Breaking News
Home / নারী / নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা / মেয়েদের গোপন সমস্যা : অবৈধ গর্ভপাত

মেয়েদের গোপন সমস্যা : অবৈধ গর্ভপাত

বাংলাদেশের নারীদের গর্ভপাতের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। কুমারী মেয়েদের থেকে শুরু করে নববিবাহিত দম্পতিরাও গর্ভপাত করিয়ে থাকেন। আসুন এই অবৈধ গর্ভপাতের কিছু ভয়ংকর কথা শুনা যাক।

পি.জি হাসপাতাল। প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বহির্বিভাগ। মন্দিরা চ্যাটার্জি, ঠিকানা বাঘা যতীন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ভালবেসে রেজিট্রি করে এক ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করেছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে দু’দুবার গর্ভবতী হন। এ সময়ে সন্তান নিলে পাঠপর্ব যে লাটে উঠবে, তাই হাওড়ার কোনো নার্সিংহোমে দুবারই গর্ভপাত করিয়েছিলেন।

নয়না পাল। তাঁর ঠিকানা গড়িয়া। বিয়ের তিন মাসের মধ্যেই নয়না বুঝতে পারলেন যে তিনি মা হতে চলেছেন। এত তাড়াতাড়ি সন্তান! না, কিছুতেই না। তিনিও শেয়ালদার কোনো নার্সিংহোমে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের হাত থেকে মুক্ত হয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

চন্দনা। কুমারী অবস্থাতেই ক্ষণিকের অসতর্কতার মাসুল গুনতে হল তাঁকে। লোক জানাজানি হলে মুখ দেখানো দায়। ট্রেনের কামরায় বিজ্ঞাপন দেখে শেওড়াফুলির এক ক্লিনিকে গিয়ে নিজেকে মুক্ত করে আনলেন। মন্দিরা চ্যাটার্জি, নয়না পাল, চন্দনা আবার মা হতে চলেছেন। এবারের মাতৃত্ব আকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু সমস্যা হল এদের তিনজনেরই রক্ত পরীক্ষা করার পর দেখা যাচ্ছে যে এরা প্রত্যেকেই আর-এইচ নেগেটিভ, আর এদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার পর অ্যানিমিয়া, জন্ডিস ইত্যাদিতে মারা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে অলি-গলির গর্ভপাতের কেন্দ্রগুলিতে গর্ভপাত করানোর জন্য এরা এখন নিজেদের চুল ছিঁড়ছেন।

আরো পড়ুন ঃ গর্ভপাত ঘটানোর উপায় সমূহ

তবে কি মন্দিরা চ্যাটার্জি, নয়না পাল আর চন্দনার মতন মেয়েরা আর মা হতে পারবেন না? এদের ভাগ্যো কি আছে জানার জন্য আর-এইচ সম্বন্ধে একটু আলোচনায় আসা যাক।

  • আর এইচ ব্যাপারটা কি?

আর-এইচ হল রক্তের একপ্রকার অ্যান্টিজেন যা রক্তের লোহিত কণীকায় থাকে। ১৯৪০ সালে ল্যান্ডস্টাইনার ও ওয়ানার নামে দুজন বিজ্ঞানী রীসস নামক বানরের রক্তকণীকায় এই বিশেষ অ্যান্টিজেন আবিস্কার করেন, তাই এর নাম রীসস ফ্যাক্টর বা আর-এইচ ফ্যাক্টর।

প্রতিজোড়া ক্রোমোজোম ছয়প্রকারের আর-এইচ অ্যান্টিজেন থাকে। এই ছয়প্রকার অ্যান্টিজেনের মধ্যে D প্রতীক চিহ্নের অ্যান্টিজেন হল সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। D এর উপস্থিতি নির্ধারিত করে যে সেই ব্যক্তি আর-এইচ পজিটিভ এবং এর অনুপস্থিতি নির্ধারিত করে যে সেই ব্যক্তি আর-এইচ পজিটিভ। আবার জিনপেয়ারে যদি একটি D থাকে সেই ব্যক্তিকে হেটারোজাইগস পজিটিভ এবং দুটোই যদি D  থাকে তবে তাঁকে হোমোজাইগস পজিটিভ বলা যায়।

এখন কোনো আর-এইচ পজিটিভ এবং অর্ধেক সন্তান আর-এইচ নেগেটিভ  হবে।

  • আর-এইচ নেগেটিভের সমস্যা কি?

মা যদি আর-এইচ নেগেটিভ হয় এবং গর্ভস্থ সন্তানও যদি আর-এইচ নেগেটিভ তখন কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু গর্ভস্থ সন্তান যদি আর-এইচ পজিটিভ হয় এবং এই পজিটিভ রক্ত যখন মায়ের শরীরে প্রবেশ করে তখন মায়ের আর এইচ নেগেটিভ এবং সন্তানের আর-এইচ পজিটিভ রক্তের পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে এক প্রকার অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডি যখন সন্তানের শরীরে প্রবেশ করে তখন সন্তানের ক্ষতি করে এবং সন্তান অ্যানিমিয়া, জন্ডিস ইত্যাদিতে মারা যায়।

  • অ্যানিমিয়া, জন্ডিস কিভাবে হয়?

সাধারণত গর্ভস্থ সন্তানের রক্ত মায়ের শরীরে প্রবেশ করে না। কিন্তু গর্ভাবস্থায় যদি কোনো রক্তপাতের ঘটনা ঘটে যেমন গর্ভপাত বা প্রসবকালীন যে রক্তপাত হয় তাতে সন্তানের রক্ত মায়ের শরীরে প্রবেশ করে। সন্তানের আর-এইচ পজিটিভ সেল মায়ের আর-এইচ নেগেটিভ সেলের সঙ্গে যখন মিলিত হয় তখন পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে অ্যান্টিবডি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সেলগুলি কেমলমাত্র সেনসিটাইজড অর্থাৎ প্রভাবিত হয়। পরবর্তীকালে এই সেনসিটাইজড সেলগুলি যখন আর-এইচ পজিটিভ সেলগুলির সংস্পর্শে আসে তখন পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে আর-এইচ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডি তৈরি হতে প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় লাগে যার জন্য প্রথম সন্তান সাধারণত ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। কিন্তু প্রথম সন্তানের ক্ষেত্র্ব গর্ভাবস্থায় যদি কোনো রক্তপাত ঘটে থাকে বা ভূলক্রমে মা যদি আর-এইচ পজিটিভ রক্ত পেয়ে থাকে তবে প্রথম সন্তানও ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

দ্বিতীয় সন্তান যখন পেটে আসে এবং সেই সন্তানও যদি আর-এইচ পজিটিভ হয় তখন প্রথম সন্তান থেকে উদ্ভুত আর-এইচ অ্যান্টিবডি সন্তানের শরীরে প্রবেশ করে রক্তের লোহিত কণিকাগুলিকে ভাঙতে শুরু করে যার ফলে সন্তান হেমোলিটিক অ্যানিমিয়া-তে আক্রান্ত হয়। অ্যান্টিবডির পরিমাণ যত বেশি থাকবে তত বেশি রক্তের লোজিত কণীকা ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং সেই অনুপাতে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রাও বাড়বে। এই বিলিরুবিন সাধারণত গর্ভাবস্থায় মায়ের লিভারের দ্বারা নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে। কিন্তু সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সন্তানের লিভারের এই বিলিরুবিন নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা থাকে না, ফলে বিলিরুবিনের আধিক্যের জন্য জন্ডিস দেখা দেয়। যাকে “ইক্টেরাস গ্র্যাভিস নিওনেটোরাম” বলে। এই জন্ডিস সাধারণত জন্মের ২৪ ঘণ্টায় মধ্যেই দেখা দেয়। কিন্তু সন্তানের রক্তে যদি বিলিরুবিনের মাত্রা অত্যাধিক থাকে তবে তাঁর প্রভাব সন্তানের মস্তিঙ্কেও পড়ে, যাকে “কারনিকটেরাস” বলা হয়। এই সন্তান বাঁচলেও বিকলাঙ্গ হয়। আবার অনেক সময় বিলিরুবিনের মাত্র এত বেশি থাকে যে সন্তান গর্ভেই মারা যায় এবং বিকৃত রূপ নেয়। এই অবস্থাকে “হাইড্রপস ফিটালিস” বলা হয়।

  • ‘এ’ ‘বি’ ‘ও’ গ্রুপের সঙ্গে আর-এইচ এর সম্বন্ধ

মায়ের রক্ত আর-এইচ নেগেটিভ হলেও যদি ‘ও’ গ্রুপের থাকে তখন মায়ের রক্তে ন্যাচারাল অ্যান্টি ‘এ’ এবং এন্টি ‘বি’ আইসোগ্লুটিনিন ‘এ’ বা ‘বি’ বা ‘এ-বি’ থাকে। সে ক্ষেত্রে সন্তানের রক্ত যখন  মায়ের শরীরে প্রবেশ করে তখন রক্তের সেলগুলি মায়ের আইসোগ্লুটিনিন দ্বারা ধব্বস্প্রাপ্ত হয়। এর ফলে কোনো সেনসিটাইজেসন প্রক্রিয়া শুরু হয় না বা অ্যান্টিবডিও তৈরি হয় না। সেক্ষেত্রে সন্তান সাধারণত আর-এইচ অ্যান্টিবডির প্রভাবমুক্ত থাকে।

  • অ্যান্টিবডি জানার উপায়?

গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তে আর-এইচ অ্যান্টিবডি আছে কি না বা তৈরি হয়েছে কি না জানার জন্য ইনডিরেক্ট কুম্বস টেস্ট করা  হয়। এই পরীক্ষায় যদি মায়ের রক্তে রক্তে অ্যান্টবডি পাওয়া যায় বা দেখা যায় যে অ্যান্টবডির পরিমাণ ক্রমশই বাড়ছে তখন সন্তানের আর-এইচ সমস্যাগুলি দেখা দেবে। সেক্ষেত্রে আরো কিছু পরীক্ষা যেমন অ্যামানিওসিনটিসিস ইত্যাদি করে বিলিরুবিনের পরিমাণ মাপা হয় এবং সেইমতো চিকিৎসা ব্যবস্থা করা হয়, এমনকি গর্ভস্থ সন্তানের শরীরে আর-এইচ নেগেটিভ রত প্রবেশ করিয়ে সন্তানকে বাঁচানো যায়। এই প্রক্রিয়াকে ইন্ট্রাঅ্যামনিয়াটিক ফিটাল ব্লাড ট্রান্সফিউসন বলা হয়।

  • আরএইচ এর সমস্যা থেকে নিষ্কৃতি?
  • বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে আর-এইচ এর সমস্যা যাতে না হয় তাঁর জন্য ইনজেকসন ‘অ্যান্টি ডি ইমিউনোগ্লোবুলিন’ আবিস্কৃত হয়েছে। এই ইনজেকসন মাকে-দিলে মায়ের শরীরে যে আর-এইচ পজিটিইভ রক্তকণিকা থাকে তাঁর চারপাশে এক আবরণের সৃষ্টি করে। এর ফলে সন্তানের পজিটিভ রক্তকণিকা মায়ের শরীরের নেগেটিভ রক্তকণিকার সংস্পর্শে এলেও কোনো অ্যান্টিবডি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে না। এই ইনজেকসন মাকে দেওয়া হয় এবং গর্ভপাত বা প্রসবের ৭২ ঘন্টার মধ্যেই দিতে হয় যাতে পরবর্তী সন্তান ক্ষতিগ্রস্থ না হয়।
  • মন্দিরা চ্যাটার্জিদের কি হবে?

যেহেতু মন্দিরা চ্যাটার্জিরা গর্ভপাত করিয়েছিলেন এদের রক্তে সেনসিটাইজড রক্তকণিকা বা আর-এইচ অ্যান্টিবডি থাকার সম্ভাবনা বেশি। এদের রক্ত ইনডাইইরেক্ট কুম্বস টেস্ট করানোর জন্য পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষায় যদি আর-এইচ অ্যান্টিবডি পাওয়া যায় তবে প্রসবের পূর্বেই এদের অ্যান্টি ডি ইমিউনোগ্লোবুলিন নিতে হবে। প্রথমটি ৭ মাসের মাথায় আর দ্বিতীয়টি সাড়ে আট মাসের মাথায় এবং ডেলিভারির পর ৭২৫ ঘন্টার মধ্যে অবশ্যই আর একটি। এই ইনজেকশনগুলির এক একটির দাম প্রায় আড়াই হাজার টাকার মতো।

লেখকঃ ডাঃ প্রসন্ত কুমার সেন গুপ্ত।

আপনি কি আপনার লিখিত কোন কিছু প্রকাশ করতে আগ্রহী? তাহলে আপনার লিখিত সামগ্রী পাঠিয়ে  দিন amarbanglapost@gmail.com এই ঠিকানায়। আমরা আপনার লেখিত সামগ্রী আমাদের নির্দিষ্ট বিভাগে প্রকাশিত করে দিবো।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

নারীরা মাসিকের সময় যে ৭ টি ভুল করে থাকে!

মাসিক নিয়ে নানা লুকোচরি থাকলেও এ সম্পর্কে খোলাখুলি আলোচনা করাটা অনেক বেশী স্বাস্থকর ও নারীর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE