Breaking News
Home / সাহিত্য / কিছু গল্প / পিচ্ছি বউ-পর্ব ৬-১০

পিচ্ছি বউ-পর্ব ৬-১০

পিচ্ছি বউ ৬-১০ পর্বে আপনাকে স্বাগতম। আগের পর্ব গুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন>>


রাত হয়ে এসেছে। ডিনার শেষ করে সোফায় এসে চোখ বন্ধ করে বসলাম।খুব মাথা ব্যথা করছে। মিথিলা এসে আমার পাশে বসল,
-অভ্র
-বল
-তুই ঠিক আছিস?
-হ্যাঁ
-চোখ বন্ধ করে আছিস কেন?
-মাথা ব্যথা করছে খুব।
-তোর মাথা ম্যাসেজ করে দিব?
কিছু বললাম না। আগের মত চুপ করে বসে থাকলাম। মাথায় কমল হাতের স্পর্শ পেলাম। খুব যত্ন করে ম্যাসেজ করে দিচ্ছে মিথিলা। স্বপ্নের কথা কিছু বলা হয় নি তাকে,
-মিথু
-হু
-জানিস, আজকে যখন তুই বাসার বাইরে গিয়েছিলি, আধো ঘুম, আধো জাগরণের মাঝে খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখলাম…
-কি দেখলি?
-তোকে সাথে নিয়ে কোনো এক পাহাড়ি এলাকার ঘুরতে গিয়েছি। হাত ধরে হাটছিলাম, হঠাৎ তুই আমার হাত ফসকে পাহাড়ের খাঁদে পরে গেলি। সাথে আমিও অতলে হারিয়ে যেতে শুরু করলাম। কিন্তু কে যেন আমার হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করল। তার চেহারা দেখতে পেলাম না।
চোখ খুললাম, আমার কথা শুনে মিথু কিছুটা হাসতে শুরু করল,
-তুই আমাকে নিয়ে আজকাল স্বপ্নও দেখিস?
-ব্যাপারটা মোটেও হাস্যকর না।
-জানি তো। কেন জানি হাসতে ইচ্ছে করল।
-তোর বাচ্চামি স্বভাব ভালো হবে না কোনদিন?
-সম্ভবনা শূন্যের কাছাকাছি।
.
এবার আমার হাসি পেল। পাগলি টা আসলেই মনে হয় কখনও গম্ভীর হতে পারবে না।
-অভ্র, তোর হাসিটা সুন্দর!
-বাব্বাহ, তুই আমার হাসিও খেয়াল করেছিস? আর কি কি দেখলি?
-এই, তুই একটা গবেট, ছাগল, গরু, উজবুক, ছন্নছাড়া ইত্যাদি ইত্যাদি।
খুব জোরে হেসে উঠলাম। কারণ আমাকে নিয়ে কেউ এ ধরণের কথা কোন দিন বলে নি।
-তোর কেন এমন মনে হয়?
-কেন বলব তোকে?
.
উঠে গেলাম! ঘুমোতে হবে গত ২দিন অনেক ধকল পার হয়েছে।
কিন্তু এ কি? বেডে গিয়ে দেখি কোলবালিশ নেই।
-মিথু
-বলে ফেলুন অভ্রবাবু
-কোলবালিশ কোথায়?
-রুম সার্ভিসে ফেরত দিয়ে দিয়েছি।
-কিইইইহ? কেন?
-কোলবালিশটাকে কেন যেন সতিন সতিন মনে হয়
-তোকে কি করা দরকার এখন? ভালো কথা, কোলবালিশ ছাড়া তুইও তো ঘুমোতে পারিস না!
-আমার বর আছে না? তাকেই না হয় কোলবালিশ বানিয়ে নেব।
-কিসের বর? আমি তোর কোলবালিশ হতে রাজি না!
-যাহ, লাগবে না, আমি বুঝি না তোর মত আন রোমান্টিক একটা ছেলে কোন মেয়ে বিয়ে করতে চাইবে?
-ছাড় তোর রোমান্টিকতা। আমি ঘুমাতে গেলাম
.
এইটুকু বলে বেডের এক পাশে গিয়ে শুয়ে পরলাম, মিথুও এসে আমার কাছ ঘেষে শুয়ে পরল।কিছু বললাম না। চোখ লেগে এসেছে। গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ মিথুর হাত আমার বাহুর উপর চলে আসল, নাহ এ মেয়েকে নিয়ে মত বিশাল মুসীবত! কোলবালিশ ছাড়া ঘুমায় না, অথচ তাকে সতিন মনে করে ফেরত দিয়ে এসেছে। নিজের কাছে কিছুটা অস্বস্তি লাগছে। কিন্তু কিছু করার নেই।
.
পাগলীটা দিন দিন আপন করে নিতে চাচ্ছে! আমি কি পারছি ওর প্রাপ্য ওকে ফিরিয়ে দিতে? নাকি অবিচার করছি মেয়েটার সাথে? এমন কোনো মেয়েকে এখনও দেখি নি, যে তার বরের পুরনো ভালবাসাকে তার জন্মদিনে বাসায় হাজির করে। সব কিছু জানার পরেও কোনো রকম হাঙ্গামা না করে সব কিছু নিরবে নিভৃত্বে মেনে নিয়ে আমাকে ভালোবাসতে চাইছে। আমি কি পারব ওকে ভালোবাসা দিয়ে আজীবন নিজের কাছে আগলে রাখতে? পারব কি সুন্দর একটি জীবন তাকে উপহার দিতে? ভাবতে ভাবতে আমিও ঘুমিয়ে গেছি। আগে কার সেই কোলবালিশের বদ অভ্যাসের দরুণ কখন আমার একটা হাত তার বাহুতে চলে গেছে খেয়াল করিনি। যেহেতু কিছু করার নেই তাই মিথুর দিকে ঘুরে শুলাম। ঘুমন্ত অবস্থায় একদম পরীর মত লাগছে তাকে, কি মায়াবী চেহারা, মনে হচ্ছে তার প্রতিটি নিশ্বাস অনুভব করতে পারছি,সাথে বুকের প্রতিটি হৃদ স্পদন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি…
.
সকাল হয়ে গেছে, মিথুর মিস্টি কন্ঠে ঘুম ভাঙ্গল
-এই অভ্র, অভ্র।
-কি হয়েছে?
-উঠ না। দেখ সকাল টা কত সুন্দর আজকে। চল বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
-আরেকটু ঘুমাই?
-চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, ওঠ না!
.
উঠে পারলাম। চা খেয়ে ফ্রেস হয়ে পাগলীটাকে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। রিসোর্ট থেকে একটু এগিয়ে দেখি ফুলের দোকান। মিথুকে নিয়ে আগে সেখানে গেলাম। সুন্দর দেখে একগুচ্ছ কালো গোলাপ কিনে তার হাতে ধরিয়ে দিলাম। আবার হাঁটতে শুরু করেছি, আজকে মিথু না, আমিই আগে ওর হাতটা ধরলাম, একটু লজ্জা পেল মনে হচ্ছে। তাতে কি? সে তো আমার স্ত্রী। সকাল টা আসলেই আজ খুব সুন্দর। রৌদ্রজ্জল চারিদিক। বেশ লাগছে তাকে নিয়ে হাঁটতে। দেশ থেকে কেউ এখনো ফোন দেয় নি, আসলে ফোনে কথা বলতে বরাবরই আমার কেন জানি না বিরক্ত লাগে। তবে আজকে কি মনে করে যেন আম্মু কে ফোন দিলাম,
-হ্যালো আম্মু।
-কি বাবা? ভুলে গেছিস আমাদের এখনই?
-কি যে বল না?
-হা হা, সময় কেমন কাটছে।
-যার সাথে পাঠিয়েছ, কেমনই বা কাটতে পারে?
মিথু পাশ থেকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে।
-মিথু কোথায়?
-পাশে আছে।
-দে তো। মেয়েটার সাথে ভালো ভাবে কথা বলতে পারলাম না!
ফোনটা মিথুর কাছে দিলাম। তাও লাউড স্পিকারে,
-আসসালামুওয়ালাইকুম ফুপ্পি
-ওয়ালাইকুমুসসালাম মা, কেমন আছিস?
-ভালো ফুপ্পি! আপনারা কেমন আছিস?
-ভালো মা। তোদের ছাড়া বাড়িটা শুন্য শুন্য লাগছে…
-আমারও খুব খারাপ লাগছে।
-তাড়াতাড়ি চলে আয় তো, আর পাগলটার দিকে খেয়াল রাখিস!
-ঠিক আছে ফুপ্পি
.
বলে ফোন রেখে দেয়। বীচ থেকে একটু সামনে নাকি খুব সুন্দর একটা জায়গা আছে। মোটামুটি স্বচ্ছ পানি, সামনে সু-বিশাল ঝর্ণা, আশেপাশে লম্বা লম্বা গাছ। বোর্ট নিয়ে চলে গেলাম সেখানে। পাশাপাশি বসেছি দুজন। চারিদিকের পরিবেশ দেখে হঠাৎ মাথায় কু-বুদ্ধি চাপল। এখানকার পানির গভীরতা বেশ অনেকটা, ভাবলাম মিথুকে একটু ভয় দেখানো যাক, ওর পাশ থেকে উঠে বোর্টের একদম সামনে চলে গেলাম,
-কোথায় যাচ্ছিস?
-এখানেই
-কি হল আবার?
-শরীর টা ভালো লাগছে না!
একদম সামনে গিয়ে মাথা ঘুরে পানিতে পরে যাওয়ার ভান করলাম। পরে সাথে সাথে ওখান থেকে একটু দূরে সাঁতরে চলে আসলাম। মিথু দৌড়ে এসে আমাকে দেখতে না পেয়ে চিৎকার দিল, সাথে কান্না জুড়ে দিল। মুখে বেদনার ছাপ স্পষ্ট খেয়াল করলাম। বাচ্চা মেয়েদের মত কাঁদছে আর আমার নাম ধরে ডাকছে। বোর্টের ক্রু অনেকে ঝাঁপিয়ে পরেছে আমাকে উদ্ধার করতে, নাহ বেশি হয়ে যাচ্ছে। সাঁতরে কাছে চলে গেলাম। মিথু যে রেলিং ধরে দাঁড়ানো ঠিক সেখানে গিয়ে উঠলাম,
-কি হয়েছে আমার বউটার?
-অভ্র…
বলে আবার কাঁদতে শুরু করেছে, উপরে উঠে আসলাম।
-হা হা, একটু মজা করছিলাম, জানিস আমি কলেজে থাকতে সুইমিং চ্যাম্পিয়ন ছিলাম।
কিছু না বলে মিথু আমাকে জড়িয়ে ধরল, এখনো কেঁদেই যাচ্ছে।
-এই মিথু!
-কোনো কথা বলবি না! [ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে] -ভয় পেয়েছিস?
-হু
.
বুঝলাম অনেক বেশি ভয় পেয়েছে। তাই ওকে বুকে আগলে রেখে আরো অনেক টা সময় ঘুরে সন্ধ্যার পরে রিসোর্টের দিকে রওনা দিলাম। আসতে আসতে রাত হয়ে গেল, তাই একবারে ডিনার করে রুমে আসলাম। মিথুর মনটা মনে হয় এখনো খারাপ হয়ে আছে তখনকার কাজটার জন্য। আসলেই এমন ফাজলামো উচিত হয় নি। ওর খুব কাছে গিয়ে বসলাম,
-আচ্ছা, তখন যদি আমার কিছু হয়ে যেত?
মিথু ক্রুর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর শার্টের কলার ধরে টান দিয়ে খুব কাছে নিয়ে, পরম ভালোবাসায় আলিঙ্গন করে নিল…

গত রাত টা স্বপ্নের মত ছিল। মিথিলা এত তাড়াতাড়ি কাছে চলে আসবে ভাবতে পারি নি। সকালের আলো ফুটেছে। সে আমাকে কোলবালিশ বানিয়ে বুকে মাথা রেখে এখনো ঘুমিয়ে আছে,
-মিথু
-হু
-সকাল হয়েছে তো। ওঠ না…
-ইচ্ছে করছে না!
-কেন?
-জানি না। আর শোন, তুই দেশে ফিরে Gym এর ধারে কাছেও যাবি না।
-কিহ? কেন?
-আমি রান্না করব, তুই খেয়ে-দেয়ে কুমড়ো পটাস হয়ে যাবি, তারপর তোকে আমি কোলবালিশের সাথে মাথার বালিশ বানিয়ে ঘুমবো।
-সবাই চায় তার বরের ফিটনেস থাকুক, আর তুই চাস কুমড়ো পটাস হই? হে উপরওয়ালা কি বউ দিয়েছ?
-কেন গো? তুমি কি ফিট থেকে অন্য মেয়েদের সাথে ফ্লাটিং করবে?
-করলে কি বিশেষ সমস্যা আছে?
-অন্য কারো সাথে যদি দেখেছি না, ঘুসি মেরে তোর নাক ফাটিয়ে ফেলব!
-হা হা, তুই আসলেই আমার পিচ্চি বউ…
মিথু কিছু না বলে আমাকে আরেকটু জড়িয়ে ধরল।
.
অনেকটা বেলা হয়ে গেছে, এখন না উঠলে হচ্ছে না, চা পর্যন্ত খাওয়া হয় নি। তাই উঠে পড়লাম মিথু এখনও বেডে শুয়ে আছে। আমি গিয়ে ফ্রেস হয়ে বের হয়ে দেখি, সে ওঠার নামই নিচ্ছে না, ওদিকে তার ফোন বেজে যাচ্ছে,
-মিথু, তোর ফোন
-ধরে দেখ তো কে।
ওর ফোন হাতের নিয়ে দেখি, আমার শ্বাশুড়ী ফোন দিয়েছেন,
-হ্যালো মিথু!
-না মামী, অভ্র
-কেমন আছিস বাবা?
-ভালো আপনারা?
-এইত আছি। কেমন কাটছে দিন?
-ভালো। আপনার মেয়ের যন্ত্রণায় শেষ হয়ে যাচ্ছি
-কেন বাবা, কি হয়েছে?
-ওর বাচ্চামো স্বভাবগুলোর জন্য…
-ও তো এমনই…
-পাগলীটা কোথায়?
-এখনো ঘুমোচ্ছে!
মিথুকে জোর করে উঠিয়ে বসালাম, ফোনটা ওর কানের কাছের ধরলাম,
-কি রে মা, কেমন আছিস?
-ভালো মা। তোমরা?
-ভালো আছি।
-দেশে ফিরবি কবে তোরা?
-খুব তাড়াতাড়ি।
-কেমন লাগছে জায়গাটা?
-খুব ভালো, তবে তোমাদের অভ্র সেদিন কি করেছে জান?
-কি করেছে?
সেড়েছে, এই কথা যদি তারা শুনে কপালে দুঃখ আছে তাতে বিন্দু মাত্র সন্দেহ নাই। তাই ফোন তার কাছ থেকে নিয়ে,
-মামী, আপনার মেয়ে এখনো বিছানা থেকে উঠে নি। কি বলছে না বলছে তার কোন ঠিক নেই। আচ্ছা পরে ফোন দিব
বলে রেখে দিলাম,
-মিথু, তুই এই কথা মামীকে বলতে যাচ্ছিলি কেন?
-তোর কি করব? আমি দেশে ফিরে ফুপ্পিকে বলব
-পাগল হয়েছিস? যাহ্‌ বলিস তুই তোর শ্বাশুড়িকে। এখন ওঠ ঘুরে আসি…
ঠেলে তাকে ওয়াশরুমে ফ্রেস হতে পাঠালাম, সোফায় গিয়ে মাত্র বসেছি, এর মধ্যে তার ডাক আসল,
-অভ্র
-কি হয়েছে আবার?
-আমার টাওয়াল টা দিয়ে যা তো।
নাহ, একে নিয়ে আর পারা যায় না। একটা কাজ যদি ঠিক মত করতে পারত, টাওয়াল নিয়ে তার কাছে গেলাম,
-এই নে তোর টাওয়াল।
সে টাওয়াল সমেত আমাকেও ভিতরে টেনে নিল…
.
আসাধারণ সময় কাটছে, কোনোদিন ভাবতে পারি নি আমার মত ছন্নছাড়া মানুষের জীবনটা মুহূর্তের মধ্যে পালটে যেতে পারে। তবে সব সময় ভয় হয়, কেন জানি না, আমার কপালে সুখ নামক জিনিট টা বেশি দিন স্থায়ী হয় না… তবে মিথু আসার পর থেকে সব কিছু ভালো হচ্ছে, ইহিতার সাথে দেখা, দুষ্ট মিস্টি খুনসুটি, আর নিঃসার্থ অনেকটা ভালোবাসা। আশা করি সে পারবে আমাকে নিজের মত করে গুছিয়ে নিতে।
সকালে আর বেড়নো হল না। তাই লাঞ্চ শেষ করে বিকেলে বীচ থেকে খানিকটা সামনে ঘুরতে বের হলাম। রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ ফোন বেজে উঠল, স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি অচেনা নম্বার। প্রথম বার না ধরে পকেটে রেখে দিলাম, আবার একই নম্বর থেকে ফোন আসল, একরাশ বিরক্তি নিয়ে ধরলাম,
-হ্যালো।
-অভ্র বলছিলে?
-জ্বী, কে বলছিলেন প্লীজ?
-আমি আবির ভাইয়া।
-ওহ, ভাইয়া। আপনি আমার নম্বার কোথায় পেলেন?
-তোমাদের রিসোর্টে গিয়েছিলাম, দেখলাম তোমরা নেই পরে রিসিপশন থেকে নিয়েছি।
-কোনো দরকার ভাইয়া?
-তোমরা কোথায় আছ এখন?
-একটু বাইরে এসেছিলাম।
জায়গার নামটা বললাম, আবির ভাইয়া কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে বলল।
পাশের একটি কফি শপে ঢুকে কফি অর্ডার করে তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। একটু পরে সে গাড়ি নিয়ে হাজির। শপে আসল,
-কি অভ্র, মিথিলা, কেমন যাচ্ছে? আশা করি ভালোই চলছে সব কিছু!
-জ্বি ভাইয়া ভাল। হঠাৎ জরুরী ভাবে ডাকলেন?
-আসলে, আজকে ইহিতার জন্মদিন। এখানে তো ওর তেমন কোনো আত্মীয় স্বজন নেই। আর আমাদের বিয়ের পরে এই প্রথম জন্মদিন। যদি একদম কেউই না থাকে হয়ত ওর খারাপ লাগবে। আর ব্যস্ততার কারণে খুব বেশি সময় থাকতে পারি না ওর পাশে। তাই আমি চাচ্ছিলাম তুমি আর মিথিলা যদি আজকে আমাদের বাসায় আসতে, হয়ত ইহিতার ভালো লাগত।
-আসলে ভাইয়া,
আমার কথা শেষ করার আগে, মিথু জবাব দিল,
-অবশ্যই…
ভেবেছিলাম কোনো ভাবে পাশ কাটিয়ে যাব। আমি চাচ্চিলাম না আবার ইহিতার সাথে আর কোনদিন দেখা হোক। সবে মাত্র মিথুকে আপন করতে শুরু করেছি। নিয়তি আমার সাথে কি খেলা শুরু করেছে? অনিচ্ছা স্বর্ত্বেও যেতে হবে।
আবির ভাইয়া তার গাড়িতে করে আমাদের সাথে নিয়ে তার বাসার দিকে রওনা দিল। আমার মুড টা পরিবর্তন হয়ে গেল। আবির ভাইয়া বলল, বাসা বেশি দূরে নয়। তাই চুপ করে বসে থাকলাম। মিথু আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল,
-অভ্র, ইহিতার জন্য কিছু একটা নেওয়া দরকার না?
কথা শেষ করার আগে সে আবির ভাইকে গাড়ী পার্ক করতে বলল, কারণ জানতে চাইলে বলল, একটু দরকার আছে,
গাড়িত থেকে নেমে সোজা গিফট শপের দিকে হাটা ধরল, আমিও তার পিছে পিছে গেলাম, আবির ভাইয়া আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকল,
-এই, সতিনের জন্য কি নেওয়া যায়?
-কি বললি?
-বললাম, ইহিতার জন্য কি নেওয়া যায়? ওর ফেভারিট জিনিস কি ছিল?
-টেডি বিয়ার।
মিথু গিফট শপের এক কর্নারে যেতে যেতে বলল,
-পেয়েছি।
-কি পেয়েছিস?
গিয়ে দেখি ইয়া বড় সাইজের এক টেডি বিয়ার। সাইজে আমার থেকেও বড় হবে। মিথু এইটা নেবে বলেই বায়না ধরল, কি করব, পেমেন্ট করে বেড়িয়ে পড়লাম, শপের লোকারা এসে গাড়ির পিছনে উঠিয়ে দিয়ে গেল। কিছুক্ষণের ভিতর পৌঁছে গেলাম ইহিতাদের আপার্ট্মেন্টে। টেডি বিয়ার টা ওয়াচ ম্যান কে দিয়ে উপরে পাঠিয়ে দিতে বললাম। আবির ভাইয়ার সাথে সাথে ঢুকলাম। কলিং বেলে চাপ দিতেই প্রায় সাথে সাথে দরজা খুলে দিল ইহিতা। আবির ভাইয়া বলল,
-হ্যালো, বাবু
-ওদের কোথায় পেলে?
-ধরে এনেছি।
বলে ভিতরে ঢুকে গেল সে। পিছু পিছু আমি আর মিথুও।
-হ্যালো ইহিতা। কেমন আছ?
-ভালো। তোমরা?
-হ্যাঁ ভালো
একবার তার সাথে চোখাচোখি হল। ইহিতা মনে হয় এখনও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। দরজা ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। আবির ভাইয়া আমাদের বসতে বলে নিজে বেডরুমে ফ্রেস হতে চলে গেল। সমস্ত ফ্লাট খুব সুন্দর করে সাজানো। বেশ চমৎকার, যত্ন করে সাজানো হয়েছে পুরোটা। পাশের বুক সেলফের উপর একটা জিনিস দেখে চোখ আটকে গেল। আরে, এইটা তো সেই ডল টা, যেটা আমি প্রথম গিফট দিয়েছিলাম ইহিতাকে।
.
তেমন কোনো লোকজনের সমাগম দেখলাম না, তাই আমরা ৪জনই কেক কেটে ইহিতাকে উইশ করলাম।আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে, মিথিলার ফূর্তিটা একটু বেশি। কেন সেটা ধরতে পারছি না। ডিনারও করলাম একসাথে। হঠাৎ আবির বলল,
-অভ্র
-জ্বি ভাইয়া
-ড্রিংস কর?
-না ভাইয়া।
চল আজকে এক পেগ হয়ে যাক। না করতে পারলাম না। আড্ডা শেষে নিজেকে সামলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। লিমিট ক্রস করিনি ।তবে বউ আমার শুধু লিমিট না, তার উপরের স্তর ক্রস করে ফেলেছে। রিসোর্টে ফিরতে হবে, আবির ভাইয়া কে জানালাম, সে নামিয়ে দিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু তার যে অবস্থা, সে ড্রাইভ করলে আমাদের ভব লিলা সাঙ্গ হয়ে যাবে।তাই তাদের কাছে বিদায় নিয়ে রওনা দিলাম।
.
ট্যাক্সি রিসোর্টের খুব কাছে নামিয়ে দিল। পুরো রাস্তা মিথু আমার ঘাড়ে মাথা দিয়ে শুয়ে ছিল,ট্যাক্সি থেকে নেমে তাকে সামলে রাখতে আমার বেগ পেতে হচ্ছে।
-অভ্র
-বল
-আমি হাঁটতে পারছি না
-তা তো দেখতে পাচ্ছি।
সে এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরল, উপায় না দেখে তাকে কোলে করে নিয়ে রুমে ফিরতে হল। বেডে শুইয়ে দিলাম। খুব ক্লান্ত লাগছে তাই আমিও তার পাশে শুয়ে পরলাম।
বুঝতে পারছি না, উপরওয়ালা আমার ভাগ্যে কি লিখে রেখেছেন…

ঢুলু ঢুলু চোখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সকাল ১১টা বেজে গেছে। লাফ দিয়ে উঠলাম। রাতের নেশার ভাবটা এখনো কিছুটা রয়ে গেছে। ক্ষুধাও লেগেছে নেহাৎ কম না। মিথু যে ঘুম দিয়েছে, আজকে বিকেলের আগে উঠবে কি না সন্দেহ হচ্ছে। তাকে ডাকলাম,
-মিথু
কোনো জবার দিচ্ছে না,
-এই মিথু
-হু [ঘুমের মধ্যে] -এগার টা বেজে গেছে উঠবি না।
-না
নাহ, একে নিয়ে পারা যায় না, তাই বাধ্য হয়ে বেড়িয়ে গেলাম। টেবিলে বসেছি, তাকে ছাড়া খেতে মন সায় দিচ্ছে না। তাই ওয়েটারকে রুমে নাস্তা পাঠাতে বলে চলে আসলাম, এসে দেখি সে এখনো বেডে শুয়ে, ব্রাশ খুঁজে নিয়ে তার কাছে গেলাম। জোর করে বেড থেকে নামিয়ে এনেছি, সে আমার ঘাড়ে মাথা দিয়ে কোনো মতে দাঁড়িয়ে আছে,
-অভ্র, ছাড় না। আমার খুব ঘুম পেয়েছে।
-পরে ঘুমাস! এখন ফ্রেস হয়ে নে। নাস্তা করতে হবে আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে।
কথাটি ম্যাজিকের মত কাজ করল,
-তুই নাস্তা করিস নি?
– না। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয়।
সে সাথে সাথে ওয়াশ রুমে ঢুকে গেল। আমিও পশ্চাৎ প্রসারণ পূর্বক বেডের উপর গিয়ে বসলাম। অপেক্ষা করতে করতে মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে,
-মিথু
-কি হয়েছে?
-এত সময় লাগে?
-শাওয়ার নিয়ে বের হব।
কিছু করার না দেখে বসে থাকলাম। ফোন নিয়ে কতক্ষণ গুতোগুতো করলাম, ভালো লাগছে না। কি করার যায় ভাবতে ভাবতে একখানা চিঠি লিখতে বসে গেলাম। কি লিখব ভেবে পাচ্ছি না। কিছু সময় পর, মিথু টাওয়াল পরে ভেজা চুলে ওয়াশরুম থেকে বের হল। ওর চেহারা থেকে চোখ ফেরাতে পারছি না। আচ্ছা, কোনো মনীষি কি বলেছিল, ভেজা চুলে মেয়েদের সব থেকে বেশি সুন্দর লাগে? মনে পরছে না! নিজেরই মনে হয় সাহিত্য রচনা শুরু করতে হবে আমার পিচ্চি বউ কে নিয়ে। এসে একদম আমার পাশে বসল, ওর চুল থেকে মন মাতানো সুঘ্রাণ আসতে শুরু করেছে,
-ঐ
ওর কথা শুনে বাস্তবে ফিরে আসলাম।
-হু বল।
-নাস্তা খাবি না?
-ও হ্যাঁ।
সে উঠে গিয়ে নাস্তা নিয়ে আসল। আবার আগের জায়গায় এসে বসল,
-নাও।
এ কি, বউ আমার আজকে নিজেই খাইয়ে দিতে চাইছে? বাহ
-এই শোন, আজকে বিকেলে ফ্লাইট। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।
-কি? আমাদের না দশ দিনের ট্রিপ ছিল?
-হ্যাঁ জানি। আমার ভালো লাগছে না। যার সাথে গত ৬ বছর কোনো যোগাযোগ ছিল না, আমি চাইছি না আবার তার মায়ায় আবদ্ধ হতে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়েছি। আমি ভালো থাকতে চাই। তোকে নিয়ে অনেকটা পথ হাঁটতে চাই। এর মাঝে নতুন করে কেউ কাটা হয়ে আসুক তা আমি চাই না।
-পারবি তো আমাকে আগলে রাখতে অভ্র?
কিছু বললাম না, শুধু তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলাম।
.
যেহেতু ট্রিপ শেষ হওয়ার আগেই বাড়িতে ফিরছি, তাই আগেই বাড়িতে ফোন দিয়ে জানানো দরকার। আম্মু ফোন দিলাম।
-হ্যালো আম্মু
-হ্যাঁ বাবা, বল
-আমরা ফিরছি আজকে। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ফ্লাইট। তাহলে আমাদের দেশের সময়ে ৪.৩০ টায় ফ্লাইটে উঠব। তুমি গাড়ি পাঠিয়ে দিতে বলে দিও
-সে কি? তোদের না আরো কয়েকদিন পরে আসার কথা ছিল?
-হ্যাঁ ছিল। ভালো লাগছে না মা
-মিথুর সাথে কিছু হয়েছে?
-ওর সাথে কি হবে? আসলে মা, রিসোর্টের পাশে ইহিতাদের বাসা। আবিরের সাথে সেও এখানে থাকে। দেখাও হয়েছে কয়েকবার, আমি চাচ্ছি না, তার জন্য মিথুর সাথে আমার সম্পর্কের কোনো ভাঁটা পরুক। তাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
-আচ্ছা, যা ভালো বুঝিস কর।
-ঠিক আছে আম্মু। রাখি তাহলে দেখা হচ্ছে খুব দ্রুত।
ফোন রেখে দিলাম।
.
তাড়াতাড়ি এয়ারপোর্টে যেতে হবে, বোর্ডিং পাস নিয়ে সব কমপ্লিট করতে বেশ খানিক টা সময় লাগবে। তাই লাঞ্চ শেষ করে ৩টার মধ্যে বেড়িয়ে গেলাম। সকল ব্যাগপত্র গাড়িতে তুলে রওনা দিয়েছি। এখনকার রাস্তা ঘাট অনেকটা উন্নত। তাই বেশি সময় লাগবে না যেতে। আনমনে বসে আছি, হঠাৎ মিথু বলল,
-অভ্র, তোর চিঠিটা
অবাক হয়ে গেলাম। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। ঠিক যেভাবে রুমে খাম বন্দি করে রেখেছিলাম সেভাবেই আছে। সে খুলেও দেখে নি।
-এটা কোথায় পেলি?
-রুম থেকে বের হবার সময় দেখলাম টেবিলের উপর রেখেছিস। ভাবলাম হয়ত কোনো জরুরী কিছু। তাও আবার ইহিতার এপার্ট্মেন্টের ঠিকানায় তাই নিয়ে এলাম।
-না আনলেই ভালো হত।
মনে মনে বললাম,
-কিছু বললি?
-না। খুলেছিলি?
-নাহ।
-জানতে চাইবি না, কি লেখা আছে?
-কি দরকার? কিছু কথা না হয় আমার অজানাই থাকল।
আমি মাঝেমধ্যে ভেবে পাই না, মেয়েটা এত ভালো কেন? আমার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে ছিল না চিঠিটা পোস্ট করার। মিথুর জোরাজুরিতে মাঝ রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে পোস্ট বক্সে ফেলে আসলাম।
.
ভালোয় ভালোয় দেশের মাটিতে পা রেখেছি।রাত হয়েছে অনেকটা। এয়ারপোর্ট থেকে সকল ফর্মালিটি শেষ করে বাইরে এসে দেখি গাড়ি হাজির। উঠে পরলাম। শীতের তীব্রতা কিছুটা বেড়েছে মনে হচ্ছে। গাড়িটি তার চূড়ান্ত বেগ তুলে ছুটে চলেছে। হিম বাতাসে আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। গ্লাস উঠিয়ে দিতে বললে মিথু বারণ করল, তাই আর উঠাতে পারলাম না। তার নাকি ভালো লাগছে। এই মেয়েকে মনে হয় আমি এক জীবনে বুঝে উঠতে পারব না।
দেখতে দেখতে বাসার কাছাকাছি চলে আসলাম। গাড়ি থেকে নেমে কলিং বেল দিতে আম্মু দরজা খুলে দিল। মিথু সাথে সাথে গিয়ে আম্মুকে সালাম করল। কোনো মেয়ে দেশের বাইরে থেকেও এত রীতি নীতি মানতে পারে ওর অভ্যাস না দেখলে হয়ত আমি জানতে পারতাম না। আম্মুও তাকে আদর করে দিল। আসলে তার ভালোবাসার কোনো কমতি হবে না, কারণ আমার পরিবারে আমিই একা সন্তান। আর ছোট থেকে মিথুকে আম্মু খুব ভালোবাসত। এখন আমার ভয় হচ্ছে, আম্মু আমাকে ভুলে না যায়…
.
রুমে এসে ডিরেক্ট বিছানায় শুয়ে পরেছি। কেন জানি না মনে হচ্ছে, দুনিয়ার সকল ক্লান্তি আমার উপরে ভর করেছে। আর সব থেকে বড় কথা হচ্ছে, মিথুর সতিন দুঃখিত আমার কোলবালিশ সাত জনম পর কাছে পেয়েছি। মিথু ঘরে এসেই শুরু করল,
-অভ্র, ভালোয় ভালোয় কোলবালিশ আমার কাছে দিয়ে দে
-দিব না। কি করবি?
-দেখতে চাস?
-হু
সে গগন ফাটানো চিৎকার দিয়ে আম্মুকে ডাক দিল,
-ফুপ্পিইইইইইইইইইইইহ
আম্মাজানও আমার রকেটের গতিতে আমার রুমে হাজির।
-কি মা, কি হল তোদের?
-দেখ না ফুপ্পি, তোমার ছেলে আমার জায়গায় কোলবালিশ দিয়ে রেখেছে।
-অভ্র, দে কোলবালিশ দে, এক্ষুনি। আমার ভুল হয়েছে, আগেই সড়িয়ে রাখা উচিত ছিল।
.
আম্মু যেহেতু বলেছে, না করার কোনো উপায় দেখছি না। সুবোধ বালকের মত দিয়ে দিলাম।হন হন করে আমার দ্বিতীয় বউখানা নিয়ে আম্মু চলে গেল। আর অন্য দিকে বউয়ের মুখে বিজয়ীর হাসি দেখা যাচ্ছে। মেজাজ সপ্তমে উঠে গেল। কোনো রকম জামা কাপড় চেঞ্জ করে বিছানায় শুয়ে পরলাম। কিছুক্ষণ পর মিথুও এসে পাশে শুয়ে পরল,
-ওগো।
-রাখ তোর ওগো। আমি কোলবালিশ এনে দিবি তুই!
-আমি আছি না?
কথা শেষ করার আগেই অন্য দিকে ঘুরলাম, সে আমার গেঞ্জির হাতা ধরে টানতে শুরু করেছে,
-তুই এমন করলে আমি ঘুমবো কি করে?
এবার তার দিকে ফিরলাম, দুষ্ট এক হাসি দিয়ে বাচ্চাদের মত আমার বাহুতে শুয়ে পরল।
.
সকালের মিষ্টি আলো মুখে পরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে দেখি মিথিলা পাশে নেই। কোনো ব্যাচেলার যদি সকালে উঠে ফোন পাশে না পায়, ঠিক তখন যে কষ্ট টা লাগে তেমনই এক সদ্য বিবাহিত মানুষ ঘুম থেকে উঠে তার বউকে পাশে না দেখতে পেলে অবস্থা একই হয়। চোখ ডলতে ডলতে রুম থেকে বেরিয়ে আম্মুর কাছে যাচ্ছি, গিয়ে দেখি সেও রুমে নেই। আব্বু এখনো ঘুম। বউ শ্বাশুড়ি মিলে সাত-সকালে গেল কোথায়? ডাইনিং রুমে গিয়ে রান্না ঘর থেকে আম্মুর গলা শুনতে পেলাম।
-আরে মা, তুই ছাড় নাই, বুয়া আছে ওরা করে দিবে।
আগ্রহ নিয়ে গেলাম সেখানে, গিয়ে দেখি বউ আমার মহানন্দে রান্নার উৎসব বসিয়েছে। আর আম্মু পাশে বসে আছে।
রুমে ফিরলাম, ভাবলাম আরো কিছুক্ষণ ঘুমানো যাক, যে ভাবা সেই কাজ। আরাম করে শুয়ে পরলাম।
.
হুট করে কে যেন রুমে এসে এক জগ পানি আমার গায়ে ঢেলে দিল। লাফ দিয়ে উঠলাম। দেখি বউ আমার ভুবন ভুলানো হাসি দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে,
-কি হে জনাব? নাস্তা খেতে হবে না?
-সে জন্য তুই গায়ে পানি ঢেলে দিবি?
-ফুপ্পি তো বলেছিল, তোর কান টেনে তুলতে। কিছুটা মায়া দেখিয়েছি। থাক থ্যাংক্স দিতে হবে না।
ক্রুর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম,
-উঠে নাস্তার টেবিলে চলে আয়, নাস্তা দিয়েছি?
-দিয়েছি মানে?রান্না তুই করেছিস?
-হ্যাঁ জনাব
-হে উপরওয়ালা, মুখে দিতে পারলে হয়।
.
কিছুটা রাগ নিয়ে বেড়িয়ে গেল মিথু, আমিও তার কিছুক্ষণ পরে নাস্তার টেবিলে চলে গেলাম, আম্মু আব্বু সবাই হাজির আমার সামনের চেয়ারে মিথু মুখ গোমরা করে বসে আছে!
-শুভ সকাল
-হুম বাবা, শুভ সকাল
নাস্তা খেতে শুরু করে আমি তো পুরো অবাক। একদম আম্মুর মত রান্না। অসাধারণ। কোনো কথা না বলে খাওয়া শেষ করে রুমে চলে আসলাম। আমার আগেই মিথু ফিরেছে, বান্দারায় গিয়ে একা মন মরা হয়ে বসে আছে, গিয়ে পিছ থেকে জড়িয়ে ধরলাম,
-কি হয়েছে তোমার?
-কিছু না। ছাড়
-বলবি না? ভালো কথা রান্না টা খুব সুন্দর হয়েছে। আমি তখন একটু মজা করেছিলাম।
-সত্যি
-হুম, তা আর কি কি পারেন আপনি?
-তা না হয় সময় আসলেই দেখতে পাবেন জনাব…

এমনি করে অনেক দিন পার হয়ে গেল।।
– সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রুমে ফিরলাম। খুশিতে
আমার নাচতে ইচ্ছে করছে। জামা কাপড় চেঞ্জ করে
বসেছি, এর মধ্য মিথু চলে এসেছে। তাকে ধরেই নাচতে শুরু
করলাম,
-এই কি করছ? ছাড়!
-আজকে কোনো কথা হবে না?
-হা হা, বলে কি পাগলটা!
-হুম। এত বড় একটা সু-সংবাদ। জানো, আজকে আমার থেকে
খুশি মনে হয় এই জগতে আর কেউ নেই।
-তাই নাকি জনাব?
কিছু একটা বলতে চেয়েছিলাম, এর মধ্যে তার
দুঃসম্পর্কের ভাই এসে নিচে ডাকল। সবাই নাকি
অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। চলে গেলাম। নানু, আম্মু
আব্বু, শ্বশুড় শ্বাশুড়ি সহ আরো অনেকে বসে আছে। আমি
মিথু কে বসিয়ে দিয়ে মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালাম, একটু
ঝেড়ে কাশি দিয়ে শুরু করলাম,
-শোন, সবাই, তোমাদের সবার জন্য একটা শুভ সংবাদ
আছে। আমি বাবা হতে যাচ্ছি।
বলে একটা বিজয়ের হাসি দিলাম। কিন্তু এ কি? কেউ
কোনো পাত্তাই দিল না। শুধু নানু উঠে এসে আমার কান
মলে দিয়ে বলল,
-এ খবর আমরা সবাই জানি। এখন মিষ্টি খাওয়ানোর কথা
কি আমাকে বলে দিতে হবে?
মক্কেল বনে গেলাম। তার কথা মতে যা দাঁড়াল তা হচ্ছে,
আমি বাদে সকলে এই খবর ভালো মত অবগত। মিথুর দিকে
তাকিয়ে দেখি সে হাসছে। খুব দ্রুত করে মিষ্টি নিয়ে
আসা হল, প্রথমে আম্মু উঠে এসে আমাকে মিষ্টি খাইয়ে
দিল,
-দাদু হচ্ছি, বুঝেছিস? সেই খুশিতে…
তার পর এক এক করে সকলে আমাকে মিষ্টি খেরাপি
দিয়ে গেল। বাড়িতে খুশির ধুম উঠেছে। তবে খুশির
মাত্রাটা আমার থেকে কারো বেশি হবে না বাজি
দিয়ে বলতে পারি।উচ্চ স্বরে গান বাজনা শুরু হয়েছে।
একে তো মিথুর জন্ম দিন, তার উপর নতুন মেহমান আসছে।
ব্যাপারটা অনেকটা আগুনে পেট্রল দেবার মত।
.
মিষ্টি খেরাপি হজম করে রাতে আর খাবার খেতে ইচ্ছে
করছে না। তবুও মিথু খাবার নিয়ে সোজা রুমে এসেছে।
শুয়ে ছিলাম, তার উপস্থিতি টের পেয়ে উঠে বসলাম, সেও
আমার পাশে এসে বসল,
-না খেয়ে রুমে চলে আসলে কেন? মন খারাপ?
-বলে কি পাগলীটা, যে থেরাপি হজম করতে হয়েছে,
খেতে ইচ্ছে করছে না।
-তা বললে তো চলবে না।
-তুমি খেয়েছ?
-উহু।
প্লেট টা আমি হাতে নিলাম। সব সময় তো সে আমার
খেয়াল রেখেছে। এখন থেকে না হয় আমিই একটু করি।
তাকে খাইয়ে দিতে শুরু করলাম,
-মিথু,
-হু
-জানো, এইদিন টার জন্য কত দিন অপেক্ষা করেছি?
-তাই?
-হ্যাঁ।
-আচ্ছা, তোমার কি চাই ছেলে না মেয়ে?
-তোমার মত মিষ্টি আর লক্ষ্মী একটা মেয়ে
-কিন্তু মেয়েদের নাকি বাবাদের মত হলে ভালো হয়।
-উহু। আমার মেয়েকে আমি তার মায়ের মত শান্ত আর
ধৈর্যশীল করে তুলব।
-হা হা, ঠিক আছে।
-তবে নাম নিয়ে কিন্তু আমি ঠিক করে রেখেছি।
-কি?
-আয়েশা মেহজাবিন ।
-ইহিতা দিয়েছিল নামটা তাই না???
কি বলব বুঝতে পারছি না। কথাটা যে মিথ্যা তাও না,
তাই হাল ছেড়ে দিলাম,
-হ্যাঁ। তোমার পছন্দ হয় নি?
-সেটা বলি নি। তাছাড়া নামটা অনেক সুন্দর। আর যদি
ছেলে হয় তাহলে আহনাদ রনওক।
চুপসে গেলাম। এই নামটাও ইহিতা দিয়েছিল। আমি বুঝতে
পারছি, মিথু মেয়েটা এত ধৈর্যশীল কেন? আর কেনইবা
ইহিতার পছন্দ অপছন্দ গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে যাচ্ছে।
এতটা বেশি ভালোবাসে মেয়েটা আমাকে?
.
আজকে কেন যেন সকাল সকাল উঠে পরলাম। মিথু এখন
ঘুমিয়ে আছে তাকে ডাক দিলাম না। গত কাল সারা রাত
অনেক ফুর্তি হয়েছে। কেউ এখনো ঘুম থেকে জেগে উঠে
নি। ফ্রেস হয়ে কিচেন রুমে চলে গেলাম। দু-কাপ কফি
বানিয়ে আবার চলে আসলাম। তাকে ডাক দিলাম,
-মিথু, ওঠ না।
সে আমার কথা শুনে হুড়মুড় করে উঠে গেল,
-আজকে এত তাড়াতাড়ি উঠে গেলে? অন্যান্য দিন তো
ডেকে তুলতে হয়।
-এমনি। কফি নাও
-আরেহ বাবা, আপনি কফি বানিয়েছেন আমার জন্য?
নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে।
-কেমন হয়েছে?
-অসাধারণ।
-চলো বিকেলে ঘুরে আসি।
-আগে বের হয়ে দেখি।
বিকেল বেলা শ্বশুড় মশাইয়ের বাইকখানা নিয়ে বের
হলাম। পিছনে মিথু। প্রায় ৬ বছর পরে বাইক নিয়ে বের
হয়েছি। ইহিতার সাথে সব কিছু শেষ হবার পরে আর
কোনো দিন বাইক নিয়ে বের হই নি। তার খুব পছন্দ ছিল
বাইকে ঘোরা। আজকে কেন জানি না মিথুকে নিয়ে বের
হতে ইচ্ছে হল। মিথু আমাকে জড়িয়ে বসে আছে। আর আমি
খুব সাবধানে চালিয়ে যাচ্ছি। একটা পার্কে গিয়ে
বসলাম। জায়গাটা অতি চমৎকার। ভালো লাগছে হাঁটতে।
মিথু জোর করে ফুসকা খেল। যদিও আমার বিন্দুমাত্র
ইচ্ছে ছিল না, তবুও তার জোরাজুরির কারণে শেষ পর্যন্ত
খেতে হল।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, বাড়ীতে ফিরতে হবে। তাকে নিয়ে
রওনা দিলাম। রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। আমি নিশ্চিন্তে
যাচ্ছি। হঠাৎ সামনে থেকে দ্রুত গতির একটি গাড়ি এসে
আমাদের ধাক্কা দিল। শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে গিয়ে
পরলাম রাস্তার পাশে।শুধু মিথু বলে শেষ একটা চিৎকার
দিয়েছিলাম। তারপরে আর কিছু মনে নেই।
.
চোখ খুলে দেখি আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে
আছি। মাথায় ভোঁতা যন্ত্রণা। মাথায় সহ হাত পায়ে বেশ
কয়েক জায়গায় ব্যান্ডেজ। মিথুর কথা মনে পরতেই বুকের
বা-পাশটা চিন চিনে ব্যাথা শুরু হল। নার্সকে ডাকলাম।
নার্সের প্রায় সাথে সাথে আব্বু কেবিনে চলে আসল,
-আব্বু, মিথিলা কোথায়?
-সে ভালো আছে।
-কোথায় সে?
-পাশের কেবিনে।
দৌড়ে গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি মিথিলা শুয়ে
আছে। পাশে গিয়ে বসে তার হাত ধরলাম। বাম হাত এবং
পায়ে ব্যান্ডেজ ছিল। মিথুর এই অবস্থা দেখে নিজের বুক
ফেটে কান্না আসতে চাইছে। এর মধ্যে সবাই মিথুর
কেবিনে চলে আসল, জানতে চাইছিলা সেদিন কি
হয়েছিল, আব্বুর কথায় সারাংশ দাঁড়াল, সেদিন ব্রেক
ফেল করা একটি গাড়ি আমাদের উদ্দেশ্যহীন ভাবে
ধাক্কা দেয়। আশেপাশে লোকজন থাকায় তারা সাথে
সাথে হসপিটালে নিয়ে এসে বাড়িতে খবর দেয়। আমার
আঘাত টা একটু বেশি গুরুত্বর ছিল,মাথায় বেশ কয়েকটা
শেলাই দিতে হয়েছে। মিথুর বাম হাতে বেশ অনেকটা
কেটে গিয়ে বেশ রক্তক্ষরণ হয়ে অবস্থা আশঙ্ককা জনক
হয়ে উঠেছিল। কোথায়ও তার গ্রুপের সাথে মিলে এমন
রক্ত পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অচেনা
এক ব্যক্তি রক্ত দিতে সম্মতি জানায়।রক্তসংগ্রহ করে
সবাই মিথুকে নিয়ে বুস্ত হয়ে পরেছিল হঠাৎ সেই
মানুষটির কথা মনে হলে তার খোঁজ করা হয় কিন্তু পরে
তাকে আর কোথায়ও খুঁজে পাওয়া যায় নি। সব থেকে বড়
কথা হচ্ছে, সেদিন রক্ত পাওয়া না গেলে হয়ত অনেক বড়
দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত।
মিথুর জ্ঞান ফিরেছি কিছুক্ষন আগে,
আমি নিজের কেবিন বাদ দিয়ে তার পাশে বসে আছি,
কোন দিন ভাবতে পারি নি তাকে এই অবস্থায় দেখতে
হবে।
-মিথু, একটু ভালো লাগছে?
-কিছুটা। তুমি ঠিক আছো তো?
-হ্যাঁ। একদম।
বেশ কয়েকদিন হসপিটালে থাকার পরে আমাদের রিলিজ
দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মিথুর হাঁটতে এখনো বেশ কষ্ট হয়।
পায়ের আঘাত টা অনেক বেশি ছিল। সব থেকে বেশি
ভয়ে ছিলাম, বাচ্চার কোনো সমস্যা হবে কি না। তবে
এবার মনে হয় কপাল টা একটু বেশিই ভালো ছিল। হালকা
আঘাতের উপর দিয়ে বেড়িয়ে গেছি। বাচ্চার কোনো
সমস্যা হবে না বলে ডাক্তার আশ্বস্ত করেছেন।
.
আরো কিছুদিন পর মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠেছি। তবে সে
দিনকার কালো দাগ টা এখনো মনের মধ্যে বসে আছে।
মিথুর কিছু একটা হয়ে গেলে জানি না নিজেকে কোনো
দিন ক্ষমা করতে পারতাম কি না।
ডাক্তার চেক আপ করে আরো কিছু দিন রেস্ট নিতে
বলেছে।তাই আম্মু আর আব্বু বাড়িতে ফিরে গেছে। আমি
আর সে তাদের বাড়ীতে আছি। মিথুকে নিয়ে ছাঁদে
এলাম অনেক দিনপর, বিকেল পেড়িয়ে গোধুলী সময়,
আকাশ টা পরিষ্কার, সূর্য্যের লাল আভাটা খুব সুন্দর
লাগছে। সে বলল,
-আচ্ছা, সেদিন যদি আমার ভালো মন্দ কিছু একটা হয়ে
যেত?
কথা শেষ করার আগে তার মুখে হাত দিলাম,
-এমন কথা আর কখনও বলবে না। তুমি চলে গেলে আমি
কাকে নিয়ে থাকব?
-এতটা ভালোবাস আমাকে?
-হ্যাঁ! অনেক বেশি, নিজের থেকেও বেশি। কোথাও
যেতে দিব না তোমাকে।
-তবে কোনদিন যদি নিয়তির কাছে আমাদের হেরে যেতে
হয়???
১০
বাড়িতে ফিরেছি। সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর অনেকটা বেশি সতর্ক হয়েছি, পরিবার বলতে বাবা মা আর মিথু। আমি চাই না এদের কেউ আমার জীবন থেকে খুব দ্রুত হারিয়ে যাক।
ব্যস্ততা বাড়ছে। মিথুকে পরিপূর্ণ সময় দিতে পারছি না। আম্মু তার দেখাশুনো করছে। তবু এখনও সে দুপুরের লাঞ্চ নিয়ে অফিসে চলে আসে। বারণ করেছি অনেকবার। কিন্তু কে শুনছে কার কথা। অফিসের বাইরে থাকলে না ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। আজকে সকাল ১১ টার দিকে কাজে বেড়িয়েছি। গুরুত্বপূর্ন মিটিং এ যেতে হবে। মিথুকে ফোন দেওয়ার কথা একদম খেয়াল ছিল না। মিটিং এর মাঝখানে একবার ফোন দিয়েছিল অবশ্য ধরতে পারি নি। অফিসে ফিরে দেখি সে আমার কেবিনে বসে আছে,
-এসেছেন জনাব?
-তুমি অফিসে কেন? তোমাকে না বারণ করেছিলাম এখন বাড়ি থেকে কম বের হতে।
-কথা বলে পেট ভরবে? নাকি লাঞ্চ করতে হবে?
ফ্রেস হয়ে এসে বসলাম,
-মিথু, তোমার ভালোর জন্য বলছি, প্লীজ একটু কম বের হবে বাড়ি থেকে। তুমি এখন একা না।
-তুমিও শুরু করলে? আচ্ছা, শোন, আজকে বিকেলে চেক আপ করতে যাবার কথা ছিল। আমার সাথে একটু যেতে পারবে???
-আচ্ছা ঠিক আছে।
.
অফিস থেকে সোজা ডাক্তারের চেম্বারে চলে গেলাম। কয়েকটা টেস্ট দিয়ে সেগুলো করতে বলল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। টেস্ট গুলো শেষ করে তাকে নিয়ে বাড়ীতে ফিরলাম। রিপোর্ট পরের দিন দিবে তাই কাল আবার যেতে হবে। রাতের খাবার সবাই একসাথে খেতে বসেছি, আব্বু বলল,
-অভ্র, তোমার কাল থেকে অফিসে যেতে হবে না। ঐ দিকটা আমি সামলে নিব। তুমি মিথিলাকে আর তোমার মাকে সময় দিবে।
-ঠিক আছে।
.
তারপর টুকটাক কথা বলে মিথুকে নিয়ে রুমে চলে গেলাম। সারাদিন পরে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে ঘুম চলে আসল। মিথুর কথায় আবার জেগে উঠলাম,
-এই শোন না।
-হুম বল
-তোমাকে খুব চিন্তিত লাগছে। কারণ টা জানতে পারি?
-কোথায়, না তো!
-আমার কাছে লুকাবে তুমি?
-আরে পাগলী, কিছু হয় নি, আগামী কাল রিপোর্ট আসবে সে জন্য একটু চিন্তা লাগছে।
-আচ্ছা, ঘুমাও তাহলে। খুব ক্লান্ত নিশ্চয়ই।
কিছু না বলে ঘুমিয়ে পরলাম। মিথুর ঘুমোতে অনেক বেশি কষ্ট হয় জানি। অনেক রাত চোখে ঘুম থাকা স্বর্ত্বেও ভোর হয়ে যায়। তবুও আমাকে কখনো সাহস করে ডাকে না। কখনো ঘুম ভেঙ্গে গেলে হয়ত দেখি, সে পাশে বসে আছে।
একমাত্র মায়েরা জানে কলিজার টুকরো একজন সন্তান জন্ম দিতে কতটুকু কষ্ট করতে হয়।
.
সকালে ঘুম থেকে উঠে সোজা আম্মুর রুমে চলে গেলাম। মিথু ঘুমচ্ছে। রাতে হয়ত ভালো ঘুম হয় নি। তাই ডাকলাম না।
-আম্মু
-হ্যাঁ বল বাবা। কি হয়েছে?
-আজকে আমি রান্না করব!
-পাগল হয়েছিস নাকি?
-একটুও না। ফ্রিজে কি মাংস আছে?
-হ্যাঁ। কেন?
-মিথিলার বিরিয়ানি খুব পছন্দ। সেটা রান্না করব।
-হা হা, আচ্ছা ঠিক আছে।
কি মনে করে যেন হাটতে বেড়িয়ে পরলাম, কিছুটা দূরে এসে আমার বাসার দিকে ফিরতে যাব, দেখি একটা বাচ্চা ছেলে বেলি ফুলের মালা নিয়ে মাত্র বের হয়েছে। আমাকে দেখে বলল,
-ভাইয়া, ফুল নিবেন নি? নেন, আফার খুব পছন্দ হইবো।
বেলিফুলের ঘ্রাণ টা অসাধারণ। তাই নিয়ে নিলাম।
রুমে এসে দেখি, মিথু শাওয়ার নিয়ে মাত্র বেড়িয়েছে। চুল শুকিয়ে নিজে তার খোপা বেঁধে, ফুলের মালা লাগিয়ে দিলাম। বাহ, অসাধারণ লাগছে দেখতে।
.
আমাকে কিচেন রুমে দেখে মিথুর চোখ চড়ক গাছে উঠেছে,
-এই, তুমি এখানে কেন?
-রান্না করব!
-পাগল হয়েছ?
-একটুও না।আজকে দেখবে, তোমার বর কত কিছু করতে জানে।
-থাক দেখাতে হবে না। এখনই বের হও এখান থেকে!
-তুমি আম্মুর কাছে যাও। কি জন্য যেন ডেকেছিল।
আসলে মিথ্যে কথা, আম্মু ডাকে নি। এখানে থাকলে সে আমাকে রান্না করতে দিত না।
.
সব সময় সে আমার জন্য কয়েছে । এখন না হয় তার জন্য কিছু করার সময় এসেছে।
আব্বুও আজকে লাঞ্চ করতে বাসায় ফিরেছে, একত্রে টেবিলে বসেছি, খেতে শুরু করেছি সবাই, আব্বু বলল,
-অভ্রর আম্মু, আজকে রান্নাটা অন্য রকম লাগছে। রাঁধুনি কি চেঞ্জ হয়েছে নাকি?
মিথিলা হাসতে হাসতে জবাব দিল,
-বাবা, আজকে আপনার ছেলে রান্না করেছে।
আব্বু অবিশ্বাসের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, একটু পরে আম্মু আব্বু দুজনই মিথুর সাথে হাসিতে যোগ দিল। আমি বললাম,
-রান্না কি ভালো হয় নি?
-অসাধারণ হয়েছে। কিন্তু বাবা, হঠাৎ কি মনে করে?
-এমনি আর কি…
.
দুপুরের পরে মিথুকে নিয়ে বের হলাম, প্রথমে রিপোর্টগুলো চেক করাতে হবে। অপেক্ষার প্রহর গুনে চলেছি। ডাক পড়ল চেম্বার। তাকে নিয়ে গেলাম সেখানে, ডাক্তার আমাদের দেখেই বল,
-আসুন আসুন, শুভ সংবাদ, আপনাদের মেয়ে আসছে খুব দ্রুত। কনগ্রেট মি & মিসেস অভ্র.
.
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আনন্দে চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল চিবুক বেয়ে নেমে পড়ল। মানুষ শুধু দুঃখ বেদনায় কাঁদে না। আনন্দেও কাঁদে।সে আরো বলল,
-নরমাল ডেলিভারি হবে তাই চিন্তার কারণ নেই।
কাছাকাছি একটা ডেটও দিয়ে দিলেন। ডাক্তারের কেবিন থেকে বেড়িয়ে মিথু প্রথমে ফোন দিয়ে আমার আম্মু কে জানাল তার পরে তার বাবা মা কে। আমার এখনই ডান্স করতে ইচ্ছে হচ্ছে, অনেক কষ্টে ইচ্ছেটা সংবরণ করতে হল।
.
ভেবেছিলাম ঘুরতে যাবো, কিন্ত মিথু নিষেধ করল, তাই মিষ্টি নিয়ে বাসায় ফিরলাম। ঢোকার সাথে সাথে আম্মু আজকে মিথুকে মিষ্টি খেরাপি দিল, তারপর আমাকে। পায়ে ধরে সালাম করলাম। আম্মু আমাদের বুকে জড়িয়ে নিল। এত বড় একটা খুশির খবর…
.
আমার বেশির ভাগ সময় মিথুর কাছে বসেই কাটছে। নিজের ভিতর অনেকটা পরিবর্তন অনুভব করতে পারছি। কেন জানি না, মিথুকে হারানোর ভয় আমাকে সব সময় আতংকিত করে রেখেছে। একে কি তার জন্য ভালোবাসা বলা যায়? জানি না! কখনো জানতে ইচ্ছে হয় নি। তবে যতটা ভয় ইহিতাকে হারানোর ছিল তার থেকে মনে হয় কয়েক শত গুন বেশি ভয় এখন কাজ করছে। মিথুকে এক মুহুর্ত চোখের আড়াল করতে ইচ্ছে হয় না। যত দিন ঘনিয়ে আসছে, তত চিন্তা বাড়ছে, যদিও সে আমাকে সব সময় সাহস দিয়ে যাচ্ছে, তবুও, ঘর পোড়া গরু। সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। ভাগ্যের হাতে এত মার খেয়েছি, যা বলার ভাষা নেই।
.
রাত প্রায় ২টা পার হয়েছে, ঘুমিয়ে আছি, পাশে মিথু। হঠাৎ সে চিৎকার দিয়ে উঠল,
-অভ্র
-মিথু, কি হয়েছে? কোনো সমস্যা? সব কিছু ঠিক আছে তো?
-খুব ব্যথা হচ্ছে। মনে হয় জীবনটা বেড়িয়ে যাবে।
বুঝলাম সময় হয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি আম্মু আব্বু ডেকে তাকে এ্যাম্বুলেন্সে করে হসপিটালে নিয়ে গেলাম, পুরোটা সময় তার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছি। সে শুধু একটা কথা বলছিল,
-আমার কিছু হলে বাবুকে দেখে রেখ।
-দূর, পাগলী, আমি থাকতে কিচ্ছু হবে না।
তার কষ্ট দেখে নিজের বুকের ভিতর ধুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে।
ডাক্তারের কথা মত প্রথমে নরমাল ডেলিভারি করার জন্য চেষ্টা করা হল। অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। ফলপ্রসু কিছু হচ্ছে না। ডাক্তার বাইরে এসে আমাকে আগে ডাকলেন,
-মি.অভ্র
-জ্বি। কি অবস্থা পেসেন্টের?
-কিছুটা সংকটপূর্ন। আমাদের c সেকশনের জন্য এগোতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমাদের ব্লাড ব্যাংক এ, আপনার স্ত্রীর গ্রুপের O- রক্ত নেই। যত দ্রুত সম্ভব রক্তের ব্যবস্থা করতে হবে। নতুবা ভালো মন্দ কিছু একটা হয়ে যেতে পারে।
আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরল। ঘড়ির কাটা ৩ টা ছুই ছুই করছে, এই সময় কোথা থেকে রক্ত ব্যবস্থা করব? আব্বুকে জানালাম। আম্মু শুনো রীতিমত কান্না জুড়ে দিয়েছি। নিজের মেয়ের মত করে ভালোবাসে মিথুকে। আম্মুকে কি শান্তনা দিব? নিজেকে বুঝাতে পারছি না। তবে কি আমার ধারণ আরো একবার সত্যি হতে যাচ্ছে?
.
বাবা আমাকে অপেক্ষা করতে বলে নিজে বেড়িয়েছেন রক্ত জোগাড় করতে। কিন্তু এ রাতে কি থেকে কি করবেন? করিডোরে ভাবলেশহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছি, সামনে কিছু চিন্তা করতে পারছি না। নিজেকে জড় পদার্থ মনে হচ্ছে। হঠাৎ কে যেন আমার ঘাড়ে শীতল হাত রাখল, ঘুরে দেখি এক মধ্য বয়স্ক চমশা পরিহিত ভদ্র লোক দাঁড়িয়ে আছেন,
-কোনো সমস্যা?
মুখ দিয়ে কোনো কথা বের করতে পারছিলাম না। কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। কি হল জানি না, হুট করে সব সমস্যার কথা হড়্গড় করে বলেদিলাম, সব শুনে তিনি মুচকি হেসে বললেন,
-নিয়তির কাছে সব সময় হেরেছেন? এবার না হয় আমার কিছুটা অংশ আপনাদের দিয়ে গেলাম।
-দুঃখিত , বুঝলাম না।
-বোঝানোর জন্য বলি নি। যাই হোক আমারই তো O-. আপনাদের অপত্তি না থাকলে আমি সাহায্য করতে পারি।
.
আমার চোখ চক চক করে উঠল, দৌড়ে গেলাম ডাক্তারের কাছে। তিনি অপরিচিত লোকটির রক্ত পরীক্ষা করে উপযুক্ত বলে গন্য করলেন।রক্ত সংগ্রহ করে OT তে নিয়ে যাওয়া হল। সেই লোকটি আমার পাশে এসে বলল,
-অনেক বেশি ভালোবাসেন তাই না? তবে ভালোবাসারই জয় হোক!
-দুঃখিত, আপনার কথা কিছু বুঝলাম না!
-বাদ দি।সব কিছু বুঝতে হয় না। আচ্ছা আসি তাহলে।
কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে গেল। আর দেখতে চোখে আড়ালে চলে যাওয়ার আর দেখতে পারলাম না তাকে। একটু পরই শুরু হল অপারেশন। বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি। মনে হচ্ছে আমার বুকের ভিতর কে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে! প্রায় সাথে সাথেই মুখ কালো করে আব্বু ফিরেছেন,
-কিছু করতে পারলাম না বাবা।
আমি তাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, রক্তের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আব্বু অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে,
-কে দিয়েছে?
-তাকে চিনি না, আগে পরে দেখেছি বলে মনে পরছে না। তবে মধ্য বয়স্ক ভদ্র লোক মনে হল…
আব্বু আমার কথা শুনে মনে হয় চমকে উঠলেন।
-অভ্র, উনি কি চমশা পরে?
-হ্যাঁ। কেন?
-আরে এই তো সেই লোক, যিনি…
আব্বু কথা শেষ করতে পারলেন না, তার আগে OT থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসল। সকল কল্পণা জল্পণার অবশান ঘটিয়ে এসেছে আমার মামুনি, আমার আয়েশা।
ডাক্তার বের হল, গিয়ে তাকে ঘিরে ধরলাম,
-অভিনন্দন মি.অভ্র। আপনার কন্যা সন্তান হয়েছে। মা এবং মেয়ে উভয়ে ভালো আছেন। একটু পরে চাইলে দেখা করতে পারবেন।
আব্বুকে জড়িয়ে ধরলাম। খুশিতে তার চোখ দিয়েও দু-ফোটা পানি গড়িতে পরছে। অবাক লাগল, কোন দিন এই মানুষটির চোখে পানি দেখি নি…
.
নার্স এসে মেয়েকে আমার বাবার কোলে দিয়ে গেল। বাবা এখনো কাঁদছেন, আর আম্মুর খুশি তো মনেই ধরছে না। প্রথম বারের মত মেয়ের দিকে তাকালাম, বাহ, একদম মায়ের মত চেহারা হয়েছে। স্বপ্নটা বোধহয় এবার সত্যি হতে চলেছে। দেখলাম ঘুমিয়ে আছে। আব্বু আমার কোলে দিল। খুব সাবধানে তাকে নিয়ে বসে রইলাম। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আমার মেয়ের দিকে।আমার মেয়ে, হ্যাঁ আমার মেয়ে। আমি বাবা হয়েছি। সকল অশুভ কিছু পার করে এসেছি? তবুও সব কিছু কেন জানি স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে। কত সময় বসেছিলাম মনে নেই। নার্সের ডাকে বাস্তব জগতে ফিরে আসলাম।
-মি.অভ্র, আপনার পেসেন্টের সাথে চাইলে দেখা করতে পারেন।
আমি আয়েশা কে নিয়ে মিথুর কেবিনে গেলাম। সে চোখ বন্ধ করে আছে। গিয়ে আস্তে করে ডাকলাম,
-মিথু
আমার গলা শুনে চোখ মেলে তাকাল। কথা বলতে পারছে না। তবে এক ফোঁটা জল চোখের কণা দিয়ে বেয়ে পরছে। আমি জানি এই জল আনন্দের। আয়েশাকে তার পাশে শুইয়ে দিলাম। অনেক কষ্টে হাত টা উঠিয়ে বাবুর গাল স্পর্শ করল। আজ মনে হচ্ছে আমি সকল অশুভ কিছুকে পিছে ফেলে এসেছি। এখন সময়টা শুধু আনন্দের। সময়টা শুধু আমাদের।
.
.
.
.
.
-আব্বু, আব্বু, এই আব্বু
-কি হয়েছে মামুনি?
-আমাকে শক গাম এনে দিবে আজকে?
-সে কি? শক গাম কেন? কি করবে?
-রনওক নামে পাজি একটা ছেলে আছে আমাদের ক্লাসে, তাকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে।
শুনে শুধু একবার হাসলাম, আসলেই তো একদম মায়ের মত হয়েছে, এখন সে আমার পিচ্চি মেয়ে…
.
[সমাপ্ত…]

আরও

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

স্ত্রীর পরশে

স্ত্রীর পরশে বদলে গেলো স্বামী (ছোট্ট গল্প)

এক স্ত্রী গভীর রাতে প্রতিদিন স্বামীর পাশ থেকে ঘুম থেকে উঠে আধা ঘন্টা এক ঘন্টার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE