Breaking News
Home / সাহিত্য / কিছু গল্প / পিচ্ছি বউ -স্বামী স্ত্রীর রোমান্টিক প্রেমের গল্প। পর্ব ১-৫

পিচ্ছি বউ -স্বামী স্ত্রীর রোমান্টিক প্রেমের গল্প। পর্ব ১-৫

গল্পের বর্ণনাঃ  পিচ্ছি বউ একটি সদ্য বিবাহিত স্বামী স্ত্রীর রোমান্টিক প্রেমের গল্প । গল্পকার গল্পটি শুরু করেছেন মামাতো বোনের সাথে জোর পূর্বক বিবাহের মাধ্যমে। আর শেষ করেছেন… বাকিটা গল্প টি পড়লেই বুঝতে পারবেন। ১০ পর্বের গল্পটি ২ টি ওয়েব পেইজের মাধ্যমে আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। আশা করি আপনারা গল্পটি পড়ে আনন্দ লাভ করবেন।

গল্প : পিচ্ছি বউ।

লেখক : আদিত্য আনাম আব্রিম


গ্রাজুয়েশন শেষ করে সবেমাত্র বাবার ব্যবসায় মন নিবেশ করেছি, সারাদিন যন্ত্রণা সহ্য করে ফিরেই দেখি আম্মু টিভির সামনে মনমরা হয়ে বসে আছে। বুঝলাম তুফান শুরুর আগের শান্তি।
-কি হয়েছে আম্মু?
-কি আর হবে?
-চুপ করে আছ কেন?
-তাহলে কি চেঁচামেচি করব?
-ইচ্ছা হলে করতে পার।
-থাম তুই।
-আচ্ছা।
.
কিছু না বলে নিজের রুমে চলে এলাম। কিছুক্ষণ পর আম্মু নিজেই খাবার খেতে ডাকছে। টেবিলে গিয়ে বিড়ালের মত বসে পরলাম, খাবার তুলে দিয়ে শুরু করল,
-তুই আর তোর আব্বু, সারাদিন বাইরে থাকিস, আমি একা কি করব বাসায়?
-পয়েন্ট। কি করতে পারি?
-বলছিলাম কি বাবা, তুই একটা বিয়ে করে ফেল। গার্লফ্রেন্ড-ঠ্রেন্ড থাকলে বল আমরা দেখে শুনে…
-কি শুরু করলে আম্মু?
-আছে নাকি কেউ?
-না।
-তাহলে চল, কালকে আমরা মিথিলা’দের বাসায় ঘুরে আসি। তোর মামা অনেক দিন ধরে ফোন দিচ্ছে যাওয়ার জন্য।
-তুমি যাও। আমি অফিস শেষ করে চলে আসব। আর আপাতাত বিয়েশাদী করার ইচ্ছা নেই।
-ঠিক আছে বাবা। ভুল করিস না কিন্তু।
.
কিছু না বলে রুমে চলে আসলাম। মিথিলা, আমার মামাতো বোন, একসাথে বড় হয়েছি, যদিও আমার থেকে বছর তিনেকের ছোট। আসলে তাকে মেয়ে না বলে গুন্ডী বললে বেশি মানাবে। খুব ঝগড়ুটে টাইপ মেয়ে, তবে মানুষ হিসেবে খুব একটা খারপ না। আগে পাশাপাশি থাকতাম তবে ব্যবসার সুবাধে আমাদের ঢাকাতে চলে আসতে হয়েছে। আর মামা তার প্রিয় শহর চিটাগং এ রয়ে গেছেন। প্রায় ৮ বছর দেখা হয় নি তাদের সাথে।
.
পরের দিন অফিস শেষ করে বিকেলের ফ্লাইটে চিটাগং চলে গেলাম, গাড়ি পাঠিয়েছে তাই সোজা বাড়িতে চলে গেলাম। বাড়িতে ঢোকার আগেই আমার চোয়াল ঝুলে পড়ল, পুরো বাড়ি বিয়ের সাঁজে সাজানো, চারিদিকে আমাদের প্রায় সব আত্মীয়স্বজন দেখতে পাচ্ছি। গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে প্রায় সবাই আমার উপর হামলে পড়ল। তা মামুলি ব্যাপার, অনেক দিন পর দেখা, কিন্তু বাড়ি সাজানো কেন আর সবাই একত্রে এখানে কেন এইটুকু জিজ্ঞাসা করার মানুষ খুঁজে পাচ্ছি না, একটু এগুতেই দেখি আমার বাচ্চাকালের বন্ধু রাফিদ,
-কি রে দোস্ত, কেমন আছিস?
-ভালো ছিলাম।
-এখন কি হয়েছে?
-তারপর আব্বু-আম্মু ধরে বিয়ে করিয়ে দিল
-হাহা, ভাবী কেমন আছে, কোথায় সে?
-সে ভালোই আছে, তোর বউ সাজাচ্ছে?
-মজা নিচ্ছিস?
-একটুও না। আন্টিই তো সব করেছে। গিয়ে দেখ আঙ্কেলও উপরে আছে।
মজা হিসেবে নিয়েই উপরে চলে গেলাম, গিয়ে দেখি আব্বু সত্যিই এখানে, ভাবলাম হয়ত মিথিলার বিয়ে তাই সবাই!
.
মজা হিসেবে নিয়েই উপরে চলে গেলাম, গিয়ে দেখি আব্বু সত্যিই এখানে, ভাবলাম হয়ত মিথিলার বিয়ে তাই সবাই এসেছে, আর রাফিদ, মামার পরিবারের অতি ঘনিষ্টজন, তাই হয়ত এসেছে।
-আব্বু, আপনি এখানে কেন?
-ছেলের বিয়েতে থাকব না?
-আপনিও শুরু করলেন?
-মোটেই না, চল আমার সাথে।
.
প্রায় আসামীর মত ধরে আমাকে নিয়ে গেল একটা রুমে, গিয়ে দেখি আম্মু সাথে খালামনিরা সবাই ব্যস্ত পাঞ্জাবি পছন্দতে। আমাকে দেখে মনে হয় আকাশে চাঁদ হাতে পেয়েছে। আম্মু কিছু না বলে মিট মিট করে হাসছে। রাগে আমার চেহারা রীতিমত লাল হয়ে গেছে, ভদ্রতার কারণে কিছু বলতেও পারছি না। বুঝলাম যে অবস্থা, সব কিছু আয়ত্বের বাইরে চলে গেছে, এখন হেরে যাওয়া সৈনিকের মত দেখা ছারা কিছু করার নেই। সবাই সাজ সজ্জায় লেগে আছে, একাই বাড়ির ছাদে চলে গেলাম, গিয়ে দেখি মিথিলাও দাঁড়িয়ে আছে,
-ঐ, তুই এখানে কেন?
-কি আর করব?
-সেটাই কথা, এত বড় ষড়যন্ত্র হচ্ছে আমাকে জানাস নি কেন?
-আমি নিজেই জানি না, আজকে সকালে ইংল্যান্ড থেকে ফিরেছি আব্বু বলেছে নানাভাই অসুস্থ তাড়াতাড়ি চলে আসতে, এসে দেখি এই অবস্থা।
-আমি তোকে বিয়ে করতে পারব না!
-আমি কি বসে আছি নাকি তোকে বিয়ে করার জন্য?
-দেখ তোর মত পিচ্চির সাথে ঝগড়া করার ইচ্ছে নেই। কিছু একটা কর
-কি করব?
-তোর বয়ফ্রেন্ডের নাই?তার সাথে পালিয়ে যা!
-বয়ফ্রেন্ড পাবো কোথায়?
-খারাপ বলিস নি, কে ই বা গুন্ডীর বয়ফ্রেন্ড হতে চাইবে?
-দেখ অভ্র, তোকে সাবধাণ করে দিচ্ছি আমাকে পিচ্ছি আর গুন্ডী বলবি না।
-কি, কি করবি হ্যাঁ?
ও কিছু একটা বলতে চেয়েছিল তার আগে মামা এসে হাজির হয়,
-আরে তোরা এখানে কেন? চল নিচে চল। কত সাঁজ গোঁজ বাকি।
.
আসলে রাগ টা কার উপর করব বুঝতে পারছি না। সবাই একদিকে, কিছু করার উপায়ও খুঁজে পাচ্ছি না। হাল ছেড়ে দিয়ে যা হচ্ছে হতে দিলাম, যথারীতি আমাকে কোরবানী দুঃখিত বিয়ে দিয়ে দেওয়া হল। রাত্রে মামার বাড়িতেই থাকতে হল, বন্ধু-বান্ধব সবাই ধরে আমাকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিল, গিয়ে দেখি মিথিলা বঊ সেজে বসে আছে, হুট করে গিয়ে সোফায় বসে পরলাম, চিন্তা করতে পারছি না কি থেকে কি হয়ে গেল। মিথিলা তার ঘোমটা তুলে আমাকে দিকে তাকিয়ে আছে, যাকে বলে অগ্নি দৃষ্টি,
-কিছু বলবা বউ?
-কিসের বউ কার বউ?
-সেটাই হচ্ছে আসল কথা, তোর মত একটা পিচ্ছি মেয়ে কিভাবে আমার বউ হয়?
-অভ্র, তোকে আমি আগেই সাবধান করেছি, আর যাকেই হোক তোকে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছে আমার কোনো কালেই ছিল না!
-আমার ছিল মনে হয়?
-তাহলে করলি কেন?
-করলাম কোথায়? ধরে করিয়ে দিল!
-কি রকম পুরুষ একটা বিয়ে ভাঙ্গতে পারলি না!
-সে সময় টুকুই তো পেলাম না
-জাহান্নামে যা
-সেটা পরে দেখা যাবে, এখন সর আমি ঘুমোব, খুব ঘুম পেয়েছে।
-ঘুমা, কে ধরে রাখছে?
-খাট থেকে নাম।
– অসম্ভব, খাটের ধারে কাছে আসলে তোর খবর আছে।
-কি করবি হ্যাঁ?
-খুন করে ফেলব
-গুন্ডী কি আর শখ করে বলি?
কোন কথা না বলে ফ্রেস হয়ে এসে শুয়ে পরে সে,
-এই মিথু, শোন না, আমি সোফায় ঘুমাচ্ছি সমস্যা নেই, তবে ক্ষুদ্র পরিসরে একটা মানবিক আবেদন, তোর কোলবালিশটা একটু দিবি?
-না।
বলেই ঘুমিয়ে পরে। স্বয়ং উপরওয়ালা মালুম, এই মেয়েকে নিয়ে কিভাবে সংসার করব….!

প্রথমত নিজের রুম ছাড়া আমার ঘুম আসে না তার উপর না আছে কোলবালিশ। অথচ মিথিলা কি সুন্দর ঘুমোচ্ছে। ইচ্ছে করছে ওর বিছানায় কয়েকটা তেলাপোকা ছেড়ে দিয়ে আসি। কিন্তু এই মাঝ রাত্রে সেটাই বা পাবো কোথায়?
সেদিন আমার’ই ভুল হয়েছে, আম্মুকে যদি বলতাম আমার গার্লফ্রেন্ড আছে তাহলে আজকে এই দিন দেখতে হত না। আর মিথ্যা বলেই লাভ হত কি? যদি আম্মু দেখত চাইত? সাত পাচ ভাবতে ভাবতে উঠে বসলাম, ঘুম যেহেতু আসছে না শুয়ে থেকে পিঠ ব্যাথা করার মানে হয় না। কিছুক্ষণ পরে দেখি মিথিলাও জেগে উঠেছে,
.
-কি ঘুমাস নি? [মিথিলা] -না [আমি] -জানিস, আমারও ঘুম আসছে না
-তো আমি কি করতে পারি? মাথায় নিয়ে নাচব তোকে?
-থাক। ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে না!
-তোর এই গুণ্ডামি স্বভাব ভালো হবে না?
-কি বললি?
-নাহ, কিছু না
বলেই সোফায় শুয়ে পরলাম,কোন মতে রাতটা পার করতে পারলে হয়।
.
কখন চোখ লেগে এসেছে খেয়াল করিনি, সকালে ঘুম ভাঙ্গল পাখির কিচির মিচির শব্দে। আড়মোড়া ছেড়ে উঠে দেখি মিথিলা আগেই ওয়াশ রুমে গিয়েছে ফ্রেস হতে। বারান্দার দিকে গেলাম, বাড়ির সামনে প্রচুর জায়গা, প্রকৃতি এত সুন্দর রুপ আগে এত কাছ থেকে দেখা হয় নি। মিথিলা বেড়িয়ে আমাকে ফ্রেস হয়ে নিচে আসতে বলে নিজে চলে যায়। যথারীতি নিচে গিয়ে দেখি সবাই নাস্তার টেবিলে উপস্থিত। আম্মু আব্বু, নানা সাথে আরো অনেক আত্মীয় স্বজন সবাই বাড়ি ফেরার আলোচনা করছে। চেয়ার টেনে বসলাম, খেয়াল করি নি পাশে মিথিলা বসে আছে। কোনো রকম নাস্তা শেষ করে নিজের রুমে দুঃখিত মিথিলার রুমে এসে বসলাম। আচ্ছা বউয়ের রুম কে কি নিজের রুম ভাবা যাবে? চিন্তা করার আগেই সে এসে হাজির। এ কি আমাকে শান্তি হিবে না?
-চল, সবাই নিচে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
-হ্যাঁ চল।
.
মামা বাড়ি দুঃখিত শ্বশুর বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় খেয়াল করলাম মিথু কি সাবলীল ভাবে গাড়ীতে উঠে বসল। সবার থেকে বিদায় নিয়ে আমিও গাড়ীতে উঠে বসা মাত্রই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । অনেক দূরের পথ, আর রাতে ঘুম হয় নি তাই চোখ লেগে আসতে চাইছে। কিছুটা লেগেও এসেছে হঠাৎ আমার ঘাড়ের উপর কিছু একটা স্পর্শ করল, ফিরে দেখি মিথু ঘুমে টলে আসছে, বাঁধা দিলাম না, শত হলেও বিয়ে করা বঊ, আগে খেয়াল করি নি, দেখতে মিথু একেবারে পরীর মত।
.
ওকে ডাকলাম বাড়ি পৌঁছনোর পর। ঘাড়ে মাথা দিয়ে ঘুমিয়েছিল দেখে কিছুটা বিব্রত বোধ করছিল। নতুন বউ বরণ করে নিতে সবার সে কি ফুর্তি। আমার বেশ বিরক্ত লাগছিল। সব শেষ করে নিজের রুমে এসে হাত পা ছেড়ে শুয়ে পরলাম। মিথিলাও চলে আসল কিছুক্ষণ পর।
-তোর রুমটা এত অগোছালো কেন?
-তাকে তোর কি?
-আমার কি মানে?
-দেখ, এটা আমার রুম কিভাবে থাকবে সেটা আমি ঠিক করব।
-ওহ তাই?
-অবশ্যই
-দাড়া, আমি ফুপ্পি কে ডাকছি, ফুপ্পিইইইইইইইইইইইইইইইইইইহ
-এই থাম, মিথু, ঐ…
গিয়ে ওর মুখ চেপে ধরলাম। নিজের কাছেই কিছুটা বিব্রত লাগছে, সাথে সাথে আম্মু এসে হাজির।
-কি রে মা, কি হল? আর অভ্র, তুই মিথিলার মুখ চেপে রেখেছিস কেন?
ছেড়ে দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম।
-দেখ না, ফুপ্পি, তোমার ছেলে বলেছে, আমাকে নাকি এই রুমে থাকতে দিবে না।
-কি? তুই এই কথা বলেছিস?
-না আম্মু, আমি আসলে বলছিলাম, ইয়ে মানে…
-থাক মা,তুই আমার সাথে আয়, অনেক মেহমান এসেছে, তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।
.
সে আম্মুর সাথে চলে গেল। আমি নিজের বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে একখানা গল্পের বই হাতে নিয়ে পড়তে লাগলাম, কিছুক্ষণ পর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গেলাম।
রাতের খাবার শেষ করে নিজের রুমে এসে দেখি মিথিলা খুব সুন্দর করে রুম গুছিয়ে ফেলেছে। বিছানায় শুতে যাব তখন ঘটল যত বিপত্তি,
-এই থাম থাম! [মিথু] -কি হয়েছে? [আমি] -আমি বিছানায় ঘুমাব।
-তাই নাকি? ঘর টা কার?
-ফুপ্পিকে ডাকব?
-অবশ্যই…
-তুই না কত ভালো ছিলি আগে, এখন এমন করছিস কেন?
-এত কিছু বুঝি না, খাটে আমি ঘুমাচ্ছি, শুভ রাত্রি।
বলেই শুয়ে পরলাম। অসহায় হয়ে সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকল।
-এই অভ্র
-হু
-শোন না
-বল
-তোর রুমে টেডি বিয়ার নেই?
-কি? এই জিনিস আমি কোথায় পাব?
-আমি টেডি বিয়ার ছাড়া ঘুমোতে পারি না! অন্তত তোর কোলবালিশ টা দে না।
-গত কাল দিয়েছিলি?
-প্লীজ দে না
-এক কাজ কর, চাইলে বেড শেয়ার করতে পারিস
ও কিছু একটা ভাবল, ভাবনা শেষে পাশে শুয়ে পড়ল,
-কিন্তু লাইট অফ করতে পারবি না।
-লাইট অফ করে কি তোর হাতে শহীদ হব? [আস্তে বললাম] -কি করলি তুই?
-কিছু না তো। ঘুমা…
.
একপাশে ও আরেক পাশে আমি মাঝখানে কোলবালিশ। মোটামুটি শীত পড়তে শুরু করেছে। শেষ রাতে বেশ ঠাণ্ডা পরে, তাই কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে পরলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল, বেশ ঠাণ্ডা লাগছে, উঠে দেখি পুরো কম্বল মহারানী একা দখল করে বসে আছে। ওর গায়ে টাচ করবো সে সাহসও পাচ্ছি না। ওকে ডাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম
-মিথিলা
-হু
-এই মিথু
-কি হয়েছে? গরুর মত চিল্লাচ্ছিস কেন?
-আমি গরু?
-গরুর ও কিছুটা জ্ঞান আছে
-কম্বল দে আমার
-আমি কি করব তাহলে?
-কিভাবে বলব?
-তুই এত কেয়ারলেস ক্যান?
-আমি কেয়ারলেস?
-নয়ত কি? বউয়ের জন্য একটু শীত সহ্য কতে পারবি না?
-বউ? তুই? তাও আমার?
-বিয়েটা কেন করেছিলি?
.
কিছু না বলে শুয়ে পরলাম। ওর সাথে কথা বলে কোনো লাভ নাই। প্রচন্ড একরোখা টাইপ মানুষ। । গায়ে কিছুটা উষ্ণ ভাব লাগছে। কিছুটা কম্বল আমাকে দিয়েছি তাহলে। যাক যতটা গুণ্ডি ভেবেছিলাম ততটা নয় তাহলে। সকালে ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না। অথচ মিথু বারবার ডেকেই যাচ্ছে,
-এই অভ্র, অভ্র…
-হু
-উঠ, অনেক বেলা হয়ে গেল
-তো?
-উঠবি না তুই?
-উহু
.
ওর শব্দ থেমে গেল ভাবলাম হয়ত হাল ছেড়ে দিয়েছি, আবার গভীর ঘুমে ঢুব দিতে যাবো, তার আগে বান্দা আমার গায়ে এক জগ পানি ঢেলে দিল। হুমড়ি খেয়ে খাট থেকে পরে গেলাম, অন্য দিকে বউ আমার অট্টহাসিতে ফেটে পরল। ঠোঁটের পাশের তিল টা মুগ্ধভাবে তাকিয়ে দেখছিলাম, তার কথা বাস্তব জগতে ফিরে আসলাম,
-কি উঠতে বলেছিলাম না?
-আজকে তোর খবর আছে…
খুনসুটি সবে শুরু করেছে, পাগলীটার আরো কত পাগলামী সহ্য করতে হবে বুঝতে পারছি না…
.
নাস্তার টেবিলে গিয়ে বসলাম, পাশের চেয়ার টা আমার পিচ্চি বউ দখল করে নিয়েছে, কিছু বললাম না সবাই সামনে দেখে,
-অভ্র শোন।
-জ্বি আব্বু
-এই নে প্লেন টিকেট, কালকে সকালে তোরা হানিমুনে যাচ্ছিস থাইল্যান্ডে।
হালকা ধাক্কা খেলাম, এই মেয়েকে নিয়ে হানিমুন? কিভাবে সম্ভব? মিথু চোখে মুখে কিছুটা হাসি দেখতে পেলাম। সবাই হয়ত ভেবেছে ও খুব খুশি, কিন্তু আমি জানি, এ হাসি খুব ভয়ংকর। রুমে ফিরে চিন্তায় পরে গেলাম, আব্বু যেহেতু বলেছে ফাঁকি দেওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু একে নিয়ে তো মহা মুশকিল। আমার জীবন এই রকম বিচ্ছু আর গুণ্ডি মেয়ে দেখি নি। রুমে এসেই শুরু করল,
-তোর সাথে আমি হানিমুন যাব না!
-কেন গো?
-কেন মানে?
-থাম তুই, তোর জন্য আমার এই অবস্থা।
-কিছু একটা কর না!
-আব্বু বলেছে। কিছু করার নেই। ব্যাগ গুছিয়ে নে।
-আম্মু আমাকে নিয়ে যাও।
বলতে না বলতে মামীর দুঃখিত এখন তো সে আমার শ্বাশুড়ি। দিলেন ফোন, যদিও ফোন মিথুর, ধরলাম আমি,
-হ্যালো মিথু!
-না, অভ্র বলছিলাম! মামী।
-কেমন আছিস বাবা?
-ভালো মামী। আপনার মেয়ে অনেক ভালো রেখেছে।
পাশ থেকে মিথিলা এমন ভাবে তাকাচ্ছে মনে হয় তার দৃষ্টিতে ভষ্মীভুত করে ফেলবে।
-তা বাবা, এখন তো একটু আম্মা ডাকতে পারিস
-হ্যাঁ অভ্যাস করে নিব।
-তোরা নাকি কালকে হানিমুনে যাচ্ছিস?
-আপনার মেয়ে যাবে না! নিন মিথুর সাথে কথা বলুন।
.
ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। ছাদে চলে গেলাম। আকাশ টা খানিকটা মেঘলা, বৃষ্টি নামতে পারে। ভালোই হল, অনেক দিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। দোলনায় বসতে না বসতেই বৃষ্টি নামতে শুরু করল, যাকে বলে কুকুর বিড়াল বৃষ্টি, গা ছেড়ে দিলাম। ভালোই লাগছিল, যতক্ষন না পর্যন্ত আমার গুণ্ডা বউ টা এসে হানা দিল।
-জানিস, অনেক দিন পর আজকে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে হল, [মিথু] -কেন?
-ইচ্ছে ছিল, বর কে নিয়ে কাঁক ভেজা ভিজব। তবে তোর মত ক্যাবলাকান্ত দিয়ে হবে না।
-তোর মত পিচ্চির সাথে ভেজার কোনো ইচ্ছে নেই
বলে নিচে চলে আসলাম। যাকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে না, তার সাথে হানিমুনে যেতে হচ্ছে।
হে উপরওয়ালা, এই ছিল তোমার মনে..???

কাল থাইল্যান্ড যেতে হচ্ছে হানিমুনে। এক রকম জোর করে পাঠাচ্ছে বাবা। বিন্দু পরিমাণ ইচ্ছে নেই এহেন গুণ্ডি বউ নিয়ে হানিমুনে যেতে। যেহেতু বাবা বলেছে তাই ফাঁকি দেওয়ার উপায় বের করাও মুশকিল। সন্ধ্যার দিকে জিনিস পত্র গোছানো শুরু করতে যাবো, ওয়ারড্রপ খুলে দেখি আমার অর্ধেক জামা কাপড় হাওয়া। সেখানে বউ আমার স্বযত্নে নিজের শাড়ির দোকান বসিয়েছে। রাগে ফেটে পরলাম,
-মিথুউউউউউউউউউউউউউউউউউউহ
– সমস্যা কি তোর হ্যাঁ?
-আমার বাকি জামাকাপড় কোথায়?
-ফুপ্পির কাছে দিয়ে এসেছি।
-আমার ড্রয়ারে হাত দিয়েছিস কেন?
-তো?
-তো মানে? সাহস হল কেমন করে?
– আমি না তোর বউ?
-বউ তো কি?
.
হয়ত বুঝেছে রাগ করেছি, তাই কথা না বাড়িয়ে আম্মুর কাছে গিয়ে জামাকাপড় গুলো সুবোধ বালিকার মত নিয়ে আসল।
-ব্যাগ গুছিয়ে নে।
সে কোনো কথা না বলে ব্যাগ গুছানো শুরু করল।
আমার প্রায় শেষ। ব্যাগে বিন্দুমাত্র জায়গা নেই। এখন বাঁধল মহাবিপত্তি, ট্রাউজার আর গেঞ্জি নেওয়া হয় নি। মেজাজ সপ্তমে উঠে গেল। নতুন করে শুরু করার কোনো মানে হয় না। মিথিলার এখনও শেষ হয় নি। বড় ব্যাগটা সে দখল করেছে। কিছু বলতেও পারছি, শেষমেষ কোনো উপায় না দেখে আবার মানবিক আবেদন করতে হল,
-মিথু
-হু
-এই মিথু…
-আচ্ছা, তোর কি মনে হয় আমার কানে সমস্যা আছে?
-মোটেই না?
-তাহলে মিথু মিথু করছিস কেন? বলে ফেল!
-ক্ষুদ্র পরিসরে একটা মানবিক আবেদন…
-কি?
-আমার ব্যাগে জায়গা নেই। ট্রাউজার গেঞ্জি গুলো তোর ব্যাগে নিতে পারবি?
-যদি না নেই?
এবার প্রচন্ড রাগ লাগছে, এত ভালো করে বললাম, তার পরেও শুনল না। কিছু না বলে রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে শুরু করলাম,
তখন বউ আমার পিছন থেকে ডাক দিল,
-কোনটা কোনটা নিব?
-তোর ইচ্ছে।
বলে চলে আসলাম। নিচে নামতে গিয়ে আবার রুমে উঁকি মারলাম, দেখি সে যত্নে সহকারে ট্রাউজার আর গেঞ্জি ভাঁজ করে তার ব্যাগে পুড়ে দিল।
.
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হলাম, মিথুও উঠে গেছে।তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পরতে হবে, সাড়ে ন’টায় ফ্লাইট। আকাশী রঙের শার্ট গায়ে দিতে যাবো এর মধ্যে মিথু বলল,
-তোর কালো রঙের শার্ট নেই?
-আছে। কেন?
-সেটা পর না! তোকে সুন্দর লাগবে।
মিথু এই কথা বলছে? ভাবতেই অবাক লাগছে! বলেছে যখন ড্রয়ার থেকে কালো শার্ট টা বের করে পরলাম। টাই হাতে নিয়েছি, নট বাঁধতে যাবো,
-দে আমি বেঁধে দিচ্ছি।
বাধ্য ছেলের মত কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইলাম। নট বাঁধা শেষ করে সে বলল,
-দেখ, তোকে অনেক সুন্দর লাগছে।
আমি বরাবর নিজের উপর উদাসীন টাইপ পাবলিক, তাই আয়না দেখতে ইচ্ছে হল না। একটু পরে বান্দা জেল আর চিরুনি নিয়ে এসে চুল্গুলোর একটা হেস্তনেস্ত করে দিল। যত সময় যাচ্ছে তত বেশি অবাক লাগছে। রুম থেকে বের হবার জন্য পা বাড়ালাম, পিছন থেকে মিথু ডাকল,
-অভ্র
-হুম বল।
-শাড়িটা একা পড়তে পারছি না, একটু হেল্প করবি?
-আমি?
-হ্যাঁ!
-পারি না তো।
-বেশি কিছু না। শুধু কুঁচি গুলো একটু ধরলেই হবে।
গেলাম, সাথে সাথে হাতে শাড়ীর কুঁচি ধরিয়ে দিল, সুদীর্ঘ ৯ মিনিটের চেষ্টার তার শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে সফল হলাম। সাজসজ্জা শেষ। নেহাৎ আমি কবি নই, হলে হয়ত ওর রুপ দেখে এখনই সাহিত্য রচনায় বসে যেতাম। প্রথম লক্ষ্য করলাম, ওর চোখে ভিন্ন রকম একটা মায়া আছে।
.
আব্বু আম্মুর দোয়া নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম। এয়ারপোর্টে পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে আটটা বেজে গেল। গিয়ে শুনি ফ্লাইট ডিলে হবে একঘন্টার মত। কিছু করার নেই, ওয়েটিং রুমে বসে আছি তখন মিথু বলল,
-চল, আইসক্রিম খেয়ে আসি।
-ইচ্ছে করছে না।
-চল না।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেতে হল, যেহেতু ফ্লাইট ডিলে হবে, তাই এত সময় বসে থাকার মানে হয় না। তবে একটু রাগী হলেও মিথুর মধ্যে বাচ্চামি অভ্যাগ গুলো এখনো রয়ে গেছে।
.
দেখতে দেখতে ডিপাচার টাইম হয়ে আসল। থাই এয়ারওয়েজ এর ফার্স্ট ক্লাস টিকিট। দীর্ঘ যাত্রা শেষে গিয়ে নামনাল থাই এয়ারপোর্টে। যেখান থেকে ট্যাক্সি যোগে সোজা Centra Grand Beach resort এ উঠলাম। অসাধারণ জায়গা। রিসোর্টের সামনে বিশাল এক সুইমিং পুল। আরেকটু সামনে বীচ। তারপর সু-বিশাল সমদ্র। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, প্রকৃতিও যেন তার রুপ আরো বেশি ঢেলে সাজিয়ে নিচ্ছে। সারাদিনের জার্নি তে খুব ক্লান্ত লাগছে। মিথু এসেই বিছানায় শুয়ে পরেছে। সে খেয়াল করে নি জায়গাটা এত সুন্দর। শাওয়ার নিয়ে বাইরে এসে দেখি মিথু বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে,
-যা ফ্রেস হয়ে নে।
-হ্যাঁ যাচ্ছি! আর শোন, তুই রেডি হয়ে নে, বীচে যাব।
-আমার খুব ক্লান্ত লাগছে।
-কোনো কথা বলবি না।
চুপসে গেলাম, পাগলীটা যেহেতু বায়না ধরেছে কিছু করার নেই। ।
.
বীচে হাটছি, পাশে মিথিলা, একটু এগিয়ে সমুদ্রের পানিতে পা ভিজিয়ে দিলাম। সামনে বসার জায়গা, গিয়ে বসলাম, আলো আঁধারের অসাধারণ খেলা চলছে, বেশ লাগছে দেখতে। হঠাৎ বউ আমার বলে উঠল,
-জানিস, অনেক দিনের ইচ্ছে, alcohol খাব। কখন সাহস হয়ে উঠে নি। নিয়ে আসবি?
-এখনই খাবি?
-হুম!
.
মুখ ফুটে বলেছে আনতে গেলাম,আমার এই সবের উপর কোনো নেশা নেই তাই নিজের জন্য একটা ফ্রুট জুস নিলাম। ওর কাছে ফিরে গ্লাস টা হাতে দিয়ে আবার পাশে বসলাম।খেয়াল করলাম মিথিলা ঘাড়ে মাথা রেখে চুপ করে বসে আছে। নিজের কাছে একটু বিব্রত বোধ হচ্ছে। আশে-পাশে লোকজন কমে আসছে, রাতও হয়ে এল। উঠতে হবে। মিথিলা ঘুমিয়ে গেছে। ডাকবো কি না বুঝতে পারছি না, কিন্তু এভাবে তো বসে রাত কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। ডাক দিতে গিয়ে থমকে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম কোলে করে রিসোর্টে নিয়ে যাব, উপায় না পেয়ে তাই করতে বাধ্য হলাম, কোলে তুলে নিলাম ওকে, হাঁটতে শুরু করলাম রিসোর্টের দিকে, আমার গলা জড়িয়ে ধরেছে। এ তো মহা মুসিবত, যে মেয়ে আমার সাথে ঝগড়া না করলে পেটের ভাত হজম হয় না, সে ড্রিংস করে গলা ধরেছে, ঘুমে না থাকলে হয়ত আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলত। রুমে ফিরে খাটে শুইয়ে দিলাম, গুটিশুটি শুয়ে পড়ল। পাতলা একটা চাদর ওর গায়ে টেনে দিলাম। মুখের উপর কিছু চুল উড়ে এসেছে, সড়িয়ে দিলাম, ও অন্য পাশ ফিরল। আমি আর কি করব, সোফায় একটা বই নিয়ে শুয়ে পরলাম।
.
কখন ঘুমিয়ে পরেছিলাম মনে নেই। সকালে ঘুম ভাঙ্গল মিথুর গলার চিল্লাপাল্লা শুনে,
-এই অভ্র, অভ্র! উঠবি নাকি পানি থেরাপি দিতে হবে?
-চোখ ডলতে ডলতে উঠলাম। কি হয়েছে?
-চল সমুদ্রে যাবো
-কোন দরকার নেই।
-চল না। না হলে আমি একা যাবো কিন্তু।
.
না গিয়ে উপায় নেই, পাগলিটা একা গিয়ে কি না কি করে বসে! সাথে যেতে হল, সে মহানন্দে নেমে গেছে, আমি হাটু পানিতে দাঁড়িয়ে আছি, আমার থেকে একটু দূরে সে বাচ্চাদের মত লাফালাফি শুরু করেছে, সামনে দিকে যেতে নিষেধ করে আমি পাড়ে চলে আসলাম, দেখলাম সে আরো সামনে এগিয়ে গেল কিছুটা। যদিও তার পাশে আরো কয়েকজন ছিল।বড় একটা ঢেউ আসতে শুরু করল, কিছু বুঝে উঠার আগেই শুধু একটা চিৎকার শুনলাম…
-অভ্র…
.
মিথিলাকে দেখতে পাচ্ছি না, বুকের বা পাশ টায় মোচড় দিয়ে উঠল, ঘাম ছুটতে শুরু করেছে, আমি এগিয়ে যেতে চাইলাম, সাথে সাথে কিছু রক্ষী বাহিনীর সদস্য আমাকে খপ করে ধরে বসল, ডুবুরী দল নেমে পড়ল, মিথুর পাশে আরো ৪-৫ জন টুরিস্ট ছিল, প্রায় আধা ঘন্টার মধ্যে সবাইকে উদ্ধার করা গেলেও মিথিলার কোনো খবর মিলল না। বুক ফেটে কান্না আসতে চাইছে, সৃষ্টি কর্তার কাছে প্রার্থনা করছি, তার কিছুক্ষন পর তাকেও উদ্ধার করে রিসোর্টের পাশে হসপিটালে ভর্তি করা হল!
.
সারাদিন ওর পাশে বসে থাকলাম, অবস্থা এখন কিছুটা ভালো। বাড়িতে কিছু জানালাম না, খামখা তারা চিন্তা করবে। সব থেকে বড় কথা মিথু সুস্থ। রাত হয়ে এসেছে, সারাদিন কিছু খায়নি সে।নার্স এসে খাবার দিয়ে গেল, জানি একা খেতে পারলেও খাবে না, ভয় পেয়েছে অনেক বেশি, তাই খাইয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, খাবার মুখে নেওয়ার আগে জিজ্ঞাসা করল,
-তুই কিছু খেয়েছিস?
ক্ষুধার কথাই ভুলেই গেছি, এখন যদি ‘না’ বলি তাহলে হয়ত ও খাবে না তাই মিথ্যে বলতে বাধ্য হলাম,
-হ্যাঁ খেয়েছি…
খাইয়ে দেওয়া শেষ হলে, ওর ঔষধ গুলোও বের করে খাইয়ে দিলাম। বিশ্রাম দরকার তাই শুয়ে পরতে বললাম।
-অভ্র
-বল
-আমার পাশে একটু থাকবি, খুব ভয় করছে…
-তুই ঘুমো, আমি পাশে আছি।
চেয়ার টা আরেকটু পাশে টেনে নিয়ে বসলাম, ও আমার হাতটা ধরে ঘুমিয়ে পরল। যত দিন যাচ্ছে পাগলীটা তত আপন করে নিচ্ছে…,,,,

সকাল হয়ে গেছে, পাগলীটা এখনও হাত ধরে ঘুমিয়ে আছে, চেহারা খানিকটা শুকিয়ে গিয়েছে। যাবে না ই বা কেন? হয়ত আরো ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারত। সৃষ্টিকর্তার কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া তেমন কিছু হয় নি, বেচারির জন্য খুব মায়া লাগছে। আজকে রিলিজ দিয়ে দেবার কথা। মিথিলা এখনও ঘুম থেকে জাগে নি। হাত ধরে ঘুমিয়েছে, কোথাও যেতে পারছি না। আমার মত ছন্নছাড়া মানুষ কারো জন্য চিন্তা করছে? ভাবা যায় না…
কিছু সময় পর সে নিজে জেগে উঠল,
-তুই রাতে ঘুমাস নি? [মিথিলা] -না [আমি] .
ডক্টর এসে আরেক বার রিপোর্ট দেখে আমাকে তার চেম্বারে ডাকল। ওর পাশ থেকে উঠে গিয়ে ডাক্তারের সাথে দেখা করতে গেলাম। তার ভাষ্য’র সারাংশ হল, চাইলে পেসেন্ট কে নিয়ে আজকে দুপুরের পরে চলে যেতে পারি। কেবিনে ফিরে মিথিলা কে জানালাম। সে বলল ঠিক আছে, নার্স এসে নাস্তা দিয়ে গেল, উঠে বসেছে পাগলিটা, ভাবলাম নিজে খেতে পারবে, আবার কি মনে করে যেন নিজে খাইয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, চেয়ার টেনে কাছে গিয়ে বসে খাইয়ে দিতে শুরু করলাম,
-তুই এত ভালো কেয়ার নিতে পারিস, জানতাম না তো!
ওর কথায় খুশি হব না রাগ করব বুঝতে পারছি না,
-কোনো কথা বলবি না, জানিস কত হেনেস্ত হতে হয়েছে? যদি ভালো মন্দ কিছু একটা হয়ে যেত?
-তুই আছিস না? কিচ্ছু হবে না!
আর কিছু বললাম না, চুপ করে খাওয়ানো শেষ করে উঠে ওয়াশ রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে আসলাম। মিথু আবার ডাকল,
-অভ্র…কালকে যদি আমার কিছু একটা হয়ে যেত, কি করতি?
-আমি বেঁচে যেতাম…
হাঁসতে শুরু করেছে পাগলীটা, বাহ ওর হাসিটা তো বেশ সুন্দর।
-শোন, আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে যা নিয়ে আয়!
-পারব না
-যা না, প্লীইইইইইইইইইইইইইইজ
এত করে যখন বলছে না গিয়ে পারলাম না, নিচে নেমে এলাম, আইসক্রিম পার্লার থেকে বেশ কয়েকটা আইসক্রিম নিয়ে আবার হসপিটালের দিকে রওনা দিলাম, রাস্তায় একটা ফুলের দোকানে কালো গোলাপ দেখে চোখ আঁটকে গেল, নেওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে নিয়ে নিলাম বেশ কয়েকটা। কেবিনে ফিরে দেখি আমার ফোন মিথুর হাতে, চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কপালে দুঃখ আছে,
-আমার ফোন ধরেছিস কেন?
কোন কথা বলছে না, অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে,
-তোর ফোনে ইহিতা নামের ফোল্ডারে একটা মেয়ের এতগুলো ছবি কেন?
কি বলব কিছু খুঁজে পাচ্ছি না, কিছু একটা বলতে হবে,
-তাতে তোর কি?
-আমার কি মানে? আমার বরের ফোনে অন্য মেয়ের ছবি আমি সহ্য করব ভেবেছিস?
-সিরিয়াসলি? আচ্ছা, বাদ দে এইসব, অনেক বড় কাহিনি পরে একসময় বলব… এই নে তোর আইসক্রিম!
-ফুল কি ইহিতার জন্য কিনেছিস?
-কি যা তা শুরু করেছিস? তোর জন্য এনেছি [দিনে দুপুরে এত বড় মিথ্যা কিভাবে বললাম?] -সত্যি?
-হুম
-জানিস আমার কালো গোলাপ অনেক পছন্দ…
-যাক, কিছু একটার সাথে মিলে আছে তাহলে…
.
কপাল ভালো ছিল আইসক্রিমের সাথে কালো গোলাপের সুবাধে এ যাত্রা বেঁচে গেলাম। মিথুকে নিয়ে রিসোর্টে ফিরেছি, রুমে ফিরে সে আবার ঘুমিয়েছে, যদিও বেশি সময় না। উঠে আবার বায়না ধরল সে শপিং করতে যাবে। এ কি মুসীবত? সারা রাত দু চোখের পাতা এক করতে পারি নি, একটু ঘুমবো, তার কোনো উপার দেখতে পাচ্ছি না। কিছু করার নেই, তাই তৈরি হয়ে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম, সে তো মহা খুশি, দেখে মনে হবে না, গত কাল তার উপর দিয়ে কত বড় এক বিপদ চলে গেছে।
.
মার্কেটে গিয়ে, তার কেনা কাটার অবস্থা দেখে আমার অবস্থা, ছেড়ে দে বাপ কেঁদে বাঁচি, এইরকম হয়ে গেল। আমার দু-হাত ভর্তি ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে সে এটা ওটা কিনেই চলেছে। হুট করে সে এক শপে ঢুকে কি যেন খুঁজতে থাকে, আমি বার বার জিজ্ঞা করে যাচ্ছি, কি খুঁজছিস? তার কোনো সাড়া নেই। একটু সামনে গিয়ে সে দাঁড়ায়,
-অভ্র
-হু
-এদিকে আয়।
কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,
-কি হয়েছে?
-এই জ্যাকেট দুটো দেখ না
-গরমে মধ্যে তুই জ্যাকেট দিয়ে কি করবি?
-আরে, বোকা আমাদের দেশে তো শীত চলছে, গিয়ে লাগবে না? দেখ কেমন লাগে!
তাকিয়ে দেখি জ্যাকেটের একটা ছেলেদের আরেকটা মেয়েদের। একটা পিছে লেখা, The King এবং আরেকটা পিছনে The Queen! মনের অজান্তে একটু হেসে উঠলাম। আমার গুণ্ডি বউটা এত রোম্যান্টিক বাহ…
.
মার্কেট শেষ করে একটা রেন্টুরেন্টে বসলাম ডিনার করতে। খাবার অর্ডার করে আন মনে বসে ফোন ঘাটাঘাটি করছি, এর মধ্যে মিথু ডাক দিল,
-অভ্র
-বল
-ঐ মেয়েটাকে দেখ।
ফোনের দিকে চেয়ে থেকে বললাম,
-কোনটা?
-আরে, ঐ যে আমাদের সামনের টেবলে।
একরাশ বিরক্তি নিয়ে মাথা তুলে দেখি ইহিতা সাথে আবির ডিনার করছে। আকাশ থেকে পড়লাম। এই মেয়ের সাথে আমার গত ৬ বছর কোনো দেখা নাই। অনেক খুঁজে ক্লান্ত হয়ে প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছি। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, মিথুর কথায় বাস্তবে ফিরে আসলাম,
-এই মেয়ের ছবি তোর ফোনে আমি দেখেছি।
এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করলাম,
-আরে নাহ, তুই অন্য মেয়ের ছবি দেখেছিস,
-না, এই মেয়ের ছবিই আমি দেখেছে, ওর নাম ইহিতা? ঠিক?
হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম,
-হ্যাঁ
-এই মেয়ের সাথে তোর কি যেন একটা চক্কর ছিল এক সময়ে? ঠিক?
-হ্যাঁ।
-তাহলে ফুপ্পিকে জানাস নি কেন?
– সে এক ইতিহাস!
-তোর ইতিহাসের গুল্লি মারি, চল কথা বলে আসি!
-ইচ্ছে নেই
-কি বললি?
-বলেছি, ইচ্ছে করছে না!
মিথুও কেন জানি আর জোর করল না, খাবার চলে আসল, কেন যেন মুড টা চেঞ্জ হয়ে গেল। কোনো রকম খাবার শেষ করে মিথু কে নিয়ে রিসোর্টে চলে আসলাম।
.
রাত হয়ে গেছে অনেকটা! মিথু ঘুমোচ্ছে, আমি একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছি বিশাল জলরাশির দিকে। ভাবছি ইহিতার কথা, মনের অজান্তে চোখ দিয়ে একফোটা জল চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ল! হঠাৎ কে যেন কাঁধের উপর হাত রাখল, তাকিয়ে দেখি মিথু, কখন ঘুম থেকে উঠে আমার কাছে চলে এসেছে খেয়াল করি নি!
-মন খারাপ? [মিথিলা] -হুম
-অনেক ভালোবাসতি ইহিতাকে?
কিছু বললাম না। গিয়ে পাশা পাশি দুটো রকিং চেয়ারের একটা তে গা এলিয়ে দিলাম। মিথু পাশের চেয়ার টা তে এসে বসল।
-এই অভ্র
-বল
-কি হয়েছিল ওর সাথে?
-বাদ দে, ওর বিষয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না!
-আচ্ছা, চল ঘুমাবি না? গত কাল ঘুমাস নি একটুও
উঠে গিয়ে খাটের একপাশে শুয়ে পড়লাম! সে এসে আরেক পাশে শুয়ে পড়ল! ঘুম আসছে না কোন মতে। পুরনো স্মৃতিগুলো নিয়ে মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষ নিজেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেছে। মাথায় হাতের স্পর্শ পেলাম, মিথু পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। দেখতে দেখতে ঘুম চলে আসল।
.
সকালে বেলা করে ঘুম থেকে উঠলাম, আজ আর মিথিলা বিরক্ত করে নি, কি মনে করে উপরওয়ালা মালুম। উঠার সাথে সাথে দেখি বান্দা চায়ের কাপ নিয়ে হাজির,
-শুভ সকাল
-আজ এত ভালো হয়ে গেলি?
-আমি বরাবরই ভালো
একটু হাসলাম। চা শেষ করে ফ্রেস হয়ে মিথু কে নিয়ে নিজেই বীচে ঘুরতে বেরলাম।পাগলীটা আজকে ইচ্ছে করেই হাত ধরে হাটছে! ভালো লাগছে, চারিদিকের পরিবেশ টা অসাধারণ। একটু এগিয়ে গিয়ে বসলাম দুজনে, সামনে সরু কিছুটা রাস্তা, আনমনে তাকিয়ে ছিলাম নীল সমুদ্রের দিকে। হঠাৎ কে যেন বলল,
-আরে অভ্র না?
বামে ঘুরে দেখি আবির, এক সময়কার পরিচিত ভাই,
-জ্বি ভাইয়া, কেমন আছেন?
-হ্যাঁ ভালো, কবে এসেছ?
-এইত অল্প কয়েকদিন হল। আপনি কি এখানে আছেন?
-হ্যাঁ। আসলে দেশে যাওয়া হয় না অনেক দিন তাই তোমার সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না!
-ওহ, ভাইয়া পরিচয় করি দেই, এই হচ্ছে আমার মিসেস!
-মিথু, আবির ভাই!
টুকটাক কথা বলছিলাম হঠাৎ আবির ভাইয়া বলল, চল আমাদের বাসায়, কথা শেষ করার আগেই কোথা থেকে যেন ইহিতা চলে আসল,
-এই আবির [ইহিতা] -আরে, ইহিতা, এসো! দেখ অভ্র এসেছে তার মিসেস কে নিয়ে, হানিমুনে!
-অভ্র, কেমন আছিস?
আবিরের একটা কল আসায় সে একটু পাশে গিয়ে কথা বলতে থাকে,
-যেভাবে দেখতে চেয়েছিলি…
চুপ করে যায় ইহিতা, নিরবতা ভাঙ্গে মিথু,
-আপনি ইহিতা আপু? তাই না?
মৃদু হেসে উত্তর দেয় সে,
-হ্যাঁ।
-আপনার কথা আমাকে বলে নি এই ফাজিল টা, আমি ওর ফোন থেকে বের করেছি।
মিথু একটা বিজয়ী হাসি দিয়ে থেমে গেল, আমি কোন কথা না বলে চুপ করে থাকলাম। ইহিতা আবার বলল,
-তো, বিয়ে করলি কবে?
-এইত কিছু দিন
কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, গলা কেঁপে উঠছে, এর মধ্যে আবির ভাইয়ের কথা শেষ হয়ে যায়, তাকে একটু ব্যস্ত মনে হল, বাসার ঠিকানা দিয়ে ইহিতাকে নিয়ে চলে যায়।
আমি মিথুকে নিয়ে রওনা দিলাম রিসোর্টের দিকে। আসার সময় তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম,
-মিথু, আমাদের গল্পটা চাইলে অন্য রকম হতে পারত। তাই না?
বউ আমার একটু মুচকি হাসল শুধু…
চলবে….!

গত দিনের ঘটনার পর, নিজের কাছে কিছুটা বিব্রত লাগছে, কখনও ভাবী নি ইহিতার সাথে আবার দেখা হতে পারে। রাতে ভালো ঘুম হয় নি, ঘুমোতে হবে। বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পরলাম, মিথু রেডি হয়ে কোথায় যেন বের হবে আয়োজন করছে, ভাবলাম কপাল হয়ত আজকেও পুড়েছে, ঠিকমত ঘুমোনোর সুযোগ পাচ্ছি না। চোখ লেগে আসতে শুরু করেছে, তখন মিথু ডাকল,
-অভ্র, ঘুমিয়েছিস?
-হু
-কি হু হু? শোন আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, ঘন্টা খানের মধ্যে ফিরব। তুই ঘুমো!
-হু
-আর শোন, তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে
ঘুমের মধ্যে আর কিছু বলেছিলাম কি না মনে পড়ছে না,
গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম…
.
আজকাল আমি দিবা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি, দেখলাম আমি আর মিথু কোনো এক পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছে, হঠাৎ সে আমার হাত ফসকে এক খাঁদে পরে গেল। শুধু একবার তার চিৎকার শুনলাম, তারপর চারিদিক নিস্তদ্ধ হয়ে আসল, আমিও অতলে হারিয়ে যেতে শুরু করলাম। কে যেন আমার হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করছে, চেহারা ঝাপসা, ঠিকমত বুঝতে পারছি না। এইটুকু দেখার পর আর ঘুমিয়ে থাকতে পারলাম না, লাফ দিয়ে উঠে বসলাম, হার্টবির্ট অনেকটা বেড়ে গেছে। পাশে রাখা গ্লাস থেকে পানি খেয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলাম। কত সময় ঘুমিয়েছি? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় দু’ঘন্টার অধিক হয়ে গেছে। মিথু বলে গেল কোথায় যেন যাবে। সে এখনো ফিরে আসে নি। চিন্তা লাগছে, ফোন দিলাম,
-হ্যালো মিথু! কোথায় তুই?
-এইত এসে পরেছি, রিসোর্টের পাশেই।
.
আর কিছু বললাম না, ফোন কেটে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলাম শাওয়ার নিতে । বেশ লম্বা সময় শাওয়ার নিয়ে বের হলাম সাথে সাথে কলিং বেলে চাপ পড়ল। ভাবলাম হয়ত মিথু চলে এসেছে। রুমের দরজা খুলে দিয়ে বললাম,
-কোথায় গিয়েছিলি হ্যাঁ? এত লেট হল কেন ফিরতে?
এবার উপরে তাকালাম, আমার শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল, মিথু একা না, তার সাথে ইহিতাও দরজার সামনে দাঁড়ানো…
.
রিসোর্টের বারান্দায় বসে আছি, পিন পতন নিরবতা, কেউ কোনো কথা বলছে না, আমার আসলে রাগ করা উচিত কি না বুঝে উঠার চেষ্টা করছি, মিথিলা নিরবতা ভাঙ্গে,
-অভ্র, কফি খাবি? ইহিতা তুমি?
আমি এবার মিথুর দিকে ক্রুর দৃষ্টিতে তাকালাম। সে হুট করে কফি আনতে বেড়িয়ে গেল। রুমে আমি আর ইহিতা, আমি বুঝে উঠতে পারছি না, মিথিলা আমার বউ হয়ে ইহিতাকে কেন বাসায় নিয়ে আসল? আর এখন একা রেখে কেন বাইরে গেল? আসলে ও চাচ্ছে টা কি? ইহিতা এবার কথা বলতে শুরু করল,
-কেমন আছিস অভ্র?
-ভালো থাকার কথা ছিল…
-তোর পেঁচিয়ে কথা বলার অভ্যাস টা এখনো রয়ে গেল?
-অনেক অভ্যাস এখনো আগের মতই আছে। বিন্দু পরিমাণ পরিবর্তন হয় নি বা করার চেষ্টা করি নি!
-বিয়েটা কি ইচ্ছে করে করেছিস?
-তোর কি তাই মনে হয়?
-এখন আর আগের মত কিছু মনে করতে ইচ্ছে হয় না রে!
.
কিছু একটা বলতে চেয়েছিলাম, তার আগেই মিথু কফি নিয়ে হাজির। কফি রেখে সে আবার কোথায় যেন যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছে,
-কোথায় যাচ্ছিস তুই?
-এক মিনিট অপেক্ষা কর।
সে রুমে চলে গেল। নিজের ব্যাগ বের করে কি যেন খুজতে লাগল, আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছি, কি যেন একটা বের করে আবার আমাদের কাছে ফিরে আসল।
-হ্যাঁ কি যেন বলছিলি অভ্র?
কিছু না বলে ওর হাতের দিকে লক্ষ্য করলাম। একি? আমার ডায়েরী ওর হাতে কেন? এই ডায়েরী তো গত ৬বছর আমি নিজেই খুলি নি।
-মিথু, এটা তোর কাছে কেন?
-কোনটা??
-ডায়েরীটা
-ও এইটা? তোর ওয়ারড্রপ থেকে জামাকাপড় সড়াতে গিয়ে পেয়ে ছিলাম।
-ধরেছিস কেন?
-কি বলিস? আমি না তোর স্ত্রী? এইটুকু অধিকার কি আমি সংরক্ষণ করি না?
.
কিছু বললাম না। চুপসে গেলাম। যেহেতু ডায়েরী মিথিলার হাতে সুতরাং ইহিতা সম্পর্কে কিছুই তার অজানা থাকার কথা না! এবার ইহিতা শুরু করল,
-আচ্ছা, তোমাদের সম্পর্ক এই রকম কেন?মনে হয় ইঁদুর বিড়ালের মত সারাদিন ঝগড়া কর।
আমি কিছু একটা বলতে চেয়েছিলাম, তার আগেই মিথিলা জবাব দিল,
-আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে, আমার কোনো ইচ্ছে ছিল না এই গবেট টাকে বিয়ে করার। কিন্তু ফ্যামিলি হুট করে বিয়ে দিয়ে দিল। বিয়ের ৪ ঘন্টা আগে শুনলাম আজকে আমার বিয়ে। ব্যাপারটা অসাধারণ না?
.
ইহিতা একটু হাসল। এবার আমি শুরু করলাম,
-আমি কি তোকে বিয়ে করার জন্য বসে ছিলাম? তুই তো ৪ ঘন্টা সময় পেয়েছিস, আর আমি তো বিয়ের আসরে গিয়ে শুনেছি আমার বিয়ে।
ইহিতা এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। ওর হাসিটা আগের মতই আছে। মিথু আবার শুরু করল,
-আচ্ছা বাদ দে, ডায়েরীতে তুই ১১ পৃষ্ঠার পর আর কিছু লেখিস নি! কেন?
চুপ করে থাকলাম। আসলে আমি কখনো চাইনি এই ডায়েরী কারো হাতে পৌঁছুক, আর পড়া তো দূরে থাক। মিথুর কথার ভাবে যা বোঝা যাচ্ছে, সে শুধু ডায়েরী পড়ে নি, সকল কাহিনি আদি অন্ত বুঝে ফেলেছে। আর সেই সুবাদে আজকে ইহিতা আবার সামনে হাজির। কি দরকার ছিল সেদিন রেস্টুরেন্টে ডিনার করা, কি দরকার ছিল আবির ভাইয়ের সাথে পরের দিন দেখা হওয়া। দেখা হল ভালো, বাসার ঠিকানা কেন দিল? আর আমিই বা কেন সেটা মিথুর কাছে রেখে দিলাম? কথা গুলো মনে পরলে নিজের মাথা দেওয়ালের সাথে ঠুকতে ইচ্ছে হচ্ছে। মিথুর কথায় আবার বাস্তবে ফিরে আসলাম,
-ইহিতা, ডায়েরীটা তুমি দিয়েছিলে এই বানরটাকে?
-হ্যাঁ
-কিন্তু দেখছ? গবেট টা শুধু মাত্র ১১ পৃষ্ঠা লিখে আর মনে হয় ছুঁয়েও দেখে নি।
.
ইহিতা এবার বলতে শুরু করে,
-জানো মিথিলা, অভ্র আমার খুব ভাল বন্ধু ছিল। অনেকটা সময় এক সাথে পার করেছি। হাইস্কুল, কলেজ ইভেন ভার্সিটিরও কিছুটা সময়। আমার থেকে ভালো মনে হয় পাগল টাকে কেউ চিনবে না। ওর পছন্দ, অপছন্দ, রাগ, অভিমান,প্রতিটি জিনিস খুব কাছ থেকে দেখেছি। জানি না সেই সময়ের মধ্যে অভ্র কখন এত কাছে চলে এসেছে। আমিও বুঝতে পারি নি, অনেক চমৎকার সময় একত্রে পার করেছি।
-জানি ইহিতা। তোমাদের গল্পটা চাইলে ভিন্ন রকম হতে পারত।
-আসলে ততটা সহজ ছিল, আমি আবিব কে দেওয়া কথা কোনো মতেই ফেলতে পারতাম না। আর অভ্রর আশে পাশে থাকলে কোন দিন আমার পক্ষে সম্ভব হত না। তাই পালিয়ে এসেছি অনেক দূরে। জানি আমাকে অনেক খুঁজেছে সে। কষ্টও পেয়েছে নেহাৎ কম নয়। আমি নিরুপায় ছিলাম।
.
ইহিতার গলা কেঁপে উঠছে কথা বলতে গিয়ে, তাই আর সামনে এগুতে চাইলাম না।
-আচ্ছা বাদ দে এইসব। তারপর ইহিতা, বিয়ে করলি কবে?
-এইত, ৬মাসের মত। দেশ থেকে আসার পর ইতালী ছিলাম মামার কাছে। অনেক দিন আবিরের সাথে যোগাযোগও করিনি। তারপর হঠাৎ বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।
-ভালো তো।
মিথু, আবার কোথায় যেন যেতে উঠে গেল, এবার সে একা নয়, ইহিতাও উঠল তার সাথে, আমি ভাবলাম হয়ত ইহিতা তাড়া আছে তাই ওর চলে যেতে হবে। কিন্তু মিথু কোথায় গেল? একা বসে থাকলাম বারান্দায়। একটু পরে দেখি দুজন আবার ফিরে এসেছে, উভয়ের মুখে বিজয়ীর হাসি। একটু সামনে এগিয়ে হামলে পড়ল আমার উপর। ইহিতার হাতে কেক, মিথু পার্টি স্পে দিয়ে আমাকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে। ওহ, ভুলেই গিয়েছিলাম, আজকে আমার জন্মদিন! আসলে এই সব ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই। এইজন্য তাহলে মিথিলা বলেছিল আমার জন্য সারপ্রাইজ আছে? আর ইহিতার সাথে আবার দেখা হওয়ার চাইতে বড় সাইপ্রাইজ আর কি ই বা হতে পারে? মিথু চিৎকার করে বলে উঠল,
-হ্যাপি বার্থডে অভ্র…
ইহিতাও সাথে যোগ দিল। ভালো লাগছে, মিথু এত খবর নিয়েছে তাহলে? পিচ্চি টা তাহলে আসলেই বড় হয়ে গেল?
কেক কাটার পর সবাই একত্রে লাঞ্চ করার জন্য বের হলাম। লাঞ্চ শেষ করে অনেকটা সময় বীচে ঘুরলাম। বিকেল গড়িয়ে গোধুলি হয়ে এসেছে, রিসোর্টে ফিরলামও এক সাথে। এবার ইহিতাকে যেতে হবে। অনেক কথা বলার ছিল তাকে, তব কেন জানি আর ইচ্ছে করল না। উঠে দাঁড়িয়েছে সে,
-অভ্র
-হু
-একটা কথা রাখবি?
-কি?
-ডায়েরী টা আমাকে দিবি?
মৃদু হাসলাম। যার জিনিস তার কাছে থাকা ভালো। মিথুর কাছ থেকে ডায়েরী নিয়ে তাকে ফিরিয়ে দিলাম। কেন যেন চোখটা ভিজে আসতে চাইছে বড্ড জোর করে। বুকের বা পাশটায় চিনচিনে ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। আর কথা না বলে ইহিতা পা বাড়ল চলে যাবার জন্য, যাবার আগে মিথিলাকে শুধু একটা কথা বলে গিয়েছিল,
-পাগলটাকে আগলে রেখ…
.
বারান্দায় আমার গিয়ে দাড়ালাম। রিসোর্টের সামনের সরু রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে ইহিতা। বাতাসে তার চুল উড়ছে, হয়ত এই শেষ বার, আর কোনো দিন দেখা হবে না তার সাথে। সর্ব শেষ স্মৃতিটুকুও ফিরিয়ে দিলাম। মিথিলা খুব কাছে এসে দাঁড়াল। একটু হাসি দিয়ে বললাম,
-কিছু ভালোবাসার সমাপ্তি অপূর্ণ থেকে যায়, তাই না?
-হ্যাঁ, তবে সেটুকু পূর্ন করার জন্য আমি আছি…

আরও পড়ুন >> পিচ্ছি বউ -পর্ব ৬-১০

User Rating: 4.04 ( 4 votes)

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

ফেরাউনের দাসী

দুই রমনীর হৃদয়স্পর্শী কাহিনী ( ফেরাউনের দাসী ও স্ত্রীর গল্প)

* ফেরাউনের দাসী ও স্ত্রীর গল্প টি পড়ুন। * গল্পটিতে রয়েছে মুসলিমদের জন্য দারুণ শিক্ষণীয় …

4 comments

  1. Md. Imran Hossain

    আমি সবগুলো পর্ব পড়েছি। খুব ভালো লেগেছে।

    বেশি ভালো লেগেছে গল্পের শেষটা সুন্দর ভাবে সমাপ্তি হওয়ার কারণে। তবে ইহিতা আর অভ্রের ভালবাসাটা অপূর্ণ থেকে যাওয়ার কারণে খুব কষ্ট পেয়েছি।

    আসলে -“কিছু ভালোবাসার সমাপ্তি অপূর্ণ থেকে যায়”- এটাই চির সত্য।

    লেখককে অনেক অনেক ধন্যবাদ, সামনে এরকম আরো সুন্দর সুন্দর গল্পের প্রত্যাশায় রইলাম।

  2. আপনাদের গল্প গুলা পরে খুব ভালো লাগে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE