Breaking News
Home / সাহিত্য / কিছু গল্প / একটি মিষ্টি রাতের গল্প পর্ব ১১-১৫

একটি মিষ্টি রাতের গল্প পর্ব ১১-১৫

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, একটি মিষ্টি রাতের গল্প ১১ থেকে ১৫ তম পর্বে আপনাকে স্বাগতম। ১ থেকে ১০ তম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পর্ব – ১১

নাফিস চিন্তিতমুখে বসে রইল কিছুক্ষন।অরণীও চুপচাপ বসে আছে।নাফিসই প্রথমে নীরবতা ভাঙল।বলল- তোমার তো ফুলে অ্যালার্জি হয়, চল বিছানার ফুলগুলো খুলে ফেলি।
– ফুলগুলোর ঘ্রাণ কমে গেছে।অনেকটা নেতিয়ে পরেছে।সেজন্য আমার তেমন প্রবলেম হচ্ছে না।
-কিন্তু আমার নিজের কাছেই কেমন ঝামেলা মনে হচ্ছে।
-থাক না। এত সুন্দর করে বিছানাটা সাজানো হয়েছে,নষ্ট করতে ইচ্ছে করছে না।
-ঠিক আছে।
-আপনি হঠাৎ এমন আনমনা হয়ে গেলেন কেন?টেনশন করছেন?সবকিছু নিয়ে এতো ভাবলে চলে?তখন খুব তো আমাকে নিয়ে ভাবলেন।এবার জনাব নিজের কথাও একটু ভাবুন।আপনার মতো একজন সিরিয়াস গাই বাবা-মার বিরুদ্ধে যাবে,ভাবা যায় না।তার ওপর মেয়েটা আবার ডিভোর্সি।বউ হিসেবে সে এ বাড়িতে কতটা বেমানান,তা একবারও ভাবলেন না?
নাফিস চুপ করে বসে বাধ্য ছেলের মতো কথাগুলো শুনছে,কোনো প্রতিবাদ করছে না।অরনী বলতে লাগল- আপনি তাদের একমাত্র ছেলে।আপনার বাবা-মার সমস্ত স্বপ্ন আপনাকে ঘিরে।অরনী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল- আচ্ছা আপনাদের সম্পর্ক কতদূর এগিয়েছে?
-মোল্লার দৌড় ঐ মসজিদ পর্যন্ত।হাগিং,কিসিং পর্যন্তই সীমাবদ্ধ।
অরনী মন খারাপ করে বলল-হাগিং,কিসিংয়ের কথা কেন আসছে? আপনাদের সম্পর্কের গভীরতা সম্পর্কে আমি জানতে চাচ্ছি।
-সরি,আসলে আমি বুঝতে পারিনি।ওকে আমি অনেক ভালবাসি।
–আমার ধারনা,আপনি মেয়েটাকে সিরিয়াসলি ভালোবাসেন না।যদি সত্যিই তাকে ভালোবাসতেন,তাহলে পৃথিবীর কেউ আপনাকে এ বিয়েতে রাজি করাতে পারত না।অবশ্য আপনাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষই জানে না ভালোবাসা কি। তারপরেও তারা ‘ভালোবাসি’ বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে।আমার কথা শুনে রাগ করলেন?
নাফিস যেন হঠাৎ ফিউজড হয়ে গেল।কি বলবে ভেবে পেল না।
অরণী বলল–মি. রোমিও এবার আপনার ফোনটা অন করুন। বেচারি জুলিয়েটের হার্ট এটাক হয়ে যাবে যে!
নাফিস বাধ্য ছেলের মতো ফোন অন করতে করতে বলল–রাত তিনটা বাজে।ঘুমাবে না?
–একজন অপরিচিত ছেলের বিছানায় আমার ঘুম হবে না।
–শোন মেয়ে,বিপদের সময় এত ছুঁচিবাই থাকলে চলে না।
–সত্যিই আমার ঘুম আসবে না।
–তাহলে তুমি বসে থাকো,আমি ঘুমাতে গেলাম।
–ঘুমানোর আগে প্লিজ আমাকে ঠান্ডা পানির একটা বোতল এনে দিন।
–পারবো না।নিজের কাজ নিজে করে নেয়া ভালো।
–ভীষন অভদ্র ছেলে তো আপনি!এক রাতের জন্য হলেও আমি আপনাদের বাড়ির গেস্ট। গেস্টদের সাথে আপনারা এমন আচরণ করেন?
–সব গেস্টদের সাথে করিনা।
–এটা কিন্ত চূড়ান্ত রকমের অভদ্রতা হয়ে যাচ্ছে।
–ওহ!রিয়েলি?
–ডেভিল,আপনি একটা ডেভিল।
–আমি ডেভিল।আর তোমার ওই গিট্টু ডেভিল না?সে তোমাকে ভালোইবাসে না।দেখবে কাল সকালে সে তোমার টাকা পয়সা, গয়নাগাটি নিয়ে তোমাকে ফেলে উধাও হয়ে যাবে।
–সে যদি ডেভিল হয় হবে।তাকে আমি অনেক বছর ধরে চিনি।”নোন ডেভিল ইজ বেটার দ্যান আননোন।”
নাফিস বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আরামে চোখ বন্ধ করে বলল–ওকে যাও আমি ডেভিল। আমি যেহেতু ডেভিল সেহেতু পানির বোতল এনে দেবার প্রশ্নই আসে না।আর আমার সাথে তুমিও কোন কথা বলবে না।এই মূহুর্ত থেকে আমাদের বাক্যালাপ বন্ধ।
–সরি, আপনাকে ডেভিল বলা আমার একদম ঠিক হয় নি।আপনি অনেক ভালো মানুষ। প্লি….জ…..আমার একটু ঠান্ডা পানি লাগবে।
নাফিস কোন জবাব না দিয়ে চোখ বন্ধ করে বিছানায় পরে রইলো।
অরণী নাফিসের পাশে বসে ওকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল–শুনছেন?আমার গলাটা ভীষণ শুকিয়ে গেছে।
–একবার যেহেতু শুয়ে পরেছি, আমাকে এখন ক্রেন দিয়েও কেউ টেনে তুলতে পারবে না।এবার একটু স্ত্রীর কর্তব্য পালন করো তো।আমার পা দু’টো টিপে দাও।সারাদিন অনেক ধকল গেছে।
–আমার তো খেয়ে দেয়ে কাজ নেই?ঠিক আছে এক্ষুণি আমি আপনার বাবাকে ডেকে বলে দেবো যে,কাল সকালে আপনি জেনিকে নিয়ে পালাচ্ছেন।
নাফিস চোখ কপালে তুলে বলল–এ মেয়ে তো সাংঘাতিক! স্মার্টলি ব্ল্যাকমেলিং হচ্ছে?স্বামী ভক্তি টক্তি কিছুই কি শেখো নি?ভুলে যাচ্ছ কেন যে একদিনের জন্য হলেও আমি তোমার স্বামী।
অরণী রেগে বলল–ডাকবো আপনার বাবাকে,মানে আমার একদিনের শ্বশুর আব্বাকে?
নাফিস উদাস গলায় বলল–ডাকো।আমিও তোমার পালানোর কথা বলে দেবো।
–কথাটা কারো কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না।কারণ ব্যাপারটা ভীষন ফিল্মি।কখনো কি শুনেছেন যে,বিয়ের পরদিন স্বামী,স্ত্রী দু’জনই তাদের এক্স লাভারের হাত ধরে পালিয়েছে?
নাফিস বিছানা থেকে উঠে বলল–ওকে রানী ভিক্টোরিয়া, আই সারেন্ডার। যাচ্ছি পানি আনতে।
অরণী বহু কষ্টে হাসি চেপে বলল–দ্যাটস লাইক আ গুড বয়।শুনুন,আমার একটু ক্ষুধাও পেয়েছে। কি করি বলুন তো!
–টেবিলে খাবার ঢেকে রাখা আছে।
–ভারী খাবার খেতে ইচ্ছা করছে না।হাল্কা কিছু হলে ভালো হতো।
টেবিলের ড্রয়ারে চকলেট আর বিস্কিটের প্যাকেট আছে,নিয়ে নিন মহারানী।
–থ্যাংক য়্যু।
ইট’স মাই প্লেজার।
অরণী হেসে ফেলে।
নাফিস পানি আনতে ডাইনিং রুমে গেল।নাফিসদের দোতলা, তিনতলাটা ডুপ্লেক্স সিস্টেমে বানানো।নাফিস,ঝিলমিল আর ওদের বাবা মার বেডরুম তিনতলায়।আর ওদের ড্রইংরুম, ডাইনিং রুম,গেস্ট রুমগুলো সব দ্বোতলায়।
নাফিসের ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো। বিরামহীনভাবে ফোনটা বেজেই চলেছে। শেষ পর্যন্ত অরণী ফোনটা রিসিভ করলো। কারো ফোন বিনা অনুমতিতে রিসিভ করা অভদ্রতা জেনেও সে কাজটা করলো। এই মুহূর্তে অরণীর মাথায় একটা খেলা ঢুকে গেছে। জেনিকে তার কিছু কথা শোনাতে ইচ্ছা করছে। ইচ্ছাটাকে সে কিছুতেই দমন করতে পারলো না।

১২ তম পর্ব

–হ্যালো! অরণী স্পিকিং।
অরণীর গলা শুনে জেনি কয়েক সেকেন্ড কোন কথা বলতে পারলো না।পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে কাটা কাটা গলায় বলল–নাফিস কোথায়?
–রুমে নেই।
–কোথায় গিয়েছে? কখন ফিরবে?
–আমার জন্য ঠান্ডা পানি আনতে গিয়েছে। কখন ফিরবে জানি না।কিন্তু আপনি কে?
–আই এম নোবডি।
অরণী নির্লিপ্ত গলায় বলল–ঠিক আছে,নাফিস এলে বলবো নোবডি মানে অজ্ঞাতনামা এক নারী ফোন করেছিলেন।
–তুমি আমার সাথে রসিকতা করছো!অসহ্য।
–মেয়েদের অভিধানে অসহ্য বলে কিছু থাকতে নেই,ম্যাম।মেয়েদের সবই সহ্য করতে হয়।
–এই মেয়ে, তুমি পাগল নাকি?
–উঁহু,আমার মধ্যে পাগলামি নেই।
–তুমি নাফিসের ফোন রিসিভ করলে কি মনে করে?হু আর ইউ?
ফোনটা আপনার ফাদারের মাল নাকি?আমার হাজবেন্ডের ফোন আমি রিসিভ করেছি,এতে দোষের কি?
–কি বললে তুমি?
অরণী নীরিহ গলায় বলল–আমার কথা বুঝতে পারেন নি ম্যাম?আমি তো স্প্যানিশ ভাষায় বলি নি।
–তুমি একটু বেশিই বলছো না?
–মেয়েরা তো একটু বেশি কথা বলবেই।মেয়েদের মস্তিষ্কে ফক্সপিটু নামের ‘ল্যাংগুয়েজ প্রোটিন ‘ বেশি থাকে।তাই মেয়েরা পুরুষদের তুলনায় তিনগুণ বেশি কথা বলে।তাছাড়া কথা বেশি বলা যাদের স্বভাব তাদের মনটা অনেক বড় হয়ে থাকে, এটা নিশ্চয়ই আপনি জানেন।
–বড় মাপের শিকার ধরে ফেলেছ বলে তোমার কনফিডেন্স লেভেলটা একটু বোধহয় বেড়ে গেছে।
–শিকার কাকে বলছেন?নাফিসকে? আমারও কিন্তু মনে হচ্ছে,নাফিসের মত ছেলের গার্লফ্রেন্ড হতে পারার অহংকারে আপনি ফেটে পরছেন। কিন্তু ম্যাম,এত অহংকারী হলে শিকার ফসকে যাবার ভয় থাকে।
–হাউ ডেয়ার ইউ?তুমি আমার সাথে তর্ক করছো?
অরণী শান্তস্বরে বলল–আপনার সাথে তর্ক করা পাপ নাকি?
–অভদ্র মেয়ে!মানুষের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না?
–আমাকে আপনি ভদ্রতা শেখাচ্ছেন?
–এই মেয়ে,তোমার প্রবলেম কি?তুমি কি নাফিসের প্রেমে পরেছো?
অরণী উদাস গলায় বলল–এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।প্রেম অন্তর্যামী। তবে ‘লাভ আফটার ম্যারেজ ‘ এর কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন?
–সব মিথ্যা।এত অল্প সময়ে কারো প্রেমে পরা যায় নাকি?
–সেকেন্ডের দেখাতেও প্রেম হয়ে যেতে পারে।আপনি কি ‘লাভ এট ফার্স্ট সাইট ‘ এর কথাও শোনেননি?
–তুমি তো স্বার্থের জন্য ওকে বিয়ে করেছো।টাকার লোভে পরে বিয়েটা করেছো।
অরণী ভীষণ ঠান্ডা গলায় বলল–মানুষ যে কতটা নিঃস্বার্থ হতে পারে সে ধারণাই আপনার নেই
এই যে প্রথম থেকে আপনাদের নির্লজ্জের মত আচরণ আমি হাসিমুখে সহ্য করে যাচ্ছি, এটা কি স্বার্থত্যাগ না?
–কি বললে?আমি তোমাকে চরম শিক্ষা দেবো।
জেনি তোতলাতে আরম্ভ করলো।
–কিভাবে শিক্ষা দেবেন?এবাড়িতে এসে শিক্ষা দেবেন?
–প্রয়োজন হলে আসবো।
–এ ধরণের কোন ঝুঁকি নিতে যাবেন না,প্লিজ।এবাড়ির প্রতিটা মানুষ আপনার বিরুদ্ধাচরণ করবে। সবাই আমার পক্ষ নেবে।ইনফ্যাক্ট,
আমাকে সবাই দেখে-শুনে এবাড়ির বউ করে এনেছে। আমি জোর করে এবাড়িতে ঢুকে পরিনি।
অরণী যেন জেনির দিকে অদৃশ্য এক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল এবং সে এমন ভাব করলো যেন শেষ পর্যন্ত সেই চ্যালেঞ্জটা জিতে যাবে।
জেনি বলল–তোমার লজ্জা করে না বড় বড় কথা বলতে? নাফিস কোনদিনও তোমাকে গ্রহণ করবে না।
–সে আমাকে গ্রহণ করুক না করুক,এটা আমার সংসার। আমিই ওর বউ।
–আই ডোন্ট কেয়ার।
–আমি বুঝতে পারছি,আপনি ভীষণ একগুঁয়ে। কিন্ত ম্যাম,বাস্তবতা টা একটু বোঝার চেষ্টা করুন।যেসব সম্পর্কগুলোতে এথিকস থাকে না,সে সম্পর্কগুলোতে প্রেম যেমন হঠাৎ উদয় হয়,তেমনি হঠাৎ আবার রংধনুর মত মিলিয়ে যায়।একসময় নাফিস তার ভুল বুঝতে পারবে এবং তখন সে আর আপনাকে গ্রহণ করতে চাইবে না।তাই প্রেম প্রেম খেলাটা এখানেই শেষ করে দিয়ে দেখেশুনে একটা বিয়ে করে ফেলুন,সব ঠিক হয়ে যাবে।।
জেনি দাঁতে দাঁত চেপে বলল–দ্যাট ইজ নট ইয়োর বিজনেস।
–আমি জানি,আমার কথাটা আপনি গ্রহণ করতে পারবেন না।সমাজে কেউ কেউ আছে যারা মুমূর্ষু বিবেক নিয়ে জন্মায়।তবে এই সহজ কথাটা আপনার বোঝা উচিত যে,নাফিসের ফ্যামিলি আর স্ট্যাটাস আপনাকে ভালো চোখে দেখে না।
কথাগুলো বলতে পেরে অরণী অনেকটা হাল্কা অনুভব করছে। জেনি দপ করে নিভে গেল।কিছুক্ষন চুপ করে থেকে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল–ইউ আর আ বিচ।
কথাটা শুনে অরণী একটুও রেগে গেল না।ভীষণ ঠান্ডা গলায় বলল –মানুষকে অসম্মাম করার শিক্ষাটা আমি পাই নি।তাই আপনার শেষ কথাটার জবাবে থ্যাঙ্কস বলা ছাড়া আমার আর কিছুই বলার নেই।আর কিছু বলবেন?
জেনি ফোন কেটে দিল।অরণী বুঝলো মেয়েটা ভালোই রেগেছে। সুযোগ পেলেই সে পাল্টা আক্রমণ করার চেষ্টা করবে। অরণী ভাবনায় পরে গেল।এতটা বলা কি ঠিক হলো?জেনি মেয়েটা কিছুটা বিরক্তিকর, তাই বলে সে কেন জেনির কষ্টটা খুঁচিয়ে বাড়িয়ে দেবে?তবে কি সে মনের অজান্তে নিজেকে জেনির জায়গায় দাঁড় করিয়েছে?আর সে জন্যই কি তার ভেতরে জেনির প্রতি খুব সূক্ষ্ম একটা ঈর্ষাবোধ কাজ করছে? কিন্তু সেরকম তো হবার কথা না।কখনো কখনো নিজের মনের ভেতর যে আরেকটা মন থাকে সেই মনটা খুব অচেনা হয়ে যায়।
ঠান্ডা পানির বোতল হাতে নাফিস রুমে ঢুকে অরণীকে ফোনে কথা বলতে দেখে রেগে গেল।রেগে বলল–হোয়াট দ্য হেল ইজ গোয়িং অন হিয়ার?
অরণী অপ্রস্তুত হলো।নাফিস যে এতটা রেগে যেতে পারে তা তার আগেই ভাবা উচিত ছিল।

পর্বঃ১৩

আপনি কিন্তু সেই তখন থেকে আমাকে কথা শোনাচ্ছেন।
আমি কিছু বলছি না কারণ আমি বড়দের মুখের ওপর কথা বলতে পারি না।
–তুমি জেনিকে কি বলেছ?
–আস্ক হার…..
নাফিস চোখ মুখ শক্ত করে বলল–আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাচ্ছি।
অরণী ঢোক গিলে বলল–আমি শুধু জেনির সামনে বাস্তবতাটা তুলে ধরেছি।আমি ওকে বলেছি,ওর প্রতি আপনার মধ্যে এক ধরণের বিভ্রম কাজ করছে,যাকে বলে অক্ষি বিভ্রম।এক সময় আপনার এ বিভ্রাট কেটে যাবে।সত্যটা আপনার সামনে এসে দাঁড়াবে।সত্যেরও কিন্তু একটা সৌন্দর্য আছে।
–আর ইউ ক্রেজি?
–আপনার পার্সোনাল ব্যাপারে নাক গলানোটা আমার একেবারেই ঠিক হয় নি,এখন বুঝতে পারছি। আসলে না বুঝে একটা বোকামি করে ফেলেছি। কথায় বলে না,স্ত্রী বুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী। সরি….
নাফিস তিক্ত কন্ঠে বলল–কেন করলে এই নাটকটা?
–বললাম তো,আই অ্যাম সরি।
–সরি বললেই সব শেষ!মেয়েটা ফোনে হাউমাউ করে কাঁদছিল, ঠিক মত কথাও বলতে পারছিল না।
–আজিব বাত!আমি তাকে এমন কিছুই বলিনি
যার জন্য সে হাউমাউ করে কাঁদবে। সত্যিই আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
নাফিস হতাশ গলায় বলল –তোমার বোঝার কথাও না।
–তাহলে আমাকে না বুঝিয়ে তাকে বোঝান।
–কাজটা তুমি মোটেও ঠিক কর নি।
অরণী এবার রেগে গিয়ে বলল–এখন আমি কি করবো?আপনার পা ধরে মাফ চাইবো?
নাফিসের বিরক্তি এবার চরমে উঠলো। সে বলল–ইট’স ইনটলারেবল।তোমার ফাজলামোটা সত্যিই আমার আর ভালো লাগছে না।আমাকে একটু একা থাকতে দাও।গেট আউট অফ মাই রুম প্লিজ।আমি এক থেকে তিন গুনবো, এর মধ্যে তুমি বিদায় হবে।
অরণী অসহায় ভঙ্গিতে বলল–এত রাতে আমি কিছুতেই বারান্দায় যেতে পারবো না।আপনাদের বারান্দার পাশের তেঁতুলগাছটাতে ভূত আছে,আমি সিওর।
নাফিস কঠিন চোখে অরণীর দিকে তাকালো।অরণী নিরুপায় হয়ে বারান্দায় চলে গেল।
অরণীকে কেউ কোনদিন এভাবে অপমান করতে পারে এটা তার ধারনাতে ছিল না।
নাফিসের সাথে আর একটাও কথা বলবে না বলে সে সিদ্ধান্ত নিল।এই মুহূর্তে তার অসম্ভব মন খারাপ। আজ তার জন্মদিন। আজ এমন একটা বিশেষ দিনে কিনা নাফিস তাকে এভাবে অপমান করলো!
নাফিস অবশ্য তার জন্মদিনের ব্যাপারটা জানে না।
তবুও নাফিসকে সে ক্ষমা করবে না।
অরণীর চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।বুকের ভেতরটা হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠলো।কিছুতেই সে চোখের পানি আটকে রাখতে পারছে না।
এই মুহূর্তে নিজেকে তার ভীষণ অসহায় লাগছে।
ভোর হতে এখনো অনেক সময় বাকি।বৃষ্টি থেমে গেছে,পৃথিবীকে ঠান্ডা করে দিয়ে।চারদিক সুনসান নীরবতা। মিষ্টি আর শীতল বাতাসের ঝপটা এসে চোখেমুখে পরছে। অরণীর একটু শীত শীত লাগছে। চেয়ারে হাঁটু ভাজ করে হাঁটুতে থুতনি রেখে জড়সড় হয়ে সে বসে আছে।এভাবে বসে থাকতে অরণীর ভালো লাগছে। বাকি রাতটুকু সে এখানে বসেই কাটিয়ে দেবে বলে সিদ্ধান্ত নিল।
বারান্দা থেকে বড় রাস্তার অনেকটাই দেখা যায়।লাইট পোস্টের মৃদু আলোতে নিস্তব্ধ শহরটাকে মায়াবী লাগছে। মাঝে মাঝে অল্প দূর থেকে নৈশ প্রহরীদের বাঁশির তীক্ষ্ণ শব্দ নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দিচ্ছে। দূরে কোথাও একটু পর পর কুকুর ডেকে উঠছে। অনেক্ষণ পর পর হুসহাস করে দু’একটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে হেডলাইট জ্বালিয়ে।
অরণীর ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে আসছে।নিজেকে চিনতে এই মুহূর্তে তার কষ্ট হচ্ছে।নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মনকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করছে –“কেন আমি নিজের সাথে প্রতারণা করছি?কেন আমি হিমেলের হাত ধরে পালাবো? আমি তো হিমেলকে ভালোইবাসি না।”আজ আবার নতুন করে সব কিছু ভাবতে ইচ্ছা করছে তার।
এ বিয়েতেই বা কেন রাজি হয়েছে সে?এ বিয়েটা না করলে অবশ্য ঐ নরক থেকে তার মুক্তির একটাও পথ খোলা ছিল না।কি লেখা আছে তার ভাগ্যে?সকালে তার জন্য কিই বা অপেক্ষা করছে কে জানে?কেন তার জীবনটা আর দশটা মেয়ের মত সহজ না?
বাবা নামের কিম্ভূত ঐ লোকটাকে পরাজিত করতে গিয়ে সে নিজেই কি নিজের কাছে হেরে যাচ্ছে না?বিয়েটা সে করেছে মুক্তির জন্য।ভয়ানক এক স্বৈর সাম্রাজ্য থেকে সে মুক্তি চায়।কিন্তু বিয়ে কি আসলেই তাকে মুক্তি এনে দেবে নাকি এক শেকল থেকে অন্য শেকলে বেঁধে ফেলবে?অদ্ভুত একটা কান্না হঠাৎ অরণীর সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।
আজ হঠাৎ তার খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসতে ইচ্ছা করছে। বৈচিত্র্যময় পৃথিবীটাকে চোখ মেলে দেখতে ইচ্ছা করছে।জ্ঞান হবার পর থেকেই যে নিঃসঙ্গতা তার সঙ্গি হয়ে আছে সে নিঃসঙ্গতা আজ তার মনে নতুন দুঃখবোধের জন্ম দিচ্ছে।
আর মা?মা কি তাকে মনে রেখেছে? মা সম্পর্কে তার ভেতরে কুয়াশাচ্ছন্ন একটা কল্পনা, একটা অনুভূতি কাজ করে সবসময়। ঠিক পরিস্কারভাবে সে কিছু ভাবতে পারে না।অনেক চেষ্টা করেও সে মনের সেই কুয়াশাভাব দূর করতে পারে না।
অরণী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
–আরে,তুমি কাঁদছো?তুমি যে এতটা টাচি টাইপ মেয়ে,তা কিন্তু আমি বুঝিনি। সরি আমার ওরকম আচরণ করা একদম ঠিক হয় নি।আসলে আমি ভীষন টেনশনে আছি।
অরণী দ্রুত নিজেকে সামলে নিল,তবে নাফিসের কথার কোনো জবাব দিল না সে।মাথা না তুলে থুতনিটা সেই আগের মত হাঁটুতে চেপে স্থির বসেই রইল,যেন সে নাফিসের কথা শুনতেই পায়নি।
–তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
অরণী বুঝতে পারছে যে খেলা উল্টে গেছে। প্রথমে যেই ছেলেটা তাকে মানুষ বলেই গণ্য করেনি,সেই এখন ওকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে দিয়েছে।
অরণী বলল–আমার জন্য কষ্ট হচ্ছে?
–নাহ!আসলে….
-আপনার ভাব ভঙ্গি দেখে সেরকমই মনে হচ্ছে।
–তোমার সাথে আমার সত্যিই জরুরি কথা আছে,ভেতরে এসো।
নাফিসের কথার মধ্যে কতৃত্বের ভাব ফুটে উঠলো।
অরণী এই কথার কোন জবাব দিল না,স্থির বসে ছিল।
–অরণী,আমরা কি বন্ধু হতে পারি না?
এই প্রথম নাফিস খুব সহজ আর আন্তরিকভাবে অরণীর সাথে কথা বলল।
অরণী বলল–বেশি ফ্রেন্ডলি হবার চেষ্টা করবেন না।
–আমার দিকে একটু তাকাবে প্লিজ?আমরা কি একটু হার্ট টু হার্ট কথা বলতে পারি না?
অরণী কোন কথা না বলে বারান্দা থেকে উঠে ভেতরে চলে এলো।
–কফি খাবে?
অরণী অবজ্ঞামাখানো কন্ঠে বলল–আপনারা পুরুষেরা পারেনও।মন চাইলে ছুঁড়ে ফেলে দেন আবার মন চাইলে তুলে নেন।মেয়েরা আপনাদের কাছে খেলনা সামগ্রী। বাহ!মজা তো!
নাফিস অবাক হয়ে ভাবছে,এতটুকু মেয়ে এত কথা কোথায় পায়,কে জানে?
নাফিস আহতস্বরে বলল–আমাকে যতোটা খারাপ ভাবছো,ততটা খারাপ কিন্তু আমি নই।
অরণী অবাক হয়ে বলল–আপনি বলতে চাচ্ছেন আপনি ভালো?এই যে অরণী নামের একটা মেয়েকে বিয়ে করলেন, মেয়েটা অরণী না হয়ে অন্য কেউ হলে কি অবস্থা হতো, ভেবেছেন একবার?
নাফিস জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো অরণীর দিকে।
অরণী বলল–মেয়েটা তার উনিশ/বিশ বছর বয়সের সমস্ত স্বপ্ন নিয়ে এ ঘরে প্রবেশ করতো।তারপর আপনার আর জেনির প্রেমালাপের এক পর্যায়ে সে হয়তো আপনারই রুমের ফ্যানের সাথে ঝুলে পরতো।শুধুমাত্র আপনার ইরেসপন্সিবিলিটির জন্য এমন কিছু ঘটতে পারতো।
নাফিস এভাবে ভাবেনি একটাবারের জন্যও।কথাগুলো শুনে সে একেবারে থ’ হয়ে গেল।
অরণী মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল।নাফিস অরণীর দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে, তার দৃষ্টি এলোমেলো। এই প্রথম সে মেয়েটাকে ভালো করে লক্ষ্য করলো। এরকম স্নিগ্ধ আর দুঃখি চেহারার মেয়ে সে জীবনে কখনো দেখে নি।এ মেয়ের মধ্যে কোন ভাণ নেই,ন্যাকামি নেই,ওভারস্মার্ট সাজার কোন তাড়া নেই।এরকম নির্ভেজাল মেয়ে বোধহয় সারা পৃথিবীতে আর একটাও নেই।অরণীর প্রতি নাফিস হঠাৎ ভীষন টান অনুভব করতে লাগলো।
নাফিস বল–তুমি আমাকে যা যা বললে আমি মেনে নিলাম।এবার ব্যাপারটা একটু উল্টো করে ভাবো তো!
কথাটা বলে নাফিসও বসে পরলো অরণীর মুখোমুখি।
নাফিস বলল–এই যে সকালে তুমি গিট্টু মানে হিমেলের হাত ধরে হাওয়া হয়ে যাবে।আমি যদি জেনি নামের কারো সাথে ইনভলবড না থাকতাম, এক রাতের মধ্যে আমি তোমার প্রেমে পরে যেতাম।তখন আমার কি অবস্থা হতো?তোমাকে হারিয়ে আমাকে হয়ত মেন্টাল হসপিটালে যেতে হতো।
অরণী একটুও না ভেবে বলল–শহুরে ছেলেরা প্রেমের ক্ষেত্রে অনেক হিসেবি হয়।ওরা এক রাতের মধ্যে কারো প্রেমে পরে না।
–সবাই কি একরকম? আমি হয়ত তোমার প্রেমে পরে যেতাম।তোমার প্রেমে না পরে আমার অবশ্য কোন উপায় থাকতো না।তখন কি একটা ফ্যাঁকড়া বেঁধে যেত,ভেবেছ তুমি?
কথাটা বলেই নাফিস ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হিল।
অরণী অসহায়ভাবে তাকালো নাফিসের দিকে।থমথমে মুখে বলল– এছাড়া আমার সামনে আর কোন পথ খোলা নেই।
নাফিস রুমের ভেতর দু’এক মিনিট চিন্তিত ভঙ্গিতে পায়চারি করে বলল– কিন্ত গিট্টুর সাথে তোমার প্রেমটা হলো কেন?
নাফিসের এই প্রশ্নে অরণী গভীর দুঃখবোধ থেকে যেন উঠে এলো।
হাল্কা রসিকতার সুরে বলল–খাওয়া,ঘুম আর পড়াশুনা করা ছাড়া আমার আর তেমন কিছু করার থাকতো না।তাই ওর সাথে প্রেমটা শুরু করেছিলাম।
ঐ সময় প্রেম না করলে যে বেকার হয়ে যেতাম।
–সেটা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু তোমার প্রেমের নায়ক গিট্টু কেন?
অন্য কেউও তো হতে পারতো।
–আপনাকে তো বলেছিই, আমার বাবাকে ডিঙ্গিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ানোর সাহস আর কারো ছিল না।তাই গিট্টুকেই…..কথায় বলে না,
নাই বয়ফ্রেন্ডের চেয়ে কানা বয়ফ্রেন্ড ভালো।
অরণীর এই রসিকতায় নাফিস হো হো করে হেসে উঠলো। তারপর বলল–ইস!তখন যদি তোমার সাথে আমার দেখা হতো!
–আপনার সাথে দেখা হলে কি আমার ষাটের দশকের সাদা-কালো সিনেমার মতো জীবনটা রঙ্গিন হয়ে উঠতো?মোটেই না।আমি হচ্ছি দূর্ভাগ্যের প্রতীক।
–আমার মনে হচ্ছে,আমার সঙ্গে তোমার দেখা হলে তোমার জীবনের গল্পটাতে একটা টুইস্ট চলে আসতো।
অরণী হেসে বলল–আমাকে তখন পাগল বললেন।আপনি নিজেও কিন্তু কোন অংশে কম না।
–মাঝে মাঝে পাগল হওয়া দোষের না,বুঝলন ম্যাডাম!
–হুম বুঝলাম, ফ্লার্টিং চলছে। আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
–কি কথা?
–মিস জেনির পেছনে আপনার মাসে কত খরচ করতে হয়?
–মানে?
–না বোঝার মত কোন প্রশ্ন কিন্তু করি নি আমি।শুনেছি,শহরের ছেলেরা বিগ বাজেটে প্রেম করে।মানে প্রেমিকার পেছনে অনেক খরচাপাতি করে।
–খরচ তো একটু হয়ই।বাইরে ঘোরাফেরা,খাওয়া, গিফট…….
–কিন্তু আমাদের প্রেমটা অনেক কম বাজেটের।মি. রোবট আমাকে সপ্তাহে দু’একটা চিঠি দেয়,আমি বই পড়তে ভালবাসি বলে আমাকে মাসে দু’একটা বই কিনে দেয়,ব্যস।আমরা ফোনেও কথা বলতে পারিনা।
কেন?
–আমার কোন ফোন নেই।বাবা আমাকে ফোন ব্যবহার করার পারমিশন দেয় নি।
–আচ্ছা,তোমার প্ল্যানিং টা একটু বলবে ঠিক করে?
–তেমন কিছু না।মি.রোবটের সাথে কিছুদিন দূরে কোথাও থাকবো।তারপর পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে অচেনা কোন শহরে বা গ্রামে সেটেল হবো,ঘর-সংসার করবো।হিমেল সারাদিন রিক্সা চালিয়ে ঘরে ফিরবে। আমি শাড়ির আঁচল দিয়ে ওর কপালের ঘাম মুছে দেবো,তালপাখা দিয়ে ওকে বাতাস করবো।ও শুয়ে শুয়ে আমার সাথে গল্প করবে…..
–স্টপ ইট।তোমার এই বাংলা সিনেমার চিত্রনাট্য শুনতে ভালো লাগছে না,বোরিং।দেখো মেয়ে,হুতাশে চলবে না।তোমার বয়স অল্প।এই বয়সে হাসবেন্ডের রিক্সা চালানোর ব্যাপারটা অনেক থ্রিলিং মনে হবে।বাস্তবতা কিন্তু অন্য জিনিস।তোমার মতো ব্রাইট একটা মেয়ের আরো বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।আচ্ছা ঐ গিট্টুকে তোমার কেন পছন্দ?
–কেন পছন্দ জানিনা।তবে ও কথা কম বলে।ওর এই কম কথা বলা স্বভাবটা আমাকে আকৃষ্ট করে।সবাই নিজের স্বভাবের উল্টো কাউকেই পছন্দ করে সাধারণত। আমি কথা বেশি বলি আর ও নির্বাক আচরণ করে।
–ব্যস,এই কারনেই? প্লিজ হুট করে কোন সিদ্ধান্ত নিও না।দরকার হলে এবাড়িতে থাকো কিছুদিন আর ঠান্ডা মাথায় ভাবো।
অরণীর ঠোঁটে মুচকি হাসির রেখা ফুটে উঠলো। সে বলল–পারবেন জেনিকে সামলাতে? আমি এবাড়িতে থাকলে সে আপনাকে কুচি কুচি করে কেটে লবণ ছিটিয়ে খেয়ে নেবে।
–দ্যাটস নট ইয়োর হেডেক।ওটা আমার ব্যাপার। আসলে চাল-চুলোহীন গিট্টুর সাথে তোমার চলে যাওয়াটা আমি ঠিক মেনে নিতে পারছি না।ও তোমাকে খাওয়াবে কি?
অরণী দৃঢ় কন্ঠে বলল–না খেয়ে থাকবো। ভূখা দিবস পালন করবো।এদেশের কত শত মানুষ অনাহারে,অর্ধাহারে দিন কাটায়।আমিও তাদের দলে যোগ দেব।
–দেখো খুকি,সাহস দেখানো ভালো,তবে দুঃসাহস দেখানো ভালো না।
–আই ডোন্ট এক্সপেক্ট এনিথিং ফ্রম হিম।তাই ওর সাথে থাকতে আমার সমস্যা হবে না।বাচ্চা-টাচ্চা পয়দা করবো,ওদেরকে লালন,পালন করবো।গিট্টুকে নিয়ে ভাবার সময়ই পাবো না।
অরণী হঠাৎ অপ্রাসংগিকভাবে বলল–আচ্ছা,জেনির অতিরিক্ত মেয়েলিপনা আপনি কিভাবে সহ্য করেন?
–অ্যাকচুয়ালি,আই অ্যাম ডিস্টার্বড উইথ হার।ও একটু বেশিই অ্যাগ্রেসিভ।
–আসলে আপনার মতো কনজারভেটিভ মেন্টালিটির ছেলে জেনিকে….. ঠিক মিলছে না।
নাফিস অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে বলল–আমাকে কনজারবেটিভ ভাবার কোন কারণ নেই।

পর্ব ১৪

–জেনিকে কোথায় পেলেন,বলুন তো!
–ফ্রেন্ডের বড় বোন।ফেসবুকে অ্যাড ছিল।ডিভোর্স হয়ে যাবার পর ও মেন্টালি ভীষণ আপসেট ছিল।মায়া থেকে দূর্বলতার জন্ম নিল।ওর সাথে নিয়মিত চ্যাট হতো।ওকে মেন্টাল সাপোর্ট দিতে দিতে কখন যে মেন্টাল অ্যাটাচমেন্ট তৈরি হয়ে গেল!
–হোপলেস!!কেন বোঝেন না যে, প্রতিটা সম্পর্কে এথিকস থাকা চাই।প্রেম-ভালোবাসাকে কি মুড়ির মোয়া মনে করেন? বন্ধুর বড় বোনকে বড় বোনের জায়গায় রেখেও তো সাপোর্ট দেয়া যেত,তাই না?বন্ধুকে মুখ দেখান কিভাবে?আপনার লজ্জা করে না?
–বন্ধুকে তো মুখ দেখাই না।ও ঘোষনা করেছে,আমাকে পেলে ঘুষি দিয়ে আমার চারটা দাঁত ভাঙবে।
–একদম ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।উনার জায়গায় আমি থাকলে প্রথমে আপনাকে রিমান্ডে নিতাম।তারপর সাঁড়াশি দিয়ে টেনে আপনার সব দাঁত তুলে ফেলতাম।
–তোমার দ্বারা একাজ যে সম্ভব তা বোঝা যায়।
অরণী বিরক্তি নিয়ে বলল–এত বোঝেন, তাহলে এই বিয়েটাই বা কেন করলেন?
–আমার ফ্যামিলিতে যারা ডিসিশন মেকার,তারা সবাই এ বিয়ের পক্ষে।আমি রাজি না হলে ওরা খেপে উঠত।পাবলিককে খেপিয়ে কি লাভ বলো?বাবা তো কিছুতেই আমার রিলেশন মেনে নিতে পারছিলেন না।তার হঠাৎ মনে পরে গেল বন্ধুর মেয়ে অরণীর কথা।ব্যস….বিয়ে অবধারিত।
–এটা হচ্ছে কার্যকারণ মানে কজ অ্যান্ড ইফেক্টের চমৎকার উদাহরণ।আপনি ভুল সম্পর্কে জড়িয়েছেন, সেজন্য তারা আপনার ওপর বল প্রয়োগ করেছেন। আপনি এমন কিছু না করলে তারাও এভাবে আপনার বিয়ের আয়োজন করত না।
–তাই বলে ওরা আমাকে এভাবে মধ্যযুগীয় কায়দায় বিয়ে করাবে? বলা নেই,কওয়া নেই,চেনা নেই,জানা নেই, হুট করে বিয়ে!!
অরণী হাসতে হাসতে বলল–সন্তানের প্রতি বাবার কর্তব্য পালনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
–আমার বাবাকে তুমি চেনোই না।আমার বাবা হচ্ছেন একজন পাঁকা ব্যবসায়ী। হিসেবটা তিনি ভালোই বোঝেন। বিপথে যাওয়া ছেলেকে পথে আনতে অবলা বালিকাকে তিনি বেছে নিয়েছেন। ভেবেছেন, মা-হারা নিরীহ এই মেয়েটা তার ছেলের বখাটেপনা সহ্য করে যাবে এমনকি তার পরকিয়া প্রেমও।চিরটাকাল বেচারা হয়ে এই সংসারেই থেকে যাবে।
–আমার বাবাও কম কোন দিক দিয়ে?ব্যবসায়ী আর রাজনীতিবিদদের মধ্যে কোথায় যেন একটা মিল আছে।বাবা আপনার কথা জেনেও আমাকে বিয়ে দিয়েছেন তার নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য।
দু’জনই হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।চার দেয়ালের ভেতর দু’জন মানুষ হঠাৎ একে অন্যকে ভীষণ আপন ভাবতে শুরু করল।
অরণীই প্রথম নীরবতা ভাঙল।
বলল–বাবার ওপ্র আমি প্রতিশোধ নেবো।সমাজে তার মুখ দেখা কিছুদিনের জন্য হলেও আমি বন্ধ করে দেবো।সবাই তার দিকে আঙ্গুল তুলে বলবে,এর মেয়ে বিয়ের পরদিন অন্য ছেলের হাত ধরে পালিয়েছে। সারাজীবন লোকটা মানুষের ইমোশন নিয়ে খেলেছে,এবার আমি তার ইমোশন নিয়ে খেলবো।
–কিন্তু উনি এমন কি করেছেন যার জন্য তোমাকে নিজের জীবন নিয়ে খেলতে হবে?
–আমার সমস্ত মনের মধ্যে ঐ লোক্টার প্রতি ঘৃনা কিলবিল করছে।বাবা নামের ঐ কিম্ভূত লোকটার সাথে আমার সব সম্পর্ক সকালেই চুকে যাবে,এটা ভেবে ভালো লাগছে আমার।
কষ্টের অতল গভীর থেকে উঠে এসে যেন অরণী কথা বলছে।
–নাফিস বলল–বাবার সাথে সম্পর্ক চুকে যাবে?কেন?
অরণীর চোখে-মুখে তীব্র ঘৃণা ফুটে উঠলো।
অরণী বলল–লোকটা চূড়ান্ত অশালীন, অমার্জিত, অভদ্র,অসভ্য টাইপ।
কথাটা বলেই অরণী তীব্র দুঃখবোধের মধ্যেও হেসে উঠল।
নাফিস বলল–হাসছ যে?
–সব “অ” দিয়ে শুরু।অমার্জিত, অশালীন, অভদ্র…..”অ”-ফ্যাক্টর।
–তোমার সবচেয়ে বড় গুন কি জানো?অতি দুঃখের মধ্যেও তোমার হিউমার কার করে।আর তুমি খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারো।
–যারা গুছিয়ে চিন্তা করতে পারে তারা গুছিয়ে বলতেও পারে।
–হ্যাঁ,তা বোঝা যাচ্ছে।
দু’জনই হেসে ফেলে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অরণী আবারো তার কষ্টের গল্পটা বলতে শুরু করলো –জানেন,লোকটা বিনা কারণে আমার মায়ের বিশ্বাস,ভালো থাকাটা কেড়ে নিয়েছিল।আমার সুন্দরি, বিনয়ী, নম্র স্বভাবের মাতে তার মন ভরে নি।মাও তার বিবাহিত জীবনের শুরুতে বুঝে গিয়েছিলেন যে লোকটা কোনোদিনও শোধরাবে না।তাই সব ছেড়ে চলে গেলেন,বেঁচে গেলেন।
নাফিস অবিশ্বাস নিয়ে তন্ময় হয়ে অরণীর গল্পটা শুনছে আর অরণীর প্রতি প্রচন্ড এক মায়া অনুভব করছে।এই এতটুকু বয়সে মেয়েটাকে জীবনের চরম নিষ্ঠুর আর অন্ধকার কিছু দিক দেখতে হয়েছে!
অরণী বলল–লোকটা প্রায় রাতেই বাড়ি ফেরে না।নিয়ম করে সে ভদ্র পতিতাদের কাছে যায়।হয়তো প্রস কোয়ার্টারেও যায়।সেখানে যে কি সুখ পায়,জানি না।তার তালিকাভুক্ত কিছু ভদ্র পতিতা আছে।
–ভদ্র পতিতা?
–হ্যাঁ ভদ্র পতিতা। যেসব মেয়েদের সমাজে আশ্রয় আছে,পরিচয় আছে,খাদ্য, বস্ত্র,চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাও মিটছে, তবুও গোপনে অন্য পুরুষের রক্ষিতা হয়ে থাকে কিছু বাড়তি আয়ের আশায়,কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের আশায়,তাদেরকে কি ভদ্র পতিতা বলা যায় না?
নাফিস হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লো।
–লোকটার অন্যায়ের সাথে মা কিংবা আমি, আমরা কেউই খাপ খাইয়ে নিতে পারিনি।সে তার নোংরা জেদ আর অহংকারের কারণে আমাকে মা-হারা করেছে। মায়ের মুখটা পর্যন্ত আমাকে ককোনদিন দেখতে দেয় নি।আমার তো কোন দোষ ছিলনা।তবুও সে বাবা হিসেবে আমার জীবনে কোন ভূমিকাই রাখেনি।আয়া,বুয়াদের হাতে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বাবার দায়িত্ব শেষ বলে মনে করেছে।
–তারপর?
–তারপর মরিয়া হয়ে আমাকে বিয়ে দিয়েছে পথের কাঁটা দূর করতে।কারণ আজকাল তার অসুস্থ যৌন জীবনের ব্যাপারট সহ্য করতে না পেরে আমি চিৎকার করে সবাইকে বলে বেড়াই।
–উনি আর বিয়ে করেন নি কেন?
অরণী তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বল–বুঝলেন না গুরু!আবারো যদি সে বিয়ে করে তবে যে একেক রাতে একেক আইটেম গার্লের কাছে যাবার খেলাটা তার বন্ধ হয়ে যাবে।রুচিসম্মত জীবন যাপন তার পছন্দ না।তার লেটেস্ট আমদানি কে শুনবেন? আমার এক ক্লাসমেট। দারিদ্রতার কারনে বাবার বয়সী কারো কাছে মেয়েটা নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছে। আরো শুনবেন?
নাফিস মন খারাপ করে বলল–নাহ!আর শুনবো না।
অরণী হাঁপাচ্ছে।ওর চোখ মুখ লাল হয়ে আছে।নাফিস হঠাৎ দু’হাত দিয়ে অরণীর মুখটা তুলে ধরলো।শান্ত চোখে অরণীকে দেখলো কয়েক মূহুর্ত।
অরণী বলল–সহানুভূতি দেখাচ্ছেন? আই ডোন্ট নিড ইট।
নাফিস মোলায়েম কন্ঠে বলল–অএণী,পৃথিবীর সব পুরুষ কি একরকম?যদি তাই হতো,পৃথিবীটা থমকে যেতো।
নাফিসের স্পর্শে ছিল না কোনো লোভ বা আকাঙ্ক্ষা। এটা শুধুই এক বন্ধুর প্রতি আরেক বন্ধুর সমবেদনার স্পর্শ। তবুও অরণী কেঁপে উঠলো। তার উনিশবিশ বছরের নিষ্পাপ যৌবন।এপর্যন্ত ভুল করেও কোনো পুরুষের ছোঁয়া লাগেনি তার শরীরে।অরণীর দেহ,মন আর মস্তিষ্কে কিছু একটা ওলট-পালট ঘটে গেল যার খবর পৃথিবীর কেউ রাখলো না।এই যে এত কাছে বসে আছে নাফিস,সেও কিছু বুঝলো না।

পর্বঃ ১৫

তোমার মায়ের কথা কিছু বলো।তাকে নিয়ে তুমি ভাবো না?
অরণী মনে মনে ভাবল, মাকে তার সত্যিই সেভাবে মনে পড়ে না।তবে কি সে খুব বেশি নিষ্ঠুর হয়ে গেছে? না ব্যাপারটা ঠিক সেরকম না।তার স্বপ্নে,ভাবনায়, কল্পনায় সে তার দুঃখিনী মায়ের অস্তিত্ব টের পায়।তবে যে মানুষটা তার কাছে আকারহীন, বর্ণহীন, গন্ধহীন, অস্তিত্বহীন তাকে নিয়ে আলাদা করে তার খুব বেশি ভাবনা হয়ও না।তার ভাবনার ঐ অংশটা কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে।কিন্ত ব্যাপারটা সে কাউকে বোঝাতে পারবে না।
অরণী বলল–গল্প,উপন্যাস, নাটক,সিনেমা থেকে আমি জেনেছি “মা” হচ্ছে অসীম এক অনুভূতির নাম,ভালোবাসার নাম।কিন্ত মা বলতে আমি বুঝি “কাজলী বুয়া”।উনি আমাকে দেড় বছর বয়স থেকে লালন-পালন করছেন।বাবার দূর সম্পর্কের ফুপু।
–অরণী,তোমার মাকে দেখতে ইচ্ছা করে না?
–ঢাকায় আসার পর থেকে ইচ্ছা করছে। মনে হচ্ছে, সারাটা ঢাকা শহরের আকাশ,বাতাস,মাটিতে আমার মায়ের গন্ধ মিশে আছে।মাকে খুঁজে বের করতে ইচ্ছা করছে। মাকে একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা করছে।
–আমি তোমাকে তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাবো।তাকে আমি খুঁজে বের করবো।
–আমার জন্য আপনি কেন কষ্ট করবেন?
–বন্ধুর জন্য বন্ধু কষ্ট করে না?তাছাড়া তোমার জীবনের গল্পটা শুনে আমি খুব ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছি।
–ভন্ডামিটা আপনি ভালোই জানেন।
–কি বললে?
–আপনি বলতে চাচ্ছেন আপনি ইমোশনাল?
–হ্যাঁ,তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?
–আপনি ইমোশনাল হলে আপনার বাবা-মার কষ্টটা একটু হলেও বুঝতেন।এভাবে জেনির সাথে পালিয়ে বাবা-মাকে হয়রানি করার আয়োজন করতেন না।আমার যদি আপনার মতো ফ্যামিলি থাকতো আর আপনার বাবার মতো দায়িত্ববান বাবা আমার হতো,আমার মাকে যদি আমার পাশে পেতাম তাহলে জীবনে আর কিছুই চাইতাম না আমি।
এ কথার কি জবাব দেবে নাফিস বুঝতে পারলো না।তখনি নাফিসের ফোন বেজে উঠলো। অরণী হেসে বলল–মিস জেনির রাগ বোধহয় একটু কমেছে।কথা বলুন।
–হ্যালো।
–শুনছি, বলো।
জেনি ন্যাকা গলায় বলল–এতক্ষণ তোমার অপেক্ষায় ছিলাম,কিন্ত তুমি ফোন করোনি কেন?
–আমি ভাবলাম তুমি রেগে টেগে আছ।আমি ফোন দিলে হয়তো রাগটা আরো বেড়ে যাবে।
–ও,এতক্ষণ কি তুমি বিজি ছিলে?
–একটু তো ছিলাম।
ব্যস,জেনি দপ করে জ্বলে উঠলো। মেয়েটা সবসময় দপ করে জ্বলে ওঠার জন্য যেন প্রস্তুত হয়ে থাকে।জেনি ঝাঁঝমাখানো গলায় বলল–বিজিনেসটা কি ঐ পেত্নীকে ঘিরে?
–দেখ রাত দুপুরে ঝগড়া করতে এসো না,ভালো লাগছে না।
–বুঝেছি, আমার সাথে কথা বলতে তুমি বোর ফিল করছো।আমি জানি,ঐ ডাইনীটা একটা স্যাবোটাজ করছে আমার বিরুদ্ধে।
–কাল তো আমাদের দেখা হচ্ছেই।তোমার সব অভিযোগ আমি কাল শুনবো। আমার মাথাটা এখন একেবারেই কাজ করছে না।
–তোমার পেয়ারের অরণীকে বললেই পারো,তোমার মাথা টিপে দেবে।ব্ল্যাক ম্যাজিক দিয়ে সে তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে।
নাফিস হাই তুলতে তুলতে বলল–ঠিক আছে,ওকে টিপে দিতে বলবো।এবার কি দয়া করে ফোনটা রাখতে পারি?
একথার কোন জবাব না দিয়ে জেনি ফোন কেটে দিল।
নাফিস দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
অরণীর হঠাৎ যেন কিছু একটা মনে পরে গেল।বল–ওহ হো!ভুলেই তো গেছি।হিমেলকে একটা কল করতে হবে।বেচারা নিশ্চয়ই আমার টেনশনে মরেই যাচ্ছে। আপনার ফোনটা একটু দেবেন প্লিজ!
নাফিস মরিয়া হয়ে বলল–সত্যিই তুমি সুইসাইড করবে?
অরণী অবাক হয়ে বলল–কি বোকার মত কথা বলছেন? সুইসাইড করবো কেন?অতটা হাল্কা টাইপ মেয়ে আমি নই।তাছাড়া আমার ভেতর আল্লাহ্‌র ভয় আছে।সুইসাইড করার অপরাধ আল্লাহ কোনদিনও ক্ষমা করেন না।আজীবন দোজখে পুঁড়ে কাবাব হবার কোন ইচ্ছা আমার নেই।
নাফিস বিরক্ত হয়ে বলল–দয়া করে তোমার লেকচারটা বন্ধ করবে?সুইসাইড করা বলতে আমি গিট্টুকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তকে বুঝিয়েছি।
–আমি কিন্ত এখন সত্যি সত্যি রেগে যাবো কারন আপনি বার বার ওকে গিট্টু বলছেন।হ্যাঁ আমি ওকেই বিয়ে করবো কারন আমি ওর সাথে কমিটেড।এবার কি আপনার ফোনটা নিতে পারি?
নাফিস অনিচ্ছাসত্ত্বেও অরণীকে ফোনটা দিল।
একবার রিং বাজার সাথে সাথেই হিমেল ফোন রিসিভ করলো।
–হ্যালো,কে?
–আমি।
–অরণী!তোমার কোনো সমস্যা হয়নি তো?
–না,আমি ঠিক আছি।তুমি এখন কোথায়?
–ঢাকায়,এক বন্ধুর মেসে উঠেছি।তোমার ফোনের অপেক্ষায় বসে আছি।ঐ লোকটা তোমার গায়ে টায়ে হাত দেয়নি তো?
প্রশ্নটা শুনে অরণীর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।সে অবহেলার সুরে বলল–কেন,সে আমার গায়ে হাত দিলে তুমি আমাকে গ্রহণ করবে না?
–আহা,বলোই না!
–তার আগে তুমি আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।যেসব মেয়েদের কিছুদিন সংসার করার পর স্বামী মরে যায় বা ডিভোর্স হয়ে যায়,তারা কি অপবিত্র হয়ে যায়?তাদেরকে দ্বিতীয়বার কেউ বিয়ে করে না?
–তা তো করেই।আমি জানি, সে তোমাকে স্পর্শ করতে পারে নি।এমনটা তুমি হতেই দেবে না। তোমাকে আমি চিনি।
–তুমি হলে কি করতে?একটা মেয়েকে সারারাত একলা ঘরে পেয়ে ছেড়ে দিতে?
হিমেল আমতা আমতা করতে লাগলো।
অরণী কাটা কাটা গলায় বলল–সে আমাকে স্পর্শ করেছে। এখন কি করবে?আমাকে রিজেক্ট করে দেবে?
হিমেল কিছুক্ষন চুপ করে থেকে হেহে করে হাসতে আরম্ভ করলো।
–এরকম হায়েনার মত করে হাসছো কেন?
–আমি জানি,তুমি হচ্ছো ফান গার্ল।তুমি আমার সাথে ফান করছো।এই প্রসঙ্গ বাদ।এবার বলো কাল আমাদের কোথায় সাক্ষাৎ হবে?
–আমি কোনো রিস্ক নিতে চাচ্ছি না।সোজা কমলাপুর স্টেশনে চলে যাবো।সিলেটের ট্রেন কখন ছাড়বে খোঁজ নিয়েছো?
–কাল বিকেল পাঁচটায় স্টেশনে থাকবে। ট্রেন ছাড়বে সাড়ে পাঁচটায়।
–ঠিক আছে।
–মনে করে তোমার গয়নাগুলো সাথে নিয়ে নিও।
এই কথার কোনো জবাব না দিয়ে অরণী বলল–আমাকে প্রয়োজন হলে এই নম্বরে ফোন দেবে।
হিমেলকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অরণী ফোন কেটে দিল।
নাফিস হাসতে হাসতে বলল–বেচারা হিমেল!তোমার ভার্জিনিটি নিয়ে সে প্রশ্ন তুলেছে।
অরণী নির্লিপ্ত গলায় বলল–খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আপনি হলেও তাই করতেন।
নাফিস আহত স্বরে বলল–আমাকে তুমি এই চিনলে? আসলে তোমরা মেয়েরা সব একরকম। ছেলেদেরকে রেসপেক্ট এর চোখে দেখতেই জানো না।
–এক্সকিউজ মি!আমি আপনাকে সত্যিই রেসপেক্ট করি।
–হুম,আর স্বান্তনা দিতে হবে না।
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে অরণী চিন্তিতভঙ্গিতে বলল–এই যে আপনার সাথে এক ঘরে এতটা সময় কাটালাম,হিমেল কি ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারবে?কিছুটা সন্দেহ কি ওর মনে থেকে যাবে না?
–কেন সন্দেহ করবে?
–মেয়েরা খুব সহজেই অপবিত্র হয়,পুরুষরা হয় না।এটাই তো বলে এ সমাজ।হিমেল এ সমাজের বাইরের কেউ না।
–তুমি তাকে সব খুলে বললেই হবে।
–এত সহজ? মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট বড় কঠিন জিনিস।টিপিক্যাল জীবন যাপনের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে ওদের মনটাও হয়ে যায় টিপিক্যাল। অনেক সহজ ব্যাপার ওরা সহজভাবে নিতে জানে না।
নাফিস উদ্বিগ্ন হবার ভাণ করে বলল–এখন উপায়!এক কাজ করো।হিমেলকে ফোন করে না করে দাও।ওকে লাইফ থেকে ডিলিট করে দাও।নতুন করে সফটওয়্যার ইন্সটল করো,লাইফটাকে রিসেট করো।
অরণী হেসে বলল–উঁহু,আমি অতো দক্ষ মেয়ে নই।এতোকিছু করতে পারবো না।
নাফিস হাল ছেড়ে দিয়ে বলল–তুমি খুব জেদি মেয়ে।তোমাকে কিছু বোঝানো যায় না।
–আমার এই জেদটুকুই আমার শেকড়হীন জীবনের শক্তি,অবলম্বন।
নাফিস উঠে বারান্দায় চলে গেলো।বারান্দার রেলিংটা সে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।তার হঠাৎ মনে হচ্ছে যে তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সে কোনো অবলম্বন খুঁজে পাচ্ছে না।কি আশ্চর্য ক্ষমতা মফস্বলে বেড়ে ওঠা ঐ সহজ ধরণের মেয়েটার!মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে তার ভেতরে কেমন এলোমেলো ঘটিয়ে দিলো।নাফিস তার মনের ভেতর আরেক মনের অস্তিত্ব টের পাচ্ছে। কিন্তু কোন মনটা সত্যি?

আরও পড়ুন >> একটি মিষ্টি রাতের গল্প-পর্ব ১৬-২০ থেকে। 

রেটিং দিন

User Rating: 3.02 ( 3 votes)

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

স্ত্রীর পরশে

স্ত্রীর পরশে বদলে গেলো স্বামী (ছোট্ট গল্প)

এক স্ত্রী গভীর রাতে প্রতিদিন স্বামীর পাশ থেকে ঘুম থেকে উঠে আধা ঘন্টা এক ঘন্টার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE