Home / নারী / নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা / গর্ভাবস্থায় জনডিস- জন্ডিসের কারণ ও চিকিৎসা

গর্ভাবস্থায় জনডিস- জন্ডিসের কারণ ও চিকিৎসা

যখন রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা দুই মিলিগ্রাম পার্সেন্টের বেশি হয় (স্বাভাবিক 0.2-8mg%) তখন রোগীর চামড়া, চোখের সাদা অংশ ইত্যাদি হলুদ রঙের দেখায় এবং রোগীর জনডিস হয়েছে বলে ধরা হয়।

জনডিসের কারণ

  • ভাইরাল হেপাটাইটিস : সর্বাধিক কারণ হল এটা (৭০ শতাংশ)।
  • পিত্তথলিতে পাথর এবং পিত্তথলির প্রদাহ : (২ শতাংশ)
  • হিমোলাইটিক জনডিস : রঞ্চাসঞ্চালন ক্রটির জন্য (Mismatched blood transfusion) ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের জন্য।
  • ভেষজ পদার্থের বিষক্রিয়ার জন্য : ক্লোরপ্রোমাজিন ও টেট্রাসাইক্লিন বেশি মাত্রায় প্রয়োগের জন্য।
  • কোলেস্টেটিক জনডিস (Cholestatic Jaundice) (১০ শতাংশ ক্ষেত্রে) : গর্ভাবস্থায় জনডিসের এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ। গর্ভাবস্থার  শেষ দিকে হালকা ধরনের জনডিস ও সঙ্গে চুলকানি থাকে। অন্তঃসত্ত্বাকালে এস্ট্রোজেন হরমোনের লিভারের ওপর প্রতিক্রিয়ার জন্য গর্ভাবস্থায় শিশুর মৃত্যু হতে পারে  অথবা প্রসবের পর মায়ের যোনি দিয়ে খুব বেশি পরিমাণ রক্তক্ষরণ (পি.পি.এইচ.) হতে পারে।
  • অ্যাকিউট ফ্যাটি লিভার (Obstetric acute yellow atrophy of liver) : প্রোটিনের অভাবজনিত অপুষ্টি ও টেট্রাসাইক্লিন ওষুধের প্রয়োগের জন্য এই রোগ হতে পারে।  এই রোগে জনডিসের সঙ্গে খুব বেশি বমি হতে পারে। ওপর পেটে ব্যথা হতে পারে, বমির সঙ্গে রক্ত বের হতে পারে, প্রস্রাব কমে যেতে পারে, এমনকি গর্ভাবস্থার শেষ দিকে প্রস্রাব উৎপন্ন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডি.আই.সি (I.C)-এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। লিভারের কোষ পরীক্ষা করলে ফ্যাটি পরিবর্তন (Fatty changes) দেখা যায়। সাধারণত মা কিছুদিনের মধ্যেই মরা সন্তান প্রসব করে ও মারা যায়।
  • প্রি-এক্লাম্পসিয়া/এক্লাম্পসিয়া : এই রোগে লিভারের পরিবর্তনের জন্য কখনও কখনও জনডিস দেখা দিতে পারে।
  • হাইপারএমোসিস গ্রাভিডেরাম : লিভারের পরিবর্তনের জন্য কদাচিৎ জনডিস দেখা যায় এই রোগে।
  • সেপটিক অ্যাবরশান : এর জন্য হিমোলাইটিক জনডিস  হয়। ই-কোলাই ও কলট্রিডিয়াম ওয়েলসাই সংক্রমণ হেপাটাইটিস করতে পারে।

গর্ভাবস্থায় জনডিস

ভাইরাল হেপাটাইটিস

গর্ভাবস্থায় জনডিসের সর্বাধিক কারণ হল ভাইরাল হেপাটাইটিস। গর্ভাবস্থায় এই রোগ বেহসি হয় গর্ভাবস্থাহীন অবস্থার থেকে। এই সংক্রমণ সাধারণত গর্ভের শেষ তিনমাসে দেখা যায়। উন্নয়নশীল দেশের গর্ভবতী মহিলাদের এই রোগের প্রবণতা বেশি।

  • কোন কোন ভাইরাস সংক্রমণ থেকে এই রোগ হয় :

তিন রকম ভাইরাসের যে-কোন একটির সংক্রমণ থেকে এই রোগ হয়। সেগুলি হল—

  • হেপাটাইটিস-এ ভাইরাস।
  • হেপাটাইটিস বি ভাইরাস।
  • নন-এ এবং নন-বি ভাইরাস হেপাটাইটিস।

কিভাবে এই ভাইরাস সংক্রামিত হয় :

  • হেপাটাইটিস-এ ভাইরাস মল দিয়ে নির্গত হয়, যা দূষিত দুধ বা পানীয় জলের সঙ্গে মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। ওই সংক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে সংস্পর্শ, নিম্নমানের ময়লা জল নিঙ্কাষণ ব্যবস্থা এবং ঘনবসতি এলাকা উক্ত সংক্রমণের প্রেক্ষাপট। এই সংক্রমণ শরীরে ঢোকার পর একমাস বাদে রোগের প্রকাশ পায়।
  • হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস প্রধানত উক্ত ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত রক্ত বা রক্তজাত পদার্থ শরীরে সঞ্চালনের জন্য হয়ে থাকে। এছাড়াও লালা, যোনিরস এবং বীর্য দ্বারাও উক্ত সংক্রমণ হয়। তাই৯ স্বাস্থ্যকর্মীদের সংক্রমণের আশঙ্কা খুব বেশি। শরীরে উক্ত সংক্রমণ ঢোকার তিনমাস বাদে জনডিসের লক্ষণ প্রকাশ পায়।
  • নন-এ ও নন-বি (Non-A & non B virus) একই সঙ্গে হেপাটাইটিস –বি ভাইরাসের মতো শরীরে প্রবেশ করে রক্ত ও রক্তজাত পদার্থ শরীরে সঞ্চালন করার পর। সংক্রমণ ঢোকার ছ’সপ্তাহ বাদে রোগে প্রকাশ পায়। মায়ের অপুষ্টিই ভাইরাল হেপাটাইটিসের পূর্ববর্তী কারন।

এই রোগের পরিসংখ্যান কেমন :

এই রোগ ৬৭০ জন গর্ভবতী স্ত্রীর মধ্যে ১ জনের হয়।

লিভারের কোষে কি ধরনের ক্ষতি করে :

এই ভাইরাস লিভারের কোষ আক্রমণ করে এবং পচন ধরায়।

উপসর্গ

ক্ষুদামান্দ্য,  বমি-বমি ভাব অথবা বমি হওয়া,  অল্পমাত্রায় জ্বর, অতিমাত্রায় দুর্বলতা,  প্রস্রাবের রং হলুদ হওয়া, চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া এবং অসম্ভব চুলকানি এই রোগের প্রধান লক্ষণ। এছাড়াও লিভার বড় হয়ে যায় এবং পেটের ওপরের দিকে ও ডানদিকে টিপলে ব্যথা অনুভূত হয়।

গর্ভাবস্থায় এই রোগের পরিণতি কিঃ

গর্ভাবস্থায় এর তীব্রতা বৃদ্ধি হয় ও মারাত্মক হয়। সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে হেপাটাইটিস-বি’র সংক্রমণ হলে। আর  অন্য সব ভাইরাল হেপাটাইটিস হলে সম্পূর্ণ আরোগ্যলাভ করে, ১০ শতাংশ রোগী ক্যারিয়ার হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী লিভারের প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং লিভারের পচন ধরায়। নন-এ ও নন-বি হেপাটাইটিস লিভারের দীর্ঘস্থায়ী রোগ সৃষ্টি করে না।

কোন কোন হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণ মায়ের থেকে শিশুর শরীরে প্রবেশ করে:

        হেপাটাইটিস-এ ভাইরাস গর্ভের ফুলের মাধ্যমে মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে প্রবেশ করে।

হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস সংক্রমণ গর্ভের ফুলের মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

নন-এ এবং নন-বি হেপাটাইটিস ভাইরাসও মা’র থেকে  শিশুর শরীরে সংক্রামিত হতে পারে।

রোগের জটিলতা

এই রোগে ২০ শতাংশ রোগীর মৃতু হয়। গর্ভাবস্থায় এই রোগে মৃত্যুহার গর্ভধারণ হয়নি এমন অবস্থার থেকে দশ গুণ বেশি।

মৃত্যুর কারণ :

হেপাটিক কোমা ৫৭ শতাংশ ক্ষেত্রে, ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে পি.পি এইচ. মৃত্যুর কারণ।  এছাড়াও মুখ দিয়ে রক্তবমি হওয়া, মলদ্বার দিয়ে রক্ত নির্গত হওয়া, প্রসবজনিত জটিলতা, কিডনি ফেলিওর, প্রসবের পর সংক্রমণ ইত্যাদিও মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

মৃতু শিশু বা শিশুমৃত্যু : ৩৫ শতাংশ ক্ষেত্রে। এর কারণ মরা বাচ্চা প্রসব হওয়া, সময়ের যথার্থ আগে প্রসব হওয়া, শিশুর শ্বাসকষ্ট ও প্রসবের অব্যবহিত পরে শিশুর সংক্রমণ। বলা যেতে পারে, এই রোগে মা ও শিশুর জীবন সঙ্কটনাপন্ন ও মরা-বাঁচা অনিশ্চিত।

রোগ অনুসন্ধান :

  • মল পরীক্ষা : হেপাটাইটিস-এ ভাইরাস পাওয়া যেতে পারে।
  • রক্ত-পরীক্ষা : হেপাটাইটিস-এG.A. এবং I.G.M. অ্যান্টিবডি রক্তে পাওয়া যায়। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস রক্তপরীক্ষা করে পাওয়া যায়। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস রক্তপরীক্ষা করে সারফেস অ্যান্টিজেন Hbs A9 Hbs A9 অ্যান্টিবডি পেলে বোঝা যায়।

ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা

এ-রোগের চিকিৎসা থেকে রোগ প্রতিরোধ বেশি উপকারি।

  • রোগ প্রতিরোধ : গর্ভাবস্থার সময় ফোটানো ঠান্ডা পানি পান করা উচিৎ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বাড়ির পরিবেশ ও ময়লা পানি নিঙ্কাশনের সুব্যবস্থা রাখা গুরুত্বপূর্ণ।  এটি একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
  • প্রতিষেধক টিকা : প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ টিকাকরণ দরকার।
  • চিকিৎসা : তীব্র ভাইরাল হেপাটাইটিসের এখনও পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তীব্র ভাইরাল হেপাটাইটিস রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া উচিৎ। রোগীকে আলাদা করে রাখা দরকার। রোগির সম্পূর্ণ বিশ্রাম দরকার, যতদিন না বিলিরুবিনের মাত্র স্বাভাবিক হয়ে আএ, যতদিন না রোগীর খিদে বৃদ্ধি পায়, যতদিন না মলের রং স্বাভাবিক হয়।

সপ্তাহ অন্তর বিলিরুবিন, SGOT SGPT পরীক্ষা করা হয় প্রথমদিকে।  পরবর্তীকালে মাসে একবার করে ওই পরীক্ষা করা হয়, যতদিন না ওই পরীক্ষার রিপোর্ট স্বাভাবিক আসে।

  • খাদ্য : প্রথমদিকে চর্বিহীন ও শর্করাযুক্ত খাদ্য দেওয়া হয়। (গ্লুকোজ পানি, ফলের রস)। যখন খিদেভাব ফিরে আসে, তখন প্রোটিন ও কম চর্বিযুক্ত খাদ্য খেতে দেওয়া হয় (মাছ, দুধ, মুরগি,  ডিম, সবজি ইত্যাদি)। ঘি,  মাখন,  তেল বাদ দেওয়া উচিৎ। তীব্র হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে যে রোগী কোমায় আচ্ছন্ন, তাঁর শিরাতে ডেক্সট্রোস সঞ্চালন-সহ ভিটামিন-বি  এবং সি দেওয়া হয়।
  • ভেষজ পদার্থ বা ওষুধ কী কী দেওয়া যেতে পারে :

কোনো ওষুধই উপকারী নয়। তীব্র হেপাটাইটিস-এ খুব বেশি  মাত্রায় করটিকো স্টেরয়েড দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।  মস্তিঙ্কের ফোলাভাব  কমানোর জন্য (কোমায় আচ্ছন্ন রোগীর ক্ষেত্রে) ম্যালিটন (Mannitol) I.V. দেওয়া হয়। নিয়োমাইসিন ক্যাপসুল ছ’ঘন্টা  বাদে বাদে গ্যাসট্রিক ফিডিং-এর সঙ্গে দেওয়া হয় অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করার জন্য। কোনো রকম সংক্রমণ ঝটপট সারিয়ে নিতে হবে।

  • এম.টি.পি. :

তীব্র হেপাটাইটিস এটা কখনোই করা উচিৎ নয়।

প্রসব : যথাসম্ভব সিজার করা থেকে বিরত থাকা ভালো। প্রসব করানোর সময় চিকিৎসাকর্মীদের হাতে দুটি করে গ্লাভস পরা উচিৎ।  মাস্ক ও গাউন পরা উচিৎ। তাঁদের হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের টিকা নেওয়া উচিৎ।

গর্ভাবস্থার জন্য জনডিস (Cholestetic Jandice)-Prednisolone ট্যাবলেট রোজ ২০ মিলিগ্রাম করে রোগীকে খেতে দেওয়া যেতে পারে।

এরপর পড়ুন >> কম বয়সে গর্ভ

লেখকঃ ডাঃ অবিনাশ চন্দ্র রায়

লেখকের গর্ভবতী  মা ও সন্তান বই থেকে নেওয়া।

লেখাটি পড়ার জন্য আমার বাংলা পোস্ট.কম ব্লগ পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

আমাদের লেখিত ও প্রকাশিত আর্টিকেল, বই ও লাইফস্টাইল টিপস গুলো পড়ে আপনার কাছে ভালো লাগলে শেয়ার করে আপনার বন্ধুদেরকে জানান। আমাদের প্রকাশিত আর্টিকেল-বই ও টিপস সম্পর্কে আপনার মতামত জানাতে কমেন্ট করুন।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

নারীরা মাসিকের সময় যে ৭ টি ভুল করে থাকে!

মাসিক নিয়ে নানা লুকোচরি থাকলেও এ সম্পর্কে খোলাখুলি আলোচনা করাটা অনেক বেশী স্বাস্থকর ও নারীর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE