Home / নারী / নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা / গর্ভাবস্থায় হার্টের রোগ – জেনে নিন করণীয়

গর্ভাবস্থায় হার্টের রোগ – জেনে নিন করণীয়

গর্ভাবস্থায় হার্টের রোগ একটি বিপজ্জনক অবস্থা।

যে সমস্ত মা প্রসবের জন্য হাসপাতালে আসেন তাঁদের মধ্যে প্রায় ১ শতাংশ ক্ষেত্রে এই রোগ দেখা যায়। এই রোগ দুটি কারনে হয়।

  • জন্মগত কারণ১০ শতাংশ
  • পরবর্তীকালে অর্জিত৯০ শতাংশ

পরবর্তীকালে অর্জিত কারণের মধ্যে রিউম্যাটিক কারণে হৃদরোগ (মাইট্রাল স্টেনোসিস) প্রধান। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই রোগ হয়। উন্নত বিশ্বে এই রোগ নেই বললেই চলে। কারণ এ সমস্ত দেশে স্ট্রেপটোকক্কাস নামক ব্যাকটেরিয়া, যার দ্বারা এই রোগ হয় তাঁর সংক্রমণ অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা যথাযথ প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ভারতবর্ষের মতো উন্নয়নশীল দেশে আর্থ-সামাজিক কারণে এই রোগের প্রাধান্য  এখনও অনেক বেশি। বাল্যকালে কারও কারও রিউম্যাটিক জ্বর হয়। গলাব্যথা, জ্বর ও গা-হাত-পা ব্যথা, বিশেষ করে হাড়ের সন্ধিস্থলে ব্যথা হয়। জ্বর ছাড়ে, হাড়ের সন্ধিস্থলের ব্যথারও উপশম হয়। কিন্তু হার্টের ভালবের সংক্রমণ হয়ে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ১ স্কোয়ার সেন্টিমিটার হয়ে যায়। ফলে রক্তচলাচলে অনেক বড় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। হার্টের কাজ  বেড়ে যায়। পরবর্তীকালে অর্জিত অন্যান্য কারণগুলি হল—

  • উচ্চ রক্তচাপের জন্য হার্টের রোগ।
  • থাইরয়েড গ্রন্থির জন্য হার্টের রোগ।
  • সিফিলিস ও করোনারি ধমনীর জন্য হার্টের রোগ।

জন্মগত কারণে হার্টের রোগগুলি হল এইরকম—হার্টের প্রকোষ্ঠের দেওয়ালে জন্মগত কারণে ছিদ্র থাকা, যথা—এট্রিয়াল সেপটাল ডিফেক্ট, ভেনট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্ট।

এছাড়াও patient ductas arterious,  coarctation of aorta  রোগও হতে পারে। গর্ভাবস্থায় হার্টের কাজ বেড়ে যায়। কারণ এই সময়ে প্রায় ২০ শতাংশ রক্তের আয়তন বৃদ্ধি হয়।

মোট প্রায় ১ লিটার রক্ত বৃদ্ধি হয়। রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি শুরু হয় গর্ভের ১২ সপ্তাহ থেকে এবং সর্বাধিক বৃদ্ধি হয় ৩২ সপ্তাহে। গর্ভাবস্থায় হার্টের গতিবৃদ্ধি হয়। গর্ভাবস্থায় কার্ডিয়াক আউটপুট বৃদ্ধি হয় ৩০—৪০ শতাংশ।  প্রসবের সময় ৪০ শতাংশ এবং প্রসবের অব্যবহিত পরে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ। সেইজন্য ৩০—৩২ সপ্তাহে অথবা প্রসবের সময় বা তাঁর অব্যবহতি পরে সাধারণ হার্ট ফেলিওর হয়।

অন্যান্য কারণ যা ক্ষতিগ্রস্ত হার্টের কর্মক্ষমতা আরও কমিয়ে দেয় তা হল, রোগীর বেশি বয়স, হার্টের অস্বাভাবিক ছন্দ, গর্ভাবস্থায় জটিলতা, যথা—রক্তাসল্পতা প্রি-এক্লাম্পসিয়া, এক্লাম্পসিয়া, সংক্রমণ, গর্ভাবস্থায় দেখভালের অপ্রতুলতা।

নিউইয়র্ক হার্ট অ্যাসোসিয়েশন গর্ভাবস্থায় হৃদযন্ত্রের রোগের তীব্রতা অনুযায়ী এইভাবে শ্রেণী বিন্যাস করেছেন।

গ্রেড-১ : সাধারণ কাজকর্মে যখন কোনো অসুবিধা হয় না।

গ্রেড-২ : সাধারণ কাজকর্মে অসুবিধা তথা শ্বাসকষ্ট।

গ্রেড-৩ : সাধারণ থেকে কম কাজকর্মে শ্বাসকষ্ট হয়।

গ্রেড-৪ : যখন বিশ্রাম অবস্থাতেই শ্বাসকষ্ট হয়।

রোগ নির্ণয়

বাল্যকালে রিউম্যাটিক জ্বর হওয়ার ইতিহাস জন্মগত হার্টের রোগ,  সিফিলিস বা করোনারি ধমনীরে রোগ থাকলে, হার্ট বড় হয়ে যাওয়া, ডায়াস্টোলিক মারমার, হার্টের গতির অস্বাভাবিক ছন্দ ইত্যাদি ছাড়াও ই.সি.জি., ছাতির এক্স-রে, ইকোকার্ডিওগ্রাম করে এই রোগ নির্ণয় করা যায়। 

গর্ভাবস্থায় হার্টের রোগ থাকলে কম ওজনের শিশু সময়ের আগেই প্রসব হয়। গর্ভাবস্থায় পরিচর্যা ভালোভাবে  হলেও এই রোগে গ্রেড ১ এবং গ্রেড ২-এর ক্ষেত্রে ১ শতাংশ মা মারা যান এবং গ্রেড-৩  এবং গ্রেড ৪-এর ক্ষেত্রে ৪ শতাংশ মা মারা যান।

 মৃত্যুর কারণ

কনজেসটিভ কার্ডিয়াক ফেলিওর, পালমোনারি এমবোলিজম,  সাবএকিউট ব্যাকটেরিয়াল এন্ডোকার্ডাইটিস, অ্যাকটিভ রিউম্যাটিক কার্ডাইটিস ইত্যাদি।

গর্ভাবস্থায় হার্টের রোগীর মৃত্যুর সচরাচর সময় হল গর্ভের ২৮ থেকে ৩২ সপ্তাহ,  প্রসবের সময়, প্রসবের অব্যবহিত পরে অথবা সূতিকার প্রথম সপ্তাহের শেষদিকে।

এই রোগের গর্ভের শিশুর ওপর প্রভাব

গ্রেড-১ এবং গ্রেড ২ ক্ষেত্রে সাধারণত শিশুর ওপর কোনো প্রভাব থাকে না, গ্রেড ৩ এবং গ্রেড ৪ হার্টের রোগীদের প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু মারা যায়। সময়ের আগেই কম ওজনের শিশুর জন্ম, বয়স অনুযায়ী কম ওজনের শিশুর জন্ম অথবা গর্ভাবস্থায় পেটের মধ্যেই শিশুর মৃত্যু হয়।

গর্ভাবস্থায় পরিচর্যা

এক্ষেত্রে রোগীকে ঘন ঘন পরীক্ষা করা হয়। সাধারণ ক্ষেত্রে মাসে একবার করে ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে ওই সময়ে ২ সপ্তাহ বাদে বাদে পরীক্ষা করা হয়। তারপর প্রতি ১ সপ্তাহ অন্তর পরীক্ষা করা হয়।

বিশেষ সতকর্তা

যে বিষয়গুলির ওপর বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়, তা হল—নাড়ির গতি, রক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, রক্তাল্পতা, গা-হাত-পা ফুলে যাওয়া, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের প্রদাহ ইত্যাদি। উপরোক্ত যে-কোন অসঙ্গতি ধরা পড়লে তা ঝটপট সারিয়ে ফেলা খুব জরুরী। সঙ্গে বেশি বিশ্রাম, ঠাণ্ডা ও সংক্রমণ থেকে বিরত থাকা, মশলাযুক্ত খাবার পরিহার করা, দাঁতের যত্ন নেওয়া ও ইঞ্জেকশন Penidure LA12 দুই সপ্তাহ বাদে বাদে নেওয়ার উপদেশ দেওয়া হয়। এই সমস্ত রোগীকে অবশ্যই হাসপাতালে প্রসব করাতে হবে।

প্রসবকালীন দেখাশোনা

এই সময় বিছানায় বিশ্রাম, প্রয়োজনে অক্সিজেন, ঘুমের ওষুধ,  গ্লুকোজ পানীয় দেওয়া হয়। নাড়ির গতি ও শ্বাসক্রিয়ায় ওপর লক্ষ্য রাখা হয়। প্রসবের দ্বিতীয় পর্যায়ে ফরসেপ করে শিশু প্রসব করানো হয়। এতে মায়ের কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। এই সময়ে নিয়মমাফিক ইঞ্জেকশন আর্গোমেট্রিন দেওয়া হয় না। দিলে হার্ট ফেলিওর হতে পারে। প্রসবকালে তৃতীয় পর্যায়ে সচরাচর ব্যবস্থাপনা অবলম্বন করা হয়।

গর্ভাবস্থায় হার্টের রোগ ও সিজারিয়ান অপারেশন

এক্ষেত্রে অপারেশন করার ঝুঁকি ও বিপদ অনেক বেশি। এতে মায়ের মৃত্যু হওয়ার বিপদ অনেকগুণ বেশি। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে, যেমন—শ্রোণী ছোট থাকলে, গর্ভস্থ শিশুর অস্বাভাবিক অবস্থিতি, জরায়ুর নীচের দিকের গর্ভের ফুলের অবস্থিতি থাকলে সিজার ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না।

সূতিকার সময় সতর্কতা

প্রথম ২৪ ঘন্টা রোগীর ওপর খুব বেশি সতর্কভাবে লক্ষ্য রাখা হয়। কারণ এই সময় মায়ের হঠাৎ করে হার্ট ফেলিওর হয়ে মৃত্যু হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা উচিৎ। হার্ট ফেলিওর না থাকলে শিশুকে স্তন্যপান করানো যেতে পারে। অন্ততপক্ষে ও সপ্তাহ রোগীর হাসপাতালে  ভর্তি থাকা উচিৎ।

জন্মনিয়ন্ত্রণ

এটা খুব জরুরি। জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি অথবা জরায়ুর মধ্যে প্রতিস্থাপিত করা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, যথা—কপার-টি ক্ষতিকারক। এই সমস্ত ক্ষেত্রে কনডম হল সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট পদ্ধতি।  স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বেশি ভালো। স্ত্রীর হার্টের অবস্থা ভালো না থাকলে স্বামীর ভ্যাসেকটমি অপারেশন করা উচিৎ।

 গর্ভপাত বা এম.টি.পি.

গ্রেড ১ ও গ্রেড ২ এর ক্ষেত্রে গর্ভপাত করে নেওয়া নিরাপদ।  গ্রেড ৩ ও গ্রেড ৪ এর ক্ষেত্রে রোগনির্ণয় হওয়া মাত্র গর্ভপাত  করা বাঞ্ছনীয়,  যদি গর্ভাবস্থায় ১২ সপ্তাহের মধ্যে থাকে। সাকশন ইভাকুয়েশন পদ্ধতি বা ডি.ই পদ্ধতিতে গর্ভপাত করা হয়। গর্ভাবস্থার ১২ সপ্তাহ পরে গর্ভপাত খুব বিপজ্জনক এবং করানো উচিৎ নয়। পেট কেটে গর্ভপাত করানো (Hysterotomy) আরও বিপজ্জনক। এসমস্ত ক্ষেত্রে ১৪—১৮ সপ্তাহে হার্টের অপারেশন (Mitral valvotomy) করা যেতে পারে।

লেখক : ডাঃ অবিনাশ চন্দ্র রায়। ( স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ)

লেখকের গর্ভবতী মা ও সন্তান থেকে আমার বাংলা পোস্ট.কম ব্লগে প্রকাশিত। 

নারীর স্বাস্থ্য সচেতনতায় এই আর্টিকেলটি শেয়ার করুন।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মায়ের মৃত্যু

গর্ভাবস্থা ও মৃত্যু। নিরাপদ মাতৃত্বের উপায়

গর্ভাবস্থায় অথবা প্রসবের পরে মায়ের মৃত্যু একটি দুঃখজনক ঘটনা। সারা পৃথিবীতে বছরে প্রায় ছ’লক্ষ মহিলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *