Home / নারী / নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা / গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস-পরীক্ষা ও করণীয়

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস-পরীক্ষা ও করণীয়

গর্ভাবস্থাকালে ডায়াবেটিস একটি বেশি বিপদের গর্ভ।

প্রায় এক শতাংশ গর্ভবতী স্ত্রীর মধ্যে এই রোগ দেখা যায়। এই রোগের জন্য মায়ের কিছু কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং শিশুর অনেক রকম সমস্যা দেখা যায়। তাঁর জন্য গর্ভাধারে, প্রসবের সময় এবং প্রসবের অব্যবহিত পরে শিশুর মৃত্যু হতে পারে। সেইজন্য প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের নিয়মমাফিক রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা উচিৎ,  রক্তে শর্করার পরিমাণ নির্ধারনের জন্য ও প্রস্রাবে শর্করা আছে কি না তা জানার জন্য। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে শর্করার পরিমাণ সঠিক নিয়ন্ত্রিত থাকলে মা ও শিশুর রোগের সম্ভাবনা কম থাকে, গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ক্রটি ও শিশুমৃত্যুর হারও অনেক কমে যায়। একজন গর্ভবতী মা একটি সুস্থ সবল হৃষ্টপুষ্ট সর্বদা কামনা করে কিন্তু শিশুর ওজন যখন চার কেজি বা তারও বেশি হয় তখন মায়ের ডায়াবেটিস রোগ থাকার সম্ভাবনা থাকে।

যে-সমস্ত অবস্থায় একজন গর্ভবতী স্ত্রীর ডায়াবেটিস রোগ থাকতে পারে বলে  সন্দেহ করা হয়, তা হল  এইরকম :

  • অতিরিক্ত মোটা গর্ভবতী মা।
  • বয়স ৩০ বছরের  বেশি।
  • মাতা পিতার ডায়াবেটিস রোগ থাকলে।
  • পূর্বের গর্ভের সময় যদি জরায়ুর ভেতর, প্রসবকালে বা প্রসবের অব্যবহিত পরে শিশুর মৃত্যু হয় অথবা স্বাভাবিক প্রসবকালে অসুবিধার সৃষ্টি হয় (Difficult labour) ।
  • শিশুর ওজন চার কেজি বা তাঁর বেশি হলে।

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস দু’ধরনের হতে পারে :

  • যখন একজন ডায়াবেটিস রোগী গর্ভধারণ করে।
  • যখন গর্ভাবস্থায় প্রথম এই রোগ ধরা পড়ে (Gestational diabetis)।

কখন ডায়াবেটিস হয়েছে বলে ধরা হয়

যখন খালিপেটে রক্ত পরীক্ষা করলে রক্তে শর্করার মাত্রা ১১০ মিলিগ্রাম %-এর অধিক এবং ৭৫ গ্রাম গ্রাম গ্লুকোজ খালিপেটে খাওয়ানোর দু’ঘন্টা পরে রক্তে শর্করার পরিমাণ ১৪০ মিলিগ্রাম %-এর বেশি হয়,  তখন উক্ত রোগীর ডায়াবেটিস হয়েছে বলে ধরা হয়। তবে Oral Glucose Tolerance Test বা সংক্ষেপে G.T.T. করে এই রোগ নির্ণয় সুনিশ্চিতভাবে করা হয়।

ডায়াবেটিস রোগের ওপর গর্ভাবস্থার প্রভাব

অন্তঃসত্ত্বাকালে :

  • রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায় ও প্রস্রাবে বেহসি মাত্রায় শর্করা নির্গত হয়।
  • শরীরের চর্বি এবং প্রোটিন বেশি খরচ হয় (Fat and protein catabolism) যার ফলে ওজন কমে যায়।

গর্ভাবস্থার প্রথমদিকে শরীরে ইনসুলিনের প্রয়োজনীয়তা কমে গেলেও গর্ভাবস্থার দ্বিতীয়ার্ধে এর প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়। কারণ এই সময়ে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যায় ও ইনসুলিনের বিপরীতধর্মী পদার্থের (contra insulin insulin Factors), যথা—হিউম্যান প্ল্যাসেন্টাল ল্যাকটোজেন, ইস্টোজেন, প্রোজেস্টেরন, ফ্রি কর্টিজল-এর মাত্রা রক্তে বৃদ্ধি পায়।

প্রসব-যন্ত্রণাকালেঃ এই সময়ে রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে যেতে পারে যদি না রোগীর শিরায় গ্লুকোজ ও কম পরিমাণে ইনসুলিন প্রবাহিত করা হয়।

প্রসবের পরঃ এই সময়ে উপরিক্ত ইনসুলিনের বিপরীতধর্মী পদার্থের প্রভাব থাকে না বলে রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে আসে। কিন্তু এটা জেনে রাখা উচিৎ যে, গর্ভাবস্থার জন্য যাদের ডায়াবেটিস হয়, তাঁদের প্রায় ১০ শতাংশের পরবর্তীকালে গর্ভাবস্থা ছাড়াই ডায়াবেটিস রোগ হয়।

গর্ভাবস্থা ও শিশুর ওপর ডায়াবেটিস রোগের প্রভাব

  • প্রস্রাবের, বহিঃপ্রজনন অঙ্গের ও যোনির সংক্রমণ  হতে পারে।
  • গর্ভপাতের মাত্রা বেড়ে যায়, এই রোগ অনিয়ন্ত্রিত থাকলে।
  • হাত-পা ফুলে যাওয়া ও রক্তের চাপ বেড়ে যেতে পারে। (প্রি-এক্লাম্পসিয়া—২৫  শতাংশ  ক্ষেত্রে)
  • জরায়ুর মধ্যে জলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়  (Hydramnios) । প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে এরকম হয়। বড় বাচ্চা হওয়ার জন্য, বড় গর্ভের ফুল অথবা বিকলাঙ্গ শিশুর জন্য এটা হয়।
  • খুব বেশি ওজনের শিশু বিকশিত হতে পারে।
  • সময়ের আগেই প্রসবের ঘটনা খুব বেশি হয়।
  • পেটের ভেতর বড় শিশু ও বেশি জল থাকার জন্য মায়ের কষ্টও বেশি হয়।

শিশুর ওপর এই রোগের প্রভাব

  • গর্ভাবস্থার শেষদিকে মায়ের জরায়ুতে শিশুর মৃত্যুর হতে পারে, যদি এই রোগের চিকিৎসা ঠিকমতো করা না হয়।
  • ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজনের শিশুর জন্ম হয়। (চার কেজি থেকে বেশি ওজনের)। এই সমস্ত শিশুর শরীরে অতিমাত্রায় চর্বি থাকার জন্য তুলতুলে হয়।
  • বড় বাচ্চা হওয়ার জন্য প্রসব সহজে হয় না।
  • এই সমস্ত শিশুর ফুসফুসের বিকাশ ও পরিপূর্ণতা দেরি করে হয়। ফলে প্রসবের পরে শ্বাসকষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
  • জন্মগত ক্রটিঃ প্রায় ৬ শতাংশ বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়।
  • শিশু-মৃত্যুর হার বেশি হয়।

ডায়াবেটিস রোগের পরীক্ষাগর্ভাবস্থায় পরিচর্যা

বেশি বিপদের গর্ভ বলে রোগীকে ঘন ঘন পরীক্ষা করা হয়। গর্ভের আগেই ডায়াবেটিস থাকলে তা আগে থেকেই সুনিয়ন্ত্রিত করা দরকার। কোনো রগী যদি ডায়াবেটিসের ট্যাবলেট খান, তাহলে সেটা বন্ধ করে ইনসুলিন ইঞ্জেকশন দিয়ে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত কয়া হয়।

চিকিৎসা

খাদ্য, বিশ্রাম ও ইনসুলিনের সঠিক মাত্রা সম্পর্কে রোগীকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ তার সুচিকিৎসা করা হয়। যে-সমস্ত রোগীর গর্ভাবস্থাজনিত কারনে মধুমেহ রোগ হয় (Gestational Diabetes), তাঁদের খাদ্য সম্পর্কে উপদেশ দেওয়া হয়।ডায়াবেটিক ডায়েট চার্ট তৈরি করে দেওয়া হয় এবং সেই অনুযায়ী খেতে বলা হয়।

ডায়াবেটিস রোগির খাবারখাদ্য

আলু ও মিষ্টি জাতীয় খাবার খাদ্য-তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ভাতের পরিমাণ কম করা হয়।  দুপুরে ৭৫ গ্রাম চালের ভাত দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া রুটি, চাপাটি, দুধ, দই, ডাল, মাছ, মুরগি,  টাটকা সবুজ সবজি।  উচ্ছে, করলা, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, ঢেঁড়শ, মটরশুঁটি, শশা, পেয়ারা ইত্যাদি খাদ্য-তালিকায় রাখা হয়। চায়ের সঙ্গে চিনির বদলে স্যাকারিন দেওয়া যেতে পারে। বারে বারে রক্তপরীক্ষা (দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার দু’ঘন্টা  বাদে) করে রক্তে শর্করার মাত্রা নির্ণয় করা হয়। সেই অনুযায়ী ইনসুলিনের মাত্রা বাড়ানো বা কমানো হয়।

আলট্রাসাউন্ড করে দেখা হয়, শিশুর জন্মগত কোনো ক্রটি আছে কি না।  এছাড়াও শিশুর অতিমাত্রায়  ওজন আছে কি ন এ তাও বোঝা যায়।

হাসপাতালে ভর্তি

গর্ভাবস্থায় মধুমেহ রোগ, যা ইনসুলিন দিয়ে সুনিয়ন্ত্রিত এই সমস্ত রোগীকে প্রসবের জন্য প্রসবের সম্ভাব্য তারিখের (Expected date of delivary) দু’সপ্তাহ আগে ভর্তি করে রাখা উচিৎ। আর এই রোগ সুনিয়ন্ত্রিত না থাকলে আরও আগে (৩৪ সপ্তাহের মাথায়) ভর্তি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

প্রসব

ইনসুলিন দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত রোগীর ক্ষেত্রে এবং যেখানে অন্য কোনো জটিলতা নেই, সেইসব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু অন্য কোন সমস্যা বা জটিলতা থাকলে সিজারিয়ান অপারেশন (গর্ভাবস্থার ৩৮ থেকে ৪০ সপ্তাহের মধ্যে) করা বেশি নিরাপদ। তবে কোনো ক্কেহত্রেই রোগীর প্রসবের সম্ভাব্য দিন থেকে বেশি দেরি করা উচিত নয়। করলে মায়ের গর্ভে শিশুমৃত্যুর বিপদ অনেক গুণ বেরে যায়।

নবজাত শিশুর পরিচর্যা

ডায়াবেটিস রোগাক্রান্ত মায়ের প্রসবের সময় শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি একান্ত জরুরি। অন্তত দু’-তিনদিন নবজাত শিশুকে চোখে চোখে রাখা বাঞ্ছনীয়। কারণ এই সমস্ত শিশুর হঠাৎ করে জরুতি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

জন্মনিয়ন্ত্রণ

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গর্ভনিরোধক বড়ি সেবন করা উচিৎ নয়। এই সমস্ত বড়ি ডায়াবেটিক অবস্থাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। জরায়ুর মধ্যে কপার টি বা মাল্টিলোড কপার প্রতিস্থাপিত করাও উচিৎ নয়। এতে শ্রোণির সংক্রমণ হতে পারে। তাই সমস্ত রোগীর সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ণ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হল ব্যারিয়ার কন্ট্রাসেপটিভ অর্থাৎ কনডম বা নিরোধ। দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নেওয়া উচিৎ। স্বামীর ভ্যাসকটমি বা স্ত্রীর টিউবেকটমি করা দরকার।

আপনি পড়ছেন : গর্ভবতী মা ও সন্তান বই থেকে।

লেখকঃ ডাঃ অবিনাশ চন্দ্র রায়। ( স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ)

এই বই থেকে পূর্বে প্রকাশিত আর্টিকেল সমূহ…

06 গর্ভাবস্থায় ওষুধ

07 গর্ভাবস্থায় এক্স-রে

17 দেরিতে মা হওয়ার বিপদ

18 বেশি বিপদের গর্ভ – পরীক্ষা ও চিকিৎসা

22 ভ্রূণের লিঙ্গ (ছেলে না মেয়ে) নির্ধারণ

26 নকল গর্ভ

লেখাটি পড়ার জন্য আমার বাংলা পোস্ট.কম ব্লগ পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

আমাদের লেখিত ও প্রকাশিত আর্টিকেল, বই ও লাইফস্টাইল টিপস গুলো পড়ে আপনার কাছে ভালো লাগলে শেয়ার করে আপনার বন্ধুদেরকে জানান। আমাদের প্রকাশিত আর্টিকেল-বই ও টিপস সম্পর্কে আপনার মতামত জানাতে কমেন্ট করুন।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মায়ের মৃত্যু

গর্ভাবস্থা ও মৃত্যু। নিরাপদ মাতৃত্বের উপায়

গর্ভাবস্থায় অথবা প্রসবের পরে মায়ের মৃত্যু একটি দুঃখজনক ঘটনা। সারা পৃথিবীতে বছরে প্রায় ছ’লক্ষ মহিলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *