Home / সাহিত্য / কিছু গল্প / প্রবাসীর ছেলের প্রেম! (প্রেমের কষ্টের গল্প)

প্রবাসীর ছেলের প্রেম! (প্রেমের কষ্টের গল্প)

কষ্টের গল্পগল্পঃ প্রবাসীর ছেলের প্রেম।

লেখিকাঃ শারমিন রহমান

গল্পের টপিক্সঃ প্রেমের গল্প

প্রবাস নামক কারাগারে বাস করার একটা পর্যায়ে ঢাকায় থাকা শবনমের সাথে ফেসবুকে পরিচয় হয় চট্টগ্রামের মুহিবের। শবনম তখন উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্রী। জীবনের বাস্তবতা ভাববার বুঝটা সেরকম হয়নি তখন!
কথা বলতে বলতে মুহিব আর শবনম প্রচণ্ড মায়ায় জড়িয়ে যায় একসময়। একপ্রকার অবাধ্য কাছে আসা।
ভালোলাগা আর তারপর ভালোবাসা…..
তবুও সমাজের আর দশটা প্রেম কাহিনীর চেয়ে ওদের গল্পটা আলাদা!
রোড এক্সিডেন্টে বাবা চলে যাওয়ায় নিজের পড়াশোনা বাদ দিয়ে সংসারের হাল ধরতে প্রবাসে ছুটে যায় এক বিধবা মায়ের বড় ছেলে আর এতিম ভাই বোনদের বড় ভাই মুহিব!
সেখানে শ্রম বিলিয়ে টাকা কামিয়ে মায়ের হাতে পাঠিয়ে দেয় সে। তার দুবোন একভাই আর মা। ছেলের পাঠানো উপার্জনে স্রোতের মতো একভাবে চলে যায় তাদের জীবন।
এদিকে সময় গড়াবার সাথে সাথে একটা সময় শবনমের বুঝ হয়। তার বাড়িওয়ালা আর সরকারি চাকুরীজীবী বাবা কখনই মুহিবের মতো ছেলেকে মেয়ের জামাই হিসেবে মেনে নিবে না।
মুহিবও জানে সেটা। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় কোনোদিন দেখা না করার। কারণ দেখা করা মানেই ভুলের আরেকটা অধ্যায়ের শুরু। সেই শুরুটা তারা করতে চায়না। বিশেষ করে শবনম। ভাগ্য যেভাবে যেদিকে নেয় সেভাবেই দুজন দুদিকে চলে যাবে,সেটা মাথায় নিয়ে নেয়।
এসব নিয়ে মনমালিন্য হয়ে কতবার যে তাদের প্রেমের বিচ্ছেদ হয়েছে তার হিসেব নেই। কিন্তু প্রত্যেকবারই সেই বিচ্ছেদের ব্যপ্তি হয় কেবল তিনদিন। এরপর আবার সব ঠিকঠাক। কেউ কারও সাথে কথা না বলে থাকতে পারেনা। না হোক জীবনে দেখা। তবুও তো মুঠোফোনের ওপাশের মানুষটার কন্ঠ শোনা যায়। প্রশান্তি আসে…..
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর মুহিব ছুটিতে আসে দেশে। আসার আগে সব বাস্তবতা মেনে দুজনই মিউচুয়াল কন্ট্রাক্ট করে যে তারা দেখা করবেনা।
শেষপর্যন্ত মুহিব একবারের জন্য হলেও দেখা করতে চায়। কিন্তু শবনম কোনো ভাবেই রাজি হয়না।
মুহিব প্রিয়তমাকে একবার চোখের দেখা না দেখে কিছুতেই ফিরে যেতে পারবেনা। তাই তার প্ল্যানিং হয় অন্যভাবে।
দেশে আসার তিনমাস পর অক্টোবরের ৬ তারিখ মুহিবের প্রবাসে ফিরে যাওয়ার কথা।
কিন্তু সে শবনমকে বলে তার ফ্লাইট সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখ। তার সেই ফ্লাইট ছিল বাসে। হ্যাঁ বাসেই এক বন্ধুর সাথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয় মুহিব। এটাই ছিল ওর প্রথম ঢাকায় আসা। উদ্দেশ্য প্রিয়তমাকে একটাবার চোখের সামনে দেখা। আর শবনম জানে মুহিব বিদেশ ফিরে যাচ্ছে। তাই সেদিন পুরোটাদিন সে শুধু কাঁদে। কখনও যার সঙ্গে দেখাই হলোনা তার জন্যই অদ্ভুত একটা কষ্টে প্রচণ্ড কাঁদে সে।
২৪ তারিখ ভোরে ঢাকা নেমে হোটেলে উঠে মুহিব। বেলা ১০ টার দিকে শবনমের বান্ধবী অর্থীকে ফোন করে সে।
–আপু আমি মুহিব।
–জ্বী ভাইয়া বলেন।
–আপু আমি তো ঢাকা এসেছি। কিন্তু শবনম জানেনা।
আজ ওর জন্মদিন। তাই আমি ওকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্যই না বলে এতোদূর ছুটে এসেছি। আপনি ওকে নিয়ে কোথাও বের হবেন প্লিজ আপু!?
–আচ্ছা ভাইয়া কোনো সমস্যা নেই। খুব ভালো সারপ্রাইজ হবে এটা। একেবারে ফিল্ম ফেইল। হাহাহা….
আপনি উমুক জায়গায় থাকবেন। আমি ওকে নিয়ে আসবো।
এদিকে শবনমের হঠাৎ শরীরটা খারাপ লাগছে। ও বের হবেনা জানিয়ে দেয়। কিন্তু অর্থী অনেক রিকুয়েস্ট করতে থাকে।
মুহিবও ওকে মেসেজে বলতে থাকে যাও না বেড়িয়ে এসো,ভালো লাগবে।
কিন্তু কোনোভাবেই শবনম রাজি হয়না। মুহিব কি এখন বলে দিবে সত্যিটা!??
তবে কি আর সারপ্রাইজ দেয়া হবেনা???
বলবে যে,আমি এসেছি। প্লিজ তুমি এসো!???
নাহ বলতে হয়নি শেষ পর্যন্ত। শবনমকে নিতে ওর বাসায় চলে যায় অর্থী। রেডি করিয়ে নিয়ে যায় সেই রেস্টুরেন্টে যেখানে অপেক্ষারত মুহিব।
শবনম কাছে যেতেই বসা থেকে দাঁড়িয়ে মুহিব একটা ফুলের তোড়া ওর দিকে বাড়িয়ে ঠোঁটের কোণে হাসির রেশ টেনে বলে,’শুভ জন্মদিন প্রিয়া’
শবনম আকাশ থেকে পড়ার মতো ভীষণ রকম সারপ্রাইজড হয়। তার কাছে সবকিছু স্বপ্ন মনে হয়। একি! আজ মুহিবের চলে যাবার কথা! সে ঢাকা কি করে এলো!??? সবকিছু এলোমেলো লাগছে। মাথা চক্কোর দিচ্ছে ওর। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছেনা। স্বপ্ন দেখছে না তো!?
পরে সত্যিটা জানানো হয় তাকে।
তিনবছর যাবৎ পরিচয়ের সেই মানুষটাকে সেদিন চোখের সামনে দেখে নিজেকে সামলাতে অনেক সময় লাগে শবনমের। চোখ ভিজে ওঠে। কিন্তু সে খুশিও হয় খুব। ওর জন্মদিনে এমন একটা গিফট অপেক্ষা করছিল তা কল্পনায়ও ভাবেনি শবনম। কখনও দেখা করতে না চাইলেও প্রিয় মানুষটাকে একটাবার দেখতে পেয়ে খুব খুশি হয় সে।
জীবনের সেরা উপহার ছিল তার জন্য।
স্বাভাবিকের মতোই আবার ফিরে যায় মুহিব। বিদায়টা হয় অশ্রুসিক্ত!
মনের দিক থেকে আরও বেশি কাছে চলে আসে দুজন দুজনের। হৃদয়ের টানটা আরও গভীর হয়।
দেখতে দেখতে বিদেশ যাওয়ার সময় চলে এলে ফিরে যায় মুহিব। দেশ থেকে টুকরো কিছু স্মৃতি বুকে নিয়ে ফের প্রবাসের কারাবরণ করে নেয় সে।
মা,ভাই,বোন আর প্রেয়সীর পবিত্র মুখখানা হৃদয়ের ছবি বানিয়েই আবার স্বপ্ন দেখতে থাকে মুহিব।
বেশকিছু দিন পর শবনমের পরিবারকে ওদের কথা জানাতে বলে মুহিব। শবনম নিশ্চিত জানে তার পরিবার মানবেনা এই সম্পর্ক।
তবুও বুকে কিঞ্চিত আশা নিয়ে সব ভয়ভীতি,লজ্জা ভেঙ্গে এক পর্যায়ে মাকে সবটা শেয়ার করে শবনম।
মা সবটা শুনে অবাক হয় নিজের মেয়ের রুচি দেখে।
বলে,
একটা মিডলইস্টের ছেলে। পড়ালেখাও নাই। বিয়ে করে দুইবছরের জন্য বউ ফেলে চলে যাবে বিদেশ! জীবনেও ওখানে নিয়ে যেতে পারবেনা। ছেলের কি অভাব হয়েছিল দেশে!????
তুই কি পঁচে গেছিস যে এই বিয়ে করতে হবে তোকে!?
এতো পড়াশোনা কেনো করালাম তাহলে!??
এতো নিচে নেমেছিস কি করে!???
এসব কথা তো তর বাবাকে কোনোভাবেই জানানো যাবেনা।
কথা গুলো নিতে পারছিলনা শবনম। প্রচণ্ড অপমান বোধ করে সে। মায়ের সাথে তর্ক করে এক পর্যায়ে চুপ করে যায়। সে বুঝতে পারে মাকে।
সমাজ আর পরিবারের চোখে সে যে জীবনে অনেক বড় ভুল করে ফেলেছে তা আর বুঝতে বাকি নেই।
তবুও মাকে সে বলে,
–জানো মা অনেক সার্টিফিকেট ধারী শিক্ষিত আর দেশে কর্মরত ছেলেও ভালো হয়না। কিন্তু আবার অনেকসময় গোবরেও পদ্মফুল ফোটে। মুহিব আমার কাছে পদ্মফুলের মতোই। ভালোবাসা কি এতসব দেখে হয় বলো!???
–আমরা কি দেখেশুনে বিয়ে দিবোনা!??? জেনে রাখিস এতোটা খোঁড়া হয়ে যায়নি তোর বাবা মা।
–দেখেশুনে বিয়ে দিলেই কি সে মানুষটা তোমার মেয়েকে ভালোবাসতে পারবে!??
–কেনো তোর বাপ চাচা আর মা চাচীরা করেনি এরেঞ্জ ম্যারেজ!??? দেখাতো কাদের জীবনে ভালোবাসা নাই?? পারলে দেখা।
আর কোনো জবাব নেই শবনমের কাছে।
মুহিব সবকিছু শোনার পর খুব ভেঙ্গে পড়ে। প্রচণ্ড অপমান বোধ হয় তার। শবনমের সামনে নিজেকে একেবারেই অযোগ্য মনে হয়।
সে বলে,
–তোমার মা ঠিকই বলেছে। আমি তোমার জন্য যোগ্য নই। আমার মনে হয় তোমার পরিবারের কথাই তোমার শোনা উচিত। তুমি মাকে জানিয়েছ তার জন্য অনেক কৃতজ্ঞতা। তোমার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেলো। না পাই তোমায় তবুও তো বলতে পারবো যে চেষ্টা করেছিলে….
কাঁদতে কাঁদতে শবনমের চোখের পানি যেনো ফুরিয়ে যায়। কিন্তু সমাজ আর পরিবারের কাছে হাত পা বাঁধা ওদের। নিজেরাও একা কোনো সিদ্ধান্ত নিবেনা তারা। কারণ বিয়ের আগ পর্যন্ত শবনম শুধুমাত্র ওর পরিবারের আমানত। একমাত্র তাদেরই অধিকার। সেটা বোঝে সে।
দুজনের পথ দুদিকেই হবে। এছাড়া আর উপায় নেই।
চারটে সার্টিফিকেটের অভাব আর প্রবাসের আবদ্ধ কারাগার এভাবেই সৃষ্টি করে দিলো একটা বেদনাবিধুর ভাঙ্গনের গল্প…..নিভিয়ে দিলো দুটি মানুষের চারটে বছরের শত স্বপ্ন,আশা আর ভালোবাসার প্রদীপটাকে…..বাস্তবতার টানাপোড়নে হারিয়ে গেলো দুজন দুজনের কাছ থেকে। আর রয়ে গেলো কিছু ভুল। অনেকখানি অপ্রাপ্তি!
শবনমের জন্মদিনটাই ছিল তাদের প্রথম এবং শেষ দেখা….
ওর জন্মদিনের বিশেষত্বের সাথে সেটাও যোগ হয়ে থাকবে সারাজীবনের জন্য……….
প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই এমন কিছু অতীত থাকে। আর থাকে বলেই সে মানুষ!
জীবন এটাই। এটাই বাস্তবতা…….!
মুহিব এভাবেই সারাজীবন প্রবাসের কারাভোগ করতে করতে সংসার টেনে যাবে। আর শবনম একদিন হয়ে যাবে অন্য কারও ঘরের ব্যস্ত জননী…..
শুধু রয়ে যাবে রক্তক্ষরণে জমাট বাধা আহত কিছু স্মৃতি….!

শারমিন রহমানের লেখিত আরও গল্প…

০১. সুখ (স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার গল্প)

০২. বড় মেয়ে (বাস্তব গল্প)

probasi cheler premer koster golpo, bangla love story. writer by sharmin rohman.

#লাভ স্টোরি #প্রেমের গল্প #প্রেমের কষ্টের গল্প #ভালোবাসার গল্প #বাংলা গল্প #Bangla Love story #BanglaGolpo  

About Syed Rubel

Creative writer and editor of amar bangla post. Syed Rubel create this blog in 2014 and start social bangla bloggin.

Check Also

জিনের সুন্দরি মেয়ে

জিনের সুন্দরি মেয়ে কে বিয়ে করার ঘটনা [জিনের গল্প]

জনাব কাযীউল কুযযাহ জালালুদ্দীন আহমদ বিন কাযীউল কুযযাহ হিসামুদ্দীন রাযী হানাফী বলিয়াছেন……… ‘আমার পিতা আপন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE