Breaking News
Home / সাহিত্য / কিছু গল্প / ছিনাল মেয়ের আক্ষেপ (ভন্ড প্রেমিকের গল্প)

ছিনাল মেয়ের আক্ষেপ (ভন্ড প্রেমিকের গল্প)

‘ইশ ও যদি আমায় রেপ করতো!’ হাতের পত্রিকা টেবিলে রাখতে রাখতে যন্ত্রণা মিশ্রিত আক্ষেপের সাথে এই কথাটাই বিড়বিড় করছিলাম আমি। রেপ কি চরম মন্দ কাজ? এটা কি নারীর পরম ক্ষতি? রেপ ও রেপিস্টদের মানুষ কেন যে এত মন্দ বলে! অবিবেচক পৃথিবী! অবিচার এর ভূষণ।

তিনদিন আগে আমাদের কাজের মেয়ে কুলসুম কে রেপ করেছিলো এই পাড়ার মুদি দোকানদার হাফিজ মিয়া। ঘটনাটা আজ পত্রিকায় এসেছে। এলাকায় হাফিজ মিয়ার নামে ছি ছি রব উঠেছে। হাফিজ মিয়ার জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। আহারে! বেচারা!! কি আর এমন ক্ষতি করেছে কুলসুমের? জোর করে নিজের কাম ক্ষুধা কুলসুমকে দিয়ে মিটিয়েছে। এতে হয়ত কুলসুম কিছুটা শারীরিক আঘাত পেয়েছে ও অপমানিত বা লজ্জিত হয়েছে। এইতো ক্ষতি! এ আর এমন কি!

দূর্ঘটনা ঘটে যাবার পর কুলসুমের আদর কদর বেড়ে গেছে। উদ্ধার করার পর থেকে আমার আব্বা আম্মাসহ এলাকার সমস্ত ভদ্র সভ্য লোক কুলসুমের পাশে এসে দাড়িয়েছে। কুলসুম গত দুইদিন ধরে আমাদের বাসাতেই আছে। আব্বা মেডিকেল ও থানা পুলিশের সমস্ত কিছু দেখছেন।

পাশের রুমে উকি দিয়ে দেখি কুলসুম আমার আম্মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আর আব্বা কুলসুমের মাথায় হাত বুলিয়ে খুব সাহস দিচ্ছেন। দৃশ্যটা দেখেই আমার কলিজাটা দুমড়ে মুচড়ে যেতে শুরু করলো। আমি প্রচন্ড ঈর্ষা নিয়ে কুলসুমকে দেখছি,,,,

কুলসুম কত ভাগ্যবতী! ওর যন্ত্রণা ও ব্যথার চিৎকার লুকাতে হয়না মেকি হাসি দিয়ে। ও সবার সামনেই কান্না করতে পারছে। ওর পাশে আছে সমাজ, আইন এবং ওর আর আমার বাবা মা। ও ওর আঘাতের জন্য সরাসরি সবার সামনে ভিলেনের দিকে অভিযোগের আংগুল তুলতে পারছে। আইন সেই অভিযোগ গ্রহণ করবে এবং তার প্রেক্ষিতে সাজাও দিবে অপরাধীকে। আহা! কত সৌভাগ্যবতী দুঃখী!
দুঃখী হতেও বুঝি ভাগ্য লাগে! যাদের এই ভাগ্যটুকুও নেই তারাই হয় আমার মতন ছিনাল মেয়ে।

নিজের কথা মনে হতেই একটা প্রচন্ড ঘূর্ণি এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ছয় মাস আগের সেই সম্মোহনী সময় গুলোতে,,,,,

আমার পরিবারের ও আমার প্রবল ইচ্ছা মেডিকেলে পড়ার। এসএসসিতে গোল্ডেন ফাইভ সেই ইচ্ছার আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। পাশের বাড়ির বাড়িয়ালার ছেলে রাহাত ডিএমসির ছাত্র। আমি ইন্টার ২য় বর্ষতে পদার্পণ করতেই আরো বেশী কেয়ারের জন্য বাবা রাহাত ভাইকে আমার প্রাইভেট টিউটর হবার প্রস্তাব দেন। রাহাত ভাই তা লুফে নেন।

রাহাত ভাই আসেন, পড়া শেখান সেই সাথে শেখান শরীরী বিদ্যার সবচেয়ে সুন্দর ও প্রাচীন ছলাকলা। প্রেম ও কামের রংগীন দুনিয়ায় রাহাতের হাত ধরে নিজেকে আবিষ্কার করি। প্রথমে লজ্জা ও ভয় থাকলেও পরে কেন যেন আমিই বেশী উদ্দাম হয়ে গেলাম। সমস্ত সংস্কার, ধর্মীয় ভীতি এক ফুয়ে উড়িয়ে রাহাতের নৌকায় চড়ে প্রেমের সাগরে ভাসতে লাগলাম। পরিবার ও বন্ধু সবাইকে পর মনে হতে লাগলো। মাকে ভিলেন ভাবতে থাকলাম। দুনিয়ায় শুধু একজনই হিরো- রাহাত ভাই। আমার দেহ মনের সর্বত্র রাহাত মিশে গেল অথবা আমি হারিয়ে গেলাম রাহাতের মাঝে।

দুই মাস আগে একদিন আব্বা এসে বললেন, ‘তোর রাহাত ভাইয়ের এনগেজমেন্ট আগামী শুক্রবার। এই মাসের শেষেই বিয়ে। পড়ালেখা যা কিছু গুছিয়ে নেয়ার এই সপ্তাহের মধ্যেই গুছিয়ে নে।”
আমার দুনিয়াটা টলে উঠলো। নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে। রাহাত আমার!
তবে প্রচন্ড কষ্ট ও যন্ত্রণায় অস্তিত্বহীন হয়ে গেলাম যখন জানলাম এটা লাভ ম্যারেজ। হবু বউ রাহাতের ক্লাসমেট। মেয়ের বাবা বিশাল ধনী। মেয়ের নামে উত্তরায় ফ্ল্যাট আছে। এছাড়া, বিয়ের পরে উচ্চশিক্ষার জন্য মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে নিজের খরচে লন্ডন পাঠিয়ে দেবেন।

একদিন রাহাতকে একা পেয়ে যখন সামনে দাড়ালাম আমার একরাশ প্রশ্ন, ব্যাথা, বিরহ কাতরতা নিয়ে তখনো জানতাম না আরো কিছু বাকি আছে! রাহাত আমাকে দেখেই বুঝেছিল আমি কি বলব। তাই কাছে এসে দুই হাত দিয়ে মুখ তুলে খুব কোমল গলায় বলতে লাগলো- আরে পাগলি, আমি তো তোমারই। প্রেমের জন্য কি বিয়ে লাগে নাকি? তুমি এত ব্যাকডেটেড কেন? তুমি যদি চাও তাহলে আমি সারাজীবন তোমার প্রেমিক হয়ে থাকব।
বজ্রাহত হতে হলে নিজের অবস্থান ও অস্তিত্ব থাকতে হয়, আমার তাও নেই। শুধু শূণ্যতাকে টের পেলাম। আমি একেবারেই শূণ্য, পরম শূণ্য!
তবুও শেষ চেষ্টা হিসাবে সেই গোপন সংবাদটি দিলাম। আমাদের প্রেমের চিহ্ন আমার পেটে একটু একটু করে বড় হবার খবর। প্রথমে বুঝতে পারিনি। যখন বুঝলাম তখন চারমাস!

রাহাত আমাকে টেনে নিয়ে গেল নার্সিংহোমে। পরিচিত ডাক্তারকে দিয়ে গর্ভপাত করালো। আমার বাবুটাকে যখন ট্রেতে রাখলো তখন আমি ছিনিয়ে নিলাম। মন চাইলো ওকে আমার বুকের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলি। মন চাইলো ওকে আমার হৃদপিন্ড ও ফুসফুসের অংশ করে রাখি। মন চাইলো এক ফুয়ে ওকে বাচিয়ে দিই। মন চাইলো ওকে আগলে রাখি সমস্ত মন্দ ও মৃত্যুর হাত থেকে,,,,
অথচ ওরা আমার হাত থেকে কেড়ে নিলো, আমার বাবুকে, আমার প্রেম কে, আমার নারীত্ব কে, আমার সুখস্বপ্ন কে,,,,,

সেদিন বাসায় ফেরার সময় রাহাত আমায় অনেক কিছু বলেছিল কিন্তু আমি কিছুই শুনিনি কারন আমি বুঝে গিয়েছিলাম রাহাতের কাছে আমার জায়গা ঠিক কোথায়। ওর মনই নেই, তো সেখানে জায়গা পাব কিভাবে? ওর শিশ্ন আছে আর সেখানেই ছিল আমার জায়গা। আমি বোকা ব্যবসায়ী তাই শিশ্নের সাথে হৃদপিন্ডের বিনিময় করেছি। কি অন্ধ ও অজ্ঞ বিনিময়!!

সত্য সুন্দর নয়, সত্য কুৎসিত ও ভয়াবহ। তাই সেদিন থেকে কিছু ড্রাগসের সহায়তায় আমি সুন্দর ও কোমল মিথ্যার পূজারী হতে লাগলাম। আমার তৈরি সুন্দর ও সুখী মিথ্যার পরাবাস্তব দুনিয়ায় বসবাস করতে লাগলাম। সেই দুনিয়ায় আমার বাবুর জন্ম হয়েছে। রাহাত খুব স্নেহশীল পিতা। আমাদের সুখের সংসার সবাই ঈর্ষা নিয়ে দেখে।

বাস্তব দুনিয়ার নিরাদর ও অবহেলা আমাকে পরাবাস্তব দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিল। কুলসুম তো হাফিজকে ঘৃণা করার সুযোগ পেয়েছে কিন্তু আমি তো তাও পারছি না। ঘৃণা করতে গিয়ে বরং বেশী ভালোবেসে ফেলছি আর পরাবাস্তব দুনিয়ায় হারিয়ে যাচ্ছি ড্রাগসের হাত ধরে।

হ্যা, আমি এখন মাদকাসক্ত। কি করব! রাহাতের প্রেমে পড়ার পর অন্ধ হয়ে পরিবার ও বন্ধু সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। রাহাতকে কেন্দ্র করেই গড়েছিলাম পৃথিবী। কত সুখ স্বপ্ন জমা করেছিলাম ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ফিক্সড ডিপোজিটে। কেন্দ্র ও সঞ্চয় হারিয়ে আমি তাই নিঃস্ব। নেশা করে ভুলে থাকি সব। তখন নিজেকে রাণী মনে হয়। হোক মিথ্যা তবুও তা আমার কাছে সত্য অথচ সত্য নয়।

নেশার টাকা জোগাতে হিমশিম খেতাম। মা আর আগের মতন চাইলেই টাকা দেয় না। একশটা অজুহাত তৈরি করতে করতে আমিও ক্লান্ত তাই বিকল্প পথ বেছে নিলাম, চুরি। হ্যা চুরি করা শুরু করলাম। চুরি করতে গিয়ে একদিন ধরা পড়লাম। সেদিন বাবা বেদম প্রহার করলেন। পুরো পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষকে সেদিন ভিলেন মনে হলো। সবাই একযোগে আমাকে মেরে ফেলার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে যেন। প্রতিশোধ নিলাম! হ্যা, প্রতিশোধ, টাকা ইনকাম ও রাহাতের উস্কে দেয়া আদিম নেশা,,,,এসব কিছু মিটাতে আমি বিভিন্ন ছেলেদের সাথে প্রেম শুরু করলাম। আমার টাকা ও কাম দুই চাহিদা সুন্দর ভাবে পূরণ হতে থাকলো। সেইসাথে কিছুটা প্রতিশোধগ্রহণও হলো।

আর কিছুদিন পর এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার প্রশ্ন আগের দিন হাতে পেলেও আমি পাশ করতে পারব না। মনোযোগ দিয়ে একঘন্টাও টেবিলে বসতে পারি না। অথচ আমার এপ্লাস পাবার কথা ছিল, ডাক্তার হবার কথা ছিল, সুন্দর মানুষ হবার কথা ছিল, সুখী একটা সংসার পাবার কথা ছিল,,,,,
অথচ আজ আমি বাবা মায়ের বখে যাওয়া কন্যা, ফেল্টুস, মাদকাসক্ত, চোর ও ছিনাল মেয়ে!!! আমার এই পরিবর্তন কোন রেপিস্ট করেনি, প্রেমিক করেছে,,,, হা হা হা,,,, প্রেমিক! বালের প্রেমিক!!
প্রেমিক রাহাতের থেকে রেপিস্ট হাফিজ কত ভালো!
অথচ রেপিস্টের বিচার তো খুব করো। আমার এই প্রেমিকের বিচার কোন আদালতে হবে কেউ বলতে পারো?

ছিনাল মেয়ের আক্ষেপ
ছবিঃ লেখিকা

গল্পের লেখিকা : লুলু আম্মানছুরা

আরও গল্প >> চলন্ত বাসে বাসর (ধর্ষণের গল্প)

গল্পটি পড়ে আপনার কাছে ভালো লাগলে এটি অবশ্যই শেয়ার করুন।

বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে চমৎকার গল্প লেখনির জন্য আমার বাংলা পোস্ট.কম ব্লগের পক্ষ থেকে লেখিকা লুলু আম্মানছুরা কে অভিবাদন।

আপনার রেটিং দিন

0%

গল্পটি সম্পর্কে আপনার প্রতিক্রিয়া জানাতে সর্বোচ্চ ৫ম লাভ বাটন আলতো চাপার দ্বারা আপনার রেটিং জমা দিন।

আরও গল্প পড়ুন
User Rating: 3.49 ( 11 votes)

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

উচ্চ শিক্ষিতা বউ

উচ্চ শিক্ষিতা বউ – আধুনিক বউয়ের গল্প

গল্পঃ উচ্চ শিক্ষিতা বউ জনাব শামীম খন্দকার। ঢাকাস্থ একটি চাইনিজ হোটেলের ম্যানেজার। তার গ্রামের বাড়ি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE