Home / ব্লগ / প্রেমের গুনগুন! আম্মানছুরা

প্রেমের গুনগুন! আম্মানছুরা

(১)
জমকালো বিশাল পার্টি কিন্তু গুনগুনের ভীষণ একা লাগছে। আশেপাশে কতশত কাপল জোড় বেধে নাচছে। ওদের প্রেমলীলা দেখে সদ্য তারুণ্যে পা দেওয়া গুনগুন আরো একা হয়ে যায়। সবার সাথে তাল মিলিয়ে একা একাই বেচারি নাচতে থাকে। হঠাত অদূরে এক চমৎকার যুবককে গুনগুনের নিকট এগিয়ে আসতে দেখা যায়।

প্রেমের গুণগুণ
ছবিঃ লেখিকা।

মুহুর্তেই ধুসর মুহুর্ত রংগিন হয়ে যায় গুনগুনের কাছে। সুদর্শন যুবককে দেখে গুনগুনের রক্তস্রোতে এক উন্মাদনার সুর জাগে। এক সম্মোহনী নেশায় গুনগুন আক্রান্ত হয়ে যায়। সেই নেশাকে ছোঁয়াচে করার উদ্দেশ্যে গুনগুন মনপ্রাণ উজাড় করে নাচতে থাকে। প্রেমের সার্বজনীন ভাষা গুনগুনের নৃত্যের ছন্দে ছন্দে প্রকাশিত হতে থাকে। এই ভাষাকে অস্বীকার করার সাধ্য নেই কোন যুবকের।

কিছুক্ষণ পর গুনগুন আর যুবকটিকে জোড় বেধে নাচতে দেখা যায়। দুজনের চোখে মুখে প্রেমের আভা খেলা করছে। হঠাত যুবকটি নাচ থামিয়ে চোখ কুচকে গুনগুনের দিকে চেয়ে থাকে, তারপর বলে- “এই তুমি কি নীল দরিয়ার মেয়ে?”
– “হ্যা, তুমি কিভাবে জানলে?”
গুনগুনের চোখে মুখে বিষ্ময়!
– “আরে, তুমি গুনগুন না!! আমি তোমার ছেলেবেলার খেলার সাথী যাকে তুমি আদর করে ভুতো বলে ডাকতে!!”
মুহুর্তেই চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে যায় গুনগুনের। মধুর ছেলেবেলা স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে চলে আসে।

গুনগুন আর ভুতো ছেলেবেলায় সবসময় একসাথে থাকতো। ওরা দুজন সারাদিন নীল দরিয়ায় সাতার কাটতো আর খেলতো। ভুতো ভূতের মতন বেশী খাই খাই করতো বলে গুনগুন ওর নাম দিয়েছিল- ভুতো। এই নামকরণে ক্ষেপে গিয়ে অভিমানী ভুতো ৬০০ সেকেন্ড গুনগুনের সাথে কথা বলেনি। অথচ, পরে এই নামকেই ভালবেসে ধারণ করেছে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ওদের এই হাসিখেলার দিন ফুরায়। ওরা যার যার দুনিয়া বুনতে ব্যস্ত হয়ে দুজন দুজনের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আজ আবার দুনিয়ার নিয়ম মেনেই পার্টি ও পরিচয়! হায়রে দুনিয়া!!

ভুতো কে চেনার পর গুনগুনের ভীতু প্রেম সাহস পায়। গুনগুন ভুতোর সামনে হাটু গেড়ে বসে প্রস্তাবই দিয়ে বসে- “উইল ইউ ম্যারি মি?”
এই কথা শুনে ভুতো খুব খুশী হয়। আনন্দে গুনগুনকে জড়িয়ে ধরে কিন্তু পরমুহুর্তেই ছেড়ে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে- “না, গুনগুন, না। আমি তোমাকে নিয়ে এত বড় জুয়া খেলতে পারব না। আমায় ক্ষমা করো। দুনিয়ার সবাই তো বিয়ে করে, বাচ্চা হয়। আমাদের নাইবা হলো। দুজন দুজনকে ভালোবেসে এক জীবন হেসে খেলে নেচে নেচে পার করে দিই চলো। কি দরকার সংসার সন্তানের জন্য জীবনকে জুয়ার আসরে নিয়ে যাবার!!!”

গুনগুন বুঝতে পারে কেন বিয়ে করতে ভয় পাচ্ছে ভুতো। একারণে আরও বেশী খুশি হয় গুনগুন। নিজের সৌভাগ্যের কথা ভেবে গর্বিত হয়। এত চমৎকার প্রেমিক পুরুষকেই তো সন্তানের বাবা বানাতে হবে, হবেই। এই মহৎপ্রাণ যুবকের সন্তানের মা হতে পারাটা বিশাল ভাগ্যের ব্যাপার। গুনগুন এই ভাগ্য কিছুতেই হাতছাড়া করবেনা। তাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ পায়ে ভুতোর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ভুতোর বুকে মাথা দিয়ে ফিসফিস করে বলে- “ভুতো, অনিশ্চিত জীবন আর নিশ্চিত মৃত্যুর চক্রে আমরা সবাই বাধা। শুধুমাত্র সন্তানের মাধ্যমেই আমরা অনন্তকাল বেচে থাকতে পারব। যেভাবে আমার বাবা মা ও তাদের বাবা মা আমাদের মাধ্যমে বেচে আছেন। আমাদের দুজনের একাকার হয়ে যাবার একটাই সুযোগ- সন্তান! অর্ধেক তুমি আর অর্ধেক আমি নবজন্ম পাব সন্তানের মাধ্যমে। আমি তোমার ডিএনএর সাথে আমার ডিএনএ মিশিয়ে দিয়ে অনন্তকাল আমরা হয়ে বেচে থাকতে চাই। তারজন্যই আমাদের বিয়ে করতে হবে। প্লিজ, আমাকে ফিরিয়ে দিও না। আমার মৃত্যু ঝুকির কথা ভেবেই তুমি ফিরিয়ে যদি দাও তাহলে জেনে রাখো, আমি এই জীবন রাখব না।”

গুনগুনের এই ঠান্ডা হুমকিতে ভুতো ঘাবড়ে যায়। এই মেয়েকে দিয়ে বিশ্বাস নেই। খুবই জেদী ও একরোখা মেয়ে। আত্নহত্যার চেয়ে তো মৃত্যুর ঝুকি নেয়াটা বেচে থাকার জন্য অধিক সম্ভাবনাময়। তাই ভুতো নিমরাজি হয়ে ইয়েস বলে।

অত:পর বিয়ে ও দুটি প্রাণের এক হয়ে যাবার তীব্র বাসনায় দুজনের প্রাণরস একত্রিত হয়ে জমা হয় গুনগুনের গর্ভে। গুনগুনের জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চলে এসেছে যেই ভয়ে ভুতো ভীষণ ভীত। গুনগুন অবশ্য সাহস হারায় না বরং দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে নেমে পড়ে।

(২)

সারাদিন হাড়ভাংগা খাটুনি খেটে আছিয়া মাত্র বিছানায় গা এলিয়ে দিল। আজ বাসায় মেহমান এসেছিল তাই কাজের অনেক চাপ ছিল। এই বাড়ির মালিক বেশী টাকা বেতন দেয় বলেই আছিয়া কাজটা ছাড়েনা। নয়ত কাজের চাপে প্রাণ পলাই পলাই করে। প্রতিদিনই এত এত বাজার ও কাজ লেগেই আছে।

আছিয়ার চোখটা লেগে এসেছে ঠিক তখন মেমসাহেব এসে আছিয়াকে ডেকে তুল্লেন। গ্রাম থেকে ফেরার সময় নদীর মাঝিদের থেকে ইয়া বড় সাইজের একটা চিতল মাছ কিনে এনেছেন গৃহকর্তা। এই রাত বারোটায় মাছ নিয়ে বাসায় এসেছেন আর এখুনি নাকি তাকে এটা রেধে খাওয়াতে হবে। চিতল মাছের পেটি দিয়ে ভাত খেয়ে তবেই ঘুমাবেন। সাহেবের তৃপ্তির ঘুমের বন্দোবস্ত করতে নিজের শান্তির ঘুম বিসর্জন দেয়ার অলিখিত চুক্তি ভাংগার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও সেই সাহস আছিয়ার নেই।

রান্নাঘরে বসে মাছ কাটতে থাকে আছিয়া। ও মনে মনে বলছে- “আমার জীবনের অভাবগুলো চিতল মাছের আশের মতন, ফুরায় না যেন।”
হঠাত মশার কামড়ে ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে আছিয়া। তাকিয়ে দেখে একঝাক মশা ওকে ঘিরে নাচছে আর ওকে খাচ্ছে। মনের ভিতরের অসহায় দুঃখ সত্তাটা মুহুর্তেই প্রতিবাদী হয়ে যায়। মাছ হাত থেকে ছেড়ে দিয়ে নোংরা হাতেই নিজেকে থাপ্পড় দিয়ে মশা পিষে মারতে থাকে আর বলতে থাকে-” দুনিয়া আমাগো রক্ত চুষে, এই বাড়ির সাহেব বিবিও রক্ত চুষে, তুইও আমার রক্ত চুষোস। পারলে যা, এরোসেল স্প্রে করা ওই এসি রুমে গিয়া মেম সাবের রক্ত খাইয়া আয়। তা তো পারবি না।”

মশাগুলো মারার পর আছিয়ার রাগ কিছুটা কমে। ও মাছ কাটায় মনযোগ দেয়। অনেক কাজ। মৃত মশাগুলো আছিয়ার পায়ের কাছে পড়ে আছে। কোথেকে একটা মশা উড়ে এসে আছিয়ার পায়ের সামনে বসে। আছিয়া মশাটা মারতে গিয়ে থেমে যায়। ও অবাক হয়ে দেখে, মশাটা ওর পায়ের সামনে পড়ে থাকা একটা মৃত মশা পা দিয়ে জড়িয়ে ধরে সাথে নিয়ে উড়ে চলে যায় সুপারম্যানের মতন। আছিয়া মশার গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে,,,,,

(৩)

ভুতো গুনগুনের লাশ জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে। একটু আগে ওর গুনগুনকে নির্মম মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে। প্রচন্ড কষ্টে ওর ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। মানুষগুলো এত নিষ্ঠুর কেন! ওরা নিজেদের প্রয়োজনে সমস্ত জীব জন্তু ধরে বেধে মেরে খেয়ে ফেলে অথচ ওর গুনগুন কেবল ওদের সন্তানকে পরিপুষ্ট করে বড় করার জন্য মানুষের কাছে এক ফোটা রক্ত চেয়েছিল শুধু। এই এক ফোটা রক্ত ওদের প্রেমের ফসল ফলাতে অপরিহার্য। অথচ মানুষগুলা তাও দিল না। একেবারে মেরেই ফেলল। এই ভয়টাই ভুতো পেয়েছিল, একারণেই ও বিয়ে করতে চায়নি। ও জানে বিয়ে করলে গর্ভের সন্তানের অধিক পুষ্টি চাহিদা ফল টল দিয়ে পূরণ করা যায়না। তখনই স্ত্রীদের জীবনের ঝুকি নিয়ে ওই নিষ্ঠুর গরম রক্তের প্রাণীদের কাছে যেতে হয়। অনেকেই মরে যায় তখন।
ভুতো বিলাপ করে ওঠে। সৃস্টিকর্তার কাছে বিচার দেয়- হে পবিত্র স্রস্টা, মানুষগুলো নিজের খাদ্যের জন্যে লক্ষ কোটি প্রাণী মেরে ফেলে আর আমরা ওদের মারিও না, কাটিও না, শুধু সন্তানের জীবনের জন্য একফোঁটা রক্ত নিই। তাও ওদের সয় না। তবুও তোমার দুনিয়ায় ওদেরই শ্রেষ্ঠ-র সম্মান দিয়েছো প্রভু! কেড়ে নাও এই ভুল সম্মান। ওরা শ্রেষ্ঠ নয়, ওরা সেরা অত্যাচারী!!

লেখিকাঃ আম্মানছুরা

আরও পড়ুন : ছিনাল মেয়ের আক্ষেপ (ভন্ড প্রেমিকের গল্প)

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

মিশর

বিপ্লবের ঘটনাঃ মিসর, ২০১১। হোসনে মোবারকের পতন যেভাবে ঘটেছিল

২০১০ সালে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় ২৮ বছর বয়স্ক খালেদ সৈয়দ কে পুলিশ নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *