Home / শিশুদের জন্য আমরা / শিশুর স্বাস্থ্য / সুস্থ নবজাতকের লক্ষণ ও তার যত্ন এবং খাবার

সুস্থ নবজাতকের লক্ষণ ও তার যত্ন এবং খাবার

সুস্থ নবজাত শিশু পূর্ণ মাসে (৩৮—৪২ সপ্তাহ) জন্মগ্রহণ করে, জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই কাঁদে এবং সন্তোষজনকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়।

ওজন ও পরিমাপঃ ভারতবর্ষে সচরাচর ২.৫ কেজির বেশি ওজন হয়। গড় ওজন হল ২.৭ কেজি। মাথা থেকে পা পর্যন্ত গড় দৈর্ঘ্য ৫০ সেমি, মাথার পরিধি ৩৫ সেমি ও বাইপ্যায়েটাল ডায়ামিটার (Biparaetal diameter) ৯.৫ সেমি।
দেহভঙ্গিঃ নবজাতকের হাত-পা কিছুটা ভাঁজ করে থাকে, যদিও হাতের মুঠি শক্ত করে বোজানো থাকে—যেমনটি মায়ের জরায়ুর ভেতর থাকে।
মাথাঃ স্বাভাবিক প্রসবের সময় মাথার আকৃতির কিছুটা পরিবর্তন (Moulding and Caput succedaneum) হয়, তা এক-দুদিনের মধ্যে আপনা থেকেই ঠিক হয়ে যায়। চোখের পাতা দিয়ে শিশুর চোখ বেশিরভাগ সময়ে ঢাকা থাকে। শিশুর মাথা বাকি শরীরের তুলনায় বড় থাকে। মাথার তুলনায় ছাতির পরিধি কিছুটা কম থাকে।
গলাঃ নবজাতকের সাধারণত ছোট থাকে।
মুখঃ মাথার তুলনায় মুখ ছোট থাকে।
শ্বাসপ্রশ্বাসঃ নবজাতক নাক ও মুখ উভয় দিক দিয়ে শ্বাস নিতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়মিত থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি সাধারণত ৩০—৬০ এর মধ্যে থাকে। হার্টের গতি প্রতি মিনিটে ১২০—১৪০।
রক্তচাপঃ সাধারণত ৮০/৫০ মিঃমিঃ পারদ।
পেটঃ সচরাচর ভেতরে ঢুকে থাকে। লিভার ও স্প্লিন হাত দিয়ে অনুভব করা যায়।
লিঙ্গঃ পুরুষ-শিশুর শুক্রাশয় অণ্ডকোষের মধ্যে থাকে।
চুলঃ সরু সরু মুখের চুল ও শরীরের চুলকে লানুগো (Lanugo) বলে। মাথার চুল সাধারণত এক মাসের মধ্যে পড়ে যায়।
তাপমাত্রাঃ শরীর তাপমান জন্মের অল্প সময় পরেই এক থেকে ২ ডিগ্রি ফারেনহাইট কমে যায় এবং তা ৯৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে।
ত্বকঃ কিঞ্চিৎ নীলাভ শরীর সচরাচর জন্মের পরপরই দেখা যায়। পরবর্তীকালে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার পরেই তা গোলাপি রঙের হয়। একরকম সাদা পদার্থ দিয়ে শিশুর চামড়া ঢাকা থাকে, তাঁকে ভার্নিক্স বলে।
প্রস্রাবঃ নবজাত শিশু জন্মের পরপরই সাধারণত প্রস্রাব করে। জন্মের প্রথম সপ্তাহে প্রস্রাবের পরিমাণ কম থাকে এবং চব্বিশ ঘন্টায় প্রায় দু’আউশ পরিমাণ হয়। কদাচিৎ প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে কোনো প্রস্রাবই হয় না।
মলঃ শিশু জন্মের পরপরই কালো রঙের মলত্যাগ করে। একে মেকোনিয়াম বলে।
জন্মের সময় পরীক্ষা করে রক্তে যা যা পাওয়া যায়

জন্মের পর রক্তের পরিমাণ ৮০ মিলিলিটার প্রতি কেজি ওজনে থাকে। লোহিত রক্তকণিকা ৬—৮ মিলিয়ন প্রতি কিউবিক মি.মি.-তে। হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ১৮ গ্রাম % শ্বেত রক্তকণিকা ১৭০০০ প্রতি কিউবিক মি.মি.-এ, অনুচক্রিকা ৩,৫০,০০০ প্রতি কিউবিক মি.মি. এ, রেটিকিউলোসাইট ৩.৭ শতাংশ।

প্রথম সপ্তাহে শিশুর কী কী পরিবর্তন হয়

প্রথম সপ্তাহে শিশু পারিশ্বার্শিক আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া চেষ্টা করে।

ওজনঃ প্রায় ১০ শতাংশ ওজন কম যায় জন্মের চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই। সাত দিন বাদে ওজন বাড়তে শুরু করে। প্রথম দিকে ওজন কমার কারণ হল—শরীর থেকে, ফুসফুস থেকে, প্রস্রাব ও পায়খানার সঙ্গে জল বের হয়ে যাওয়া। এই সময়ে শিশুর আহারও খুব কম থাকে। যত বড় শিশু জন্ম নেয়, ওজনও তত বেশি কমে। পরবর্তীকালে শিশুর ওজন প্রতিদিন ২৫ গ্রাম করে বৃদ্ধি হয়।
ত্বকঃ গোলাপী রঙ থেকে ফ্যাকাশে বাদামী রঙের হয়। চামড়াতে কিছুটা শুজনো ভাব থাকে এবং তা আঁশযুক্ত। জন্মের দু-তিন বাদে ১০ শতাংশ শিশুর চামড়ায় হলদে ভাব দেখা যায়, যাকে ফিজিওলজিক্যাল জনডিস বলে। চামড়ায় সরু-সরু চুল, জা শিশু জন্মের সময় দেখা যায়, তা আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়।
তাপমাত্রাঃ শরীরের তাপমাত্রা ৯৭—৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইটে ওঠানামা করে।
স্তনঃ উভয় লিঙ্গের শিশুরই স্তন ফুলে ওঠে। সাদাটে রস বের হয় দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন থেকে। মায়ের এস্ট্রোজেন হরমোন শিশুর শরীরে প্রবেশ করার জন্য এটা হয়।
নাড়ি (Cord)ঃ শুকিয়ে পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে ঝরে পড়ে।
প্রজনন-অঙ্গঃ স্ত্রী-শিশুর বহিঃপ্রজনন অঙ্গ কিছুটা ফুলে থাকে। শ্বেতপ্রদর হতে পারে, এমনকী যোনি থেকে রক্তক্ষরণ পর্যন্ত হতে পারে প্রথম সপ্তাহে। এটা ১—২ দিন থাকে। এটা শরীরের এস্ট্রোজেন হরমোন কমে যাওয়ার জন্য হয়।
মলঃ প্রথম দু-তিনদিন মেকোনিয়াম নির্গত হয়, যা দিনে-তিন-চার বার হয়। বারো ঘন্টার ভেতর শিশু মলত্যাগ না করলে শিশুকে পর্যবেক্ষণে রাখা উচিৎ। তৃতীয়-চতুর্থ দিন থেকে মলের রঙের পরিবর্তন হয়ে তা বাদামী-হলুদ রঙের হয় ও টক গন্ধযুক্ত থাকে। বৃহদন্ত্রের ভেতর ব্যাকটিরিয়াল ফ্লোরা (E-Coli) সৃষ্টি হওয়ার জন্য এটা হয়। দিনসাতেক বাদে শিশুর মলের রঙের আবার পরিবর্তন হয়। যে শিশু মায়ের দুধ পান করে, তার সোনালী-বাদামী রঙের নরম মল হয় এবং টক-টক গন্ধযুক্ত থাকে। দিনে একবার থেকে পাঁচ-ছয়বার পর্যন্ত মলত্যাগ করতে পারে। কখনও কখনও মল জলীয় ও সবুজ রঙের মিউকাসযুক্ত হতে পারে। বোতলের দুধ খাওয়া শিশুর মলের রঙ হয় ফ্যাকাশে,তা শক্ত এবং দুর্গন্ধযুক্ত হয়—এর সঙ্গে দইয়ের মতো পদার্থ যুক্ত থাকে। এটা ক্ষারধর্মীয় (Alkaline in reaction)।
মূত্রঃ প্রথমদিকে শিশুর মূত্রের পরিমাণ কম থাকলেও সপ্তাহখানেক বাদে শিশু দিনে প্রায় ২৫০ মিলিলিটার প্রস্রাব করে।
স্নায়বিক প্রতিক্রিয়াঃ স্বাভাবিক শিশুর কতকগুলি প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করলে দেখা যায়।যেমন, গ্রাস্প রিফ্লেক্স (Grasp reflex) এবং মরোস রিফ্লেক্স (Moro’s reflex)।
রক্তের পরিবর্তনঃ হিমোগ্লোবিন ১২ গ্রাম %-এ নেমে আসে। দু’তিন্দিনের মাথায় বিলিরুবিন ৫ মি. গ্রাম% থাকলেও সপ্তাহখানেক বাদে তা ২ মি.গ্রাম%-এ নেমে আসে।
এরপর পড়ুনঃ নবজাত শিশুর যত্ন 

লেখকঃ ডাঃ অবিনাশ চন্দ্র রায়। (স্ত্রীরোগ-বিশেষজ্ঞ)

লেখকের গর্ভবতী মা ও সন্তান বই থেকে নেওয়া।

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *