Home / নারী / নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা / গর্ভাবস্থায় নিরাপদ ও অনিরাপদ ওষুধ সমূহ

গর্ভাবস্থায় নিরাপদ ও অনিরাপদ ওষুধ সমূহ

গর্ভাবস্থা ঘিরে রয়েছে  নানারকম সমস্যা। সেইসব সমস্যা ও উপসর্গ থেকে নিরাময় লাভের জন্য ওষুধ সেবন করতেই হয়। তবে সেসব গর্ভস্থ শিশুর কোনো ক্ষতি করে কি না তা নিশ্চিত হয়ে তবেই প্রয়োগ করা উচিৎ। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে গর্ভশয্যায় ভ্রূণের স্নায়বিক ও শারীরিক বিকাশ দুর্দান্ত গতিতে ঘটতে থাকে। সেইসময় কোনো ভেষজ পদার্থের ক্ষতিকারক প্রভাবে একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে—সে  চিরতরে বিকলাঙ্গ হতে পারে। তাই গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস কোনো ওষুধ সেবন না করাই ভালো।

স্বাভাবিক অবস্থায় সমস্ত গর্ভাবস্থা জুড়ে শিশুর বিকাশ ও নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য সুষম খাদ্যের সঙ্গে যে ওষুধ দরকার তা হল খনিজ, লৌহ, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন মাত্র।

পুরো গর্ভাবস্থাকে মোটামুটি  তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়। প্রথম তিন মাস, মধ্যবর্তী তিন মাস ও শেষ তিন মাস।

গর্ভাবস্থায় ওষুধপ্রথম তিন মাসে মায়েদের যে-সমস্ত উপসর্গের মুখোমুখি হতে হয় তা হল মাথাঘোরা, বমি-বমি ভাব,  অরুচি, ক্ষুধামান্দ্য ও কোষ্ঠকাঠিন্য।  মায়ের শরীরে হরমোনের প্রভাবে ও উপরোক্ত সে উপসর্গ সমূহ দেখা দেয় তা থেকে নিরাময় লাভের জন্য খাদ্য সম্বন্ধে উপদেশ, নিরাপদ ওষুধ ও জোলাপ ব্যবহার করলে উপশম পাওয়া যায়।

মুশকিল হয় যখন কোনো মা গর্ভাবস্থার পূর্বেই কোনো অসুখে ভুগছেন, এ অবস্থায় গর্ভধারণ করল। যেমন—কোনো মৃগী, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ সম্পন্ন, হার্ট, কিডনি, ফুসফুস বা বাতের রোগী। এক্ষেত্রে আকাঙ্ক্ষিত গর্ভ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, মায়ের স্বাস্থ্যের নিরপত্তাও একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ওষুধ, যার কুপ্রভাবে মাতৃজঠরে বিকশিত শিশুর ওপর ঠিক কতখানি তা সুনিশ্চিত না হয়ে প্রয়োগ না করাই ভালো।

আর একটা কথা  মনে রাখা দরকার যে, গর্ভাবস্থায় যে-সমস্ত রোগ হয়, তাঁর কিছু হয় গর্ভজনিত  কারনে, আর বাকিটা অন্য সাধারণ রোগীর যেমন হয় তেমন। তবে গর্ভের কারনে কোনো ছাড় নেই, বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, প্রোটোজোয়া  ইত্যাদি সংক্রমণজনিত রোগসমূহের ক্ষেত্রে। তাই সর্দিকাশি, ব্যথাবেদনা, ফুসফুস, কিডনি, লিভার, অন্ত্র, মুত্রাশয় ইত্যাদির প্রদাহ যেমন গর্ভের যে-কোন সময় শুরু হতে পারে, তেমনি গর্ভস্থ শিশুর সংক্রমণও হতে পারে। তাই গর্ভবতী মায়েদের গর্ভাবস্থা জুড়ে বেশি সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ।

গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় তিন মাস ও  শেষ তিন মাসে গর্ভজনিত কারণে যে-সমস্ত রোগ হয় তা হল মুখ্যত উচ্চরক্তচাপ, প্রি-এক্লামসিয়া ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে গর্ভের জন্য ডায়াবেটিস ইত্যাদি। এর জন্যও দরকার নিরাপদ ওষুধ প্রয়োগ।

আরও পড়ুন >> গর্ভপাতের ক্ষতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণের পর বিকিরণজনিত কারণে বহু গর্ভবতী মায়ের বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম ও ১৯৬১ সালে থ্যালিডোমাইড নামক একপ্রকার ভেষজ পদার্থ যা ঘুমের ওষুধ হিসাবে গর্ভবতী মায়ের ওপর ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হত এবং তাঁর ফলস্বরূপ কম বিকশিত অঙ্গ প্রত্যঙ্গসম্পন্ন বিকলাঙ্গ শিশুর (ফোকোমেলিয়া) জন্ম গর্ভাবস্থায় ভেষজ পদার্থের ব্যবহারে কিছুটা আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। সেই জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে তবেই ওষুধ প্রয়োগ করেন। তাই গর্ভাবস্থায় ওষুধ সেবনের পূর্বে এব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া একান্ত দরকার। ভেষজ পদার্থের ব্যবহারের ফলে গর্ভপাত এবং গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় নিরাপদ ওষুধ

  • হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি ও রক্তাল্পতা রোগের জন্য : ফেরাস সালফেট, ফলিক অ্যাসিড ও ভিটামিন।
  • জোলাপ জাতীয় ওষুধ : ক্রেমাফিন পিঙ্ক, মিল্ক অফ ম্যাগনেসিয়া, সফসেনা, সপ্টোভ্যাক, সুপারগল ইত্যাদি।
  • ডায়ারিয়া, আমাশা ইত্যাদির জন্য : এন্টারোজাইম, এম্বিজাইম ফোর্ট ও গর্ভের প্রথম তিন মাস পর—মেট্রোনিডাজোল ইত্যাদি।
  • ব্যথা-বেদনা : প্যারাসিটামল, অ্যাসপিরিন ইত্যাদি।
  • কৃমির ওষুধ : পাইপেরাজিন সাইট্রেট, পাইরেন্টাল পামোয়েট ইত্যাদি।
  • অম্বলের ওষুধ : ডাইজিন, পলিক্রলা ফোর্ট জেল, ডাইসোজেল, জেলুসিল ইত্যাদি।
  • ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের জন্য : পেনিসিলিন, সেফালোস্‌পোরিন, অ্যাম্পিসিলিন, অ্যামোক্সিসিলিন, এরিথ্রোমাইসিন, ন্যালিডিক্সিড অ্যাসিড ইত্যাদি।
  • টিবি-র ওষুধ : (গর্ভের তিন মাস ব্যবহার করা উচিৎ) স্ট্রপটোমাইসিন, আইসোনিউয়াজিড, ইথামবিউটল, রিফামপিসিন।
  • ম্যালেরিয়ার ওষুধ : ক্লোরোকুইন, ল্যারিয়াগো ইত্যাদি।
  • উচ্চরক্তচাপ : মিথাইলডোপা, ফ্রুসিমাইড ইত্যাদি।
  • হার্টের ওষুধ : ডিগক্সিন।
  • থায়রয়েড হরমোন : এলট্রক্সিন।
  • ডায়াবেটিস-এর ওষুধ : ইনসুলিন।
  • ট্রাঙ্কুলাইজার ও অ্যান্টিহিস্টামিন : ডায়াজিপাম, প্রোমিথাজিন ইত্যাদি।

গর্ভাবস্থায় যেসব ওষুধ ব্যবহার করা অনুচিত

  • মৃগী রোগের জন্য ব্যবহৃত ওষুধ : সোডিয়াম ভ্যালপ্রয়েট। এই ওষুধের জন্য বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে।
  • ডায়াবেটিসের জন্য ওষুধ : এসব ওষুধে শিশুর বিকৃতি অঙ্গ হতে পারে।
  • স্টেরয়েড : ক্লেফট প্যালেট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই জন্য ব্যবহার না করি ভালো।
  • প্রোজেস্ট্রন : কন্যা-শিশুর বহিঃপ্রজনন অঙ্গ বিকৃত হতে পারে।
  • ট্রাই মিথোপ্রিম ও সালফোনামাইড : লোহিত রক্তকণিকা ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য নব-জাতকের রক্তাল্পতা হতে পারে। নবজাত শিশুর জনডিসও হতে পারে।
  • টেট্রাসাইক্লিন : শিশুর প্রাথমিক দাঁত হলুদ রঙের হতে পারে। শিশুর হাড়ের বৃদ্ধি কমে যায়। এই ওষুধ বেশি মাত্রায় ইঞ্জেকশন করলে মায়ের লিভার ও কিডনির ক্ষতি, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হয়।
  • ক্লোরামফেনিকল : শিশুর গ্রে বেবী দিন-ড্রোম রোগ হতে পারে।
  • ক্যানসারের জন্য ব্যবহৃত ওষুধ বা সাইটো-টক্সিক ড্রাগ, যথা—মিথোত্রিকসেত, অ্যামি-নোপটেরিন : এই ওষুধের প্রভাবে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে।
  • নিয়মিত মদ্যপান : এতে মাতৃজথরে শিশুর বিকাশ কমে যায়।
  • অতিরিক্ত ধূমপান : এর জন্য মাতৃজঠরে শিশুর বিকাশ কমে যেতে পারে এবং সময়ের আগেই প্রসব হতে পারে।
  • থ্যালডোমাইড : জার্মানিতে ১৯৬১ সালেই এই ওষুধ (ঘুমের ওষুধ) ব্যবহারের ফলে হাত-পা ঠিকমতো বিকশিত না হওয়া শিশুর (ফোকোমেলিয়া) জন্ম হয়।

লেখকঃ ডাঃ অবিনাশ চন্দ্র রায়। (স্ত্রীরোগ-বিশেষজ্ঞ)

লেখকের গর্ভবতী মা ও সন্তান বই থেকে নেওয়া।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

যমজ সন্তান

যমজ গর্ভ-যমজ সন্তান কেন হয়,প্রকারভেদ ও বুঝার উপায়

ধৃতরাষ্ট্র-জায়া গান্ধারী শতপুত্রের জননী। কিন্তু সেই শতপুত্র একই সঙ্গে তাঁর জরায়ুতে বিকশিত হয়নি। গর্ভশয্যায় সাধারণত …

2 comments

  1. এতো সুন্দর পরামর্শ দেওয়ার জন্য ডাক্তার বাবু আপনাকে ধন্যবাদ।

  2. Very useful article . many many thanks admin.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *