Breaking News
Home / সাহিত্য / কিছু গল্প / একটি মিষ্টি রাতের গল্প-পর্ব ১৬-২০

একটি মিষ্টি রাতের গল্প-পর্ব ১৬-২০

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, একটি মিষ্টি রাতের গল্প ১৬ থেকে ২০ ও শেষ পর্বে আপনাকে স্বাগতম। আগের পর্ব গুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পর্ব ১৬

মিষ্টি রাতের গল্পনাফিস বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিল।তারপর বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল–সকাল তো প্রায় হয়ে এলো। তোমার প্ল্যান কি?
–এখান থেকে সোজা কমলাপুর যাব,তারপর হিমেলের হাত ধরে সিলেটের ট্রেনে উঠে বসে পড়বো।তারপর সিলেটে পৌঁছে স্বাধীনতার স্বাদ নেব,দৌঁড়াবো,নাঁচবো,হাসবো। কে জানে,অধিক আনন্দে হয়তো পাগল-টাগলও হয়ে যাবো।
–আনন্দটা কি হিমেলকে পাবার জন্য?
অরণী দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল–আর ইউ ফিলিং জেলাস উইথ হিম?আমি কিন্তু জেনিকে একটুও জেলাস করছি না।কারণ জেলাস টাইপ মেয়েদের দলে আমি না।যাই হোক,আমার খুশিটা অন্য কারণে।আমি এতগুলো বছর বন্দি এক রাজকন্যা ছিলাম।কোথাও যাবার বা কারো সাথে মন খুলে কথা বলার অধিকারও আমার ছিল না।এমনকি আমি যখন স্কুল,কলেজে যেতাম,একজন মহিলা আর একজন পুরুষ বডিগার্ড সবসময় আমার পাহারায় থাকতো। আপনি কি আমার অবস্থাটা চিন্তা করতে পারছেন?
–সরি, অরণী।
–আপনার সরি হবার দরকার নেই।আসলে আমি যে এতদিনে মানসিক ভারসাম্য হারাইনি সেজন্য আল্লাহ্‌কে অনেক ধন্যবাদ জানাই।আমার কাজ ছিল সারাদিন বই পড়া আর টি.ভি দেখা।এ দু’টো কাজ না থাকলে হয়তো মরেই যেতাম।
নাফিসের ভীষণ মন খারাপ লাগছে।মেয়েটার জন্য তার কিছু করতে ইচ্ছা করছে।
–অরণী,আজ আমি তোমাকে স্টেশনে পৌঁছে দেবো।
–না না,আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।
–তোমাকে একা ছেড়ে দিতে খারাপ লাগছে।
–আমার জন্য করুণা হচ্ছে!জানেন,আমাকে সবাই করুণা করে।
–ছিঃ!অরণী।মায়া আর করুণা কি এক হলো?তোমার মতো নিষ্পাপ একটা মেয়ের জন্য কি কারো মায়া হতে পারে না?
–ভালোই বলেছেন।
নাফিস চেহারাটা যথেষ্ট করুণ করে বলল–তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?
–হ্যাঁ হচ্ছে।ভালোই হলো, আপনি আমাকে স্টেশনে পৌঁছে দেবেন।সময় যত এগিয়ে আসছে,আমার ততই নার্ভাস লাগছে।
–এই শহরটা তোমার কাছে নতুন।তুমি জানো না,রাস্তা-ঘাটে অনেক জন্তু জানোয়ার ঘুরে বেড়ায়।সুযোগ পেলেই এরা মেয়েদের গায়ে হাত দিয়ে নোংরা আনন্দের স্বাদ নেয়।
–এই বদমাশের বাচ্চাগুলো কি রাস্তার সব মেয়েকেই এদের সম্পদ ভাবে?
–হয়তো ভাবে।
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে অরণী বলল–আপনাকে একটা কথা বলি,রাগ করবেন না তো?
নাফিস ভীষণ নরম গলায় বলল –একটা কেন,হাজারটা বলো।
–আমার সিক্সথ সেন্স বলছে,মিস জেনির সাথে আপনার সম্পর্কটা শেষ পর্যন্ত টিকবে না।
কথাটা শুনে নাফিস খুশি হলো নাকি কষ্ট পেল,তা অবশ্য তাকে দেখে বোঝা গেল না।
ফজরের নামাজের পর অরণী বারান্দায় চলে গেল ভোর হওয়া দেখতে। এটা তার প্রিয় খেলা।ছোটবেলায় প্রায়ই সে এই খেলাটা খেলতো।বিশেষ করে রোজার মাসে কাজলী বুয়ার সাথে সেহরি খেতে উঠলে সে আর ঘুমাতো না।বাইরে অপলক চেয়ে থাকতো।নিকষ কালো অন্ধকার কিভাবে আলোতে পরিনত হয় তা সে দেখার চেষ্টা করতো।আজ ভোর হওয়া দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা চিন্তা তার মাথায় উঠে এলো।প্রকৃতির অন্ধকার যেভাবে আলোয় পরিণত হয় সেভাবে তার জীবনের অন্ধকারও কি কোনদিন আলোয় পরিণত হবে?
নাফিস বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে কিছুক্ষন এপাশ-ওপাশ করলো। কিন্ত কিছুতেই তার ঘুম এল না।এত দুশ্চিন্তা নিয়ে কি ঘুমানো যায়?
নাফিস বিছানা ছেড়ে উঠে এসে বারান্দায় অরণীর পাশের চেয়ারটায় বসলো। কয়েক ঘন্টা আগেও যে মেয়েটা অচেনা ছিল এবং চরম বিরক্তির কারণ ছিল,সেই মেয়েটাকে এখন সে চোখের আড়াল করতে পারছে না।এটা প্রকৃতির কেমন খেলা?
–অরণী,তোমার কি মন খারাপ?
–কিছুটা।
–কেন?
–জানি না।
–মন খারাপ হলে তুমি কি কর?
–রান্না করি।রান্না করলে আমার মন ভালো হয়ে যায়।
–আশ্চর্য ব্যাপার!তুমি রান্না জানো?
–আশ্চর্য হবার কি আছে?রান্না তো এমন কোন অসম্ভব ব্যাপার না।আমি পড়তে জানি,কম্পিউটার ব্যবহার করতে জানি,সাজতে জানি।তাহলে রান্না জানবো না কেন?রান্না নিয়ে এক্সপিরিমেন্ট করতে আমার অনেক ভালো লাগে।রান্না একটা শিল্প।
–জেনি সবসময় খুব গর্ব নিয়ে বলে যে,ও নাকি একটা ডিম ভাজতেও জানে না।শুধু আলু ভর্তা করতে জানে।আর তুমি……
–কারো সাথে কারো তুলনা করাটা আসলে মিনিংলেস।প্রতিটা মানুষই আলাদা।জেনি হয়তো এমন অনেককিছুই জানে যা আমি জানি না।
নাফিস অপ্রস্তুত হলো।
অরণী বলল–মন খারাপ হলে আপনি কি করেন?
–কেনাকাটা করি।তোমার প্রিয় খাবার কি?
–গরম ভাতের সাথে গরুর মাংস ভুনা এবং অবশ্যই মাংসটা ঝাল করে রান্না হতে হবে।আপনার?
–বিরিয়ানি, নাচোস আর থাই স্যুপ।আচ্ছা,তোমার প্রিয় সিজন কি?
–ইন্টারভ্যু নিচ্ছেন?
–আহা,বলোই না!
–বর্ষাকাল আমার ভীষণ প্রিয়।
–আমার প্রিয় শীতকাল। আশ্চর্য! কিছুই তো মিলছে না।
–প্লিজ,ঢং করবেন না।আপনার পছন্দ অপছন্দের সাথে আমারটা মিলবে কেন?
নাফিস মাথা চুলকে বলল –ঠিকই তো।
নাফিসের এই ছেলেমানুষিতে অরণী মজা পেল,তবে তা প্রকাশ করলো না।
অরণীর হঠাৎ যেন কিছু একটা মনে পরে গেল।বলল–ওহ!ভালো কথা।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটাই আমি ভুলতে বসেছি।
–আবার কি কথা?
–এগুলো রাখুন।
–কি এগুলো?
–আপনার বাবার দেয়া গহনা। আমি চলে যাবার পর এগুলো তাকে ফিরিয়ে দেবেন।
নাফিস মন খারাপ করে বলল–তুমি কি এবাড়ির কিছুই সাথে নেবে না বলে ঠিক করেছো?
–ন্যাকামি করবেন না।ন্যাকামিটা আমার একদম পছন্দ না।আমি কেন এবাড়ির জিনিস নেবো?
–তাতো ঠিকই।
–আচ্ছা,আমি পালালে আপনার বাবা কোনো ঝামেলা করবে না তো?
–আমি কি জানি?
–আপনি কি একটা ব্যাপার ভেবে দেখেছেন?
–কি?
–আমি চলে গেলে আপনার জন্য অনেককিছুই সহজ হয়ে যাবে।আপনাকে আর বাড়ি থাকে পালাতে হবে না।
–কেন পালাতে হবে না?
অরণী বিরক্ত হয়ে বলল –আমি বুঝলাম না,আপনি সবকিছু এত দেরিতে বোঝেন কেন?আপনি কি টিউবলাইট?
–হ্যাঁ,আমি টিউবলাইট, বোকা,স্টুপিড, ভাগেরা,ভাগেরা…..
–আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন?আমার কথা শুনলে আপনি রাগের বদলে খুশি হয়ে যাবেন।
–কথাটা কি,সেটা তো আগে বলতে হবে!
গলার স্বর নামিয়ে ষড়যন্ত্রের মত করে অরণী বলতে আরম্ভ করলো–আমি চলে যাওয়া মানে আপনার বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া। বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া মেয়েদেরকে যেমন সমাজ ভালো চোখে দেখে না,তেমনি বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া ছেলেদেরও সমাজ ভালো চোখে দেখতে পারে না।আপনার জন্য নতুন করে পাত্রী খুঁজতে আপনার বাবা-মায়ের অনেক কষ্ট হবে।তারা যেখানেই সম্বন্ধ করতে যাবে সবাই তাদেরকে এক প্রশ্ন করবে যে,বিয়ের পরদিন ছেলেকে ফেলে বউ ভেগেছে তারমানে ছেলের নির্ঘাত কোনো প্রবলেম আছে।
নাফিস ভ্রু কুচকে বলল–সো?
–তখন আপনার বাবা-মা নিরুপায় হয়ে মিস জেনিকেই বউ হিসেবে গ্রহণ করবেন।ছেলেকে তো আর সারাজীবন আইবুড়ো করে ঘরে রেখে দিতে পারবেন না।
কথাটা শুনে নাফিস খুশি হতে পারলো না।সে হতাশভাবে বলল– কিন্ত তুমি যে প্রফিসি করেছিলে, জেনির সাথে আমার সম্পর্কটা টিকবে না।
–আপনাকে নিয়ে সত্যিই আর পারা গেল না।সেটা তো আমি এমনিই কথার কথা বলেছিলাম। আর আপনি সেটা ধরে বসে আছেন!যাইহোক, আজ আপনাকে একটা চমক দেবো।
–কি চমক?
–হিমেলকে দেখে আপনি চমকে উঠবেন।
–এমনিতেই কাল থেকে যথেষ্ট চমকের মধ্যে আছি।আর নতুন কোনো চমক চাচ্ছি না।সকালে তুমি আমার সাথে বের হচ্ছো।
–কোথায়?
–প্রথমে আমরা একটা কফি হাউজে যাব জেনিকে মিট করতে।দেন তোমার মাকে খুঁজতে বের হবো।
–মাথা খারাপ!মাকে আপনি কোথায় পাবেন?
–উনি ঢাকার কোন এরিয়াতে থাকেন, জানো কিছু?
–শুনেছি,খিলগাঁ এর তিলপাপাড়ায় এক কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকুরি করেন।
–আমরা সেখানে গিয়ে প্রতিটা স্কুলে ঢুকে ঢুকে তাকে খুঁজবো। তাকে আমার ভীষণ দেখতে ইচ্ছা করছে।তুমি তো নিষ্ঠুর মহিলা।তোমার হয়তো তেমন ইচ্ছা করছে না।
–যা মনে করেন,আমার কোনো আপত্তি নেই।কিন্ত আপনার জেনি আমাকে দেখলে জাস্ট গলা টিপে ধরবে।
–সেটা আমি ম্যানেজ করবো।
–ওকে,আমি রাজি।মাকে খুঁজে বের করার আইডিয়াটা খারাপ না।কেমন যেন এডভেঞ্চারাস লাগছে।

পর্ব ১৭

নাফিসের টেবিল থেকে একটা খাতা কলম নিয়ে তাতে আঁকিবুঁকি করতে করতে অরণী বলল–বাসায় কি বলে বের হবো আমরা?
–বউ ভাতের প্রোগ্রাম হতে এখনো সাতদিন বাকি।এই সাতদিন নিশ্চয়ই বেডরুমের দরজা বন্ধ করে কনেকে কোলে নিয়ে বসে থাকবে না বর!
–কথাটা আপনার মুখে ভীষণ অশ্লীল শোনাচ্ছে।
–আজব!এখানে অশ্লীলতার কি দেখলে? বর-কনের কোলে নেবার কথা বলেছি আমি।এর চেয়ে বেশি কিছু তো বলিনি।
–বেডরুমে বসে থাকা ছাড়া কি বর-কনের আর কিছুই করার থাকতে পারে না?বাড়িতে কত গেস্ট আসছে,যাচ্ছে!
–সো হোয়াট? আমার বউ কি এখন বাড়ির গেস্টদের আপ্যায়ন এ নেমে যাবে নাকি?আমি তা কখনোই হতে দেবো না।
অরণী ভ্রু কুঁচকে বলল–আপনার বউ মানে?
–তুমি আমার বউ,সবাই তো এটাই জানে।
–তাই বলে আপনি আমাকে বউ বউ করবেন?কেন আমাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইছেন?
–ঠিক আছে,তোমাকে তাহলে কি বলে ডাকবো?
অরণী মাথা এক দিকে কাত করে মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল–ফালতু কথা বাদ দিয়ে আমরা এবার কাজের কথায় আসি?
–জি মহারানী। আমরা সকালে বেড়াতে বের হতেই পারি।অতএব নাস্তা করে আমরা বের হবো।
–তারপর যখন আমাকে ছেড়ে একা বাড়িতে ঢুকবেন, কি বলবেন সবাইকে?
–কাঁদতে কাঁদতে বলবো,বউ আমাকে ফেলে পালিয়েছে। যেখান থেকে পারো আমাকে বউ এনে দাও।
অরণী কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল–আবারো?
নাফিস হেসে দু’কান ধরে বলল–সরি,সরি,সরি।তোমাকে আর একবারও বউ বলবো না।
–ইট’স ওকে।
–তুমি তাহলে রেডি হও।আমরা একটু আর্লি বের হবো।আমি জেনিকে সকাল নয়টায় কফি শপে থাকতে বলেছি।
–আমি তো রেডিই আছি।
–রেডি মানে?তুমি সাজবে না?
–সাজার কি হলো?আমি আপনার সাথে কোনো জয়ট্রিপে যাচ্ছি না।
আসলে জেনিকে সবসময় সাজগোজ অবস্থায় দেখি তো!আমার ধারণা মেয়েদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে সাজ।
–আমি হচ্ছি আমি।কেন আমাকে জেনির সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করেন?
নাফিস মাথা চুলকে বলল–ভুল হয়ে গেছে।
অরণী হাসলো।
ওরা দ্বোতলার ডাইনিংয়ে চলে গেল।এ বাড়ির কঠোর নিয়মের মধ্যে একটি হচ্ছে অবশ্যই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খেতে হবে এবং সবাইকে এক সঙ্গে খেতে বসতে হবে।
নাফিসের বিয়ের উপলক্ষ্য যতদিন চলবে মানে বউভাত পর্যন্ত আত্নীয়স্বজন সবাই এবাড়িতে থাকবে, খাবে।এমনকি একই বিল্ডিং এ বসবাসরত নাফিসের চাচা,চাচি,কাজিনরাও তিনবেলা এবাড়িতে খাবে।
খুব সকালে উঠেই বাড়ির মেয়ে,বউ,কাজের লোকেরা মিলে সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পরেছে। কেউ পরোটা বানাচ্ছে,কেউ গতকালের বেঁচে যাওয়া বিয়ের খাবারগুলো গরম করছে,কেউ ভাত রান্না করছে,কেউ ভর্তা বানাচ্ছে।দেখতে দেখতে খাবারের নানা পদে টেবিল ভরে গেলো।নতুন বউয়ের সম্মানে সকালবেলা আবার নতুন করে পোলাও, গরুর মাংস,আস্ত মুরগির রোস্ট রান্না হয়েছে। এটাই এ পরিবারের রীতি।এ পরিবারে নতুন জামাই আর নতুন বউয়ের খাবার,যত্ন-আত্তিতে কোনো পার্থক্য করা হয় না।
নাফিস ওর চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী রিফাতকে কাজে-কর্মে ব্যস্ত দেখে অবাক হয়ে অরণীকে বলল–ভাবী এত সকালে উঠেছে কিভাবে বুঝতে পারছি না।তার তো এত সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারার কথা না।
রিফাত টেবিলে প্লেট সাজাতে সাজাতে বলল–কিরে কি বলছিস অরণীকে?সাতসকালে বউয়ের কাছে আমার নামে কুটনামি করছিস না তো?
–বলছি,তুমি সবসময় সেজে থাকো।জীবনের প্রথম আজ তোমাকে সাজ ছাড়া দেখলাম। না সাজলে তোমাকে কেমন মরা মানুষের মত দেখায়!
–মুখ সামলে কথা বল,নইলে ইট দিয়ে তোর মুখ একেবারে ভোঁতা করে দেবো।
নাফিস আর রিফাতের টক-ঝাল সম্পর্ক দেখে অরণী ভীষণ মজা পাচ্ছে।
নাফিসের ছোটবোন ঝিলমিলও মহা উৎসাহে কাজে লেগে পরেছে। ওভেনে খাবার গরম করছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। সে অরণীকে বলল–গুড মর্নিং।ভাবী তোমাকে এত্তগুলা সুন্দর লাগছে।
অরণী মিস্টি করে হাসলো।
নাফিসের চাচাতো ভাই সাহিল একটা চেয়ার টান দিয়ে বসতে বসতে অরণীকে বলল–তুমি একটা চেয়ার টেনে বসে পর।খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
অরণী রিফাত ভাবীকে বলল–ভাবী আপনারা বসবেন না?
–আমরা কে,কখন খাই,তার কোনো ঠিক নেই।যে যখন পারবে খেয়ে নেবে।তোমাকে ঘিরেই যখন আয়োজন,তোমাকেই সবার আগে বসতে হবে।
নাফিস বলল–লেডিস ফার্স্ট।
অরণী কোণার দিকের একটা চেয়ারে বসলো। নাফিস তার পাশে বসলো।
নাফিসের বাবা হাসিব চৌধুরীও টেবিলে এসে বসলেন অরণী আর নাফিসের মুখোমুখি।
প্রথমেই নাফিসের মুখের দিকে তাকালেন তিনি।ছেলের মনোভাব বুঝতে চেষ্টা করলেন।তারপর অরণীকে দেখলেন। অরণী মাথা নিচু করে জড়সড় হয়ে বসে আছে।ছেলের বউয়ের স্নিগ্ধ আর নিষ্পাপ মুখটা দেখে আনন্দে তার বুকটা ভরে উঠলো। অরণীকে স্বাভাবিক করার জন্য তিনি বললেন –বউমা,এবাড়িতে তোমার খারাপ লাগছে না তো?আমার গুড ফর নাথিং ছেলেটা কোনো কটু কথা বলে তোমাকে কষ্ট দেয়নি তো!
অরণী না সূচক মাথা নাড়লো।কথাটা শুনে ওর হাসি পেয়ে গেলো।এত বড় ছেলে সম্বন্ধে কোনো বাবা কি এভাবে বলতে পারেন?তাও আবার নতুন বউয়ের সামনে?এবাড়ির প্রতিটা মানুষকেই তার ভীষণ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে।
নাফিস পৃথিবীতে একজন মানুষকেই ভয় পায় আর সে হচ্ছে,তার বাবা।বাবাকে দেখে সে অস্বস্তিবোধ করতে লাগলো।
ওরা খাবার খেয়েই বেরিয়ে পরলো।সকাল সকাল এভাবে ওদের বেরিয়ে পরা দেখে অনেকেই সন্দেহের তীর ছুঁড়ছিল নাফিসের দিকে।নাফিসকে ওরা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না।যে মানুষটা এ বিয়েতে একেবারেই রাজি ছিল না সে কিনা সকাল সকাল বউকে নিয়ে খুশি মনে বেড়াতে বের হচ্ছে!ব্যাপারটা কারো কাছেই ঠিক স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।নাফিসকে অনেক জেরার মুখে পরতে হয়েছে।
। সবার প্রশ্নের জবাব দিয়ে অবশেষে সে অরণীকে নিয়ে বের হতে সক্ষম হয়েছে।
নাফিস সাথে গাড়ি নেয় নি।আজকের এই অ্যাডভেঞ্চার ট্রিপে গাড়ি নেয়া ঠিক হবে না।অরণী সাথে শুধু হ্যান্ডব্যাগটা নিয়ে নিল।আরকিছুই সে সাথে নেবার প্রয়োজনবোধ করলো না।
অরণী হঠাৎ একদম চুপ হয়ে গেল।সকালবেলা ডাইনিং রুমে মানুষগুলোর সাথে দেখা না হলেই ভালো হতো।শুধুমাত্র তাকে আর নাফিসকে ঘিরে মানুষগুলো যে মহা উৎসবে মেতে উঠেছে তা সে মাটি করে দিতে চলেছে। এক ধরনের দ্বিধা আর গ্লানিবোধ তার মনকে ছেঁয়ে ফেলছে। জীবনে কখনো সে এতটা অসহায়বোধ করেনি।
ও বাড়ি থেকে বের হবার সময় নাফিসের মা সুফিয়া বেগম এক ফাঁকে অরণীকে আঁড়ালে ডেকে বললেন –মা,আমার ছেলেকে তোমার পছন্দ হয়েছে তো!
অরণী তখন মাথা নিচু করে বসে ছিল।

পর্ব ১৮

মোহাম্মদপপুর যাবার সিটিং বাসে ওরা জায়গা পেয়ে গেল।জেনি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে মোহাম্মদপুর থাকে।সেখানকার একটা কফি শপে ওরা বসবে।
বাসের জানালা দিয়ে অরণী বৃষ্টি ভেজা ঢাকা শহরকে দেখছে অপলক চোখে।নতুন এক শহর কিন্তু শহরটা যেন তার অনেক দিনের চেনা।এখানে তার মায়ের বসবাস। কতবার সে মনের চোখ দিয়ে এই শহরটা দেখেছে!
–কি দেখছো এত মনোযোগ দিয়ে?আমাদের ঢাকা শহরটা অনেক সুন্দর না?
–একদম না।উচ্চশ্রেণির বস্তি একটা।কেমন ঘিঞ্জি! গাছ নেই,পুকুর নেই,প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নেই।যেদিক তাকাই শুধু মানুষ আর মানুষ। দম বন্ধ করা এক পরিবেশ।
–ও।
–রাগ করলেন?
–রাগ করার কি আছে?
–আমি বুঝি না,মানুষ কেন ঢাকায় থাকার জন্য এত আগ্রহী? আমাকে কেউ দড়ি দিয়ে বেঁধেও এখানে রাখতে পারবে না।
–তোমাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার ইচ্ছাও কারো নেই।
অরণী মুখ ভেংচে বলল–আমি জানি।
নাফিসের সাথে স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের ছিমছাম অরণীকে দেখে জেনি চমকালো। এ মেয়ের হাঁটা,তাকানোর ভঙ্গি,রুচিশীল পোষাকে নিজেকে উপস্থাপন করার ধরণের কাছে জেনির নিজেকে তুচ্ছ মনে হতে লাগলো।
জেনিকে দেখে অরণীও কম অবাক হলো না।ত্রিশের কাছাকাছি বয়সের ভীষণ স্মার্ট হতে চাওয়া একজন নারীকে দেখছে সে।চেহারা তেমন ভালো না,তবে সেই চেহারাটাকে যথেষ্ট ঝকঝকে করে রাখা হয়েছে। একটা সম্পর্কের ব্যাপারে চেহারা বড় কোন ব্যাপার না।তবে এ মেয়ের যে ব্যাপারটা অরণীর মনে চরম বিরক্তির জন্ম দিয়েছে তা হচ্ছে ওর সাজ পোষাক অতি উগ্র।কে কতটা আধুনিক হতে পেরেছে তার প্রমাণ দিতে হলে কি কে কতটা শরীর প্রদর্শন করতে পারে তার প্রতিযোগিতায় নামতে হবে?এসব মেয়েদের অদ্ভুত অঙ্গ ভংগি,কথা বলা,ঢ্লে ঢলে পরা দেখলে অরণীর গা ঘিন ঘিন করে।রাস্তার একটা কেঁচো দেখলেও তার এতটা খারাপ লাগে না।
অরণীর খুব ইচ্ছা করছে জেনিকে ডেকে বলতে–ম্যাম,এসব যৌন সুড়সুড়ি দেয়া টাইপ ড্রেস পরে বেডরুমে বসে থাকবেন,তাও রাত বারোটার পর।প্লিজ এগুলো পরে রাস্তায় বের হবেন না।রাস্তাকে আপনার বেডরুম ভাববেন না।
নাফিস পরিচয় করিয়ে দিল–জেনি ও হচ্ছে অরণী……
জেনির দিকে তাকিয়ে অরণী মিষ্টি করে হাসলো।জেনি হঠাৎ ভারসাম্যহীনভাবে টলতে লাগলো।পরতে গিয়েও পরলো না।নাফিস ওকে ধরে ফেললো এবং একটা চেয়ারে বসালো।
অরণী ফিসফিস করে বলল– বিড়ালাক্ষীর এপিলেপ্সি আছে নাকি,যখন-তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলে?
নাফিস বলল–বিড়ালাক্ষী মানে?
–আরে বাবা,বাংলায় আপনি এত কাঁচা?কটাচোখো মেয়েদেরকে বিড়ালাক্ষী বলা হয়।
–প্লিজ অরণী!বেফাঁস কিছু বলে ফেলো না।
জেনি নিজেকে সামলে নিতে কিছুটা সময় নিল।তারপর তুমুল হৈচৈ শুরু করে দিল।আশেপাশের টেবিলগুলোতে লোকজন এখনো ভিড় করেনি।দু’চারজন যারা আছে,তারা আড়চোখে এই টেবিলে তাকাচ্ছে। নাফিস ভীষণ অস্বস্তিবোধ করছে।
জেনি উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলল–আমাদের মাঝখানে তুমি ওকে এনেছো কেন?হু ইজ শি?
নাফিস অরণীর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল,যার মানে হচ্ছে,বাদ দাও,যা বলেছে বলুক না!
জেনি চিৎকার করে বলল–তুমি ওর দিকে তাকিয়ে আই কনট্যাক্ট করছো।কেন,হোয়াই?আনসার মি…….
–আগে আমার কথাটা শোনো।
জেনি নাকি সুরে কাঁদতে কাঁদতে বলল–তুমি একটা লায়ার,লুজার,লম্পট…..।
অরণী বিড় বিড় করে বলল–ল-ফ্যাক্টর….
নাফিস বলল–জেনি,তোমার যা ইচ্ছা হয় বলো।কিন্তু আমার কিছু কথা আছে,সেটা শুনবে তো!
–আমি তোমার কোনো কথাই শুনব না।
–দেখ,আমার হাতে সময় নেই।অরণীকে প্রথমে ওর মায়ের কাছে নিয়ে যেতে হবে আমাকে। তারপর আমি ওকে ওর বয়ফ্রেন্ডের হাতে তুলে দিতে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে যাব।আমার কথাগুলো একটু মন দিয়ে শোনো।
–বললাম তো,আমি তোমার কোনো কথাই শুনবো না।
নাফিস ধমক দিয়ে বলল–জাস্ট স্টপ ইট।লিসেন টু মি….
জেনি তাদের এক বছরের সম্পর্কে এই প্রথম নাফিসকে রেগে যেতে দেখলো। জেনি হঠাৎ থমকে গেলো।তারপর খসখসে গলায় বলল–কি বলবে, বলো।
নাফিস দৃর কন্ঠে বলল–তোমার বয়স, ম্যারিটাল স্ট্যাটাস এসব কিছুই আমার কাছে ম্যাটার করে না।কিন্ত কাল রাত থেকে একটা ব্যাপার আমি ভালোই ফিল করতে পারছি যে,তোমার সাথে যতক্ষণ কথা বলি বা চলাফেরা করি ততক্ষণ নিজেকে আমার ভীষণ স্টুপিড আর ব্যক্তিত্বহীন মনে হয়।তোমার কাছ থেকে এতটুকু রেসপেক্ট আমি কখনো পাই না।যে সম্পর্কে রেসপেক্ট নেই,বিশ্বাস নেই,সে সম্পর্কটা চালিয়ে নেবার ব্যাপারে মন থেকে আমি সাড়া পাচ্ছি না।
জেনি হতবিহবল হয়ে বলল–নাফিস তুমি এসব কি বলছো?আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি,ওই মেয়েটা তোমাকে বায়াস করেছে,হিপনোটাইজ করেছে।
অরণী জানে,এই মুহূর্তে তার চুপ করে থাকাটাই নিরাপদ।তাই সে নীরব দর্শক হয়ে বসে আছে।তবে জেনির তাকে দোষারোপ করার ব্যাপারটাতে তার অসহ্যবোধ হচ্ছে।মনে মনে সে জেনিকে পেত্নি,শাঁকচুন্নি বলে গাল দিল।
নাফিস বলল–কাউকে হিপনোটাইজ করতে
পারাটাও যোগ্যতার ব্যাপার।তোমার সে যোগ্যতাও নেই।তোমার শুধু মানুষকে অবজ্ঞা করার আর ছোটো করার যোগ্যতা আছে।বাই দ্য ওয়ে,আমার আশায় বসে থাকাটা বোকামি হবে।এমন কাউকে খুঁজে নাও,যাকে তুমি সম্মান করতে পারবে,বিশ্বাস করতে পারবে।তাছাড়া আমার ফ্যামিলির একটা মানুষও এই সম্পর্ক টা মেনে নিতে পারছে না।এতগুলো মানুষের মতামতকে তো আমি অগ্রাহ্য করতে পারি না।আমরা কেউই ফ্যামিলিকে অস্বীকার করতে পারি না।
অরণী হাঁ হয়ে গেলো।নাফিস যে এরকম কিছু করবে তা সে একটুও ভাবে নি।নাফিস কাজটা ঠিক করলো কিনা তা সে বুঝতে পারছে না।জেনির জন্য তার একটু খারাপ লাগছে।
জেনি কথা বলার শক্তি হারিয়ে যেন বোবা হয়ে গেল।ভীষন অপমানিত হয়ে সে কাঠ হয়ে চেয়ারে বসে রইলো।
নাফিস উঠে সোজা দরজা দিয়ে বের হয়ে একটা খালি রিক্সায় বসলো।অরণী কি করবে,কি বলবে বুঝতে পারছে না।সেও নাফিসের পিছু পিছু রিক্সায় উঠে বসলো।রিক্সা অজানা গন্তব্যে চলতে লাগলো।

পর্ব ১৯

অরণী বলল–আপনি তো দেখছি কঠিন চিজ!কাজটা কি ঠিক করলেন?
নাফিস শুকনো হাসি দিয়ে বলল–কেন তোমার পছন্দ হয় নি?তুমিই তো রাতে অনেক উপদেশ দিচ্ছিলে।
–মাই গুডনেস!আমার কথায় কনভিন্সড হয়ে আপনি লাইফের এত বড় সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললেন?
–নিজেকে তোমার অপরাধী ভাবার কোনো কারণ নেই।তোমার কথায় আমি অন্ধকার থেকে আলোয় উঠে এসেছি এটা ঠিক।তবে সিদ্ধান্তটা স্বজ্ঞানেই নিয়েছি।আসলে না বুঝে একটা ভুলের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলাম। তারপর যখন সেই ভুলটা বুঝতে পারলাম,তখন সেই ভুল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম,দ্যাট’স অল।
–কিন্ত আমাকে সাথে না নিয়েও আপনি কাজটা করতে পারতেন।জেনি আমাকে ভুল বুঝেছে।
–ওর স্বভাবই হচ্ছে মানুষকে ভুল বুঝে বেড়ানো। আসলে আমাদের সম্পর্কটাতে কোনো গভীরতা ছিল না।সো সম্পর্কটা এমনিতেই ভেঙ্গে যেতো,আজ অথবা কাল।তবে একটা জিনিস তুমি আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিখিয়েছো।
–আমি আবার আপনাকে কি শেখালাম?
— তোমার কাছ থেকেই আমি শিখেছি যে প্রতিটা সম্পর্কেই ভারসাম্য থাকা চাই।
অরণী চুপ হয়ে আছে।
নাফিস খুশি খুশি গলায় বলল–আমার কিন্তু এই মুহূর্তে নিজেকে অনেক হাল্কা লাগছে। আজ আমি তোমাকে ঢাকা শহরটা ঘুরে দেখাবো এবং ট্রিট দেবো।
অরণী চিন্তিতমুখে বলল–কিন্তু আমার ট্রেন?লেট হয়ে যাবে না তো?
–এখন মাত্র সকাল দশটা।অনেক সময় বাকি আছে।
ঢাকা শহরটা অনেক ছোট।রিক্সা নিয়ে অনেক ঘোরাঘুরি করে,বাইরে খেয়েও ওদের হাতে অনেক সময় রয়ে গেলো।
অরণী বলল–জেনির জন্য আমার কিন্ত খারাপ লাগছে।
–আমার লাগছে না।কারণ ঐ ইরিটেটিং মেয়েটার সব ধরণের উইয়ার্ড বিহেভ সহ্য করেও ওর সাথে আঠার মতো লেগে থাকতে আর ভালো লাগছিল না।তুমি চিন্তাও করতে পারবে না যে আমি এখন কতটা শান্তি অনুভব করছি।আই অ্যাম আ ফ্রি ম্যান নাও।
ওরা খিলগাঁও এর তিলপাপাড়ায় পৌঁছে গেল।প্রতিটা অলিতে-গলিতে ঢুকে,প্রতিটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ঢুকে ওরা জানতে চাইলো,এখানে ছালেহা পারভীন নামের কেউ চাকুরি করেন কিনা।
ভাগ্য ওদের সহায় হলো।অল্প চেষ্টাতেই ওরা তার খোঁজ পেয়ে গেল।চার নাম্বার স্কুলে গিয়েই ওরা তার খোঁজ পেল।কিন্ত আজ উনি স্কুলে আসেন নি।স্কুলের খুব কাছেই একটা টিনসেড বাড়িতে উনি অনেক বছর ধরে ভাড়া আছেন তারই বড় ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী আর তার দুই সন্তান নিয়ে।
বাড়িটার দিকে যতই এগোচ্ছে, ততই অরণীর বুকের ভেতরের অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। অরণী যেন হাত-পায়ের শক্তি একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছে। এতগুলো বছরে একদিনও তার ভেতরে এমন বোধ হয় নি।তার ধারণাতেই কখনো আসে নি যে এত সহজে তার মাকে খুঁজে পাওয়া যাবে।মাকে সে কেমন দেখবে? তাকে দেখেই বা মা কেমন করবে?
নাফিস আড়চোখে অরণীকে দেখছে।সেও মেয়েটার গভীর আর অপার্থিব এই অনুভূতির কিছুটা অনুভব করার চেষ্টা করছে।
ওরা গেটের ভেতর প্রবেশ করলো। গেট পার হলেই ছোট্ট এক টুকরো উঠান।উঠানে মাদুর পেতে অনেকগুলো ছোট ছেলে-মেয়েকে বিরিয়ানি খেতে দেয়া হয়েছে। নাফিস আর একটু নিশ্চিত হবার জন্য ষোল/সতের বছর বয়সী একটা ছেলেকে ডাক দিল।ছেলেটা খাবার তদারকি করছে। সে ডাক শুনে এদিকে ছুটে এলো।
নাফিস বলল–এ বাড়িতে ছালেহা পারভীন থাকেন?
–জি,আপনারা কারা?
এ প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে নাফিস বলল–উনি বাড়িতে আছেন?
–জি আছেন।আজ ছালেহা ফুপু আম্মার মেয়ের জন্মদিন। তিনি প্রতিবছর এই দিনে নিজের হাতে রান্না করে এতিম ছেলে-মেয়েদেরকে খাওয়ান।
নাফিস অরণীর দিকে তাকালো। অরণীর দৃষ্টি উদভ্রান্তের মতো।সে যেন হঠাৎ জগত-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কিছুই শুনছে না,কিছুই দেখছে না।মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু সামনে এগুচ্ছে।
কয়েক মিনিট আগের অরণী,সকালের অরণী বা গতকালের অরণীর সাথে এ অরণীকে নাফিস কিছুতেই মেলাতে পারছে না।নাফিস অরণীর হাত ধরল যেন সে পরে না যায়।
বাইরের বারান্দা পেরিয়ে ওরা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। প্রথম রুমের বিছানায় বসে একজন মহিলা তাসবীহ পড়ছেন। ছিপছিপে গড়নের অভিজাত চেহারার একজন মহিলা যার বয়সটা ঠিক অনুমান করা যাচ্ছে না।তবে তিনিই যে অরণীর মা তা তার চেহারা দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছে।
অরণী দরজায় দাঁড়িয়ে অস্ফুট স্বরে ডাকলো–মা……
মহিলা থমকে তাকালেন অরণীর দিকে,যেন বহুকাল ধরে এই ডাক শোনার অপেক্ষায় ছিলেন।বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।নিজের স্বত্তা,নিজের নারিছেঁড়া ধনকে চিনতে তার কোনো কষ্টই হয় নি।তার সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে উঠলো তীব্র আবেগে।
অরণী দৌঁড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। অরণী আজ তার দেড় বছর বয়সের শিশু জীবনে ফিরে গেল।আজ কিছুতেই সে মায়ের কোল ছাড়বে না।ছালেহা পারভীনও শক্ত হাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আছেন।এখন আর কেউ তার বুকের মানিককে তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।তিনি তার হারানো পৃথিবীটা বহু বছর পর খুঁজে পেয়ে আনন্দে কাঁদছেন। আজ থেকে তার আর কোনো দুঃখবোধ হবে না।নিজেকে আর কোনদিনও তিনি বঞ্চিত ভাববেন না।
বাড়িতে ভিড় জমে গেল।পাশে যে দু’তিনটা পরিবার ভাড়া থাকে তারাও ছুটে এলো।সবার চোখে পানি।নাফিসও তার চোখের পানি ধরে রাখতে পারছে না।মা-মেয়ের এই মিলন দৃশ্য সে কোনদিনও ভুলবে না।
ছালেহা পারভীন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেন।অরণী কেঁদেই চলেছে। তার এত বছরে জমে ওঠা সমস্ত কান্না আজ সে কেঁদে নেবে।
রাজপুত্রের মতো দেখতে এই ছেলেটা যে তার মেয়ে জামাই তা ছালেহা বেগম সহজেই অনুমান করলেন। জামাইকে কোথায় বসতে দেবেন,কি খেতে দেবেন সেই ভাবনায় তিনি অস্থির। মেয়ে জামাইকে তার অসম্ভব পছন্দ হয়েছে। কেমন পবিত্র চেহারা! দেখেই বোঝা যায় এ ছেলে কোনো অন্যায় করতে পারে না,পাপ করতে পারে না।
নাফিস মৃদু হেসে সবাইকে ব্যস্ত হতে নিষেধ করলো।
ছালেহা পারভীন ঘুরে ফিরে একটা কথাই বলছেন, আল্লাহ্‌ আমার ডাক শুনেছেন। আমার মানিককে আমার বুকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই।
অরণী ছোট শিশুর মতো মায়ের কোলে মাথা রেখে পরে রইলো অনেকটা সময়।ছালেহা পারভীন অরণীর চুলের বিলি কাটতে কাটতে নাফিসের সাথে টুকটাক কথাবার্তা বলছেন। নাফিসের লেখাপড়া বাবা-মা পরিবার, গ্রামের বাড়ি সব কিছুর খবর নিয়ে নিলেন তিনি।সব জেনে তার মনটা আস্বস্ত হলো,খুশিতে ভরে উঠলো।

পর্ব ২০

নাফিস অরণীকে তাড়া দিল।অরণীও বিছানা ছেড়ে উঠলো।জরুরি এক কাজে তাকে নাফিসের সাথে ঢাকার বাইরে যেতে হবে বলে মায়ের কাছ থেকে সে বিদায় নিল।খুব শিগগিরই সে মায়ের কাছে ফিরে আসবে এবং মায়ের কাছে কিছুদিন থাকবে বলে কথা দিল।
ছালেহা পারভীনের এক মুহূর্তের জন্যও মেয়েকে কাছ ছাড়া করতে ইচ্ছা করছে না,চোখের আড়াল করতে ইচ্ছা করছে না।ভাবছেন, এতগুলো বছর কি করে মেয়েকে ছাড়া কাটালেন?তবুও মনকে তিনি বোঝালেন। এতগুলো বছর যেহেতু অপেক্ষা করতে পেরেছেন আর কয়টা দিনও নিশ্চয়ই পারবেন।
নাফিস একটা সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে নিল কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে যাবার জন্য।অরণী চুপ করে বসে বসে ভাবছে। কতরকম ভাবনা যে ওর মাথায় এসে ভিড় করছে!নাফিসের প্রতিও সে মনে মনে কৃতজ্ঞতাবোধ করছে। নাফিস উদ্যোগী না হলে হয়তো এত বড় ঢাকা শহরে মাকে এত সহজে খুঁজে পাবার চিন্তাটা তার মাথায়ই আসতো না।তার কাছে সব কিছু স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে। নিজেকে তার ভীষণ সুখি আর আত্ববিশ্বাসী মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে,তার আর কিছু হারাবার নেই।মায়ের মুখটা তার চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছে। মানুষ যে কতটা দুঃখী আর অসহায় হতে পারে তা আজ সে মাকে না দেখলে কোনদিনও বুঝতো না।অথচ জ্ঞান হবার পর থেকে এই মানুষটাকে সে কিছুটা ভুল বুঝে এসেছে। মনে মনে অনুতপ্ত হলো সে।
এদিকে নাফিসের ফোনটা একটু একটু পর পর বেজে উঠছে। বাড়ি থেকে এ পর্যন্ত পাঁচবার ফোন এসেছে। সবাই উদ্বিগ্ন। এতটা সময় ওরা বাইরে কি করছে?নাফিস অরণীকে বাইরে নিয়ে কোনো ঝামেলা টামেলায় ফেলছে না তো!শেষে নাফিসের মা সুফিয়া বেগম ফোন দিলেন–হ্যালো নাফিস,তোমাদের বেড়ানো কি এখনো শেষ হয় নি?
–এই তো মা,আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বাড়ি আসছি।
–তাড়াতাড়ি এসো।তোমার বাবা কাল থেকেই তোমার বউভাতের কার্ড বিলি করা শুরু করবেন।তোমার কয়টা ফ্রেন্ডকে ইনভাইট করতে চাও তার একটা লিস্ট লাগবে।
–ওকে মা,যত দ্রুত সম্ভব আমি আসছি।
–আমি আসছি মানে?
–সরি,আমি না;আমরা আসছি। এবার হলো?
সুফিয়া বেগম হাসলেন।
অরণী বলল–কার ফোন?
–মা ফোন দিয়েছে। বলছে তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে।বউভাতের কার্ড বিলি করবে তো!
নাফিস শুকনো হাসি দিল।মায়ের জন্য এই মুহূর্তে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। যখন সে অরণীকে ছাড়া বাসায় ফিরবে তখন সবাই কতটা কষ্ট পাবে আর বাড়ির পরিবেশ কতটা শোকাবহ হয়ে উঠবে তা ভেবে এই প্রথম নাফিস আতঙ্কিতবোধ করতে লাগলো।
অরণী হঠাৎ বলল–আমি আপনাকে হিমেলের পড়াশুনা নিয়ে মিথ্যা বলেছি। ও আসলে এবছর অনার্স শেষ করে মাস্টার্স এ ভর্তি হয়েছে। ম্যাথে অনার্স করেছে। সে আমার হাউজ টিউটর ছিল।ক্লাস সিক্স থেকে বাসায় এসে আমাকে পড়াচ্ছে।
–তুমি আমাকে অমন ব্লাফ দিলে কেন?
–তেমন কোনো কারণ নেই।আসলে মিথ্যা বলে মানুষকে বোকা বানানোটা আমার বাজে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই বদ অভ্যাসটা বাদ দিতে হবে,কি বলেন?
নাফিস কোনো কথা বলল না।হিমেল অনার্স পাশ শুনে কেন তার এমন অনুভূতি হচ্ছে?এই অনুভূতির নামই কি ঈর্ষা?সে কেন হিমেলকে ঈর্ষা করছে?
স্টেশনে পৌঁছে অরণী নাফিসের ফোন থেকে হিমেলকে ফোন দিল।এত এত লোকের ভিড়ে হিমেলকে খুঁজে পেতে একটু সময় লাগলো। দূর থেকে হিমেলকে এদিকটায় এগিয়ে আসতে দেখে অরণী আঙ্গুল তুলে দেখালো–ঐ যে নীল চেক সার্ট,হিমেল।
নাফিস মন খারাপ করে বলল–তুমি ওকে নিয়ে আরো একটা মিথ্যা বলেছো।ও মোটেও খাটো না।যথেষ্ট লম্বা সে এবং তার চেহারায় পুরুষালি একটা সৌন্দর্য আছে।দেখে তো ভালোই মনে হচ্ছে।
অরণী নিচু স্বরে বলল–সত্যিই আমিও বুঝি না,কেন যে অহেতুক মিথ্যা বলি?আমি বোধহয় “প্যাথলজিকাল লায়িং ডিজঅর্ডার” নামক মানসিক রোগে আক্রান্ত।
–এটা আবার কি রোগ?
–এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিনা কারনে মিথ্যা বলে,বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে।
নাফিস হেসে ফেলে।
অরণী বিরক্ত হয়ে বলে–আমি একটা কঠিন ধরণের মানসিক রোগে আক্রান্ত, এটা শুনে আপনি হাসছেন?
তখনি হিমেল আতঙ্কিত ভঙ্গিতে ওদের সামনে এসে দাঁড়ালো।
নাফিসকে দেখে সে সত্যিই চিন্তায় পরে গেছে। সে ভেবে পাচ্ছে না,নাফিস কেন তার নববিবাহিতা স্ত্রীকে প্রেমিকের হাতে তুলে দিতে এসেছে?
অরণী হিমেলকে বলল–চোখ মুখ এরকম শক্ত করে রেখেছ কেন?চেহারা দেখে মনে হচ্ছে,তোমার ভীষণ বাথরুম পেয়েছে।
অরণীর কথায় হিমেল বোকার মত হাসলো। তারমানে অরণীর মুখ থেকে এধরণের কথা শুনে সে অভ্যস্ত।
অরণী হিমেলকে নাফিসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল–এই হচ্ছে মি.নাফিস;আমার এক্স হাজবেন্ড, আর ইনি হচ্ছেন আমার উড বি হাজবেন্ড মি.হিমেল।
কথাটা বলেই সে হাসতে হাসতে ভেংগে পরলো। হিমেল আর নাফিস দু’জনই বোকার মত দাঁড়িয়ে রইলো। কেউ কোনো কথা খুঁজে পেল না।
হিমেলই প্রথম কথা বলল –অরণী,ট্রেন ছাড়তে আর বেশি সময় বাকি নেই।ট্রেনে উঠবে চলো।তোমার ব্যাগ কোথায়?
–ব্যাগ ট্যাগ কিছুই সাথে আনি নি।
–তোমার গয়না?
–গয়নাগুলো কি খুব বেশি জরুরি? শুধু আমি তোমার সাথে গেলে চলবে না?
হিমেল অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল –না না,আমি তা বলতে চাই নি…….।
–নো টেনশন, ওগুলো আমার হ্যান্ডব্যাগেই আছে।
–ব্যাগটা চুরি হয়ে যেতে পারে,আমার কাছে দাও।
–চুরি হলে হবে।লেডিস ব্যাগ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো টাইপ পুরুষ আমার একদম সহ্য হয় না।
হিমেল একথার পিঠে কি বলবে খুঁজে পেল না।
আবারো নাফিসের ফোন বেজে উঠলো।জেনি তাকে ফোন করে করে জ্বালিয়ে মারছে।সে ফোন বন্ধ করে পকেটে ভরে রাখলো।
হিমেল নাফিসের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল–আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। ধন্যবাদ দিয়ে আপনাকে ছোট করতে চাই না।আবার দেখা হবে।
নাফিসও হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে বলল–অরণী খুব ভালো মেয়ে।ওকে কষ্ট দেবেন না।ভালো থাকবেন।
কথাগুলো বলতে নাফিসের খুব কষ্ট হচ্ছিল। অদৃশ্য কেউ যেন তার গলা টিপে ধরে আছে।ওর নিজের কন্ঠস্বর নিজের কাছেই অচেনা আর অদ্ভুত মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছে,কি যেন এক মূল্যবান কিছুর দখল সে হারিয়ে ফেলছে। মনের এ ভাবটা যে চেহারায় ফুটে উঠেছে তা সে ভালোই টের পাচ্ছে।কিন্ত কিছুতেই সে তার অন্ধকার হয়ে আসা চেহারাটাকে স্বাভাবিক রাখতে পারছে না।
হিমেল তাড়াতাড়ি ট্রেনে উঠে জানালার পাশের সিটে বসলো। অরণী হিমেলের কাছ থেকে দুই মিনিট সময় চেয়ে নিল,নাফিসের কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্য।
অরণী নাফিসের মুখোমুখি দাঁড়ালো। নাফিস চোখ তুলে অরণীর দিকে তাকাতে পারছে না।তাকালেই যেন মেয়েটা তার ভেতরটা পড়ে ফেলবে। নাফিসের আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে– “অরণী,প্লিজ তুমি যেও না,থেকে যাও আমার বউ হয়ে। আমি তোমাকে বার বার বউ বলে ডাকতে চাই। ”
অরণী মিটি মিটি হেসে বলল–কি,খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে?
নাফিস ফ্যাকাসে হাসি দিয়ে বলল–কষ্ট হবে কেন?
–আপনি তো ভীষণ নিষ্ঠুর! এক বন্ধুর বিদায় মুহূর্তে আর এক বন্ধুর কষ্ট হয় না?
নাফিস নরম স্বরে বলল-হ্যাঁ,কষ্ট হচ্ছে তো!
–ব্যাপারটাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এভাবে বলেছেন ” হ্রদয়ের কথা কহিতে ব্যাকুল,শুধাইলো না কেহ। ” কি ঠিক বলেছি না?
অরণীর ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির হাসি লেগে আছে।
নাফিস অবাক হয়ে ভাবলো – “মেয়েটা কত সহজে তার ভেতরটা পড়ে ফেলছে! কিন্ত সে তো তাকে একদম পড়তে পারছে না।
হিমেল দূর থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে নাফিস আর অরণীকে।
ট্রেন হঠাৎ দুলে উঠলো। হিমেল দৌঁড়ে দরজার কাছে এসে তারস্বরে অরণীকে ডাকছে। সেদিকে অরণীর ভ্রুক্ষেপ নেই।
অরণী মন খারাপ করা ভঙ্গিতে বলল–আপনি এত কাপুরুষ কেন?
নাফিস মাথা নিচু করে অপরাধীর ভঙ্গিতে বলল–জানি না।
–আমি জানি।সত্যিকারের প্রেমে পরলে কখনো কখনো এরকম অবস্থা হয়।
নাফিস হঠাৎ লক্ষ্য করলো যে ট্রেনটা চলতে আরম্ভ করেছে। নাফিস চিৎকার করে বলল–অরণী তোমার ট্রেন……
ভাবলেশহীন কন্ঠে অরণী বলল– ওটা মোটেও আমার ট্রেন না,ওটা হিমেলের ট্রেন।ওকে যেতে দিন।
নাফিস অবিশ্বাসভরা কন্ঠে বলল–তুমি যাবে না ওর সাথে?
–কেন,গেলে খুশি হবেন? যে মানুষটা কাল রাত থেকে এ পর্যন্ত দশবার আমার গয়নার কথা ভেবে ফেলেছে, কেন যেন তার সাথে যাবার রুচি হচ্ছে না।তাছাড়া সব মানুষই তার সঙ্গির মধ্যে রহস্য খোঁজে।সে রহস্য ভেদ করার চেষ্টাতেই সে এক জীবন কাটিয়ে দেয়।কিন্তু রহস্যটা ভেদ করে ফেললে মানুষটাকে ভীষণ ম্যাড়ম্যাড়ে আর একঘেয়ে লাগতে থাকে।
–হিমেলের রহস্য তুমি ভেদ করে ফেলেছো?
–হ্যাঁ।আমি বুঝে গেছি,আপনার কথাই ঠিক।হি ইজ আ সোশ্যাল ক্লাইম্বার।
ট্রেনের গতি ধীরে ধীরে বাড়ছে।হিমেল হতভম্ব চোখে অরণী আর নাফিসকে দেখছে ট্রেনের জানালা দিয়ে মাথা বের করে।সে এখন কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
নাফিস হাসতে হাসতে বলল–মিস ড্রামা কুইন! বেচারা হিমেলের এখন কি হবে?
–কি আর হবে? “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” এই গানটা গাইতে গাইতে সে সিলেট পৌঁছে যাবে।খালার বাসায় দু’চারদিন মন খারাপ করে ঘুরে বেড়াবে। তারপর আবার ট্রেনে চেপে নিজ বাসস্থানে ফিরে যাবে।
নাফিস হাসতে হাসতে বলল–সত্যিই তুমি আশ্চর্য একটা মেয়ে।তোমার মত মেয়ে পৃথিবীতে রেয়ার।দ্বিতীয়টা খুঁজে পাওয়া যাবে না,আমি নিশ্চিত।
–দয়া করে আমার মত দ্বিতীয় কাউকে খুঁজতে যাবেন না।আর একটা কথা…..
–কি?
–আমাকে প্লিজ ভুল বুঝবেন না।ভাববেন না,হিমেলের সাথে আমি প্রতারণা করেছি। আসলে মাকে দেখার পর থেকে কোথা থেকে যেন আশ্চর্য এক শক্তি এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমার চিন্তা,অনুভূতি সব হঠাৎ করে বদলে গেল।জেদের বশে নিজেকে আর হিমেলের হাতে তুলে দিতে ইচ্ছা করলো না।আর আমি যদি এমন কিছু করি মা হয়তো আমাকে ক্ষমা করতে পারবেন না।আমাকে আমার মায়ের সম্মান রক্ষা করে চলতে হবে।আর আমার মাকে আমি দ্বিতীয়বার হারাতে চাই না।
–আর লতিফ তালুকদার, মানে তোমার বাবা?
–নাউ হি ইজ আউট আফ মাই সিলেবাস। আমার সমস্ত ভাবনা জুড়ে এখন শুধুই মা,মা আর মা।এই শহরে আমার দুঃখিনী মাকে একলা ফেলে আমি কিভাবে যাই বলুন?আমাকে তার ভীষণ প্রয়োজন।
নাফিস হঠাৎ কোনো ভণিতা না করে বলল–অরনী!উইল ইউ বি মাই লাভ?
অরণী খিল খিল হাসি দিয়ে বলল– এরকম ভিড় আর কোলাহলের মধ্যে দাঁড়িয়ে কেউ ভালোবাসার কথা বলে?
নাফিস লজ্জা পেল।
নাফিস ঘোর লাগা চোখে অরণীকে দেখছে। অরণী লজ্জা পাচ্ছে।অরণী ভেবে পাচ্ছে না,কাল রাতে যে মানুষটাকে সে একেবারেই পাত্তা দেয় নি,আজ সে মানুষটাকে দেখে কেন অচেনা অনুভূতিতে তার সারাটা শরীর আর মন ছেয়ে যাচ্ছে?

সমাপ্ত!

গল্পটি প্রথম থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

রেটিং দিন

User Rating: 3.07 ( 8 votes)

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

স্ত্রীর পরশে

স্ত্রীর পরশে বদলে গেলো স্বামী (ছোট্ট গল্প)

এক স্ত্রী গভীর রাতে প্রতিদিন স্বামীর পাশ থেকে ঘুম থেকে উঠে আধা ঘন্টা এক ঘন্টার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE