلَّذِي بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيۡءٖ وَإِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ ٨٣ ﴾ [يس: ٨٣]

“মহান পবিত্র সেই সত্তা, যাঁর হাতে সর্বকিছুরই সার্বভৌমত্ব নিহিত”[12]

আল্লাহ আরো বলেন:

﴿ وَكَذَٰلِكَ نُرِيٓ إِبۡرَٰهِيمَ مَلَكُوتَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَلِيَكُونَ مِنَ ٱلۡمُوقِنِينَ ٧٥ ﴾ [الانعام: ٧٥]

‘‘আর এ ভাবে আমরা ইব্রাহীমকে আকাশ রাজ্য ও ভুমণ্ডলের উপর প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌমত্বের বিস্ময়কর দৃশ্যসহ দেখিয়েছি।’’[13]

এ থেকেই ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে সুম্পষ্ট ধারণা মিলে।

Arabic Bengali Functional Dictionary তে[14] ملكوت এর প্রসঙ্গে যেসব অর্থ পাওয়া যায় তা হলো–কর্তৃত্ব سلطة,রাজত্ব حكم,অধিকারী صاحب,ক্ষমতা قوة وقدرة, রাজ্য ولاية-

ইসলাম রাষ্ট্রব্যবস্থায় সার্বভৌমত্বের নিরংকুশ মালিক হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, এর কারণে কুরআন মাজীদে ‘মালাকূত’ শব্দটি কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই বিশেষভাবে নিদিষ্ট হয়েছে।

খ. السلطان (সুলতান) এর অর্থ হলো: কর্তৃত্ব, ক্ষমতা, শক্তি, [15] طاقةসম্রাট। এ থেকেই ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা মেলে। ইসলামী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ‘মালাকুত’ এর পরিবর্তে ‘সুলতান’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। কুরআনের পরিভাষায় এর অর্থ হচ্ছে আধিপত্য। আর সঠিক তাৎপর্য সার্বভৌমত্ব। ইমাম রাগিব ইসফাহানী এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, التمكن من القهر ‘‘প্রবল পরাক্রমসহকারে আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করা।’’

অন্যত্র লিখেছেন, هو التصريف بالامر والنهى فى الجمهور-‘‘জনগণের মধ্যে আদেশ ও নিষেধের বিধান প্রয়োগ করা প্রশাসনিক ক্ষমতা পরিচালনা করা।’’[16] ১৬

আল্লামা আলুসীর মতে, সর্বাধিক ক্ষমতাশালী সত্তাই সার্বভৌম। আর ‘মালাকূত’ অর্থ- سلطان قاهر সুলতানুন কাহির অর্থাৎ: স্বীয় পরাক্রমে প্রতিষ্ঠিত শক্তি।

তবে এ প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব নবীগণের মাধ্যমে প্রয়োগ হত। বর্তমানে কোনো নবী আসবে না। এর জন্য এ সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী হচ্ছেন নবীর ওয়ারিস খলীফাগণ অর্থাৎ খিলাফতের অধিকারী শাসকবর্গ। ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগ থাকবে। কিন্তু এ বিভাগগুলো আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বহনকারী আল কুরআন ও সুন্নাহ তথা শরীয়াতের বাইরে কোনো কাজ করতে পারবে না।

তাই খলীফা ও শাসকবর্গ যদি ইসলামী শরীয়াতের বিপরীত কোনো আইন প্রণয়ন করে, তার বিপরীত কোনো আইন বা অর্ডিনেন্স জারি করে অথবা জাতির প্রতিনিধিরা তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে এ উভয় অবস্থায় সে কাজটি শরীয়তের সনদবিহীন বলে গণ্য হবে এবং সার্বভৌমত্বের অধিকারে নির্দিষ্ট সীমালঙ্ঘন করার কারণে তা বাতিল হয়ে যাবে। কেননা জাতির প্রতিনিধিদের বা শাসকের সার্বভৌমত্ব হলো, বাস্তবায়নের সার্বভৌমত্ব (Execution Sovereignty)। তাদের আইন রচনা করে তা জারি করার মূলগতভাবেই কোনো অধিকার নেই। এটিই হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব।

[10] সূরা আল আ‘রাফ:১৫৮।

[11] সূরা আল মুমিনূন:৮৮।

[12] সূরা ইয়াসিন:৮৩।

[13] সূরা আল আন‘আম:৭৫।

[14] ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, Arabic Bengali Functional Dictionary (ঢাকা: রিয়াদ প্রকাশনী, ১ম প্রকাশ, ১৯৯৮ জুন), পৃ. ৫৭২।

[15] ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, Arabic Bengali Functional Dictionary (ঢাকা: রিয়াদ প্রকাশনী, ১ম প্রকাশ, ১৯৯৮ জুন), পৃ. ৩৫৫।

[16] ইমাম রাগিব ইস্পাহানী, আল মুফরাদাত

০৫ সার্বভৌমত্বের ইসলামী সংজ্ঞা (Islamic Defination of Sovereignty)ইসলাম কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিগোষ্ঠীর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে না। গতানুগতিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তি, গোত্র, শ্রেণী অথবা বিশেষ জনসংখ্যা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। রাষ্ট্রের সকল নাগরিককেই বিনা দ্বিধায় সার্বভৌম শক্তির আদেশ পালন করতে হয়, তার সিদ্ধান্তকে চরম সিদ্ধান্ত বলে মেনে নিতে হয়। এহেন অসীম ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির হাতে এলে তা দ্বারা বৃহত্তর মানব সমাজের যথার্থ কল্যাণ হতে পারে না। কেননা মানুষ একদিকে যেমন পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী নয় অন্যদিকে তেমনি সে স্বার্থপরতা, অর্থলোভ, ক্ষমতা ও প্রাধান্য লিপ্সা ইত্যাদি মানবীয় দুর্বলতার অধীন। এমতাবস্থায় সার্বভৌম ক্ষমতা তার উপর ন্যস্ত হলে সে তার সীমাবদ্ধতার দরুন বা অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তারের মানসে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি প্রবর্তন করবে। যদিও কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিগোষ্ঠীকে সার্বভৌম শক্তি বলে মেনে নেয়া হয়, তথাপিও তার বা তাদের মধ্যে সার্বভৌম শক্তির গুণাবলী থাকতে পারে না, কারণ জন্মগতভাবে সে/তারা এসব গুণ থেকে বঞ্চিত। অমরত্ব, চিরঞ্জীবতা, চিরস্থায়িত্ব, ব্যাপকতা, অবিভাজ্যতা, নিখুঁত জ্ঞানের অধিকার, ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে অবস্থান ইত্যাদি গুণ মানুষের নেই, থাকতে পারে না। আর নেই বলেই তার উপর সার্বভৌম ক্ষমতা অর্পিত হলে তা মানব সমাজে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার বিপরীতে ক্ষুদ্র স্বার্থে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় প্রধান মূলনীতি হচ্ছে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। মানুষের উপর হুকুমত, প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ব করার অধিকার বিশ্ব সৃষ্টিকর্তা, বিধানদাতা আল্লাহ ব্যতীত আর কারো নেই। মানুষের উপর থেকে মানুষের প্রভুত্ব উৎখাতের মধ্যেই রয়েছে গণমানুষের চরম আযাদী। মানুষ একমাত্র আল্লাহর অধীন। কোনো ব্যক্তি মানুষের উপর প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ত্ব করার অধিকারী নয়। ইসলামী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহরই। আইন রচনা করার অধিকারও তাঁরই। কুরআনে এসেছে বস্তুত সার্বভৌম ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্যই নয়। তাঁর নির্দেশ এ যে, তাঁকে ছাড়া আর কারো দাসত্ব ও বন্দেগী করা যাবে না। আল্লাহ তাঁর সার্বভৌমত্বে কাউকে অংশীদাররূপে গ্রহণ করেন না। ‘‘আসমান ও যমীনের সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতা আল্লাহর, আর তিনি ব্যতীত পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী আর কেউ নেই।’’

কাজেই দেখা যায় যে, ইসলামী বিধানুযায়ী আল্লাহ সার্বভৌম শক্তির মালিক। আর আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বলতে বুঝায় আল্লাহর চূড়ান্ত, চরম ও অপ্রতিহত ক্ষমতা। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে আল্লাহ তো মানুষের ধরাছোঁয়ার উর্ধ্বে; কাজেই পার্থিব রাষ্টীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও যাবতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য কার শরণাপন্ন হওয়া যাবে? এর জবাব অত্যন্ত স্পষ্ট। আল্লাহ মানুষের কল্যাণের জন্য সকল আইন বিধান আল কুরআনের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রেরণ করেছেন, সেই জীবন বিধানকে বিজয়ী ব্যবস্থা হিসেবে মানুষের জীবন ও যমীনে প্রতিষ্ঠার জন্য। তাই আল কুরআনের অনুশাসন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য লোকায়ত শাসনের প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার অর্থ হবে, যাদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের দায়িত্ব থাকবে তারা হবেন আল্লাহর বিধানের অধীন এবং সেই সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠার জন্যই আল্লাহর রাসূলগণ এসেছেন।

আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কেবল আল্লাহর। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সে আইনের বাস্তবায়নকারী। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: হে নবী, আমার বান্দাহদের উপর আপনার কোনো আধিপত্য নেই। অর্থাৎ আপনার রবের আধিপত্যই যথেষ্ট।

মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের প্রশাসনে মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রয়োগকারী ছিলেন মাত্র। আল্লাহ কর্তৃক সার্বভৌমত্বে আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে তিনি ছিলেন মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। বস্তুত মদীনা রাষ্ট্রে আল্লাহ ছিলেন আইনগত সার্বভৌমত্বের (Legal Sovereignty) অধিকারী। আর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন কার্যত সার্বভৌমত্বের (Real Sovereignty) বা রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের (Political Sovereignty) অধিকারী। গতানুগতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আইনগত সার্বভৌমত্ব এবং কার্যত সার্বভৌমত্বের মধ্যে পার্থক্য মাঝে মাঝে দেখানো হয়। তবে এটা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন যে, ইসলামের দৃষ্টিতে সার্বভৌমত্বের এ দু দিক বা রূপ দুটি ভিন্ন বস্তু নয়। এটি যেন মুদ্রার দুটি দিক, যেন এপিট ওপিট এবং এ দুয়ের সমন্বয়েই ইসলামী সার্বভৌমত্বের আসল রূপ ফুটে উঠে।

ইসলামের আইনগত সার্বভৌম (Legal Sovereignty) হচ্ছেন আল্লাহ এবং আল্লাহ প্রদত্ত বিধিবিধান যা রাষ্ট্রের চূড়ান্ত নির্দেশ বা আইনের আকারে প্রকাশিত হয়। উক্ত আইন দেশের বিচারালয়ে স্বীকৃত হয়ে কার্যকর হয়। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধানসহ প্রশাসনে সবাই আল্লাহর আইনের অধীন। রাষ্ট্রপ্রধান আল্লাহর আইনের বরখেলাফ কিছু করলে বিচারালয় তাকে যে কোনো শাস্তি দিতে পারে। বিচারক আল্লাহর আইনের প্রতিনিধি (খলীফা) হিসেবেই বিচার করবেন। বস্তুত: এটাই আইনের শাসন, যা একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। কার্যত সার্বভৌম (political Sovereignty) মূলত আল্লাহর বিধানকে বাস্তবায়নের কার্যই সম্পাদন করবে। আইনগত সার্বভৌমের প্রদত্ত আইনকে পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করে রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনকল্যাণকর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অবর্তমানে সৎ ও ঈমানদার লোকদের প্রতিনিধিত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা একান্ত প্রয়োজন। ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নিলে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হবে তাঁরই বিধানসমূহ বাস্তবে কার্যকর করা। অন্য কথায়, এক্ষেত্রে রাষ্ট্র হবে আল্লাহর বিধানকে কার্যকর করণের যন্ত্র মাত্র। এ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা হবে আল্লাহর। আল্লাহর এ সর্বোচ্চ ক্ষমতা ইসলামী শরীয়াহর প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়েই বিমূর্ত হয়ে উঠে।

০৬ ইসলামী সার্বভৌমত্ব (Islamic Sovereignty) :ইসলামের তত্ত্বানুসারে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এবং ফলত সকল আইনই আল্লাহর নির্দেশিত কাঠামোর সাহায্যে রচিত হওয়া বাধ্যতামূলক। ইসলামী রাষ্ট্রে গণনির্বাচিত প্রতিনিধি তথা রাষ্ট্রপ্রধানের (খলীফার) হাতে শাসনভার থাকে এবং রাষ্ট্রপ্রধান আল্লাহর সার্বভৌমত্বের নীতি অনুযায়ী কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত পন্থায় শাসনকার্য পরিচালনা করেন। অন্য কথায়, রাষ্ট্রপ্রধান আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে ইসলামী মূলনীতির আলোকে জনগণের ইচ্ছানুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রয়োগ করে থাকেন। বস্তুত সার্বভৌমত্বকে আল্লাহর কর্তৃত্বে ন্যস্ত ঘোষণা করে ইসলাম মানবিক উচ্ছৃঙ্খলতার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার প্রয়াস পেয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র তাই প্রচলিত গতানুগতিক অর্থে সার্বভৌম নয়, ইসলামী রাষ্ট্র খিলাফত তথা প্রতিনিধিত্ব বলে অভিহিত। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মূলমন্ত্র হিসেবেই প্রতিনিধিত্বের নীতি কাজ করে। ইসলামী রাষ্ট্রে শাসন পরিচালক শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবেই রাষ্ট্র শাসনের অধিকার লাভ করে এবং তা গণমানুষের কল্যাণে প্রয়োগ করে। রাষ্ট্রের সকল নাগরিকও মহান উদ্দেশ্য সাধনে প্রশাসনকে সহযোগিতা প্রদান করে।
০৭

ইসলামী সার্বভৌমত্বের বৈশিষ্ট্য:

মহাগ্রন্থ, আল-কুরআনের ‘বর্ণনানুযায়ী’ ইসলামী সার্বভৌমত্বের কতিপয় বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠে। নিম্নে এ সকল বৈশিষ্ট্য পেশ করা হল:

১। স্থায়িত্ব : (Permanence) :

ইসলামী সার্বভৌমত্বের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর স্থায়িত্ব। স্থায়িত্ব বলতে তাই বুঝায় যার কোনো ক্ষয়, লয় নেই, কোনো কমতি নেই। সকল অবস্থা ও পরিস্থিতিতে এর অবস্থান ও গুণসমূহ অটুট থাকে। আয়াতুল কুর্সীতে এ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে ‘আল হাইয়্যু’ চিরঞ্জীব শাশ্বত সত্তা শব্দ ব্যবহত হয়েছে, আল্লাহ চিরঞ্জীব যার জীবনের শুরুও নেই শেষও নেই। তিনি চিরন্তন অনাদি এবং চিরস্থায়ী। মহান আল্লাহ তা‘আলার সার্বভৌমত্ব এককভাবে অন্য কারো এক বিন্দু অংশীদারিত্ব ব্যতীতই। সেই অবিনশ্বর সত্তার জন্য চির নির্দিষ্ট। যিনি অন্য কারো দেওয়া জীবন দ্বারা নয়, নিজস্ব জীবন দ্বারাই চিরঞ্জীব এবং যার অনুগ্রহ শক্তির উপর ভর করে বিশ্ব নিখিলের এ গোটা ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা কোনো শাসক এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে পারে না। কারণ এ ব্যাপারে সে সম্পূর্ণ অযোগ্য, অক্ষম, কাজেই সে সার্বভৌমত্বের দাবীদার হতে পারে না।

২। চির প্রতিষ্ঠিত (Al quayaum Endlessly Established) এ প্রসঙ্গে আয়াতুল কুরসীতে ‘আল কাইয়্যুম’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কাইয়্যুম শব্দ কেয়াম শব্দ হতে উৎপন্ন। এর অর্থ হচ্ছে এ যে, নিজে বিদ্যমান থেকে অন্যকেও বিদ্যমান রাখেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন। তার সত্তা স্থায়ীত্বের জন্য অন্য কারো মুখাপেক্ষী নয়। অর্থাৎ আল্লাহ শুধু চিরঞ্জীব শ্বাশত সত্তাই নন তিনি ক্ষমতায় চির প্রতিষ্ঠিত। মূহুর্তের জন্যও তিনি সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রয়োগ কার্য থেকে অবসর গ্রহণ করেন না। এ বৈশিষ্ট্যের দিক থেকেও মানুষ একবারেই অযোগ্য।

৩। সর্বব্যাপকতা/সার্বজনীনতা (Universality):

ইসলামী সার্বভৌমত্বের অপর বৈশিষ্ট্য হলো এর সর্বব্যাপকতা বা সার্বজনীনতা। সার্বজনীনতা হলো ইসলামী সার্বভৌমত্বের অসীমতার পরিচায়ক। সৃষ্টিজগতের এমন একটি প্রাণীও নেই, থাকতে পারে না যারা তার সার্বভৌম শক্তির অধীন নয়। আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছু সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক ও মা`বুদ আল্লাহ। তাঁর ক্ষমতা সর্বত্র। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি প্রাণী আল্লাহর এ সার্বভৌম শক্তির অধীনতা স্বীকার করতে বাধ্য। এর গতি সৃষ্টি জগতের সর্বস্তরে অবাধ ও অপ্রতিহত। একথা বুঝানোর জন্যই আয়াতুল কুরসীতে বলা হয়েছে।

﴿ لَّهُۥ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۗ ٢٥٥ ﴾ [البقرة: ٢٥٥]

‘‘আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সবকিছুই তার।[1]

তাঁর ক্ষমতা কোনো পরিসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।’’ সবচেয়ে বড় ক্ষমতার যিনি মালিক তার ক্ষমতা কোনো বিশেষ এলাকার মধ্যে হলে চলবে কি? তার ক্ষমতা হতে হবে সর্বত্র, যার মালিক হওয়া মানুষের জন্য কোনদিনই সম্ভবপর নয়। যেমন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি অন্যদেশের একটি চৌকিদারের চাকুরী ও বাতিল করতে পারবে না। তাই বলা যায়, দুনিয়ার প্রতিটি রাজা-বাদশাহরই ক্ষমতা এমন একটা নির্দিষ্ট পরিসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

৪। মৌলকথা, চরমতা ও সীমাহীনতা : (original, Absolute and Unlimited)

আয়াতুল কুরসীর বর্ণনা হতে এটি প্রতীয়মান হয় যে, সার্বভৌম ক্ষমতা মৌলিক চরম ও সীমাহীন। বিধান দেয়ার ক্ষমতা সার্বভৌম শক্তির চরম ক্ষমতা। এ ক্ষমতা কোনো কিছুর দ্বারা সীমিত নয়। সৃষ্টি জগতে এর সমকক্ষ বা এর উর্ধ্বে কোনো ক্ষমতা থাকতে পারে না। সার্বভৌম সত্তা আল্লাহ চূড়ান্ত ক্ষমতার আঁধার। তিনি সমস্ত শক্তি ও ক্ষমতার উৎস। তাঁর ক্ষমতা শুধু কোনো পূর্ণ সত্তার উপরই নয়। বরং এ সত্তার সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম একক তাঁর ইচ্ছা ও আদেশ প্রতিফলিত হয়। আরো সহজভাবে বলতে গেলে, মানুষ অন্য যে কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ তাঁর নির্দেশেই পরিচালিত হয়, বিষয়টি এটিই নয় বরং ঐ প্রাণীর প্রত্যেকটি কোষ বা তাঁর ক্ষুদ্রতম একক মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও আদেশে পরিচালিত হয়। ঠিক তেমনিভাবে এ মহাবিশ্বের প্রত্যেকটি অনু-পরমানু তাঁর নিয়ন্ত্রনাধীন।

৫। অবিভাজ্যতা ও একত্ব (Indivisibility and unity):

ইসলামী সার্বভৌমত্ব একক ও অবিভাজ্য এ সার্বভৌমত্বকে বিভক্ত করা যায় না। আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর চূড়ান্ত ক্ষমতা একটিমাত্র কেন্দ্রেই কেন্দ্রীভূত এবং এর কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছেন আল্লাহ। যদি দু বা ততোধিক ক্ষেত্রে তা ন্যস্ত হত তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বিরোধ ঘটত। চরম ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হত। এজন্যই আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে সম্পূর্ণ বলা হয়। এর বিভাজনের চিন্তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও নাফরমানির শামিল। আল্লাহ তাঁর ক্ষমতা কোনো ফেরেশতাকে বা কোনো নবীকে বা কোনো রাষ্ট্র প্রধানকে কিংবা কোনো পীর, সূফী, দরবেশকেও ভাগ করে দেন নি। সৃষ্টিকূলের কেউ সার্বভৌমত্বের অধিকারী হতে পারে না, যে কোনো বাদশাহ বা রাষ্ট্র প্রধান তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার উপর নির্ভরশীল। আবার তার ক্ষমতা ও আদেশ নিজ ভুখণ্ডের বাইরে সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর। একথাই কুরআনে বলা হয়েছে:

﴿مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦ ٢٥٥ ﴾ [البقرة: ٢٥٥]

“কে আছে এমন (স্বীয় ক্ষমতা, অধিকারী বলে) আল্লাহর নিকট কোনো সুপারিশ করতে পারে তার অনুমতি ছাড়া।’’[2]

মহান আল্লাহ আরো বলেন :

﴿ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَۖ وَلَا يَ‍ُٔودُهُۥ حِفۡظُهُمَاۚ ٢٥٥ ﴾ [البقرة: ٢٥٥]

‘‘তাঁর কুরসী আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সর্বত্রই পরিব্যাপ্ত হয়।’’[3] তাঁর এ সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ ও সংরক্ষনে তিনি হিমশিম খান না; ক্লান্ত শ্রান্ত হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

পবিত্র কুরআনের বাণী:

﴿ ۖ وَلَا يَ‍ُٔودُهُۥ حِفۡظُهُمَاۚ ٢٥٥ ﴾ [البقرة: ٢٥٥]

‘‘আসমান ও যমীনের প্রতিটি বিষয়কে সংরক্ষণ ক্রমবিকাশ ও ক্রমোন্নতি দানে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন না, বা এসব তাকে ক্লান্ত করতে পারে না।’’

কারণ তিনি মহান ও শ্রেষ্ট সত্তা।

﴿وَهُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡعَظِيمُ ٢٥٥ ﴾ [البقرة: ٢٥٥]

‘‘তিনি পরাক্রমশালী ও অসীম মর্যাদাবান।’’

৬। অসীম জ্ঞান ও বিচক্ষনতা (Unlimited knowledge and farsightedness) ইসলামী সার্বভৌমত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ সার্বভৌমত্বের দাবীদার অসীম জ্ঞান ও বিচক্ষণতার অধিকারী। সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক বিধায় তিনি সর্বোচ্চ জ্ঞানী ও বিশ্বের প্রশাসন পরিচালনা কার্যে খবরাখবর পাবার জন্য তিনি কারো উপর নির্ভরশীল নন। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ ۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡۖ ٢٥٥ ﴾ [البقرة: ٢٥٥]

‘‘তিনি স্বয়ং সৃষ্টি জগতের সবার অগ্র পশ্চাতের বা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যাবতীয় খবরাখবর সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল।’’

যেমন দুনিয়ার কোনো শাসক তার অধীনস্থ রাজ্যের খবরাখবরের জন্য বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল। শাসক নিজে জ্ঞান রাখেন না তাকে জ্ঞাত করা হয়। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর বাণী প্রনিধানযোগ্য, মহান আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيۡءٖ مِّنۡ عِلۡمِهِۦ ٢٥٥ ﴾ [البقرة: ٢٥٥]

‘‘তাঁর জ্ঞাত বিষয়ের কিছুই মানুষের জ্ঞান সীমার আয়ত্তাধীন হতে পারে না। তবে আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান থেকে মানুষকে যা কিছু দান করেছেন, মানুষ শুধূ তাই জানে এর বেশী নয়।’’[4]

অপরাধী বা অন্য কারো সম্পর্কে আল্লাহর জ্ঞানী সর্বব্যাপী। কে বির্পযকারী, আর কে সংশোধনকারী তা আল্লাহ জানেন।’’

(৭) হস্তান্তর আযোগ্যতা (Inalienability) সার্বভৌম ক্ষমতাকে হস্তান্তর করা যায় না। এটা হস্তান্তর অযোগ্য। সার্বভৌমত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের প্রাণস্বরূপ এবং এর উপরই ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নিভর্রশীল। মানুষ যেমন তার প্রাণ অপরকে দান করে বেঁচে থাকতে পারে না। বৃক্ষ যেমন তার পল্লব জন্মাবার ক্ষমতা পরিত্যাগ করে টিকতে পারে না, নদী যেমন তার উচ্ছল পানিরাশির গতি বন্ধ করে নিশ্চল হয়ে থাকতে পারে না। তেমনি রাষ্ট্র ও আল্লাহর সার্বভৌমত্ব পরিত্যাগ করে তার যথার্থ লক্ষ্যে উপনীত হতে পারে না। এ সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করার অর্থই হচ্ছে ইসলমী রাষ্ট্রের বিলুপ্তি। সুতরাং আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের মূলশক্তি।                              

পরিশেষে বলা যায় যে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হতে হয় স্থায়ী, সার্বজনীন, অসীম, চরম, অবিভাজ্য, একক এবং হস্তান্তর অযোগ্য। কোনো রাষ্ট্রে যদি এগুলোর কোনো একটির অনুপস্থিতি দেখা যায় তবে সেখানে রাষ্ট্র সার্বভৌম হতে পারে না। ফলে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে বাধ্য এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকেও রাষ্ট্রকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। আর এসব বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় একমাত্র মহান আল্লাহই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন অন্য কোনো মানুষের পক্ষে স্থায়ী, একক, সার্বজনীন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হওয়া অসম্ভব।

[1] সূরা আল বাকারাহ:২৫৫।

[2] সূরা আল বাকারাহ:২৫৫।

[3] সূরা আল বাকারাহ:২৫৫।

[4] সূরা আল বাকারাহ:২৫৫।

০৮ ইসলামী সার্বভৌমত্বে আল্লাহর স্বরূপইসলামে সার্বভৌমত্বের ধারণা হলো আল্লাহ তা‘আলা শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা, বিযিকদাতা ও পালনকর্তাই নন, তিনি শাসক ও বিধানদাতাও বটে, এটা সেই সার্বভৌমত্বের ধারণার বিস্ময়কর বহিঃপ্রকাশ যা প্রথম খলিফা আবু বকর রাদিয়া্ল্লাহু আনহু তার খিলাফতের বায়আত অনুষ্ঠানের পরে সর্বপ্রথম ভাষণে বলেছিলন,‘‘তোমাদের মধ্যকার দুর্বল ব্যক্তি আমার নিকট শক্তিশালী, যতক্ষণ না আমি তাঁর প্রাপ্য ফিরিয়ে দিতে পারি। আর তোমাদের মধ্যকার সবল ব্যক্তি আমার নিকট দুর্বল যতক্ষণ না তাঁর থেকে তাঁর নিকট প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে পারি।”

ইসলাম কোনো ব্যক্তি বিশেষের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে না। অপরদিকে পাশ্চাত্য সার্বভৌমত্বে ব্যক্তি বিশেষের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেয়। সার্বভৌমত্ব বাস্তবিক পক্ষে মানবীয় পরিমণ্ডলে বিদ্যমান আছে কি?

যদি থেকে থাকে তবে তা কোথায়? এ সার্বভৌমত্বের প্রকৃত মালিক কাকে বলা যেতে পারে? স্বয়ং রাষ্ট্র বিজ্ঞানের পণ্ডিতগণ এ বিষয় নিয়ে চরমভাবে দিশেহারা। ইসলামের দৃষ্টিতে যদি তা ব্যক্তি বিশেষের স্বীকৃতি দেওয়া হয় তা হবে তাওহীদ পরিপন্থী কাজ। এ কারণেই ইসলামী সমাজব্যবস্থায় কেউ ঐশী অধিকার বলে (Divine rights) সর্বাত্মক ক্ষমতা ধারণের অধিকার প্রাপ্ত হয় না। তাই ইসলামের মূলকথা হল সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর অধিকার। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে যদি এ সার্বভৌমত্বের অধিকার প্রদান করা হয় তবে তার হুকুম বাস্তবিক পক্ষে আইন বলে বিবেচিত হবে না। তার উপর কোনো অধিকার থাকবে না। তার শর্তহীন আনুগত্য করতে হবে এমনটি নয়। বরং তার নির্দেশ সম্পর্কে ভাল-মন্দ-ভুল ও র্নিভুল হওয়ায় প্রশ্ন উপস্থাপন করা যাবে। পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে আল্লাহর সৃষ্টির উপর অন্য কোনো সৃষ্টির প্রভূত্ব কায়েম করার এবং হুকুম চালাবার কোনো অধিকার অপর কারও নেই।

এ অধিকার একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর অধিকার ভিত্তি এ যে,

﴿ إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ ٥٤ ﴾ [الاعراف: ٥٤]

‘‘বস্তুত আল্লাহ তোমাদের রব, যিনি আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন’’।[1]

সার্বভৌমত্বের এ অধিকার যদি কোনো মানবশক্তিকে দেওয়া হয়, তাতে মানুষের প্রকৃত কল্যাণ হতে পারে না। মানুষ সে যে কোনো ব্যক্তি হোক, শ্রেণী হোক, কিংবা কোনো জাতি বা সমষ্টি হোক সার্বভৌমত্বের এতো বিরাট ক্ষমতা সামলানো তার পক্ষে অসম্ভব। তথাপি এরূপ অধিকার ও কর্তৃত্ব যদি কোনো মানবীয় শক্তি লাভ করেন তবে সেখানে যুলুম, নিপীড়ন ও নির্যাতন বেড়ে যাবে। সমাজের মধ্যে বিশৃংঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তাঁর যুলুমের দায়ভার প্রতিবেশী সমাজের উপর পড়বে। মানুষ যখনই সার্বভৌমত্বের ক্ষমতাকে নিজের মনে করেছেন তখনি সমাজের ভাঙ্গণ বির্পযয় ও অশান্তি সর্বগ্রাসী হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ যার বাস্তবিক পক্ষে সার্বভৌমত্ব নেই এবং যাকে সার্বভৌমত্বের অধিকার ও প্রদান করা হয় নি, তাকেই যদি কৃত্রিমভাবে সার্বভৌমত্বের অধিকার ও ক্ষমতা প্রদান করা হয়, তবে সে কিছুতেই এ পদের যাবতীয় ক্ষমতার এখতিয়ার সঠিক পন্থার ব্যবহার করতে সক্ষম হবে না। তাই বলতে পারি ইসলামী মতাদর্শ অনুসারে আকাশ পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের উৎস ও মালিক হবেন একমাত্র আল্লাহ।

মহান আল্লাহর বাণী :

﴿إِنِ ٱلۡحُكۡمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُۚ ذَٰلِكَ ٱلدِّينُ ٱلۡقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ ٤٠ ﴾ [يوسف: ٤٠]

‘‘বিধান একমাত্র আল্লাহরই। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না। এটিই সঠিক দীন, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।’’[2]

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, আল্লাহ তো বির্মূত সত্যের (Abstract reality) প্রতীক যিনি মানুষের ধরাছোঁয়ার উর্ধ্বে; কাজেই পার্থিব সমস্যা মীমাংসার জন্য কী কারো শরণাপন্ন হওয়া যাবে? তার উত্তরে বলা যায়, আল্লাহ মানবের মঙ্গলের জন্য সকল আইন কুরআনের মাধ্যমে বিশ্বনবীর নিকট প্রেরণ করেছেন এবং মানবগণ এ বিধানসমূহ পালন করলে তাদের উন্নতি হবে। সুতরাং আমরা বলতে পারি, দুনিয়াতে আল্লাহর এ আইনগত সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধি হচ্ছে আল্লাহর প্রেরিত রাসূলগণ। অন্যকথায় আমাদের জন্য আইন রচয়িতা ও সংবিধান দাতা আমাদের জন্য কি আইন এবং কি কি নির্দেশ দিয়েছেন তা জানাবার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে আম্বিয়ায়ে কিরাম। তাই সার্বভৌমত্বে তাঁদের আনুগত্য করতে হবে।

ক. সকল কিছুর উর্ধ্বে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব :

আল্লাহর সার্বভৌমত্ব নিখিল বিশ্ব ও গোটা মানব জাতির উপর। মানুষকে আল্লাহ অধিকার দিয়েছেন খলিফা হওয়ার। খলিফা হলে সে সার্বভৌত্বের অধিকারী হবে এমন নয়। বরং সেই তার কার্যক্রম পরিচালনা করবে মজলিশে শুরা তথা পরামর্শ সভার মাধ্যমে। আর মজলিশে শুরার কোনো অধিকার নেই আল্লাহর আইনের পরিবর্তন করার। অধিকার আছে শুধু কুরআন-হাদীসের আইন বাস্তবায়ন করার পথ ও উপায় নির্ধারণ করার। এছাড়া মানুষ কখনো মানুষের উপর রাজা বাদাশাহ হতে পারে না, এটাই আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। অন্য ধর্মে মানুষের উপর মানুষ রাজা বাদশাহ, কিন্তু ইসলাম ধর্মে তা নেই। তাই বলতে পারি মানুষের বাদশাহ বা প্রভু “মানুষ নয়’’ কেবলমাত্র ‘‘আল্লাহ’’। আল্লাহ নিজেই তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন,

﴿ هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِي لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡمَلِكُ ٱلۡقُدُّوسُ ٱلسَّلَٰمُ ٱلۡمُؤۡمِنُ ٱلۡمُهَيۡمِنُ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡجَبَّارُ ٱلۡمُتَكَبِّرُۚ سُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٢٣ ﴾ [الحشر: ٢٣]

‘‘তিনি আল্লাহ, যিনি ছাড়া হক্ক কোনো ইলাহ নেই, তিনিই অধিপতি, তিনিই পবিত্র, তিনিই শান্তিদাতা, তিনিই নিরাপত্তা বিধায়ক, তিনি রক্ষক, তিনিই পরাক্রমশালী, তিনিই প্রবল, তিনিই অতীব মহামান্বিত। তারা যাকে শরীক স্থির করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, মহান।’’ [3]

এ আয়াতের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই, মূল আয়াতে الملك শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যার অর্থ বাদশাহ, নিরঙ্কুশ অধিনায়ক কেবলমাত্র তিনি। আল্লাহ কোনো এলাকায় বা রাষ্ট্রে বা রাজ্যে নয়। সমগ্র সৃষ্টি লোকের সারা জাহানের অধিপতি বাদশাহ। তাঁর প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব সমগ্র সৃষ্টিলোকের উপর নিরংকুশভাবে প্রতিষ্ঠিত। প্রতিটি জিনিসের মালিক তিনিই। তাহাঁর আধিপত্য কর্তৃত্ব ও আইন বিধানের অধীন এখানকার প্রতিটি জিনিস। তাহার সার্বভৌমত্ব (Sovereigny) সীমাবদ্ধ নয়।

মহান আল্লাহ বলেন :

﴿ لَّهُۥ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ كُلّٞ لَّهُۥ قَٰنِتُونَ ١١٦ ﴾ [البقرة: ١١٦]

‘‘পৃথিবীর ও আকাশমণ্ডলে যা কিছু আছে সবই তাহার দাসানুদাস, সবই তাহাঁর আদেশানুগত।’’ ১৩[4]

অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন।

﴿ فَعَّالٞ لِّمَا يُرِيدُ ١٦ ﴾ [البروج: ١٦]

‘‘তিনিই যা করতে চান তা তিনি করে ফেলেন।”[5]

﴿ لَا يُسۡ‍َٔلُ عَمَّا يَفۡعَلُ وَهُمۡ يُسۡ‍َٔلُونَ ٢٣ ﴾ [الانبياء: ٢٣]

‘‘তিনি যা করেন সেই জন্য কারো ও নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়, বরং সবাই তার নিকটই জবাবদিহি করতে বাধ্য।’’[6]

অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ وَٱللَّهُ يَحۡكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكۡمِهِۦۚ وَهُوَ سَرِيعُ ٱلۡحِسَابِ ٤١ ﴾ [الرعد: ٤١]

‘‘আর আল্লাহই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তার সিদ্ধান্তের পূনর্বিবেচনা করতে পারে এমন কেউ নেই।’’[7]

﴿ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيۡهِ ٨٨ ﴾ [المؤمنون: ٨٨]

‘‘তিনি আশ্রয় দান করেন, তার বিরুদ্ধে আশ্রয় দেওয়ার কেউ নেই।’’[8]

মানুষ রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে দাবি করে, আমি সকল ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতির উর্ধ্বে, আমি কুদ্দুস, অথচ পবিত্র কুরআনে ‘‘কুদ্দুস’’ অর্থ এমন সত্তা যার কোনোরূপ ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা কিংবা আশোভনতা ও অশুচিতা পাওয়া যাবে না। আল্লাহ তা হতে অনেক দূরে। তাঁর সম্পর্ক কোনো খারাপ ধারণা পোষণ করা যেতে পারে না। আর সার্বভৌমত্বের অধিকারী হতে হলে তা প্রথম শর্ত। আর সার্বভৌমত্বের ধারক সত্তা যে কোনোরূপ দুষ্ট, অসচ্ছরিত্র ও অশুভ মানসিকতাপূর্ণ হতে পারে না। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণে যারা সার্বভৌমত্বের দাবী করে তারা এগুলো থেকে মুক্ত নয়। কাজেই প্রকৃত সার্বভৌমত্বের মালিক আল্লাহ ছাড়া কেউ নয়।

আল্লাহই একমাত্র আস-সালাম (السلام)। মানুষ একবার রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারলে দাবি করে, আমিই সালাম বা শান্তি দাতা মানুষ কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার জন্য যখন ভোট চায় তখন বলে, আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে আমি শান্তি দিতে পারবো। সে আরো বলে, শান্তি সমাজে ফিরিয়ে আনার জন্য কেউ আমার মত যোগ্যতা রাখে না। অথচ মানুষের নিজের-ই-শান্তির প্রয়োজন, তাই মানুষ রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারলে তার হাতে শান্তির যা কিছু থাকে তার সবটুকুই সে নিজে ভোগ করতে চায়। সে তার নিজের লোক যাদের ঘাড়ের উপর সওয়ার হয়ে সে ক্ষমতায় টিকে থাকে তাদের কিছু ভাগ দেয়। আর বাদবাকি লোকগুলোকে সে কোনোক্রমেই শান্তিতে রাখতেও চায় না এবং চাইলেও তা পারে না। কারণ সেতো একজন মানুষ। যা তার নিজের-ই দরকার তা সে নিজে না রেখে কি অন্যকে দিতে চাইবে? তা কখনোই চাইবে না। তাই সকল কিছুর উপরেই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব।

আল্লাহই একমাত্র আল-মুমিন (المؤمن)। অর্থ ভয়-বিপদ হতে, সুরক্ষিত। আর আল-কুরআনের দৃষ্টিতে আল-মুমিন সেই যে অন্যদের নিরাপত্তা দান করে। যারা নিজেদেরকে সার্বভৌমত্বের দাবীদার বলে মনে করে, তার নিজের জান-মাল ও মান-ইজ্জতের নিরাপত্তার ব্যবস্থাই যখন তার নিজের হাতে নেই তখন অন্যের জান-মাল ও মান-ইজ্জতের হেফাজতের দায়িত্ব সে কি করে নিতে পারে? কাজেই আল্লাহ যেহেতু সৃষ্টিকুলের নিরাপত্তা দান করেন, সেহেতু সার্বভৌমত্ব শুধু আল্লাহর।

আল্লাহই একমাত্র আল-মুমিন (المهيمن)। কুরআনে এ শব্দটির তিনটি অর্থ বুঝানো হয়েছে, পাহারাদার ও সংরক্ষণকর্তা, পর্যবেক্ষক; যিনি সৃষ্টি সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যাপারে সর্বদা কর্মতৎপর। আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টির পাহারাদারী সংরক্ষণ করছেন। তিনি কারোও থেকে নিরাপত্তা চান না। কিন্তু যারা সার্বভৌমত্বের দাবী করে তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য পাহারাদার নিযুক্ত করতে হয়। সুতরাং সার্বভৌমত্ব আল্লাহর এ কথাই প্রমাণিত হয়।

আল্লাহই একমাত্র আল-মুমিন (العزيز)। আল-আযীয বলতে এমন এক সত্তাকে বুঝায় যার বিরুদ্ধে কেউ মাথা জাগাতে পারে না। যার সিদ্ধান্ত প্রতিরোধ করার সাধ্য কারোও নেই। যার সম্মুখে অন্য সকলেই নিঃশক্তি অসহায় ও অক্ষম। এ ধারণা যারা সার্বভৌমত্বের দাবীদার তাদের জন্য মোটেই প্রয়োজ্য নয়। সুতরাং আল্লাহই পরাক্রমশালী। আর তারই সার্বভৌমত্ব।

আল্লাহই একমাত্র আল-মুমিন (الجبار)। এর অর্থ শক্তি প্রয়োগকারী, এটা শুধূ আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য, কারণ তিনি যা খুশি তার পরিকল্পনাকারী এবং তার বাস্তবায়ন কারী অন্য কারো দ্বারা তা সম্ভব নয়। ইহা ছাড়া জাববার শব্দে বিরাটত্ব ও মহানত্বের অর্থও নিহিত রয়েছে।

আল্লাহই একমাত্র আল-মুমিন (المتكبر)। মানুষের স্বভাব হল এমন, একটু ক্ষমতা পেলেই সে ক্ষমতার বড়াই করা শুরু করে দেয়, কিন্তু ক্ষমতার বড়াই করার অধিকার রাখেন একমাত্র আল্লাহ। তাই সার্বভৌমত্বের অধিকারী আল্লাহ।

এর দুটি অর্থ- (১) যে আসলে বড় না কিন্তু শুধু শুধুই বড়াই করে বেড়ায়।

(২) যে আসলেই বড় এবং বড় হইয়া থাকে, মানুষ, শয়তান কিংবা অন্য কিছুতেই প্রকৃত বড়ত্ব নাই। এ কারণে নিজেকে বড় মনে করা ও অন্যান্যদের উপর নিজের বড়ত্ব জাহির করা-বড়াই করে বেড়ানো এর একটা মিথ্যা ও অমূলক দাবি বিশেষ। যার মত বড় দোষ আর কিছুই হতে পারেনা। আল্লাহ তা‘আলা প্রকৃতপক্ষেই বড়, সমস্ত বড়ত্ব তারই জন্য, বড়ত্ব তাতেই শোভা পায়। তাঁর মুকাবিলায় প্রতিটি জিনিসই হীন ও নগন্য।২৪

কুরআনে এসেছে,

﴿ أَلَيۡسَ ٱللَّهُ بِأَحۡكَمِ ٱلۡحَٰكِمِينَ ٨ ﴾ [التين: ٨]

‘‘আল্লাহ কি সব শাসনকর্তার বড় শাসনকর্তা নন?’’ ২৫

 

খ. ভূ-মণ্ডল ও নভোমণ্ডলে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব :

আল্লাহ তো আসমান ও জমিন এবং দু‘য়ের মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছুর নিরংকুশ মালিক। এখানে কেউ-ই-অংশ বসাতে পারে না। বিশ্ব জাহানের যিনি শাসক-পরিচালক, মানুষের শাসক পরিচালকও তিনিই। মানুষের কাজ কারবারেও তিনিই সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী এবং তিনি ছাড়া অন্য কোনো মানবীয় ও অ-মানবীয় শক্তির নিজের পক্ষ থেকে নির্দেশ-ফয়সালা দান করার অধিকার নেই।’’

মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ لَهُۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۗ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ مِن وَلِيّٖ وَلَا نَصِيرٍ ١٠٧ ﴾ [البقرة: ١٠٦، ]

‘‘তুমি কি জান না যে, নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহর? আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী নেই।’’[9]

﴿ وَلِلَّهِ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ ١٨٩ ﴾ [ال عمران: ١٨٩]

‘‘আর আল্লাহর জন্যই হল আসমান ও যমীনের বাদশাহী। আল্লাহই সর্ববিষয়ে ক্ষমতার অধিকারী।’’[10]

কুরআনে অন্যত্র আরো এসেছে,

﴿ ۗ وَلِلَّهِ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَمَا بَيۡنَهُمَاۚ يَخۡلُقُ مَا يَشَآءُۚ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ ١٧ ﴾ [المائ‍دة: ١٧]

‘‘নভোমণ্ডল, ভূ-মণ্ডল ও এতদুয়ের মধ্যে যা আছে, সবকিছুর উপর আল্লাহ তা‘আলারই আধিপত্য। তিনি যা ইচ্ছা, সৃষ্টি করেন। আল্লাহ সবকিছুর উপর শক্তিমান।’’[11]

﴿ وَلِلَّهِ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَمَا بَيۡنَهُمَاۖ وَإِلَيۡهِ ٱلۡمَصِيرُ ١٨ ﴾ [المائ‍دة: ١٨]    

‘‘আকাশ ও পৃথিবীর এবং এ দুয়ের মধ্যকার সবকিছুর নিরংকুশ মালিকানা আল্লাহরই। এর সবকিছুকেই তার দিকে ফিরে যেতে হবে।’’৩০

﴿ أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ لَهُۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ يُعَذِّبُ مَن يَشَآءُ وَيَغۡفِرُ لِمَن يَشَآءُۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ ٤٠ ﴾ [المائ‍دة: ٤٠]

‘‘তুমি কি জাননা যে, আল্লাহ নিমিত্তেই নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলের আধিপত্য। তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।’’[12]

﴿ لِلَّهِ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَمَا فِيهِنَّۚ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرُۢ ١٢٠ ﴾ [المائ‍دة: ١٢٠]

‘‘নভোমণ্ডল, ভূ-মণ্ডল এবং এতদুভয়ে অবস্থিত সবকিছুর আধিপত্য আল্লাহরই। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। ’’[13]

﴿ لَّهُۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۚ وَإِلَى ٱللَّهِ تُرۡجَعُ ٱلۡأُمُورُ ٥ ﴾ [الحديد: ٥]

‘‘তিনিই আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর রাজত্ব ও সার্বভৌমত্বের একমাত্র মালিক। সকল ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ও মীমাংসার জন্য তারই দিকে ফিরতে হবে।’’[14]

এ ভূ-মণ্ডল ও নভোমণ্ডলে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বরুপ উপলব্ধি করতে হলে ভূ-মণ্ডল ও নভোমণ্ডল সর্ম্পকে সম্যক ধারণা লাভ করতে হবে। এ মহাবিশ্বের প্রতিটি বিষয় ও সৃষ্টির সাথে এবং এর পরিচালনার সাথে আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতা প্রত্যেকটি মুহূর্তে বিরাজমান। মহান রাব্বুল আলামীন এ বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে বলেন,

﴿ أَوَ لَمۡ يَرَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ أَنَّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ كَانَتَا رَتۡقٗا فَفَتَقۡنَٰهُمَاۖ ﴾ [الانبياء: ٣٠]    

‘‘যারা অস্বীকারকারী তারা কি চিন্তা করে দেখে না যে, এ আসমান ও জমিন মিলিত অবস্থায় ছিল অতঃপর আমরা এ গুলোকে আলাদা করে দিয়েছি।’’[15]

আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এ মহাবিশ্ব একসময় একটি পিণ্ড ছিল। আর এরপর মহাবিস্ফোরনের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি। আর এ বিষয়টিকে আল্লাহ বলেছেন,

﴿ إِنَّمَا قَوۡلُنَا لِشَيۡءٍ إِذَآ أَرَدۡنَٰهُ أَن نَّقُولَ لَهُۥ كُن فَيَكُونُ ٤٠ ﴾ [النحل: ٤٠]

‘‘আমরা কোনো কিছু সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করলে তখন তো কেবল সেটার উদ্দেশ্য আমাদের কথা হয়, ‘হয়ে যাও’। আর তখনই তা হয়ে যায়।’’[16]

আমাদের পৃথিবী সৌরজগতের একটি গ্রহ। আর এ সৌরজগতের কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য নামক নক্ষত্র। এ রকম প্রত্যেকটি নক্ষত্রেরই একটি নিজস্ব বলয় ও কক্ষ রয়েছে। আর এ রকম অনেকগুলো নক্ষত্র ও তাদের জগৎ মিলে হয় একটি গ্যালাক্সী। অনেকগুলো গ্যালাক্সীর মধ্যে একটি গ্যালাক্সীর হচ্ছে Milkyway গ্যালাক্সী। আর এ গ্যালাক্সীর মধ্যেই আমাদের সৌরজগত অবস্থিত। এ গ্যালাক্সীকে কেন্দ্র করেই এ সবকিছু আবর্তিত হচ্ছে। মিল্কিওয়ে Galaxy তে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে। আর গ্যালাক্সীসমূহ cluster কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। একটি cluster এ অনেকগুলো যে গ্যালাক্সী রয়েছে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সী যে cluster এর অবস্থিত তার নাম Local group এতে ৩২টি গ্যালাক্সী রয়েছে। মহাবিশ্বের আরেকটি cluster হচ্ছে Hercules cluster এতে দশ হাজার (১০,০০০) গ্যালাক্সী রয়েছে। আর এরকম কতগুলো cluster রয়েছে তা মহাকাশবিদরা এখনো ধারণা করতে পারে নি। তাই আমরা এটুকু অন্তত উপলব্ধি করতে পারি যে, মহাবিশ্বের বিশালত্ব আমাদের ধারনার বাইরে এবং তা পরিমাপ করা হয়ত আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ মহাবিশ্বের সবকিছুই পরিভ্রমনশীল, এ সকল সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্ব সর্বদা বিরাজমান।

মহান আল্লাহ বলেন,

   ﴿ كُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٣٣ ﴾ [الانبياء: ٣٣]

‘‘প্রত্যেকই আপন কক্ষপথে পরিভ্রমনশীল।’’[17]

এখানে শেষ নয়। এ মহাবিশ্ব এখনও প্রসারমান এবং গ্যালাক্সীগুলোর দুরত্ব পরস্পর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ মহাবিশ্বের আয়াতন ক্রমেই বাড়ছে। এ বিষয়ে প্রবিত্র কুরআনের বাণী প্রনিধানযোগ্য,

﴿ وَٱلسَّمَآءَ بَنَيۡنَٰهَا بِأَيۡيْدٖ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ ٤٧ ﴾ [الذاريات: ٤٧]  

‘‘অর্থাৎ আমি আসমান সৃষ্টি করেছি আর আমিই এর প্রসারকারী।’’৩৭

আর গ্যালাক্সী গুলো পরস্পর দূরে সরে যাওয়ার গতি হচ্ছে প্রতি ঘন্টায় ৩০০ মাইল। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে,

﴿ فَلَآ أُقۡسِمُ بِٱلۡخُنَّسِ ١٥ ﴾ [التكوير: ١٥]

‘‘শপথ তারকারাজির যা দূরে সরে যাচ্ছে।’’৩৮

গ্রহ, নক্ষত্র, উপগ্রহের আর্বতনের মাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছে দিন রাত। এখানেও আল্লাহর পরিপূর্ণ সার্বভৌমত্ব সর্বদা বিরাজমান। দিন কখনো রাতকে অতিক্রম করতে পারে না এবং গ্রহ-নক্ষত্র কখনো একটি অপরটির সাথে মিলিত হয় না।

﴿ لَا ٱلشَّمۡسُ يَنۢبَغِي لَهَآ أَن تُدۡرِكَ ٱلۡقَمَرَ ٤٠ ﴾ [يس: ٤٠]

‘‘সূর্যের সাধ্য নেই যে চন্দ্রকে নাগাল পাবে এবং রাত্রি অগ্রে চলে না দিনের।’’[18]

নভোমণ্ডলের প্রত্যেকটি গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সী, ক্লাস্টার, তাদের নিজস্ব কক্ষপথে এবং নিজস্ব আকর্ষণ শাক্তিকে কেন্দ্র করে পরিচালনশীল রয়েছে। কোনো নক্ষত্র অন্য কোনো নক্ষত্রের বা গ্রহের উপর নির্ভরশীল হয়।

মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ ٱللَّهُ ٱلَّذِي رَفَعَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ بِغَيۡرِ عَمَدٖ تَرَوۡنَهَا ٢ ﴾ [الرعد: ٢]  

‘‘আল্লাহ তিনি যিনি আসমানসমূহ স্থাপন করেছেন কোনো খুঁটি ছাড়াই যা তোমরা দেখতে পাও।’’[19]

তবে এ মহাবিশ্বের পরিনতি কি হবে? এটি কি এভাবেই প্রসারমান থাকবে নাকি অন্য কিছু। এ প্রসারমান অবস্থা থেমে যাবে এবং সবকিছুই দ্রুত একত্রিত হতে থাকবে এবং Singularity তে ফিরে যাবে। অর্থাৎ Big Bang এর পূর্বে যেমন ছিল এবং দ্বিতীয়বারও আবার বিস্ফোরন ঘটবে, এটাকে বলা যায় Big crunch। এর পর নতুন মহাবিশ্ব সৃষ্টি হবে যা হবে চির স্থায়ী। এ বিষয়টিকে মহান রাববুল আলামীন এভাবে বলেছেন:

﴿ يَوۡمَ نَطۡوِي ٱلسَّمَآءَ كَطَيِّ ٱلسِّجِلِّ لِلۡكُتُبِۚ كَمَا بَدَأۡنَآ أَوَّلَ خَلۡقٖ نُّعِيدُهُۥ ١٠٤ ﴾ [الانبياء: ١٠٤]

‘‘সে দিন, যে দিন আমি আসমানকে কাগজের পৃষ্টাগুলোর মত ভাঁজ করে রাখব, যেভাবে সর্ব প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম অনুরূপভাবে আমরা সেটার পুনরাবৃত্তি ঘটাব।’’[20]

আজকের আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণা করে প্রমাণ করেছে যে, বিশ্ব সৃষ্টি এর প্রসার এবং চূড়ান্ত পরিণতি পবিত্র কুরআনে অনেক আগেই বর্ণনা করা হয়েছে। তাই আমরা উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝতে পারি যে, মহাবিশ্বের প্রত্যেকটি অনু-পরমানুতে আল্লাহর ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্ব বিদ্যমান।

গ. সার্বভৌমত্ব আল্লাহর জন্য বিশেষিত :-

সার্বভৌমত্ব যে আল্লাহর জন্য বিশেষিত তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি, শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা বিশ্লেষনের মাধ্যমে। সাধারণভাবে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের জনগণ অথবা রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বলে মনে করা হয়। কোথাও কোথাও সার্বভৌম ক্ষমতা মনে করা হয় আইন পরিষদ বা সংসদকে। সার্বভৌম ক্ষমতা হলো সর্বময় ক্ষমতা। অথচ ইসলামে আইন প্রণয়ন, শাসন ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ক্ষমতার মালিক হচ্ছেন মহান আল্লাহ। এ ব্যাপারে অন্য কারো অংশীদারিত্ব কখনই স্বীকার করা হয় না।

আল্লাহ আল-কুরআনে বলেন:

﴿ قُلِ ٱللَّهُمَّ مَٰلِكَ ٱلۡمُلۡكِ تُؤۡتِي ٱلۡمُلۡكَ مَن تَشَآءُ وَتَنزِعُ ٱلۡمُلۡكَ مِمَّن تَشَآءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَآءُۖ بِيَدِكَ ٱلۡخَيۡرُ ٞ ٢٦ ﴾ [ال عمران: ٢٦]

‘‘বলে দাও (হে মুহাম্মদ)। আপনি রাজত্বের মালিক। আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন, আর যার নিকট থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন। আপনি যাকে খুশী সম্মানিত করেন, আর যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। সমুদয় কল্যাণ আপনারই হাতে।’’[21]

কুরআনে আরো এসেছে,

﴿ وَقُلِ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ ٱلَّذِي لَمۡ يَتَّخِذۡ وَلَدٗا وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ شَرِيكٞ فِي ٱلۡمُلۡكِ وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ وَلِيّٞ مِّنَ ٱلذُّلِّۖ وَكَبِّرۡهُ تَكۡبِيرَۢا ١١١ ﴾ [الاسراء: ١١١]

‘‘বলুন: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি না কোনো সন্তান রাখেন না তাঁর সার্বভৌমত্ব কোনো শরীক আছে এবং যিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না, যে কারণে তাঁর কোনো সাহায্যকারী প্রয়োজন হতে পারে না। সুতরাং আপনি তাঁর মাহাত্ন বর্ণনা করতে থাকুন।”[22]

আল্লাহর পরিচয় প্রসঙ্গে আরো বলা হয়েছে:

﴿ قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ ١ مَلِكِ ٱلنَّاسِ ٢ إِلَٰهِ ٱلنَّاسِ ٣ ﴾ [الناس: ١، ٤]  

‘‘বলুন! (হে মাহাম্মদ): আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রভু মানুষের শাসক এবং মানুষের উপাস্যের নিকট। ’’[23]

সার্বভৌমত্ব যে আল্লাহর জন্য বিশেষিত অন্য কোনো ক্ষমতাসীন শাসকের জন্য নয় তা আমরা বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারি। বিজ্ঞান এমন কতিপয় দৃষ্টান্ত মানব জাতির কাছে উপস্থাপন করেছেন, যা প্রমাণিত করেছে, ক্ষমতাসীন কোনো শাসকের পক্ষে এমনভাবে মানব জাতির জন্য কল্যাণকর কিছু করা সম্ভব নয়। এমনকি এসব করার কল্পনাও করতে পারে না।

তাই বলতে পারি, একত্ববাদের বিশ্বাস থেকে যে সত্যটি প্রকাশিত হয় তাহলো সমস্ত বস্তুর উপর সৃষ্টিকর্তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। দুনিয়ার সাধারণ ক্ষমতা বলে আমরা যা বুঝে থাকি এর প্রতিটি তাঁরই ক্ষমতার পরিচায়ক এবং তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন। সুতরাং সার্বভৌমত্ব আল্লাহর জন্য বিশেষিত।

মহান আল্লাহ আরো বলেন,

﴿ أَلَمۡ تَرَوۡاْ أَنَّ ٱللَّهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَأَسۡبَغَ عَلَيۡكُمۡ نِعَمَهُۥ ظَٰهِرَةٗ وَبَاطِنَةٗۗ وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يُجَٰدِلُ فِي ٱللَّهِ بِغَيۡرِ عِلۡمٖ وَلَا هُدٗى وَلَا كِتَٰبٖ مُّنِيرٖ ٢٠ ﴾ [لقمان: ٢٠]

‘‘তোমরা কি দেখ না আল্লাহ, নভোমণ্ডল ও ভু-মণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছে? এমন লাকও আছে; যার জ্ঞান, পথ নির্দেশও উজ্জল কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে বাকবিতণ্ডা করে।’’[24]

উপরোক্ত আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, মানবমন গভীর অনুভূতি ও আবেগ সহকারে যতবার প্রকৃতি জগতে আল্লাহর অসীম কুদরতসমূহ দর্শন করবে ও আল্লাহর অনুগ্রহসমূহের প্রতি চিন্তা ও গবেষণায় নিয়োজিত হবে ততবারই তা নতুন নতুন রূপ নিয়ে তার কাছে প্রকাশিত হবে। মানুষ যখন গভীর মনোনিবেশ সহকারে আকাশ ও যমীনের আল্লাহ তা‘আলার অন্তহীন সৃষ্টি এবং এর তাৎপর্য চিন্তা করে, তখন সে বুঝতে পারে যে, এর বিস্ময়কর অপরূপ কলাকৌশল সে তার সমগ্র জীবন গবেষণা করে শেষ করতে পারবে না। যতবার মানুষ তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে, ততবারই তা নতুনরূপে নতুন সাজে তার সামনে ভেসে উঠবে। মানুষ অবাক ও বিস্ময়ের সাথে এ প্রকৃতির রূপ সুধা পান করবে। তার অবস্থা ও অস্তিত্বকে হৃদয়ের সকল অনুভূতি, আবেগ. উচ্চাস ও মুগ্ধ দৃষ্টি দিয়ে উপভোগ করবে। বিশেষিত তা এগুলোই প্রমাণিত করে।

ঘ. ক্ষমতার দৃষ্টিকোণে সার্বভৌমত্ব আল্লাহর:

ক্ষমতার দৃষ্টিতে সার্বভৌমত্বের মালিক আল্লাহ। মানুষ যারা সার্বভৌমত্বের দাবীদার তারা তাদের ক্ষমতা কাউকে না কাউকে কিছু বন্টন করে দিতে হয়, না হলে সুষ্ঠুভাবে রাজ্য পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আল্লাহর ক্ষমতা কোনো ফেরেশতাকে বা কোনো নবীকে ও কিংবা কোনো পীর-সুফি-দরবেশকে ও ভাগ করে কিছু দেওয়া হয় নি। তাছাড়া সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক হতে হলে তাকে সর্বোচ্চ জ্ঞানীও হওয়া দরকার যা ব্যতীত সার্বভৌমত্বের মালিক হওয়া যায় না। এ গুণে গুণান্বিত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। এ সম্পর্কে কুরআনের বাণী হলো,

﴿ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ ٱلَّذِي لَهُۥ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَلَهُ ٱلۡحَمۡدُ فِي ٱلۡأٓخِرَةِۚ وَهُوَ ٱلۡحَكِيمُ ٱلۡخَبِيرُ ١ ﴾ [سبا: ١]

‘‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য, (এ) আকাশমণ্ডলী ও যমীনে (যেখানে) যা কিছু আছে সবই তাঁর একক মালিকানাধীন এবং পরকালেও সমস্ত প্রশংসা হবে একমাত্র তাঁর জন্যে, তিনি সর্ববিষয়ে প্রজ্ঞাময়, পরিপূর্ণভাবে অবহিত।’’[25]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿يَعۡلَمُ مَا يَلِجُ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَمَا يَخۡرُجُ مِنۡهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ ٱلسَّمَآءِ وَمَا يَعۡرُجُ فِيهَاۚ وَهُوَ ٱلرَّحِيمُ ٱلۡغَفُورُ ٢ ﴾ [سبا: ٢]

‘‘তিনি জানেন, যা কিছু যমীনের ভেতর প্রবেশ করে (আবার) যা কিছু তা থেকে উদগত হয়, যা কিছু আসমান থেকে বর্ষিত হয় এবং যা কিছু তাতে উত্থিত হয়, তিনি পরম দয়ালু পরম ক্ষমাশীল।’’[26]

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর জ্ঞানের সুবিশাল ভাণ্ডারের একটা অংশ শুধু দেখান সমগ্র আকাশ ও পৃথিবীর যা আওতাভুক্ত। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে সবই তার জানা। অল্প কয়েকটা শব্দ প্রকাশ করা এ অংশটা নিয়ে ভাবলেই মানুষ দেখতে পায় বিপুল সংখ্যক বস্তু, কর্ম, আকৃতি, রূপ, চিত্র, তত্ত্ব ও কাঠামোর এক বিশাল সমারোহ, যা কল্পনাও করা যায় না। আয়াতে যেসব জিনিসের দিকে ইংগিত করা হয়েছে, তার মধ্য থেকে যতগুলো জিনিস এক মুহুর্তে সংঘটিত হয়, সারা পৃথিবীর আধিবাসিরা জীবনভর গণনা করেও সেগুলোর সুনিশ্চিত সংখ্যা স্থির করতে পারবে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় পৃথীবির ভূ-স্তরগুলোতে কতগুলো শস্য বীজ আত্মগোপন করে? কতগুলো কীট পতংগ, পোকা মাকড়, সরীসৃপ পৃথিবীর বিভিন্ন দিক দিয়ে তার ভিতরে প্রবেশ করে? কতো ফোঁটা পানি কতো বিন্দু গ্যাস ও কতো ইউনিট বিদ্যুৎ পৃথিবীর বির্স্তীর্ণ এলাকাগুলোতে প্রবেশ করে? আল্লাহর সদা জাগ্রত চোখ তার সবকিছু দেখতে পায়। কিন্তু যারা জাগতিক সার্বভৌমত্বের দাবীদার তাদের মাঝে এ জ্ঞান অপরিপূর্ণ।

এখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মৌলিক সর্বাত্মক ও অসীম। কারণ রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতাই সার্বভৌমত্বের মাপকাঠি বলে বিবেচিত হলে মহান আল্লাহ ব্যতীত অপর কোনো সত্তাই এর অধিকারি হতে পারে না ।

মহান আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿يَقُولُونَ هَل لَّنَا مِنَ ٱلۡأَمۡرِ مِن شَيۡءٖۗ قُلۡ إِنَّ ٱلۡأَمۡرَ كُلَّهُۥ لِلَّهِِ ١٥٤ ﴾ [ال عمران: ١٥٤]

‘‘তারা বলেছিল আমাদের হাতে কি কিছুই করার নেই? তুমি বল সবকিছুই আল্লাহর হাতে।’’[27]

﴿ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُۚ ُۥ ٢٥٥ ﴾ [البقرة: ٢٥٥]

‘‘তিনি আল্লাহ, যিনি ব্যতীত আর কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী।’’[28]

আল্লাহ প্রত্যেক নবীদেরকে সর্বপ্রথম এ শিক্ষা দিয়েছিল যে, একমাত্র আল্লাহকেই ‘‘রব’’ বা সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া। একমাত্র তাকেই ইলাহ তথা তাঁরই ইবাদতের প্রতি আহ্বান জানাবে; কারণ মানুষ যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক বলে মেনে নেয়, তাহলে সে তারই ইচ্ছা মতো চলতে বাধ্য হয়, সে আল্লাহর হুকুম মতো চলতে পারে না। এ কথা আয়াতুল কুরসীতে আল্লাহ ইঙ্গিত করেছেন।

আল্লাহ তাঁর ক্ষমতার বর্ণনা করেছেন, মানুষের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে, তিনি বলেন,

﴿ أَمَّنۡ خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ وَأَنزَلَ لَكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَنۢبَتۡنَا بِهِۦ حَدَآئِقَ ذَاتَ بَهۡجَةٖ مَّا كَانَ لَكُمۡ أَن تُنۢبِتُواْ شَجَرَهَآۗ أَءِلَٰهٞ مَّعَ ٱللَّهِۚ بَلۡ هُمۡ قَوۡمٞ يَعۡدِلُونَ ٦٠ ﴾ [النمل: ٦٠]

‘‘তিনি কে, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য আসমান হতে পানি বর্ষাণ, যার দ্বারা সুন্দর রং বেরংয়ের বাগিচা তৈরী হয়, যার গাছ পালাগুলো উদ্ভব তোমাদের দ্বারা আদৌ সম্ভব ছিলনা? (এসব তৈরীর ব্যাপারে) আছে কি আল্লাহর সঙ্গে তার কেউ (শরীক) ইলাহ? তা যখন নেই তখন মানুষ কেনো মানুষের উপর প্রভু হয়ে চেপে বসতে চাও? বরং একটা সম্প্রদায় আল্লাহর সঠিক পথ হতে সরে যাচ্ছে।’’[29]

কুরআনে অন্যত্র এসেছে,

﴿ أَمَّن يَهۡدِيكُمۡ فِي ظُلُمَٰتِ ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِ وَمَن يُرۡسِلُ ٱلرِّيَٰحَ بُشۡرَۢا بَيۡنَ يَدَيۡ رَحۡمَتِهِۦٓۗ أَءِلَٰهٞ مَّعَ ٱللَّهِۚ تَعَٰلَى ٱللَّهُ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٦٣ ﴾ [النمل: ٦٣]

‘‘তিনি কে, যিনি স্থলভাগ ও সমুদ্রের মধ্যে অন্ধকারে (পথহারা অবস্থায় তোমাদেরকে তারকার মাধ্যমে) পথ দেখা আর কে জলীয় বাম্প ও আশু বৃষ্টির সুসংবাদ সহ বায়ূ প্রেরণ করেন? আছে কি কেউ (এসব ব্যাপারে) আল্লাহর সঙ্গে (শরীক) ইলাহ? (তা যখন নেই তখন তোমরা কি করে আল্লাহ ব্যতীত অন্যদেরকে ইলাহ (মা‘বুদ) মেনে নিতে পারো? এসব ব্যাপারে মানুষ তার ইবাদতে যে শরীক করে আল্লাহ তা থেকে উর্ধ্বে।’’[30]

এছাড়া তাঁর জ্ঞান সীমাহীন, তাঁর জ্ঞানের সাথে মানুষের জ্ঞানের কোনো তুলনাই চলে না। আর মানুষ তো নিজের ভাল মন্দ সর্ম্পকেও অবগত নয়, তাই কি করে মানুষ সার্বভৌমত্বের দাবী করতে পারে? তার পরেও দেখা যায় কিছু লোক আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার না করে জান্নাত লাভের আশা পোষণ করে। এটা কোনো মুমিনের পক্ষে উচিত নয়, এটা তো তাদের দ্বারা সম্ভব যারা কুফরীতে লিপ্ত। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ لَّقَدۡ كَفَرَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ ثَالِثُ ثَلَٰثَةٖۘ وَمَا مِنۡ إِلَٰهٍ إِلَّآ إِلَٰهٞ وَٰحِدِٞۚ ٧٣ ﴾ [المائ‍دة: ٧٣]

‘‘নিশ্চয়ই তারা কুফরী করে যারা বলে, আল্লাহ তিন জনের মধ্যে একজন। অথচ প্রকৃতপক্ষে এক আল্লাহর ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।’’[31]

﴿وَمَا مِنۡ إِلَٰهٍ إِلَّا ٱللَّهُۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ ٦٢ ﴾ [ال عمران: ٦١، ٦٣]

‘‘আর প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ-ই ইলাহ বা মা‘বুদ নেই, আর নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’[32]

ঙ. পৃথিবী ধ্বংস করার দৃষ্টিকোণে সার্বভৌমত্ব :

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যখন চরমভাবে দিশেহারা সার্বভৌত্বের ধারণা নিয়ে, তখন আমাদের সামনে স্পষ্ট যে, যারা পৃথিবীতে সার্বভৌমত্বের দাবী নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তেমনি সময়ে আল্লাহ যদি পৃথিবীটাকে ধ্বংস করে দেন, তারা কি তা রক্ষা করতে পারবে? এক কথায় সবার মুখে একইসুর বেজে উঠবে, পারবে না তারা আল্লাহর ধ্বংস থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে। সুতরাং কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দৃষ্টিতেও সার্বভৌমত্ব আল্লাহর।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:-

﴿وَيَوۡمَ تَقُومُ ٱلسَّاعَةُ يَوۡمَئِذٖ يَخۡسَرُ ٱلۡمُبۡطِلُونَ ٢٧ ﴾ [الجاثية: ٢٧]

‘‘নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলের রাজত্ব আল্লাহরই। যে দিন কেয়ামত সংঘটিত হবে। সে দিন মিথ্যাপন্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’’[33]

তাছাড়া আল্লাহ যখন পৃথিবী ধ্বংস করার জন্য ইসরাফিল আলাইহিস সালামকে নির্দেশ প্রদান করবেন তখন এর শব্দ এত বিকট ও প্রচণ্ড হবে যে, তার তীব্রতায় কান, ‎হৎপিণ্ড, কলিজ্বাসহ মানব শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ফেটে যাবে, মানুষ বেহুশ হয়ে পড়বে। আকাশ ফেটে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাবে। পাহাড়-পর্বত ধুনিত তুলার ন্যায় উৎক্ষিপ্ত হতে থাকবে। নক্ষত্ররাজি বিলুপ্ত হবে। চন্দ্রসূর্য জ্যোতিহীন হয়ে একত্রিত হবে। তখন পারবে কি সার্বভৌমত্বের দাবীদাররা রক্ষা করতে নিজেদেরকে?

মহান আল্লাহ বলেন:

﴿ فَإِذَا نُفِخَ فِي ٱلصُّورِ نَفۡخَةٞ وَٰحِدَةٞ ١٣ وَحُمِلَتِ ٱلۡأَرۡضُ وَٱلۡجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةٗ وَٰحِدَةٗ ١٤ فَيَوۡمَئِذٖ وَقَعَتِ ٱلۡوَاقِعَةُ ١٥ وَٱنشَقَّتِ ٱلسَّمَآءُ فَهِيَ يَوۡمَئِذٖ وَاهِيَةٞ ١٦ ﴾ [الحاقة: ١٣، ١٦]

‘‘অতঃপর যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে একটি ফুৎকার পর্বতমালাসহ পৃথিবী উৎক্ষিপ্ত হবে (তুলার ন্যায়)। একই ধাক্কায় এরা চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যাবে। সেদিন সংঘটিত হবে মহাপ্রলয়। আর আসমান বিদীর্ণ হয়ে যাবে ফলে সেদিন তা দুর্বল-বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। সুতরাং সে দিন হবে মহাভয়ঙ্কর।’’[34]

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:

﴿ فَإِذَا ٱلنُّجُومُ طُمِسَتۡ ٨ وَإِذَا ٱلسَّمَآءُ فُرِجَتۡ ٩ وَإِذَا ٱلۡجِبَالُ نُسِفَتۡ ١٠﴾ [المرسلات: ٨، ١0]

‘‘অতঃপর যখন তারকারাজী নিশ্চিহ্ন করা হবে, আকাশ-মণ্ডল খণ্ড-বিখণ্ড করা হবে এবং পর্বতমালা ধুলির ন্যায় উড়ে যাবে।’’[35]

এ মর্মে আল-কুরআনে আরো বর্ণনা এসেছে,

﴿ إِذَا ٱلسَّمَآءُ ٱنشَقَّتۡ ١ وَأَذِنَتۡ لِرَبِّهَا وَحُقَّتۡ ٢ وَإِذَا ٱلۡأَرۡضُ مُدَّتۡ ٣ وَأَلۡقَتۡ مَا فِيهَا وَتَخَلَّتۡ ٤ وَأَذِنَتۡ لِرَبِّهَا وَحُقَّتۡ ٥ ﴾ [الانشقاق: ١، ٥]

‘‘যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে ও তার পালনকর্তার আদেশ পালন করবে এবং আকাশ এরই উপযুক্ত। আর যখন পৃথিবীকে সম্প্রসারণ করা হবে এবং পৃথিবী তার ভূগর্ভস্থিত সবকিছু বাইরে নিক্ষেপ করবে ও শুন্যগর্ভ হয়ে যাবে এবং তার পালকর্তার আদেশ পালন করবে এবং পৃথিবী এরই উপযুক্ত।’’[36]

আরো ইরশাদ হয়েছে:

﴿ إِذَا ٱلسَّمَآءُ ٱنفَطَرَتۡ ١ وَإِذَا ٱلۡكَوَاكِبُ ٱنتَثَرَتۡ ٢ وَإِذَا ٱلۡبِحَارُ فُجِّرَتۡ ٣ وَإِذَا ٱلۡقُبُورُ بُعۡثِرَتۡ ٤ عَلِمَتۡ نَفۡسٞ مَّا قَدَّمَتۡ وَأَخَّرَتۡ ٥ ﴾ [الانفطار: ١، ٥]

‘‘যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে, যখন নক্ষত্রসমূহ ঝরে পড়বে, যখন সমুদ্রকে উত্তাল করে তোলা হবে এবং যখন কবরসমূহ উম্মোচিত হবে, তখন প্রত্যেকে জেনে নিবে সে কি অগ্রে প্রেরণ করেছে এবং কি পশ্চাতে ছেড়ে এসেছে।’’[37]

﴿ ٱلۡقَارِعَةُ ١ مَا ٱلۡقَارِعَةُ ٢ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا ٱلۡقَارِعَةُ ٣ يَوۡمَ يَكُونُ ٱلنَّاسُ كَٱلۡفَرَاشِ ٱلۡمَبۡثُوثِ ٤ وَتَكُونُ ٱلۡجِبَالُ كَٱلۡعِهۡنِ ٱلۡمَنفُوشِ ٥ ﴾ [القارعة: ١، ٥]

‘‘করাঘাতকারী (মহাপ্রলয়) করাঘাতকারী কি (মহাপ্রলয় কি) করাঘাতকারী (প্রলয়) সম্পর্কে আপনি জানেন কি? ‘‘সেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতংগের মত। আর পর্বতমালা হবে ধুলিত রঙ্গিন পশমের মত।’’[38]

﴿ إِذَا زُلۡزِلَتِ ٱلۡأَرۡضُ زِلۡزَالَهَا ١ وَأَخۡرَجَتِ ٱلۡأَرۡضُ أَثۡقَالَهَا ٢ وَقَالَ ٱلۡإِنسَٰنُ مَا لَهَا ٣ ﴾ [الزلزلة: ١، ٦]

‘‘যখন পৃথিবী তার কম্পনে প্রকম্পিত হবে, যখন সে তার বোঝা বের করে দিবে এবং মানুষ বলবে এর কি হল।’’[39]

আল্লাহ বলেন:

﴿ كُلُّ مَنۡ عَلَيۡهَا فَانٖ ٢٦ وَيَبۡقَىٰ وَجۡهُ رَبِّكَ ذُو ٱلۡجَلَٰلِ وَٱلۡإِكۡرَامِ ٢٧ ﴾ [الرحمن: ٢٦، ٢٧]

‘‘এ মহাবিশ্বে যা কিছু আছে সবই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, শুধু বাকি থাকবে তোমার সম্মানিত মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের চেহারাসহ সত্তা।’’[40]

চ. আইনের দৃষ্টিতেও সার্বভৌমত্ব আল্লাহর :

আইনগত সার্বভৌমত্ব তাঁরই স্বীকার করতে হবে, যার বাস্তব সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা ও অধিকার নিখিল বিশ্ব ও গোটা মানব জাতির উপর স্থাপিত হয়েছে। আর আইনকে যদি সার্বভৌমত্বের মুখপাত্র বলে বিবেচনা করা হয় এবং আইন যদি সার্বভৌম শক্তির নির্দেশ হয়, তবে এরূপ আইনদাতা হবার অধিকার এবং শক্তি কেবলমাত্র আল্লাহর-ই আছে। মোটকথা প্রভূত্ব-কর্তৃত্ব ও আধিপত্য ও মৌলিক আইন ও বিধান রচনা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এ বুনিয়াদী কার্যাবলী সম্পাদনের নিরংকুশ অধিকার একমাত্র আল্লাহর তা‘আলার। এ ব্যাপারে কেউ তাঁর শরীক নেই। সে আল্লাহ সর্বদশী, সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ ١٦٣ ﴾ [البقرة: ١٦٣]

‘‘আর তোমাদের ইলাহ তিনি একই সত্তা।’’[41]

﴿أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ ٥٤ ﴾ [الاعراف: ٥٤]

‘‘জেনে রাখ তাঁর কাজ সৃষ্টি করা এবং বিধান দেওয়া।’’[42]

﴿ ٓۚ إِنِ ٱلۡحُكۡمُ إِلَّا لِلَّهِۖ يَقُصُّ ٱلۡحَقَّۖ وَهُوَ خَيۡرُ ٱلۡفَٰصِلِينَ ٥٧ ﴾ [الانعام: ٥٧]

‘‘আল্লাহ ব্যতীত আর কারও নির্দিশ চলে না। তিনি সত্য বর্ণনা করেন এবং তিনি শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী।’’[43]

﴿أَلَا لَهُ ٱلۡحُكۡمُ وَهُوَ أَسۡرَعُ ٱلۡحَٰسِبِينَ ٦٢ ﴾ [الانعام: ٦٢]

‘‘তোমরা জেনে রাখো, সার্বভৌম কেবলমাত্র (সেই) আল্লাহরই, আর তিনি হচ্ছেন সর্বাধিক দ্রুত হিসেব গ্রহনকারী।’’[44]

﴿ ٓ أَنۡ أَنذِرُوٓاْ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱتَّقُونِ ٢ ﴾ [النحل: ٢]

‘‘(এ হেদায়েত সহকারে) লোকদেরকে সাবধান ও সর্তক করে দাও যে, নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং একমাত্র আমারই তাকওয়া অবলম্বন করো।’’[45]

﴿ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥ ﴾ [الانبياء: ٢٥]

‘‘অবশ্য আমি ছাড়া আর কোনই ইলাহ নেই। সুতরাং আমারই উপাসনা করো।’’[46]

﴿ إِنَّمَآ إِلَٰهُكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۚ وَسِعَ كُلَّ شَيۡءٍ عِلۡمٗا ٩٨ ﴾ [طه: ٩٨]

‘‘তোমাদের ইলাহ তো তিনিই যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি জ্ঞানে সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।’’[47]

﴿ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ لَهُ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ ٨ ﴾ [طه: ٨]

‘‘তিনি আল্লাহ যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, আর সর্বোত্তম গুণবাচক নামগুলি তারই।’’[48]

আল্লাহর এ-সুবিশাল প্রকৃতি রাজ্যে তাঁর প্রদত্ত আইন মেনে চলা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। অর্থাৎ সৃষ্টি জগতের সবাই তাঁর ইচ্ছার অধীন এবং এটাই আইন। এ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহ স্বাধীন ও সার্বভৌম। সুতরাং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ মানুষের আইন দাতা হতে পারে না। এ কারণে নতুন কোনো আইনের প্রণেতা এবং অনুসারী উভয়েই মহান আল্লাহর অবাধ্য এবং অপরাধী বলে গণ্য।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ ٤٤ ﴾ [المائ‍دة: ٤٤]

‘‘যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই কাফির।’’[49]

এই আয়াত থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা আইনগত সার্বভৌমত্ব স্বীকার করার নাম ঈমান ও ইসলাম এবং তা অস্বীকার করার নামই নিরেট কুফর।’’

ইসলাম পরিপূর্ণ ন্যায় বিচার ভিত্তিক জীবন বিধান। কারণ প্রথমত: পরিপূর্ণ ন্যায় বিচার কিসের দ্বারা ও কিভাবে হয়, সে কথা একমাত্র আল্লাহই নির্ভুলভাবে জানেন। দ্বিতীয়ত, তিনি যেহেতু সকল সৃষ্টির প্রতিপালক, মনিব ও প্রভু তাই সকলের সাথে ন্যায় বিচার করা কেবল তার পক্ষে সম্ভব। একমাত্র তার রচিত বিধানই প্রবৃত্তির খেয়ালখুশী আবেগ ঝোঁক ও দুর্বলতা থেকে মুক্ত থাকতে সক্ষম। এ বিধান অজ্ঞতা, ভূল-ত্রুটি বাড়াবাড়ি ও শৈথিল্য থেকে মুক্ত। পক্ষান্তরে প্রবৃত্তি কামনা-বাসনা ঝোঁক ভাবাবেগ ও দুর্বলতায় জর্জরিত মানুষ যে আইন ও বিধান রচনা করে, তাতে অজ্ঞতা ও অক্ষমতা জনিত ত্রুটি তো থাকবেই, অধিকন্তু প্রবৃত্তির খেয়ালখুশী, আবেগ, ঝোঁক ও দুর্বলতায় তা পরিপূর্ণ থাকবে, চাই আইন রচনাকারী কোনো ব্যক্তি শ্রেণি বা জাতি বা প্রজন্ম যেই হোক না কেন। তাই বিচার বিশ্লেষনে বুঝা যায় যাদের আইন ত্রুটি ও বিচ্যুতির উর্ধ্বে নয় তারা কখনো সার্বভৌমত্বের অধিকারী হতে পারে না, বরং আইনের দৃষ্টিকোণে আল্লাহ সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী। আল্লাহর শরীয়ত মানব জীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এ বিধান মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগকে তার যাবতীয় আকৃতি ও অবস্থা সহকারে সংগঠিত করে, উন্নত করে ও দিক নির্দেশনা দেয়। মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন,

﴿ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٤٧ ﴾ [المائ‍دة: ٤٧]

‘‘যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই ফাসিক।’’[50]

﴿ ۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ ٤٥ ﴾ [المائ‍دة: ٤٥]

‘‘যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই জালিম।’’৭৯

প্রভুত্ব-কর্তৃত্ব, আধিপত্য ও মৌলিক আইন ও বিধান রচনা রাষ্ট্র-ব্যবস্থার এ বুনিয়াদী-কার্যাবলী সম্পাদনের নিরংকুশ অধিকার একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। এ ব্যাপারে কেউ তাঁর শরীক নেই। সেই আল্লাহ সর্বদশী সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান। তাঁর কাছে কোনো মানুষের মনের গোপন রহস্য অজ্ঞাত নয়। বিচার দিনে তিনি মানুষের সকল কার্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হিসাব গ্রহন করবেন; তাঁর হিসাব গ্রহন থেকে কেউই রেহাই পাবে না। তাঁর শাস্তি-বিধান থেকে কোনো উকিল, মুখতার, বিচারক, পীর-মাওলানা (নেতা ও রাষ্ট্রপতি)ও মুক্তি পেতে বা দিতে পারে না। বরং সকলেই ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ জীবনব্যাপী কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে। উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে আল্লাহই সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী।

কারণ কোনো আইন তখনই কল্যাণকর হয় যখন আইন প্রণেতার মধ্যে দুটি মৌলিক উপাদান পাওয়া যায়:

(ক) পরিব্যাপ্ত জ্ঞানঃ

অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পরিব্যাপ্ত জ্ঞান। একই সাথে তাকে মানুষের সাধারণ স্বভাব ও প্রকৃতিগত বিশেষত্ব ও ভাবধারা সর্ম্পকে জানতে হবে। তাকে ওয়াকিফহাল হতে হবে মানব প্রকৃতি নিহিত নিগূঢ় তত্ত্ব ও সূক্ষ্ম প্রবণতা সম্পর্কে, মানুষের মনস্তাত্তিক ও সমাজতাত্ত্বিক জ্ঞান তথা ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয় সম্পর্কিত তত্ত্বজ্ঞান থাকতে হবে তার নখদর্পণে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কেউ এ জ্ঞানের অধিকারী হতে পারে না। কারণ আল্লাহই হচ্ছেন এ বিশ্বলোকের প্রতিটি অনু-পরমানুর সৃষ্টিকর্তা। এর অংশসমূহ তিনিই সংমিশ্রিত ও সংযুক্ত করে এক একটি বস্তুসত্ত্বার অস্তিত্ব গড়ে তুলেছেন। ফলে তিনি তাঁর সৃষ্টি নিহিত নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে একমাত্র ওয়াকিফহাল সত্তা। মানুষের জন্য প্রকৃত কল্যাণ কিসে, আর কিসে রয়েছে অকল্যাণ ইহকাল-পরকালের দৃষ্টিতে, তা একমাত্র তিনি ছাড়া আর কারোরই জানা থাকতে পারে না। অতএব, মানুষের জন্য যথার্থ আইন-বিধান রচনা করাও কেবলমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তাই সার্বভৌমত্ব একমাত্র তারই মৌলিক আকিদার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ أَلَا يَعۡلَمُ مَنۡ خَلَقَ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلۡخَبِيرُ ١٤ ﴾ [الملك: ١٤]

‘‘যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি কি করে জানবেন না? তিনি তো সুক্ষ্মজ্ঞানী, সম্যকজ্ঞাত।’’[51]

(খ) আত্মস্বার্থ চেতনামুক্ত হওয়া:

তাকে হতে হবে প্রকৃতপক্ষেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সকল ব্যক্তিগত খাহেশ, ঝোঁক প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কারণ স্বার্থ চেতনা নিরপেক্ষ আইন-বিধান রচনার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তার সুবিচার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কিন্তু মানুয যতই ন্যায়বাদী ও সুবিচারক হোক না কেন, তার পক্ষে আত্মস্বার্থ চিন্তা ও নিজস্ব ঝোঁক-প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া কখনই সম্ভব নয়। তাই কোনো মানুষের পক্ষেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সুবিচারবাদী আইন রচনা করাও সম্পূর্ণ অসম্ভব। বরং এ শর্ত কেবলমাত্র আল্লাহর মধ্যেই পাওয়া যেতে পারে। কেননা সর্ব প্রকার আত্মস্বার্থ চিন্তা ও নিজস্ব ঝোঁক প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র হচ্ছেন কেবলমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। মানুষের মধ্যে তাঁর কোনো স্বার্থ চিন্তা থাকতে পারে। নির্বিশেষে সকল মানুষ একমাত্র তাঁরই সৃষ্টি। তিনি সকলেরই নির্বিশেষে একমাত্র স্রষ্টা ও মা‘বুদ। অতএ্রব এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, উপরোক্ত দুটি গুণের নিরংকুশ অধিকারী কোনো মানুষ এ দুনিয়ার পাওয়া যেতে পারে না। এ দুটি গুণের পূর্ণমাত্রার অধিকারী হতে পারেন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তিনি সর্ব প্রকার অধীনতা ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত। তাঁর স্বাধীনতা অবাধ। তাঁর উপর নেই কোনো প্রকার বাধ্যবাধকতা কারো নিকট তিনি দায়ী নন। কারো নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য নন তিনি। তিনি চিরঞ্জীব,অক্ষয় ও শাশ্বত। কাজেই সার্বভৌমত্ব তাঁরই।

মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ لَا يُسۡ‍َٔلُ عَمَّا يَفۡعَلُ وَهُمۡ يُسۡ‍َٔلُونَ ٢٣ ﴾ [الانبياء: ٢٣]

‘‘তিনি যা করেন, তৎসম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে।’’[52]

এমনকি আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞান প্রদত্ত সংজ্ঞানুযায়ীও সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী হতে পারেন আল্লাহ তা‘আলা। তার মধ্যে Bodin এর সংজ্ঞাটা স্মরণ করতে পারি। তিনি বলেন, A perpetual, humanly unlimited and unconditional right to make, interpret and execut law অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব হচ্ছে, আইন প্রণয়ন, ব্যাখ্যাদান এবং কার্যকরণের চিরস্থায়ী মানবীয় অসীমাবদ্ধ এবং নিঃর্শত অধিকার।

তাঁর মতে প্রত্যেক সুসংবদ্ধ রাষ্ট্রের জন্য এরূপ একটি শক্তির অস্তিত্ব একান্তভাবে প্রয়োজন। সার্বভৌমত্বের এসব শর্ত আল্লাহ ছাড়া আর কারো মধ্যে পাওয়া কি আদৌ সম্ভব? তবে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ তা করতে পারে আল্লাহর আইনের পূর্ণ প্রয়োগের মাধ্যমে।

ছ. রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর :

এ পৃথিবীতে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব বা (political Sovereignty) একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। কারণ আল্লাহ তা‘আলার আইনগত সার্বভৌমত্ব মানব সমাজে যে প্রতিষ্ঠানই রাজনৈতিক শক্তি বলে কার্যকর করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হবে, আইন ও রাজনীতির পরিভাষা তাকে কখনো সার্বভৌমত্বের মালিক বলা যায় না। যে শক্তির আইনগত সার্বভৌমত্ব নেই, যার ক্ষমতা ও এখতিয়ার এক উচ্চতর আইন আগে থেকে সীমিত ও অনুগত বানিয়ে দিয়েছে এবং যার পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা তার নেই সে কখনো সার্বভৌমত্বের ধারক হতে পারে না। বরং এ প্রতিষ্ঠানকে আল-কুরআনের ভাষায় খিলাফত নামে অভিহিত করা হয়। অর্থাৎ এ প্রতিষ্ঠান স্বয়ং একচ্ছত্র শাসক নয় বরং একচ্ছত্র শাসকের প্রতিনিধি মাত্র। সুতরাং সর্বশেষ এ কথাই প্রমাণিত হয় রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব একমাত্র মহান রাব্বুল ‘আলামিনের।

জ. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অসীম ও অনন্ত:

মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অনন্ত ও অসীম। এর কোনো লয় নেই, নেই কোনো পরিবর্তন। সুতরাং সঙ্গত কারণেই এতে কোনো দ্বিতীয় সত্তার অস্তিত্ব বা অংশীদারিত্ব নেই। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব শুধু এ পৃথিবীতে সীমাবদ্ধ নয়, পারলৌকিক জীবন ও জগতে তিনি একচ্ছত্র সার্বভৌমত্বের মালিক। প্রকৃতপক্ষে তিনি হচ্ছেন তাঁর সৃষ্টির সবকিছুর উপর একচ্ছত্র মালিকানার অধিকারী এতে কারো একবিন্দু পরিমাণও অংশ নেই। এটা বন্য পশুরা না বুঝলেও আল্লাহর সৃষ্টি বুদ্ধিমান জীব হিসেবে কমপক্ষে আমাদের বুঝা উচিত। এ সম্পর্কে কুরআনে এসেছে,

﴿ ٱلۡمُلۡكُ يَوۡمَئِذٖ لِّلَّهِ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡۚ فَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ فِي جَنَّٰتِ ٱلنَّعِيمِ ٥٦ ﴾ [الحج: ٥٦]

‘‘সার্বভৌমত্ব সে দিন আল্লাহরই; তিনি তাদের বিচার করবেন। অতএব, যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তারা নিয়ামতপূর্ণ কাননে থাকবে।’’[53]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ٱلۡمُلۡكُ يَوۡمَئِذٍ ٱلۡحَقُّ لِلرَّحۡمَٰنِۚ وَكَانَ يَوۡمًا عَلَى ٱلۡكَٰفِرِينَ عَسِيرٗا ٢٦ ﴾ [الفرقان: ٢٥]

‘‘সে দিন (কিয়ামতের দিন মানুষ স্পষ্ট বুঝতে পারবে যে,) বাদশাহী কেবল মাত্র রহমানের-ই। আর তা (কিয়ামত) অমান্যকারীদের জন্য বড় কঠিন দিন হবে।[54]

মহান আল্লাহ আরও বলেন:

﴿ مَٰلِكِ يَوۡمِ ٱلدِّينِ ٤ ﴾ [الفاتحة: ٤]

‘‘বিচারের দিনের মালিক।’’[55]

আরও বলেন,

﴿ إِنَّا نَحۡنُ نَرِثُ ٱلۡأَرۡضَ وَمَنۡ عَلَيۡهَا وَإِلَيۡنَا يُرۡجَعُونَ ٤٠ ﴾ [مريم: ٤٠]

‘‘নিশ্চয় আমরাই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী হব, পৃথিবীর এবং তার উপর যারা আছে তাদের এবং আমাদেরই কাছে তারা প্রত্যাবর্তিত হবে।’’[56]

ঝ. একচ্ছত্র সার্বভৌমত্ব আল্লাহর

সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। তাঁর উচ্চতর প্রভুত্ব একচ্ছত্র মালিকানা এবং নিরংকুশ শাসন-ক্ষমতা এ উভয় দিক দিয়েই অখণ্ড, অবিভাজ্য। কোনো ব্যক্তি মানুষ, পার্লামেন্ট বা কোনো রাজশক্তি এ দিক দিয়ে তার অংশীদার হতে পারে না। সুতরাং তিনি গোটা বিশ্ব সাম্রাজ্যের অধিপতি, তার ওপর পরাক্রান্ত, তার উপর সঠিক ক্ষমতার অধিকারী। তাঁকে কোনো কিছুই অক্ষম ও উপায়হীন করে দেয় না। তাঁর উর্ধ্বে কেউ উঠতে পারে না, তাঁর ইচ্ছাকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না বা সীমাবদ্ধও করতে পারে না। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, যা চান তাই করেন। তিনি যা চান তা করতে সক্ষম, নিজের উপর তাঁর কর্তৃত্ব সর্বোচ্চ ও সর্বজয়ী, বিস্ময়কর এ সাত আসমান তাঁর সার্বভৌমত্বের স্বরূপ, তিনি সাত আসমানকে স্তরে স্তরে সুসজ্জিত করেছেন। তাছাড়া সৃষ্টি দেখে স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব উপলব্ধি করা যায়, বিশ্বজগতের সৃষ্টিতে পূর্ণতা যেমন কাম্য, তেমনি কাম্য সৌন্দর্যও। বরং এ দুটো আসলে একই জিনিসের এপিঠ ও ওপিঠ মাত্র। কেননা পূর্ণতা যখন শেষ সীমায় উপনীত হয়, তখন তা সৌন্দর্যে পরিণত হয়। বিশ্ব সাম্রাজের ওপর তার যে সর্বময় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিরাজমান, সব কিছুর ওপর যে তার সীমাহীন অধিকার ও ক্ষমতা এবং তার ইচ্ছা যে বাধা-বন্ধনহীন এগুলো তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রমাণ।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ تَبَٰرَكَ ٱلَّذِي بِيَدِهِ ٱلۡمُلۡكُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ ١ ﴾ [الملك: ١]

‘‘(কতো) মহীয়ান সে পূণ্যময় সত্তা! যার হাতে (রয়েছে) আসমান যমীনের যাবতীয় সার্বভৌমত্ব (এ সৃষ্টি জগতের) সব কিছুর ওপর তিনি একক ক্ষমতাবান।’’[57]

এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তাফসীরবিদগণ বলেন,

‘‘সমস্ত মাখলুকের উপর তাঁরই আধিপত্য রয়েছে, তিনি যা চান তাই করেন। তাঁর হুকুমকে কেউ টলাতে পারে না। তাঁর শক্তি হিকমত এবং ন্যায়পরায়ণতার কারণে কেউ তাঁর কাছে কোনো কৈফিয়ত তলব করতে পারে না। তিনি সবকিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। সুতরাং সার্বভৌমত্বের অধিকারী একমাত্র তিনিই।’’

এ আয়াতের ‘তাবারাক’ শব্দটি ‘বরকত’ শব্দ হতে গৃহীত। শব্দ গঠনের বিশেষ ভঙ্গির দরুন তাতে বিপুলতার অর্থ শামিল রয়েছে। উচ্চতা, বিরাটত্ব, বিপুলতা, প্রাচুর্য, স্থিতিশীলতা, শব্দ গঠনের ফলে অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহ তা‘আলা আসাধারণ মহান ও বিরাট।

‘‘আর ‘আল-মুলকু’ শব্দটি সীমাবদ্ধ অর্থে এখানে ব্যবহৃত হয় নি। তার প্রকৃত অর্থ সমগ্র সৃষ্টিলোকের ও বিশ্বনিখিলের উপর রাজকীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব। তা ছাড়া এখানে এর অন্য কোনো অর্থ উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহর হস্ত তাঁর একটি বিশেষ গুণ। এর দ্বারা তার হাত সাব্যস্ত হচ্ছে, সাথে সাথে এটা রাজকীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরংকুশ কর্তৃত্বও বুঝাচ্ছে। এ শব্দটির দ্বারা সবকিছু আল্লাহর হাতের অধীন, তার কর্তৃত্ব ও আয়ত্তাধীন হওয়া বুঝাতে পারে।’’৮৮

‘আল-মুলকু’ আক্ষরিক অর্থে এর অর্থ দাঁড়ায়, রাজার শাসন (Kingship) সার্বভৌমত্ব, মালিকানা কিংবা কর্তৃত্ব।

ইসলামে সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো রাজা কিংবা শ্রেণী অথবা সাধারণভাবে জনগনের উপর ন্যস্ত নয়। ‘আল্লাহই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। এ কথা এখানে মুলুক দ্বারা উদ্দেশ্য।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ فَسُبۡحَٰنَ ٱلَّذِي بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيۡءٖ وَإِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ ٨٣ ﴾ [يس: ٨٣]

‘‘মহান পবিত্র সেই সত্তা, যাঁর হাতে সবকিছুরই সার্বভৌমত্ব নিহিত।’’[58]

অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَكَذَٰلِكَ نُرِيٓ إِبۡرَٰهِيمَ مَلَكُوتَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ ٧٥ ﴾ [الانعام: ٧٥

‘‘এভাবেই আমরা ইবরাহীমকে আকাশ রাজ্য ও ভূ-মণ্ডলের ওপর প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌমত্বের বিষ্ময়কর দৃশ্যসমূহ দেখিয়েছি।’’৯১

ঞ. দৈনন্দিক দোয়াতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ব্যাপৃত :-

আসমান-জমিনের বাদশাহী কেবলমাত্র এক আল্লাহ আর প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব (Soverignty) সমগ্র শক্তি ও ক্ষমতা সেই এক আল্লাহর সত্তায়ই নিহিত, তারই জন্য রক্ষিত। এ প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্বের মধ্যে যে ব্যক্তি বা জনসমষ্টি নিজের বা অপর কারো আংশিক বা সামগ্রিক প্রভুত্ব/সার্বভৌমত্ব দাবি করবে সে একান্তভাবে গভীর প্রতারণায় নিমজ্জিত হবে। কারণ আমরা যখন প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে প্রর্থানা করি তখন তার কাছে তার সার্বভৌমত্বের কথা স্বীকার করি কায়ামনোবাক্যে।

আসমান ও জমিনের আল্লাহ আলাদা-আলাদা নয়, দুইজন নয়, সমগ্র সৃষ্টিলোকের আল্লাহ একজন মাত্র। আল্লাহর প্রভুত্ব ও কর্তৃত্বের ব্যাপারে কেউ তার শরীক নেই। তার মধ্যে কারো ইলাহ হওয়ার গুণ স্থানান্তরিত হওয়া কিংবা ইলাহী ক্ষমতা ইখতিয়ারের ধারক হওয়া একেবারে অসম্ভব।

বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বেলায় আল্লাহর কাছে যেভাবে প্রার্থনা করতেন এগুলো থেকেও প্রমাণিত হয় সার্বভৌমত্ব আল্লাহর ব্যতীত কারো জন্য নয়। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন,

اللهم لك الحمد أنت نور السماوات والارض ولك الحمد أنت قيم السماوات والارض ولك الحمد أنت رب السماوات والارض ومن فيهن أنت الحق وقولك الحق ووعدك الحق ولقاؤك الحق والجنة حق والنار حق والنبيون حق والساعة حق اللهم لك أسلمت وبك آمنت وعليك توكلت وإليك أنبت وبك خاصمت وإليك حاكمت فاغفر لي ما قدمت وما أخرت وما أسررت وما أعلنت أنت الله لا إله إلا أنت

‘‘হে আল্লাহ সব প্রশংসা তোমারই। তুমি আসমানসমূহ ও যমিনের মালিক রব। সব প্রশংসা তোমারই। তুমি আসমানসমূহ ও এবং যমীন ও এর মধ্যকার সব কিছুর ব্যবস্থাপক। আসমানসমূহ ও যমীনের নূর, তোমার বাণী সত্য, তোমার ওয়াদা সত্য। তোমার সাক্ষাৎ লাভের বিষয় সত্য। জান্নাত সত্য। জাহান্নাম সত্য, কিয়ামত সত্য। নবীগণ সত্য, কিয়ামত সত্য, হে আল্লাহ তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করছি। তোমার কাছে ফিরে এসেছি। তোমার উদ্দেশ্য ঝগড়া করেছি এবং বিবদমান বিষয়ে তোমার কাছে ফায়সালা চেয়েছি। তুমি আমার অতীত ও ভবিষ্যতের প্রকাশ্য ও গোপন সব গুণাহ মাফ করে দাও। তুমি আমার ইলাহ। তুমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।’’[59]

অন্য হাদীসে এসেছে, ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,

كنا نصلي خلف النبي صلى الله عليه و سلم فنقول السلام على الله فقال النبي صلى الله عليه و سلم ( إن الله هو السلام ولكن قولوا التحيات لله والصلوات والطيبات السلام عليك أيها النبي ورحمة الله وبركاته السلام علينا وعلى عباد الله الصالحين أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمدا عبده ورسوله )

‘‘আমরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে নামাজ পড়ার সময় বলতাম, আল্লাহর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। একথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তো নিজেই শান্তি। তাই তোমরা (এ কথা না বলে) বরং বলো আমাদের সব সালাম ও শিষ্টতা আমাদের সব সালাত এবং সব রকমের পবিত্রতা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্য নিবেদিত। হে নবী আপনার প্রতি সালাম, আপনার ওপর আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ বর্ষিত হোক। আমাদের ওপরও আল্লাহর নেক বান্দাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।’’[60]

মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পবিত্র যবানিতে পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেছেন আল্লাহই সার্বভৌমত্বের মালিক।

عن ابى هريرة : عن النبي صلى الله عليه و سلم قال ( يقبض الله الأرض ويطوي السماء بيمينه ثم يقول أنا الملك أين ملوك الأرض )

‘‘আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীকে তাঁর মুষ্ঠিতে ধারণ করবেন এবং আসমানকে হাতে জড়িয়ে ধরে বলবেন, (আমি সর্বশক্তি ও সার্বভৌম) বাদশাহ। পৃথিবীর বাদশাহরা (আজ) কোথায়?’’[61]

 

ত. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অমুখাপেক্ষী

যদি আকাশমণ্ডলী এবং পৃথিবীর বহু ইলাহ থাকত তাহলে ক্ষমতার দ্বন্দে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতো, তাই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অমুখাপেক্ষী। কারণ যাকে এ পৃথিবীতে সার্বভৌমত্বের মালিক বলে মনে করা হয়, পরীক্ষা করলে দেখা যায়, তার বাহ্যিক নিরংকুশ কর্তৃত্বের অন্তরালে প্রচ্ছন্নভাবে আরো কতকগুলো শক্তি বিদ্যমান আছে যাদের হাতে তার কর্তৃত্বের চাবিকাঠি নিহিত। এমনকি তার ক্ষমতা ও এখতিয়ার মূল্যায়ণ করলে পরিস্কার বুঝা যায় যে, কতো দিক দিয়েই না সে বাধাগ্রস্ত এবং কতোভাবেই না অসংখ্য বহিঃশক্তি তার ইচ্ছা ও মর্জির বিরুদ্ধে তাকে সীমাবদ্ধ করে রাখছে, তাকে অক্ষম করে দিচ্ছে।

একটু গভীরে আমরা চিন্তা করলে দেখতে পাই, আল্লাহ তা‘আলা যে অমুখাপেক্ষী তার প্রমাণ বিভিন্ন দেশে আছে। আল্লাহ তার প্রাকৃতিক সম্পদ ছড়িয়ে রেখেছেন পৃথিবীর সর্বত্র একটা নিদিষ্ট পরিমাণ মতো। যেমন বাংলাদেশকে আল্লাহ দিয়েছেন কৃষি সম্পদ, খনিজ ও গ্যাস সম্পদ। তেমনি আরব দেশকে কৃষি সম্পদ দেননি বলেই তাদের কে তেল সম্পদে সমৃদ্ধশীল করে গড়ে তুলেছেন। তাছাড়া চীন, জাপান, ভারত, সাইবেরিয়া ও কোরিয়াকে আল্লাহ দিয়েছেন লৌহ ও কয়লা সম্পদ, কুয়েত, সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, সাইবেরিয়া, বার্মা, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও পাকিস্থানকে আল্লাহ দিয়েছেন কিছু কম-বেশী করে খনিজ তেল সম্পদ। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, র্বামা ও ইন্দোচীনকে আল্লাহ দিয়েছেন টিন সম্পদ। সাইবেরিয়া, কোরিয়া ও ফিলিপাইনের আল্লাহ দিয়েছেন স্বর্ণ সম্পদ। তেমনি জাপান, র্বামা ও ইন্দোনেশিয়াকে আল্লাহ কিছু রৌপ্য সম্পদ দিয়েছেন। এছাড়াও বিভিন্ন দেশকে বিভিন্ন সম্পদ দিয়ে আল্লাহ সম্পদের একটা ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। অথচ তিনি কারো কাছে মুখাপেক্ষী নয়। এমনিভাবে দেখা যায় ঋতুর পরিবর্তনের আলোকে বিভিন্ন দেশের নানানজাতের ফল-মুলের ব্যবস্থা তিনি করেছেন। মানুষ যারা সর্বভৌমত্বের দাবিদার তাদের ক্ষমতা ভাগ ভাগ করে কাউকে কাউকে কিছু দেওয়া হয়, যেমন, মন্ত্রীপরিষদ মন্ত্রীপরিষদের, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আছে, এক একজন একেক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, এ সকল মন্ত্রীগণ তাদের কার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য অত্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবের উপর অনেকাংশ নির্ভরশীল। আর সচিব অত্র মন্ত্রণালয়ের উধর্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নিম্ন কর্মচারীর উপর নির্ভরশীল। তেমনিভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রে, বিভিন্ন ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠিত, যেমন রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার। যা আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের ক্ষমতা পৃথকীকরণের উপর প্রতিষ্ঠিত। মন্ত্রী পরিষদ শাসিত সরকার। যা আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের ক্ষমতার মিলনের উপর প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের মন্ত্রীপরিষদ শাসিত সরকারের, তাদের কার্যাবলীর জন্য ভিন্নরূপে তাদের কার্যের জন্য জবাবদিহি করতে হয়। মন্ত্রীপরিষদ সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী ও বিভিন্ন বিভাগের উপর কিছু ক্ষমতা থাকে তাদের তরফ থেকে কোনো সুপারিশ আসলে তা ন্যায় হোক বা অন্যায় হোক একেবারে উপেক্ষা করা যায় না এবং দেশের প্রেসিডেন্ট কোনো কিছু করতে গেলেও মন্ত্রী পরিষদের সমর্থন ছাড়া কিছু করতে পারে না। কারণ তাদেরও কিছু ক্ষমতা থেকে যায়। তাই বুঝা যায় প্রত্যেকটি বিভাগ একে অপরের মুখাপেক্ষী। যারা দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ হয়ে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিকানা দাবি করে, তারাতো ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রের মধ্যে কোথাও তার বিরুদ্বে কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে কিনা তা দেখার ও খোঁজ-খবর নেয়ার উদ্দেশ্যে একটা গোয়েন্দা বিভাগ রাখেন। তাদের যথাসময়ে খবরাখবর পৌঁছানোর উপর রাষ্ট্রের ও রাষ্ট্রপতির স্থায়িত্বের উপর নির্ভর করে। এ ব্যাপারে মানুষ রাষ্ট্রপতিগণ (যারা সার্বভৌম ক্ষমতা দাবিদার) কোনো প্রকারেই পরনির্ভরশীল না হয়ে পারেন না। মানুষ রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ খবর রাখবেন এটা মানুষের জন্য একচুল পরিমাণও সম্ভব নয়। কিন্তু আল্লাহ তো সবকিছুই জানেন। এ ব্যাপারে মানুষ সম্পূর্ণই অযোগ্য। সুতরাং কি করে মানুষ সর্বভৌমত্বের মালিক হতে পারে? তাই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অমুখাপেক্ষী, মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

﴿ذَٰلِكُمُ ٱللَّهُ رَبُّكُمۡ لَهُ ٱلۡمُلۡكُۚ وَٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ مَا يَمۡلِكُونَ مِن قِطۡمِيرٍ ١٣ ﴾ [فاطر: ١٣]

‘‘ইনি আল্লাহ, তোমাদের পালনকর্তা, সাম্রাজ্য তাঁরই। তাঁর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা তুচ্ছ খেজুর আঁটির অধিকারীও নয়।’’[62]

আরও বলেন,

﴿ ٱلَّذِي لَهُۥ مُلۡكُ السمٰوَٰتِ والأَرۡضِ وَلَمۡ يَتَّخِذۡ وَلَدٗا وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ شَرِيكٞ فِي ٱلۡمُلۡكِ وَخَلَقَ كُلَّ شَيۡءٖ فَقَدَّرَهُۥ تَقۡدِيرٗا ٢ ﴾ [الفرقان: ٢]

‘‘তিনি হলেন এমন সত্তা, যাঁর রয়েছে নভোমণ্ডল ও ভূ মণ্ডলের রাজত্ব। তিনি কোনো সন্তান গ্রহন করেন নি। রাজত্বে তাঁর কোনো অংশীদার নেই। তিনি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে শোধিত করেছেন পরিমিতভাবে।’’ [63]

মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব যে অমুখাপেক্ষী তা তার গুণবাচক নামগুলোর মাধ্যমেও তা বুঝা যায়, মহান আল্লাহর গুণ সীমাহীন। এখানে আল্লাহর কয়েকটি গুণবাচক নামের অর্থ বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। আর-রাহমান, আর-রাজ্জাক, আল-কাহহার এ কয়েকটি গুণবাচক নামের কথাই ধরা যাক।

এদের সবগুলোই সক্রিয় মূলনীতি হিসেবে ক্রিয়াশীল। আর-রাহমান পূর্বাহ্নেই সমস্ত জীবের চাহিদা জানেন এবং তাদের অস্তিত্বের জন্য আবশ্যকীয় সবকিছু শ্রমনিরপেক্ষ দান হিসেবে যোগাতে থাকেন। দোষ- গুণ নির্বিশেষে এ সব বিনামূল্যের উপহার বিশ্বজনীন। জীবের কাছ থেকে বিনিময়ে কোনো কিছু পাওয়ার আশা না করেই এ অবদান সরবরাহ হয়। সৌরতাপ, পানি, আর বাতাস যে কোনো জীবের জীবনধারনের জন্য অপরিহার্য এবং কোনো রকম বিনিময়ের প্রত্যাশা না করেই বিনা মূল্যের উপহারস্বরূপ এগুলো বিতরণ করেন। পূর্বাহ্নে শিশুর চাহিদা বুঝতে পেরে মায়ের বুকে দুধ সঞ্চিত রাখেন। আর-রাজ্জাক সব জীবের রুযী যোগান। প্রকৃতিতে সব জীবের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও খাদ্যোপকরণ বিদ্যমান। আল-কাহ্হার ও আল-জাববার নতি স্বীকার করতে বাধ্য করে।

পৃথিবীর চিরাচরিত নিয়মে দেখা যায়, মানুষ বিনিময় বা স্বার্থ ছাড়া কোনো কাজ করে না, তাহলে মানুষ কিভাবে সার্বভৌমত্বের মালিক হতে পারে? সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা সার্বভৌমত্বের মালিক। তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না।

থ. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও মানুষের তাকদীর লিখন

মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, আর সৃষ্টি করেছেন তিনি সবকিছুকে, তারপর সবকিছুর তাকদীরও তিনি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি সব কিছুকে সৃষ্টি করেছেন তারপর সর্বকিছুর তাকদীর তিনিই ঠিক করে দিয়েছেন। তিনিই সব কিছুর আকৃতি-প্রকৃতিকে নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং এ মহা সৃষ্টির বুকে কার সাথে কি সম্পর্ক প্রয়োজন তাও তিনিই নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

এই মহাবিশ্বের গঠন প্রণালী এবং এর মধ্যস্থিত সব কিছুর আকৃতি প্রকৃতির দিকে তাকালে একেবারেই দিশেহারা হয়ে যেতে হয়। সকল প্রতিরোধ ক্ষমতা বিলুপ্ত হয় এবং কোনো বুদ্ধিই আর তখন কাজ করতে চায় না।

এ সময়ে মানুষের কাছে তাকদীরের লিখন যে কতো সত্য এবং কোনো অবস্থাতেই যে তাকদীরের সিদ্ধান্ত এড়ানো যায় না, এ কথাটি স্পষ্ট হয়ে যায়।

মানুষ চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু কিছুতেই সে জোর করে বলতে পারে না যে অমুক সময়ের মধ্যে অবশ্যই সে অমুক কাজটি করবে। সৃষ্টির রহস্যরাজির মধ্যে অবশ্যই এটা একটা বড় রহস্য। যতবেশী মানুষ তার জ্ঞান বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে থাকে ততো বেশী তার সামনে সৃষ্টি রহস্যের জট একে একে খুলতে থাকে এবং সেই বুঝতে পারে সকলের সৃষ্টিকর্তা এক। এমনকি আল্লাহই সার্বভৌমত্বের অধিকারী অন্য কেউ নয়। যারা নিজেরা সার্বভৌমত্বের দাবীদার তাঁরাও নিজের ভাগ্য সর্ম্পকে অজ্ঞ। আসমান যমীনের সবখানেই রয়েছে তাঁর নিরংকুশ ক্ষমতা, রয়েছে মালিকানার ক্ষমতা কর্তৃত্ব করার শক্তি সাহস, ব্যয় ও ব্যবস্থা নির্মানের অধিকার এবং যে কোনো বিষয়কে পরিবর্তন করার সার্বিক এখতিয়ার একমাত্র তাঁরই রয়েছে।

তাঁর মালিকানা সারা বিশ্বব্যাপী পরিব্যপ্ত, তাঁর যুক্তিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা সবখানে বিরাজিত এবং সব কিছুই পূর্ব পরিকল্পিত ও পূর্ব নির্ধারিত। আল্লাহ রাববুল আলামিনের একত্ব ও একচ্ছত্র আধিপত্য নিরংকুশ তা প্রশ্নাতীত। মানুষের ভাগ্য লিখনেও প্রমাণ করে সার্বভৌমত্ব শুধু মহান আল্লাহর।

 

দ.জীবন ও মরণে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব

আল্লাহ তা‘আলা এক চিরঞ্জীব পরাক্রমশালী সত্তা, এ বিশ্ব ভূমণ্ডলের ও নভোমণ্ডলের সব কিছুতে তার কর্তৃত্ব রয়েছে, সব কিছুতে তিনি এক ইলাহ। এমনকি জীবন-মরণের ক্ষেত্রেও তিনি এক ইলাহ (সার্বভৌমত্বের অধিকারী) জীবন ও মরণের ক্ষেত্রে তাঁর সার্বভৌমত্বের কাছে সকল শক্তি মাথা নোয়াতে বাধ্য।

আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন :

﴿ إِنَّ ٱللَّهَ لَهُۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ يُحۡيِۦ وَيُمِيتُۚ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ مِن وَلِيّٖ وَلَا نَصِيرٖ ١١٦ ﴾ [التوبة: ١١٦]

‘‘নিশ্চয় আল্লাহরই জন্য আসমানসমূহ ও যমীনের সাম্রাজ্য। তিনি জিন্দা করেন ও মৃত্যু ঘটান, আর আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের জন্য কোনো সহায়ও নেই কোনো সাহায্যকারীও নেই।’’[64]

মৃত্য ঠিক সেভাবে সত্য যেভাবে জীবনের আগমন সত্য। আর এ জীবন, মৃত্যু ঘটানোর মালিক এক আল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَإِنَّا لَنَحۡنُ نُحۡيِۦ وَنُمِيتُ وَنَحۡنُ ٱلۡوَٰرِثُونَ ٢٣ ﴾ [الحجر: ٢٣]

‘‘নিশ্চয় আমরা জীবন দান করি, মৃত্যু দান করি এবং আমরা চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী।’’[65]

﴿ أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِي حَآجَّ إِبۡرَٰهِ‍ۧمَ فِي رَبِّهِۦٓ أَنۡ ءَاتَىٰهُ ٱللَّهُ ٱلۡمُلۡكَ إِذۡ قَالَ إِبۡرَٰهِ‍ۧمُ رَبِّيَ ٱلَّذِي يُحۡيِۦ وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا۠ أُحۡيِۦ وَأُمِيتُۖ قَالَ إِبۡرَٰهِ‍ۧمُ فَإِنَّ ٱللَّهَ يَأۡتِي بِٱلشَّمۡسِ مِنَ ٱلۡمَشۡرِقِ فَأۡتِ بِهَا مِنَ ٱلۡمَغۡرِبِ فَبُهِتَ ٱلَّذِي كَفَرَۗ وَٱللَّهُ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ ٢٥٨ ﴾ [البقرة: ٢٥٨]

‘‘তুমি কি সে ব্যক্তির অবস্থা দেখনি যে ব্যক্তিকে আল্লাহ (দুনিয়ার) রাষ্ট্র ক্ষমতা দেয়ার পর সে তাঁর সাথে স্বয়ং মালিকের ব্যাপারেই বিতর্কে লিপ্ত হলো, (বির্তকের এক পর্যায়ে) ইবরাহীম বললো, আমার মালিক তিনি, যিনি (সৃষ্টিকুলের) জীবন মৃত্যু নির্ধারণ করেন। সে বললো জীবন মৃত্যু তো আমিও দিতে পারি, ইবরাহীম বললো (আমার) আল্লাহ তা‘আলা পূর্ব দিক থেকে (প্রতিদিন সূর্যের উদয়ন ঘটান একবার) তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে বের করে দেখাও তো! (এতে সত্য) অস্বীকারকারী ব্যক্তিটি হতভম্ব হয়ে গেলো (আসলে) আল্লাহ তা‘আলা যালেম জাতিকে কখনো পথের দিশা দেন না।’’[66]

কোনো কোনো মুফাসসির বলেন, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সাথে বিতর্করত এ বাদশাহ আসলে আল্লাহর অস্তিত্বের অস্বীকারকারী ছিলো না; কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এক আল্লাহকে সব ক্ষমতার মালিক বলে সে মানতে নারায ছিলো। মানুষের প্রতিপালন ও সবকিছুর ওপর একমাত্র তাঁর ক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনাই চলছে একথা সে স্বীকার করত। আজও অনেক হঠকারী নাদান আছে যারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা বলে মানে সত্য, কিন্তু তাঁর সাথে কিছু অংশীদার বানায়, তাদের সাথে আল্লাহর ক্ষমতা ভাগাভাগি করে। শাসন ক্ষমতায় এবং প্রতিপালনের ব্যাপারে আল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্যকেও মানতে নারাজ। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমতা দেওয়ার পরও সে অহংকারবশত তা করেছে। তাই আজকের দিনেও কেউ যদি এমন করে বুঝতে চায় মূলত সে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে।

[1] সূরা আল আরাফ:৫৪।

[2] সূরা ইউসুফ:৪০।

[3] সূরা হাশর:২৩।

[4] সূরা আল বাকারা:১১৬।

[5] সূরা আল বুরুজ:১৬।

[6] সূরা আল আম্বিয়া:২৩।

[7] সূরা আর রাদ:৪১।

[8] সূরা আল মুমেনুন:৮৮।

[9] সূরা আল বাকারা:১০৬।

[10] সূরা আলে ইমরান:১৮৯।

[11] সূরা আল মায়েদা:১৮।

[12] সূরা আল মায়েদা:৪০।

[13] সূরা আল মায়েদা:১২০।

[14] সূরা আল হাদীদ: ৫।

[15] সূরা আল আম্বিয়া:৩০।

[16] সূরা আন নাহল: ৪০।

[17] সূরা আত তাকভীর:১৫।

[18] সূরা ইয়াসিন:৪০।

[19] সূরা আর রা‘দ:২।

[20] সূরা আল আম্বিয়া:১০৪।

[21] সূরা আলে ইমরান:২৬।

[22] সূরা ইসরা:১১১।

[23] সূরা নাস:১-৪।

[24] সূরা লুকমান:২০।

[25] সূরা সাবা:১।

[26] সূরা সাবা:২।

[27] সূরা আলে ইমরান:১৫৪।

[28] সূরা আল বাকারা:২৫৫।

[29] সূরা আন নামল:৬০।

[30] সূরা আন নামল:৬৩।

[31] সূরা আল মায়িদা:৭৩।

[32] সূরা আলে ইমরান:৬১-৬৩।

[33] সূরা আল জাসিয়া:২৭।

[34] সূরা আল হাক্কাহ:১২-১৩।

[35] সূরা মুরসালাত:৮-১১।

[36] সূরা ইনশিকাক:১-৫।

[37] সূরা ইনফিতার:১-৫।

[38] সূরা আল কারি‘আহ:১-৫।

[39] সূরা যিলযাল:১-৬।

[40] সূরা আর রাহমান:২৬-২৭।

[41] সূরা আল বাকারাহ:৬৩।

[42] সূরা আল আরাফ:৫৪।

[43] সূরা আল আনআম:৫৭।

[44] সূরা আল আনআম:৬২।

[45] সূরা আন নাহল:২।

[46] সূরা আল আম্বিয়া:২৫।

[47] সূরা ত্বা হা :৯৮।

[48] সূরা ত্বা হা:৮।

[49] সূরা আল মায়িদা:৪৪।

[50] সূরা আল মায়েদা:৪৫।

[51] সূরা মুলক:১৪।

[52] সূরা আল আম্বিয়া:২৩।

[53] সূরা হজ্ব: ৫৬।

[54] সূরা আল ফুরকান:২৫।

[55] সূরা আল ফাতেহা:৪।

[56] সূরা মরিয়ম:৪০।

[57] সূরা মুলক:১।

[58] সূরা ইয়াসিন:৮৩।

[59] ইমাম নাসাঈ,সুনান,খ ৪,পৃ ৪০৪।

[60] বুখারী,হাদীস নং ৬৮৬১।

[61] প্রাগুক্ত,হাদীস নং ৬৮৬৫।

[62] সূরা ফাতির:১৩।

[63] সূরা ফুরকান:২।

[64] সূরা আত তাওবাহ:১১৬।

[65] সূরা হিজর :২৩।

[66] সূরা আল বাকারা:২৫৮।

০৯

সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে রাসূলের পদমর্যদা

দুনিয়াতে আল্লাহর আইনগত সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধি হচ্ছে আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসূলগণ অন্যকথায় আমাদের আইন রচিয়তা ও সংবিধানদাতা আমাদের জন্য কি আইন এবং কি নির্দেশ দিয়েছেন তা জানাবার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছেন আম্বিয়ায়ে কেরাম। এ কারণে ইসলামে নির্দ্বিধায় তাদের অনুসরণ করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বস্তুত বহুসংখ্যক সার্বভৌমত্বের দাসত্ব থেকে মানব সভ্যতাকে মুক্ত করে এক আল্লাহর একক সার্বভৌমত্বের অধীন করে একমাত্র তাঁর ইবাদত প্রতিষ্ঠার জন্যই আল্লাহ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ নবী এবং রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন। এ সম্পর্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী হল, আমি সর্বশেষ নবী, আমার পর আর কোনো নবী আসবে না। সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানব জীবনে মহান আল্লাহর আইনগত সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধি। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ هُوَ ٱلَّذِيٓ أَرۡسَلَ رَسُولَهُۥ بِٱلۡهُدَىٰ وَدِينِ ٱلۡحَقِّ لِيُظۡهِرَهُۥ عَلَى ٱلدِّينِ كُلِّهِۦ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡمُشۡرِكُونَ ٣٣ ﴾ [التوبة: ٣٣]  

‘‘তিনি তাঁর রাসূলকে পথ নির্দেশ ও সত্য দীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে একে সব ধর্মের উপর প্রবল করে দেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।’’[1]

এখানে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য সার্বভৌমত্বের প্রয়োগ করা হলেও তিনি নিজে সার্বভৌম ছিলেন না। তিনি নিজে কখনও এ দাবী করেন নি। একইভাবে খলিফা, রাজা-বাদশাহ বা জনগণ কেউই সার্বভৌম নন। তাঁরা শুধু আল্লাহর সার্বভৌমত্বের যিম্মাদার। তাঁদের দায়িত্ব আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা ও তদানুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা। কুরআনে মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِي ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ ٥٩ ﴾ [النساء: ٥٩]

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আনুগত্য করবে আল্লাহর, রাসূলের এবং তোমাদের (অর্থাৎ ঈমানদারদের মধ্যকার) কর্তৃত্বশীলদের।”[2]

মানুষ মূলত মহান আল্লাহর নিকট থেকেই কর্তৃত্ব লাভ করে থাকে এবং যিম্মাদার হিসেবে এ দায়িত্ব পালন করে। এ কথা প্রমাণ করে যে, সার্বভৌমত্ব দু ধরনের। একটি প্রকৃত ও মৌলিক বা একান্তভাবে আল্লাহর। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রদত্ত বা অর্পিত এ দুটি সার্বভৌমত্বের ধারণাই ইসলামে বিদ্যমান এবং এদের মাঝে কখনও বিরোধ হয় না। কাজেই সার্বভৌমত্বের আসল মালিক আল্লাহ তা‘আলা আর তাঁর পক্ষ থেকে এর ধারক হচ্ছে মুসলিম জনগণ।

মুসলিমদের উপর আল্লাহর অর্পিত এ দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন ও গুরুভার। আল্লাহ বলেন,

﴿ إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُكُمۡ أَن تُؤَدُّواْ ٱلۡأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهۡلِهَا ٥٨ ﴾ [النساء: ٥٨]

‘‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও।’’ [3]

এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যে কোনো অবহেলা ও খামখেয়ালীপনার বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করে আল্লাহ বলেন:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَخُونُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ وَتَخُونُوٓاْ أَمَٰنَٰتِكُمۡ وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ٢٧ ﴾ [الانفال: ٢٧]

‘‘হে ঈমানদারগণ! খেয়ানত করো না আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সাথে। আর খেয়ানত করো না নিজেদের পারস্পরিক আমানত জেনে শুনে।’’[4]

ইসলামের ইতিহাসের চতুর্থ খলিফ আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বলেছিলেন :

ان عملك ليس لك بطعمة ولكنه فى عنقك أمانة وأنت مسترعى بما فوقك ليس لك ان تقتات فى رعيه

তোমার কাজ ও কর্তৃত্ব তোমার জন্য কোনো স্বাদের খাদ্য নয় বরং তা তোমার ঘাড়ের উপর একটি ভারী আমানত। তোমার উপরস্থের জন্য তুমি প্রহরার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি। তুমি তার প্রহরার কাজে কোনোরূপ রোজগার করতে পার না।’’[5]

তিনি আরো বলেন:

حق على الامام ان يحكم بما انزل الله وان يؤدى الامانة فاذا فعل ذالك فحق على الناس ان يسمعوا له وان يطيعوه وأن يجيبوه اذا دعوا

ইমাম-রাষ্ট্রনায়কের অধিকার হচ্ছে যে, সে আল্লাহর নাযিল করা বিধানের ভিত্তিতে শাসন কার্য চলাবে এবং আমানত আদায় করবে। সে যদি তা করে তাহলে জনগণের উপর তার এ অধিকার হবে যে, তারা তার কথা শুনবে ও তার আনুগত্য করবে এবং যখন সে ডাকবে, তখন তারা তার ডাকে সাড়ে দেবে।’’[6]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

من اطاعنى فقد اطاع الله ومن يعصنى فقد عصى الله ومن يطع الامير فقد اطاعنى ومن يعصى الامير فقد عصانى-

‘‘যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই আনুগত্য করলো, যে আমার অবাধ্যতা করলো সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকেই অবাধ্যতা করল। যে শাসকের আনুগত্য করল সে প্রকৃতপক্ষে আমারই আনুগত্য করলো। আর যে শাসকের অবাধ্যতা করলো প্রকৃতপক্ষে সে আমারই অবাধ্যতা করলো।’’[7]

মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীস :

أن رسول الله صلى الله وسلم لما بعثه الى اليمن قال كيف تقضى إذا عرض لك قضاء قال: أقضى بكتاب الله قال فإن لم تجد فى كتاب رسول الله؟ قال فبسنة رسول الله عليه وسلم، قال: فإن لم تجد فى سنة رسول الله قال أجتهد برأيي ولا آلو. قال فضرب رسول الله صلى الله عليه وسلم على صدره وقال : الحمد لله الذي وفق رسول رسول الله لما يرضى به رسول الله صلى الله عليه وسلم

‘‘যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ইয়েমেনে (শাসনভার দিয়ে) পাঠালেন, তখন তাকে বললেন: তোমার সম্মুখে যখন কোনো বিচারের দায়িত্ব আসবে, তখন তুমি কিভাবে তার ফয়সালা দেবে? তিনি বলেন, আল্লাহর কিতাব অনুসারে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, যদি আল্লাহর কিতাবে তা না পাও? তিনি বললেন, তাহলে আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ মুতাবিক। আবার তিনি বললেন: যদি আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহতেও না পাও? তিনি বললেন, তাহলে আমি গভীর চিন্তা-ভাবনা করে আমার বিবেক ও ইজতিহাদের আলোকে ফয়সালা করবো, তার একটুও কমতি করবো না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বুকে হাত মেরে বললেন: সেই আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা, যিনি তাঁর রাসূলের রাসূল বা দূতকে আল্লাহর রাসূলের পছন্দসই কাজের তওফীক দিয়েছেন।’’[8]

উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস থেকে জানা গেল যে, আল্লাহ তা‘আলাই প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁরই প্রতিনিধি বা খলীফাস্বরূপ। নবী-রাসূলের অনুপস্থিতিতে তাঁদের নিয়োজিত বা মনোনীত বা তাঁদের নীতির আলোকে যিনিই শাসন ক্ষমতার অধিষ্ঠিত হবেন, তিনিই আমীররূপে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুরূপে বিবেচিত হবেন। কুরাআন-সুন্নাহর আলোকেই তাঁর নেতৃত্ব পরিচালিত হবে এবং যেখানে স্পষ্টত কুরআন-হাদীসের নির্দেশ না পাওয়া যায়, সে ব্যাপারে ইজমা, কিয়াস এবং পরামর্শের আশ্রয় নেবেন।

[1] সূরা আত তাওবাহ:৩৩।

[2] সূরা আন নিসা:৫৯।

[3] সূরা আন নিসা:৫৮।

[4] সূরা আল আনফাল:২৭।

[5] নাহজুল বালাগাহ, রিসালাহ, নং-৫।

[6] আল আমওয়াল লি-আবী উবাইদ, ১২ খৃ. পৃ. ৩৭৭।

[7] মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী (রহ:), আল জামে সহীহ, কিতাবুল আহকাম, ২য় খ-; পৃ. ১০৫৭, ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ইমামাত, ২য় খ-, পৃ. ১২৪।

[8] মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ৩৫৫০ (তিরমিযী, আবূ দাউদ ও দারিমীর বরাতে)।

১০

সার্বভৌমত্ব প্রয়োগে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি

সার্বভৌমত্ব মূলত একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের। কিন্তু মানব সমাজে এ সার্বভৌমত্বের প্রয়োগ হতে পারে মানুষের দ্বারা। মানুষকে পৃথিবীতে ‘প্রতিনিধি’ হিসাবে প্রেরণের মাধ্যমে মহান আল্লাহ এ কাজ করার পন্থা নিরূপণ করে দিয়েছেন। সকল মানুষ একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ এ খিলাফতের দায়িত্ব পালনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করবে। এ প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব মানুষের নিকট আমানত। কিন্তু কার্যত সকল মানুষ একত্রিত হয়ে একসাথে এ প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করতে পারে না বলেই সকলের পক্ষ থেকে এক বা একাধিক ব্যক্তি তা প্রয়োগ করবে।’’১১৪

এ কাজ সুসম্পন্ন করার জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থা একান্ত প্রয়োজন:

প্রথমত: গোটা মানব সমাজকে এক ও অভিন্ন কেন্দ্রবিন্দুতে একত্রিত হতে হবে, তারা অন্যান্য সকল প্রকারের সর্ম্পক ছিন্ন করে নেবে এবং সমগ্র বিশ্বলোক ও তার মধ্যকার সব কিছুর একমাত্র মালিক ও নিয়ন্ত্রকরূপে সেই এককেই স্বীকার করবে। এই ব্যাপারে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো,

﴿ ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلٗا رَّجُلٗا فِيهِ شُرَكَآءُ مُتَشَٰكِسُونَ وَرَجُلٗا سَلَمٗا لِّرَجُلٍ هَلۡ يَسۡتَوِيَانِ مَثَلًاۚ ٢٩ ﴾ [الزمر: ٢٩]

‘‘আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। এক ব্যক্তি তো সে, যার মালিকানায় বহু সংখ্যক বাঁকা স্বভাবের মনিব শরীক হয়ে আছে, যারা প্রত্যেকেই তাকে নিজের দিকে টানে। আর অপর এক ব্যক্তি পুরাপুরিভাবে একই মনিবের জন্য নিদিষ্ট… এই দুজনের অবস্থা কি একই রকমের হতে পারে?”[1]

এ দৃষ্টান্ত থেকে মুমিন ও কাফির এক আল্লাহ অনুগত ও বহু আল্লাহতে বিশ্বাসী মুশরিকের অবস্থা এবং এ দু’য়ের মধ্যকার আসমান-যমীনের পার্থক্য স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে গেছে।

ইউসূফ আলাইহিস সালাম এ একক সার্বভৌমত্বের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন :

﴿ ءَأَرۡبَابٞ مُّتَفَرِّقُونَ خَيۡرٌ أَمِ ٱللَّهُ ٱلۡوَٰحِدُ ٱلۡقَهَّارُ ٣٩ ﴾ [يوسف: ٣٩]

‘‘বিভিন্ন-বিচ্ছিন্ন বহু সংখ্যক রব (সার্বভৌমত্ব) উত্তম নাকি মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহ উত্তম?”[2]

দ্বিতীয়ত: পুরো সমাজকে আল্লাহর দাসত্বের শৃঙ্খলে গড়ে তুলতে হবে এবং অন্যান্য অসংখ্য তাগুতী শক্তির সার্বভৌমত্বের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও স্বাধীন হতে হবে। কেননা আল্লাহ ব্যতীত অন্য যাদের নাম করা হয় সার্বভৌম হিসেবে সেগুলি তো নিছক নামমাত্র। এ নামগুলো হয়তো তোমরা তোমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী রেখেছ অথবা তোমাদের পূর্ব পুরুষেরা এ নামগুলো রেখে গেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

﴿ مَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِهِۦٓ إِلَّآ أَسۡمَآءٗ سَمَّيۡتُمُوهَآ أَنتُمۡ وَءَابَآؤُكُم ٤٠ ﴾ [يوسف: ٤٠]  

‘‘এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে আর যার যার দাসত্ব তোমরা কর সেগুলি নিছক কতকগুলি নাম মাত্র (সে নামগুলির অন্তরালে ব্যক্তিসত্তা বলতে কিছুর অস্তিত্ব নেই) এ নাম তোমরা আর তোমাদের বাপ দাদারা রেখে নিয়েছে।’’১১৭

মানব কূলকে বহু সংখ্যক দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সকল নবীসহ সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবীরূপে এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তাই মানুষকে এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং অন্য কারও ইবাদতকে অস্বীকার করতে হবে। আর একমাত্র মহান আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

খলিফা একমাত্র আল্লাহর বিধান অনুসারে শাসন পরিচালনা করবে। এ দিক দিয়ে ইসলাম পাশ্চাত্যের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সমাজ-সংস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কেননা পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক পদ্ধতির অনুসারী সমাজ নিজেই নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী। তাঁরা আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করে না এবং আল্লাহর বিধান থেকে শাসনকার্য চালায় না। আল্লাহর খলীফাদের চিন্তা-চেতনা তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তারা সবক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতিনিধিরূপে কাজ করে এবং জবাবদিহিতার মনোভাব অন্তরে পোষণ করে। তাই বলা যায় তাঁরা তাদের নিজ ইচ্ছা কামনা-বাসনাকে বাস্তবায়িত করে না, বরং আল্লাহর ইচ্ছা-কামনা-বাসনাকে বাস্তবায়িত করে, আর আল্লাহর ঘোষিত সীমাসমূহের মধ্যে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহর যমীনের একমাত্র আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করাই তাদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।

[1] সূরা আয যুমার:২৯।

[2] সূরা ইউসূফ:৩৯।

 

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

এই ঘর এই লোকালয়

এই ঘর এই লোকালয় (কাব্য পিডিএফ বই)

এই ঘর এই লোকালয় এই জনপদে যাপিত জীবন ও জীবনের চালচিত্র। জীবনের বিচিত্র অনুভূতির সমাবেশ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE