Breaking News
Home / নারী / নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা / কম বয়সে গর্ভ ধারনের ক্ষতি

কম বয়সে গর্ভ ধারনের ক্ষতি

ভারতবর্ষে আইন অনুযায়ী মেয়েদের বিবাহের ন্যূনতম বৈধ বয়স ১৮ এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ বছর।

এই আইন অত্যন্ত মহৎ ও সৎ উদ্দেশ্যে রচিত। এটা মেনে চললে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, দম্পতির অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে এবং দেশের জনসংখ্যা সুনিয়ন্ত্রত হবে। কিন্তু দুঃখের কথা, এরকম আইন বলবত থাকলেও তা আমাদের দেশে মেনে চলা হয় না। ১৮ বছরের পূর্বে বিয়ে এবং সন্তানধারণ সমাজের বহু অংশের লোকের মধ্যে দেখা যায়। সামাজিক কুপ্রথা, দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষার অভাব এর জন্য দায়ী। ভারতবর্ষে যে-সমস্ত  রাজ্যে শিক্ষিতের হার কম, বিশেষ করে হিন্দি ভাষাভাষী রাজ্য, যেমন—মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার (শিক্ষিতের হার ৩০ শতাংশের কম) সেখানে বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেশি। কিন্তু যে-সমস্ত রাজ্যে শিক্ষিতের হার বেশি, যেমন কেরালা (শিক্ষিতের হার ৭০ শতাংশেরও বেশি) সেখানে এর প্রবণতা কম।

১০ থেকে ২০  বছর পর্যন্ত সময়ে মেয়েদের শারীরিক বিকাশ সম্পূর্ণ হয়। সে তরুণী অবস্থা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে। এই সময়ে উল্লেখযোগ্য যে পরিবর্তন হয়, তা হল স্তনের বিকাশ ও বৃদ্ধি, রজোদর্শন, প্রজনন অঙ্গের পরিপূর্ণতা ও গৌণ সেক্স চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলির প্রকাশ। বাল্য অবস্থা থেকে সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে বয়ঃসন্ধিকাল অতিক্রম করে সে পরিপূর্ণ যৌবনের দোরগোড়ায় উপস্থিত হয়।

কম বয়সে গর্ভসারা পৃথিবীতে ২৫ শতাংশ মানুষ ১০—১৯ বছরের মধ্যে। ভারতবর্ষে ২৭ শতাংশ মানুষ ওই বয়সের মধ্যে। যদিও এই বয়স হল জীবনের অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্যোজ্জ্বল সময় তবু বাল্যবিবাহ নামক কুপ্রথা ওই বয়সের তরুণীকে অস্বাস্থ্য ও কুস্বাস্থ্যের বিষময় জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য করে। অল্প বয়সে বিয়ে মানেই হল অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবাঞ্চিত গর্ভধারণ। ১০-১৯ বছরে গর্ভধারণকে অল্পবয়সে গর্ভধারণ (Teen aged pregnancy) বলে। যে তরুণীর নিজের শারীরিক বিকাশ ও প্রজনন অঙ্গের বিকাশ সম্পূর্ণ হয়নি, তাঁর পেটে শিশুর বিকাশ মা ও শিশু  উভয়েরই মৃত্যুর বিপদ ডেকে নিয়ে আসে। তাই “শিশুর পেটের ভিতরের শিশু” কখনোই সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ হতে পারে না। অন্যদিকে শ্বশুর-শাশুড়ির অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করার জন্য ‘বংশের চিরাগ’ অনতিবিলম্বে জ্বালানোর জন্য বিবাহের অব্যবহিত পরেই গর্ভধারণ না করার জন্য দৈহিক দোষক্রটিহীন নবোঢ়া বালিকা বধূকে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা মাথা পেতে সহ্য করতে হয়, এক বুক দুঃখ নিয়ে অন্তঃপুরবাসিনীকে নীরবে নিভৃতে যে অশ্রুমোচন করতে হয়, তাও কিছু কম নয়।

স্বাস্থ্য-সমস্যা

মেয়েদের প্রজনন-অঙ্গের সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে, যা ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে গড়ে ওঠে। প্রজনন অঙ্গ পরিপূর্ণতা লাভের পূর্বে সহবাস হলে মেয়েরা নানারকম যৌনরোগাক্রান্ত (sexually transmitted disease) হয়। এর মদহ্যে গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া, এইডস ইত্যাদি রোগ রয়েছে। হতে পারে শ্রোণীর সংক্রমণ (P.I.D) ।

গর্ভজনিত সমস্যা

ভারতবর্ষে কম বয়সে গর্ভধারণের  হার (Teen aged pregnancy) গ্রামাঞ্চলে ৪০ শতাংশ ও শহরাঞ্চলে ১০ শতাংশ। অপরিণত মন ও মস্তিঙ্কের তরুণীর তাঁর যে গর্ভধারণ হয়েছে এই ব্যাপারটা বুঝতে পারে অনেক দেরিতে। বহু ক্ষেত্রে এটি অবাঞ্চিত গর্ভ, তাই গোপনে গর্ভপাত করাতে চেষ্টা করে। গ্রামাঞ্চলে দাই, কোয়াক বা অনভিজ্ঞ হাতে গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বড় বিপদ ডেকে নিয়ে আসে। গর্ভপাতের জন্য সংক্রমণ বা সেপটিক অ্যাবরশানের জন্য রক্তক্ষরণ, রক্তাল্পতা, জরায়ুতে ক্ষত হয়ে অথবা শ্রোণীর ভেতর সংক্রমণ হয়ে মায়ের জীবন সঙ্কটাপন্ন হয়। বহু ক্ষেত্রে মৃত্য হয়। ভারতবর্ষে এই ধরনের সংক্রমণে মৃত্যুর হার খুব বেশি। না মরেও যদি তরুণী বাঁচে, তবে পরবর্তীকালে অনুর্বরতা রোগে ভোগে। বহু ক্কেহত্রে মনমরা রোগ, বিষণ্নতা, অবসাদ কচি বয়সেই তরুণীর জীবনকে গ্রাস করে। রোগগ্রস্ত দুর্বল শরীর নিয়ে কোনোরকমে জীবনযন্ত্রণার মধ্যে বেঁচে থাকে।

অল্পবয়সের জন্য, সচেতনতার অভাবে সঠিক সময়ে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে আসে না—তাই গর্ভাবস্থায় পরিচর্যার (Antenatal care) অভাবে গর্ভাবস্থা জুড়েই থাকে নানারকম সমস্যা।

  • গর্ভপাতঃ তরুণী বয়সে গর্ভধারণ হলে আপনা হতে গর্ভপাত (Spontaneous abortion) হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। জরায়ু ঠিকমতো বিকাশ না হওয়ার জন্য এটা হয়।
  • রক্তাল্পতা ও অপুষ্টিঃ অল্প বয়সের মায়েরা রক্তাল্পতা ও অপুষ্টিতে বেশি ভোগে। মায়ের যে পরিমাণ পুষ্টিকর খাদ্য দরকার তাঁর অভাবে এটা হয়। লৌহ ও ফলিক অ্যাসিডের অভাবে এই সময়ে রক্তাল্পতা রোগ হয়।
  • রক্তক্ষরণঃ জরায়ু থেকে গর্ভের প্রথম দিক ও শেষ মাসগুলিতে রক্তক্ষরণের (P.H.) সম্ভাবনা বেহসি থাকে।
  • উচ্চরক্তচাপঃ এই সমস্ত ক্ষেত্রে গর্ভিণীর উচ্চরক্তচাপ (I.H) গা-হাত-পা ফুলে যাওয়া (Pre-Eclampsia, Eclampsia), এমনকি তড়কা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
  • শ্রোণী ছোটঃ যদিও এ-সমস্ত ক্ষেত্রে সহজেই শিশুর প্রসব হয়, তবু কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিশু ও মায়ের শ্রোণীর অস্মতার জন্য সমস্যা হয়। সহজে প্রসব হয় না, প্রসবের সময় প্রতিবন্ধকতার সৃষতি হয়। সিজারিয়ান অপারেশন করতে হয়। সাধারণ মায়ের শ্রোণীর হাড়ের বিকাশ সম্পূর্ণ না হওয়ার জন্য এই সমস্যা হয়।
  • প্রসবঃ সময়ের যথার্থ আগেই প্রসব হয়। বহু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক প্রসব-যন্ত্রণা হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রসবের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। প্রসবের পর রক্তক্ষরণ বেশি হওয়ার (P.P.H.) সম্ভাবনা থাকে গর্ভের ফুল জরায়ুতে আটকে থাকার জন্য (Retained placenta) অথবা জরায়ু ঠিকমতো সঙ্কোচন না হওয়ার জন্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রসবকালে যোনির ভেতর আঘাত লেগে ছিঁড়ে বা ছড়ে যাওয়ার জন্য অনুরূপ রক্তক্ষরণ হয়।
  • বুকের দুধ পান করানোঃ তুরুণী-মা শারীরিক কমজোরী, পরিপক্কতার অভাবে ঠিকভাবে বুকের দুধ খাওয়াতে সক্ষম হন না। বহু ক্ষেত্রে চেষ্টা ও নিপুণতার অভাবে শিশু তাঁর সর্বপেক্ষা উৎকৃষ্ট আহার মায়ের বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত হয়।
  • শিশুঃ গর্ভশয্যায় শিশুর বিকাশ ও বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না। মায়ের সঠিক পুষ্টির অভাবে শিশু সময়ের আগেই কম ওজনের (premanturity) অথবা বয়স থেকে কম ওজনের (U.G.R) ভূমিষ্ট হয়। এই সমস্ত শিশু জরায়ু থেকে বের হয়েই জরাগ্রস্থ হয়। জন্মগত ক্রুটিসম্পন্ন যেমন জন্মান্ধ বা বধির শিশুর জন্ম হতে পারে। এইসব শিশুর পরবর্তীকালে মৃগী রোগ হতে পারে। কম ওজনের শিশু অপুষ্টি ও নানা রোগের শিকার হয়। কম বুদ্ধিসম্পন্ন হয় বলে তরুণী মায়ের শিশুরা স্কুলে ভালো রেজাল্ট করতে পারে না। সুস্থ-সবল ও বুদ্ধিমান শিশুর জন্ম হয় মায়ের ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সে।
  • গর্ভাবস্থায় পরিচর্যাঃ এটি একটি বেশি বিপদের গর্ভ। তাই বেশি যত্ন, বেশি দেখভাল প্রয়োজন। এ-সমস্ত মায়েদের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসক দ্বারা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো দরকার। গর্ভাবস্থার সমস্যাগুলি ঠিক সময়ে নিরূপণ ও সঠিক চিকিৎসা দরকার। অপুষ্টি, রক্তাল্পতা, উচ্চরক্তচাপ বিষয়ে লক্ষ্য রাখা উচিত। সঠিক পরিমাণ খাদ্যগ্রহণ, বিশ্রাম, লৌহ ও ফলিক অ্যাসিড সেবন করা একান্ত দরকার। এই সমস্ত রোগীকে ভালো চিকিৎসা কেন্দ্রে, সেখানে সবরকম জরুরি ব্যবস্থা আছে সেখানে প্রসব করানো উচিত।

বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে গর্ভধারণ প্রতিরোধ

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে পারলে তবেই অল্প বয়সে গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

  • শিক্ষাও সচেতনাঃ শিক্ষার প্রসার ঘটলে বাল্যবিবাহ ও গর্ভধারণ রোধ করা সম্ভব। বাড়িতে অভিভাবক ও পিতা-মাতা, স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকা এ বিষয়ে গুরুদায়িত্ব রয়েছে। দেখা যায় যেখানে শিক্ষিতের হার বেশি, সেখানে বাল্যবিবাহ ও গর্ভধারণ কম। উন্নত বিশ্বের তুলনায় তৃতীয়  বিশ্বে বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে গর্ভধারণের প্রবণতা খুব বেশি।
  • যৌনশিক্ষাঃ এ-সম্বন্ধে জ্ঞান থাকলে অবাঞ্চিত গর্ভরোধ করা সম্ভব। স্কুল-কলেজে যৌন শিক্ষার বিষয়টি খুব স্পর্শকাতর্ব বহু-বিতর্কিত।
  • পরিবার পরিকল্পনাঃ বিবাহিত নবদম্পতিকে গর্ভধারণরোধক উপায় সম্বন্ধে ভালো করে অবগতি করা দরকার। নিরোধ, জন্মনিরোধক বড়ি ইত্যাদি সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে দেওয়া হয় তাও অবগত করা দরকার, কম বয়সে সন্তান হলে মা ও শিশুর উভয়েরই মৃত্যুহার বেশি হতে পারে তাও ভালো করে বুঝানো উচিত। সেই সঙ্গে দুটি সন্তানের মধ্যে বয়সের ব্যবধান অন্ততপক্ষে তিন বছর হওয়া স্বাস্থ্যের কারণে উচিত সে বিষয়ে সচেতন করা চাল। গ্রামাঞ্চলে তৃণমূল স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীদের এ বিষয়ে বেশি তৎপর হওয়া উচিত। সেইসঙ্গে সমাজসেবী সংগঠনেরএ এ বিষয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা উচিত।
  • মিডিয়াঃ খবরের কাগজ, রেডিও, টিভি ইত্যাদিতে এ-বিষয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচার করে গণ-সচেতনতা বৃদ্ধি দরকার।
  • আইনঃ আইন করে মেয়েদের বিবাহের বৈধ বয়স একুশ ও ছেলেদের ক্ষেত্রে পঁচিশ করা যেতে পারে।

জনসংখ্যার নিরিখে অল্প বয়সে গর্ভধারণ

ভারতবর্ষে যেখানে পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ২.৫ শতাংশ জমি, সেখানে পৃথিবীর লোক-সংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ বোঝা বহন করতে হয়। প্রতিবছর প্রায় দু’কোটি লোকসংখ্যা বৃদ্ধি হয়। ক্রমবর্ধনমান বিপুল জনসংখ্যার জন্য ভারত ভারাক্রান্ত। প্রায় ৪০ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নীচে। দেশের ৪৫ শতাংশ লোক কোনো না কোন অপুষ্টিতে ভোগে। পরিশ্রুত পানীয় জল, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা—সব  কিছুরই অভাব। মানুষের নৈতিকতার অধঃপতন, মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষুনি দরকার জনসংখ্যার সুনিয়ন্ত্রণ । এই বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে গর্ভধারণ বহুলাংশে দায়ী। অল্প বয়সে বিবাহ ও অনিয়ন্ত্রিত জন্মহাত  ভারতবর্ষে জন-সংখ্যা বৃদ্ধির মুখ্য কারণ।

এরপর পড়ুন >> দেরিতে মা হওয়ার বিপদ-প্রসবকালে সমস্যা ও চিকিৎসা

লেখক ঃ ডাঃ অবিনাশ চন্দ্র রায়।

লেখকের গর্ভবতী মা ও সন্তান বই থেকে প্রকাশিত।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

নারীরা মাসিকের সময় যে ৭ টি ভুল করে থাকে!

মাসিক নিয়ে নানা লুকোচরি থাকলেও এ সম্পর্কে খোলাখুলি আলোচনা করাটা অনেক বেশী স্বাস্থকর ও নারীর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE