Home / নারী / মা ও শিশু / সন্তান প্রসব কালে

সন্তান প্রসব কালে

প্রসবের সময় নিকটবর্তী হয়ে এলে মেয়েরা অনেকেই সেটা বুঝতে পারে। প্রায় দুই তিন সপ্তাহ আগের থেকে তারা পেটের ভার হঠাৎ যেন একটু নিচে নেমেছে বোধ করতে থাকে। এর কারণ প্রসবের সময় আসন্ন হলে সন্তানের মাথা অপেক্ষাকৃত নিচের দিকে বস্তির হাড়ের খোলের মধ্যে নেমে যায়, সুতরাং সন্তানসমেত বৃহৎ জরায়ুটির উপর দিকে ঠেলে ওঠার কষ্টটা কিছু লাঘব বোধ হতে থাকে। এর পরেই গর্ভিণী বোধ করতে থাকে যে কখনো পেটটা চারপাশ থেকে যেন গুটিয়ে আঁঠির মতো শক্ত হয়ে উঠেছে। বুঝতে হবে তখন থেকেই প্রসব কালীন সংকোচনক্রিয়ার প্রথম মহড়া দেওয়া শুরু হলো। এমনি সংকোচঙ্ক্রিয়া প্রসবের সময় আরো সজোরে হতে থাকবে এবং তার দ্বারাই সন্তান প্রসব হবে।

গর্ভকালটি সম্পূর্ণ হয়ে গেলেই আসল প্রসব বেদনা শুরু হয়ে যায়। কেন যে সুস্থ শরীরে অকস্মাৎ এমন একটা যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া ঘটতে আরম্ভ করে এ সম্বন্ধে অনেক মতভ্রদ আছে। অনেকে বলেন গর্ভস্থ সন্তানের দ্বারাই কোনো এক তীব্র উত্তেজক বস্তু জন্মায়, সেটা যখন মাত্রায় অত্যাধিক হয়ে পড়ে তখন তার দ্বারা জরায়ুর মাংসপেশী দারুণ উত্তেজিত হয়ে যথাসাধ্য সংকোচনের দ্বারা যত শীঘ্র সম্ভব সন্তানটিকে ভিতর থেকে নির্গত করে ফেলবার চেষ্টা করে। এর বেগ যদিও যথেষ্টই প্রবল, কিন্তু জরায়ুর মুখের ছিদ্রটি তখন ছোট, সন্তানের বেরিয়ে যাবার মতো প্রশস্ত পথ তখনও প্রস্তুত হয়নি। সেই নির্গমের পথটি প্রশস্ত করবার জন্য জরায়ু উত্তরোত্তর চাপ দিতে থাকে, আর প্রসূতি উত্তরোত্তর বেশী বেশী বেদনা বোধ করতে থাকে। প্রথম বারের গর্ভটির বেলায় মাংসপেশী গুলি খুব কঠিন থাকায় ঐ পথ প্রস্তুত হতে বারো ঘন্টা থেকে চব্বিশ ঘন্টা পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। কিন্তু পূর্বে যাদের একবার কিংবা একাধিকবার সন্তান হয়ে গেছে তাদের পক্ষে চার ছয় ঘন্টা অধিক বিলম্ব প্রায় হয় না।

প্রসবের ব্যথা নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে হয় না, কারণ জরায়ু কখনো নির বিচ্ছিন্ন বেগের সঙ্গে সমান ভাবে চাপ দিতে পারে না। তার চাপ মাঝে মাঝে প্রবল হয়ে উঠে, আবারব ,আঝে মাঝে থেমে যায়।   সুতরাং প্রত্যেক বারেই ব্যথাটা আসতে থাকে স্বতন্ত্রভাবে ও থেমে থেমে, মাঝে থাকে কিছুক্ষণ বিশ্রামের ব্যবধান। প্রথম যখন ব্যথা  ওঠে তখন সেই ব্যথা হয় ক্ষণস্থায়ী, তারপরে আসে অনেকটা সময়ের জন্য বিশ্রমের ব্যবধান। প্রসূতি ঐ সময় বেশ সুস্থ বোধ করতে থাকে। কিন্তু ক্রমে ব্যথার মাত্রা বাড়তে থাকে, ব্যবধানের মাত্রা কমে যেত থাকে, আর একটু দম নিতে না নিতে আবার সজোরে ব্যথাটা জোরে আসছে তবু প্রসব হতে অনেক বেশী দেরী হয়ে যাচ্ছে। খুব বুদ্ধিমতী হলেও তখনকার মতো সে ভুলে যায় যে খুব বেশী ব্যথা না পেলে জগতে কোনোই ভালো জিনিস সৃষ্টি করা যায় না।

প্রসব বেদনাকে নির্দিষ্ট ক্রিয়া করবার সময় টুকু না দিলে তাড়াতাড়ি প্রসব হবার কোনো উপায় নেই, বিশেষত প্রথম প্রসূতির পক্ষে। কেন উপায় নেই তা একটু বিচার করে দেখলে অনায়াসেই বোঝা যায়। আমরা ইতিপূর্বে যে ঝুলে—থাকা বোঁটার মতো জরায়ু কন্ঠের সম্বন্ধে উল্লেখ্য করেছি, সেটি তার ভিতরমুখ থেকে যোনিমধ্যস্থ মুখ পর্যন্ত মালে প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা, এবং তার মধ্যে যে নালিপথ আছে সেটি বড় জোর একটা সাধারণ পেন্সিলের মতো সরু । ঐটুকুর ভিতর দিয়ে একটি পাঁচ ইঞ্চি চওড়া হাড়ের তৈরী শক্ত মাথাকে বেরিয়ে আসতে হবে। অতএব ঐ সরু নালিপথের সরু পক্ষে ভিতর থেকে ক্রমশ চাড় পেয়ে এতখনি পর্যন্ত খুলে যাওয়া দরকার, যাতে ওর ভিতর দিয়ে অন্তরপক্ষে প্রমাণ হাতের চারটি আঙ্গুলই বিনা বাধায় গলে যেতে পারে। বেরোবার রাস্তা এতখানি প্রশস্ত হতে কিছু সময় লাগবারই কথা। প্রসব বেগের দ্বারা অর্থাৎ জরায়ুর চাপের দ্বারাই এই কাজটি ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকে। প্রত্যেক বারের ব্যথার সঙ্গে জরায়ুর সংকোচনের দ্বারা ঐ নালিপথটি এক ইঞ্চির কুড়ি ভাগের এক ভাগ মাত্রই ফাঁক হতে পারে। স্বয়ং প্রকৃতির এই ব্যবস্থা, কারণ ওর চেয়ে বেশী জোর করতে গেলে অকস্মাৎ জরায়ু অথবা জরায়ু কণ্ঠ হঠাৎ ফেটে কিংবা চিরে যেতে পারে। সুতরাং পথটি প্রস্তুত হবার জন্য কিছুক্ষণ সময় দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

প্রত্যেক বেগ আসার সঙ্গে গর্ভিণীও যথাসম্ভব কুন্থন করতে থাকে, তাতে প্রসবের পক্ষে যথেষ্ট সাহায্য হয়। পুনঃপুনঃ চাড় পেয়ে যখন জরায়ু কণ্ঠ অকোটা ফাঁক হয়ে যায় তখন তার ভিতর থেকে কিছু কিছু রক্তপাত শুরু হয়। তার পরেই রাস্তা পেয়ে প্রথমে সন্তানের দেহঘেরা পাতলা আবরণটি, অর্থাৎ যাকে বলে পানমুচি, সেটি জলসমেত ঠেলে বেরিয়ে আসে, এবং উপরকার চাপের দ্বারা ফেটে গিয়ে তার ভিতর থেকে সমস্ত জলটুকু হঠাৎ বেরিয়ে পড়ে। একেই বলে ‘পানমুচি ভাঙ্গা’। এর পরে যথাসময়ে সন্তানের মাথাটি জরায়ু কণ্ঠের সীমা পার হয়ে খানিক নিচে নেমে আসে। কিন্তু যোনির মুখ আরো ফাঁক না হলে মাথাটি তার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না। সুতরাং সন্তানের মাথা যোনির মুখের কাছে দেখা দিয়েও সেখানে কিছুক্ষণ আটকে থাকে। তার পরে দফায় দফায় ব্যথা আসার দ্বারা সেই যোনির মুখটিও ফাঁক হতে থাকে। যথেষ্ট প্রশস্ত হলে তখন কোনো একবারের ব্যথার সঙ্গে সঙ্গে আগে মাথাটি বেরিয়ে আসে, ওর পরের বারের চাপে কাৎ হয়ে বেরিয়ে আসে কাঁধটি, তার পরে আসে ধড়টি, পাছাটি এবং অবশেষে পা দুটি। এমনিভাবে প্রসবক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে তখন প্রসূতি কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম পায়।

কিন্তু সন্তান প্রসব হয়ে গেলেও তার পরে সন্তানের নাড়ির সঙ্গে সংলগ্ন ভিতরকার গর্ভফুলটিকে প্রসব করতে হয়। তার জন্যও দ্বিতীয় দফা অল্পক্ষণের জন্য আবার একটু প্রসব বেদনা ওঠে। সন্তান বেরিয়ে আসার প্রায় আধ ঘন্টার মধ্যেই ফুলটি বেরিয়ে আসে। ফুলটি জরায়ুগাত্র থেকে ছিঁড়ে আসার দরুণ তখন ভিতর থেকে রক্তপাত হতে থাকে। কখনো কখনো এই রক্তপাত অনেকটাই হয়, কখনো কখনো বা হয় সামান্য।

এই তো গেল একটিমাত্র সন্তান প্রসবের কষ্ট। যার দৈবাৎ দুটি যমজ সন্তান হয় তাকে এর চেয়ে আরো বেশী কষ্ট পেতে হয়। দুটি সন্তান কখনো একত্রে প্রসব হতে পারে না। সুতরাং একটির পর একটি পর্যায়ক্রমে প্রসব হতে থাকে, আর প্রসূতিকে একবারের স্থানে উপর্যুপরি দুইবারই ঐরূপ প্রসব বেদনা ভোগ করতে হয়। তবে যমজ সন্তান হলে তার প্রত্যেকটির আকার এক সন্তানের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ছোটই থাকে। যদি একই ডিম্বকোষ থেকে দুটি সন্তান জন্মায় তাহলে দুইজনের জন্য একটি  গর্ভফুলই থাকে। এস্থলে দেখা যায় যে প্রায় দুটিই হয় ছেলে কিংবা দুটিই হয় মেয়ে। আর যদি দুই স্বতন্ত্র ডিম্বকোষ থেকে দুটি সন্তানের উৎপত্তি হয় তাহলে সেখানে দুজনের জন্য দুটি স্বতন্ত্র গর্ভফুল থাকে। তেমন ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় যে দুজনের মধ্যে একটি হলো ছেলে আর একটি হলো মেয়ে।

প্রসব বেদনার যে কষ্ট তাতে প্রসূতিকে যথেষ্টই কাবু করে ফেলে এ কথা বলাই বাহুল্য। উত্তরোত্তর সমস্ত প্রক্রিয়াগুলির সঙ্গে যুজতে যুজতে তার নাড়ির গতি চঞ্চল হয়, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুততর হয়ে ওঠে, আর সর্বাঙ্গ দিয়ে ঘাম ঝরতে থাকে। অতিরিক্ত পরিশ্রম হেতু তার গলা শুকিয়ে যায়, বারে বারে পিপাসা পেতে থাকে, সে ধৈর্য হারিয়ে গোঙ্গাতে বা চিৎকার করতে থাকে। এতখানি কষ্ট সহ্য করবার পরে যখন প্রসবের প্রক্রিয়াটি সমাপ্ত হয় তখন প্রসূতি একেবারে অবসন্ন হয়ে পড়ে। এর পরে আবার রক্তপাতের দ্বারা সে আরো বেশী নির্জীব হয়ে যায়। তখন তাকে গরম দুধ কিংবা গরম চা দিলে ভালো হয়। ব্রাণ্ডি প্রভৃতি কোনো উত্তেজক জিনিস তখন মোটেই দেওয়া উচিৎ নয়। তাতে কোনো উপকার না হয়ে বরং অনিষ্ট হতে পারে।

সন্তানটি প্রসব হবার পরেও সে তখন মাতৃঅঙ্গ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়নি, নাড়ির দ্বারা গর্ভফুলের সঙ্গে তার সংযোগ রয়েছে। যখন নাড়িতে হাত দিয়ে দেখা যায় যে তার মধ্যে কোনো স্পন্দন নেই, তখন বোঝা যায় নবপ্রসূত শিশুর আপন শরীরের মধ্যেই রক্তচলাচল স্বাধীনভাবে ঘটতে শুরু হয়েছে। তখনই সুতো দিয়ে বেঁধে নাড়ি কেটে শিশুকে সরিয়ে নেওয়া যায়।

গর্ভফুলতি প্রসব হয়ে যাবার পরে যোনিস্থান ওষুধাক্ত জীবাণুমুক্ত পানি দিয়ে উত্তমরূপে ধুয়ে পরিস্কার করে ফেলতে হয়। তার পরে প্রসূতিকে কিছু খেতে দিয়ে গায়ে কাপড় চাপা দিয়ে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দেবার ব্যবস্থা করতে হয়।

প্রসব ক্রিয়াটির সম্বন্ধে সাধারণের পক্ষে যতটুকু জানা দরকার ততটুকুই এখানে বলা হলো। বাকি আরো যা কিছু জানবার আছে সে সব কথা ডাক্তারি ও ধাত্রীবিদ্যার অন্তর্গত। 

আপনি পড়ছেনঃ মেডিক্যাল সেক্স গাইড থেকে>> প্রসব কালে

প্রিয় পাঠক/পাঠিকাঃ আমাদের সাইটের পোস্ট পড়ে যদি আপনার কাছে ভালো তাহলে শেয়ার করুণ। এবং আপনার বন্ধুদের কে আমন্ত্রণ জানান আমাদের সাইটে যোগ দেওয়ার জন্য।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মাতৃস্তন্য দুগ্ধ শিশুর অমৃত আধার

সর্বযুগে সর্বদেশে মাতৃস্তন্য পান ও মাতৃস্তন্য দান নবজাত শিশুর জীবন সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *